ভূমিকা : ভাই-বোন হ’ল একে অপরের রক্তের বঁাধন এবং বিপদের পরম বন্ধু। শৈশবের চঞ্চলতা থেকে ভাই-বোনে খুনসুটি ও সাময়িক ঝগড়া হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় কিংবা অভিভাবকদের অসচেতনতায় এই সাময়িক অভিমান যখন স্থায়ী হিংসা-বিদ্বেষে রূপ নেয়, তখন তা কেবল পারিবারিক শান্তিই বিনষ্ট করে না; বরং সন্তানের কচি হৃদয়ে তৈরি করে এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত।
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হাবীল-কাবীলের ঘটনা ও ইউসুফ (আঃ)-এর ঘটনায় আমরা দেখতে পাই যে, ভাইয়ের মধ্যকার হিংসা কতটা ভয়ঙ্কর হ’তে পারে, যা আপন ভাইকে কূপে নিক্ষেপ করতেও দ্বিধা করে না। পরিতাপের বিষয় হ’ল, অনেক সময় পিতা-মাতার অজান্তেই তাদের কথায় বা আচরণে সন্তানদের মাঝে এই হিংসার বিষবাষ্প দানা বঁাধে। অথচ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সন্তানদের মাঝে ইনছাফ করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। আজকের নিবন্ধে আমরা আলোচনা করবো কেন ভাই-বোন একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে কিভাবে এই হিংসা দূর করে তাদের মধ্যে ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় করা যায়।
হিংসা বা রেষারেষির মূল কারণসমূহ
শয়তানের কুমন্ত্রণা : শয়তানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হ’ল রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের মাঝে ফাটল ধরানো। পবিত্র কুরআনে ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইদের হিংসার নেপথ্যে শয়তানের প্ররোচনার কথা স্মরণ করে দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَى إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُبِينٌ، ‘হে বৎস! তোমার ভাইদের কাছে এ স্বপ্ন বর্ণনা করো না। তাহ’লে ওরা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু’ (ইউসুফ ১২/৫)। শয়তান যেহেতু মানুষের চিরশত্রু সেহেতু সে মানুষকে ভ্রষ্ট ও হিংসা-বিদ্বেষে নিমজ্জিত করার সর্বদা সুযোগ খেঁাজে।
পিতা-মাতার অসম ভালোবাসা ও প্রকাশভঙ্গি : সন্তানদের মধ্যে কাউকে বেশী ভালোবাসা স্বাভাবিক হ’তে পারে। কিন্তু তা প্রকাশ্যে বা আচরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া মারাত্মক ভুল। এই আচরণ অন্যান্য সন্তানদের মনে হিংসার আগুন জ্বালিয়ে তোলে। কোন সন্তান যদি অনুভব করে যে, বাবা-মা তাকে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন, তবে সে তার ভাই বা বোনকে নিজের প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করে।
অন্যের সাথে তুলনা করা : ভাই-বোনদের মধ্যে রেষারেষি সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ হ’ল অসম তুলনা। বাবা-মা যখন এক সন্তানের সাফল্যের উদাহরণ টেনে অন্যজনকে ছোট করেন, যেমন ‘তোমার ভাই অংকে ১০০ পেল, আর তুমি পেলে ৬০’? কিংবা ‘তোমার বোন কত গুছিয়ে কাজ করে, আর তুমি এত অগোছালো কেন’? এজাতীয় কথাবার্তা শিশুর মনে হিংসার বিষ ঢুকিয়ে দেয়। তখন শিশুর মনে ভাই-বোনের প্রতি হিংসা ও ক্ষোভ জন্ম নেয়। সে ভাবতে শুরু করে, ওর কারণেই আমি বকা খাচ্ছি বা অবহেলিত হচ্ছি। ফলে সে হীনমন্যতায় ভোগে এবং ভাই-বোনকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু মনে করতে থাকে।
