উপস্থাপনা : সুশিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। আদর্শবান শিক্ষার্থীরা দেশ ও জাতির ভবিষ্যত কর্ণধার। সেকারণ তাদেরকে অবশ্যই সৎ ও চরিত্রবান রূপে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের সৎ ও চরিত্রবান রূপে গড়ে তোলার মহান কারিগর। আর চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ গড়ে তোলার ক্ষেত্র হ’ল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা মানব জীবনে অপরিহার্য হ’লেও প্রচলিত এই সহশিক্ষা ব্যবস্থায় মারাত্মক নৈতিক অবক্ষয় হচ্ছে। নাস্তিকরা এটিকে ‘প্রগতি’ ও ‘সমতা’র প্রতীক মনে করে। অথচ বাস্তবে এটি মূল্যবোধের অবক্ষয় ও নৈতিক বিপর্যয়ের প্রধানতম উৎস। আলোচ্য নিবন্ধে সহশিক্ষার কুপ্রভাব এবং ইসলামের দৃষ্টিতে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বিধৃত হ’ল।-
সহশিক্ষা কি? Co-education বা সহশিক্ষাকে সংক্ষেপে কো-এড বলা হয়। যেখানে ছেলে ও মেয়ে একইসঙ্গে, একই ক্লাসে, একই রুমে পড়ালেখা করে।
সহশিক্ষার সূত্রপাত : ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সহশিক্ষা পদ্ধতি ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে সহশিক্ষা নামক বিষফোঁড়া মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান বিশ্বে পশ্চিমা সংস্কৃতির আলোকে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে সহশিক্ষা নামক এই ভাইরাস। তবে বহু মুসলিম দেশে এখনো মুসলিম সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে একক শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত আছে।[1]
সহশিক্ষার কুপ্রভাব : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ :
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হাযার হাযার শিক্ষার্থী পড়ালেখা সমাপ্ত করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে কর্মরত আছে। তাদের অনেকে মারাত্মক দুশ্চরিত্র ও চরম দুর্নীতিবাজ। প্রশ্ন হ’ল, উচ্চশিক্ষা লাভ করেও তারা চরিত্রহীন হ’ল কেন? যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে চরিত্রবান লোক বের হওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকে বের হচ্ছে চরিত্রহীন, লম্পট, প্রতারক। এজন্য মূলত আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাই দায়ী। কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সহশিক্ষা নামক আত্মঘাতি ব্যবস্থা চালু আছে। যা ছাত্রজীবন থেকেই আমাদের চরিত্র ধ্বংসে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের মত ৯০% মুসলিম প্রধান দেশে যা আদৌ কাম্য হ’তে পারে না। নিম্নে সহশিক্ষার কুপ্রভাব তুলে ধরা হ’ল।-
১. সহশিক্ষা সংক্রামক ব্যাধির চাইতেও ভয়াবহ : সহশিক্ষা ছাত্র-ছাত্রীদেরকে অতি অল্প বয়সে চরিত্রহীন হ’তে সহায়তা করছে। কেননা সহশিক্ষায় রয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের অবাধ চলাফেরার সুযোগ। যেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা একাকার হয়ে মিলেমিশে চলাফেরা করে। এখানে ইসলামের অমোঘ বিধান পর্দাব্যবস্থা মানা হয় না। সেটাই হচ্ছে সহশিক্ষা। এই সহশিক্ষা নামক সংক্রামক ব্যাধিই শিক্ষার্থীদের চরিত্রকে চরমভাবে কলুষিত করছে।
