বর্তমান হালচাল : যোহরের ছালাতের পরে কিছু শিক্ষার্থীকে ব্যাগ কাঁধে হনহন করে হেঁটে যেতে দেখি। আছরের ছালাতের পরেও অনেকের সাথে দেখা হয়। মাগরিব ছালাতের পরেও কিছু ছাত্রকে ব্যাগ কাঁধে রাস্তায় হাঁটতে দেখি। এরা ঐ সকল শিক্ষার্থী, যারা সকাল আটটা থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক ক্লাস করেছে। আমরা যোহরের পরে ঘুমিয়েছি। তারা ঘুমায়নি। আমরা আছরের পরে যখন পূর্ণ রিফ্রেশমেন্ট নিয়ে বের হচ্ছি, তখনও তাদের পিঠ থেকে বইয়ের ব্যাগ নামেনি। এরা সবাই প্রাইভেট পড়ুয়া শিক্ষার্থী। যারা শুধুমাত্র পরীক্ষায় একটু ভাল নম্বর পাওয়ার আশায় তাদের শান্তি-বিশ্রাম সব বিসর্জন দিয়েছে।
প্রথমেই বলি, এই শিক্ষার্থীদের জন্য আমাদের কষ্ট হয়। কারণ আমরা যখন পড়ালেখা করেছি, সেসময়ে আমরা দুপুরে ঘুমিয়েছি। আছর পরে মাঠে খেলেছি। সময় করে বন্ধু-বান্ধবের সাথে গল্প করেছি। তবে আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দুপুরে ঘুমায় না। তারা প্রতিদিন বিকেলে খেলে না। তারা বন্ধু-বান্ধব বা পরিবারের সাথে গল্প করার কোন সময় পায় না। কেমন যেন দুর্বিষহ এক জীবনযাপন করছে তারা। মাঝে মাঝে ভাবি, আমাদের ছাত্রজীবন যদি এতটা প্রেশারের হ’ত তবে আমরা হয়ত লেখাপড়া শেষ করতে পারতাম না। পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার সার্বক্ষণিক মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে হয়তো পড়ালেখাই বাদ দিয়ে দিতাম।
ইদানীং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাইভেটের এমনই প্রভাব যে, অভিভাবকগণ সন্তান ভর্তি করার পরে সর্বপ্রথম প্রাইভেট শিক্ষক খোঁজেন। অথচ তাদের সন্তান এখনো একদিনও ক্লাস করেনি! এখনই তাদের প্রাইভেট নিয়ে মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেছে। তারা মনে করেন, কোন শিক্ষকের কাছে যদি প্রাইভেট দেয়া হয় তবে তার কাছে থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সবরকমের সহায়তা পাওয়া যাবে। তিনি সন্তানের সুবিধা-অসুবিধা বুঝবেন। ছুটি-ছাটার ব্যবস্থা করবেন। পরীক্ষার সময় বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিবেন। আর হচ্ছেও তাই। শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়া শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করছে। বাহ্যিকভাবে দেখা যাচ্ছে, প্রাইভেটের মাধ্যমে তারা অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছে। ফলত এর মাধ্যমে শিক্ষকগণ শ্রদ্ধার আসন থেকে নেমে হয়েছেন ‘কেয়ারটেকার’। এই বিষয়ে একটু পরে আসছি।
