বিজ্ঞান যখন বস্ত্তগত জগতের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করে, তখন তা মানব কল্যাণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের খোলসে কোন তত্ত্ব যে বিজ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে একটি রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক এজেন্ডায় পরিণত হ’তে পারে, তার একটি বাস্তব উদাহরণ হ’ল চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ (Theory of Evolution), যা স্রেফ একটি বৈজ্ঞানিক অনুকল্প (Hypothesis) থেকে আধুনিক যুগে ধর্মবিরোধী নাস্তিকদের জন্য বস্ত্তবাদের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

আধুনিক ইউরোপীয় পুনর্জাগরণের (Renaissance) পর থেকে ধর্মের পরিবর্তে বিজ্ঞানকে সত্য অনুসন্ধানের একটি নিরপেক্ষ মাধ্যম হিসাবে দাবী করা হয়েছে। কিন্তু ১৯ শতকে এসে বিজ্ঞানের নিরপেক্ষতার আড়ালে ‘পদ্ধতিগত বস্ত্তবাদ’ (Methodological Naturalism)-কে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা শুরু হয়। ফলে ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইন যখন তার On the Origin of Species গ্রন্থটি প্রকাশ করেন, তখন তা কেবল একটি জৈববৈজ্ঞানিক তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তৎকালীন ইউরোপের ঈশ্বরবিমুখ বুদ্ধিজীবী শ্রেণী ডারউইনবাদকে লুফে নেয়। কারণ এটি তাদের ঈশ্বরহীন বিশ্বদৃষ্টির এক বৈজ্ঞানিক সনদ জোগাড়ের সুযোগ করে দিয়েছিল।

আমাদের সন্তানরা আজ স্কুলে পড়ছে ‘মানুষ মূলত বানর বা এপ গোত্রীয় নরবানর থেকে বিবর্তিত হয়েছে’। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে ‘জীবন এলোমেলো রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফলাফল’। পাঠ্যবইয়ে লেখা আছে, ‘ডারউইনের তত্ত্ব একটি প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য’। কিন্তু একটি প্রশ্ন কেউ করে না, এই তত্ত্ব কেন কিভাবে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসাবে প্রচার পেল? যে তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক সমস্যাগুলো ডারউইন নিজেই স্বীকার করেছিলেন, যে তত্ত্বের মূল দাবীগুলো ১৬৫ বছরেও প্রমাণিত হয়নি[1], সেই তত্ত্ব কেন বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর পাঠ্যক্রমে পর্যন্ত ঢুকে গেল? উত্তরটা মোটেই বৈজ্ঞানিক নয়; বরং রাজনৈতিক এবং মতাদর্শিক। বক্ষমাণ প্রবন্ধে ডারউইনবাদের বাস্তবতা পর্যালোচনা করব এবং এর পিছনের রাজনৈতিক এজেন্ডার অনুসন্ধান করব ইনশাআল্লাহ। যাতে নতুন প্রজন্ম এই মতবাদের আক্বীদাগত আঘাত-পরাঘাত থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে।

প্রাককথন :

আমরা জানি যে, বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি হ’ল পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ ও পুনরুৎপাদনযোগ্যতা। অথচ ডারউইনবাদের মূল দাবী হ’ল ‘অন্ধ প্রাকৃতিক নির্বাচন’ ও ‘হঠাৎ রূপান্তরের’ মাধ্যমে কোটি কোটি প্রজাতির উদ্ভব, যা কোন প্রকার প্রত্যক্ষ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবুও ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে এই অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে সার্বজনীন সত্য হিসাবে সারাবিশ্বে প্রচার করা হয়েছে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, ডারউইনবাদ বিজ্ঞানের তত্ত্ব নয় বরং নাস্তিক্যবাদী বস্ত্তবাদের একটি সুপরিকল্পিত মতাদর্শিক প্রকল্প।

আশ্চর্যের বিষয় যে, আধুনিক যুগে ২০১৪ সালে বিবর্তনবাদের সপক্ষে প্রকাশিত হয় জেরুযালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউভাল নাওয়াহ হারিরি (জন্ম ১৯৭৬)-এর লিখিত Sapiens: A Brief History of Humankind (স্যাপিয়েন্স: মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস)। এই বইটিকে হারিরি পূর্ণভাবে ডারউইনবাদ প্রচারের মাধ্যম বানিয়েছেন এবং দ্বিধাহীনভাবে প্রচার করেছেন যে, মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মতোই বিবর্তনের ফল। তার সৃষ্টির পিছনে কোন ঐশ্বরিক পরিকল্পনা বা বিশেষ উদ্দেশ্য নেই। ৭০ হাযার বছর আগেও মানুষ ছিল প্রাণীজগতের আর দশটা প্রাণীর মত সাধারণ একটি প্রাণীই (An Animal of No Significance)। বর্তমান মানুষের মানুষ হয়ে ওঠা, তার মন-মগজের বিকাশ ও সমাজ-সংস্কৃতি সবকিছুই এক জৈবিক বিবর্তনের ফসল। এতে সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহর কোন হাত নেই। বরং মানুষই নিজের মানসিক প্রশান্তির প্রয়োজনে আল্লাহ, জান্নাত, জাহান্নামের ধারণা সৃষ্টি করেছে (নাঊযুবিল্লাহ)

