এই আসমান-যমীন, গ্রহ-নক্ষত্র নিজে নিজেই তৈরী হয়নি। এর পেছনে কারিগর রয়েছেন। এমনকি এক টুকরো সুতাও দুনিয়ার বুকে এমনি এমনি তৈরী হয় না। তার কারিগর প্রয়োজন হয়। শুধু ভাল মানুষ গড়ার ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, একটি ঈমানদার, ন্যায়পরায়ণ, বলীয়ান প্রজন্ম এমনি এমনি তৈরী হয়ে যাবে। কোন কারিগর লাগবে না। আমরা বিশ্বাস করি যে, ভাল বই-পুস্তক পড়লে, ভাল পরিবেশে থাকলেই মানুষ ভাল হয়ে যায়। তাই আমাদের পদক্ষেপ গুলোও এতটুকুর মাঝেই সীমাবদ্ধ। হ্যাঁ, অনেক সময় পরিবেশ মানুষকে ভাল বানায়। তবে সেই পরিবেশটাও একজন কারিগরকে তৈরী করতে হয়। কারিগর ছাড়া কোন কিছু তৈরী অসম্ভব।

আমরা দো‘আর মাঝে আবেগ মাখিয়ে বলি, ‘হে আল্লাহ! ঘরে ঘরে আপনি আবুবকর, ওমর তৈরী করে দিন’। কিন্তু আল্লাহ তো ঘরে ঘরে আবুবকর, ওমর দেন না। তিনি চেষ্টা অনুযায়ী ফল প্রদান করেন। আমরা যে আবুবকর, ওমর, ওছমান, আলী (রাঃ)-এর দৃষ্টান্ত দেই, তাদের তৈরী করেছিলেন মুহাম্মাদ (ছাঃ)। এই সোনালী মানুষগুলো তাঁর হাতে গড়া। তিনি ছিলেন সেই সোনালী প্রজন্মের কারিগর। এতে বুঝা যায়, মানুষ তৈরী করতে কারিগর লাগে। কোথাও যদি কোন মানুষকে ভাল কাজ করতে দেখি, সততার ওপরে টিকে থাকতে দেখি, তবে বুঝে নেই যে, এই ব্যক্তিত্ব গঠনের পেছনে একজন কারিগর আছেন। সেই কারিগর হ’তে পারে তার পিতা-মাতা, নয়ত তার শিক্ষক, নয়ত ভিন্ন কেউ। কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো পরোক্ষ। তবে কারিগর অবশ্যই রয়েছেন। 

আমরা যেমন মানুষ গড়ছি : কয়েক মাস আগে আমার জনৈক শিক্ষকের নতুন প্রতিষ্ঠানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তিনি বড় এক প্রতিষ্ঠানের মুহাদ্দিছ ছিলেন। এখন গ্রামে একটি ছোট্ট প্রতিষ্ঠান করেছেন। আমি তাকে বললাম, উস্তাদজী! বড় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে এখানে এসে ছোট্ট মাদ্রাসা চালু করলেন। কারণ কি? তিনি বললেন, বাবা! আমি কিছু আমলী মানুষ তৈরী করতে চাই। এখন উন্নত শিক্ষা তো সবাই দিচ্ছে। আলেমও তুলনামূলক বাড়ছে। তবে সৎ মানুষ নেই। আখেরাতমুখী মানুষ নেই। তাই আমি মনে করেছি, সবাই শিক্ষিত করুক, আমি ভাল মানুষ বানাব। আমার এখানে যে ক’জন ছাত্র আছে তারা প্রতিদিন তাহাজ্জুদ পড়ে। এখন থেকেই তারা দো‘আয় কান্নাকাটি করে। আর আমি এমনই চেয়েছিলাম। আমার সে স্বপ্নটুকু এখান থেকে পূরণ হচ্ছে’। 