২. ইসলামের দর্পণে সহশিক্ষা : সহশিক্ষায় ইসলামী পর্দার বিধানকে বাঁকা চোখে দেখা হয়। যারা পর্দা মেনে চলতে চায়, তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। যারা যত নগ্নভাবে চলে তাদেরকে সাধুবাদ দেয়া হয়। সহশিক্ষা মানেই পর্দাহীনতা। কলেজ-ভার্সিটির সর্বত্র চলছে আজ নগণতা, অশ্লীলতা ও অবৈধ প্রেম-প্রীতি। প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীরা আজ মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সহশিক্ষার কুপ্রভাবে বিপর্যস্ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হ’ল উন্নত চরিত্র গঠন করে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি লাভ করা। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় চরিত্র নষ্ট হয় এবং অবাধ যৌনাচারের পথ দেখায়, সেই শিক্ষা দ্বারা আমাদের কি লাভ হচ্ছে? এ শিক্ষার মাধ্যমে জাতি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক উন্নয়ন ও চারিত্রিক উৎকর্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। দিন শেষে অমানবিক, অনৈতিক ও চরিত্রহীন মানুষে পরিণত হচ্ছে।
ইসলামে সহশিক্ষা নিষিদ্ধ। কেননা এটি নৈতিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। এটি স্বেচ্ছাচারিতা, বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করে। অথচ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বহু স্থানে নারী ও পুরুষের একাকার হওয়াকে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، ‘নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (নূর ২৪/১৯)।
৩. সহশিক্ষায় চোখের যেনা : ক্লাসের ফাঁকে চোখের চোরা চাহনির লোলুপ আক্রমণে সহশিক্ষার অভিসারীরা পরস্পরে চোখের যেনায় লিপ্ত হয়। অথচ চোখের যেনা ও লজ্জাস্থানের যেনা থেকে মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, وَلَا تَقْرَبُوْا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ’ (ইসরা ১৭/৩২)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আদম সন্তানের জন্য ব্যভিচারের অংশ নির্ধারিত রয়েছে, যা সে অবশ্যই লাভ করবে। যেমন- চোখের যেনা হ’ল দেখা, জিহবার যেনা হ’ল কথা বলা, হাতের যেনা হ’ল ধরা, পায়ের যেনা হ’ল চলা। আর মন সেটার আকাঙ্ক্ষা করে ও কামনা করে। আর গুপ্তাঙ্গ সেটাকে সত্য অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে’।[2]
৪. সহশিক্ষায় সতীত্ব হরণ : পরিণত বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য সহশিক্ষার ফলে সতীত্ব হরণ পর্যন্ত হয়ে থাকে। তারা ছুটির সময়ে বিভিন্ন পার্কে, রাস্তার ধারে, আড়ালে-আবডালে প্রেম বিনিময় করে। এর মাধ্যমে সতীত্ব হারানোর মরণযাত্রা শুরু হয়। অথচ রাসূল (ছাঃ) বলেন,لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثُهُمَا الشَّيْطَانَ- ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যেন কোনও পরনারীর সঙ্গে নির্জনে একাকী না হয়, কারণ তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান’।[3] এমনকি হজ্জের পবিত্র সফরেও একাকী গমন করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ وَلاَ تُسَافِرَنَّ امْرَأَةٌ إِلاَّ وَمَعَهَا مَحْرَمٌ، فَقَالَ رَجُلٌ : يَا رَسُولَ اللهِ اكْتُتِبْتُ فِي غَزْوَةِ كَذَا وَكَذَا وَخَرَجَتِ امْرَأَتِي حَاجَّةً، قَالَ : اذْهَبْ فَاحْجُجْ مَعَ امْرَأَتِكَ- ‘কোন পুরুষ যেন কখনও কোন নারীর সাথে একত্রিত না হয় এবং কোন নারী যেন মাহরাম ব্যতীত একাকী ভ্রমণে বের না হয়। তখন এক ব্যক্তি বলে উঠল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! অমুক যুদ্ধে আমার নাম লেখানো হয়েছে, আর আমার স্ত্রী একাকী হজ্জের সফরে রওয়ানা হয়েছে। রাসূল বললেন, যাও তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে হজ্জব্রত পালন কর’।[4]
