ভূমিকা :
শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে পালিত হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর। এক মাস ছিয়াম সাধনার পর দয়াময় প্রতিপালকের কাছে প্রতিদান লাভের আশায় মুসলমানরা ঈদুল ফিতরের ছালাত আদায় করে। ধনী-দরিদ্র, বাদশাহ-ফকীর একই কাতারে দাঁড়ায়। ঈদুল ফিতরের দিনে ছাদাক্বাতুল ফিতর আদায় করা ও ঈদের ছালাত আদায় করা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাছাড়া এ মাসে নফল ছিয়াম পালন করার পাশাপাশি অন্যান্য আমল যেমন- দান-ছাদাক্বা করা, অসহায় ও দুর্বলদের সাহায্য করা, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করা, অসুস্থ মানুষের সেবা করা প্রভৃতি অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ আমল। মোটকথা এই মাস নফল ইবাদত-বন্দেগীর জন্য খুবই উপযোগী। এ মাসের করণীয় সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হ’ল।-
শাওয়ালের ছিয়ামের ফযীলত :
শাওয়ালের ছয়টি ছিয়ামের ফযীলত অত্যধিক। এর মাধ্যমে সারা বছর ছিয়াম পালনের ছওয়াব অর্জিত হয়। এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে, আবু আইয়ুব আনছারী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِئًا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ ‘যে ব্যাক্তি রামাযান মাসে ছিয়াম পালন করল, তারপর শাওয়াল মাসের ছয় দিন ছিয়াম পালন করল, ঐ ব্যক্তি যেন সম্পূর্ণ বছরই ছিয়াম পালন করল।[1] আরেকটি হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মুদাস ছাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ صَامَ سِتَّةَ أَيَّامٍ بَعْدَ الْفِطْرِ كَانَ تَمَامَ السَّنَةِ (مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا) ‘যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতরের পর ছয় দিন ছিয়াম রাখলো, তা পূর্ণ বছর ছিয়াম রাখার সমতুল্য। কেউ কোন সৎকাজ করলে, সে তার দশ গুণ পাবে’ (আন‘আম ১৬০)।[2] অন্যত্র তিনি আরো বলেন,جَعَلَ اللهُ الْحَسَنَةَ بِعَشَرَةِ فَشَهْرٌ بِعَشَرَةِ أَشْهُرٍ وَسِتَّةُ أَيَّامٍ بَعْدِ الْفِطْرِ تَمَامُ السَّنَةِ ‘আল্লাহ একটি নেক আমলকে দশগুণ করে দিয়েছেন, তাই এক মাস দশ মাসের সমান এবং ঈদুল ফিতরের পরের ছয় দিন ছিয়াম বছর পূর্ণ করে’।[3] অপর একটি হাদীছে এসেছে, ছাওবান (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, مَنْ صَامَ رَمَضَانَ فَشَهْرٌ بِعَشَرَةِ أَشْهُرٍ وَصِيَامُ سِتَّةِ أَيَّامٍ بَعْدِ الْفِطْرِ فَذَلِكَ تَمَامُ صِيَامِ السَّنَةِ ‘যে ব্যক্তি রামাযানের ছিয়াম পালন করল, তার এক মাস দশ মাসের সমান। আর (রামাযান শেষে) ছিয়াম ভাঙার পর ছয় দিন ছিয়াম রাখলে সারা বছরের ছিয়াম পূর্ণ হয়’।[4]
শাওয়ালের ছিয়ামের গুরুত্ব :
শাওয়ালের ছিয়াম অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ফরযের ত্রুটি ও ঘাটতি পূরণ হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ العَبْدُ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ صَلَاتُهُ، فَإِنْ صَلُحَتْ فَقَدْ أَفْلَحَ وَأَنْجَحَ، وَإِنْ فَسَدَتْ فَقَدْ خَابَ وَخَسِرَ، فَإِنْ انْتَقَصَ مِنْ فَرِيضَتِهِ شَيْءٌ، قَالَ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ: انْظُرُوا هَلْ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّعٍ فَيُكَمَّلَ بِهَا مَا انْتَقَصَ مِنَ الفَرِيضَةِ، ثُمَّ يَكُونُ سَائِرُ عَمَلِهِ عَلَى ذَلِكَ ‘নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের দিন বান্দার সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে তার ছালাতের। সুতরাং যদি তা সঠিক হয়, তাহ’লে সে সফল হবে, পরিত্রাণ পাবে। আর যদি তা নষ্ট-বরবাদ হয়, তাহ’লে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি তার ফরয (ইবাদতের) মধ্যে কিছু কম পড়ে যায়, তাহলে প্রভু বলবেন, দেখ তো! আমার বান্দার কিছু নফল (ইবাদত) আছে কি-না। তা দিয়ে ফরযের ঘাটতি পূরণ করা হবে। অতঃপর তার সমস্ত আমলের ক্ষেত্রেও ঐরূপ করা হবে’।[5]