তার মতে, বর্তমান মানবজগতের বিকাশ হয়েছে তিনটি বিপ্লবের মাধ্যমে। ১. (Cognitive Revolution), যা প্রায় ৭০ হাযার বছর আগে মানুষের ইতিহাসের ভিত্তি স্থাপন করে। এরপর বিকাশ ঘটে কৃষিভিত্তিক বিপ্লবের (Agricultural Revolution), যা প্রায় ১২ হাযার বছর আগে মানুষের ইতিহাসকে দেয় নতুন গতি। সবশেষে, মাত্র ৫০০ বছর আগে সূচনা হয় বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের (Scientific Revolution)। এভাবেই নাকি মানুষ একটি সাধারণ প্রাণী থেকে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসাবে বিবর্তিত হয়েছে, যার নাম দেয়া হয়েছে Homo (মানুষ) Sapiens (জ্ঞানী)।[2]

এই বইটিকে সর্বোচ্চ একটি রূপকথার কল্পকাহিনী (Fairy story) হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারত। কিন্তু অত্যাশ্চর্যের বিষয় হ’ল বস্ত্তবাদী নাস্তিক্যবাদী দর্শন প্রচারক এই সাধারণ বইটি ২০১৪ সালে প্রথম প্রকাশের পর থেকে অদ্যাবধি মোট ৫০ মিলিয়নেরও বেশী কপি বিক্রি হয়েছে এবং ৬৫টিরও বেশী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।[3] আরো মজার বিষয় যে, সমকামী এই ইহুদী লেখক এই একটি বইয়ের মাধ্যমেই রাতারাতি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী জনবুদ্ধিজীবী হিসাবে পরিচিত হয়েছেন! তার এই বিশ্বজোড়া সাফল্যের মূল চাবিকাঠি কি এটাই যে, তিনি ডারউইনবাদকে এক রোমাঞ্চকর ‘সেক্যুলার মহাকাব্য’ আকারে সর্বশ্রেণীর পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন! আর এজন্যই বোধহয় তার বইটি প্রচারের জন্য পশ্চিমা নাস্তিক্যবাদী মিডিয়া ও গ্লোবালিস্ট এলিট বারাক ওবামা, বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গ প্রমুখ ব্যক্তিরা এত ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং মিডিয়াতে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বর্তমান যুগের নব্য-নাস্তিক্যবাদের অন্যতম প্রধান মুখ রিচার্ড ডকিন্স (জন্ম : ১৯৪১খৃ.), স্যাম হ্যারিস (জন্ম : ১৯৬৭) বইটিকে অত্যন্ত বৈপ্লবিক এবং মেধাভিত্তিক কাজ বলে উল্লেখ করেছেন। ডকিন্সের মতে, এখানে রয়েছে মানবজাতির এক বিস্তৃত ও চিন্তার খোরাক জোগানো ইতিহাস... ’স্যাপিয়েন্স’ আমাদের প্রজাতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি উপহার দেয় (Sapiens gives us a whole new perspective on our species)।[4]

তারা যেন এই বইটিকে ধর্মহীন পৃথিবীর ‘নতুন বাইবেল’ হিসাবে ব্যবহার করছে, যাতে সাধারণ পাঠক কোন প্রকার প্রশ্ন ছাড়াই ডারউইনবাদকে মানব ইতিহাসের একমাত্র সত্য হিসাবে গিলে নেয়।

মূলত মার্কস যেমন তার সমাজতান্ত্রিক মতবাদের ভিত্তি হিসাবে ডারউইনবাদকে গ্রহণ করেছিলেন, তেমনি নাস্তিকরাও ডারউইনের মতবাদকে ধর্মের বিরুদ্ধে তাদের প্রধান অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছে। ডকিন্সের ভাষায়, ডারউইন ‘বৌদ্ধিকভাবে পরিতৃপ্ত নাস্তিক’ হওয়াকে সম্ভব করেছেন (Darwin made it possible to be an intellectually fulfilled atheist)।[5]

ডারউইন আসলে কী ভেবেছিলেন!