৫. বেপর্দা বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার জন্ম দেয় : সহশিক্ষা শিক্ষার্থীদের মাঝে পারস্পরিক গোপনীয়তা ও পর্দার সীমা ধ্বংস করে দেয়। তারা একে অপরের সাথে স্বাভাবিকভাবে মেলামেশা করে, যা ইসলাম সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। বেহায়াপনার বিপরীতে লজ্জাশীলতাকে ইসলাম আবশ্যক গণ্য করেছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلاَمِ النُّبُوَّةِ إِذَا لَمْ تَسْتَحِى فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ- ‘বিগত নবী-রাসূলগণের সর্বসম্মত বাণী সমূহ যা মানব জাতি প্রাপ্ত হয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হ’ল, যখন তোমার লজ্জা-শরম না থাকে, তখন তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পার’।[5] অন্যদিকে আল্লাহ বলেন, وَلاَ تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ، ‘তোমরা প্রকাশ্য বা গোপন কোন প্রকার অশ্লীলতার নিকটবর্তী হয়ো না’ (আন‘আম ৬/১৫১)। অন্যত্র তিনি বলেন,قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ، ‘তুমি বল, নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক প্রকাশ্য ও গোপন সকল প্রকার অশ্লীলতা হারাম করেছেন এবং হারাম করেছেন সকল প্রকার পাপ ও অন্যায় বাড়াবাড়িকে’ (আ‘রাফ ৭/৩৩)।
৬. বিবাহপূর্ব অবৈধ সম্পর্ক : সহশিক্ষা থেকে বিবাহপূর্ব অবৈধ প্রেম-প্রীতি, বন্ধুত্ব, হৃদ্যতা, চ্যাটিং, ডেটিং হয়ে থাকে। বিপরীত লিঙ্গের চৌম্বিক আকর্ষণে শিক্ষার্থীরা পরস্পরের দিকে আকৃষ্ট হয়। আবার এসব অবৈধ সম্পর্ক থেকে যেনা-ব্যভিচারের পথ উন্মুক্ত হয়। অতএব জাতির পরবর্তী প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে অনতিবিলম্বে সহশিক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ করে ছেলে ও মেয়েদের পৃথক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। অন্যথা তারা নৈতিকতা বিবর্জিত এক অথর্ব জাতিতে পরিণত হবে।
৭. পর্দার বিধান লঙ্ঘন : প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের একসাথে পড়াশুনা করা শরী‘আত বিরোধী কাজ। এছাড়াও এটি মানুষের স্বভাবধর্মের বিরোধী এবং পারস্পরিক নীতি-নৈতিকতার জন্য চরম ক্ষতিকর। যরূরী প্রয়োজনে মহিলাদেরকে ঘর থেকে বের হ’তে হ’লে সৌন্দর্যের গোপনীয়তা বজায় রেখে বের হ’তে বলা হয়েছে। তারা আপাদমস্তক ঢেকে বের হবে। কারণ মহিলারা আবৃত থাকার জন্য আদিষ্ট। আর যখন তারা বেপর্দা হয়, তখন শয়তান তার দিকে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে কিভাবে তাদের দ্বারা গুনাহের কাজ করানো যায়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ- ‘নারী হ’ল আবরণীয় জিনিস। যখন সে বের হয় শয়তান তাকে চোখ তুলে দেখে’।[6] পর্দার বিধান লঙ্ঘনের কারণে সমাজে বিপর্যয় নেমে আসে। আল্লাহ্র রহমত, বরকত উঠে যায়। আমাদের দেশে সহশিক্ষা ও কর্মস্থলে কারণে পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় মারাত্মক অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। যার কুপ্রভাব প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে বিবাহ বহির্ভূত অবৈধ সম্পর্ক এবং বিবাহ পরবর্তী পরকীয়া। যা ইসলামের শান্তিপূর্ণ পারিবারিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