এ ছিয়াম পরকালীন জীবনে জাহান্নাম থেকে মুক্তির অসীলা হবে। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,مَنْ صَامَ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللهِ بَعْدَ اللهُ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِينَ خَرِيفًا. ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় এক দিন ছিয়াম পালন করে, আল্লাহ তার মুখমন্ডলকে জাহান্নামের আগুন হ’তে সত্তর বছরের রাস্তা দূরে সরিয়ে নেন’।[6]
শাওয়াল মাসের ছিয়ামরাখার হুকুম :
রামাযানের ছিয়াম পালনের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি ছিয়াম রাখা। হাম্বলী ও শাফেঈ মাযহাবের ফকীহগণ স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, রামাযান মাসের পর শাওয়াল মাসে ছয়দিন ছিয়াম রাখা একবছর ফরয ছিয়াম পালনের সমান। তাছাড়া সাধারণ নফল ছিয়ামের ক্ষেত্রেও ছওয়াব বহুগুণ। কেননা এক নেকীতে দশ নেকী দেয়া হয়।[7]
একদল বিশেষজ্ঞ বিদ্বান শাওয়াল মাসের ছয় দিন ছিয়াম পালন করাকে মুস্তাহাব মনে করেন। ইবনুল মুবারাক বলেন, প্রতি মাসে তিন দিন ছিয়াম পালনের মত এটিও মুস্তাহাব। এ ছিয়াম রামাযানের ছাওমের পরপরই পালনের কথা কোন কোন হাদীছে উল্লেখিত হয়েছে। তাই তিনি এই ছয়টি ছিয়াম শাওয়াল মাসের শুরুর দিকে পালন করাকে অধিক পসন্দনীয় মনে করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, শাওয়াল মাসের ভিন্ন ভিন্ন দিনে ছিয়াম পালন করাও জায়েয।[8]
শাওয়ালের ছয়টি ছিয়ামের উপকারিতা :
শাওয়ালের ছয়টি ছিয়ামের নানা উপকারিতা রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হ’ল।-
১. শাওয়াল মাসের ছিয়ামকে ফরয ছালাতের আগে ও পরে নফল ছালাতের সাথে তুলনা করা যায়। এর দ্বারা ফরয ছিয়ামের যেকোন ত্রুটি বা ঘাটতি পূরণ হয়।[9]
২. রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত পালন হয়। আর নবী করীম (ছাঃ)-এর আদেশ ও নির্দেশনা মেনে চলার মাধ্যমে অধিক কল্যাণ এবং বহু উপকারিতা লাভ করা যায়।
৩. এ ছিয়াম পালনে আনুগত্যের পর আনুগত্য করা হয় এবং এটি রামাযানের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। কারণ আল্লাহ যদি কোন বান্দার আমল কবুল করেন, তবে তিনি তাকে তারপরে একটি ভাল আমল করার তাওফীক দান করেন। হাসান বছরী (রহঃ) বলেছেন, একটি ভাল কাজের প্রতিদান তার পরে একটি ভাল কাজ।[10] সুতরাং যে কেউ একটি ভাল কাজ করে এবং তার পরে অন্য একটি ভাল কাজ করে, এটি প্রথম ভাল কাজের গ্রহণযোগ্যতার লক্ষণ।
৪. শাওয়ালের ছয় দিন ছিয়াম রাখা রামাযানের ছিয়াম পূর্ণ করার সুযোগ দানের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। ছিয়াম হৃদয়কে পুনরুজ্জীবিত করে এবং শাওয়ালের ছয় দিন ছিয়াম রাখার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে বান্দার সংযোগকে শক্তিশালী করে।
