নারীর ভরণ-পোষণের বিধান ও ফযীলত

ইসলামী আহকামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ’ল ইনফাক্ব বা সম্পদ ব্যয়। কিছু ব্যয় নফল বা ঐচ্ছিক আর কিছু ব্যয় ফরয বা অবশ্যপালনীয়। এই নফল ও ফরয ইনফাক্বের ক্ষেত্র, বিধান ও নীতিমালা কুরআন-সুন্নাহতে সবিস্তার বিবৃত হয়েছে। জীবনের অন্যান্য বিষয়ের মতো আয় ও ব্যয়ের একটি সুসংহত ও সুষম ব্যবস্থা মহান আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন। এই ব্যবস্থার একটি ক্ষুদ্র অংশ হ’ল পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনের ভরণ-পোষণ ও প্রতিপালন। এই ভরণ-পোষণ ও প্রতিপালনের মৌলিক বিধানগুলো অনেকের অজানা। ফলে ইলম না থাকায় ক্ষেত্রবিশেষে ওয়াজিব হক আদায় করা হয় না, আবার খরচ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চিন্তাও আসে না। এতদ্ব্যতীত ইসলাম-বিদ্বেষী চক্রের মিথ্যা প্রচারণায় ভীত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে সাধারণ মুসলমান। তাই এই বিধান সম্পর্কে জানা যরূরী।

অপরদিকে নারীঅধিকার বিষয়ক প্রচার-প্রচারণার অসারতা বুঝতে সহজ হ’ত যদি ইসলামের নাফাক্বাত ও ভরণ-পোষণ ব্যবস্থা সম্পর্কে মুসলমানদের পর্যাপ্ত দ্বীনী ইলম থাকতো। এ আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হ’ল ইসলামের পূর্ণাঙ্গ নাফাক্বা-ব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে জানার আগ্রহ জাগ্রত করা এবং সঠিক নিয়মে হকদারের হক আদায়ের চেতনা সৃষ্টি করা। সর্বোপরি নবী করীম (ছাঃ) ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করার যে ছওয়াব ও ফযীলত বর্ণনা করেছেন তা অবগত হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই খরচ করতে পারার যোগ্যতা অর্জন করা।

স্ত্রীর ভরণ-পোষণ : আহকাম ও ফযীলত

পরিবার গড়ে ওঠে স্বামী-স্ত্রীকে কেন্দ্র করে। আর ইসলাম স্বামীর উপরে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ, আবাসন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার দায়িত্বভার অর্পণ করেছে। এ দায়িত্ব তাকে নিষ্ঠার সাথে পালন করতে হবে। তাহ’লে পরিবার সুন্দর চলবে। মায়া-মমতার অটুট বন্ধনে সবাই যুক্ত থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللهُ، ‘পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক। এজন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যকে প্রাধান্য দান করেছেন এবং এজন্য যে, তারা (নারীদের ভরণ-পোষণের জন্য) তাদের মাল-সম্পদ হ’তে ব্যয় করে থাকে। অতএব সতী-সাধ্বী স্ত্রীরা হয় অনুগত এবং আল্লাহ যার হেফাযত করেছেন, আড়ালেও (সেই গুপ্তাঙ্গের) হেফাযত করে’ (নিসা ৪/৩৪)। এখানে قَوَّامُونَ-এর অর্থ করা হয়েছে অভিভাবক। মুফাসসিরগণের মতে তা হচ্ছে, শাসন ও ব্যবস্থায়ন এবং রক্ষা ও নিরাপত্তা বিধানের মাধ্যমে নারীর দেখভাল করা; আদেশ ও নিষেধের মাধ্যমে তার অবস্থার সংশোধন করা। যেমন শাসকগণ প্রজাসাধারণের দেখভাল করে। পুরুষ হচ্ছে নারীর প্রধান ও উপরস্থ; নারীর শাসক ও সংশোধক, যদি সে বেঁকে যায়।[1]

এই আয়াতে স্ত্রীর উপর স্বামীর অভিভাবকত্বের দু’টি কারণ বলা হয়েছে, প্রথমত দৈহিক শক্তি-সামর্থ্য ও বিচার-বিচক্ষণতার মতো গুণাবলী, দ্বিতীয়ত মোহরানা ও ভরণ- পোষণের জন্য ব্যয়বহন। এই আয়াতে ‘পুরুষের ব্যয়কৃত সম্পদ’ মানে স্ত্রীর মোহরানা, খোরপোষ ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ, কুরআন ও সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী যা বহন করা অবশ্য কর্তব্য। এ আয়াত প্রমাণ করে, স্ত্রীর নাফাক্বা ও খোরপোষ স্বামীর উপর ফরয।[2] অন্যত্র আল্লাহ বলেন,وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ لَا تُكَلَّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا لَا تُضَارَّ وَالِدَةٌ بِوَلَدِهَا وَلَا مَوْلُودٌ لَهُ بِوَلَدِهِ وَعَلَى الْوَارِثِ مِثْلُ ذَلِكَ، ‘জন্মদাত্রী মাতাগণ তাদের সন্তানদের পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে, যদি তারা দুধপানের মেয়াদ পূর্ণ করতে চায়। আর জনমদাতা পিতার দায়িত্ব হ’ল ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রসূতি মায়েদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা। সাধ্যের অতিরিক্ত কাউকে বাধ্য করা যাবে না। আর সন্তানের কারণে প্রসূতি মাকে এবং জন্মদাতা পিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। উত্তরাধিকারীদের প্রতিও একই বিধান’ (বাক্বারাহ ২/২৩৩)

