ভূমিকা: শিশুরা হ’ল পরিবারের আয়না। সেই আয়নাতেই প্রতিফলিত হয় বাবা-মায়ের শিক্ষা, আচরণ ও চরিত্রের সূক্ষ্ম ছাপ। আখলাক বা চরিত্রের সবচেয়ে সুন্দর বাহ্যিক রূপ হ’ল আদব। একজন মানুষের সৌন্দর্য ফুটে উঠে তার আদবের মধ্যে। উত্তম আদবের মাধ্যমে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত হয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সর্বত্রই রয়েছে আদবের ছাপ। নবী কারীম (ছাঃ) আমাদের সকল বিষয়ের আদব শিক্ষা দিয়েছেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থাকলেও আদব বা শিষ্টাচারের শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হয়। পরিবার হ’ল শিশুর প্রথম ও প্রধান শিক্ষালয়। যেখানে পুঁথিগত বিদ্যার আগে ধৈর্য, যত্ন ও অনুশীলনের মাধ্যমে রোপিত হয় শিষ্টাচারের প্রথম বীজ। সবকিছুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শেখানো সম্ভব নয়। কিছু বিষয় পরিবার থেকেই শেখাতে হয় ধৈর্য ও অনুশীলনের মাধ্যমে। পরিবারই পারে শিশুকে আদবের আলোয় উদ্ভাসিত মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে। এজন্য বলা হয়ে থাকে, শিশুরা জ্ঞান অর্জন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে, আর আদব শিখে পরিবার থেকে।
যে আদবগুলো পরিবার থেকে শেখাতে হবে : আদবের বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা কিছু মৌলিক আদব সম্পর্কে আলোচনা করার প্রয়াস পাব, যেগুলো পরিবার থেকেই শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
ঈমান ও আক্বীদাগত আদব : শিশুদের ঈমান ও আক্বীদার শিক্ষা কেবল ধারণাগত নয়, বরং এর সাথে কিছু মৌলিক আদবও জড়িত। মহান আল্লাহ তা‘আলার পরিচয়, তাঁকে চেনা ও জানা, তাঁকে সকল কিছুর চেয়ে বেশী ভালোবাসা, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করা, আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা, সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা রাখা ইত্যাদি বিশ্বাসগুলো শিশুদের প্রথম পাঠ হওয়া উচিত। অতঃপর নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর আদর্শ ও সুন্নাতকে মেনে চলা, তাঁর নাম শুনলে দরূদ পাঠ করা ইত্যাদি বিষয়গুলো শিক্ষা দেওয়া। এভাবে ক্রমান্বয়ে ঈমানে মুফাছছালের ছয়টি বিষয়ে ধারণা দেওয়া। এছাড়াও সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত আক্বীদার বিপরীতে সঠিক আক্বীদা শিক্ষা দিতে হবে।
সামাজিক ও আচরণগত আদব : ইসলামী জীবনবিধানে এই আদবগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এই আদবগুলো শুধু সামাজিক সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে না বরং এগুলো ইবাদতেরও অংশ। সামাজিক ও আচরণগত আদবগুলো হ’ল :
ক. কথা বলা ও যোগাযোগের আদব : দেখা হ’লে প্রথমে সালাম দেওয়া এবং সালামের উত্তর সুন্দরভাবে দেওয়া, সর্বদা বিনয়ী থাকা এবং নম্র হওয়া, যেকোন পরিস্থিতিতে এমনকি নিজের বিপক্ষে হ’লেও সত্য কথা বলা, মিথ্যা সম্পূর্ণ পরিহার করা, ভাল কথা বলা নচেৎ চুপ থাকা, গীবত ও চোগলখোরি না করা, কেউ কথা বললে মনোযোগ দিয়ে শোনা, বক্তার কথা শেষ না হ’লে তাকে থামিয়ে না দেওয়া, তর্ক এড়িয়ে চলা ইত্যাদি আদবগুলো সর্বপ্রথম পরিবার থেকেই শিক্ষা দেওয়া উচিত।