আজকের নব্য-নাস্তিকরা ডারউইনকে যেভাবে নিজেদের ‘ধর্মহীনতার পোস্টার বয়’ বানিয়েছেন, ডারউইন নিজে কি তেমন ছিলেন? তার নিজস্ব চিঠিপত্র ও আত্মজীবনী ঘাটলে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। বাস্তবে তিনি নিজে কোন উগ্র নাস্তিক ছিলেন না; বরং নিজের তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা ও ঈশ্বর ভাবনা নিয়ে সারাজীবন গভীর দোলাচলে ভুগেছেন। তিনি নিজেকে কখনও ‘নাস্তিক’ বলেননি। তিনি প্রথম জীবনে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন ধর্মতত্ত্ব নিয়ে, পাদ্রি হওয়ার উদ্দেশ্যে।[6] পরবর্তীতে ধর্মবিশ্বাস থেকে দূরে সরলেও ১৮৭৯ সালে জন ফর্ডাইসকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি স্পষ্ট লেখেন, ‘আমার মানসিকভাবে কখনো ঈশ্বরকে অস্বীকার করার মতো নাস্তিক্যবাদী প্রবণতা ছিল না... আমি মনে করি, আমার মানসিক অবস্থার সবচেয়ে সঠিক বর্ণনাকারী শব্দ হ’ল আমি একজন ‘অজ্ঞেয়বাদী’ (Agnostic)।[7]

তিনি নিজের মতবাদ নিয়েও তিনি ভয়াবহ দ্বিধা ও সংশয়ে ছিলেন। প্রকৃতিতে মানুষের চোখের মতো অতি-জটিল অঙ্গ কেবল ‘অন্ধ সুযোগে’ তৈরি হওয়া সম্ভব কি-না, তা নিয়ে ডারউইন ১৮৬০ সালে তার বন্ধু অ্যাসা গ্রেকে লেখা চিঠিতে স্বীকার করেছিলেন, ‘আজও চোখের জটিলতার কথা চিন্তা করলে আমার শরীরে ঠান্ডা শিহরণ বয়ে যায় (gives me a cold shudder)’[8]

অনুরূপভাবে ১৮৮১ সালে উইলিয়াম গ্রাহামকে লেখা চিঠিতে ডারউইন নিজের তত্ত্বের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘আমার মনে সর্বদা এক ভয়াবহ সংশয় জাগে, যদি মানুষের মস্তিষ্ক পশুর মস্তিষ্ক থেকে বিবর্তিত হয়ে থাকে, তবে মানুষের মস্তিষ্কের অর্জিত কোন বিশ্বাস বা অনুভূতির আদৌ কি কোন নির্ভরযোগ্যতা আছে? কোন নিম্নমানের প্রাণীর মস্তিষ্কে যদি কোন চিন্তা আসে, তবে কি কেউ তা বিশ্বাস করবে?’।[9]

অর্থাৎ ডারউইন নিজেই বুঝেছিলেন যদি মানুষের মন কেবলই সাধারণ পশুর মস্তিষ্কের বিবর্তিত রূপ হয়, তবে তার নিজের ‘বিবর্তন’ তত্ত্বটিও তো সেই পশুমস্তিষ্কেরই ফসল! তাহ’লে এর সত্যতার চূড়ান্ত ভিত্তি কী?

সর্বোপরি ডারউইন মূলত একজন প্রকৃতিবিজ্ঞানী (naturalist) ছিলেন। তার প্রধান লক্ষ্য ছিল, প্রজাতির বৈচিত্র্য ও পরিবর্তনকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা। ‘প্রতিটি প্রজাতি আলাদাভাবে সৃষ্ট’ এই ধারণার বিপরীতে একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া (Natural Selection) দেখানো। তিনি চেয়েছিলেন প্রকৃতি ‘কিভাবে’ কাজ করে তা বোঝা। প্রকৃতি ‘কেন’ করে বা সবকিছুর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কি সেসব দার্শনিক বা ধর্মীয় প্রশ্ন তার গবেষণার বিষয় ছিল না।

তবে প্রকৃতিতে মানুষের যন্ত্রণা, কষ্ট এবং সম্পদের অপচয় দেখে তিনি ‘দয়ালু ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর’ ধারণা সম্পর্কে সন্দেহগ্রস্ত হন। এর ধারাবাহিকতায় প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবজগতের একধরনের ব্যাখ্যা পেয়ে তিনি ‘প্রতিটি প্রজাতি আলাদাভাবে আল্লাহর সৃষ্টি’- এই বিশ্বাস থেকে দূরে সরে যান। সেই সাথে তাঁর কন্যা অ্যানির মৃত্যুও তার ধর্মীয় বিশ্বাসকে আরও নাড়া দেয়। ফলে তার সংশয়ী মনের ধারণা জন্মে যে, চূড়ান্ত প্রশ্নগুলো (সৃষ্টির শুরু, উদ্দেশ্য ইত্যাদি) মানব যুক্তির সীমার বাইরে। অতএব এসবের অনুসন্ধান অপ্রয়োজনীয়।[10]

ডারউইনবাদের মূল কথা :