আমি তার কথা শুনে নীরব হয়ে রইলাম। অনেকটা লজ্জাও পেলাম। আসলেই! আমাদের শিক্ষা এখন কতই না উন্নত! লেখাপড়া নিয়ে আমরা কতই না সচেতন! তবুও মন ভরে না। আরো উন্নত, আরো আধুনিক, আরো সমৃদ্ধ হওয়া চাই। নিজেদের পড়ালেখার মান নিয়ে আমরা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কেউ বলছে, আমাদের কাছে আসুন, আমরা ইংরেজদের থেকে ভাল ইংরেজী শিখাই, আরবদের চেয়ে ভাল আরবী শিখাই। আবার কেউ বলছে, আমাদের অর্জনগুলো দেখুন। আমাদের অমুক শিক্ষার্থী তমুক হয়েছে। স্কলারশীপে অমুক দেশে এতজন আছে, তমুক দেশে এতজন আছে ইত্যাদি।

অভিভাবকগণ প্রতিষ্ঠানে এসে খোঁজ নেন, এখানকার সুবিধাগুলো কি কি। কোন কোন বিষয় পড়ানো হয়। বিদেশ-গমনের ব্যবস্থা আছে কি-না? এখানে লেখাপড়া করার পরে তথাকথিত ‘উজ্জবল ভবিষ্যৎ’-এর সম্ভাবনা আছে কি-না ইত্যাদি। তবে ভাল মানুষ তৈরী করা হয় কি-না; তা কেউ খোঁজ নেন না। আর এজন্যই আমরাও অভিভাবকদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাগুলো দিয়েই প্রাতিষ্ঠানিক মার্কেটিং করি। এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষ গড়ার প্রজেক্ট আমাদের কাছে একটি অনাগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আমাদের উচিৎ ছিল, অভিভাবকদের চাহিদাকে পরে রেখে দ্বীন ও যুগের চাহিদাকে আগে রাখা। উজ্জবল ভবিষ্যতের ঠিকাদারী না নিয়ে উজ্জবল মানুষ বানানোর দায়িত্ব নেয়া।

আমাদের আক্ষেপ : আমরা যখন স্বীকার করে নিয়েছি যে, আমরা আখেরাতের পথিক। দুনিয়া আমাদের আসল ঠিকানা নয়। তখন দুনিয়াদার প্রজন্ম তৈরী করা আমাদের শোভা পায় না। আখেরাতমুখী প্রজন্ম তৈরীর মাঝেই আমাদের গর্ব খুঁজে নেয়া উচিৎ ছিল। কারণ একজন বস্ত্তবাদী যে বিষয়গুলোকে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন মনে করে, আমরা সেগুলো দু’পায়ে দলি। আমরা সেগুলোর মাঝে গর্ব খুঁজব কেন? মেধা-শক্তি-সামর্থ্য আল্লাহ আমাদেরকেও দিয়েছেন। এই দুনিয়ার জৌলুসের মূল্য যদি আমাদের কাছে নূন্যতমও হ’ত, তবুও তাদের চেয়ে অধিক দুনিয়া অর্জন করে দেখানোর সামর্থ্য আমাদের ছিল। তবে আমরা এগুলো কিছুই করিনি। কারণ আমরা তো সেই পথের পথিক নই।

আমাদের তো এমন প্রজন্ম গড়া প্রয়োজন ছিল, যারা মনে করবে আমি একজন নবীর ওয়ারিছ। একজন বস্ত্তবাদীর সামনে আমাকে নিজের বেতনের অংক দেখিয়ে সম্মান নিতে হবে কেন? বিলাসবহুল জীবনের বর্ণনা দিয়ে নিজেকে উন্নত প্রমাণ করতে হবে কেন? আমি আল্লাহর কিতাব শিখেছি, রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ শিখেছি। এগুলো শিখে আমি শিক্ষিত হয়েছি কি-না তার সনদপত্র কোন বস্ত্তবাদীর কাছে নিতে হবে কেন? আমার পেটে ভাত না থাকতে পারে। দুর্বলতায় আমার মেরুদন্ড বাঁকা হ’তে পারে। আমার মাথা কখনো নীচের দিকে ঝুঁকবে না। ঈদুল আযহা ছাড়া আমার ঘরে গোশত রান্না না হ’তে পারে, এক পয়সা হারাম কখনো আমার রক্তে প্রবেশ করবে না।

এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোকাবিলায় আমি মহা-শক্তিধর। আমি যে কোন মানের খাবারে জীবন-ধারণ করতে পারি। যে কোন মানের আবাসনে সুস্থ থাকতে পারি। যে কোন মানের কাপড় পরে দুনিয়া শাসন করতে পারি। আমি যদি ভাতের জন্য লড়াই করতে দুনিয়ায় আসতাম, তবে দুনিয়ার সিংহভাগ সম্পদ আমার প্রাসাদে থাকত। আমি তো এগুলো করতে দুনিয়ায় আসিনি। আমাদের রাজত্ব এই দুনিয়ায় নয়। আমাদের সালতানাত প্রস্ত্তত হচ্ছে অনাদী-অনন্তকালের জন্য। সেই সালতানাতের জন্য শুধু এই জীবন নয়; এমন এক লক্ষ জীবন ক্ষুধা, কষ্ট ও দুর্দশার মাঝে হাসতে হাসতে পার করে দিতে পারি।

আমরা যদি এমন চিন্তাধার একটি প্রজন্ম তৈরী করতে পারি, তবে সেই প্রজন্ম দিয়ে যে কোন অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। আল্লাহর এই দুনিয়ায় দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। দ্বীনের খেদমতে নিবেদিতপ্রাণ মানুষ পাওয়া সম্ভব। দেখুন! প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, আদর্শ, চিন্তাধারা বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন কিছু নিবেদিত প্রাণ মানুষের। পার্ট টাইম জব দিয়ে সংসার চলে, তবে আদর্শ টিকিয়ে রাখা যায় না। আমরা আজ প্রতিটি ক্ষেত্রে নিবেদিতপ্রাণ মানুষের অভাবে ভুগছি। তবুও আমরা মানুষ গড়ার প্রজেক্ট হাতে নিচ্ছি না। তৃষ্ণা আমাদের কলিজা ছুঁয়েছে। তবুও আমরা কূপ থেকে পানি তোলার ব্যবস্থা করছি না। আমরা আশায় আছি, একদিন বৃষ্টি হবে। আমাদের পিপাসা নিবারণ হবে।

আমাদের শিক্ষকদের দেখেছি, তারা লাভ-ক্ষতির হিসাব একটু কম বুঝতেন। নিজের পরিবারের কাছে, বন্ধু-বান্ধবের কাছে তারা একটু মোটা হুঁশের মানুষ বলে বিবেচিত হ’তেন। সারা জীবন মাদ্রাসায় পড়ে থেকেছেন। ছাত্র গড়েছেন। জীবনে ফ্ল্যাট কিনতে পারেননি। গাড়ী কিনতে পারেননি। সারা জীবন ‘কিতাবুল হজ্জ’ পড়িয়ে নিজে একবারও হজ্জ করতে পারেননি। এক কথায় নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানোই তাদের অভ্যাস ছিল। তারা বলতেন, ‘ওয়াতন সে হাম কেয়া কারেঙ্গে, মাদ্রাসা হ্যায় ওয়াতন আপনা, মারেঙ্গে হাম কিতাবোঁ পর, ওয়ারক হোগা কাফন আপনা’। অর্থাৎ ‘বাড়ী দিয়ে আমরা কি করব! মাদ্রাসাই আমাদের বাড়ী। কিতাবের ওপর আমরা মারা যাবো। কিতাবের পাতা-ই হবে আমাদের কাফন’। তারা সাধারণ শিক্ষকের দায়িত্বের জায়গা থেকেই এগুলো করেছেন।

তাদের ছাত্র হয়ে আমরা কি করেছি? আমাদেরকে যখন গোটা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, তখন আমাদের মাথায় কেবল এই চিন্তাই ঘুরপাক খেয়েছে যে, ‘এর চেয়ে ভাল কর্মসংস্থান হ’লে এখান থেকে চলে যাব’। আর ভাল কর্মসংস্থান মানেই যেখানে বেতন বেশী, এটা না হয় আবার নতুন করে না-ই বললাম। আল্লাহ আমাকে দ্বীনের খেদমতে কবূল করেছেন, এটা যথেষ্ট নয়। আমি কোথায় কতটুকু ইলমী খিদমতের সুযোগ পাচ্ছি, এটা ধর্তব্য নয়। এমন মানুষকে যখন আমরা বাধ্য হয়ে পরিচালক বানাই তখন এই পরিস্থিতিকে বলা হয়, ‘পরিচালক দুর্ভিক্ষ’।

