‘যাকাত’ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম। ছালাতের পরেই যাকাতের স্থান। পবিত্র কুরআনের ৮২টি আয়াতে ছালাতের সাথে যাকাত আদায়ের নির্দেশনা এসেছে।[1] যাকাত অর্থ পবিত্রতা, বৃদ্ধি ও বরকত। আল্লাহ বলেন, خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا، ‘তুমি তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ কর। যা দ্বারা তুমি তাদের পবিত্র করবে ও পরিশুদ্ধ করবে’ (তওবা-মাদানী ৯/১০৩)। নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের সম্পদ এক বছর পূর্ণ হ’লে তার একটি নির্দিষ্ট অংশ মহান আল্লাহ নির্ধারিত আটটি খাতে ব্যয় করাকে যাকাত বলা হয়। যাকাত গরীবের প্রতি কোন করুণা, দয়া বা অনুদান নয়, বরং এটি ধনীদের সম্পদে গরীবের ন্যায্য অধিকার।

যাকাতের গুরুত্ব ও বিধান :

যে ব্যক্তি যাকাতের ফরযিয়াতকে অস্বীকার করে, সে ইসলাম থেকে খারিজ বলে গণ্য হয়। আর যে ব্যক্তি অবহেলাবশে যাকাত দেয় না, সে ‘ফাসেক’। অতঃপর যে ব্যক্তি সঠিক হিসাব করে যাকাত দেয় না। বরং যৎসামান্য দিয়েই দায় এড়াতে চায় অথবা হিসাবের চেয়ে বেশী দিয়েছি বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করে, সে ‘কৃপণ’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘একজন বান্দার হৃদয়ে কৃপণতা ও ঈমান কখনো একত্রিত হ’তে পারেনা’।[2] আল্লাহ বলেন, ‘যারা হৃদয়ের কার্পণ্য হ’তে মুক্ত, তারাই সফলকাম’।[3]

যাকাত মাক্কী জীবনে ফরয হয়। কিন্তু তার নেছাব নির্ধারিত হয় মাদানী জীবনে ২য় হিজরীতে।[4] মাক্কী ও মাদানী উভয় জীবনে একই ভাষায় আল্লাহ বলেছেন,وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللهِ، ‘তোমরা ছালাত কায়েম কর ও যাকাত আদায় কর। আর তোমরা নিজেদের জন্য যেসব সৎকর্ম অগ্রিম প্রেরণ কর, তা তোমরা আল্লাহর নিকটে পাবে’ (মুয্যাম্মিল-মাক্কী ৭৩/২০; বাক্বারাহ-মাদানী ২/১১০)

ইবাদত ৩ প্রকার। কথা ও কলমের ইবাদত, দৈহিক ইবাদত ও আর্থিক ইবাদত। ছালাতের বৈঠকে আমরা যে তাশাহহুদ পাঠ করি, সেখানে বলে থাকি, اَلتَّحِيَّاتُ ِللهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ، ‘যাবতীয় সম্মান, যাবতীয় উপাসনা ও যাবতীয় পবিত্র বিষয় আল্লাহর জন্য’। অর্থাৎ দো‘আ ও আল্লাহর গুণগানের মাধ্যমে মৌখিক ইবাদত; ছালাত-ছিয়াম ইত্যাদির মাধ্যমে দৈহিক ইবাদত এবং যাকাত ও ছাদাক্বার মাধ্যমে আর্থিক ইবাদত। এ তিনটির মধ্যে আর্থিক ইবাদত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, جَعَلَ اللهُ لَكُمْ قِيَامًا، ‘আল্লাহ ধন-সম্পদকে তোমাদের জন্য জীবিকার অবলম্বন হিসাবে নির্ধারণ করেছেন’ (নিসা-মাদানী ৪/৫)। যা সমাজদেহকে সতেজ ও সমৃদ্ধ রাখে।

আল্লাহ বলেন,فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلاَةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَنُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَّعْلَمُونَ- ‘অতঃপর যদি ওরা তওবা করে এবং ছালাত কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে, তাহ’লে ওরা তোমাদের দ্বীনী ভাই। আর আমরা জ্ঞানী লোকদের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে থাকি’ (তওবা-মাদানী ৯/১১)। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, যাকাতকে অস্বীকার করলে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে যদি না সে তওবা করে। সেকারণেই ১ম খলীফা (১১-১৩ হি.) হযরত আবুবকর (রাঃ) যাকাত জমা দানে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেনوَاللهِ لأُقَاتِلَنَّ مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ الصَّلاَةِ وَالزَّكَاةِ، ‘আল্লাহর কসম, আমি অবশ্যই যুদ্ধ করব তাদের বিরুদ্ধে, যারা ছালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করে’।[5] এতে ওমর (রাঃ) সহ সকল ছাহাবী একমত হন, যা ‘ইজমায়ে ছাহাবা’ হিসাবে গণ্য।