খ. দেখা-সাক্ষাৎ ও মেলামেশার আদব : কারো ঘরে বা ব্যক্তিগত স্থানে প্রবেশের আগে অবশ্যই সালাম দেওয়া ও মুছাফাহা করা এবং অনুমতি চাওয়া (তিনবার), মানুষের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা, বাড়িতে অতিথি এলে খুশি হওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী আপ্যায়ন করা, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা, তাদের আগে কথা না বলা এবং তাদের জন্য স্থান ছেড়ে দেওয়া, ছোটদের স্নেহ করা ইত্যাদি ছোট ছোট আদবগুলো যথাসম্ভব অল্প বয়সেই শিক্ষা দিতে হবে। কেননা শিশুকালেই চরিত্রের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
গ. মজলিস বা জনসমাগমের আদব : শিশুদের মানসিক বিকাশ, জ্ঞান অর্জন প্রভৃতি কারণে তাদের বিভিন্ন জনসমাগমে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ দিতে হয়। এসমস্ত স্থানের আদবগুলো মেনে চলা যরূরী। নচেৎ মজলিসগুলোর উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। মজলিস বা জনসমাগমের আদবগুলো হ’ল : কোন আসরে, মজলিসে বা মসজিদে অবস্থান করলে সেখানে শান্তভাবে অবস্থান করা, দেরীতে আসলে যেখানে জায়গা পাওয়া যাবে সেখানেই বসা, অন্যকে বসার জায়গা করে দেওয়া, কারো ঘাড় ডিঙিয়ে সামনে না যাওয়া, তিন জন থাকলে তৃতীয় জনকে বাদ দিয়ে দু’জনে কানকথা না বলা, হাঁচি এলে আল-হামদুলিল্লাহ বলা, হাই তোলার সময় মুখে হাত দেওয়া, বিশেষ প্রয়োজনে অনুমতি নিয়ে কথা বলা, স্থান ত্যাগ করা ও বিদায় নেওয়া। সর্বোপরি একজন ভালো শ্রোতা হওয়া। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الْأَلْبَابِ، ‘যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে, অতঃপর তার মধ্যে উত্তমটির অনুসরণ করে। তাদেরকে আল্লাহ সুপথে পরিচালিত করেন এবং তারাই হ’ল জ্ঞানী’ (যুমার ৩৯/১৮)। পরিশেষে দো‘আ পাঠের মাধ্যমে মজলিস ত্যাগ করা।
ঘ. ব্যক্তিগত আচরণের আদব : ইসলাম ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শালীনতা ও ভদ্রতা বজায় রাখতে শিখিয়েছে। এজন্য শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর পূর্বেই ব্যক্তিগত আচরণের আদবগুলো পরিবার থেকেই শেখানোর চেষ্টা করতে হবে। নিজের শরীর, পোষাক ও চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ ও শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা, ডান হাতে খাওয়া, ডান কাতে দো‘আ পাঠ করে ঘুমানো, যেকোন শুভ কাজ ডান দিক থেকে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা, রাতে দ্রুত ঘুমানো এবং ফজরে ঘুম থেকে ওঠা, নিজেকে অন্যের ক্ষতির হাত থেকে বিরত রাখা, নিজের ভুল স্বীকার করা ও ক্ষমা চাওয়া, সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা এবং সর্বদা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা ইত্যাদি আদবগুলো আদর্শ ব্যক্তিত্ব গঠনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঙ. প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সাথে আদব : রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, خَيْرُ الجِيرَانِ عِنْدَ اللهِ خَيْرُهُمْ لِجَارِهِ ‘আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম প্রতিবেশী সে, যে তার প্রতিবেশীর নিকট উত্তম’।[1] এজন্য প্রতিবেশীর সাথে উত্তম আচরণ ও আদব বজায় রাখা যরূরী। প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখা, তাদের বিপদে সাহায্য করা এবং নিজের কোন আচরণে তাদের কষ্ট না দেওয়া, অসুস্থ হ’লে দেখতে যাওয়া, আত্মীয়স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, উপহার বিনিময় করা ইত্যাদি আদবগুলো শিশুরা পরিবারের কাছেই পেয়ে থাকে।