ইনছাফ না করা : ভাই-বোনদের সম্পর্কের ফাটলের আরেকটি মূল কারণ হ’ল বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে ইনছাফের অভাব। অনেক সময় অভিভাবকরা অজান্তেই খাবার, পোষাক-পরিচ্ছদ, হাতখরচ কিংবা আদরের ক্ষেত্রে সন্তানদের মাঝে তারতম্য করে ফেলেন। এর ফলে বঞ্চিত সন্তানের মনে ধারণা জন্মে যে, বাবা-মা তাকে ভালোবাসেন না বা সে পরিবারের কাছে গুরুত্বহীন। এই বঞ্চনাবোধ থেকেই ভাই-বোনের প্রতি হিংসা সৃষ্টি হয়।
একপক্ষীয় বিচার : ভাই-বোনের ঝগড়ায় অধিকাংশ অভিভাবক ঘটনার গভীরে না গিয়ে বয়সের দোহাই দিয়ে বড় সন্তানকেই একতরফা দোষারোপ করেন। ‘তুমি বড়, তুমি কেন ছোটর সাথে ঝগড়ায় জড়ালে’? কিংবা ‘তুমি কেন ছাড় দিলে না’? এমন ভৎর্সনার বিপরীতে ছোট সন্তান অন্যায় করলেও অনেক সময় তাকে অবুঝ ভেবে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া হয়। পিতা-মাতার এরূপ পক্ষপাতিত্বমূলক বিচার বড় সন্তানের মনে তীব্র বঞ্চনাবোধ সৃষ্টি করে, যা পরিণামে ভাই-বোনের মাঝে স্থায়ী ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম দেয়।
হিংসা নিরসনে সুন্নাহসম্মত প্রতিকার
ভাই-বোনদের মধ্যকার এই হিংসা ও রেষারেষি দূর করে একটি জান্নাতী পরিবেশ তৈরি করতে পিতা-মাতার দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার বিকল্প নেই। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে অভিভাবকদের করণীয়গুলো নিম্নে তুলে ধরা হ’ল।
অভিভাবকদের জন্য সতর্কতা : সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনে সমতা রক্ষা করা পিতা-মাতার উপর ফরয। পোষাক, খাবার বা খেলনা দেওয়ার ক্ষেত্রে সমতা যরূরী। অন্যথা অবচেতনভাবেই শিশুর মনে বঞ্চনা ও হিংসার জন্ম নেয়। নু‘মান বিন বাশীর (রাঃ) মিম্বরে দঁাড়িয়ে থাকা অবস্থায় বর্ণনা করেন যে, একদা তার পিতা তাকে একটি বিশেষ উপহার দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিষয়টি জানতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি তোমার অন্যান্য সন্তানকেও এর অনুরূপ উপহার দিয়েছ’? তিনি বললেন, না। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজ সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা করো’। অতঃপর তিনি (তার পিতা) ফিরে গেলেন এবং তার দেওয়া উপহারটি ফিরিয়ে নিলেন।[1]
একইভাবে শারীরিক আদর-স্নেহের ক্ষেত্রেও সমতা বিধানের নির্দেশ এসেছে। একদিন রাসূল (ছাঃ)-এর পাশে একজন ছাহাবী বসে ছিলেন। তার পুত্র সন্তানটি আগমন করলে সে চুমু দিয়ে নিজের কোলে বসাল। একটু পরে তার কন্যা সন্তান আসলে তাকে পাশে বসিয়ে দিল। এটি দেখে রাসূল (ছাঃ)
বললেন, তুমি উভয়ের মাঝে ইনছাফ করলে না কেন?[2]
পারস্পরিক ভাগাভাগি বা সহমর্মিতা শেখানো : সবকিছু একা ভোগ করার আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতা থেকে মূলত স্বার্থপরতা ও হিংসার জন্ম হয়। তাই শৈশব থেকেই নিজেদের খাবার বা খেলনা একে অপরের সাথে হাসিমুখে ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। নবী করীম (ছাঃ) বলেন,كُلُوا جَمِيعًا، وَلَا تَفَرَّقُوا، فَإِنَّ الْبَرَكَةَ مَعَ الْجَمَاعَةِ، ‘তোমরা এক সাথে খাও এবং পৃথক পৃথক খেয়ো না। কারণ জামা‘আতের সাথে (খাবারে) বরকত আছে’।[3] তিনি আরো বলেন,طَعَامُ الْوَاحِدِ يَكْفِى الاِثْنَيْنِ وَطَعَامُ الاِثْنَيْنِ يَكْفِى الأَرْبَعَةَ وَطَعَامُ الأَرْبَعَةِ يَكْفِى الثَّمَانِيَةَ، ‘একজনের খাবার ২ জনের জন্য, ২ জনের খাবার ৪ জনের জন্য এবং ৪ জনের খাবার ৮ জনের জন্য যথেষ্ট’।[4] এই নববী নীতির আলোকে পরিবারের ছোট-বড় সবাইকে একত্রে মিলেমিশে খাওয়ার এবং যেকোন বস্ত্তর সুষম ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে তাদের মাঝে স্বার্থপরতার বদলে ত্যাগ ও ভালোবাসার গুণ বিকশিত হবে।
