লক্ষ্যহীন গতানুগতিক নির্বাচন

জুলাই’২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এদেশের ঈমানদার জনগণ আশা করেছিল যে, দেশে ইসলামী খেলাফত কায়েমের সুযোগ তৈরী হবে। কিন্তু দীর্ঘ ১৯ মাস পরে দেখা যাচ্ছে পুনরায় সেই দলীয় রাজনীতির হিংস্র থাবা জাতির উপর চেপে বসছে। একদল ফ্যাসিস্ট যাওয়ার পর আরেকদল ফ্যাসিস্ট সামনে আসছে। ক্ষমতায় আসার আগেই চারদিকে শুরু হয়েছে চুরি-ডাকাতি, চাঁদাবাজি, হত্যা ও জ্বালাও-পোড়াও, দখল-পাল্টা দখল। কথিত ইসলামী দলগুলোও সমান গতিতে এগিয়ে চলেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরা সবচেয়ে বড় আবেগ সৃষ্টিকারী নেতা সিলেটের শাহ জালাল ও শাহ পরাণের মাযার যিয়ারত করে ‘নবী করীম (ছাঃ)-এর ন্যায়পরায়ণতায় দেশ চালাবো’ বলে ইলেকশন ক্যাম্পেইন শুরু করলেন। অথচ কে না জানে যে, কবরস্থ ব্যক্তি কিছুই শুনতে পায়না, দেখতেও পায়না, বুঝতেও পারেনা। অথচ তিনি জন্মসূত্রে আহলেহাদীছ পরিবারের সন্তান।

গণতন্ত্রের বিপরীতে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবী তোলার পরিবর্তে ইসলামী দলগুলো ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও ক্ষমতার হিস্যা’ লাভের জন্য মুখিয়ে আছে। জোট গড়া, জোট ভাঙ্গা, আসন ভাগাভাগি ইত্যাদি চিরাচরিত ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছে। মানব রচিত গণতন্ত্রের বিপরীতে আল্লাহ প্রেরিত ইসলামকে তারা পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি। অথচ আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো’ (বাক্বারাহ ২/২০৮)। বাতিলের সাথে এই আপোষকামিতা কি দেশে আদৌ কোন পরিবর্তন আনতে পারবে? নাকি এটি স্রেফ চেয়ারের পরিবর্তন?

ইসলাম কখনোই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনা। কিন্তু তাই বলে বাস্তবতার নামে আদর্শকে বিসর্জন দিতে বলেনা। সালাফে ছালেহীন অত্যাচারিত হয়েছেন, কারা নির্যাতিত হয়েছেন। কিন্তু অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি। তারা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেও সত্য উচ্চারণে পিছপা হননি। আজ যদি আমরা শুধু ‘এখন সময় নয়’ ‘পরিস্থিতি অনুকূলে নয়’ ইত্যাদি বলে পিছুটান দেই, তাহ’লে জাতির বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ বংশধর আমাদের কাছ থেকে কী শিক্ষা নেবে? আপোষহীন তাওহীদী অবস্থান, না কি শিরকের সাথে আপোষ? নিঃসন্দেহে নিরংকুশ তাওহীদী চেতনা ব্যতীত পরকালীন মুক্তি কখনোই সম্ভব নয়! আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিবেন এবং তার ঠিকানা হ’ল জাহান্নাম (মায়েদাহ ৭২)

কে না জানে যে, ‘গণতন্ত্রে জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস’। পক্ষান্তরে ইসলামে ‘আল্লাহ সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস’। ‘গণতন্ত্রে অধিকাংশের রায়ই চূড়ান্ত’। পক্ষান্তরে ‘ইসলামে অহি-র বিধানই চূড়ান্ত’। ‘গণতন্ত্রে আইনের প্রণেতা হলেন এমপি-মন্ত্রীগণ’। কিন্তু ‘ইসলামে বৈধ-অবৈধ এবং হালাল-হারামের মানদন্ড হ’ল কুরআন ও সুন্নাহ’। যার অভ্রান্ত বিধান পরিবর্তনের অধিকার জাতীয় সংসদ বা কোন মানুষের নেই। জানা আবশ্যক যে, ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর সামাজিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য হ’ল, নির্ভেজাল তাওহীদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে কিতাব ও সুন্নাতের যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন করা। এ আন্দোলনের অন্যতম মূলনীতি হ’ল- কিতাব ও সুন্নাতের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সকল সমস্যায় ইসলামকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে পরিগ্রহণ। যার অর্থ- পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আদেশ-নিষেধকে নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়ার ভিত্তিতে মুসলিম ঐক্য গড়ে তোলা এবং মুসলিম উম্মাহর সার্বিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

অন্যদিকে যারা বলেন ‘গণতন্ত্র’ শিরক কিন্তু ভোট দেওয়া জায়েয, কেননা তা আমানত মাত্র; তাদের জন্য সূরা নিসা ৮৫ আয়াতটিই যথেষ্ট। যেখানে আল্লাহ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ভাল কাজে সুফারিশ করে, তার জন্য তাতে একটি অংশ থাকে। আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজে সুফারিশ করে তার জন্য তাতে একটি অংশ থাকে। বস্ত্তত আল্লাহ সকল বিষয়ের উপর শক্তিমান’। এক্ষণে ভোট দেওয়া কি সুফারিশ নয়? ভোট প্রাপ্ত ব্যক্তি তার মেয়াদে যত পাপ করবে, তার একটি অংশ ভোট দাতার আমলনামায় যুক্ত হবে।

