মানবজীবনে ভুল এক অনিবার্য বাস্তবতা। জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় আমরা হরহামেশাই ভুল করে থাকি। কিন্তু সেই ভুলকে অাঁকড়ে ধরে অহংকার ও আত্মম্ভরিতার পথে চলা যেমন ধ্বংসের নামান্তর, তেমনি নিজের ভুল অকপটে স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়া এক মহৎ গুণ এবং মহান আল্লাহর নিকটে অত্যন্ত পসন্দনীয় একটি আমল। যে ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করার মতো সৎ সাহস রাখে, সে কেবল নৈতিকভাবেই শক্তিশালী নয়, বরং সে আল্লাহর ক্ষমা ও করুণা লাভের পথেও এক ধাপ এগিয়ে যায়। আর ভুল স্বীকার করা মানুষের দুর্বলতা নয়। কারণ সৃষ্টিগতভাবেই ভুল করার প্রবণতা মানুষের মধ্যে রয়েছে। তাই ভুল হ’লে স্বীকার করে নেওয়াই যৌক্তিক এবং উত্তম বান্দার বৈশিষ্ট্য।
কিছু ভুল বা অন্যায় মানুষের হক বা অধিকার নষ্ট করে। যেমন কাউকে অপমান করা, মন্দ আচরণ করা, প্রতারণা করা, মিথ্যার আশ্রয় নেয়া, কারো অর্থ বা জমি আত্মসাৎ করা ইত্যাদি। এসব ভুল বান্দার সাথে সংশ্লিষ্ট, যা আল্লাহর নিকটে ক্ষমা চেয়ে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। বরং এক্ষেত্রে বান্দার কাছেই ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে হয়।[1]
ভুল স্বীকারের উপকারিতা :
ভুল স্বীকারের গুরুত্ব বর্ণনা করে রাসূল (ছাঃ) বলেন, كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِيْنَ التَّوَّابُوْنَ- ‘প্রত্যেক আদম সন্তান ভুলকারী। আর সর্বোত্তম ভুলকারী তারাই, যারা তওবা করে’ (অর্থাৎ ভুল স্বীকার করে তা থেকে ফিরে আসে)।[2]
হাদীছটি আমাদের শিক্ষা দেয়, মানুষ হিসাবে আমরা কেউ ভুলে ঊর্ধ্বে নই। জীবনে চলার পথে ভুল-ত্রুটি হবেই। এটি মানুষের জন্মগত স্বভাবের অংশ। তাই ভুলের জন্য অনুশোচনা করা, লজ্জিত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই ভুল থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করাই একজন মুমিনের মৌলিক কর্তব্য।
ক্ষমা লাভ : ভুল স্বীকার করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উপকার হ’ল, এর মাধ্যমে রাববুল আলামীনের ক্ষমা পাওয়া সহজ হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللهُ أَنْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ ‘কিছু লোক রয়েছে, যারা তাদের অপরাধ সমূহ স্বীকার করেছে। তারা তাদের কর্মে ভাল ও মন্দ মিশ্রিত করেছে। অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (তওবা ৯/১০২)।
মর্যাদা বৃদ্ধি : ভুল স্বীকার করা মানুষের বিনয়-নম্রতার অন্যতম লক্ষণ। যখন কেউ অন্যের কাছে কোন ভুলের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করে, তখন সে ছোট হয়ে যায় না, বরং তার সম্মান ও মর্যাদা বহুগুণে বেড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللهُ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন’।[3]
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, إِذا أَرَادَ الله بِعَبْد خيرا جعله معترفا بِذَنبِهِ ممسكا عَن ذَنْب غَيره جوادا بِمَا عِنْده زاهدا فِيمَا عِنْده مُحْتملا لأَذى غَيره وَإِن أَرَادَ بِهِ شرا عكس ذَلِك عَلَيْهِ ‘আল্লাহ যখন কোন বান্দার জন্য কল্যাণ চান, তখন তাকে স্বীয় পাপ স্বীকারের যোগ্যতা এবং অন্যের পাপ অন্বেষণ করা থেকে বিরত থাকার তাওফীক দান করেন। আর সে স্বীয় সম্পদ নিয়েই প্রাচুর্য বোধ করে ও অন্যের সম্পদ থেকে বিমুখ থাকে এবং অন্যের দুঃখ-কষ্টের ভার বহন করে। আর যখন কারো অকল্যাণ চান, তখন বিপরীতটাই ঘটে’।[4]
মিথ্যা অহমিকা থেকে মুক্তি : ভুল স্বীকার না করা এবং ভুলের পক্ষে সাফাই গাওয়া মূলত অহংকারের লক্ষণ। ক্ষণস্থায়ী এ জীবনে যা নিতান্তই মূল্যহীন। আর অহংকারকারীকে আল্লাহ তা‘আলা পসন্দ করেন না। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।[5]
