পরিবারে অগ্রাধিকার ব্যবস্থাপনা

আধুনিক যুগে পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা ও বিশৃঙখলা আমাদের সামাজিক জীবনে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক পরিবারেই আজকাল দেখা যায় ভূমিকার অস্পষ্টতা, দায়িতেবর সংঘাত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভ্রান্তি। এই সমস্যার মূল কারণ হ’ল একটি স্পষ্ট ও কার্যকর অগ্রাধিকার ব্যবস্থার অনুপস্থিতি।

ইসলামী শরী‘আতে পারিবারিক জীবনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে, যা শুধু ধর্মীয় নির্দেশনাই নয়, বরং একটি কার্যকর সামাজিক ব্যবস্থাও বটে। ইসলাম প্রতিটি সম্পর্ককে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোতে সাজিয়েছে, যাতে করে প্রত্যেকে জানে তার কর্তব্য, দায়িতব ও কাকে আগে মান্য করতে হবে। আজকের আলোচনায় আমরা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে পারিবারিক অগ্রাধিকার ব্যবস্থার গুরুতব, কার্যকারিতা এবং বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআললাহ।

পারিবারিক অগ্রাধিকার ব্যবস্থার স্তরবিন্যাস : আমরা প্রথমেই স্বামীর প্রাথমিক দায়িতব নিয়ে আলোচনা করব। তা হ’ল স্বামী তার পিতা-মাতার প্রতি আনুগত্যশীল হবে। কেননা ইসলামে সন্তানের কাছে পিতা-মাতার মর্যাদা সর্বোচ্চ। আললাহ বলেন, ‘তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করবে’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/২৩)। এছাড়াও রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘জানণাত মায়ের দুই পায়ের নিচে’ (নাসাঈ হা/৩১০৪; ইরওয়া হা/১১৯৯, সনদ হাসান)। ছেলে হিসাবে একজন পুরুষের দায়িতব হ’ল, তার পিতা-মাতার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও সেবা নিশ্চিত করা। তবে এর মানে এই নয় যে, স্ত্রীকে অবহেলা করা যাবে। বরং ভারসাম্য বজায় রেখে, ন্যায় ও ইনসাফের দায়িতব পালন করতে হবে।

এর বাস্তব প্রয়োগ এমন হ’তে পারে যে, জাহিদ ছাহেব একজন ব্যস্ত চাকুরিজীবী। তার স্ত্রী গৃহিণী ও তাঁর পিতা-মাতা অসুস্থ বয়োবৃদ্ধ। তিনি তার বাবা-মায়ের স্বাস্থ্যসেবার জন্য নিয়মিত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। তাদের পসনেদর খাবার তৈরি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পারিবারিক সিদ্ধান্তে পিতা-মাতার মতামত প্রাধান্য দেন। তাদের দৈনিক খোঁজ খবর নেন এবং মানসিক প্রশান্তির জন্য সময় দেন। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে আগে তাদের ঔষধ খাওয়ান ও দেখভাল করেন, এরপর স্ত্রীকে সময় দেন। এতে কোন পক্ষই উপেক্ষিত হয় না।

অপরদিকে স্ত্রীর দায়িত্ব হ’ল স্বামীর আনুগত্য করা। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘পুরুষেরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক’ (নিসা ৪/৩৪)। এর মানে এই নয় যে নারীরা হীন বা অধস্তন, বরং এটি একটি পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ব্যবস্থা। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যদি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সিজদা করার অনুমতি দিতাম, তবে নারীদের তাদের স্বামীদের সিজদা করতে বলতাম’ (তিরমিযী হা/২১৪০; ছহীহাহ হা/১২০৩)। স্ত্রীর মূল দায়িতব তার স্বামীর প্রতি আনুগত্য, শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং তার পরিবারের দেখভাল করা। এতে সংসারে শান্তি বজায় থাকে।