চ. হাঁটা-চলা ও রাস্তার আদব : একজন মানুষের হাঁটা-চলার মাধ্যেই তার ব্যক্তিত্বের অনেকাংশ ফুটে ওঠে। এজন্য রাস্তাঘাটে চলার সময় নিজের দৃষ্টিকে অবনত রাখা, রাস্তা থেকে যেকোন কষ্টদায়ক বস্ত্ত সরিয়ে ফেলা, কারো সাথে দেখা হ’লে সালাম ও কুশল বিনিময় করা, কেউ পথ হারিয়ে ফেললে বা ঠিকানা জানতে চাইলে তাকে সাহায্য করা, হাঁটার সময় অন্যমনষ্ক না হওয়া এবং সামনের দিকে দেখে পথ চলা ইত্যাদি আদবগুলো মেনে চলা।
ছ.ধৈর্য ও সহনশীলতা : জীবনযুদ্ধ ও দ্বীনের উপর অটল থাকার জন্য মুমিন জীবনে ধৈর্য ও সহনশীলতা খুবই প্রয়োজনীয় গুণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন’ (বাক্বারাহ ২/১৫৩)। লোকমান তার সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, اصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ، ‘বিপদে ধৈর্যধারণ কর। নিশ্চয়ই এটি দৃঢ় সংকল্পের কাজ’ (লোকমান ৩১/১৭)। শৈশবকাল থেকে শিশুদের মধ্যে ছবর ও সহনশীলতার অনুশীলন থাকলে ভবিষ্যৎ জীবনের পথ চলা তাদের জন্য সহজ হবে।
ইলম অর্জনের আদব : ইলমের আবরণ হ’ল তার আদব বা শিষ্টাচার। আদব বিহীন জ্ঞান কেবল মস্তিষ্কে জমা হয়; হৃদয়ে প্রবেশ করে না। এজন্য ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈনে এযাম তথা সালাফে ছলেহীন ইলম অর্জনের আগে আদব শেখাকে বেশী গুরুত্ব দিতেন। খলীফা ওমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, تَأَدَّبُوا ثُمَّ تَعَلَّمُوا، ‘আগে শিষ্টাচার শেখ, তারপর জ্ঞানার্জন কর’।[2] ইমাম গাযালী (রহ.) বলেনمِنْ آدَابِ الْمُتَعَلِّمِ...طَهَارَةُ النَّفْسِ عَنْ رَذَائِلِ الْأَخْلَاقِ وَمَذْمُومِ الْأَوْصَافِ وَالصِّفَاتِ الرَّدِيئَةِ مِثْلَ: الْغَضَبِ وَالشَّهْوَةِ وَالْحِقْدِ وَالْحَسَدِ وَالْكِبْرِ وَالْعُجْبِ وَأَخَوَاتِهَا، ‘শিক্ষার্থীর অন্যতম শিষ্টাচার হ’ল ...আতমাকে নীচু নৈতিকতা, নিনিদত বৈশিষ্ট্য এবং মনদ গুণাবলী থেকে পবিত্র রাখা। যেমন ক্রোধ, কুপ্রবৃত্তি, বিদ্বেষ, হিংসা, অহংকার, আতমমুগ্ধতা এবং এ জাতীয় অন্যান্য বদঅভ্যাস’।[3]
সন্তানকে প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর পূর্বেই ইলম অর্জনের মৌলিক আদবগুলো পরিবার থেকে শেখানো অত্যন্ত যরূরী। প্রথমেই সন্তানের মানসপটে এই বিশ্বাসটি স্থায়ীভাবে গেঁথে দিতে হবে যে, জ্ঞানার্জনের মূল উদ্দেশ্য হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এর পাশাপাশি শ্রেণীকক্ষের শিষ্টাচার যেমন শ্রেণীকক্ষে সালাম দিয়ে প্রবেশ করা, শিক্ষককে মনেপ্রাণে সম্মান ও মান্য করা এবং শিক্ষকের কথা পূর্ণ মনোযোগ সহকারে শোনা, সহপাঠীদের সাথে সুন্দর আচরণ করা ইত্যাদি শেখাতে হবে।
সম্বোধন শেখানো : সামাজিক যোগাযোগের প্রথম ধাপ হ’ল সঠিক সম্বোধন। শিশুরা কথা বলা শেখার পর থেকেই পর্যায়ক্রমে তাদেরকে পারিবারিক ও সামাজিক সম্বোধন শেখানো উচিত। যেমন : ভাই-বোন, দাদা-দাদী, নানা-নানী, চাচা-চাচী, খালা-খালু ইত্যাদি সম্বোধনগুলো। এছাড়াও পিতার বয়সী লোকজনকে চাচা, সমবয়সী বা এর একটু বড়দের ভাই, বৃদ্ধদের দাদু সম্বোধন করা। বয়স, সম্পর্ক বা অবস্থান ভেদে (যেমন : ‘আপনি’, ‘তুমি’) কথা বলতে শেখাটা তাদের বিনয়ী ও মার্জিত করে তোলে।