পাপমুক্তি : ভুল স্বীকারের মানসিকতা ব্যক্তিকে তওবার প্রতি অগ্রগামী রাখে। কেননা প্রতিনিয়ত সে ভাবে যে, আমার ভুল হ’তে পারে। ফলে সে বেশী বেশী ইস্তেগফার করে। নিজের ভুলগুলো খুঁজে ফিরে। কারো হক নষ্ট হ’ল কিনা, কাউকে অপমান করা হ’ল কিনা প্রভৃতি ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকে। ফলে পাপ থেকে মুক্ত থাকা তার জন্য সহজ হয়ে যায়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ، كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ ‘যে ব্যক্তি গোনাহ থেকে তওবা করে, সে এমন ব্যক্তি যেন তার কোন গোনাহই ছিল না’।[6]
সৌভাগ্যবানদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ তাওফীক : মানুষ হিসাবে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। ভুল করা আমাদের স্বভাবজাত। কিন্তু সেই ভুলকে শনাক্ত করে, বিনয়ের সাথে তা স্বীকার করার ক্ষমতা সবার থাকে না। এটি কোন সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়, বরং এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক গুণ। যখন আল্লাহ কাউকে ভালোবাসেন, তখন তিনি তাকে নিজের নফসের উপর বিজয়ী হওয়ার তাওফীক দান করেন। তখন সেই ব্যক্তি নিজের সম্মান বা অহংকারের চেয়ে সত্য এবং সঠিক পথকে বড় করে দেখতে শেখে। কারণ নফস সর্বদা নিজেকে সঠিক, নিখুঁত এবং অন্যদের চেয়ে অগ্রগামী প্রমাণ করতে চায়। ভুল স্বীকার করাকে সে নিজের পরাজয় বা দুর্বলতা হিসাবে দেখে। তাই যে ব্যক্তি এই ক্ষমতা অর্জন করতে পারে, সে নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবান এবং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত।
ব্যক্তিগত বিকাশ ও আত্মশুদ্ধি : ভুল স্বীকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হ’ল ব্যক্তিগত বিকাশ। যখন কোন ব্যক্তি তার ভুলটি স্বীকার করে, তখন সে আত্ম-উপলব্ধির প্রথম ধাপে পা রাখে। নিজের কাজের দায়ভার গ্রহণ করার মাধ্যমে সে নিজেকে বিশ্লেষণের সুযোগ পায়। কেন ভুলটি হ’ল, কোন পরিস্থিতিতে হ’ল এবং ভবিষ্যতে কিভাবে তা এড়ানো যায়- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির পথ ধরেই একজন মানুষ আরও ব্যক্তিত্ববান, সুবিবেচক ও পরিণত হয়ে ওঠে। যে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে না, সে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে এবং তার মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ভুল স্বীকার করা বিবেকের ওপর জমে থাকা একটি ভারী পাথর নামিয়ে ফেলার মত, যা মানসিক প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে।
সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিশ্বাস স্থাপন : পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হ’ল বিশ্বাস ও সততা। পরিবার, বন্ধুত্ব বা কর্মক্ষেত্রে সর্বত্রই বিশ্বাস এক অপরিহার্য উপাদান। যখন আমরা ভুল করে তা লুকিয়ে রাখি বা অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেই, তখন সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়। এটি সম্পর্ককে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। অন্যদিকে একজন ব্যক্তি যখন সাহসের সাথে নিজের ভুল স্বীকার করে এবং তার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চায়, তখন তা অন্যের মনে তার প্রতি সম্মান বাড়িয়ে দেয়। একটি অকপট স্বীকারোক্তি সাময়িকভাবে কিছুটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা সম্পর্ককে আরও মযবূত ও স্বচ্ছ করে। এটি প্রমাণ করে যে, ব্যক্তির কাছে সম্পর্কের মূল্য তার অহমিকার চেয়ে অধিক।