আমাদের অনেক অভিভাবক শুধুমাত্র এজন্য সন্তানকে প্রাইভেটে দেন, যেন কষ্ট করে নিজেকে পড়তে বসাতে না হয়। এর মাধ্যমে তারা নিজ সন্তানের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছেন। কারণ, শিশু শ্রেণী থেকে প্রাইভেট পড়তে পড়তে সন্তানের মনে এই ধারনা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, ‘প্রাইভেট ছাড়া পড়া যায় না’। ফলে উচ্চবিত্ত অভিভাবকগণ যখন সময়ের অভাবে বা একটু অবসর সময় পার করার জন্য নিজের মেধাবী সন্তানকে প্রাইভেটে দিচ্ছেন, তখন বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে সন্তানদের প্রাইভেট বা কোচিংয়ের বিপুল ব্যয় মেটাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে চরমভাবে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক অভিভাবক নিজেদের মৌলিক প্রয়োজনগুলো বিসর্জন দিয়ে এই ব্যয়ভার বহন করছেন। ‘অন্যের সন্তান প্রাইভেট পড়ছে, আমার সন্তান না পড়লে পিছিয়ে পড়বে’-এই ভীতির কারণে অভিভাবকরা সকল কষ্ট মেনে নিচ্ছেন।
প্রাইভেটের কারণে যা যা হারালাম : প্রাইভেট সিস্টেম আমাদের শিক্ষকতার মহান পেশায় চুনকালি লাগিয়েছে। এটা এখন আর কোন ‘মহান পেশা’ নয়। কারণ শিক্ষকগণ যখন উপরী উপার্জনের একমাত্র পথ হিসাবে প্রাইভেটকেই বেছে নেন তখন আর মহান পেশা থাকে না। এতে তার সৃজনশীলতাও নষ্ট হয়ে যায়। তিনি পাঠ্যবইয়ের মলাটের মাঝে বন্দী হয়ে যান। পাশাপাশি তিনি আর নীতিবানও থাকতে পারেন না। তিনি শিক্ষাকে সহজ করার স্থানে কঠিন করার কথা ভাবেন। কারণ শিক্ষা যদি সহজ হয়ে যায় তবে প্রাইভেটের চাহিদা কমে যাবে। শ্রেণীকক্ষেই যদি শিক্ষার্থীদের সকল চাহিদা পূরণ হয়ে যায় তবে তারা আর প্রাইভেটের প্রয়োজন অনুভব করবে না। তাই শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষের পাঠদানে নিজেদের সেরাটা দেন না, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য হয়। এটাই সবচেয়ে দুঃখজনক। প্রাইভেটের প্রভাবে পাঠদান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। পরীক্ষার নম্বর প্রদানে সমতা রক্ষা করা কঠিন হয়। সর্বোপরি শিক্ষক তার আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলেন। তিনি তার শ্রেণীকক্ষেও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না।
প্রাইভেট আমাদের শিক্ষার্থীদের সময়গুলো কেড়ে নিচ্ছে। তাদেরকে জ্ঞানার্জনের পথ না দেখিয়ে শুধু পরীক্ষামুখী করে তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে। যেখানে শিক্ষার্থীর মূল কাজ হ’ল ‘শেখা’ সেখানে প্রাইভেট পড়ানোর মূল ফোকাস থাকে পরীক্ষায় ভাল নম্বর পাওয়া। ফলে মনের অজান্তেই শিক্ষার্থীরা নোট বা সাজেশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পড়ালেখার মূল উদ্দেশ্য কি, সেটা তারা কখনোই বুঝে ওঠে না। প্রাইভেট পদ্ধতির জাঁতাকলে পড়ে এরা ‘তালিবুল ইলম’ নয় বরং ‘তালিবুদ দারাজাত’ বা ‘তালিবুর রক্বম’ হয়ে যায়। এরা কখনোই জ্ঞান অন্বেষণ করে না। এরা সর্বদা পরীক্ষার ফলাফলের পেছনে ছুটে বেড়ায়। বছরের পর বছর লেখাপড়া করে কি শিখলাম, কি পেলাম, কি হারালাম; এগুলো হিসাব করার ফুরসত তাদের হয় না।