চার্লস রবার্ট ডারউইন (১৮০৯-১৮৮২) ছিলেন একজন ব্রিটিশ প্রকৃতিবিজ্ঞানী। যিনি দক্ষিণ আমেরিকা ও গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ পরিভ্রমণ করে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁর দু’টি প্রধান গ্রন্থ On the Origin of Species (১৮৫৯) এবং The Descent of Man (১৮৭১) পশ্চিমা সভ্যতাকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে দেয়।[11] অন দ্য অরিজিন অফ স্পেশিস নামে চার্লস ডারউইনের এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৮৫৯ সালে। তার এই গ্রন্থে তিনি বিবর্তনবাদকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছেন, ‘এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে কোন প্রাণী ক্রমাগত অভিযোজনের ফলে আপন পরিবেশের জন্যে বিশেষায়িত হ’তে হ’তে এক সময় নতুন একটি প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়’। তার তত্ত্বের মূল কথা হ’ল, মানুষ বিশেষ কোন সৃষ্টি নয় বরং বানরের মত এক ধরনের প্রাণী থেকে ক্রমবিকাশের মাধ্যমে বিবর্তিত একটি বুদ্ধিমান প্রাণী। তার মতবাদের মূল কথাগুলো নিম্নরূপ :

১. প্রাকৃতিক নির্বাচন ও যোগ্যতমের জয়লাভ (Natural Selection & Survival of the Fittest) : ডারউইনবাদের প্রথম কথা হ’ল, পরিবেশের সাথে যে প্রাণী বেশী মানানসই, সে বেশী বংশবিস্তার করে। এই প্রক্রিয়ায় দুর্বল প্রজাতি বিলুপ্ত হয়, শক্তিশালী প্রজাতি টিকে থাকে।[12] ডারউইনের মতে, প্রকৃতিতে সম্পদগুলো (খাদ্য, বাসস্থান) সীমিত, কিন্তু প্রাণীর সংখ্যা ও তার বংশবৃদ্ধির হার অনেক বেশী। ফলে টিকে থাকার জন্য প্রাণীদের মধ্যে একটি নীরব প্রতিযোগিতা বা অস্তিত্বের সংগ্রাম শুরু হয়। এ সকল জীবের মধ্যে যাদের ভেতর আকস্মিকভাবে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য তৈরী হয় যা পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে, প্রকৃতি তাদেরকেই টিকিয়ে রাখে এবং বংশবৃদ্ধির সুযোগ দেয়। আর যারা খাপ খাওয়াতে পারে না, তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইংরেজ দার্শনিক হার্বার্ট স্পেন্সারের ভাষায় একেই বলা হয় ‘যোগ্যতমের জয়লাভ’ (Survival of the Fittest)।[13]

২. সাধারণ পূর্বপুরুষ বা এক-পূর্বপুরুষবাদ (Common Descent) : পৃথিবীর সকল জীব একটিমাত্র সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছে। ডারউইনের দাবী হ’ল, পৃথিবীর কোটি কোটি প্রজাতি পৃথকভাবে বা স্বাধীনভাবে সৃষ্টি হয়নি। বরং একটিমাত্র আদি সরল একযোগীয় এককোষী জীব (Single Common Ancestor) থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে কোটি কোটি বছর ধরে আজকের সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীর উৎপত্তি হয়েছে।[14] তিনি জীবজগৎকে একটি বিশালাকার ‘জীবন-বৃক্ষ’ (Tree of Life)-এর সাথে তুলনা করেন, যার মূল বা কান্ড একটিই, কিন্তু শাখা-প্রশাখা থেকে জিনের আবিষ্কার হয়নি। ডারউইন কেবল দেখেছিলেন যে, একই নতুন নতুন প্রজাতির জন্ম হয়েছে।

৩. আকস্মিক বা অন্ধ প্রকরণ (Random Variation & Mutation) : ডারউইনবাদের অন্যতম ভিত্তিমূলক দাবী হ’ল, ডিএনএ বা জিনের এলোমেলো পরিবর্তন প্রাণীদের মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি করে। ডারউইনের যুগে ডিএনএ বা পিতামাতার সন্তানদের মধ্যে সূক্ষ্ম শারীরিক পার্থক্য বা বৈচিত্র্য থাকে, যাকে তিনি Random Variation (এলোমেলো প্রকরণ) বলতেন। পরবর্তীকালে নব্য-বিবর্তনবাদীরা (Neo-Darwinists) জিনতত্ত্বের (Genetics) আবিষ্কারের পর এটিকে ডারউইনবাদের সাথে যুক্ত করে নাম দেয় Random Mutation (আকস্মিক রূপান্তর)। তাদের দাবী, ডিএনএ অনুলিপি করার সময় ভুলবশত বা এলোমেলোভাবে ঘটা মিউটেশনই প্রাণীর মধ্যে নতুন নতুন শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরির মূল ইঞ্জিন।

৪. মানুষ বানরজাতীয় পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত (Human Evolution from Ape-like Ancestors) : ডারউইনবাদের মূল অনুসিদ্ধান্ত হ’ল, মানুষ পৃথক কোন প্রজাতি নয়; বরং বানরজাতীয় পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত। The Descent of Man-এ তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন মানুষ আফ্রিকান এপ-জাতীয় প্রাণী থেকে বিবর্তিত। ১৮৫৯ সালে On the Origin of Species প্রকাশের সময় ডারউইন মানুষের বিবর্তন নিয়ে সরাসরি খুব বেশী কথা বলেননি। কিন্তু ১৮৭১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিতর্কিত গ্রন্থ The Descent of Man-এ তিনি স্পষ্টভাবে দাবী করেন যে, মানুষ কোন বিশেষ সৃষ্টি নয়। মানুষ, শিম্পাঞ্জি, গরিলা ও ওরাংওটাং এরা সবাই আফ্রিকান এক প্রাচীন বানরজাতীয় বিলুপ্ত প্রজাতি (Common Primate Ancestor) থেকে আলাদা আলাদা শাখায় বিবর্তিত হয়েছে। মানুষ উক্ত প্রাণীসমূহেরই সমগোত্রীয় একটি প্রাণী।