সামাজিক ও পেশাগত জীবনে গুরুত্ব : পেশাগত জীবনে ভুল স্বীকারের গুরুত্ব অপরিসীম। কর্মক্ষেত্রে একটি ছোট ভুলও যদি সময়মতো স্বীকার করা না হয়, তবে তা পরবর্তীতে বড় ধরনের ক্ষতি বা বিপর্যয়ের কারণ হ’তে পারে। যে কর্মী বা নেতা নিজের ভুল স্বীকার করে তা সংশোধনের চেষ্টা করেন, তিনি একটি দায়বদ্ধ ও স্বচ্ছ কর্মপরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করেন। একজন দায়িত্বশীল যখন নিজের ভুল স্বীকার করেন, তখন তার কর্মীদের মধ্যে তার প্রতি বিশ্বাস ও সম্মান আরো বৃদ্ধি পায়। এর মাধ্যমে টীমে বা সংগঠনে একটি ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যেখানে প্রত্যেকেই ভুল থেকে শিখতে উৎসাহিত হয় এবং একে অপরকে দোষারোপ করার পরিবর্তে সমাধানের দিকে মনোনিবেশ করে।
পারিবারিক জীবনে ভুল স্বীকারের গুরুত্ব : পারিবারিক জীবনেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ, যা পরিবারের ভিত্তি মযবূত করে এবং সদস্যদের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা, বিশ্বাস ও সম্মান বৃদ্ধি পায়। যখন একজন সদস্য তার ভুল মেনে নেয়, তখন তা তার সততা এবং বিনয়ের পরিচয় বহন করে। এর ফলে অহংকার ও যিদের মতো ক্ষতিকর বিষয়গুলো দূর হয়, যা প্রায়শই পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষত স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভুল স্বীকার আরো গুরুত্বপূর্ণ, যা দাম্পত্য জীবনকে আরও মযবূত ও মধুর করে তোলে। যখন স্বামী বা স্ত্রী নিজের ভুল স্বীকার করে নেন, তখন তা কেবল একটি সাধারণ ক্ষমা চাওয়া হয় না, বরং এটি জীবনসঙ্গীর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। পারস্পরিক ভুল স্বীকারের মধ্য দিয়ে একে অপরকে আরও ভালোভাবে বুঝতে শেখে এবং তাদের মধ্যেকার মানসিক বন্ধন দৃঢ় হয়। এটি কেবল বর্তমানের সমস্যাই সমাধান করে না, বরং ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতেও সাহায্য করে।
নবী জীবনে ভুল স্বীকারের অনন্য নিদর্শন :
হযরত আদম (আঃ) : আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ) শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহর আদেশ অমান্য করে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেলেছিলেন। যখন তাঁরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন, তখন তারা বিনীতভাবে নিজেদের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেছিলেন, رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নিজেদের উপর যুলুম করেছি। এক্ষণে যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন ও দয়া না করেন, তাহ’লে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’ (আ‘রাফ ৭/২৩)। তাদের এই আকুতিভরা প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেন এবং তাদের ক্ষমা করে দেন।
পক্ষান্তরে ইবলীস অহংকারবশত নিজের ভুল স্বীকার করেনি। বরং সে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে দোষারোপ করে এবং বিতর্কে লিপ্ত হয়। ফলে সে চিরদিনের জন্য অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয়। এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, ভুল স্বীকার করা নবীদের গুণ এবং আল্লাহর রহমত লাভের উপায়। আর অহংকার ও নিজ ভুলে অটল থাকা শয়তানের বৈশিষ্ট্য।
হযরত ইউনুস (আঃ) : ইউনুস (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়ের উপর হতাশ হয়ে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা না করেই কর্মস্থল ত্যাগ করেছিলেন। পরবর্তীতে যখন তিনি মাছের পেটে বন্দী হন, তখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে এই বলে দো‘আ করেন, لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ অর্থাৎ ‘(হে আল্লাহ!) তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তুমি পবিত্র। আর নিশ্চয়ই আমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত’ (আম্বিয়া ২১/৮৭)।