দেখা গেছে, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকেও শিক্ষার্থীরা নিজের যে কোন বিষয়ের পাঠ্যবই হাতে নিয়ে বলতে পারে না যে, ‘এই বই পড়ার পরে আমার এই যোগ্যতা তৈরি হবে’। তারা মনে করে, ‘পড়ার উদ্দেশ্য কেবলই পরীক্ষায় ভাল নম্বর পাওয়া। এই ভাল নম্বরই একদিন সৌভাগ্য এনে দিবে’। যা একটি মিষ্টি ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর প্রাইভেট সেন্টার হ’ল এমন একটি জায়গা যা তাকে সর্বদা মনে করিয়ে দিতে থাকে, ‘তোমাকে পরীক্ষায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতেই হবে’। ফলে শিক্ষার্থীরা এক তীব্র ও অস্বাস্থ্যকর মানসিক চাপে থাকে। তাদের মাঝে তৈরি হয় হতাশা ও বিষণ্ণতা। জ্ঞানার্জনের প্রকৃত স্বাদ তারা কোনদিনই পায় না।
এই প্রাইভেট সিস্টেম আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থী দিয়ে সাজানো শ্রেণীকক্ষ কেড়ে নিয়েছে। এখন শ্রেণীকক্ষে দেখা যায়, শিক্ষক পড়ানোর সময় শিক্ষার্থীরা অমনোযোগী হয়ে বসে থাকে। পাশের শিক্ষার্থীর সাথে গল্প করে। তারা মনে করে, ‘এই পড়াগুলো তো আমাকে বিকেলে প্রাইভেটে গিয়ে আবার পড়তেই হবে। প্রাইভেট টিচার তো বুঝিয়েই দিবেন। একই পড়া কতবার বুঝব! এখন একটু গল্প করি। এখন আমার কাজ শুধু কোথায় পড়া দিল তা জেনে নেয়া। বাকী কাজ প্রাইভেট শিক্ষক করে দিবেন’। শিক্ষার্থীদের এই মানসিকতার কারণে শ্রেণীকক্ষে পাঠদানে আগ্রহী শিক্ষকগণ হতাশায় ভোগেন। কারণ শিক্ষার্থী যদি অমনোযোগী হয় তবে পড়া বোঝানো যায় না।
শিক্ষক ক্লাসে পড়া বুঝনোর সময় যখন ক্লাসের মেধাবী শিক্ষার্থীরা গল্প করে, আর শিক্ষকও জানেন, ‘তারা কেন অমনোযোগী’ তখন সত্যিই কপাল চাপড়ানো ছাড়া আর কোন পথ থাকে না। এই দুঃখ কাউকে বলা যায় না। কারণ এই অভিযোগ করলে কর্তৃপক্ষ ভাবেন, ‘এই শিক্ষক শ্রেণীকক্ষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না’। তাই শিক্ষকগণ আর অভিযোগ করেন না। একসময় তারা শ্রেণীকক্ষে পড়া বোঝানো ছেড়ে দেন। এভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল পরীক্ষা দেওয়া এবং সনদ গ্রহণের কেন্দ্রে পরিণত হয়। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা একাধিক প্রাইভেট শিক্ষকের সহায়তা নিয়ে এগিয়ে যায়; অন্যদিকে মেধা থাকা সত্ত্বেও কেবল অর্থের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে। শ্রেণীকক্ষে তাদের পিপাসা নিবারণ হয় না।
এই সিস্টেম আমাদের শিক্ষার্থীদের পঙ্গু করে দিয়েছে। প্রাইভেট পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা হয়ে যাচ্ছে এন্টিবায়েটিক সেবন করে বেঁচে থাকা রোগীর মত। কখনো যদি প্রাইভেট না থাকে তবে যেন এদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। কত দ্রুত আরেকজন শিক্ষক দেখে প্রাইভেট দেয়া যায়, সেটাই অভিভাবকদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে এই ধরনের শিক্ষার্থীরা নিজ যোগ্যতায় একটি কিতাব বুঝতে পারে না। একটি সমস্যা সমাধান করতে পারে না। এরা ভবিষ্যতে গবেষক হ’তে পারে না। কারণ গবেষক হ’তে সেল্ফ এডুকেশনে অভ্যস্ত হ’তে হয়। যে পদ্ধতির সাথে তারা কোনদিন পরিচিতই হয়নি। এজন্যই বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে যখন শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জিনিস আবিষ্কার করতে শিখছে, তখন আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের কেবল সেই আবিষ্কারের কাহিনীগুলোই পড়াচ্ছি। এর বেশী চাপ তারা নিতে পারছে না।