ডারউইনবাদের অসারতা :

আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারসমূহ ডারউইনবাদের ভিত্তিমূলকে চুরমার করে দিয়েছে। যদিও ডারউইনের বই প্রকাশিত হওয়ার ১০ বছর পর যখন গ্রেগর মেন্ডেল তার The Laws of Genetics (1866)-এ প্রজনন শাস্ত্র (Genetics) বা জীবনের বংশানুক্রমিকতা সম্পর্কিত গবেষণাটি প্রকাশ করেন তখনই ডারউইনের মতবাদের অন্তঃসারশূন্যতা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল। মেন্ডেল প্রমাণ করেছিলেন যে, বংশানুক্রমিক বস্ত্তর বিশেষ একক (Unit) জিন যেমন নির্দিষ্ট, তেমনি তা মিশ্রণ অযোগ্য। অর্থাৎ এক প্রজাতির জিন অন্য প্রজাতির জিন-এ রূপান্তরিত বা সংক্রমিত হ’তে পারে না। তা বংশানুক্রমিক সংক্রমণে মূলতঃ পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র এবং নিজস্ব কোষের কেন্দ্রবিন্দুতে বন্দী।[15] তবে ১৯৩০ হ’তে ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত মেন্ডেলের ‘জেনেটিক্সে’র সাথে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনে’র সিনথেসিস করে তথাকথিত Synthetic Theory বা বিবর্তনের নব্য ডারউইন তত্ত্ব তৈরী করা হয়’, যা Neo-Darwinism বা ‘নব্য ডারউইনবাদ’ নামে খ্যাত হয়েছে। এর মাধ্যমে ডারউইনবাদীরা আবার উঠে দাঁড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে।[16]

ডারউইনের তত্ত্ব বোঝার আগে একটি মূলনীতি মনে রাখতে হবে যে, তিনি স্বল্প পর্যবেক্ষণ এবং সামান্য কিছু তথ্য থেকে বিশাল মহা দাবীতে লাফ দিয়েছেন। তার তত্ত্ব মূলত বিজ্ঞান নয়, বরং একটা দর্শন। তিনি পরীক্ষিত তেমন কোন প্রমাণ উপস্থাপন করেননি, বরং নিজের ব্যক্তিগত ধারণার কথাই বারাংবার উল্লেখ করেছেন। যেমন ডারউইনের বইয়ের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বৃটিশ বিজ্ঞানী L. M. Davies তত্ত্বটি সম্পর্কিত অনুমানের প্রায় ৮০০টি উদাহরণ গুনে বের করেছিলেন, যেখানে ‘যদি’, ‘হ’তে পারে’, ‘হয়তো’, ‘সম্ভবত’, ‘হ’তেও পারে’, ‘পারে’, ‘ভাবা যেতে পারে’-র মতো শব্দ এবং প্রচুর কাল্পনিক উদাহরণ ব্যবহার করা হয়েছে।[17] আমরা এখানে তার সেসব অনুমানমূলক দাবীগুলো খতিয়ে দেখব এবং বাস্তবতা যাচাই করার চেষ্টা করব।

১. প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব পর্যালোচনা :

ডারউইনের প্রধান দাবী হ’ল, পরিবেশের সাথে যে প্রাণী বেশী মানানসই, সে বেশী বংশবিস্তার করে। দুর্বল বৈশিষ্ট্যগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়, শক্তিশালী বৈশিষ্ট্যগুলো পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়াতেই নাকি কোটি বছরে একটি মাত্র পূর্বপুরুষ থেকে পৃথিবীর সকল জীব তৈরী হয়েছে। এক্ষেত্রে তার প্রমাণ হ’ল, গ্যালাপাগোস দ্বীপের ফিঞ্চ পাখির ঠোঁটের আকার পরিবর্তন, অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া, কুকুরের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে বৈচিত্র্য ইত্যাদি। সন্দেহ নেই যে, এগুলো বাস্তবে বিবর্তনের কিছু প্রমাণ উপস্থাপন করে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন অণু-বিবর্তন (Micro-evolution)। এটি একটি প্রজাতির ভেতরকার পরিবর্তন, যা পর্যবেক্ষণযোগ্য এবং অনুধাবনযোগ্য। কিন্ত এক প্রজাতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতিতে রূপান্তর, যেমন সরীসৃপ থেকে পাখি হওয়া, মাছ থেকে উভচর হওয়া, বানরজাতীয় প্রাণী থেকে মানুষ হওয়া এটা কখনোই পর্যবেক্ষণ করা হয়নি, পরীক্ষাগারে পুনরায় তৈরী করা যায়নি। ৪০০ মিলিয়ন বছরের ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষায়ও প্রজাতি পরিবর্তন হয়নি।[18]