তাঁর এই অকপট স্বীকারোক্তি এবং আকুল প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেন এবং তাঁকে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন।
হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জীবন থেকে :
বদর যুদ্ধের ময়দানে : বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একটি তীর দিয়ে সৈন্যদের কাতার সোজা করছিলেন। এমন সময় সাওয়াদ ইবনে গাযিইয়াহ (রাঃ) নামে এক ছাহাবী সারি থেকে কিছুটা এগিয়ে ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) তীর দিয়ে তার পেটে হালকা খোঁচা দিয়ে সোজা হ’তে বলেন। সাওয়াদ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! أَوْجَعْتَنِي وَقَدْ بَعَثَكَ اللهُ بِالْحَقِّ وَالْعَدْلِ، فَأَقِدْنِي ‘আপনি আমাকে কষ্ট দিয়েছেন, অথচ আল্লাহ আপনাকে সত্য ও ন্যায়বিচারসহ প্রেরণ করেছেন। সুতরাং আমাকে এর প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ দিন। রাসূল (ছাঃ) তৎক্ষণাৎ নিজের পেটের কাপড় তুলে ধরে বললেন, ‘সাওয়াদ, প্রতিশোধ গ্রহণ করো’।
কিন্তু সাওয়াদ (রাঃ) প্রতিশোধ না নিয়ে রাসূল (ছাঃ)-কে জড়িয়ে ধরে তাঁর পেটে চুমু খেলেন। তারপর বললেন, যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার আগে তার জীবনের শেষ ইচ্ছা ছিল, তাঁর শরীরের চামড়া যেন রাসূল (ছাঃ)-এর পবিত্র শরীরকে স্পর্শ করে। একথা শুনে রাসূল (ছাঃ) তাঁর জন্য কল্যাণের দো‘আ করলেন।[7] অতঃপর তিনি যুদ্ধে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন।[8]
খেজুর গাছের পরাগায়ন বিষয়ে ভুল থেকে প্রত্যাবর্তন : হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় এসে দেখলেন, সেখানকার অধিবাসীরা পুরুষ খেজুর গাছের পরাগরেণু নিয়ে স্ত্রী খেজুর গাছের ফুলের সাথে মিশিয়ে দিচ্ছেন (কৃত্রিম পরাগায়ন করছেন)। বিষয়টি দেখে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ধারণা থেকে তাদের বললেন, ‘আমার মনে হয়, তোমরা এটি না করলেও ফলন ভাল হবে’। ছাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কারণে তাঁর কথা মেনে নিয়ে সে বছর আর কৃত্রিম পরাগায়ন করলেন না। কিন্তু এর ফলে সে বছর খেজুরের ফলন খুবই কম বা মন্দ হ’ল। বিষয়টি রাসূল (ছাঃ) জানতে পেরে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁর অবস্থান তুলে ধরে বললেন, إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ، إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ دِينِكُمْ فَخُذُوا بِهِ، وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ رَأْيِي، فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ ‘আমি তো কেবল একজন মানুষ। যখন আমি দ্বীনের কোন বিষয়ে তোমাদের নির্দেশ দেই, তখন তা অাঁকড়ে ধরবে। কিন্তু যখন আমি আমার ব্যক্তিগত মত থেকে কোন কথা বলি, তখন আমি (অন্যদের মতোই) একজন মানুষ মাত্র’। অন্য বর্ণনা মতে তিনি বলেন, أَنْتُمْ أَعْلَمُ بِأَمْرِ دُنْيَاكُمْ ‘দুনিয়াবী বিষয়ে তোমরাই সবচেয়ে ভালো জান’।[9]
শিক্ষা : ঘটনা দু’টি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মহৎ চরিত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রথমটিতে তার ন্যায়বিচার, বিনয় এবং নিজের সামান্য কাজ দ্বারা কেউ কষ্ট পেলে সাথে সাথে তার প্রতিকার করার মানসিকতার এক অসাধারণ উদাহরণ।