সেল্ফ এডুকেশন : প্রাইভেট নামের এই মহামারি বন্ধ করতে হ’লে আগে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেটের বিকল্প কিছু দিতে হবে। আর প্রাইভেটের উত্তম বিকল্প হ’ল ‘সেল্ফ এডুকেশন’। আমরা এই পদ্ধতিতেই পড়াশোনা করেছি। তবে সমস্যা হ’ল, সেল্ফ এডুকেশনের মূলমন্ত্র ‘শিক্ষার্থীর আগ্রহ’। সেটা যদি না থাকে তবে এই পদ্ধতি কাজে আসে না। আর বর্তমানে আমাদের শিক্ষার্থীদের মাঝে পড়াশোনার আগ্রহ নেই বললেই চলে। তবুও বিষয়টির সাথে তাদের পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। যেন আগ্রহীরা এই পদ্ধতিকে কাজে লাগাতে পারে।
সেল্ফ এডুকেশন হ’ল নিজে পড়ে শেখা। সহজ কথায়, কারো সাহায্য না নিয়ে নিজেই পড়ালেখার মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা বাড়ানো। এই পদ্ধতিই শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। এর শুরুটা কষ্টকর হ’লেও ফল দীর্ঘমেয়াদী। কারণ সেল্ফ এডুকেশন একজন শিক্ষার্থীকে একাডেমিকভাবে মযবূত করে গড়ে তোলে। সেল্ফ এডুকেশনের সবচেয়ে বড় শত্রু হ’ল প্রাইভেট সিস্টেম। কারণ যেখানে সেল্ফ এডুকেশন একজন শিক্ষার্থীকে স্বনির্ভর হ’তে শেখায়, সেখানে প্রাইভেট সিস্টেম তাকে আজীবনের মত পরনির্ভর করে তোলে। কেউ বুঝিয়ে দিলে তবেই সে কোন পাঠ বুঝতে পারে।
সেল্ফ এডুকেশনের কয়েকটি ধাপ আছে। প্রাথমিকভাবে একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে শিক্ষকের আলোচনা শুনবে এবং এতেই সে পাঠ বুঝে যাবে। কারণ শিক্ষক অবশ্যই ক্লাসে পড়াগুলো যথাসাধ্য বোঝানোর চেষ্টা করেন। তবে শিক্ষকের আলোচনা যদি শিক্ষার্থীর কাছে অস্পষ্ট থাকে তখনই সেল্ফ এডুকেশনের প্রয়োজন হয়। শিক্ষার্থীকে তখন ক্লাসে নোট খাতা নিয়ে বসতে হয় এবং শিক্ষকের কথাগুলো নোট করতে হয়। কোন আলোচনা যদি অস্পষ্ট থাকে তবে ক্লাস শেষে শিক্ষককে সেই বিষয়টি জিজ্ঞাসা করতে হয়। এতুটুকু যত্ন নিলেই অনেকে শতভাগ পড়া বুঝে যায়।
তারপরও যদি কেউ না বোঝে তবে তাকে এগুলোর জন্য বাড়তি সময় দিতে হয়। এর পদ্ধতি হ’ল, না বোঝা বিষয়গুলো আলাদাভাবে নোট করে কোন শিক্ষক বা বড় ভাইয়ের কাছে গিয়ে বুঝিয়ে নেয়া। তাতেও যদি না হয় তবে বুঝতে হবে, সাবজেক্টের ভিত্তি মযবূত নয়। আগে ভিত্তি মযবূত করতে হবে। সেল্ফ এডুকেশনে যে কোন বিষয়ের ভিত্তি মযবূত করার জন্য কারিকুলাম বহির্ভূত বইয়ের সহযোগিতা নিতে হয়। বর্তমানে যে কোন বিষয়ের দূর্বলতা দূর করার জন্য বাজারে ফর্মুলা সমৃদ্ধ বহু বই পাওয়া যায়। অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে সেই বইগুলো সংগ্রহ করে নিয়মিত অধ্যয়ন করলে দুই তিন মাসের মধ্যে একটি বিষয়ের দুর্বলতা দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
