বিবাহের খুৎবা : বিবাহে যে খুৎবা পড়া হয় তা খুৎবাতুল হাজাত নামে পরিচিত। মুখস্থ কিংবা দেখে উভয়ভাবে তা পড়া যায়। এখানে বিবাহের খুৎবা তুলে ধরা হ’ল।-
إِنَّ الحَمْدَ لِلَّهِ نَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وََمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، فَمَنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ (آل عمران 102)، يَاأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا (النساء 1)، يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا، يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا (الأحزاب 70-71) أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ، وَخَيْرَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وآله وسلم، وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ، وَكُلَّ ضَلاَلَةٍ فِى النَّار-
উপরোক্ত খুৎবাকে ‘খুৎবাতুল হাজাত’ বলা হয়।[1] ঈজাব ও কবুলের পূর্বে এ খুৎবা প্রদান মুস্তাহাব। বিবাহের খুৎবা দাঁড়িয়ে বা বসে উভয়ভাবে দেওয়া যায়।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক বিবাহ দেওয়ার উদাহরণ: এখানে উদাহরণ প্রদানের উদ্দেশ্য তাঁরা বিবাহে কোন ধরনের শব্দ ও ভাষার ব্যবহার করেছেন এবং কিভাবে বিবাহ পড়িয়েছেন তা জানানো। এভাবে বিবাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে ছাহাবী যায়েদ (রা.)-এর তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী যয়নাব বিনতে জাহাশের সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছেন,فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا ‘অতঃপর যায়েদ যখন তার স্ত্রীর নিকট থেকে তার প্রয়োজন পূর্ণ করল, আমরা তোমাকে তার সাথে বিবাহ দিলাম’ (আহযাব ৩৩/৩৭)।
এখানে অতীতকাল বাচক শব্দে বিবাহের ঈজাব ও কবুল সম্পন্ন করা হয়েছে। একই সাথে এটাও লক্ষণীয় যে, এখানে আল্লাহ তা‘আলা একাই বর ও কনের অভিভাকত্ব করেছেন এবং নিজে ঈজাব ও কবুল করে দিয়েছেন। বর ও কনের আলাদা ঈজাব ও কবুল করতে হয়নি। একইভাবে হাদীছে এসেছে,
عن سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ كُنَّا عِنْدَ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم جُلُوسًا فَجَاءَتْهُ امْرَأَةٌ تَعْرِضُ نَفْسَهَا عَلَيْهِ فَخَفَّضَ فِيهَا النَّظَرَ وَرَفَعَهُ فَلَمْ يُرِدْهَا، فَقَالَ رَجُلٌ مِنْ أَصْحَابِهِ زَوِّجْنِيهَا يَا رَسُولَ اللهِ. قَالَ أَعِنْدَكَ مِنْ شَىْءٍ. قَالَ مَا عِنْدِى مِنْ شَىْءٍ. قَالَ وَلاَ خَاتَمًا مِنْ حَدِيدٍ. قَالَ وَلاَ خَاتَمًا مِنَ حَدِيدٍ وَلَكِنْ أَشُقُّ بُرْدَتِى هَذِهِ فَأُعْطِيهَا النِّصْفَ، وَآخُذُ النِّصْفَ. قَالَ لاَ، هَلْ مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ شَىْءٌ. قَالَ نَعَمْ. قَالَ اذْهَبْ فَقَدْ زَوَّجْتُكَهَا بِمَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ.
সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদা আমরা নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকটে বসা ছিলাম। এমন সময় জনৈকা মহিলা এসে নিজেকে নবী (ছাঃ)-এর নিকট পেশ করল। নবী করীম (ছাঃ) তার আপাদমস্তক ভাল করে দেখলেন; কিন্তু তার কথার কোন উত্তর দিলেন না। একজন ছাহাবী আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তাকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কিছু আছে কি? লোকটি উত্তর করল, না, আমার কাছে কিছু নেই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, একটি লোহার আংটিও নেই? লোকটি উত্তর করল, না, একটি লোহার আংটিও নেই। কিন্তু আমি আমার পরিধানের লুঙ্গির অর্ধেক তাকে দেব আর অর্ধেক নিজে পরব। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, না। তোমার কুরআন মাজীদের কিছু কি জানা আছে? সে বলল, হ্যাঁ। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তুমি যে পরিমাণ কুরআন জান, তার পরিবর্তে তাকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিলাম’।[2] এখানেও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বর ও কনের ঈজাব-কবুল করে দিয়েছেন।
উক্ত আয়াত ও হাদীছে বর্ণিত বিয়ের ঘটনা থেকে প্রমাণ মেলে যে, বিবাহে কোন একক ব্যক্তি বর ও কনে উভয় পক্ষের উকিল হ’লে তা জায়েয হবে। তিনি সাক্ষীদের সামনে বিবাহের আকদ বা চুক্তি সম্পাদন করবেন। তিনি বলবেন, আমি বর-কনে উভয় পক্ষের উকিল হিসাবে অমুকের ছেলে অমুকের সাথে অমুকের মেয়ে অমুককে এত টাকা মহর নির্ধারণ পূর্বক আপনাদের সাক্ষী রেখে বিবাহ দিলাম। ব্যস, এতেই বিবাহ হয়ে যাবে। বর ও কনেকে আলাদাভাবে ঈজাব-কবুল করতে হবে না। এ পদ্ধতি পূর্বে বর্ণিত বিবাহের পদ্ধতিরই আরেকটি প্রকার।
কনে পক্ষের খানাপিনার আয়োজন :
বিবাহে বর ও বরযাত্রী এবং নিজেদের পরিবার ও আত্মীয় মেহমানদের জন্য কনে পক্ষ খানাপিনার আয়োজন করে থাকে। বিবাহ উপলক্ষেই মূলত খানাপিনার অনুষ্ঠান। কাজেই বিবাহের অনুষ্ঠান যেন কোনক্রমেই গৌণ এবং খাওয়া-দাওয়া মুখ্য হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকটা উভয় পক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে। বিবাহের আকদ বা অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর মেযবান পক্ষ আহার্য হিসাবে যা আয়োজন করবেন তা তৃপ্তি সহকারে সবাই খাবে। কিন্তু আমাদের সমাজে কী দেখা যায়? বিবাহ গৌণ বললে অনেকে হয়তো রেগে যাবেন। অথচ অবস্থা আয়োজন দেখলে মনে হয় উপস্থিত অনেকের নিকট খাবারের মেনু, রান্নার পদ, রান্নার মান, দই-মিষ্টি ইত্যাদিই মুখ্য। তাদের মর্জি মাফিক খাবারের আয়োজনে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি হ’লে অনেক সময় বিবাহ ভেঙে যাওয়ারও কারণ হয়। এটাই বাস্তবতা। সুতরাং খাবারের বিষয়কে কিভাবে গৌণ করা যায় তা ভাবতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, একটা মানুষ একটা মেয়াদ পর্যন্ত তার নাড়ি ছেঁড়া নয়নমণিকে পেলেপুষে বড় করে ইসলামী রীতি মেনে একটি ছেলের হাতে সমর্পণ করছে। সেতো তার জন্য এ পর্যন্ত অনেক খরচ করেছে। এখন মেয়ে সমর্পণ করতে যদি খাবারের পদ, সংখ্যা ইত্যাদিতে একটু ত্রুটি হয়ে যায় তবে কি তা ক্ষমা করা যায় না? কোন পিতা-মাতাই ইচ্ছে করে এ ধরনের অনুষ্ঠানে ত্রুটি করে না। অন্তত