এ আয়াতে মায়ের প্রতি আদেশ হ’ল সন্তানকে দুধপান করানোর, আর পিতার প্রতি আদেশ হ’ল (সন্তানের) মায়ের খোরপোষ বহনের। নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানের মায়ের খোরপোষের ব্যবস্থা করা পিতার দায়িত্ব। সুতরাং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্বাভাবিক খোরপোষে কার্পণ্য করা স্বামীর জন্য জায়েয নয়, তেমনি স্ত্রীর জন্যও বৈধ নয় স্বামীর সামর্থ্যের অধিক বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী খোরপোষ দাবী করা।

বিবাহের পর দাম্পত্য সম্পর্কের কারণেই স্ত্রীর পরিপোষণ স্বামীর দায়িত্বে থাকে। একই কারণে স্ত্রীর কর্তব্য হয় শিশুকে স্তন্যদান করা। তবে বিবাহ-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে ইদ্দত শেষ হওয়ার পর মা যদি সন্তানকে দুধপান করান তাহ’লে তখনো তাকে স্বাভাবিক পরিপোষণ বা পারিশ্রমিক দিতে হবে। এটা তাঁর দুধপানের বিনিময়।

তালাকপ্রাপ্তা নারীর পরিপোষণ :

তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত পালনকালে তার ভরণ-পোষণও স্বামীকে দিতে হবে। সে নারী গর্ভবতী হ’লে তাকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত ভরণ-পোষণ দিতে হবে। যদি সন্তান প্রসবের পর তাকে দুধ পান করায় তাহ’লে দুধ পানের বিনিময় দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের থাকতে দাও যেখানে তোমরা থাক তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী। তোমরা তাদের ক্ষতি করো না কষ্ট দেওয়ার জন্য। যদি তারা গর্ভবতী হয়, তাহ’লে তাদের জন্য ব্যয় কর, যতদিন না গর্ভ খালাস হয়। যদি তারা তোমাদের সন্তানদের দুধ পান করায়, তাহ’লে তোমরা তাদের পারিশ্রমিক দাও। আর এ বিষয়ে তোমরা পরস্পরে সুন্দরভাবে পরামর্শ কর। কিন্তু যদি তোমরা সংকট সৃষ্টি কর, তাহ’লে অন্য নারী তাকে স্তন্যদান করবে। সামর্থ্যবান ব্যক্তি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে। কিন্তু যার রিযিক সীমিত, সে আল্লাহ তাকে যা দান করেছেন, তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তার অতিরিক্ত বোঝা কাউকে চাপান না। সত্বর আল্লাহ কষ্টের পর সহজ করে দিবেন’ (তালাক ৬৫/৬-৭)। এই আয়াতে তালাকপ্রাপ্তা নারীর বিধান দিয়ে বলা হয়েছে, ইদ্দতের অবস্থায় তাদের বাসস্থান দেয়া এবং খোরপোষের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব।

তালাকপ্রাপ্তা নারী গর্ভবতী না হ’লে তার ইদ্দত তিন তোহর বা তিন মাস। অর্থাৎ যার হায়েয হয় তার ইদ্দত তিন তোহর এবং যার হায়েয হয় না তার ইদ্দত তিন মাস। আর গর্ভবতী নারীর ইদ্দত সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত। ইদ্দত পালনকালে তার অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান স্বামীকে দিতে হবে। পরবর্তী সময়ের খোরপোষ ও বাসস্থানের দায়িত্ব স্বামীর উপর থাকে না। তবে সন্তানকে দুধপান করালে তাকে বিনিময় দিতে হবে, আর তা ধার্য হবে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে।