আমাদের অনেক মাদ্রাসা ‘শিক্ষা’ আধুনিক করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের আধুনিক করে ফেলেছে। এখন শিক্ষকরাও মাদ্রাসা থেকে ডাক্তার তৈরী করতে চান, আর শিক্ষার্থীরাও ডাক্তার হ’তে চায়। আর আমরাও বাধ্য হয়ে মাদ্রাসা থেকে ডাক্তার বানাতে চাওয়া মানুষকে ‘মুদাররিস’ বানাই। এই পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘মুদাররিস দুর্ভিক্ষ’। মাঝে মাঝে মনে হয় তাদের আমরা হাতজোড় করে অনুরোধ করি যে, ‘আপনারা আলেম বানান’। এই বিষয়টিকে আরেকটু গুরুত্বের সাথে নেন। কারণ ডাক্তার তৈরী করার জন্য হাযারো প্রতিষ্ঠান পড়ে আছে। একটি কাপড়ের কারখানায় কতগুলো মাশরূম জন্মেছে এটা কখনো কাপড়ের কারখানার গর্ব হ’তে পারে না। তাদের গর্ব হওয়া উচিৎ ছিল কাপড়ের মান নিয়ে। কারণ মাশরূম তৈরীর জন্য আলাদা কারখানা আছে। তারা উন্নত মানের মাশরূম তৈরী করে। আর কাপড়ের কারখানায় মাশরূম তৈরী হয়ে গেলে মাশরূমের কারিগররা বলে, ‘ওটা ব্যাঙের ছাতা’।

যে দ্বীনী অঙ্গনে ইউরোপিও প্যান্ট-শার্ট আরবীয় জুববার তুলনায় বেশী সহজভাবে গ্রহণ করা হয়, সেখানে কেউ রাসূল (ছাঃ)-এর দায়েমী সুন্নাহ পাগড়ী পরবে, এটা আশা করা বোকামী। কারণ সবাই একটু স্মার্টনেস চায়। আর স্মার্টনেস-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে আমাদের আশেপাশের লোকজন। সুতরাং যেখানে যে পোষাকের প্রচলন, সেখানে তা-ই স্মার্টনেস। আর অপ্রচলিত পোষাক সর্বদা হাসির খোরাক। এখন আমার প্রতিষ্ঠানে যদি আমি পোষাক নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতির মানে যদি হয়, আমার শিক্ষার্থীরা এতদিন পাঞ্জাবী পরত, এখন জার্সি গায়ে ঘুরবে। তারা এতদিন নযরের হেফাযত করত, এখন ছেলে-মেয়ে সব একসাথে বসে গ্রুপ স্টাডি করবে। তবে এটা কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি নয়, বরং এই পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘সাংস্কৃতিক দুর্ভিক্ষ’।

এই দুর্ভিক্ষগুলো আমরা আঁচ করতে পারি না। আমরা সমাজ নষ্ট হ’তে দেখি। বলি, সমাজটা নষ্ট হয়ে গেল। শিক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট হ’তে দেখি। সেখানেও আফসোস করি। তবে আমরা ভেবে দেখি না, এগুলো নষ্ট হয় কিভাবে? এগুলো নষ্ট হওয়ার পেছনে মূল কারণ হ’ল, এর চালিকা-শক্তি নষ্ট হওয়া। যেমন শিক্ষক হ’লেন শিক্ষার্থীদের চারিত্রিক প্রতীক। রুচিবোধ কাকে বলে তা শিক্ষকগণ শেখাবেন। এখন শিক্ষকই যদি শিক্ষার্থীদের সাথে নাচ-গান করেন, তবে শিক্ষার্থীদের রুচিবোধ তৈরী হবে কোত্থেকে? এজন্য প্রতিটি জিনিস সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য মানসম্মত চালিকা-শক্তি তৈরি করতে হয়।