যাকাত বিধিবদ্ধ হওয়ার তাৎপর্য :

যাকাত কেবল একটি আর্থিক ইবাদতই নয়, বরং এটি একটি সুষম সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এর তাৎপর্য বহুমাত্রিক।

(১) আত্মিক পরিশুদ্ধিতা অর্জিত হয় : মানুষের মনে জন্মগতভাবেই সম্পদের প্রতি মোহ ও লোভ থাকে। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে মানুষের অন্তর সম্পদের মোহ, কৃপণতা ও স্বার্থপরতা থেকে পবিত্র হয়। আল্লাহ বলেন, خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا، ‘তুমি তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ কর। যা দ্বারা তুমি তাদের পবিত্র করবে ও পরিশুদ্ধ করবে’ (তওবা-মাদানী ৯/১০৩)

(২) সম্পদ প্রবৃদ্ধি লাভ করে : যাকাত প্রদান করলে বাহ্যিক দৃষ্টিতে সম্পদ কমছে বলে মনে হ’লেও, মূলত তা সম্পদের বহুগুণ প্রবৃদ্ধি ঘটায়। আল্লাহ বলেন, وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ رِبًا لِيَرْبُوَ فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلَا يَرْبُو عِنْدَ اللَّهِ وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ ‘লোকদের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে মনে করে তোমরা যে সূদ প্রদান করে থাক, আল্লাহর নিকটে তা বৃদ্ধি পায়না। পক্ষান্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাক, তা বহুগুণ বেশী লাভ করে থাক’ (রূম-মাক্কী ৩০/৩৯)

তিনি বলেন,مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ، وَاللهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَّشَآءُ وَاللهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ- ‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি শস্য বীজের ন্যায়। যা থেকে সাতটি শিষ জন্ম নেয়। প্রতিটি শিষে একশ’টি দানা হয়। আর আল্লাহ যার জন্য চান বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন। বস্ত্ততঃ আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী ও সর্বজ্ঞ’ (বাক্বারাহ-মাদানী ২/২৬১)

(৩) যাকাত অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি ও বৈষম্য দূর করে : যাকাত ব্যবস্থার মূল অর্থনৈতিক দর্শন হ’ল, সম্পদ যেন গুটি কয়েক ধনীর হাতে কুক্ষিগত হয়ে না থাকে। আল্লাহ বলেন, ...যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়’ (হাশর-মাদানী ৫৯/৭)। যাকাতের মাধ্যমে সমাজের এক শ্রেণীর উদ্বৃত্ত অর্থ অন্য শ্রেণীর অভাব মেটাতে সাহায্য করে, ফলে সমাজে একটি চমৎকার অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হয়।

(৪) এটি ধনীদের সম্পদে গরীবের হক। এই হক আদায় না করলে ধনিক শ্রেণী আল্লাহর নিকট দায়ী হবে। আল্লাহ বলেন,وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّآئِلِ وَالْمَحْرُومِ- ‘আর তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের জন্য হক রয়েছে’।[6] এটি ‘হক’ হিসাবেই হকদারকে প্রদান করতে হবে এবং হকদারগণ এটা দাবী করায় হীনতা বোধ করবে না।

(৫) এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের আর্থিক ভিতকে মযবুত রাখে। আল্লাহ বলেন,اَلَّذِينَ إِنْ مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلاَةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ- ‘তারা এমন লোক, যাদেরকে আমরা যদি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করি, তাহ’লে তারা ছালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, সৎকাজের আদেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে। বস্ত্ততঃ সকল কাজের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারাধীন’ (হজ্জ-মাদানী ২২/৪১)

(৬) দারিদ্র বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি : যাকাতের অর্থ শুধু ভোগের জন্য নয়, বরং অভাবীদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। পরিকল্পিতভাবে যাকাত আদায় ও বণ্টন করা হলে সমাজ থেকে বেকারত্ব ও দারিদ্র সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব।