এ আয়াতগুলো থেকে সাধারণ অবস্থায়ও স্ত্রীর খোরপোষ ও বাসস্থানের অধিকার প্রমাণিত হয়। কারণ তালাক এমন কোন বিষয় নয়, যা দ্বারা স্ত্রী নতুন করে এসব বিষয়ের অধিকার লাভ করতে পারে। খোরপোষ সংক্রান্ত এই কুরআনী বিধান নবী করীম (ছাঃ) বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। জাবির (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,فَاتَّقُوا اللهَ فِي النِّسَاءِ، فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللهِ، وَاسْتَحْلَلْتُمْ فُرُوجَهُنَّ بِكَلِمَةِ اللهِ، وَلَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لَا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُونَهُ، فَإِنْ فَعَلْنَ ذَلِكَ فَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ، وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ، ‘তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কারণ তাদেরকে তোমরা আল্লাহর আমানত হিসাবে গ্রহণ করেছ। আল্লাহর কালেমার সাহায্যে তাদের লজ্জাস্থানকে বৈধ করেছ। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হ’ল, তারা এমন কাউকে তোমাদের বিছানা মাড়াতে দেবে না, যাকে তোমরা অপসন্দ কর। এমন করলে তাদেরকে হালকাভাবে প্রহার কর। আর ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদের খাওয়া-পরার দায়িত্ব তোমাদের উপর’।[3] অন্য হাদীছে এসেছে, আমর ইবনুল আহওয়াছ (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন,أَلَا إِنَّ لَكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ حَقًّا، وَلِنِسَائِكُمْ عَلَيْكُمْ حَقًّا، فَأَمَّا حَقُّكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ فَلَا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ مَنْ تَكْرَهُونَ، وَلَا يَأْذَنَّ فِي بُيُوتِكُمْ لِمَنْ تَكْرَهُونَ، أَلَا وَحَقُّهُنَّ عَلَيْكُمْ أَنْ تُحْسِنُوا إِلَيْهِنَّ فِي كِسْوَتِهِنَّ وَطَعَامِهِنَّ، ‘সাবধান, তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের উপর কিছু অধিকার রয়েছে। আর তোমাদের স্ত্রীদের জন্যও তোমাদের উপর কিছু অধিকার রয়েছে। তোমাদের অধিকার এই যে, স্ত্রীরা কোনভাবেই তোমাদের বিছানায় এমন কাউকে পদার্পণের সুযোগ দিবে না, যাকে তোমাদের পসন্দ নয়। আর তোমাদের ঘরে এমন কাউকে প্রবেশের অনুমতি দিবে না, যাকে তোমরা অপসন্দ কর। সাবধান, তোমাদের উপর তাদের অধিকার এই যে, খোরপোষের বিষয়ে তাদের প্রতি সদাচরণ করবে’।[4]

হিন্দ বিনতে উতবা নবী করীম (ছাঃ)-এর খেদমতে আরয করল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ লোক। সে আমার ও আমার সন্তানের প্রয়োজনীয় খোরপোষ দেয় না যতক্ষণ না আমি তার অজান্তে তার মাল থেকে কিছু নেই। তখন নবী করীম (ছাঃ) ইরশাদ করলেন, নিজের ও সন্তানের স্বাভাবিক প্রয়োজন পরিমাণ খোরপোষ তুমি নিতে পার।[5] এই হাদীছ থেকে বোঝা যায়, স্ত্রী-সন্তানের ভরণ-পোষণ স্বামীর অবশ্য-কর্তব্য এবং এটি তাদের প্রাপ্য। এ কারণেই স্বামীর অগোচরে হ’লেও আবু সুফিয়ান (রাঃ)-এর স্ত্রীকে তা নিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আর স্বামীর উপর স্ত্রী-সন্তানের ঐ পরিমাণ খোরপোষ ওয়াজিব, যা দ্বারা তাদের স্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণ হয়।

হাকীম বিন মু‘আবিয়া আল-কুশাইরী স্বীয় পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি বললাম,يَا رَسُولَ اللهِ، مَا حَقُّ زَوْجَةِ أَحَدِنَا عَلَيْهِ؟، قَالَ: أَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ، وَتَكْسُوَهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ، أَوِ اكْتَسَبْتَ، وَلَا تَضْرِبِ الْوَجْهَ، وَلَا تُقَبِّحْ، وَلَا تَهْجُرْ إِلَّا فِي الْبَيْتِ، ‘হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমাদের কারো উপর তার স্ত্রীর কি হক রয়েছে? তিনি বললেন, তুমি যখন আহার করবে তাকেও আহার করাবে। তুমি পোষাক পরিধান করলে তাকেও পোষাক দিবে। তার মুখমন্ডলে মারবে না, তাকে গালমন্দ করবে না এবং পৃথক রাখতে হ’লে ঘরের মধ্যেই রাখবে’।[6]

স্ত্রীর ভরণ-পোষণের ফযীলত :

স্ত্রীর ভরণ-পোষণের ফযীলত ও গুরুত্ব অত্যধিক। হাদীছে এ ব্যয়কে উত্তম বলা হয়েছে। আর এই ব্যয়ে দান-ছাদাক্বা করার ন্যায় ছওয়াব অর্জিত হয়।