মেয়ের কল্যাণে তো নয়ই। নবী করীম (ছাঃ) কখনই খাবারের সমালোচনা করতেন না। কোন পদ মনে না চাইলে তিনি তা থেকে হাত গুটিয়ে নিতেন, কিন্তু সমালোচনা করতেন না। তাঁর অনুসারী হয়ে আমরা কি ভদ্রোচিত আচরণ করতে পারি না? তেমন হ’লে পরিবেশ সুন্দর হ’ত। এজন্যই আমরা অযৌক্তিক বরযাত্রী ব্যবস্থাকে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করি। খানাপিনা শেষে বৈধ রীতি-নীতি মেনে কনে পক্ষ বরের নিকট মেয়েকে সমর্পন করবে। চাইলে কনের বাড়িতেও বর রাত যাপন করতে পারে।
ওয়ালীমা ও তৎসংশ্লিষ্ট সুন্নাত :
বর পক্ষ তাদের সাধ্যমত ওয়ালীমার আয়োজন করবে। তাতে তারা সাধ্যমত সংখ্যায় লোকদের দাওয়াত দিতে পারবে। হাদীছে বরং একটি ছাগল যবেহ করে হ’লেও বরকে ওয়ালীমা করতে বলা হয়েছে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কর্তৃক নিজ বিবাহে ওয়ালীমা বিষয়টি কুরআনের সূরা আহযাবের ৫৩নং আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ إِلَّا أَنْ يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلَى طَعَامٍ غَيْرَ نَاظِرِينَ إِنَاهُ وَلَكِنْ إِذَا دُعِيتُمْ فَادْخُلُوا فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانْتَشِرُوا ‘হে ঈমানদারগণ! অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত তোমরা নবীর গৃহ সমূহে প্রবেশ করো না তোমাদের খাওয়ার জন্য আহার্য প্রস্ত্ততির অপেক্ষা না করে। তবে যখন তোমাদের ডাকা হবে, তখন প্রবেশ করো। অতঃপর খাওয়া শেষে বেরিয়ে পড়ো’ (আহযাব ৩৩/৫৩)।
তিনি তাঁর স্ত্রী ছাফিয়্যা বিনতে হুয়াইয়ের ওয়ালীমায় ছাতু ও খেজুর যোগে পাকানো ‘হায়েস’ নামক খাদ্য দিয়ে আপ্যায়ন করেছিলেন। এ মর্মে হাদীছে এসেছ,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضى الله عنه قَالَ قَدِمَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم خَيْبَرَ، فَلَمَّا فَتَحَ اللهُ عَلَيْهِ الْحِصْنَ ذُكِرَ لَهُ جَمَالُ صَفِيَّةَ بِنْتِ حُيَىِّ بْنِ أَخْطَبَ، وَقَدْ قُتِلَ زَوْجُهَا، وَكَانَتْ عَرُوسًا، فَاصْطَفَاهَا رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم لِنَفْسِهِ فَخَرَجَ بِهَا، حَتَّى بَلَغْنَا سَدَّ الرَّوْحَاءِ حَلَّتْ، فَبَنَى بِهَا، ثُمَّ صَنَعَ حَيْسًا فِى نِطَعٍ صَغِيرٍ، ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم آذِنْ مَنْ حَوْلَكَ. فَكَانَتْ تِلْكَ وَلِيمَةَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى صَفِيَّةَ، ثُمَّ خَرَجْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ،
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) খায়বার গমন করেন। যখন আল্লাহ তাঁর দুর্গের বিজয় দান করেন, তখন তাঁর সামনে ছাফিয়্যাহ (রাঃ) বিনতে হুয়াই ইবনু আখতাব-এর সৌন্দর্যের আলোচনা করা হয়। তাঁর স্বামী নিহত হয় এবং তিনি তখন ছিলেন নব-বিবাহিতা। অবশেষে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তাঁকে নিজের জন্য গ্রহণ করেন। তিনি তাঁকে নিয়ে রওয়ানা হন। যখন আমরা সাদ্দা রাওহা নামক স্থানে উপনীত হ’লাম, তখন ছাফিয়্যাহ (রাঃ) পবিত্র হলেন! তখন নবী করীম (ছাঃ) তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। তারপর চামড়ার ছোট দস্তরখানে হায়েস (খেজুরের ছাতু ও ঘি মিশ্রিত খাদ্য) তৈরী করে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমরা আশেপাশের লোকদের উপস্থিত হওয়ার জন্য খবর দাও। এই ছিল ছাফিয়্যাহ (রাঃ)-এর বিবাহে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক ওয়ালীমা। এরপর আমরা মদ্বীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই’।[3] এক বর্ণনায় ছাতু ও খেজুরের কথা আছে।[4] যয়নাব বিনতু জাহশের ওয়ালীমায় তিনি গোশত ও রুটি দিয়ে আপ্যায়ন করেছিলেন।[5]