যাকাত আনাদায়ের ভয়াবহ পরিণতি :

পবিত্র কুরআনে ছালাতের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশী তাগিদ দেওয়া হয়েছে যাকাত আদায়ের ওপর। যারা এই অবশ্য পালনীয় বিধানটি লঙ্ঘন করে কিংবা অবহেলাবশত আদায় করে না, ইসলামী শরী‘আতে দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা বিবৃত হয়েছে।

(১) জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি : আল্লাহ বলেন,وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ- يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُونَ- ‘যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য সঞ্চয় করে, অথচ তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে তুমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও’। ‘যেদিন সেগুলিকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে। অতঃপর তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগানো হবে, (আর বলা হবে) এগুলি হ’ল সেইসব স্বর্ণ-রৌপ্য, যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করেছিলে। এক্ষণে তোমরা যা সঞ্চিত রেখেছিলে তার স্বাদ আস্বাদন কর’ (তওবা-মাদানী ৯/৩৪-৩৫)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি স্বর্ণ ও রৌপ্যের মালিক অথচ তার হক (যাকাত) আদায় করে না, ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য তা আগুনের পাত্ররূপে পেশ করা হবে এবং জাহান্নামের আগুনে তা গরম করে তার কপালে, পার্শ্বদেশে ও পৃষ্ঠদেশে সেক দেয়া হবে। যখন উহা ঠান্ডা হয়ে যাবে তখন পুনরায় গরম করা হবে। এ অবস্থা ক্বিয়ামতের পুরো দিন চলতে থাকবে, যার দৈর্ঘ্য পঞ্চাশ হাযার বছরের সমান হবে। অতঃপর বান্দাদের মাঝে বিচার করা হবে, তখন সে দেখবে তার পথ কি জান্নাতের দিকে, না জাহান্নামের দিকে’।[7]

তিনি বলেন, مَانِعُ الزَّكَاةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي النَّارِ- ‘যাকাত ত্যাগকারী ক্বিয়ামতের দিন জাহান্নামে পতিত হবে’।[8]

(২) রাসূল (ছাঃ)-এর যুদ্ধ ঘোষণা : রাসূল (ছাঃ) বলেন,أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَّآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَّسُولُ اللهِ، وَيُقِيمُوا الصَّلاَةَ، وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ، إِلاَّ بِحَقِّ الْإِسْلاَمِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللهِ- ‘আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি, যে পর্যন্ত না তারা ঘোষণা করে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং তারা ছালাত কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে। যখন তারা এগুলো করবে, তখন আমার পক্ষ হ’তে তাদের জান ও মাল নিরাপদ থাকবে ইসলামের হক ব্যতীত। আর তাদের (অন্তর সম্পর্কে) বিচারের ভার আল্লাহর উপরে ন্যস্ত’।[9]

এতে বুঝা যায় যে, মুসলিম রাষ্ট্র প্রধান যাকাত ত্যাগ কারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন। যেমনটি করেছিলেন ১ম খলীফা হযরত আবুবকর ছিদ্দীক (রাঃ)।

(৩) সম্পদ বিষধর সাপে পরিণত হয় : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,مَنْ آتَاهُ اللهُ مَالاً فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ لَهُ مَالُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ لَهُ زَبِيْبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، ثُمَّ يَأْخُذُ بِلِهْزِمَتَيْهِ يَعْنِي شِدْقَيْهِ ثُمَّ يَقُوْلُ أَنَا مَالُكَ، أَنَا كَنْزُكَ ثُمَّ تَلاَ : وَلاَ يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُوْنَ، رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ- ‘যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, অথচ সে এর যাকাত আদায় করেনি, ক্বিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টেকো মাথার বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় বেড়ী পরানো হবে। সাপটি তার দুই চোয়াল চেপে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ধন। অতঃপর তিনি সূরা আলে ইমরান ১৮০ আয়াতটি তেলাওয়াত করেন’।[10] যেখানে আল্লাহ বলেন,وَلاَ يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَآ آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ، سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ- ‘আল্লাহ যাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহ থেকে কিছু দান করেছেন, তাতে যারা কৃপণতা করে, তারা যেন এটাকে তাদের জন্য কল্যাণকর মনে না করে। বরং এটা তাদের জন্য ক্ষতিকর। যেসব সম্পদে তারা কৃপণতা করে, সেগুলিকে ক্বিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ীবদ্ধ করা হবে। বস্ত্ততঃ আল্লাহর জন্যই হ’ল আসমান ও যমীনের মালিকানা। আর (গোপনে ও প্রকাশ্যে) তোমরা যা কিছু কর, সবই আল্লাহ খবর রাখেন’।[11] 