তাছাড়া এই সিস্টেমে নেতৃত্ব পরামর্শের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না, বরং নেতৃত্ব চেয়ে নিতে হয়। যা ইসলামে নিষিদ্ধ। পক্ষান্তরে ইসলামী খেলাফতে আল্লাহভীরু যোগ্য ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ পরামর্শের মাধ্যমে আল্লাহর বিধান মতে দেশ পরিচালিত হয়। নিকট অতীতে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ড. ফখরুদ্দীন আহমাদ মাত্র ১০ জন উপদেষ্টা নিয়ে দীর্ঘ প্রায় দু’বছর (২০০৭-২০০৯) নিরপেক্ষভাবে দেশ পরিচালনা করলেন। বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মাদ ইউনুস সীমিত সংখ্যক উপদেষ্টা নিয়ে নিরপেক্ষভাবে দেশ পরিচালনা করছেন। অনুরূপ নিরপেক্ষ শাসনের পরিবর্তে আমরা কেন গণতন্ত্র নামক দলতন্ত্রের শাসন বেছে নেব? নিঃসন্দেহে কোন দলীয় শাসন কখনোই নিরপেক্ষ প্রশাসন পরিচালনা করতে পারে না।

আববাসীয় খলীফা হারূণুর রশীদ-এর দরবারে জনৈক ইহূদী একদিন দরবারের দরজার মুখে দাঁড়িয়ে যায়। অতঃপর খলীফা বের হলে সে তাঁর সামনে গিয়ে বলে, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন! একথা শুনে খলীফা তার বাহন থেকে নামলেন ও সিজদায় পড়ে গেলেন। অতঃপর মাথা উঠিয়ে তিনি সভাসদগণকে তার প্রয়োজন মিটানোর নির্দেশ দেন ও সাথে সাথে তা পূরণ করা হয়। ফিরে আসার পর তাঁকে বলা হ’ল, একজন ইহূদীর জন্য আপনি বাহন থেকে নামলেন? জবাবে তিনি বললেন, না। বরং আমার মধ্যে আল্লাহর বাণী স্মরণ হ’ল। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘যখন তাকে বলা হয়, তুমি আল্লাহকে ভয় কর, তখন তার প্রতিপত্তির অহমিকা তাকে পাপে স্ফীত করে তোলে। অতএব তার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। আর নিশ্চয়ই সেটা কতই না নিকৃষ্ট ঠিকানা!’ (কুরতুবী, তাফসীর সূরা বাক্বারাহ ২০৬ আয়াত)

গণতান্ত্রিক বিজয়ে মানুষ অহংকারে স্ফীত হয়। বিরোধীকে নির্যাতন করে ও নিশ্চিহ্ন করার পাঁয়তারা করে। অর্থ ও অস্ত্র বলে বলিয়ান সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা আজ ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তীন এবং বর্তমানে ভেনেজুয়েলা, গ্রীণল্যান্ড ও ইরান দখলের কী অপচেষ্টাই না চালিয়ে যাচ্ছে! অথচ মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পাহারাদার জাতিসংঘ নির্বিকার। কেননা গণতন্ত্র তথাকথিত মানবাধিকার রক্ষার নামে চূড়ান্ত বিচারে মানুষকে মানুষেরই গোলাম বানায়। যার সম্পূর্ণ বিপরীত হল ইসলাম, যা মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে বের করে তাদের প্রতিপালক আল্লাহর গোলামীতে ফিরিয়ে নেয়। আর এটাই হল প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকার রক্ষার মূল হাতিয়ার, স্বাধীনতার মূল রক্ষাকবচ। ইসলামী খেলাফত সেই লক্ষেই পরিচালিত হয়।

অতএব আসুন, আমরা ইসলামপন্থীরা গণতান্ত্রিক নির্বাচনে কাউকে ‘মন্দের ভাল’ বলে সমর্থনের মাধ্যমে প্রকারান্তরে এই গণতান্ত্রিক সিস্টেমকে শক্তিশালী করা থেকে বিরত থাকি। ‘অধিকতর ক্ষতি থেকে বাঁচা’র নামে আত্মপ্রবঞ্চনা ও আপোষের নীতি পরিহার করি। সেই সাথে এদেশে বুকে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার পক্ষে জনমত সুসংহত করি। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন। আমীন! (স.স.)






সত্যদর্শন - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
তালেবানদের পুনরুত্থান ও আমাদের প্রত্যাশা - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
হে আল্লাহ! সৎ ও সাহসী নেতা দাও - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
ইরাকে মার্কিন হামলা : বিশ্ব বিবেক জেগে ওঠ - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
ওয়াহহাবী সংস্কার আন্দোলন - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
জবাবদিহিতার অনুভূতি - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
স্বাধীনতার মাসে অধীনতার কসরৎ - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আহলেহাদীছ কখনো জঙ্গী নয় - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
দিবস পালন নয়, চাই আদর্শের অনুসরণ - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
পিওর ও পপুলার - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
সত্যের সন্ধানী - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
ভালোবাসি - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আরও
আরও
.