ছোট-বড়র পারস্পরিক হক ও আদব শিক্ষা দেওয়া : পারিবারিক পরিবেশে শৈশব থেকেই পারস্পরিক সম্মান ও স্নেহের চর্চা থাকা অতীব যরূরী রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيْرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيْرَنَا ‘যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের মর্যাদা বুঝে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’।[5] পরিবারে এই হাদীছের বাস্তব আমল চালু করতে হবে। যেমন বড় ভাই বা বোন ঘরে প্রবেশ করলে ছোটদের উচিত আগে সালাম দেওয়া এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। অপরদিকে বড়দের দায়িত্ব হ’ল- ছোটদের ভুল-ত্রুটিগুলোকে স্নেহের সাথে শুধরে দেওয়া এবং তাদের প্রতি সদয় আচরণ করা। এতে ভাই-বোনদের মাঝে অহংবোধ ও হিংসার পরিবর্তে গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়।
টিমওয়ার্ক বা মিলেমিশে কাজের অভ্যাস গড়ে তোলা : ভাই-বোনদের একে অপরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে একই দলের সদস্য হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। অনেক সময় অহেতুক প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিলে তাদের মাঝে রেষারেষি বাড়ে। এর পরিবর্তে তাদের দলগত কাজে অভ্যস্ত করা যরূরী। যেমন সন্তানদের বলা যেতে পারে, তোমরা তিনজন মিলে আজ তোমাদের পড়ার ঘরটি গুছিয়ে ফেলো কিংবা তোমরা ভাই-বোনেরা সবাই মিলে আজ মাকে খাবার পরিবেশনে সাহায্য করো। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ الْمُؤْمِنَ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ، يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا.. ‘এক মুমিন অপর মুমিনের জন্যে প্রাসাদ সদৃশ। যার একাংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে থাকে’।[6] সুতরাং যখন ভাই-বোনেরা একসঙ্গে কোন ভালো কাজ বা পারিবারিক দায়িত্ব সম্পন্ন করে এবং পিতা-মাতার নিকট যৌথভাবে প্রশংসিত হয়, তখন তাদের মাঝে ইমারতের মতোই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও শক্তিশালী আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়।
ডিজিটাল আসক্তি নিয়ন্ত্রণ : অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম শিশুদের চরম আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে এবং মেজায খিটখিটে করে দেয়। ফলে তাদের পারস্পরিক সহমর্মিতা হ্রাস পায়। তাই অভিভাবকদের অবশ্য কর্তব্য হ’ল সন্তানদের এই ভার্চুয়াল জগত থেকে বের করে এনে একসঙ্গে ইসলামী বই পড়া, নবীদের গল্প শোনা বা দলবদ্ধ খেলাধুলায় অভ্যস্ত করা। এতে তাদের মাঝে একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে এবং ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় হবে।