একটি শিক্ষাব্যবস্থা যদি চায়, আমাদের এই ব্যবস্থা দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়ুক, যুগ যুগ ধরে আমাদের চিন্তাধারা টিকে থাকুক, তবে সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিচালক, ব্যবস্থাপক, শিক্ষক তৈরী করতে হবে। দাওয়াতী সংগঠনকে দাঈ তৈরী করতে হবে। পত্রিকাকে লেখক তৈরী করতে হবে। কারণ দাওয়াত বাতাসে ভেসে দুনিয়াব্যাপী ছড়াতে পারে না। দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে মানুষ। ইট-পাথরের দেয়াল কোন চিন্তাধারা লালন করতে পারে না। চিন্তাধারা লালন করে সেই ইট-পাথরের মাঝে বসবাস করা মানুষ। সেই মানুষ তৈরী করতে যদি আমি ব্যর্থ হই, তবে আমার ইট-পাথরের ইমারত যতই চোখ ধাঁধানো হোক, তা একসময় ধ্বসে যাবে। আর যদি আমি মানুষ তৈরী করতে পারি তবে সেই মানুষগুলো নর্দমা ভরাট করে একসময় ইমারত গড়ে তুলবে।

আমাদেরকে সেই মানুষ তৈরী করতে হবে। তবে যখনই মানুষ গড়ার আলোচনা আসে, তখনই প্রশ্ন আসে সামর্থ্যের। আমাদের তো সামর্থ্য নেই। সামর্থ্যের অভাবে প্রতি বছর দু’মাস ব্যাপী শিক্ষক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা সম্ভব হয় না। শিক্ষক তৈরী হবে কোত্থেকে? বছরে দুইটি লেখালেখি কর্মশালার আয়োজন করা সম্ভব হয় না। লেখক তৈরী হবে কোত্থেকে? এমন কোন সেমিনার বা বৈঠকের আয়োজন করা হয় না, যেখানে ছাত্রদের মাথায় চিন্তার বীজ বপন করা হবে, আদব-আখলাক শেখানো হবে, দ্বীনের খাদেম হওয়ার স্বপ্ন দেখানো হবে। তবে প্রোডাকশন তৈরী হবে কোত্থেকে? আমাদের না আছে সময়, না আছে টাকা, না আছে প্রবল ইচ্ছা।

আমরা যদি সত্যিই মানুষ গড়তে চাই, তবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা কোন কঠিন বিষয় নয়। ওছমান বিন হাদী বলেছিলেন, ঘাস খেয়ে হ’লেও অস্ত্র তৈরী করতে হবে। আমরা ঘাস খাওয়ার কথা বলতে পারি না। তবে বিশ্বাস করি যে, যার ওপর নিজেদের অস্তিত্ব টিকে আছে তা ঘাস খেয়ে হ’লেও তৈরী করতে হবে। না খেয়ে হ’লেও তৈরী করতে হবে। আর হ্যাঁ, দুনিয়ায় শুধু খেয়ে পরে বেঁচে থাকার নামই অস্তিত্ব নয়। আমাদের তাহযীব-তামাদ্দুনই আমাদের অস্তিত্ব। তাহযীব-তামাদ্দুন ছাড়া আমরা কেবল প্রাণীমাত্র। সুতরাং আমাদের সংস্কৃতিকে আমরা টিকিয়ে রাখব। আমরা মাটির সাথে মিশে যাব। আমাদের অস্তিত্ব দুনিয়ায় থেকে যাবে ইনশাআল্লাহ।

প্রস্তাবনা ও শেষ কথা : উপকারী বিদ্যা দুই ধরনের। একধরনের বিদ্যা সরাসরি মানুষ গড়ে। আরেক ধরনের বিদ্যা মানুষের জীবন পরিচালনায় উপকারে আসে। যেমন, একজন মানুষকে সুস্থ রাখতে চিকিৎসা বিদ্যা। মানুষের খাবার-দাবারের চাহিদা পূরণের জন্য ক্ষেত-খামারী বা কৃষি বিদ্যা। জীবন-ধারণে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস তৈরির জন্য প্রকৌশল বিদ্যা ইত্যাদি। তবে শ্রেষ্ঠ বিদ্যা সেটাই, যা সরাসরি মানুষ গড়ে। আল্লাহ সকল নবী-রাসূলকে এ বিদ্যা দিয়েই পাঠিয়েছিলেন। পাশাপাশি অন্যান্য বিদ্যাও দিয়েছিলেন, সেটা ভিন্ন বিষয়।