দৈনন্দিন দো‘আ ও যিকিরে অভ্যস্ত করা : শিশুদের ছোটবেলা থেকেই দৈনন্দিন গুরুত্বপূর্ণ দো‘আ ও যিকিরগুলো শিক্ষা দিলে সেটি তাদের মনে স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে। এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও তাওয়াক্কুল তৈরী হওয়ার পাশাপাশি শিশুরা বদ নযর, দুষ্ট জীন, জাদু-টোনা ও অন্যান্য বালা-মুছীবত থেকেও রক্ষা পায়।
আদব শেখানোর উপায় :
নিজে আদর্শবান হওয়া : শিশুদের আদব বা শিষ্টাচার শেখানোর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কার্যকরী উপায় হ’ল, পিতা-মাতার আচরণে সেই আদর্শগুলো ফুটিয়ে তোলা। এই পদ্ধতিই ছিল নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর শিক্ষাদানের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি ছিলেন ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ বা সর্বোত্তম আদর্শ। ছাহাবীগণ কেবল তাঁর কথা শুনেই ইসলাম শেখেননি বরং তাঁর প্রতিটি কাজ স্বচক্ষে দেখে শিখেছেন ও অনুকরণ করেছেন।
শিশুদের মধ্যে অনুকরণের প্রবণতা খুবই প্রবল। তারা শুনে যতটা শেখে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশী শেখে স্বচক্ষে দেখে। এজন্য আপনি যে আদবগুলো সন্তানকে শেখাতে চান, তা আগে আপনার নিজের জীবনে অনুশীলন করুন। যেমন শিশুকে বিনয়ী হ’তে বলার আগে, নিজেকেও বিনয়ী হ’তে হবে। অন্যের সাথে বিনয়ের সাথে নম্রভাবে কথা বলতে হবে। মনীষী জন সি. ম্যাক্সওয়েলের মতে, মানুষ ৮৯% শিক্ষা গ্রহণ করে দেখার মাধ্যমে, ১০% শেখে কানের দ্বারা এবং বাকী ০১% শিখে ইন্দ্রিয়ের দ্বারা। অনেক পিতা-মাতা আছেন, যারা সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে চান, ভালো উপদেশ প্রদান করেন, সন্তানকে ভালো মাদরাসায় পড়াশুনা করান কিন্তু নিজে জীবনে ইসলাম মেনে চলেন না। এসমস্ত মানুষ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ، ‘তোমরা কি লোকদের সৎকাজের আদেশ দাও এবং নিজেদের বেলায় তা ভুলে যাও? (বাক্বারাহ ২/৪৪)।
গল্প ও উপমা দিয়ে শেখানো : বাচ্চারা অত্যধিক গল্পপ্রিয় এবং গল্পের চিত্রগুলো নিজের চরিত্রে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। এজন্য গল্প ও উপমা শিশুদের আদব শেখানোর জন্য একটি কার্যকরী উপায়। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে মানবজাতিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অনেক কাহিনী ও উপমা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَقَدْ صَرَّفْنَا فِي هَذَا الْقُرْآنِ لِلنَّاسِ مِنْ كُلِّ مَثَلٍ، ‘আমরা এই কুরআনে সব ধরনের উপমা দিয়ে বারবার ব্যাখ্যা করেছি মানুষের জন্য’ (কাহফ ১৮/৫৪)। শিশুদের আদব শেখানোর জন্য নিজ পুত্রকে দেওয়া লোকমান হেকিমের উপদেশগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন। হিংসা ও ক্রোধের পরিণাম শেখাতে হাবীল ও কাবীলের কুরবানীর ঘটনাটি সংক্ষেপে বলুন। কিভাবে হিংসার বশবর্তী হয়ে কাবীল তার ভাই হাবীলকে হত্যা করেছিল এবং পরে অনুতপ্ত হয়েছিল। মিথ্যা ও অনুশোচনার পরিণাম শেখাতে ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা শুনান। কিভাবে তার ভাইয়েরা হিংসা করে তাঁকে কূপে ফেলে দিয়েছিল এবং বাবার কাছে এসে মিথ্যা বলেছিল। কিন্তু বহু বছর পর তারা কিভাবে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়েছিল। রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক শিশুদের আগে সালাম দেওয়া এবং তাদের সাথে স্নেহপূর্ণ আচরণের গল্পগুলো আদব শেখানোর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