৫. ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। ইবাদত কেবল একটি নির্দিষ্ট ঋতুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় যে, এরপরে ব্যক্তি ইবাদত ছেড়ে দেবে। বরং ইবাদত বান্দার সাথে তার জীবন জুড়ে চলতে থাকে এবং কবরে প্রবেশ না করা পর্যন্ত শেষ হয় না। বিশর আল-হাফী (রহঃ)-কে বলা হয়েছিল, এমন কিছু লোক আছে যারা রামাযানে ইবাদত করে ও কঠোর পরিশ্রম করে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, কত হতভাগ্য মানুষ যারা রামাযান মাস ছাড়া অন্য সময় আল্লাহর হক স্বীকার করে না! প্রকৃত সৎকর্মশীল ব্যক্তি হ’ল সেই যে সারা বছর ধরে ইবাদত করে ও কঠোর পরিশ্রম করে।[11]
শাওয়াল মাসের করণীয় :
১. নফল ছিয়াম পালন করা : রামাযান ছিল এক মহান মৌসুম, যা ভরপুর ছিল রহমত, মাগফিরাত এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির পসরা দিয়ে। আমরা দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদেরকে তাঁর দয়া, অনুগ্রহ এবং করুণার দ্বারা সৎকর্মশীলদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন। আমল কবুলের নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে, আমলকারীদের অবস্থার উন্নতি এবং আমলের সাথে আরো অধিক আমল করা। প্রত্যাখ্যানের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে রামাযানের পর বঞ্চনা এবং পুনরায় পিছিয়ে পড়া। এর অর্থ এই নয় যে শাওয়াল মাস রামাযানের মতো হবে, বরং রামাযান মাসের আমলের অনুসরণে নফল ছিয়াম পালন ও ক্বিয়ামুল লায়ল জারী রাখা কর্তব্য।
২. ইবাদত জারী রাখা : বান্দা আমৃত্যু আমল করে যাবে। মৃত্যু ব্যতীত আল্লাহ বান্দার আমল বন্ধের জন্য কোন সীমা নির্ধারণ করেননি। তিনি বলেন, وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ ‘আর তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত কর, যতক্ষণ না তোমার নিকট নিশ্চিত বিষয়টি (মৃত্যু) এসে যায়’ (হিজর ১৫/৯৯)। রামাযানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য রয়েছে। তাহ’ল রামাযানে মুমিনের আমল বৃদ্ধি পায়, কিন্তু রামাযানের পরে তা থেমে থাকে না।
৩. দান-ছাদাক্বা করা : রামাযানে অধিক দান-ছাদাক্বা করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় শাওয়াল মাসেও দান অব্যাহত রাখা কর্তব্য। দানের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন,وَأَقْرِضُوا اللهَ قَرْضًا حَسَنًا وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللهِ هُوَ خَيْرًا وَأَعْظَمَ أَجْرًا، ‘আর আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। বস্ত্ততঃ তোমরা নিজেদের জন্য যতটুকু সৎকর্ম অগ্রিম পাঠাবে, তোমরা তা আল্লাহর নিকটে পাবে। সেটাই হ’ল উত্তম ও মহান পুরস্কার’ (মুয্যাম্মিল ৭৩/২০)। তিনি আরো বলেন, وَأَنْفِقُوا مِنْ مَا رَزَقْنَاكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ ‘আর আমরা তোমাদেরকে যে রূযী দিয়েছি তা থেকে তোমরা (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর তোমাদের কারু মৃত্যু আসার আগেই’ (মুনাফিকূন ৬৩/১০)।
৪. খাদ্য খাওয়ানো : মাহে রামাযানে ছায়েমকে ইফতার করানো এবং ক্ষুধার্তকে খাদ্য দানের ন্যায় শাওয়াল ও অন্যান্য মাসেও এই ইবাদত অব্যাহত রাখা কর্তব্য। কারণ মুমিন পরকালীন মুক্তির জন্য খাদ্য দান করে থাকে। আল্লাহ বলেন, وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا، ‘তারা আল্লাহর মহববতে অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীদের আহার্য প্রদান করে। (তারা বলে) আমরা শুধুমাত্র আল্লাহর চেহারা কামনায় তোমাদেরকে খাদ্য দান করি। তোমাদের নিকট থেকে আমরা কোনরূপ প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না’ (দাহর ৭৬/৮-৯)। খাদ্য খাওয়ানোকে রাসূল (ছাঃ) ইসলামের উত্তম আমল গণ্য করেছেন। জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইসলামের কোন কাজটি উত্তম? উত্তরে তিনি বলেন,تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ ‘তুমি খাদ্য খাওয়াবে ও চেনা অচেনা সকলকে সালাম দিবে’।[12]