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন, دِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللهِ وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ فِي رَقَبَةٍ، وَدِينَارٌ تَصَدَّقْتَ بِهِ عَلَى مِسْكِينٍ، وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ، أَعْظَمُهَا أَجْرًا الَّذِي أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ ‘তুমি একটি দীনার আল্লাহর রাস্তায় খরচ করেছ, একটি দীনার গোলাম আযাদ করার জন্য, একটি দীনার অভাবীর প্রয়োজন পূরণের জন্য এবং একটি দীনার পরিবারের জন্য খরচ করেছ। এর মধ্যে ঐ দীনারের ছওয়াব সর্বাধিক, যা পরিবারের জন্য খরচ করেছ’।[7]

আবু মাসঊদ (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ يَحْتَسِبُهَا فَهُوَ لَهُ صَدَقَةٌ ‘পুরুষ যখন পরিবারের জন্য ছওয়াবের আশায় খরচ করে, তা ছাদাক্বা হিসাবে গণ্য হয়’।[8] অপর একটি হাদীছে এসেছে, মিক্বদাদ ইবনে মা‘দিকারিব (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন,مَا أَطْعَمْتَ نَفْسَكَ فَهُوَ لَكَ صَدَقَةٌ وَمَا أَطْعَمْتَ وَلَدَكَ فَهُوَ لَكَ صَدَقَةٌ وَمَا أَطْعَمْتَ زَوْجَتَكَ فَهُوَ لَكَ صَدَقَةٌ وَمَا أَطْعَمْتَ خَادِمَكَ فَهُوَ لَكَ صَدَقَةٌ ‘যা তুমি নিজে খাবে তা তোমার জন্য ছাদাক্বা, যা সন্তাানকে খাওয়াবে তা তোমার জন্য ছাদাক্বা, স্ত্রীকে যা খাওয়াবে তাও তোমার জন্য ছাদাক্বা এবং তোমার খাদেমকে যা খাওয়াবে তাও তোমার জন্য ছাদাক্বা’।[9]

কন্যার ভরণ-পোষণ :

কন্যা সন্তান লালন-পালন ও তার ভরণ-পোষণের ফযীলত অত্যধিক। কন্যা সন্তান প্রতিপালনের মাধ্যমে জান্নাত লাভ করা যায়। মূলত সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আল্লাহ পিতাকে দিয়েছেন। তিনি বলেন,وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ، ‘আর জন্মদাতা পিতার দায়িত্ব হ’ল ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রসূতি মায়েদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা’ (বাক্বারাহ ২/২৩৩)। অন্যত্র তিনি বলেন,فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ، ‘অতঃপর যদি তারা তোমাদের সন্তানদের দুধ পান করায়, তাহ’লে তোমরা তাদের পারিশ্রমিক দাও’ (তালাক ৬৫/৬)

এই দুই আয়াতের মূল বিষয় সন্তানের ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত। সন্তানের ভরণ-পোষণের মাধ্যমে তার বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করা এবং ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সন্তানের দুধের ব্যবস্থা করা পিতার দায়িত্ব। অনিবার্য কারণে মা সন্তানকে বুকের দুধ দিতে না পারলে পিতাকে দুধের অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। তদ্রূপ বিবাহ-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে স্ত্রীর ইদ্দত শেষ হওয়ার পর যদি তিনি শিশু সন্তানকে বুকের দুধ দেন তাহ’লে ঐ সময় তার ভরণ-পোষণের ভার পিতাকে বহন করতে হয়। মোটকথা পিতাকে তার সন্তানের দুধের ব্যবস্থা করতে হবে। সুতরাং দুধের বয়সে দুধের ব্যবস্থা এবং দুধ ছাড়ার পর স্বাভাবিক ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা পিতার দায়িত্ব। এই বিধানে পুত্র-কন্যার ভেদাভেদ নেই।

কন্যার ভরণ-পোষণের ফযীলত : সন্তান-সন্ততির ভরণ পোষণের জন্য প্রচেষ্টা চালানো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত থাকার ন্যায় ফযীলতপূর্ণ আমল। কা‘ব ইবনে উজরা (রা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করল। তার চলার ভঙ্গি থেকে ছাহাবায়ে কেরামের মনে হ’ল সে খুব কর্মঠ ও উদ্যমী। তারা আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! যদি সে আল্লাহর রাস্তায় এভাবে চলত! তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, إِنْ كَانَ خَرَجَ يَسْعَى عَلَى وَلَدِهِ صِغَارًا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَإِنْ كَانَ خَرَجَ يَسْعَى عَلَى أَبَوَيْنِ شَيْخَيْنِ كَبِيرَيْنِ فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَإِنْ كَانَ خَرَجَ يَسْعَى عَلَى نَفْسِهِ يَعُفُّهَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَإِنْ كَانَ خَرَجَ يَسْعَى رِيَاءً وَمُفَاخَرَةً فَهُوَ فِي سَبِيلِ الشَّيْطَانِ ‘যদি সে শিশু-সন্তানদের জন্য উপার্জনের চেষ্টায় বের হয় তাহ’লে সে আল্লাহর রাস্তায় আছে। যদি সে বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য উপার্জনের চেষ্টায় বের হয় তাহ’লেও সে আল্লাহর রাস্তায় আছে, যদি অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষিতা থেকে নিজেকে রক্ষার চেষ্টায় বের হয় তাহ’লেও সে আল্লাহর রাস্তায় আছে। আর যদি মানুষকে দেখানোর জন্য ও গর্ব-অহংকারের জন্য বের হয় তাহ’লে সে শয়তানের রাস্তায় আছে’।[10] এ হাদীছে পুত্র-কন্যার মধ্যে কোন ভেদাভেদ করা হয়নি। পিতা উপার্জনে বের হলে নিয়ত যদি ছহীহ থাকে, তাহ’লে সে আল্লাহর রাস্তায় রয়েছে। এছাড়া অনেক হাদীছে কন্যা-সন্তানের ভরণ-পোষণের বিশেষ ফযীলত বর্ণিত হয়েছে।