হিংসার বদলে উত্তম আচরণের শিক্ষা দেওয়া : পিতা-মাতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হ’ল একজনের রাগের জবাবে অপরজনকে প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে বরং ক্ষমা ও উত্তম আচরণের শিক্ষা দেওয়া। কারণ হিংসার আগুনে ঘি ঢাললে তা আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ক্ষমা ও ভালোবাসার পরশ নিমিষেই তা নিভিয়ে দেয়। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ، ‘ভালো ও মনদ সমান নয়। তুমি ভালো দিয়ে মন্দকে প্রতিরোধ কর। তাহ’লে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত হয়ে যাবে’ (হামীম সাজদাহ ৪১/৩৪)।
নবী-রাসূলগণের জীবনী থেকে শিক্ষাদান : পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর আপন আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের নিকট চরম হিংসা ও বিদ্বেষের শিকার হয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন ক্ষমার মূর্ত প্রতীক। পৃথিবীর প্রথম হত্যাকান্ডের নেপথ্যেও ছিল এই হিংসা। আপন ভাই কাবীলের তীব্র হিংসা ও আক্রোশের বিপরীতে হাবীল নিজেকে সম্পূর্ণ সংযত রেখেছিলেন এবং পাল্টা আঘাত করা থেকে বিরত ছিলেন। একইভাবে নবী ইউসুফ (আঃ)-কে তঁার বৈমাত্রেয় ভাইয়েরা হিংসার বশবর্তী হয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে কূপে নিক্ষেপ করেছিল। অথচ দীর্ঘকাল পর মিসরের রাজক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে পূর্ণ সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রতিশোধ নেননি; বরং ভাইদের নিঃশর্ত ক্ষমা করে দিয়ে বলেছিলেন, لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু’। (ইউসুফ ১২/৯২)। তাই পিতা-মাতা হিসাবে আমাদের প্রধান কর্তব্য হ’ল সন্তানদের অন্তরে নবী-রাসূলগণের এই সুমহান আদর্শ ও ক্ষমার মহিমা গেঁথে দেওয়া। যাতে তারা ভাই-বোনদের মধ্যকার সাময়িক হিংসা বা মনোমালিন্যের বিপরীতে প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা ও সংযমের পথ অঁাকড়ে ধরে।
সন্তানদের জন্য দো‘আ করা : সন্তানদের মধ্যকার হিংসা-বিদ্বেষ দূর করতে পিতা-মাতার যাবতীয় পার্থিব চেষ্টার পাশাপাশি মহান আল্লাহর দরবারে সার্বক্ষণিক দো‘আ করা অপরিহার্য। নবী-রাসূলগণ সর্বদা তাঁদের অনাগত ও বর্তমান সন্তানদের হেদায়াত এবং কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দো‘আ করতেন। ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন’ (ছাফফাত ৩৭/১০০)।
এছাড়া নিজের ও সন্তানদের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার জন্য নিম্নোক্ত দো‘আটি নিজে পাঠ করার পাশাপাশি সন্তানদেরও পাঠ করার নির্দেশ দিতে হবে।رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ، ‘রাববানাগ্ফির লানা ওয়া লিইখ্ওয়া -নিনাললাযীনা সাবাক্বুনা বিল ঈমা-নি ওয়ালা তাজ‘আল ফী ক্বুলূবিনা গিল্লাল লিল্লাযীনা আ-মানূ রাববানা ইন্নাকা রাঊফুর রাহীম’।
অর্থ : ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে ও আমাদের পূর্ববর্তী ভাইয়েরা যারা ঈমান এনেছে তাদের ক্ষমা কর, ঈমানদারদের বিরূদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না। হে প্রভু! নিশ্চয়ই তুমি দয়ালু পরম করুণাময়’ (হাশর ৫৯/১০)। তাছাড়া অন্যের হিংসা থেকে রক্ষা পেতে সূরা ফালাক্ব বেশী বেশী পাঠ করতে হবে। কেননা এই সূরায় মহান আল্লাহ তা‘আলা হিংসুকের হিংসা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার দো‘আ শিক্ষা দিয়েছেন।
হেদায়াতের তা‘লীম ও আত্মশুদ্ধি : শয়তানের কুমন্ত্রণা ও নফসের ধেঁাকা থেকে বঁাচতে শিশুদেরকে শৈশব থেকেই কুরআন ও ছহীহ হাদীছের নিম্নোক্ত শিক্ষাগুলো হৃদয়ে গেঁথে দিতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর শয়তান যখনই তোমাকে কুমন্ত্রণা দেয়, তখনই তুমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শোনেন ও জানেন’ (হামীম সাজদাহ ৪১/৩৬)।