অথচ ডারউইন Micro-evolution-এর এই অতি সীমিত পর্যবেক্ষণ থেকে প্রমাণহীনভাবে বিশাল মহাদাবী করে বসেছেন যে, ব্যাকটেরিয়া থেকে মানুষ পর্যন্ত সকল জীব এই একই প্রক্রিয়ায় তৈরী। এটাকে বলা হয় মহা-বিবর্তন (Macro-evolution)। এভাবে তিনি অণু-বিবর্তনের প্রমাণ দেখিয়ে মহা-বিবর্তন প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। এটা ঠিক এরকম যুক্তির মত যে, ‘আমি দেখেছি মানুষ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে পারে, সুতরাং মানুষ চাঁদেও যেতে পারে।’ প্রথমটা সত্য, কিন্তু সেটা মোটেই দ্বিতীয়টার প্রমাণ বহন করে না।

বাস্তবে কালক্রমে ফিঞ্চ পাখির ঠোঁট পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ফিঞ্চ পাখি ফিঞ্চই থাকে, অন্য কোন পাখিও হয় না, কোন সরীসৃপ হয় না। কুকুর থেকে শাখা-প্রশাখা হিসাবে বিচিত্র প্রজাতি আসে কিন্তু কুকুর কুকুরই থাকে, অন্য কোন প্রাণী হয় না। অর্থাৎ প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রজাতির মধ্যে বৈচিত্র্য আনে, কিন্তু প্রজাতির মধ্যে রূপান্তর আনে না। পৃথিবীর কোন বিজ্ঞানী এমন কোন বাস্তব প্রমাণ দেখাতে পারেননি যে, কোন প্রাণীর এক প্রজাতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতিতে রূপান্তর (Macro-evolution) হয়েছে। এরকম কখনোই ঘটেনি, ঘটার ধারে-কাছেও যায়নি এবং কখনও ঘটার সম্ভবনাও নেই।[19]

অথচ নব্য ডারউইনবাদীরা এই তত্ত্ব নিয়েই মূলত তাদের যুক্তি খাড়া করে থাকে।[20] বাস্তব কোন প্রমাণ না দেখাতে পেরে তারা বলে যে, ‘মহা-বিবর্তন কোটি বছরে হয়েছে, তাই দেখা যাচ্ছে না’। কিন্তু এই যুক্তি বৈজ্ঞানিকভাবে মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। যে তত্ত্ব নীতিগতভাবে পরীক্ষাযোগ্য নয়, সেটা তাদের মতেই বিজ্ঞান নয়; বরং ভ্রান্ত ধারণা আর অপবিজ্ঞান মাত্র। তারপরও এই অপ্রমাণিত তত্ত্ব বিশ্বের প্রতিটি পাঠ্যক্রমে স্থান পেয়েছে, ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের সন্তানদের কচি মাথায়। এটা কখনও বিজ্ঞানচর্চা নয়; বরং নাস্তিক্যবাদী সেক্যুলার মতাদর্শিক প্রতারণার এক নতুন রূপ।

দ্বিতীয়তঃ প্রাকৃতিক নির্বাচন কেবল পূর্ব থেকে বিদ্যমান কোন দুর্বল প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটাতে পারে, কিন্তু নতুন কোন জটিল শারীরিক কাঠামো বা নতুন জিনোম তৈরি করতে পারে না।[21] এজন্য জীববিজ্ঞানী হুগো ডি ভ্রিজ গত শতকের শুরুতেই বলেছিলেন, ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’-এর এই তত্ত্ব যোগ্যতমদের টিকে থাকা (Survival of the Fittest) ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু যোগ্যতমদের আগমন (Arrival of the Fittest) ব্যাখ্যা করতে পারে না’।[22]

তৃতীয়তঃ প্রাকৃতিক নির্বাচন নতুন কোন তথ্য তৈরী করতে পারে না। এমনকি বিদ্যমান জিনগুলো থেকে বাছাই করে একটিমাত্র নতুন জিন বা নতুন তথ্য সৃষ্টি করার ক্ষমতাও তার নেই। এটা ডারউইনবাদের একটি মৌলিক দুর্বলতা।

বর্তমান শতাব্দীতে কেমব্রিজের প্রোটিন ইঞ্জিনিয়ারিং কেন্দ্রের গবেষক বায়োকেমিস্ট ডগলাস অ্যাক্স Journal of Molecular Biology-তে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী গবেষণায় এই অসম্ভাব্যতা গণিতের ভাষায় প্রমাণ করেছেন। তাঁর উপসংহার ছিল অকপট। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি নতুন জিন, প্রতিটি নতুন প্রোটিন ফোল্ড... কোন কিছুই ধারাবাহিক বিবর্তনের পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে বলে আমরা দেখাতে পারি না।

এটা সবই মরীচিকা।’[23]