ওয়ালীমাতে অপব্যয় ও অপচয় যাতে না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। আল্লাহ বলেন, وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ ‘তোমরা খাও ও পান কর। কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালবাসেন না’ (আ‘রাফ ৭/৩১)।
আমাদের দেশে বিবাহের বহুদিন পরেও ওয়ালীমা করার প্রচলন আছে। অথচ বাসর রাতের পরের দিন ওয়ালীমা করাই সুন্নাত। রাসূল (ছাঃ) যয়নব বিনতে জাহশ (রাঃ)-এর সাথে বাসর রাত অতিবাহিত করার পর ওয়ালীমা করেছিলেন।[6] তবে তিনদিন পর্যন্তও বিলম্বিত করা যায়। রাসূল (ছাঃ) ছাফিয়্যাহ (রাঃ)-কে বিবাহের পর তিনদিন যাবৎ ওয়ালীমা খাইয়েছিলেন।[7]
আমন্ত্রিতদের পক্ষ থেকে উপহার প্রদান :
বর পক্ষের উপলক্ষে কনে পক্ষের খানাপিনার আয়োজন একটি সামাজিক রীতি। এজন্য বর পক্ষের আগত লোকজন বাদেও কনে পক্ষ নিজেদের অনেক লোককে দাওয়াত করে। আবার বর পক্ষও সুন্নাত অনুসারে ওয়ালীমার আয়োজন করে। তাতে তারা নিজেদের লোকজন ছাড়াও কন্যা পক্ষের লোকদের দাওয়াত করে। এমন দাওয়াতে উপহার আদান-প্রদানের রীতিও সামাজিকভাবে বহুল প্রচলিত। কেউ দাবী করে না বটে, কিন্তু সচলন হিসাবে প্রায় সবাই উপহার নিয়ে আসে। কেউ না আনলে তাকে লজ্জিত হতে হয়। মেযবানেরও উচিত উপহার না দিতে আমন্ত্রিতদের আগে থেকে বলা। উপহারের জন্য লালায়িত হ’লে দাওয়াত না দেওয়াই ভালো। তাতেও অনুষ্ঠান ছোট হয়ে আসবে। মেযবানের খরচ কমবে। কাউকে খাইয়ে উপহার গ্রহণ যে কোন বিচারে অপ্রীতিকর। কন্যা বিদায় ও ওয়ালীমা বা বৌভাতের উভয় অনুষ্ঠানে উপহার আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে উক্ত কথা প্রযোজ্য। কিন্তু সমাজ এ অপ্রীতিকর কাজকে এমনভাবে আত্মস্থ করে নিয়েছে যে, যেন তা মোটেও দোষণীয় নয়।
উল্লেখ্য, বিবাহে বা ওয়ালীমাতে উপহার কামনার বিষয়টি শরী‘আত সম্মত নয়। রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের যুগে এ প্রথার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাছাড়া এতে গরীব আত্মীয়-স্বজনকে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘নিকৃষ্ট খানা হ’ল ওয়ালীমার ঐ খানা, যাতে কেবল ধনীদের দাওয়াত দেওয়া হয় এবং গরীবদের বাদ দেওয়া হয়’।[8] বর্তমান যুগে বিবাহ এবং ওয়ালীমাতে উপহারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। যাতে গরীব আত্মীয়গণ লজ্জায় পড়েন। সেকারণ তাক্বওয়ার দাবী হ’ল সকল প্রকার বাড়াবাড়ি ও প্রদর্শনী হ’তে দূরে থাকা এবং এই অনুষ্ঠানগুলিকে সহজ ও অনাড়ম্বর করা।
যৌতুক ও ব্যবহার্য সামগ্রী :