প্রয়োজন হ’লে যে বিষয়গুলোতে দূর্বলতা আছে সে বিষয়ে ফর্মুলা সমৃদ্ধ বই কিনে গ্রুপ স্টাডি বা তাকরার করতে হবে। এটাও অত্যন্ত ফলপ্রসূ। যদি এতটুকু যোগ্যতাও না থাকে তবে গাইড কিনতে হবে। গাইড দেখে ক্লাসের পড়া করতে হবে। যদি কেউ উল্লেখিত সবগুলো পন্থায় অপারগ হয় এবং গাইড থেকেও পড়া করতে না পারে তবে তার জন্য প্রাইভেটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তারপরও সেটা গদবাধা প্রাইভেট নয়, বরং এভাবে প্রাইভেট দিতে হবে যে, প্রাইভেট শিক্ষক যেন তিন মাসের মধ্যে তার নির্দিষ্ট বিষয়ের দুর্বলতা দূর করে দেন। অর্থাৎ ক্লাসের বই না পড়িয়ে ভিত্তি মযবূত করায় মনোনিবেশ করেন। দুর্বলতা দূর না করে শুধু ক্লাসের পড়াগুলো দ্বিতীয়বার পড়িয়ে দেয়া প্রাইভেট অবশ্যই বর্জনীয়।
আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের সেল্ফ এডুকেশনের সাথে পরিচয় করাতে হবে। প্রয়োজনে দু’একদিনের কর্মশালা রাখতে হবে। দুর্বলতা দূর করার জন্য কিভাবে বিষয়ভিত্তিক বই চয়ন করতে হয়। বইগুলো কখন, কিভাবে পড়তে হয়। দুর্বলতা দূর করতে ছুটিকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় ইত্যাদি বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে। তাদের শেখাতে হবে, সামনের পাঠ মুতালা‘আ করার পদ্ধতি কী। তাহ’লে আশা করা যায়, প্রাইভেটের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশেই কমে আসবে। কারণ শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে, ‘ক্লাসে শিক্ষকদের প্রশ্ন করলে তারা প্রাইভেটে আসতে বলেন’। এই দোষ তো শিক্ষার্থীদের। তারা নিজেদেরকে কেন ভোঁতা করে রাখবে?
আমাদের সময় যে শিক্ষার্থীরা সেল্ফ এডুকেশনে অভ্যস্ত ছিল, যারা সামনের পাঠ মুতালা‘আ করে ক্লাসে আসত, শিক্ষকগণ তাদের প্রাইভেটে আসতে বলা তো দূর কী বাত! তাদের সাথে লিয়াজু মেন্টেইন করে চলতেন। অনেক বড়ভাইকে দেখেছি, যারা শিক্ষকের চেয়ে বেশী মুতালা‘আ করে ক্লাসে বসতেন। শিক্ষকগণ পড়ানোর সময় দ্বিধায় থাকতেন যে, শিক্ষার্থীরা কি না কি প্রশ্ন করে বসে! শিক্ষক প্রাইভেটে আসতে বলার তো কোন প্রশ্নই আসে না। আবার শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ‘শিক্ষকগণ ক্লাসে মুতালা‘আ করে আসেন না’। আমরা শিক্ষার্থীদের বলব, এটা কোন অভিযোগ করার বিষয় নয়। অবশ্যই সেই ক্লাসের শিক্ষার্থীরা পাথরের মত নিথর। তাদের কাছে হাঁ-না সব সমান। কাজেই শিক্ষক মুতালা‘আ করে আসার প্রয়োজনবোধ করেন না। শিক্ষার্থীরা যদি সামনের পাঠ মুতালা‘আ করে আসা শুরু করে তবে শিক্ষকও মুতালা‘আ করে আসতে বাধ্য হবেন।
আত্মসমালোচনা ও পদক্ষেপ : শুধু শিক্ষার্থীরা পরিবর্তন হ’লেই যে প্রাইভেট বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়। শিক্ষার্থীদের সচেতন করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান প্রধানেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আমরা মনে করি, এই অবস্থার পরিবর্তনে প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির পদক্ষেপ সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা এখানে সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে চাই। আমরা যখনই এই কথা বলি যে, ‘পদক্ষেপ নিতে হবে’ তখনই প্রমাণ হয়ে যায় যে, সে বিষয়ে ঘাটতি আছে। সুতরাং এগুলো কোন সমালোচনা নয় বরং আত্মসমালোচনা বা ‘মুহাসাবা’।