আনাস বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘তোমরা পরস্পরে বিদ্বেষ করো না, হিংসা করো না, একে অপরকে পরিত্যাগ করো না, একে অপরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করো না। তোমরা পরস্পরে আল্লাহর বান্দা হিসাবে ভাই ভাই হয়ে যাও’।[7]
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা সমূহ খোলা হয়। অন্য বর্ণনায় এসেছে, এ দু’দিন বান্দার আমলনামা আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। অতঃপর আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেনি এমন সবাইকে মাফ করা হয়। কেবল ঐ দু’জন ব্যতীত যাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ বিদ্যমান রয়েছে। বলা হয়, এদের ছাড়, যতক্ষণ না এরা আপোষে মীমাংসা করে নেয়’।[8]
যামরাহ বিন ছা‘লাবাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘মানুষ অতক্ষণ কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতক্ষণ তারা পরস্পরে হিংসা না করবে’।[9]
আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যঁার হাতে আমার জীবন তঁার কসম করে বলছি, তোমাদের কেউ মুমিন হ’তে পারবে না, যতক্ষণ না সে তঁার ভাইয়ের জন্য ঐ বস্ত্ত ভালবাসবে, যা সে নিজের জন্য ভালবাসে’।[10]
আবুল লাইছ সামারকান্দী (মৃঃ ৩৭৩ হিঃ) বলেন, হিংসাত্মক ব্যক্তির আগেই হিংসুকের নিকট পঁাচটি শাস্তি পেঁŠছে যায়। (ক) দুশ্চিন্তা, যা বিচিছন্ন হয় না। (খ) কষ্ট, যার কোন পুরস্কার পাওয়া যায় না। (গ) তিরষ্কার, যাকে প্রশংসা করা হয় না (ঘ) আল্লাহর ক্রোধ অর্জন করা এবং (ঙ) তার জন্য (কল্যাণকর্মের) তাওফীকের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া।[11]
উপসংহার : পিতা-মাতা হ’লেন মূলত একজন সুদক্ষ মালীর মতো। মালী যেমন পরম যত্নে চারাগাছের চারপাশের ক্ষতিকর আগাছা পরিষ্কার করেন, পিতা-মাতাকেও তেমনি সন্তানদের মন থেকে হিংসার আগাছা দূর করে ভালোবাসার বীজ প্রথিত করতে হবে। এই সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে পারলেই সন্তানেরা হবে আখেরাতে আমাদের নাজাতের অসীলা ও ছাদাক্বায়ে জারিয়া। মহান আল্লাহ আমাদের পরিবারগুলোকে জান্নাতের টুকরো বানিয়ে দিন। ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানদের মাধ্যমে চক্ষু শীতলকারী বংশধারা দান কর এবং আমাদেরকে আল্লাহভীরুদের নেতা বানাও’ (ফুরক্বান ২৫/৭৪)।- আমীন।
[1]. বুখারী হা/২৫৮৭; মুসলিম হা/১৬২৩।
[2]. বায়হাক্বী শু‘আবুল ঈমান হা/৮৭০; ছহীহাহ হা/২৮৮৩, ২৯৯৪, ৩০৯৮।
[3]. ইবনু মাজাহ হা/৩২৮৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৪৫০০।
[4]. মুসলিম হা/৫৪৮৯; তিরমিযী হা/১৮২০; ইবনু মাজাহ হা/৩২৫৪।
[5]. আবুদাঊদ হা/৪৯৩৯, তিরমিযী হা/১৯২০, ছহীহাহ হা/২১৯৬।
[6]. বুখারী হা/৪৮১, ৬০২৬; মুসলিম হা/২৫৮৫; মিশকাত হা/৪৯৫৫।
[7]. মুসলিম হা/২৫৫৯; মিশকাত হা/৫০২৮।
[8]. মুসলিম হা/২৫৬৫; মিশকাত হা/৫০২৯-৩০।
[9]. ত্বাবারাণী হা/৮১৫৭; ছহীহাহ হা/৩৩৮৬।
[10]. বুখারী হা/১৩; মুসলিম হা/৪৫; মিশকাত হা/৪৯৬১।
[11]. শিহাবুদ্দীন আবশীহী, আল-মুসতাত্বরাফ ২২১ পৃ.। গৃহীত: মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, হিংসা ও অহংকার, পৃ.১১।