দ্বিতীয় ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, তিনি বিশ্বজগতের নেতা ও আল্লাহর নবী হওয়া সত্ত্বেও নিজের ব্যক্তিগত একটি ধারণা ভুল প্রমাণিত হওয়ায় তা স্বীকার করতে সামান্যও কুণ্ঠাবোধ করেননি। এটি শিক্ষা দেয় যে, ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়, বরং সততা, বিনয় ও মহত্ত্বের লক্ষণ।
ছাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে ভুল স্বীকারের নিদর্শন :
ছাহাবায়ে কেরাম ছিলেন সত্যের মাপকাঠি এবং আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁরা মানুষ হিসাবে ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কিন্তু তাঁদের মহত্ত্ব ছিল এখানেই যে, ভুল হওয়ার সাথে সাথেই তাঁরা তা অকপটে স্বীকার করে নিতেন এবং অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। নিম্নে তাঁদের জীবন থেকে ভুল স্বীকারের কিছু অনুপ্রেরণাদায়ক ঘটনা তুলে ধরা হ’ল।-
হযরত আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-এর ঘটনা :
একদিন রাসূল (ছাঃ)-এর প্রধান দুই সাথী হযরত আবুবকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ)-এর মধ্যে কোন একটি বিষয়ে আলাপ চলছিল। আলাপের এক পর্যায়ে আবুবকর (রাঃ)-এর কোন কথায় ওমর (রাঃ) রাগান্বিত হন এবং রাগের বশেই তাঁকে ছেড়ে সেখান থেকে চলে যান।
নিজের কথায় প্রিয় বন্ধুর মনে কষ্ট দিয়েছেন বুঝতে পেরে আবুবকর (রাঃ) সাথে সাথেই অনুতপ্ত হ’লেন। তিনি ওমর (রাঃ)-এর পিছু পিছু ছুটলেন এবং তাঁকে মাফ করে দেওয়ার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করতে লাগলেন। কিন্তু ওমর (রাঃ) তখন এতটাই রাগান্বিত ছিলেন যে, তিনি কোন কথা না শুনে নিজের ঘরে প্রবেশ করেন এবং আবুবকর (রাঃ)-এর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেন।
ওমর (রাঃ)-এর এমন আচরণে অত্যন্ত ব্যথিত ও চিন্তিত হয়ে আবুবকর (রাঃ) সোজা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হ’লেন। আবুবকর (রাঃ)-এর এমন অবস্থা দেখে নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমাদের এই সাথী নিশ্চয়ই কারো সাথে ঝগড়া করে এসেছে’।
আবুবকর (রাঃ) সালাম দিয়ে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ও ওমর-এর মধ্যে একটা কিছু ঘটে গিয়েছিল। আমি তার প্রতি কিছুটা রূঢ় আচরণ করে ফেলেছি। পরে আমি অনুশোচনা করেছি এবং তার কাছে ক্ষমা চেয়েছি, কিন্তু সে আমাকে ক্ষমা করতে অস্বীকার করেছে। তাই আমি আপনার কাছে এসেছি’। তাঁর কথা শুনে নবী করীম (ছাঃ) তিনবার বললেন, ‘হে আবুবকর! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন’।
এদিকে ওমর (রাঃ)-এরও রাগ কমে গিয়েছিল এবং নিজের আচরণের জন্য তাঁর মনে অনুশোচনা জেগেছিল। তিনি লজ্জিত হয়ে আবুবকর (রাঃ)-এর বাড়িতে গেলেন। কিন্তু তাঁকে পেলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, আবুবকর (রাঃ) নিশ্চয়ই নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে গিয়েছেন। এরপর ওমর (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ)-এর দরবারে এসে সালাম দিয়ে বসলেন এবং পুরো ঘটনা আনুপূর্বিক বর্ণনা করলেন। নিজের সাথী আবুবকর (রাঃ)-এর প্রতি এমন আচরণ করা হয়েছে শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চেহারা মোবারক রাগে লাল হয়ে উঠল।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর রাগান্বিত চেহারা দেখে আবুবকর (রাঃ) ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, তাঁর কারণে হয়তো ওমর (রাঃ) আল্লাহর রাসূলের রোষানলে পড়বেন। তাই তিনি সাথে সাথে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন এবং বলতে লাগলেন, وَاللهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ لأَنَا كُنْتُ أَظْلَمَ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কসম, আমিই যুলুম করেছি!’
তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উপস্থিত সাহাবীদের দিকে ফিরে বললেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা আমাকে তোমাদের কাছে রাসূল করে পাঠিয়েছেন। কিন্তু (প্রথমে) তোমরা বলেছিলে, ‘তুমি মিথ্যা বলছ, আর একমাত্র আবুবকর বলেছিল, ‘আপনি সত্য বলছেন। সে তার জান ও মাল দিয়ে আমাকে সর্বাত্মক সহায়তা করেছে। এমতাবস্থায় তোমরা কি আমার জন্য আমার এই সাথীকে ত্যাগ করবে? তোমরা কি আমার জন্য আমার সাথীকে ত্যাগ করবে?’। এই কথাটি তিনি দু’বার পুনরাবৃত্তি করলেন। আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, এই ঘটনার পর আর কখনো কেউ আবুবকর (রাঃ)-কে কোন কষ্ট দেয়নি।[10]
হযরত আবুবকর ও রাবী‘আহ (রাঃ)-এর ঘটনা :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর একজন খাদেম ছিলেন রাবী‘আহ আল-আসলামী (রাঃ)। একবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে এবং হযরত আবুবকর (রাঃ)-কে এক খন্ড জমি দান করেন। কিছুদিন পর তাদের জমির সীমানায় থাকা একটি খেজুরের কাঁদি নিয়ে দু’জনের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়। বিতর্কের এক পর্যায়ে হযরত আবুবকর (রাঃ) রাবী‘আহ (রাঃ)-কে এমন একটি কথা বলেন, যা তার জন্য খুবই পীড়াদায়ক ছিল। কিন্তু কথাটি বলার সাথে সাথেই হযরত আবুবকর (রাঃ) প্রচন্ড অনুতপ্ত হন। তিনি রাবী‘আহ (রাঃ)-কে অনুরোধ করেন, يَا رَبِيعَةُ رُدَّ عَلَىَّ مِثْلَهَا حَتَّى يَكُونَ قِصَاصاً ‘তুমিও আমাকে ঠিক একই রকম কথা বলে প্রতিশোধ নাও, যাতে তার আমার মন্দ কথার বিচার (ক্বিছাছ) হয়ে যায়’। কিন্তু রাবী‘আহ (রাঃ) এই মহৎ মানুষটির প্রতি প্রতিশোধ নিতে অস্বীকৃতি জানান।
আবুবকর (রাঃ) বললেন, তুমি অবশ্যই (আমাকে মন্দ কথা) বলবে নতুবা তোমার বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট নালিশ করব। কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানালে আবুবকর (রাঃ) আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট গমন করলেন।
একটু পর রাবী‘আহ (রাঃ)ও রওয়ানা হলেন। পথে তাঁর গোত্রের লোকেরা তাঁকে আবুবকরের বিরুদ্ধে সাহায্য করতে চাইলেও তিনি তাদের বারণ করেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা কি জানো তিনি কে? তিনি আবুবকর ছিদ্দীক। তাঁর ক্রোধের কারণে রাসূল (ছাঃ) ক্রোধান্বিত হবেন, আর তাঁদের দু’জনের ক্রোধের কারণে আল্লাহ ক্রোধান্বিত হবেন, ফলে আমি ধ্বংস হয়ে যাব’।
অবশেষে তাঁরা দু’জনেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে পৌঁছান। সব শুনে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) রাবী‘আহ (রাঃ)-কে বললেন, أَجَلْ فَلاَ تَرُدَّ عَلَيْهِ وَلَكِنْ قُلْ غَفَرَ اللَّهُ لَكَ يَا أَبَا بَكْرٍ ‘না, তুমি তাঁর কথার জবাবে কটূ কথা বলবে না। বরং তুমি বলো, হে আবুবকর! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিন’। রাসূল (ছাঃ)-এর এই মহান শিক্ষা শ্রবণ করে হযরত আবুবকর (রাঃ) কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গেলেন।[11]
শিক্ষা : ঘটনা দু’টি ভুল স্বীকার, বিনয় এবং ক্ষমার এক অসাধারণ শিক্ষা প্রদান করে। যেখানে আমরা দেখতে পাই, ইসলামের প্রথম খলীফা আবুবকর (রাঃ) এত উচ্চ মর্যাদাশীল মানুষ হওয়া সত্ত্বেও সামান্য ভুলের জন্য কতটা অনুতপ্ত হয়েছিলেন এবং সাথে সাথে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন।
তিনি কেবল অনুতপ্ত হয়েই থেমে থাকেননি, বরং দুনিয়াতেই এর প্রতিবিধান (ক্বিছাছ) চেয়েছেন, যাতে আখেরাতে তাঁকে লজ্জিত হ’তে না হয়। এটি ভুলের দায়ভার গ্রহণ করার এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করার সর্বোচ্চ মানসিকতার পরিচায়ক। নিজের অবস্থান বা মর্যাদার কথা চিন্তা না করে ভুল স্বীকার করা তাঁর মহত্ত্বের অনন্য নিদর্শন। এই মানসিকতাই একজন মুমিনকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র করে তোলে এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে।