(৪) ক্বিয়ামতের দিন সম্পদের পাহাড়ের নীচে পিষ্ট হবে : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَا مِنْ رَّجُلٍ يَكُوْنُ لَهُ إِبِلٌ أَوْ بَقَرٌ أَوْ غَنَمٌ لاَّ يُؤَدِّيْ حَقَّهَا إلاَّ أُتِيَ بِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْظَمَ مَا يَكُوْنُ وَأَسْمَنَهُ تَطَؤُهُ بِأَخْفَافِهَا وَتَنْطَحُهُ بِقُرُوْنِهَا كُلَّمَا جَازَتْ أُخْرَاهَا رُدَّتْ عَلَيْهِ أُوْلاَهَا حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ- ‘যে ব্যক্তির উট, গরু, ছাগল বা ভেড়া আছে, অথচ সে তার যাকাত দেয় না, ক্বিয়ামতের দিন ঐগুলোকে তার নিকট অতি বিরাটকায় ও অতি মোটাতাজা অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। ঐগুলো দলে দলে তাকে পা দিয়ে মাড়াতে থাকবে ও শিং দিয়ে আঘাত করতে থাকবে। যখনই এদের শেষ দল অতিক্রম করবে, তখনই প্রথম দল এসে তার সাথে এরূপ করতে থাকবে, যতক্ষণ না মানুষের মধ্যে বিচারকার্য শেষ হবে’।[12] 

(৫) বৃষ্টি বন্ধ করে দেয়া হবে : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, خَمْسٌ بِخَمْسٍ ...قَالَ : مَا نَقَضَ قَوْمٌنِ الْعَهْدَ إِلاَّ سَلَّطَ اللهُ عَلَيْهِمْ عَدُوَّهُمْ، وَمَا حَكَمُوْا بِغَيْرِ مَا أَنْزَلَ اللهُ إِلاَّ فَشَا فِيْهِمُ الْفَقْرُ، وَمَا ظَهَرَتْ فِيْهِمُ الْفَاحِشَةُ إِلاَّ فَشَا فِيْهِمُ الْمَوْتُ (أَوْ إِلاَّ ظَهَرَ فِيْهِمُ الطَّاعُوْنُ)، وَلاَ طَفَّفُوا الْمِكْيَالَ إِلاَّ مُنِعُوا النَّبَاتَ وَاُخِذُوْا بِالسِّنِيْنَ، وَلاَ مَنَعُوا الزَّكَاةَ إِلاَّ حُبِسَ عَنْهُمُ الْمَطَرَ- ‘পাঁচটি বস্ত্তর কারণে পাঁচটি বস্ত্ত হয়ে থাকে।... (ক) কোন কওম চুক্তি ভঙ্গ করলে আল্লাহ তাদের উপর তাদের শত্রুকে বিজয়ী করে দেন। (খ) কেউ আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বাইরের বিধান দিয়ে দেশ শাসন করলে তাদের মধ্যে দারিদ্র্য ছড়িয়ে পড়ে। (গ) কোন সম্পদ্রায়ের মধ্যে অশ্লীল কর্ম ছড়িয়ে পড়লে তাদের মধ্যে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। (ঘ) কেউ মাপে বা ওযনে কম দিলে তাদের জন্য শস্যের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দুর্ভিক্ষ তাদের গ্রাস করে। (ঙ) কেউ যাকাত দেওয়া বন্ধ করলে তাদের থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হয়’।[13] অন্য বর্ণনায় এসেছে, যদি ভূ-পৃষ্ঠে চতুষ্পদ জন্তু ও নির্বাক প্রাণী না থাকত, তাহ’লে বৃষ্টিপাত হ’ত না।[14]

(৬) সামাজিক বৈষম্য ও অপরাধ বৃদ্ধি পায় : যাকাত না দেওয়ার একটি বড় সামাজিক কুফল হলো চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য। সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। সমাজে দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়, ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, দুর্নীতিসহ নানাবিধ অপরাধ সমাজে বিস্তার লাভ করে। ধনীদের প্রতি দরিদ্রদের মনে ক্ষোভ ও বিদ্বেষের জন্ম নেয়, যা সমাজের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে একটি স্থবির ও রুগ্ন অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।