প্রাইভেট বন্ধের বিষয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে প্রশাসনিক দুর্বলতা বা আপোসকামিতার ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পথ বন্ধ করে একটি সুস্থ, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি সুধারণা রাখা অবশ্যই বর্জনীয়। ‘আমরাই সেরা’ এই মানসিকতা রাখা যাবে না, বরং ‘আমাদেরকে সেরা হ’তে হবে’ এমন মানসিকতাই কাম্য। এক্ষেত্রে আমরা নিজেদের অর্জনগুলো সামনে না রেখে ঘাটতিগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারি।
যেমন আমাদের গ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ শিক্ষকের অভাব দেখা যায়। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক তো নেই বললেই চলে। এজন্য শিক্ষার্থীরা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শিক্ষা অর্জনের জন্য শহরমুখী হয়। কারণ শহরের উন্নত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক রয়েছেন। তারা খুব সুন্দরভাবে পড়া বোঝাতে পারেন। তাদের কাছে পড়লে তুলনামূলক ভাল পড়া বোঝা যাবে। আরো বেশী যোগ্য হওয়া যাবে। এজন্যই শিক্ষার্থীরা গ্রাম ছেড়ে শহরে আসে। পড়ালেখা ছাড়া শুধু ভাল খেতে-পরতে কেউ শহরে আসে বলে আমরা জানি না।
এখন উন্নত প্রতিষ্ঠান হিসাবে যদি আমরা মানসম্মত পড়ালেখাই নিশ্চিত করতে না পারি, তবে আমাদের স্বার্থকতা কোথায়! মেধা যাচাই করে ভর্তি নেয়া শিক্ষার্থীগুলোরই যদি চার/পাঁচটি প্রাইভেট পড়া লাগে তবে আমরা তাদেরকে কি শিখাই? আমাদের শিক্ষাদান কি এতই ভঙ্গুর? যদি উন্নত প্রতিষ্ঠানে পড়েও প্রাইভেটের প্রয়োজন হয়, তবে প্রতিষ্ঠান উন্নত হ’ল কই? শুধু জুতা-মোজা আর উন্নত ড্রেসকোডই কি প্রতিষ্ঠানকে উন্নত করে? না! প্রতিষ্ঠানকে কেবল একটি জিনিসই উন্নত করতে পারে। তা হ’ল পড়ালেখার মান। সেই মান ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদেরই।
আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে যে, প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অর্থের বিনিময়ে প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পড়াতে পারবেন না। শিক্ষক নিয়োগের চুক্তিতেই পেশাদারী নৈতিকতা এবং জবাবদিহিতার শর্তগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে যৌক্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিধান রাখতে হবে। তবে এই নিয়মের ওপর কঠোরতা আরোপ করা তখনই সম্ভব হবে, যখন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রদত্ত সম্মানীতে শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান ও সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে। কারণ ‘প্রাইভেট পড়াচ্ছেন কেন’? এই প্রশ্নের উত্তরে একজন শিক্ষক যদি বলেন, ‘আমি মাসের শুরুতে বেতন তুলে বাড়ী ভাড়া দিয়ে বাকী টাকার বাজার করি। তাতে ১৫ দিনের চাল-ডাল হয়। এখন মাসের ২০ তারিখ। আমার বাড়ীতে চাল নেই’। তাহ’লে শিক্ষকদের এই প্রশ্ন না করাই যুক্তিযুক্ত। সিস্টেম যেভাবে চলছে সেভাবেই চলতে দেয়াই ভাল। কারণ যে সিস্টেম কোটি টাকার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে তা শুধু মুখের শুকনো কথায় থেমে যাবে এটা আশা করা যায় না।
আমরা যেটা করতে পারি, যে সকল শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে সর্বোত্তম মেধা ও শ্রম দিচ্ছেন, যাদের শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট ছাড়াই ভাল ফলাফল করছে, যারা সারা বছরে নিজের প্রাপ্য ছুটিটাও গ্রহণ করছেন না, আরো বিভিন্ন পদ্ধতিতে অন্যদের তুলনায় অধিক শ্রম দিচ্ছেন, তাদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিশেষ আর্থিক বা সম্মানসূচক প্রণোদনা প্রদানের ব্যবস্থা করা। কারণ একজন শিক্ষক যখন দেখবেন, তিনি ক্লাসে অনেক শ্রম দেন। আরেকজন শিক্ষক ক্লাসে কোন শ্রম না দিয়ে তার সমান বা অধিক মূল্যায়িত হচ্ছেন, তখন শ্রম দেয়ার আগ্রহ এমনিতেই হারিয়ে যাবে। এটা অবশ্য হঠাৎই হারিয়ে যাবে না, একটু একটু করে হারাবে। তখন দেখা যাবে, পুরো একটি শিক্ষক প্যানেল সব ফাঁকিবাজে ভরে গেছে। তবে তাদেরকে ফাঁকিবাজ বলার আগে এটাও দেখতে হবে যে, পরিশ্রমীদের শ্রম আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করেছি।
অর্থনৈতিক বিষয়ে যদি আমরা একটি সন্তোষজনক স্থানে অবস্থান করতে পারি, তখন আমাদের কাজ হবে শিক্ষকদের মাঝে আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করা। এই বিষয়েও প্রতিষ্ঠান প্রধান বা পরিচালকগণের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। কারণ শিক্ষকগণ মূলত এখান থেকেই আত্মসম্মান হারান। আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাব, বিভিন্ন কোম্পানী তাদের পণ্য বিক্রির জন্য কর্মচারী রাখে। একটি কোম্পানীর কাছে কাস্টমার সর্বদা মুখ্য বিষয়। কারণ কাস্টমারের মাধ্যমেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। এজন্য কোন কাস্টমার যদি তাদের কর্মচারীর সাথে দুর্ব্যবহারও করে তবুও কোম্পানী এটাকে সহজেই মেনে নেয়। তবে কোন কর্মচারী যদি কাস্টমারের সাথে দুর্ব্যবহার করে তবে তাকে সে বেলাতেই চাকুরি হারাতে হয়।
এই চিরচেনা পদ্ধতিতে যদি আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও পরিচালিত হয় তবে সেখানে আমরা যতই ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদার বাণী’ শোনাই না কেন, শিক্ষকদের মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হবে না। কারণ তারা মনে করবেন, শিক্ষকতাও আর দশটা চাকুরির মতই। এখানে ‘মহান পেশা’ বলতে কিছু নেই। আর এই মানসিকতা জন্ম নিবে তখনই, যখন তাদের সাথে আর দশটা পেশার কর্মচারীর মত আচারণ করা হবে। এজন্য শিক্ষকগণের সাথে সম্মানসূচক আচরণ করতে হবে। যা আমাদের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই আজ অনুপস্থিত।