এর বাস্তব প্রয়োগ এমন হ’তে পারে যে, নুছরাত বেগম তার স্বামীর কর্মজীবনের চাপ বুঝে ঘরের পরিবেশ সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও শান্তিপূর্ণ রাখেন। স্বামীর সিদ্ধান্তে সহযোগিতা করেন এবং পরামর্শ দেন। সন্তানদের দেখাশোনা ও সঠিক তারবিয়াত দিয়ে গড়ে তুলতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। পারিবারিক বাজেট ও পরিকল্পনায় স্বামীর সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। স্বামীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার যতণ নেন ও পাশে থাকেন।

দায়িত্বের ধারাবাহিকতায় সন্তানদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। তাদের দায়িতব হ’ল, পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, কথায়-কর্মে বিনয়ী থাকা এবং তাদের উপদেশ মেনে চলা। এটার বাস্তবিক প্রয়োগ এমন হ’তে পারে যে, মুছ‘আব তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। সে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং তাদের সম্মান করে। পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার নির্বাচনে পিতা-মাতার পরামর্শ সবার আগে অগ্রাধিকার দেয়। ঘরের কাজে সাহায্য করে এবং পারিবারিক দায়দায়িতেব অংশগ্রহণ করে। সবচেয়ে বেশি সে তাঁর পিতা-মাতাকে বিশবাস করে ও তাদের সাথে গুরুতবপূর্ণ সব কথা শেয়ার করে। পিতা-মাতার অসুস্থতায় তাদের সেবা করে এবং নিয়মিত তাদের জন্যে দো‘আ করে।

সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার : সংসারে শান্তি চাইলে আললাহ ও রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশনার সর্বোচ্চ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সকল পারিবারিক সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম পরিচালিত হবে ইসলামী মূল্যবোধ ও শরী‘আতের আলোকে। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর’ (তাহরীম ৬৬/৬)। পরিবারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে, আচরণে, পরিকল্পনায় ইসলামিক মূল্যবোধ তথা আললাহর আদেশ ও রাসূল (ছাঃ)-এর আদর্শ অনুসরণ করাই হবে সফলতার একমাত্র চাবিকাঠি।

এর বাস্তব প্রয়োগ এমন হ’তে পারে যে, জাহিদ ছাহেব ও নুছরাত বেগম পারিবারিক যেকোন পরিকল্পনা কিংবা বিরোধের ক্ষেত্রে সবার আগে কুরআন ও হাদীছের আলোকে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন। সন্তানদের নৈতিক ও দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। পারিবারিক আয়-ব্যয়ে হালাল-হারাম কঠিনভাবে বিবেচনা করেন। ছালাত, ছিয়াম, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতের জন্য পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করেছেন। অর্থাৎ তাদের জীবনে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পায় আল্লাহর আদেশ এবং রাসূল (ছাঃ)-এর আদর্শ অনুসরণ।

এই অগ্রাধিকার ব্যবস্থার উপকারিতা : এই ব্যবস্থায় দায়িতব বিভাজনে স্পষ্টতা পাওয়া যায়। প্রতিটি সদস্য তার নিজস্ব দায়িতব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকে। এতে করে পারিবারিক বিশৃঙখলা কমে যায় এবং সবাই নিজ নিজ ভূমিকায় মনোনিবেশ করতে পারে। যেমন জনাব জাহিদ ছাহেব সকালে অফিসে যাওয়ার আগে তার পিতা-মাতার ওষুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন। তার স্ত্রী নুছরাত বেগম সারাদিনের খাবারের ব্যবস্থা করেন। সন্ধ্যায় ছেলে মুছ‘আব দাদা-দাদীর সাথে সময় কাটায়। এই স্পষ্ট দায়িতব বিভাজনের ফলে বৃদ্ধা পিতা-মাতা সর্বদা যতণ পান এবং কেউ কারো উপর অভিযোগ করেন না।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হয়। এমন একটি স্পষ্ট কমান্ড চেইন থাকলে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়। এতে বিলম্ব ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব কমে যায়। যেমন জাহিদ ছাহেবের কুরবানীর পশু ক্রয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রথমে তিনি তার পিতা-মাতার সাথে আলোচনা করেন, তারপর স্ত্রীর পরামর্শ নেন এবং অবশেষে ছেলে-মেয়ের মতামত জানেন। এই ক্রমানুসারে আলোচনার ফলে সবার মতামত বিবেচিত হয় এবং একটি সুষ্ঠু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মান বৃদ্ধি পায়। প্রত্যেকে যখন নিজের অবস্থান ও দায়িতব বুঝে কাজ করে, তখন পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। যেমন নুছরাত বেগম তার স্বামীর সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন এবং সহযোগিতা করেন। তার স্বামী জাহিদ ছাহেব স্ত্রীর মতামতকে গুরুতব দেন এবং তার ব্যক্তিতবকে সম্মান করেন। তাদের সন্তান যেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে পিতা-মাতার পরামর্শ নেয়। এই পারস্পরিক সম্মানের ফলে তাদের দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবন সুখী ও শান্তিপূর্ণ।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য ও রহমতপ্রাপ্ত হওয়া যায়। পরিবারে সবাই যদি তাদের দৈননিদন যেকোন কাজে আললাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর সুনণাহর অনুসরণ করে তাহ’লে তারা হবে সুখী পরিবার ও আললাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে রহমত ও বরকত প্রাপ্ত। আর এটিই হবে পরিবারের সর্বোচ্চ সফলতা। 