এই কথাগুলো বোঝার জন্য প্রোটিন সম্পর্কে সামান্য ধারণা দরকার। প্রোটিন হ’ল জীবনের মূল কর্মী। শরীরের প্রতিটি কাজ, হজম, শ্বাসক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধ, জিনের পাঠোদ্ধার ইত্যাদি প্রোটিন সম্পন্ন করে। প্রোটিন তৈরী হয় অ্যামিনো অ্যাসিডের শৃঙ্খল দিয়ে। পৃথিবীতে ২০ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড আছে। এই ২০টি উপাদান বিভিন্ন ক্রমে সাজিয়েই তৈরী হয় প্রতিটি প্রোটিন। কিন্তু প্রোটিন শুধু শৃঙ্খল হ’লেই হয় না তাকে একটি নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক আকারে ভাঁজ হ’তে হয় (Protein Fold)। এই ভাঁজ না হ’লে প্রোটিন কোন কাজ করতে পারে না। আর ২০টি অ্যামিনো অ্যাসিডের ১৫টি থেকে ২০০টির শৃঙ্খলে সম্ভাব্য সংমিশ্রণের সংখ্যা এতই বিশাল যে, পৃথিবীর বয়স ও মিউটেশনের হারের সাপেক্ষে এলোমেলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কোন কার্যকর প্রোটিন ফোল্ডে পৌঁছানো অসম্ভব।

অ্যাক্স তাঁর গবেষণায় পরিসংখ্যান দিয়ে গাণিতিকভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, পৃথিবীর সমগ্র ইতিহাসে এলোমেলো প্রক্রিয়ায় একটিমাত্র কার্যকর প্রোটিন ফোল্ড পর্যন্ত তৈরী হওয়ার সম্ভাবনাও যদি খোঁজা হয়, তবে সে সম্ভাবনা কার্যত শূন্য। অথচ ডারউইনবাদ যুক্তিহীন ধারণার ভিত্তিতে বলছে এভাবেই নাকি লক্ষ লক্ষ প্রোটিন তৈরী হয়েছে। অথচ ঝড় এলে বাতাসে এলোমেলোভাবে একটি বোয়িং ৭৪৭ তৈরী হওয়ার সম্ভাবনা যেমন শূন্য, সম্পূর্ণ নতুন প্রোটিন ফোল্ড নিছক মিউটেশনে তৈরী হওয়াও তেমনই অসম্ভব। কারণ সর্বনিম্ন জীবনের জন্যও প্রায় ৫০০ ধরনের প্রোটিন একসাথে প্রয়োজন।[24]

বিবর্তনবাদীরা জিন পুনর্মিলন (Gene Recombination) তত্ত্বের মাধ্যমে বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে, সমধর্মী প্রোটিনগুলো পুনর্মিলনের সুযোগ আছে এবং ইন্ট্রাজেনিক পুনর্মিলন নতুন প্রোটিন তৈরী করে যা কার্যকরীভাবে বৈচিত্র্যময়

এবং সঠিকভাবে ভাঁজ হওয়ার উচ্চ সম্ভাবনা আছে।[25]

কিন্তু অ্যাক্স ও মেয়ার স্পষ্টভাবে এর জবাব দিয়েছেন যে, ‘প্রোটিন বিবর্তন করতে পারে না। এক ধরনের ফোল্ড থেকে ভিন্ন ফোল্ডে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় যাওয়া সম্ভব নয়। পুনর্মিলন কেবল একই ধরনের প্রোটিনের মধ্যে প্রযোজ্য, সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্রোটিন ফোল্ড তৈরিতে নয়।’[26]

বিবর্তনবাদীরা আরো দাবী করে যে, প্রোটিন তৈরীর এই প্রক্রিয়া কোটি কোটি বছর সময়ের ব্যবধানে সম্পন্ন হয়েছে, তাই অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। অ্যাক্স এই যুক্তির সরাসরি জবাব দিয়েছেন, ‘ডারউইনবাদীরা সবসময় ‘গভীর সুদীর্ঘ সময়ের’ আশ্রয় নেন। আর এই কৌশলেই তারা মানুষকে বোকা বানানোর কাজটি করা যায়। কারণ মানুষ স্বভাবতই অনেক সংক্ষিপ্ত সময় নিয়ে ভাবে। মূলত কোটি বছর নয়, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বছর সময় দিলেও এই প্রক্রিয়া ঘটার কোন সম্ভাবনা নেই।[27]

সর্বোপরি নব্য-বিবর্তনবাদীরা বহু চেষ্টা করেও অ্যাক্সের পরিসংখ্যানের নির্ভুলতা চ্যালেঞ্জ করতে পারেননি। তারা বিভিন্নভাবে কেবল তার প্রাসঙ্গিকতা সীমিত করার চেষ্টা করেছেন এবং তথাকথিত সম্ভাবনার সূত্র দিয়ে মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নিছক কল্পনা ছাড়া বাস্তবে কোন পরীক্ষাগারে বা পর্যবেক্ষণে এর সম্ভাব্যতা প্রমাণিত হয়নি।

(ক্রমশঃ)

 

[1]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, বিবর্তনবাদ (রাজশাহী : হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ; ১ম প্রকাশ : ২০২০), পৃ. ৯।

[2]. ইউভাল নাওয়াহ হারিরি, সেপিয়েন্স মানুষের ইতিহাস, বঙ্গানুবাদ সম্পাদনা : মোস্তাক আহমেদ (১ম প্রকাশ : ২০১৯), পৃ. ১৮-২২।

[3]. https://en.wikipedia.org.