অতএব যাকাত একদিকে যেমন আত্মিক পরিশুদ্ধি ও সম্পদের বরকত লাভের মাধ্যম, অন্যদিকে তেমনি একটি মানবিক, ইনছাফভিত্তিক ও কল্যাণমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার রক্ষাকবচ। নিজের সম্পদকে পবিত্র করতে, পরকালের ভয়াবহ আযাব থেকে বাঁচতে এবং সমাজের অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে সঠিক হিসাব করে যাকাত আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের ঈমানী ও নৈতিক দায়িত্ব।

(এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পাঠ করুন লেখক প্রণীত ও ‘হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ প্রকাশিত বই ‘যাকাত ও ছাদাক্বা’)


[1]. ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৩২৭, ১/৩১৮।

[2]. وَلاَ يَجْتَمِعُ الشُّحُّ وَالْإِيمَانُ فِي قَلْبِ عَبْدٍ أَبَدًا-নাসাঈ হা/৩১১০, ৩১১৪; মিশকাত হা/৩৮২৮ রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।

[3]. وَمَنْ يُّوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ-তাগাবুন-মাদানী ৬৪/১৬।

[4]. ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৩২৮, ১/৩১৮।

[5]. বুখারী হা/১৪০০; মুসলিম হা/২০; মিশকাত হা/১৭৯০।

[6]. যারিয়াত-মাক্কী ৫১/১৯; মা‘আরেজ-মাক্কী ৭০/২৪-২৫।

[7]. মুসলিম, মিশকাত হা/১৭৭৩; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/১৬৮১ ‘যাকাত’ অধ্যায়।

[8]. ত্বাবারাণী ছগীর হা/৯৩৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৮০৭।

[9]. বুখারী হা/২৫; মুসলিম হা/২২; মিশকাত হা/১২।

[10]. বুখারী হা/১৪০৩; মিশকাত হা/১৭৭৪ ‘যাকাত’ অধ্যায়, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)। ‘টেকো মাথা বিশিষ্ট’ বলার মাধ্যমে সাপটির প্রচন্ড বিষধর হওয়া বুঝানো হয়েছে। বিষের প্রভাবে এবং বয়স্ক হওয়ার কারণে যার মাথা টেকো হয়ে গেছে (মিরক্বাত)

[11]. আলে ইমরান-মাদানী ৩/১৮০; লেখক প্রণীত ও হাফাবা প্রকাশিত ‘মৃত্যুকে স্মরণ’ বই ৪০-৪১ পৃ.।

[12]. বুখারী হা/১৪৬০; মুসলিম হা/৯৮৭; মিশকাত হা/১৭৭৫ রাবী আবু যর গিফারী (রাঃ); তাহকীক তিরমিযী হা/৬১৭।

[13]. আলবানী, ছহীহুত তারগীব হা/৭৬।

[14]. ইবনু মাজাহ হা/৪০১৯, রাবী আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ)।






বিষয়সমূহ: যাকাত ও ছাদাক্বা
সফল মাতা-পিতার জন্য যা করণীয় - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
মাদ্রাসার পাঠ্যবই সমূহের অন্তরালে (৫ম কিস্তি) - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আল্লাহর উপর ভরসা - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
সাকীনাহ : প্রশান্তি লাভের পবিত্র অনুভূতি - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
পলাশীর মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি ও আমাদের শিক্ষা - ড. এ এস এম আযীযুল্লাহ
মুসলমানদের রোম ও কন্সটান্টিনোপল বিজয় - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
ইসলামের কতিপয় সামাজিক বিধান - মুহাম্মাদ ইমদাদুল্লাহ
আক্বীদা ও আহকামে হাদীছের প্রামাণ্যতা - মীযানুর রহমান মাদানী
হোমিও চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক ডা. হ্যানিম্যান ও তার ইসলাম গ্রহণ - ডা. এস.এম. আব্দুল আজিজ
আলেমগণের মধ্যে মতভেদের কারণ (২য় কিস্তি) - আব্দুল আলীম বিন কাওছার
অল্পে তুষ্টি (শেষ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
দান-ছাদাক্বা : পরকালীন পাথেয় সঞ্চয়ের অনন্য মাধ্যম - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আরও
আরও
.