আনাস (রা.) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ دَخَلْتُ أَنَا وَهُوَ الجَنَّةَ كَهَاتَيْنِ ‘যে ব্যক্তি দু’জন কন্যা সন্তানেরন প্রতিপালন করে তাদের বালেগ হওয়া পর্যন্ত, ক্বিয়ামতের দিন আমি ও সে একসাথে থাকব। অন্য বর্ণনায় আছে, আমি ও সে একসাথে জান্নাতে প্রবেশ করব’।[11] অন্যত্র তিনি বলেন,

مَنْ كُنَّ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ يُؤْوِيهِنَّ، وَيَرْحَمُهُنَّ، وَيَكْفُلُهُنَّ، وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ الْبَتَّةَ، قَالَ: قِيلَ: يَا رَسُولَ اللهِ: فَإِنْ كَانَتْ اثْنَتَيْنِ؟ قَالَ: وَإِنْ كَانَتْ اثْنَتَيْنِ، قَالَ: فَرَأَى بَعْضُ الْقَوْمِ، أَنْ لَوْ قَالُوا لَهُ وَاحِدَةً، لَقَالَ: وَاحِدَةً-

‘যার তিনটি কন্যা সন্তান আছে এবং তাদেরকে সে ঘরে স্থান দিয়েছে, তাদের প্রতি রহম করেছে এবং তাদের প্রতিপালন করেছে তার জন্য জান্নাত অবধারিত। কেউ জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কারো যদি দু’টি কন্যা থাকে? তিনি বললেন, দু’টি থাকলেও। বর্ণনাকারী বলেন, ছাহাবীদের ধারণা, একটি কন্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’লেও তিনি এই ফযীলত বর্ণনা করতেন।[12] এছাড়া নবী করীম (ছাঃ) কন্যা সন্তানের ভরণ-পোষণের এবং তাদের সাথে সুন্দর ব্যবহারের অনেক ফযীলত বর্ণনা করেছেন।

মায়ের ভরণ-পোষণের বিধান ও ফযীলত :

পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সামর্থ্যবান সন্তানের। আল্লাহ বলেন,وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا، ‘আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে উপাসনা করো না এবং তোমরা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো’ (ইসরা ১৭/২৩)। অন্যত্র তিনি বলেন,وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ، وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ- ‘আর আমরা মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে। অতএব তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (মনে রেখ,) আমারই নিকটে প্রত্যাবর্তন। কিন্তু যদি তোমার পিতা-মাতা তোমাকে চাপ দেয় আমার সাথে কাউকে শরীক করার জন্য, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহ’লে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না। অবশ্য পার্থিব জীবনে তুমি তাদের সাথে সদ্ভাব রেখে চলবে। আর যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে, তুমি তার পথ অবলম্বন কর। অতঃপর আমারই নিকটে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করব’ (লুকমান ৩১/১৪-১৫)

পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হ’ল প্রয়োজনের সময় তাদের ব্যয়ভার বহন করা। পিতা-মাতার প্রয়োজনের মুহূর্তে সামর্থ্যবান সন্তান যদি তাদের দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে তবে তা অতি নিন্দনীয় কাজ।

পিতামাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন,إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا، ‘তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহ’লে তুমি তাদের প্রতি ‘উফ’ শব্দটিও উচ্চারণ করো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। আর তুমি তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বল’ (ইসরা ১৭/২৩)