[4]. Making Sense Podcast (Episode 68: The Future of Humanity - March 2017).

[5]. Richard Dawkins, The Blind Watchmaker (New York: Norton, 1986).

[6]. https://bn.wikipedia.org/

[7]. Charles Darwin, Letter to John Fordyce, May 7, 1879. Darwin Correspondence Project, Letter no. 12041.

[8]. Charles Darwin, Letter to Asa Gray, April 3, 1860. Darwin Correspondence Project, Letter no. 2743.

[9]. Charles Darwin, Letter to William Graham, July 3, 1881. Darwin Correspondence Project, Letter no. 13230.

[10]. https://bn.wikipedia.org/

[11]. সেপিয়েন্স মানুষের ইতিহাস, পৃ. ১৮-২২।

[12]. Mayr, Ernst, One Long Argument: Charles Darwin and the Genesis of Modern Evolutionary Thought (Harvard University Press : 1991), pp. 36–48।

[13]. রাফান আহমেদ, হোমো স্যাপিয়েনস : রিটেলিং আওয়ার স্টোরি (ঢাকা : গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স, ২০২১) , পৃ. ৪২-৫০।

[14]. Darwin, Charles, On the Origin of Species (London: John Murray, 1859), Chapter 14, pp. 484.

[15]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, বিবর্তনবাদ, পৃ. ২১।

[16]. পূর্বোক্ত, পৃ. ১০।

[17]. মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, বিবর্তনবাদ ও সৃষ্টিতত্ত্ব (ঢাকা : খায়রুন প্রকাশনী, ৭ম প্রকাশ : ২০১১) , পৃ. ৩৪।

[18]. G.A Kerkut, Implications of Evolution (Oxford: Pergamon Press, 1960), p. 157.

[19]. হোমো স্যাপিয়েনস : রিটেলিং আওয়ার স্টোরি, পৃ. ৪২-৫০।

[20]. Luskin, Casey. Alleged Instances of Observed Speciation. Science and Culture Today, July 2016. অনলাইন: www.scienceandculture.com/2016/07/alleged_instanc/.

[21]. Stephen Jay Gould, The Episodic Nature of Evolutionary Change (New York: W.W. Norton, 1980), p. 182.

[22]. Hugo De Vries, Species and Varieties: Their Origin by Mutation (Chicago: Open Court Publishing, 1905), p. 825.

[23]. Douglas Axe, Estimating the prevalence of protein sequences adopting functional enzyme structures (London : Journal of Molecular Biology, 2004), 341(5), p. 1295-1315.

[24]. Douglas Axe, Undeniable: How Biology Confirms Our Intuition That Life Is Designed (2016 : HarperOne).

[25]. N.Tokuriki, & D. S. Tawfik, Protein dynamic evolvability: the role of conformational diversity (2009 : Science), 324(5924), p. 203-207; S. Ohno, Evolution by Gene Duplication (1970 : Springer-Verlag).

[26]. S. C. Meyer, Signature in the Cell: DNA and the Evidence for Intelligent Design (2009 : HarperOne).

[27]. Douglas Axe, Defending Douglas Axe on the Rarity of Protein Folds (Science and Culture Today, November 2023). ww.scienceandculture.com/2023/11/defending-douglas-axe-on-the-rarity-of-protein-folds.






ভুল সংশোধনে নববী পদ্ধতি (৩য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
দাঈদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সমাজে তার প্রভাব - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
রিয়া : কারণ ও প্রতিকার - ড. নূরুল ইসলাম
ইসলামে শিষ্টাচারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (২য় কিস্তি) - তানযীলুর রহমান - শিক্ষক, বাউটিয়া দাখিল মাদ্রাসা, রাজশাহী
যাকাত ও ছাদাক্বা - আত-তাহরীক ডেস্ক
ইসলামে পানাহারের আদব বা শিষ্টাচার - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
হজ্জ সফরে ধৈর্যের পরীক্ষা - ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন
প্রাক-মাদ্রাসা যুগে ইসলামী শিক্ষা (২য় কিস্তি) - আসাদুল্লাহ আল-গালিব (শিক্ষার্থী, ইংরেজী বিভাগ, ২য় বর্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
আশূরায়ে মুহাররম - আত-তাহরীক ডেস্ক
ব্রেলভীদের কতিপয় আক্বীদা-বিশ্বাস - মুহাম্মাদ নূর আব্দুল্লাহ হাবীব
কুরআন নিয়ে চিন্তা করব কিভাবে? (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
আরও
আরও
.