গল্প বলার কার্যকরী কৌশল : গল্প বলার সবচেয়ে কার্যকরী কৌশল হ’ল সঠিক সময় নির্বাচন করা। যেমন : ঘুমাতে যাওয়ার আগে, খাওয়ার সময় বা যখন শিশু বিশেষভাবে মনোযোগী থাকে। গল্পটি শেষ হ’লে শিশুকে চিন্তা করতে উৎসাহিত করুন। তাকে এভাবে প্রশ্ন করুন : ‘বলো তো বাবা, এই গল্প থেকে আমরা কি শিখলাম?’ অথবা ‘তুমি যদি ঐ গল্পের চরিত্রের জায়গায় থাকতে, তবে তুমি কি করতে’? এভাবে বিভিন্ন আঙ্গিকে গল্প উপস্থাপন করলে সে গল্প থেকে শিক্ষাগ্রহণ এবং তা বাস্তব জীবনে বাস্তবায়নে আগ্রহী হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
স্নেহ ও ধৈর্যশীলতা বজায় রাখা : শিশুদের আদব শেখানোর ক্ষেত্রে স্নেহ এবং ধৈর্য গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। আপনি নিজে যখন অন্যদের সাথে বিশেষ করে আপনার সন্তানের সাথে স্নেহপূর্ণ, বিনয়ী ও মার্জিত ভাষায় কথা বলবেন, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই তা শিখবে। যখন আপনি নিজের কোন বিপদে বা রাগের মুহূর্তে ধৈর্য ধারণ করবেন, তখন শিশুরাও শিখবে যে, কঠিন পরিস্থিতিতেও শান্ত থাকতে হয়। সন্তানের মধ্যে যখন ভালো আদব প্রকাশ পাবে তখন তাকে জড়িয়ে ধরুন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিন বা একটি চুমু খান। আপনার স্নেহ ও সন্তুষ্টির প্রকাশই তার জন্য অনেক বড় পাওয়া।
শিশুরা প্রায়ই ভুলে যাবে, ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক। তাই হতাশ না হয়ে বা রেগে না গিয়ে ধৈর্য ধরে তাকে বারবার মনে করিয়ে দিন। যেমন খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে ধমক না দিয়ে শান্তভাবে বলুন, বাবা আমরা খাওয়া শুরুর আগে কিছু বলতে ভুলে গেলাম না তো? আর এটা সর্বদা মনে রাখবেন, শিশুদের আদব শেখানো কোন ১০০ মিটার দৌড় নয়, এটি একটি ম্যারাথন।
পুরস্কারের মাধ্যমে উৎসাহ প্রদান : শিশুদের আদব শেখানোর প্রক্রিয়াকে পুরষ্কারের মাধ্যমে আরও গতিশীল করা যায়। শিশুরা ভালো কাজ বা আচরণের জন্য তাৎক্ষণিক পুরস্কার ও মৌখিক স্বীকৃতি পেলে তখন তারা সেই ভালো কাজটি আবার করার জন্য প্রবল উৎসাহ বোধ করে, যা তাদের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এজন্য শিশুদের মধ্যে কোন ভালো আদব প্রকাশ পেলে সাথে সাথে আন্তরিকভাবে তার প্রশংসা করুন। যেমন মাশাআল্লাহ, তুমি যে খাবারটা তোমার ছোট বোনকে ভাগ করে দিলে, এটা দেখে আমার যে কি ভালো লেগেছে! এর পাশাপাশি মাঝেমধ্যে খেলনা, গল্পের বই বা চকলেট ইত্যাদি বস্ত্তগত পুরষ্কারও দেওয়া যেতে পারে। সবশেষে এই সদাচরণের সর্বোচ্চ ও আসল প্রতিদান সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ)-এর এই হাদীছটি স্মরণ করিয়ে দিন, أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ ...... فِي أَعْلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ
حَسَّنَ خُلُقَهُ،‘যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সুন্দর করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের যিম্মাদার’।[4]
ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে শেখানো : ইসলামী শরী‘আতের বিধানগুলো একদিনেই নাযিল হয়নি। বরং তা পর্যায়ক্রমে নাযিল হয়েছে। নবী করীম (ছাঃ)-এর শেখানোর পদ্ধতিও ছিল অনুরূপ। তাঁর পালক পুত্র ওমর বিন আবী সালামাহ (রাঃ) বলেন, আমি শৈশবকালে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে খাবার গ্রহকেরার সময় আমার হাত পাত্রের যেখানে-সেখানে পড়লে তিনি আমাকে বললেন,يَا غُلاَمُ سَمِّ اللهَ وَكُلْ بِيَمِيْنِكَ وَكُلْ مِمَّا يَلِيْكَ، ‘হে বৎস! বিসমিল্লাহ বল, তোমার ডান হাত দিয়ে খাও এবং নিজের পার্শ্ব থেকে খাও’।[5] হাদীছটিতে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রাসূল (ছাঃ) তাকে কঠোরভাবে বকা দেননি বা খাওয়ার সমস্ত আদব যেমন : শব্দ না করা, খাবারে ফুঁ না দেওয়া, হেলান দিয়ে না খাওয়া ইত্যাদির দীর্ঘ তালিকা দেননি। তিনি ইবনু আবূ সালামা (রাঃ)-এর বয়সের দিক খেয়াল করে প্রয়োজনীয় তিনটি মৌলিক নির্দেশ দিলেন। এভাবে বয়স উপযোগী এবং ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় শিশুর মধ্যে স্থায়ী ও সুন্দর চরিত্র গড়ে ওঠে।
পারিবারিক শিক্ষার প্রভাব : পরিবার থেকে পাওয়া আদব শিক্ষার প্রভাব কেবল বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কারণ এই প্রাথমিক শিক্ষাই নির্ধারণ করে দেয় একজন ব্যক্তি তার জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে কেমন ভূমিকা রাখবে। যে শিশু পরিবার থেকে শিক্ষককে সম্মান করতে, সহপাঠীর সাথে বিনয়ী হ’তে এবং জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হ’তে শিখেছে, সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন আদর্শ শিক্ষার্থী হিসাবে পরিগণিত হয়। পরবর্তীতে সমাজে প্রবেশ করে সে সুনাগরিক, দায়িত্বশীল প্রতিবেশী এবং বিশ্বস্ত বন্ধুতে পরিণত হয়। তার সততা, দয়া ও আমানতদারিতা সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রের মূল একক হিসাবে পরিবার থেকে শেখা শৃঙ্খলা, আইন মান্য করার মানসিকতা এবং নিষ্ঠা তাকে একজন দুর্নীতিমুক্ত, দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল নাগরিকে পরিণত করে, যা একটি ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্র বিনির্মাণে সরাসরি ভূমিকা রাখে। সর্বোপরি পারিবারিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় এবং চূড়ান্ত প্রভাবটি পড়ে পরকালীন জীবনে। ইসলামে এই উত্তম চরিত্রই (হুসনুল খুলুক) ইবাদত হিসাবে গণ্য হয়। যা পিতা-মাতার জন্য ছাদাক্বায়ে জারিয়া এবং সন্তানের নিজের জন্য জান্নাতে গৃহ লাভের মাধ্যম হয়। তাই পারিবারিক আদব শিক্ষা একজন মানুষকে ইহকালীন সম্মান ও পরকালীন সফলতার বন্দরে পৌঁছে দেয়।
উপসংহার : আধুনিক বস্ত্তবাদী সমাজে মানুষের মধ্যে আদব -আখলাকের যে চরম দুর্ভিক্ষ চলছে তা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের পারিবারিকভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। তাই আমাদের আগামী প্রজন্মকে আদবের আলোয় সুসজ্জিত করার জন্য আমাদের যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আমরা যে আদব ও আখলাক আমাদের সন্তানের মাঝে রোপণ করছি, কাল সেটিই মহীরুহ হয়ে ইহকালে আমাদের জন্য সম্মান এবং পরকালে ছাদাক্বায়ে জারিয়া হিসাবে ছায়া দান করবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!
[1]. তিরমিযী, দারেমী, মিশকাত হা/৪৯৮৭; ছহীহ তারগীব হা/২৫৬৮।
[2]. আব্দুল ক্বাদের জীলানী (মৃ.৫৬১হি.), আল-গুনয়াহ বৈরূত : দারুল কুতুববিল-ইলমিইয়াহ, ১ম মুদ্রণ, ১৪১৭হি./১৯৯৭হি.), ১/১১৬।
[3]. আবূ হামেদ আল-গাযালী, ইহয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/৪৮।
[4]. আবূদাঊদ হা/৪৮০০, ছহীহাহ হা/২৭৩।
[5]. বুখারী হা/৫৩৭৬; মুসলিম হা/৫৩৮৮৮।