উফ শব্দ উচ্চারণ করেও যখন পিতামাতাকে কষ্ট দেওয়া নিষেধ তখন প্রয়োজনের মুহূর্তে তাদের খাদ্য-বস্ত্রের দিকে ভ্রূক্ষেপ না করা যে নিষেধ ও হারাম সেটা বলাই বাহুল্য। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে অভিযোগ করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ (ছাঃ)! আমার (কিছু) সম্পদ আছে এবং একজন পিতা আছেন। কিন্তু পিতা আমার সকল সম্পদ নিয়ে যেতে চান। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তুমি ও তোমার সম্পদ দু’টোই তোমার পিতার। তোমাদের সন্তানরা হচ্ছে তোমাদের উত্তম উপার্জন। সুতরাং তোমরা নিজ সন্তানের উপার্জন ভোগ কর’।[13] অতএব সন্তানের উপার্জন পিতামাতার উপার্জন বলেই গণ্য। সুতরাং নিজের উপার্জন থেকে যেমন ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ হয় তেমনি সন্তানের সম্পদ থেকেও পিতামাতার প্রয়োজন পূরণ হবে। পিতামাতা দরিদ্র হ’লে এবং পিতার নিজের কোন উপার্জন না থাকলে তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সচ্ছল সন্তানের।[14]

মায়ের সেবা-যত্নের ফযীলত :

মা পৃথিবীর এক অমূল্য নে‘মত। যার অবদানে মানুষ পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখতে পায়। তার দেহের রক্তে-গোশতে সন্তানের দেহ গঠিত হয়। তাই মায়ের ঋণ কখনও শোধ করার নয়। সন্তান উপার্জনক্ষম হ’লে মায়ের ভরণ- পোষণ, সেবা-যত্ন সঠিকভাবে করা এবং তার সাথে সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা সন্তানের দায়িত্ব।

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, يَا رَسُولَ اللهِ مَنْ أَحَقُّ بِحُسْنِ صَحَابَتِى ‘হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমার সেবা ও সদাচারের সর্বাধিক হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। ছাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। ছাহাবী আবার জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। চতুর্থবার জিজ্ঞেস করার পর নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমার পিতা’।[15]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, কোন কাজ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, الصَّلاَةُ لِوَقْتِهَا، وَبِرُّ الْوَالِدَيْنِ، ثُمَّ الْجِهَادُ فِى سَبِيلِ اللهِ সময়মতো ছালাত আদায় করা, মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা, অতঃপর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা’।[16]

অন্যত্র নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,السَّاعِى عَلَى الأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ كَالْمُجَاهِدِ فِى سَبِيلِ اللهِ، أَوِ الْقَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ، ‘বিধবা ও দরিদ্রের জন্য যে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে সে যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত কিংবা দিনভর ছিয়াম পালনকারী ও রাতভর ছালাত আদায়কারীর ন্যায়’।[17] সাধারণ অভাবী ও বিধবার প্রয়োজন পূরণে যখন এত বড় ছওয়াব তখন সেই বিধবা যদি নিজের মা হন তাহ’লে ছওয়াব ও ফযীলত আরো অনেক বেশী হবে।

বোন ও অন্যান্য আত্মীয়ার ভরণ-পোষণ :

ভাই-বোনের মধ্যে সম্পর্ক হচ্ছে রক্তের ও আত্মার। সুতরাং বোনের সমস্যায় ভাই তার পাশে দাঁড়াবে, সাধ্যমত সাহায্য করবে। এর মাধ্যমে সে প্রচুর ছওয়াবের অধিকারী হবে। আল্লাহ বলেন,وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا، ‘তুমি নিকটাত্মীয়কে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর তুমি মোটেই অপচয় করো না’ (বনু ইসরাঈল ১৭/২৬)। তিনি আরো বলেন, إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ، ‘নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন ও অশ্লীলতা, অন্যায় ও অবাধ্যতা হ’তে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর’ (নাহল ১৬/৯০)

আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেওয়া ও তাদের প্রয়োজন পূরণ করা কখনো নফল ও মুস্তাহাব থাকে, আবার কখনো তা ওয়াজিব বা অপরিহার্য হয়ে যায়। ত্বরিক আল-মুহাবিরী (রাঃ) বলেন, একদা আমরা মদীনায় আসলাম, তখন নবী করীম (ছাঃ) মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন,يَدُ الْمُعْطِي الْعُلْيَا، وَابْدَأْ بِمَنْ تَعُولُ: أُمَّكَ، وَأَبَاكَ، وَأُخْتَكَ، وَأَخَاكَ، ثُمَّ أَدْنَاكَ، أَدْنَاكَ، ‘দাতার হাত হ’ল উপরের হাত। আর দান করা শুরু করবে স্বীয় পোষ্যদের থেকে, তোমার মাতা-পিতা, ভাই-বোন, তারপর তোমার নিকটাত্মীয়, নিকটাত্মীয়’।[18]

বোনের ভরণ-পোষণের ফযীলত :