৫. দুস্থদের সাহায্য করা : অসহায় মানুষকে সাহায্য করা অত্যধিক নেকীর কাজ। যার কারণে আল্লাহর অনুগ্রহ ও নে‘মত লাভ করা যায়। রামাযানে যেভাবে মানুষকে সাহায্য করা হয়েছে, তেমনি শাওয়াল মাসেও করা কর্তব্য। রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِنَّ للهِ أَقْوَامًا اخْتَصَّهُمْ بِالنِّعَمِ لِمَنَافِعِ العِبَادِ، يُقِرُّهُمْ فِيهَا مَا يَبْذُلُونَهَا، فَإِذَا مَنَعُوهَا نَزَعَهَا مِنْهُمْ فَحَوَّلَهَا إِلى غَيْرِهِمْ ‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কল্যাণের জন্য কিছু লোককে নে‘মত দানের জন্য মনোনীত করেছেন। তিনি তাদের এই নে‘মতগুলি যতক্ষণ পর্যন্ত তারা দান করে ততক্ষণ অব্যাহত রাখার অনুমতি দেন। কিন্তু যদি তারা তা আটকে রাখে, তিনি তা কেড়ে নেন এবং অন্যদের দেন’।[13]
শাওয়াল মাস নবী করীম (ছাঃ)-এর জীবনের মহান ঘটনাবলীতে পরিপূর্ণ ছিল: প্রথম হিজরীর শাওয়াল মাসে: উবায়দাহ ইবনু হারিছ ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের রাবিগ উপত্যকায় অভিযান। এ মাসে মুহাজিরদের প্রথম সন্তান আব্দুল্লাহ ইবনে আল-জুবায়ের মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। এ মাসে নবী করীম (ছাঃ) আয়েশা (রাঃ)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হিজরতের দ্বিতীয় বছরের শাওয়াল মাসে বনু সুলায়মের অভিযান, বনু কায়নুকার অভিযান, এতে উমাইর ইবনে ওয়াহব এবং ছাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার দ্বারা নবী করীম (ছাঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র। হিজরতের তৃতীয় বছরের শাওয়াল মাসে ওহোদের অভিযান, হামরা আল-আসাদের অভিযান। হিজরতের পঞ্চম বছরের শাওয়াল মাসে খন্দক অভিযান। হিজরতের অষ্টম বছরের শাওয়াল মাসে হুনাইন অভিযান। হিজরতের দশম বছরের শাওয়াল মাসে প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে এসেছিল, তারা তাদের ইসলাম কবুল করেছিল এবং এই মাসে অন্যান্য বহু ঘটনা রয়েছে।
শাওয়াল মাসের সাথে সম্পর্কিত কিছু বিধান
১. শাওয়াল মাসে বিবাহ-শাদী : ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবরা শাওয়াল মাসে বিবাহ করাকে দুর্ভাগ্যজনক মনে করত। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এ মাসে স্ত্রীলোকরা তাদের স্বামীকে প্রত্যাখ্যান করবে, ঠিক যেমন উট করে থাকে। ইবনে মানযূর বলেন, রামাযানের পরবর্তী মাসের জন্য শাওয়াল একটি সুপরিচিত নাম এবং এটি হজ্জের প্রথম মাস। বলা হয় যে, উটের দুধ শুকিয়ে যাওয়ার কারণে এর নামকরণ করা হয়েছে।... আরবরা এই মাসে বিবাহ করাকে অশুভ বলে মনে করত। তারা বলত যে, এ মাসে বিবাহিতা মহিলা তার স্বামীকে প্রত্যাখ্যান করবে ঠিক যেমন উট গর্ভবতী অবস্থায় সঙ্গম করতে অস্বীকার করে। নবী করীম (ছাঃ) তাদের কুসংস্কারকে খন্ডন করেন।[14] হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: تَزَوَّجَنِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي شَوَّالٍ، وَبَنَى بِي فِي شَوَّالٍ وَكَانَتْ عَائِشَةُ تَسْتَحِبُّ أَنْ يُبْنَى بِنِسَائِهَا فِي شَوَّالٍ. আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, শাওয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বিয়ে করেছেন এবং বাসর রাতও শাওয়াল মাসেই হয়েছে। শাওয়াল মাসে আয়েশা (রাঃ) তার পরিবারের মেয়েদের জন্য বাসর উদ্যাপন করা পসন্দ করতেন।[15]