হাতেব বিন আবী বালতা‘ (রাঃ)-এর ঘটনা :
মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে যুদ্ধের প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলেন। হাতেব বালতা‘ (রাঃ) ছিলেন একজন বদরী ছাহাবী। কিন্তু মক্কায় তাঁর পরিবার-পরিজন ও সহায়-সম্পদ রয়ে গিয়েছিল, যাদের দেখাশোনা করার মতো কোন আত্মীয়-স্বজন সেখানে ছিল না। তিনি ভাবলেন, যদি মক্কার কুরায়েশদেরকে গোপনে মুসলিম বাহিনীর আগমনের খবর জানিয়ে একটি চিঠি পাঠান, তাহলে হয়তো তারা তাঁর পরিবারের উপর কোন অত্যাচার করবে না। এই ভেবে তিনি এক মহিলার মাধ্যমে কুরায়েশদের কাছে একটি পত্র প্রেরণ করেন।
এদিকে অহি-র মাধ্যমে রাসূল (ছাঃ) বিষয়টি জানতে পেরে একটি দল পাঠিয়ে চিঠিটি উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন। অতঃপর হাতেব (রাঃ)-কে ডেকে পত্র প্রেরণের কারণ জানতে চান। তিনি কোন গোপনীয়তার আশ্রয় না নিয়ে অকপটে নিজের ভুল স্বীকার করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আল্লাহর কসম, আমি ইসলাম ত্যাগ করিনি বা কুফরীও করিনি। বরং আমি আমার পরিবার-পরিজন ও সম্পদ রক্ষার্থে এরূপ করে ফেলেছি। জবাব শুনে হযরত ওমর (রাঃ) ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, ‘অনুমতি দিন, আমি এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দেই’।
রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘হে ওমর! সে কি বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নয়? আর তুমি কি জানো না তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ، فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ ‘তোমরা যা ইচ্ছা আমল করো, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি’। অন্য বর্ণনা মতে, তোমাদের জন্য আমি জান্নাতকে ওয়াজিব করে দিয়েছি’। এই কথা শুনে ওমর (রাঃ)-এর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াতে লাগল।[12]
কা‘ব ইবনে মালেক (রাঃ)-এর ঘটনা
তাবূক ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম কষ্টকর এক যুদ্ধ। প্রচন্ড গরম, দীর্ঘ পথ এবং রসদের স্বল্পতা ছিল। রাসূল (ছাঃ) এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সকল সক্ষম মুসলমানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু কা‘ব ইবনে মালেক (রাঃ) সহ তিনজন ছাহাবী সঙ্গত কোন কারণ ছাড়াই অলসতাবশত যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।
যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর মুনাফিকরা বিভিন্ন মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হযরত কা‘ব (রাঃ) তার দুই সাথীসহ রাসূল (ছাঃ)-এর সামনে উপস্থিত হয়ে অকপটে স্বীকার করেন যে, তাঁর কোন ওযর ছিল না, স্রেফ আলস্যের কারণেই তিনি যেতে পারেননি।
রাসূল (ছাঃ) তাদের সততার কারণে বিষয়টি আল্লাহর উপর ছেড়ে দেন এবং সকল মুসলমানকে তাঁদের সাথে কথাবার্তা বন্ধ করে সামাজিক বয়কটের নির্দেশ দেন। এই বয়কট পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই পঞ্চাশ দিন ছিল তাঁদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা সরাসরি কুরআনের আয়াত (সূরা তওবা ১১৭-১১৮) নাযিল করে তাঁদের তওবা কবুল করেন এবং তাদেরকে ক্ষমা করে দেন।[13]
শিক্ষা : একদিকে দীর্ঘ ও কঠিন পরীক্ষা, অন্যদিকে সরাসরি আয়াত নাযিলের মাধ্যমে মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে মাগফিরাত লাভের মহাসৌভাগ্য!... এথেকে স্পষ্ট হয় যে, ভুল স্বীকার করে সত্যের উপর অটল থাকার পুরস্কার কত বড়। মিথ্যা সাময়িক মুক্তি দিলেও চূড়ান্ত সফলতা ও সম্মান সত্যের পথেই নিহিত।
ভুল স্বীকার না করার পরিণতি :
ভুল করা মানব চরিত্রের একটি স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই ভুল স্বীকার না করা ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেমন :
ব্যক্তিগত বিকাশের পথ রুদ্ধ হয় : যে ব্যক্তি ভুল স্বীকার করে না, সে তার ভুল থেকে শিখতে পারে না। ফলে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে এবং তার জ্ঞান ও দক্ষতার বিকাশ থেমে যায়। আবার ক্রমাগত ভুল অস্বীকার করার ফলে ব্যক্তির মধ্যে এক ধরনের মিথ্যা অহমিকা তৈরি হয়। সে নিজেকে নির্ভুল ভাবতে শুরু করে, যা তার বাস্তব জ্ঞানকে বাধাগ্রস্ত করে। আবার নিজের ভুলকে ঢাকার জন্য তাকে ক্রমাগত মিথ্যা বলতে হয় বা অজুহাত তৈরি করতে হয়। ফলে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়।
সম্পর্কে অবনতি ঘটে : পরিবার, বন্ধুত্ব বা কর্মক্ষেত্রে ভুল স্বীকার না করলে তার প্রতি অন্যের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়। তৈরী হয় মতবিরোধ, ক্ষোভ ও মানসিক দূরত্ব। ভেঙে যায় দীর্ঘদিনের সম্পর্কও। জেনেবুঝে ভুল অস্বীকার করলে তার সাথে খোলাখুলি ও সৎ আলোচনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা সম্পর্কের জন্য অপরিহার্য।
কর্মজীবন ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব : যে ব্যক্তি কখনোই নিজের ভুল মেনে নেয় না, তাকে সমাজ এড়িয়ে চলতে শুরু করে। ফলে সে একসময় সামাজিকভাবে একা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
কর্মক্ষেত্রে ভুল স্বীকার না করলে সহকর্মী ও কর্তৃপক্ষের কাছে ভাবমূর্তি ক্ষুণন হয়। এর ফলে সহকর্মীদের মাঝে তার প্রতি ভালোবাসা, সুধারণার ঘাটতি হয়। সহানুভূতি হ্রাস পায়। তার সাথে অন্যদের দলগত কাজে সমস্যা তৈরি হয়। একইভাবে একজন দায়িত্বশীল যদি তার ভুল সিদ্ধান্ত স্বীকার না করেন, তাহ’লে পরিষদের অন্য সদস্যরা তার ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে। যা একটি সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা সৃষ্টি করে।
উপসংহার :
ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়, বরং এটি এক প্রকার শক্তি; যা মানুষকে নৈতিকভাবে বলীয়ান করে তোলে। যে সমাজে ভুল স্বীকারকে দুর্বলতা হিসাবে না দেখে, বরং শিক্ষা ও বিকাশের সুযোগ হিসাবে দেখা হয়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে সভ্য ও উন্নত। এটি ব্যক্তির বিনয়, সততা এবং আল্লাহভীতির পরিচায়ক। যখন সমাজে ভুল স্বীকার করার সংস্কৃতি চালু থাকে, তখন পারস্পরিক সম্পর্কগুলো সুন্দর ও মযবূত হয়। মনোমালিন্য দূর হয় এবং সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হয়।
আসুন, আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এই মহৎ গুণটির চর্চা করি। কোন ভুল হয়ে গেলে তা স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ না করি। অহংকারকে বিসর্জন দিয়ে বিনয়ের পথ অবলম্বন করি। রাবেব কারীমের নিকটে অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমা চাই এবং মানুষের হক নষ্ট করলে তার কাছেও ক্ষমা চেয়ে নেই। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল এবং তিনি তওবাকারীকে ভালোবাসেন। রাববুল ‘আলামীন আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।
[1]. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের ওপর যুলুম করেছে সে যেন তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেয়। তার ভাইয়ের পক্ষে তার নিকট হ’তে পুণ্য কেটে নেয়ার আগেই। কারণ সেখানে কোন দীনার বা দিরহাম নেই। তার কাছে যদি পুণ্য না থাকে তবে তার (মাযলূমের) গোনাহ এনে তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে (বুখারী হা/২৪৪৯) ।
[2]. ইবনু মাজাহ হা/৪২৫১।
[3]. মুসলিম হা/২৫৮৮, মিশকাত হা/১৮৮৯।
[4]. আল-ফাওয়ায়েদ, ৯৯ পৃ.।
[5]. মুসলিম হা/৯১, মিশকাত হা/৫১০৭।
[6]. ইবনু মাজাহ হা/৪২৫০, সনদ হাসান।
[7]. সীরাতু ইবনে হিশাম ১/৬২৬; আল-বিদায়াহ ৩/২৭১; ছহীহাহ হা/২৮৩৫।
[8]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, আল-ইছাবাহ ৩/১৮০ পৃ.।
[9]. মুসলিম হা/২৩৬২; মিশকাত হা/১৪৭।
[10]. বুখারী হা/৪৬৪০, ৩৬৬১।
[11]. আহমাদ হা/১৬৬২৭, ছহীহাহ হা/৩২৫৮।
[12]. বুখারী হা/৬৯৩৯, মিশকাত হা/৬২১৬।
[13]. বুখারী হা/৪৪১৮।