বোনের ভরণ-পোষণের বিভিন্ন ফযীলত ও উপকারিতা হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ عَالَ ابْنَتَيْنِ أَوْ أُخْتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا، أَوْ أُخْتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا، حَتَّى يَبِنَّ، أَوْ يَمُوتَ عَنْهُنَّ، كُنْتُ أَنَا وَهُوَ فِي الْجَنَّةِ كَهَاتَيْنِ وَأَشَارَ بِأُصْبَعِهِ الْوُسْطَى وَالَّتِي تَلِيهَا ‘যে ব্যক্তি দু’জন বা তিনজন কন্যার লালন-পালন করে কিংবা দু’টি বোন বা তিনটি বোনের প্রতিপালন করে এবং এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয় অথবা তারা তার নিকট থেকে আলাদা হয়, তাহ’লে আমি ও সে এভাবে জান্নাতে থাকব। একথা বলে তিনি শাহাদত ও মধ্যমা আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করলেন’।[19]

ভরণ-পোষণ ওয়াজিব না হ’লেও দান করা :

উপরোক্ত আলোচনায় ওয়াজিব ইনফাক বা অপরিহার্য ভরণ-পোষণের কথা বলা হয়েছে। তবে যেসব আত্মীয়ের ভরণ- পোষণ ওয়াজিব নয় তাদের জন্য কিংবা যেসব ক্ষেত্রে ওয়াজিব নয় ঐসব ক্ষেত্রেও কেউ যদি খরচ করে তাহ’লে আলাদা ছওয়াব পাবে। সাধারণ দানের চেয়ে আত্মীয়-স্বজনের জন্য খরচ করার ছওয়াব ও ফযীলত অধিক। তবে অপরিহার্য ভরণ-পোষণে কোনরূপ ত্রুটি করা যাবে না। আল্লাহ বলেন,وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ، ‘আর তারা তোমাকে প্রশ্ন করছে কি পরিমাণ ব্যয় করবে? তুমি বল, উদ্বৃত্ত থেকে। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ ব্যাখ্যা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা-গবেষণা করতে পার’ (বাক্বারাহ ২/২১৯)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, পরিবারের ভরণ-পোষণের পর অতিরিক্ত সম্পদ ব্যয় করবে।

হাসান বছরী (রহঃ) বলেন, এমন যেন না হয় যে, তুমি তোমার সমুদয় সম্পদ দান করে দিলে, এরপর অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে গেলে। অর্থাৎ ব্যক্তির মূল সম্পদ যেমন চাষাবাদের জমি কিংবা ব্যবসার মূলধন, যার উপার্জন থেকে তার নিজের ও পরিবার-পরিজনের স্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণ হয় তা দান করার আদেশ করা হয়নি। অর্থাৎ মূল সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের পর যা উদ্বৃত্ত থাকে তা দান করবে।[20]

প্রথমে তোমার পরিবারে ভরণ-পোষণ কর। এই দুই শর্ত পূরণ করে যত দান করা যায় ততই ফায়েদা। এক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজনের জন্য দান করার ছওয়াব আরো বেশি।

সালমান ইবনে আমির (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন,الصَّدَقَةُ عَلَى المِسْكِينِ صَدَقَةٌ، وَهِيَ عَلَى ذِي الرَّحِمِ ثِنْتَانِ: صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ، ‘অভাবীকে দান করা ছাদাক্বা আর নিকটাত্মীয়কে দান করা ছাদাক্বা ও আত্মীয়তার হক আদায়’।[21] অন্যত্র এসেছে, অভাবীকে দান করা এক ছাদাক্বা আর আত্মীয়কে দান করা দুই ছাদাক্বা। অর্থাৎ তা হচ্ছে ছাদাক্বা ও আত্মীয়তার হক আদায়।[22]

ইবনে হিযাম (রাঃ) ও উম্মে কুলছূম বিনতে উকবা (রাঃ) থেকে বর্ণিত দু’টি হাদীছে ঐ আত্মীয়দের দান করার অধিক তাকীদ করা হয়েছে, যাদের অন্তরে এই ব্যক্তির প্রতি বিদ্বেষ রয়েছে। একে সর্বোত্তম ছাদাক্বা বলা হয়েছে।[23]

মোটকথা আত্মীয়-স্বজনের জন্য দান-ছাদাক্বা ও সম্পদ ব্যয়ের কথা বিভিন্নভাবে বলা হয়েছে। এর সাথে যদি ঐসব হাদীছকেও মিলিয়ে পাঠ করা যায়, যা ইয়াতীম, বিধবা, পীড়িত ও প্রতিবন্ধীদের সাহায্য-সহযোগিতা ও প্রয়োজন পূরণের বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে তাহ’লে বোঝা যাবে, এটা কত বড় নেক আমল। কারণ আত্মীয় বা আত্মীয়দের মাঝে এমন কেউ থাকলে তাদের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে যেমন আত্মীয়তার হক আদায়ের ছওয়াব পাওয়া যাবে তেমনি দুর্বলের সহযোগিতার ফযীলতও হাছিল হবে।

উপরোক্ত আলোচনা ইসলামের ‘নিযামুন নাফাক্বা’ বা পরিপোষণ ব্যবস্থার একটি ক্ষুদ্র অংশ। এই ব্যবস্থায় আদালত ও প্রশাসনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াজিব ভরণ-পোষণের অধিকাংশ ক্ষেত্রে হকদারকে তার হক আদায় করে দেওয়া আদালত ও প্রশাসনের কর্তব্য। কিছু বিষয় এমনও আছে, যা আদালতের রায়ের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইলমে দ্বীনের চর্চা না থাকায় হকদার তার হক সম্পর্কে সচেতন নয়, হকদাতাও হক আদায়ে আগ্রহী নয়। ফলে প্রশাসন ও আদালতেরও তেমন কোন তৎপরতা নেই। সুতরাং সর্বাগ্রে আমাদেরকে ওয়াজিব হক সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!