একজন শিক্ষকের কাছে সবচেয়ে দামী জিনিস হ’ল সম্মান। শিক্ষক সম্মানীতে মানিয়ে নিতে পারেন, তবে সম্মানে মানিয়ে নিতে পারেন না। তাদেরকে অবশ্যই সম্মান দিতে হবে। এমন কাজ করতে হবে, যেন শিক্ষকগণ বুঝতে পারেন যে, তাদেরকে সম্মান দেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের আবাসন, খাবার, প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত আরো অন্যান্য বিষয়, আর শিক্ষকদের আবাসন, খাবার ইত্যাদি যদি একই মানের হয় তবে এটাকে সম্মান দেয়া বলে না। প্রতিষ্ঠানের যদি কোনই সামর্থ্য না থাকে তবে শিক্ষকদের থালায় অতিরিক্ত এক টুকরো লেবু দিয়ে বুঝাতে হবে যে, আপনারা আমাদের কাছে সম্মানিত। তুলনামূলক নতুন একটি ফ্যান তাদের ঘরে লাগিয়ে বুঝাতে হবে, শিক্ষকগণ শ্রদ্ধার পাত্র। শিক্ষকগণ যদি দেখেন, কর্তৃপক্ষ তার সাধ্যানুযায়ী তাদের সম্মান করেছেন তবে আন্তরিকতা এমনিতেই আসবে। কারণ তারা তো মানুষ। তারা তো এগুলো অনুভব করেন। এছাড়া শুধু ‘আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন হোন’ বললেই তারা পরিবর্তন হবেন না।
যখন তারা নিজেদের আত্মসম্মান বুঝবেন, প্রাইভেট না পড়িয়েই সংসারও চলবে তখন তারাই আদর্শের মূর্তপ্রতীক হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ। তখন এই শিক্ষকদের দিয়েই ওভার টাইম ক্লাসের ব্যবস্থা করা যাবে। ফ্রিতে বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করা যাবে। যে শিক্ষকগণ শিক্ষা কঠিন করতে চাইতেন, ব্যবসার মানসিকতা রাখতেন, তারাই সবার আগে এসে বলবেন, কার কি সমস্যা আছে, আমার কাছে এসো। তবে এই বিশাল পরিবর্তন আসতে সময় লাগবে। গাছ যদি আজ লাগানো হয় তবে ফল তিন বছর পরে আসবে। আর গাছই যদি তিন বছর পরে লাগানো হয় তবে ফলের দেখা পেতে ছয় বছর সময় লাগবে।
কর্তৃপক্ষের এমন পদক্ষেপ গ্রহণের পরেও যদি শিক্ষকগণের মাঝে প্রাইভেট পড়ানোর ব্যাধি দেখা যায় তবে বুঝে নিতে হবে, তারা শিক্ষক নন। তাদেরকে এই পেশা থেকে দ্রুত অব্যাহতি নেয়ার পরামর্শ দিতে হবে। প্রাইভেট বন্ধে কর্তৃপক্ষ যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছেন, কোন শিক্ষক যদি তা ব্যহত করেন তবে এই বিষয়েও কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
পরিশেষে বলব, উল্লেখিত প্রবন্ধে আমরা যে ছোট ছোট সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, এই সবগুলোই প্রাইভেট সিস্টেম প্রতিষ্ঠার একেকটি অংশ। এটি পরিপূর্ণ একটি প্যাকেজ। বাহ্যিকভাবে মনে হ’তে পারে, এর সাথে প্রাইভেটের কোন সম্পর্ক নেই। তবে আমরা দীর্ঘদিন ধরে এগুলোর সাথে প্রাইভেটের গভীর সম্পর্ক অনুভব করেছি। মহান আল্লাহর কাছে দো‘আ করছি, তিনি যেন আমাদের এই প্রাইভেট নামক মহামারী দমনে সফল পদক্ষেপ গ্রহণের তাওফীক দান করেন। আমীন!
সারওয়ার মিছবাহ
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।