বিবাহে যৌতুক আদান-প্রদান এ দেশের সরকারী আইনে নিষিদ্ধ। ইসলামী আইনেও বিবাহে যে কোন পক্ষের যৌতুক নেওয়া হারাম। যৌতুক নিঃসন্দেহে মেয়ে ও তার পরিবারের উপর যুলুম। এক সময় মেয়ের বিবাহ যৌতুক ছাড়া কল্পনাই করা যেত না। বর্তমানে শিক্ষা-দীক্ষার প্রসার, সরকারী উদ্যোগ, দ্বীনী আলোচনা, যৌতুকের বিরুদ্ধে লেখালেখি, সামাজিক সচেতনতা ইত্যাদি কারণে যৌতুকের দাবী নিম্নমুখী হয়েছে। তবে আমরা চাই, তা একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে আসুক। মনে রাখতে হবে, যৌতুক ঘুষের নামান্তর। ছেলেপক্ষ মেয়ে পক্ষ থেকে দাবীকৃত অর্থ ও জিনিসপত্র পেলে তবেই বিবাহে রাজী হবে। ঘুষও কর্তৃপক্ষকে অর্থের বিনিময়ে রাজী করিয়ে স্বার্থ উদ্ধারের জন্য দেওয়া হয়। ঘুষ নেওয়া যেমন কবীরা গুনাহ, তেমনি যৌতুক নেওয়াও কবীরা গুনাহ। আজ যে ছেলের বিবাহে অন্যায়ভাবে যৌতুক নিচ্ছে কাল নিজের মেয়ের বিবাহে তাকেই যৌতুক দিতে হবে। যৌতুকের অভাবে মেয়ে বিবাহ দিতে না পারলে তখন আফসোসের সীমা থাকবে না। যৌতুক ছাড়া নিরীক্ষণ সামগ্রী, সাংসারিক ব্যবহার্য দ্রব্য, ঘরের আসবাবপত্র ইত্যাদি সামগ্রী মেয়ে পক্ষ ছেলের বাড়িতে ব্যবহারের জন্য দিয়ে থাকে। এগুলো মেয়ের অভিভাবক খুশি মনে সাধ্য-মতো যা পারে দেওয়ায় নীতিগতভাবে কোন অসুবিধা নেই। নবী করীম (ছাঃ) তাঁর ছোট মেয়েকে বিবাহে জামা-কাপড়, খাট, বিছানা, বালিশ, পাটি, জাঁতা, থালাবাসন ইত্যাদি কিনে দিয়েছিলেন।[9] হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَلِيٍّ قَالَ: جَهَّزَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاطِمَةَ فِي خَمِيلٍ وَقِرْبَةٍ وَوِسَادَةٍ مِنْ أَدَمٍ حَشْوُهَا لِيفٌ.
আলী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফাতেমা (রাঃ)-কে একটা মোটা কাপড়ের চাদর, একটা মশক ও একটা ইযখারের আঁশ ভরা চামড়ার বালিশ উপহার হিসাবে দিয়েছিলেন’।[10] বিবাহে মেয়েকে উপলক্ষ করে দেওয়া এসব দ্রব্যাদিকে ‘জিহায’ বলা হয়। কিন্তু ছেলে পক্ষ দাবী করে এগুলো আদায় করলে তা বৈধ হবে না। মেয়ে নিয়ে পিতা-মাতাকে যেন কোন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা পোহাতে না হয় সেটা জামাই ও তার পরিবারকে নিশ্চিত করতে হবে। উল্লেখ্য, লেনদেনের কোন শর্তসাপেক্ষে বিবাহ করা যাবে না। কেননা তা যৌতুক, যা ইসলামে হারাম।[11]
পরিশেষে বলব, ইসলামে বিবাহ একটি সুন্নাতী বিধান। এটা শরী‘আত নির্দেশিত পন্থায় সম্পন্ন করা যরূরী। শরী‘আতের নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে সমাজে প্রচলিত পদ্ধতিতে তা সম্পন্ন করলে এতে আল্লাহর রহমত থাকবে না। পক্ষান্তরে কুরআন-হাদীছের আলোকে সম্পন্ন হ’লে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করবে এবং পরিবারে সুখ-শান্তি বিরাজ করবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইসলামী শরী‘আত মেনে চলার তাওফীক দান করুন-আমীন!
[1]. তিরমিযী হা/১১০৫; ইবনু মাজাহ হা/১৮৯২-৯৩; নাসাঈ হা/১৪০৪; মিশকাত হা/৩১৪৯।
[2]. বুখারী হা/৫১৩২, ৫১৪৯; মিশকাত হা/৩২০২।
[3]. বুখারী হা/২২৩৫, ৬৩৬৩; মুসলিম হা/১৩৬৫; মিশকাত হা/৫৯১৩।
[4]. আবূদাঊদ হা/৩৭৪৪; তিরমিযী হা/১০৯৫; ইবনু মাজাহ হা/১৯০৯।
[5]. মুসলিম হা/১৪২৮; মিশকাত হা/৩২১২।
[6]. বুখারী হা/৫১৭০।
[7]. মুসনাদে আবু ইয়া‘লা হা/৩৮৩৪, সনদ হাসান।
[8]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩২১৮।
[9]. আহমাদ হা/৬৪৩, ৭১৫, সনদ শক্তিশালী।
[10]. হাকেম হা/২৭৫৫; ছহীহ ইবনে হিববান হা/৬৯৪৭, সনদ ছহীহ।
[11]. ইবনু আবী শায়বাহ হা/১৭৩৮৪-৮৫; ইবনু হাযম, মুহাল্লা ৯/৫০।