[1]. জাসসাস, আহকামুল কুরআন ২/১৮৮; ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন ২/৪১৬; তাফসীরে কাশশাফ ১/৫০৫; তাফসীরে ইবনে কাছীর ১/৪৯১।

[2]. তাফসীর ইবনে কাছীর ১/৪৯২; জাসসাস, আহকামুল কুরআন, ২/১৮৮।

[3]. মুসলিম হা/১২১৮; মিশকাত হা/২৫৫৫।

[4]. তিরমিযী হা/১১৬৩; ইবনে মাজাহ হা/১৮৫১; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৮৮০; ইরওয়া হা/২০৩০।

[5]. বুখারী হা/৫৩৬৪; মুসলিম হা/১৭১৪; মিশকাত হা/৩৩৪২।

[6]. আবূদাউদ হা/২১৪২; মিশকাত হা/৩২৫৯; ইরওয়া হা/২০৩৩।

[7]. মুসলিম হা/৯৯৫।

[8]. বুখারী হা/৫৫; মুসলিম হা/১০০২।

[9]. আহমাদ হা/১৭২১৮; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৮২; ছহীহাহ হা/৪৫২;

[10]. তাবারানী আল-মুজামুল কাবীর ১৯/২৮২; ছহীহুল জামে‘ হা/১৪২৮; ছহীহুত তারগীব হা/১৯৫৯।

[11]. তিরমিযী হা/১৯১৪; মুসলিম হা/২৬৩১; মিশকাত হা/৪৯৫০।

[12]. ছহীহ ইবনে হিববান হা/৪৪৭; ছহীহাহ হা/২৯৫, ২৬৭৯; ছহীহুত তারগীব হা/১৯৭৯।

[13]. আবু দাউদ হা/৩৫৩০, ৩০৬৭; ইবনে মাজাহ ২/৭৬৯; মুসনাদে আহমদ হা/৬৮২৬-৬৯৬২।

[14]. মুগনিল মুহতাজ ৩/৫৬৯; আল-মুগনী ১১/৩৭৩।

[15]. বুখারী হা/৫৯৭১; মুসলিম হা/২৫৪৮; মিশকাত হা/৪৯১১।

[16]. বুখারী হা/৭৫৩৪; মুসলিম হা/৮৫; মিশকাত হা/৫৬৮।

[17]. বুখারী হা/৫৩৫৩; মুসলিম হা/২৯৮২; মিশকাত হা/৪৯৫১।

[18]. নাসাঈ হা/২৫৩২; ইরওয়া হা/২১৭১; ছহীহুল জামে‘ হা/৮০৬৭।

[19]. আহমাদ হা/১২৫২০; ছহীহ ইবনে হিববান হা/৪৪৭; ছহীহাহ হা/২৯৬।

[20]. ফাৎহুল বারী ৯/৪০৮।

[21]. নাসাঈ হা/২৫৮২; তিরমিযী হা/৬৫৮; ইরওয়া হা/৮৮৩।

[22]. ছহীহ ইবনে খুযাইমা হা/২৩৮৫; ছহীহুত তারগীব হা/৮৯২।

[23]. হাকেম হা/১৪৭৫; ইরওয়া হা/৮৯২; ছহীহুত তারগীব হা/২৫৩৫।






স্বামীর আনুগত্য : সুখী দাম্পত্য জীবনের সোপান (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
সন্তান প্রতিপালনে ঘরোয়া সিলেবাস - গবেষণা বিভাগ, হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
ইসলামে নারীর কর্মসংস্থান : একটি পর্যালোচনা - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
মহিলাদের দাওয়াতী কাজের পদ্ধতি - সারওয়ার মিছবাহ
স্বামীর আনুগত্য : সুখী দাম্পত্য জীবনের সোপান - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
ইসলামে শাশুড়ি ও পুত্রবধূর সম্পর্ক - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
অতি রোমান্টিকতা ও বৈবাহিক জীবনের টানাপোড়েন - সারওয়ার মিছবাহ
সন্তান প্রতিপালনে কতিপয় বর্জনীয় - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
ঋতুবতী অবস্থায় মহিলাদের জন্য যেসব কাজ নিষিদ্ধ - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
সন্তান প্রতিপালনের রূপরেখা
নারীর ভরণ-পোষণের বিধান ও ফযীলত - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
আরও
আরও
.