হাফেয ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন, শাওয়াল মাসে আয়েশা (রাঃ)-এর সাথে নবী করীম (ছাঃ)-এর বিবাহ কিছু লোকের ধারণাকে খন্ডন করে যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের ভয়ে দুই ঈদের মধ্যে বিয়ে করা অপসন্দনীয়। এটি ভিত্তিহীন।[16] অতএব শাওয়াল মাসে বিয়েকে দুর্ভাগ্যজনক মনে করা ঠিক নয়। কারণ এটা কুসংস্কার।
২. কাযা ই‘তিকাফ আদায় : রামাযানে কোন শারঈ কারণে ই‘তিকাফ ছুটে গেলে তার কাযা শাওয়াল মাসে আদায় করা যায়। আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) প্রতি রমাযানে ই‘তিকাফ করতেন। ফজরের ছালাত শেষে ই‘তিকাফের নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশ করতেন। তাঁর কাছে আয়েশা (রাঃ) ই‘তিকাফ করার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। আয়েশা (রাঃ) মসজিদে (নিজের জন্য) একটি তাঁবু করে নিলেন। হাফছাহ (রাঃ) তা শুনে (নিজের জন্য) একটি তাঁবু তৈরি করে নিলেন এবং যায়নাব (রাঃ)ও তা শুনে (নিজের জন্য) আরেকটি তাঁবু তৈরি করে নিলেন। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ফজরের ছালাতে শেষে এসে চারটি তাঁবু দেখতে পেয়ে বললেন, একী? তঁাকে তাদের ব্যাপার জানানো হ’লে তিনি বললেন, আমি মনে করি, নেক আমলের প্রেরণা তাদেরকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেনি। এসব খুলে ফেলো। সব খুলে ফেলা হ’ল। তিনি সেই রামাযানে আর ই‘তিকাফ করলেন না। পরে শাওয়াল মাসের শেষ দশকে ই’তিকাফ করেন’।[17]
৩. নফল ছিয়ামের কাযা আদায় : নিয়মিত আদায় করা পূর্ববর্তী কোন নফল ছিয়াম ছুটে গেলে তার কাযা শাওয়াল মাসে আদায় করা যায়। ইমরান ইবনু হুছায়ন (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম (ছাঃ) এক ব্যক্তিকে বললেন, তুমি কি এক মাসের অর্থাৎ শা‘বান মাসের মধ্যভাগে কিছু দিন ছিয়াম পালন করেছ? সে বলল, না। তিনি তাকে বললেন, রামাযানের ছাওম পালন শেষ করে তুমি একদিন বা দু’দিন ছাওম পালন কর’।[18] ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, مشرُوعِيَّةُ قضاءِ التَّطَوُّعِ ‘এই হাদীছটি নফল ছিয়াম কাযা করার বৈধতা প্রমাণ করে’।[19]
৪ শাওয়াল মাসে ওমরা পালন : ইসলামপূর্ব যুগে আরবের লোকেরা মনে করত যে, হজ্জের মাসগুলিতে ওমরাহ নিষিদ্ধ। কিন্তু হজ্জের মাসগুলিতে ওমরা করা জায়েয। ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা হজ্জের মাসগুলোতে ওমরাহ করাকে দুনিয়ার সবচেয়ে ঘৃণ্য পাপের কাজ বলে মনে করত। তারা মুহাররম মাসের স্থলে ছফর মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ মনে করত। তারা বলত, উটের পিঠের যখম ভাল হ’লে, রাস্তার মুসাফিরের পদচিহ্ন মুছে গেলে এবং ছফর মাস অতিক্রান্ত হ’লে ওমরাহ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি ওমরাহ করতে পারবে। নবী করীম (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীগণ হজ্জের ইহরাম বেঁধে (যুলহিজ্জাহ মাসের) চার তারিখ সকালে (মক্কায়) উপনীত হন। তখন তিনি তঁাদের এ ইহরামকে ওমরাহর ইহরামে পরিণত করার নির্দেশ দেন। সকলের কাছেই এ নির্দেশটি গুরুতর বলে মনে হ’ল (ওমরাহ শেষ করে) তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জন্য কী কী জিনিস হালাল? তিনি বললেন, সবকিছু হালাল (ইহরামের পূর্বে যা হালাল ছিল তার সবকিছু হালাল)।[20]
কাযা ছিয়াম কখন আদায় করবে?