আমরা খেয়াল করলে দেখি, সকল নবী-রাসূল এই দুনিয়ার বুকে সোনার মানুষ গড়েছেন। এটাই আগে দরকার। এখানে আমরা মানুষের জীবন ধারণে উপকারে আসে এমন বিদ্যাকে ছোট করছি না। তবে দেখুন, মানুষই যদি না গড়া হয় তবে কার জন্য এত আয়োজন? কার জন্য এই নির্মল বাতাস আর সবুজ পৃথিবী? যে মানুষই হয়নি, যার ভেতরে সর্বদা পশুত্বের বিরাজ, সে যদি প্রকৌশলী হয় তবে সে মানবতার জন্য হুমকি। সে যদি চিকিৎসক হয় তবুও সে মানুষের ক্ষতি ছাড়া কখনো কল্যাণ আনতে পারবে না। এজন্য আমরা বলেছি, মানুষ গড়তে হবে আগে। তারা দুনিয়ায় সবকিছু হোক, তবে সবকিছুর আগে ভাল মানুষ হোক। 

মানুষ গড়তে হ’লে মানুষ গড়া বিদ্যার যত্ন নিতে হবে। তা হ’ল কুরআন ও হাদীছের বিদ্যা। তা হ’ল ইসলামী শিষ্টাচার, আদব ও আখলাক। দুনিয়ার বুকে ইসলাম ছাড়া ভিন্ন কোন জীবন ব্যবস্থা মানুষ গড়ার পূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি। আমরা যদি ইসলামের বাইরে কোন সৌন্দর্য দেখতে পাই, তবে অবশ্যই তা ইসলাম থেকে ধার করে নেয়া। এজন্য মানুষ গড়তে হ’লে সামনে রাখতে হবে কুরআন-হাদীছ। কুরআন-হাদীছের জ্ঞানে পরিপুষ্ট একজন ব্যক্তিই হ’তে পারেন মানুষ গড়ার আদর্শ কারিগর। এই কারিগরদের মূল্যায়ন করতে হবে।

আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধিকাংশ শিক্ষককে আবাসিক রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ তাযকিয়া বা আতমশুদ্ধির জন্য ছোহবতের কোন বিকল্প নেই। এটি নববী পদ্ধতির একটি অংশ। আদর্শ শিক্ষকগণ শুধু ক্লাসেই পড়াবেন না, বরং শিক্ষার্থীদের সাথে অবস্থান করবেন। শিক্ষার্থীরা তাদের ছোহবত বা সান্নিধ্যে থেকে আদব-আখলাক শিখবে। দ্বীন, দুনিয়া, জাতি, বিজাতি ইত্যাদি সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারা গঠিত হবে। আগের ওলামায়ে কেরামের ছোহবতে যেমন পড়াশোনার পাশাপাশি অন্তর পরিষ্কার হ’ত, বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক যান্ত্রিকতায় তা হারিয়ে গেছে। আমাদের আবার সেই দিন ফিরিয়ে আনতে হবে।

মনে রাখতে হবে, এক টুকরো লোহার সাথে শিথিলতা প্রদর্শন করে কখনোই তা ধারালো তরবারী বানানো যায় না। তাই আমাদেরকে মানুষ গড়ার পদক্ষেপে অন্তর্ভুক্ত সকল বিষয় খুব দৃঢ়তার সাথেই গ্রহণ করতে হবে। আদব-আখলাকে শিথিলতা দেখানো যাবে না। কারিকুলাম বহির্ভুত কার্যক্রম; যেমন, বক্তব্য কর্মশালা, লেখালেখি কর্মশালা, আরবী-ইংরেজী বলার দক্ষতা অর্জন ইত্যাদি বিষয়ে কোন শিথিলতা নয়। এসব বিষয়ে খরচ করতে কোন কার্পণ্য নয়। অভিভাবক কি চান, শিক্ষার্থীরা কি চায়, সরকার কি চায়, যুগ কি চায়; এই সবগুলো চাওয়া সামনে না রেখে আমাদেরকে সবার আগে দ্বীনের চাওয়া পূরণ করতে হবে। তবেই আমরা ভাল মানুষ গড়তে সক্ষম হব ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!






বিষয়সমূহ: শিক্ষাব্যবস্থা
আরও
আরও
.