সাধারণ ভুল ধারণা ও তার সমাধান : মনে হ’তে পারে, ‘এই ব্যবস্থা নারীদের অধিকার হরণ করে’। তা মোটেও ঠিক নয়। ইসলামী পারিবারিক ব্যবস্থা নারী-পুরুষের মধ্যকার মর্যাদা স্বীকার করে, তবে ভূমিকার পার্থক্য রাখে। স্ত্রী স্বামীর আনুগত্য করলেও তার দ্বীন চর্চা, নিজস্ব মতামত, সম্পত্তির অধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণে গুরুত্ব দিয়েছে। আলহামদুলিললাহ।

মনে করুন, নুছরাত বেগম একজন দ্বীনদার গৃহিণী। তার সন্তান তাকে খুব ভালবাসে এবং সেবা ও সম্মান করে। তার স্বামী জাহিদ ছাহেব বাড়ির কাজে তাকে সহযোগিতা করেন এবং তাকে নিয়ে গর্ববোধ করেন। পারিবারিক গুরুতবপূর্ণ সিদ্ধান্তে নুছরাত বেগম স্বামীর মতামতকেই প্রাধান্য দেন আললাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্যে।

আবার কখনো মনে হ’তে পারে, এই ব্যবস্থায় সন্তানরা অন্ধভাবে পিতা-মাতার আনুগত্য করবে। এটাও সম্পূর্ণ ঠিক নয়। ইসলামে পিতা-মাতার আনুগত্য আললাহর আনুগত্যের অধীন। যদি পিতা-মাতা অন্যায় বা হারাম কাজের আদেশ দেন, তাহলে সেক্ষেত্রে সন্তান নম্রভাবে সেটা থেকে বিরত থাকবে। মনে করুন, জাহিদ ছাহেবের পিতা (অজ্ঞতাবশত) তাকে ঘুষ দিয়ে চাকরিতে আবেদন করতে বলেন। জাহিদ ছাহেব বিনয়ের সাথে বাবাকে বোঝালেন যে, এটি ইসলামী নীতিবিরোধী এবং পিতার সাথে সম্মানজনক আলোচনার মাধ্যমে বিকল্প সমাধান খুঁজে বের করেন।

উপসংহার : একটি সুশৃঙখল পারিবারিক অগ্রাধিকার ব্যবস্থা শুধু ধর্মীয় বাধ্যবাধকতাই নয়, বরং একটি সুখী ও স্থিতিশীল পারিবারিক জীবনের অপরিহার্য শর্ত। আললাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে, পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা গড়ে তুললে পারিবারিক জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও বরকত নেমে আসবে। আললাহ আমাদের সকলকে আদর্শ পারিবারিক জীবন গড়ার তাওফীক দান করুন-আমীন!

জাহিদ হাসান

* সহকারী শিক্ষক, শান্তি নিকেতন ইন্সটিটিউট, ফেনী।







আরও
আরও
.