শাওয়াল মাসের ছিয়াম আগে করাই কর্তব্য। কারণ শাওয়াল পার হ’লে ঐ মাসের ছিয়াম পালনের সুযোগ থাকে না। আর অসুস্থতা বা সফরের কারণে ছুটে যাওয়া ছিয়ামসমূহ পরবর্তীতে আদায় করতে হবে।[21] উক্ত ছিয়ামগুলি শাওয়াল মাসের ছয়টি ছিয়াম আদায় করার পরেও করতে পারে।[22] ব্যস্ততার কারণে আয়েশা (রাঃ) তাঁর রামাযানের ছুটে যাওয়া ছিয়াম পরবর্তী শা‘বান মাসে আদায় করতেন।[23] তবে ফরযের ক্বাযা যত দ্রুত সম্ভব আদায় করাই উচিৎ।[24]
শাওয়াল মাসের ছিয়াম শুক্রবারে রাখা যাবে কি?
কেবল শুক্রবারকে কেন্দ্র করে কোন নফল ছিয়াম রাখা জায়েয হবে না। কারণ শুক্রবারকে রাসূল (ছাঃ) ছিয়াম দ্বারা খাছ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, রাত্রিসমূহের মধ্যে জুম‘আর রাতকে ক্বিয়াম করার (নফল ছালাত পড়ার) জন্য নির্দিষ্ট করো না এবং দিনসমূহের মধ্যে জুম‘আর দিনকে (নফল) ছিয়াম রাখার জন্য নির্ধারিত করো না। তবে যদি তা তোমাদের কারো ছিয়াম রাখার তারিখে পড়ে যায়, তাহ’লে সে কথা ভিন্ন।[25] উল্লেখ্য যে, শুক্রবারে যদি কারো বিশেষ ছিয়ামের দিন পড়ে যায় যেমন আরাফার ছিয়াম, আশূরার ছিয়াম, শাওয়ালের বাকী থাকা ছিয়াম ইত্যাদি তাহ’লে সেদিনে ছিয়াম পালনে বাধা নেই।[26]
একই আমল একাধিক নিয়তে করা যাবে কি?
একই আমল একাধিক নিয়তে করা যায়। কেউ মাসিক আইয়ামে বীযের ৩দিন ও সাপ্তাহিক সোম ও বৃহস্পতিবারে দু’টি ছিয়ামের নিয়ত করে ছিয়াম পালন করলে উভয় ছিয়ামের ছওয়াব পেয়ে যাবে। অনুরূপভাবে কেউ তার রামাযানের ক্বাযা ছিয়ামগুলো আইয়ামে বীয বা সাপ্তাহিক ছিয়ামের দিনে পালন করলে ক্বাযা আদায়ের পাশাপাশি ঐ দিনগুলোর ছওয়াব পেয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। তবে শাওয়ালের ছয়টি ছিয়াম পালনকালে ক্বাযা আদায়ের নিয়ত করা যাবে না। কারণ শাওয়ালের ছিয়াম শাওয়াল মাসের মধ্যেই আদায় করতে হবে।[27]
পরিশেষে বলব, রামাযান পরবর্তী শাওয়াল মাসেও ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা কর্তব্য। নফল ছিয়াম, ক্বিয়ামুল লায়ল, দান-ছাদক্বা ইত্যাদি ইবাদত জারী রাখা উচিত। সেই সাথে সারা বছর ইবাদতে কাটানোর অভ্যাস তৈরী করা যরূরী। যাতে পরকালে নাজাত পাওয়া এবং জান্নাতে যাওয়া সহজ হয়। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!
[1]. মুসলিম হা/১১৬৪; তিরমিযী হা/৭৫৯; ইবনু মাজাহ হা/১৭১৫; মিশকাত হা/১৯৪৯: ছহীহুল জামে‘ হা/৬৩২৭।
[2]. আহমাদ হা/২১৯০৬; ইরওয়াহ ৪/১০৭; ইবনু মাজাহ হা/১৭১৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৩২৮; ছহীহুত তারগীব হা/১০০৭।
[3]. আহমাদ হা/২২৪৬৫; ছহীহুত তারগীব হা/১০০৭; ইরওয়া ৪/১০৭, সনদ ছহীহ।
[4]. নাসাঈ, সুনানুল কুবরা হা/২৮৭৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৮৫১; ছহীহুত তারগীব হা/১০০৭।
[5]. তিরমিযী হা/৪১৩; ইবনু মাজাহ হা/১৪২৫-২৬; নাসাঈ হা/৪৬৫; আবূ দাঊদ হা/৮৬৪, ৮৬৬; ছহীহুত তারগীব হা/৫৪০; ছহীহুল জামে‘ হা/২০২০; মিশকাত হা/১৩৩০।
[6]. বুখারী হা/২৮৪০; মুসলিম হা/১১৫৩; মিশকাত হা/২০৫৩।
[7]. ইসলাম সওয়াল-জবাব প্রশ্ন নং৭৮৫৯।
[8]. তিরমিযী হা/৭৫৯-এর আলোচনা দ্রঃ।
[9]. তিরমিযী হা/৪১৩; ইবনু মাজাহ হা/১৪২৫; নাসাঈ হা/৪৬৫; আবূ দাঊদ হা/৮৬৪; ছহীহুত তারগীব হা/৫৪০; ছহীহুল জামে‘ হা/২০২০।
[10]. ইবনুল ক্বাইয়িম, মিফতাহু দারিস সা‘আদাহ, ১/২৯৯।
[11]. আব্দুল আযীয সালমান, মিফতাহুল আফকার ২/৩৮৩।
[12]. বুখারী হা/১২, ২৮; মুসলিম হা/৩৯; মিশকাত হা/৪৬২৯।
[13]. তাবারাণী, আল-আওসাত্ব হা/৫২৯৫; ছহীহাহ হা/১৬৯২; ছহীহুল জামে‘ হা/২১৬৪।
[14]. ইসলাম সুওয়াল ও জওয়াব, প্রশ্ন নং ১২৩৬৪।
[15]. তিরমিযী হা/১০৯৩; ইবনু মাজাহ হা/১৯৯০; মুসলিম হা/১৪২৩; মিশকাত হা/৩১৪২।
[16]. আল-বিদায়া ওয়াল-নিহায়া, ৩/২৫৩।
[17]. বুখারী হা/২০৪১, ২০২৬।
[18]. মুসলিম হা/১১৬১-৬২; বুখারী হা/১৯৮৩; মিশকাত হা/২০৩৮।
[19]. আহমাদ ইবনু আলী ইবনে হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, (বৈরূত : দারুল মা‘আরিফ, ১৩৭৯হিঃ), ৪/২৩২।
[20]. বুখারী হা/১৫৬৪, ৩৮৩২; মুসলিম হা/১২৪০; নাসাঈ হা/২৮১৩।
[21]. বাক্বারাহ ২/১৮৪; বুখারী হা/৩২১; মুসলিম হা/৩৩৫; মিশকাত হা/২০৩২।
[22]. বুখারী হা/১৯৫০; মুসলিম হা/১১৪৬; মিশকাত হা/২০৩০; আত-তাহরীক, ফেব্রুয়ারী ২০২৫, প্রশ্নোত্তর।
[23]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২০৩০।
[24]. মির‘আত ৫/২৩; তাহরীক জুলাই’১৫, প্রশ্ন নং ২৬/৩৮৬।
[25]. মুসলিম হা/১১৪৪; মিশকাত হা/২০৫২।
[26]. আত-তাহরীক, জুন ২০২৪, প্রশ্নোত্তর ১১/৩৩১।
[27]. উছায়মীন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২০/৪৮; বিন বায, ফাতাওয়া নূরুন আলাদ্দারব ১৬/৪২৩; আত-তাহরীক, জানুয়ারী’২৪, প্রশ্নোত্তর ১৫/১৩৫।