৮. চারিত্রিক অবক্ষয় ও লজ্জাশীলতা ধ্বংস : শালীনতা ও লজ্জাশীলতাকে ধ্বংস করে দেয় সহশিক্ষা। অথচ শালীনতা ও লজ্জাশীলতা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। হাদীছে এসেছে, ‘রাসূল (ছাঃ) একবার জনৈক আনছারী ছাহাবীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন এমতাবস্থায় যে, তিনি তার ভাইকে লজ্জা-শরম সম্পর্কে উপদেশ দিচ্ছিলেন। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, دَعْهُ، فَإِنَّ الْحَيَاءَ مِنَ الْإِيمَانِ ওকে ছাড়ো! কেননা লজ্জাশীলতা ঈমানের অংশ’।[7] অন্যত্র তিনি বলেন,اَلْحَيَاءُ لاَ يَأْتِي إِلاَّ بِخَيْرٍ وَفِي رِوَايَةٍ : الْحَيَاءُ خَيْرٌ كُلُّهُ- ‘লজ্জাশীলতা কেবল কল্যাণই আনায়ন করে। অপর বর্ণনায় এসেছে, ‘লজ্জাশীলতার সবটুকু কেবলই মঙ্গল’।[8] তিনি বলেন,اَلْحَيَاءُ مِنَ الْإِيمَانِ وَالْإِيمَانُ فِي الْجَنَّةِ. وَالْبَذَاءُ مِنَ الْجَفَاءِ وَالْجَفَاءُ فِي النَّارِ- ‘লজ্জাশীলতা ঈমানের অঙ্গ। আর ঈমানদার জান্নাতে যাবে। পক্ষান্তরে নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা মন্দ কাজ। আর মন্দ লোক জাহান্নামে যাবে’।[9]
৯. বিকৃত মানসিকতা ও ডিপ্রেশন : সহশিক্ষার ফলে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের প্রেমঘটিত প্রত্যাখ্যান, প্রতারণা, ব্রেক-আপ, ছ্যাঁকা-ছলনা, মান-অভিমান থেকে আত্মহত্যা, এমনকি খুনাখুনির মতো ঘটনাও ঘটে যায়। অতএব অভিভাবকদের সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যত বিনির্মাণে সহশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হ’তে সন্তানকে দূরে রাখা কর্তব্য।
১০. ইসলামী আদব-শিষ্টাচার ভূলুণ্ঠিত : যারা ইসলামী পর্দা, আখলাক, চরিত্র, শালীনতা, লজ্জাশীলতা, সৃজনশীলতা, নম্রতা-ভদ্রতা ধরে রাখতে চায়, তারা সহশিক্ষা ব্যবস্থায় কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সহশিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলিতে ইসলামী শিষ্টাচার, আদব-আখলাক চরমভাবে উপেক্ষিত। প্রতিষ্ঠান থেকে পর্দার কোন নির্দেশনা থাকে না। সচেতন অভিভাবক ও তাক্বওয়াশীল শিক্ষার্থীরা নিজস্ব উদ্যোগে যতটুকু পর্দা মেনে চলে, কেবল ততটুকুই।
ইসলামে নারী শিক্ষার বিধান :
নারীদেরকে উচ্চশিক্ষা লাভ করতে ইসলাম সব সময় উৎসাহিত করেছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর স্বর্ণযুগে পর্দা করেও নারীরা ইলম অর্জনে অগ্রগামী ছিলেন। একদা কয়েকজন নারী এসে রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে আবেদন করেন,غَلَبَنَا عَلَيْكَ الرِّجَالُ فَاجْعَلْ لَنَا يَوْمًا مِنْ نَفْسِكَ، ‘আমাদের চেয়ে পুরুষরা আপনার নিকট বেশী সময় পেয়ে থাকে। অতএব আপনি আমাদের দ্বীন শিক্ষার জন্য একটি দিন নির্ধারণ করে দিন। তখন রাসূল (ছাঃ) তাদের জন্য একটি বিশেষ দিন নির্ধারণ করে দেন। যেদিন তিনি তাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দিতেন ও নির্দেশনা প্রদান করতেন।[10]
ইসলামের নির্দেশনা হ’ল নারীদের আপদমস্তক আবৃত রাখা (আহযাব ৩৩/৫৯)। কেননা পর্দা আমাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত ও দৃষ্টিকে নত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে (নূর ২৪/৩০-৩১)। এখানে মুমিন নারী-পুরুষ সকলের জন্যই দৃষ্টি এবং যৌনাঙ্গের হেফাযতের মাধ্যমে পর্দার বিধান বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ফলে যে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামী পর্দার বিধান উপেক্ষিত হয়, সেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলাম সমর্থন করে না। অতএব নারী-পুরুষ পৃথক অবস্থানে থেকে পর্দা রক্ষা করে শিক্ষা অর্জন করবে, এটাই ইসলামের চিরন্তন বিধান।
সহশিক্ষার ভয়াবহতা হ’তে বাঁচতে আমাদের করণীয় : এতক্ষণ ইসলামের দৃষ্টিতে সহশিক্ষার ভয়াবহতা উপস্থাপন করা হ’ল। এক্ষণে আমরা সহশিক্ষার ভয়াবহতা হ’তে উত্তরণের পথ সম্পর্কে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।-
১. ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা : ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা অথবা একই প্রতিষ্ঠানে পৃথক শিফটিং পদ্ধতি চালু করা। এক্ষেত্রে অবশ্যই মেয়েদের জন্য নারী শিক্ষিকা ও ছেলেদের জন্য পুরুষ শিক্ষকের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
২. ইসলামী শিক্ষার পূর্ণ বিকাশ : মাদ্রাসা শিক্ষা ও সাধারণ আধুনিক শিক্ষার দ্বিমুখী ধারাকে সমন্বিত করে একক ইসলামী শিক্ষার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।[11] বিগত যুগে ইসলামী শিক্ষার বরকতেই মুসলমানগণ হাযার বছর যাবৎ জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশ্বনেতৃত্বের আসনে সমাসীন ছিলেন। এখন সহশিক্ষা এসে সব ধ্বংস করে দিয়েছে। সেই ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা আবার ফিরিয়ে আনার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদেরকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হ’তে হবে।
৩. সহশিক্ষার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা : সহশিক্ষা মূলত শয়তানী ফাঁদ। এই চোরাগলিতে প্রবেশ করেই অধিকাংশ মুসলিম তাদের ঈমানী শক্তিকে শয়তানের কাছে যিম্মী করে ফেলে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সহশিক্ষার বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালাতে হবে।
৪. বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির সংস্কার করা : দেশে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির সংস্কার করা সময়ের অপরিহার্য দাবী। স্কুল-কলেজে বিদ্যমান পাঠ্যবই অধ্যয়ণ করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঈমানহারা, ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদী ও হিন্দুত্ববাদী মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে। বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে জাতীয় শিক্ষাবোর্ড সহ অন্যান্য সকল বোর্ডের নিয়ন্ত্রণমূলক গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদগুলোতে মুসলমানদের বাদ দিয়ে হিন্দুদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির সংস্কার করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. মিডিয়ায় ইসলামী দাওয়াহ ও গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা : সহশিক্ষার কুপ্রভাব, সহশিক্ষার ভয়াবহতা শিরোণামে বক্তৃতা-বিবৃতি, লিফলেট, গণসংযোগ, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, আবৃত্তি, অডিও-ভিডিও কন্টেন্ট প্রচার সহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাওয়াতী কাজ জোরদার ও গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সহশিক্ষার কুফল সম্পর্কে সমাজের প্রতিটি স্তরে সাধ্যমতো প্রচারণা চালাতে হবে।
৬. ইসলামী শিক্ষাকে প্রাধান্য ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া : ইসলামী শিক্ষা মানুষের সার্বিক জীবন পরিচালনার জন্য সামগ্রিক উপাদান সমৃদ্ধ একটি সমন্বিত শিক্ষার নাম। দেশের সকল স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থায় বাধ্যতামূলকভাবে ইসলামী শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
৭. কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা : অহি-র জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাই হ’ল ইসলামী শিক্ষা। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণী থেকে স্নাতকোত্তর শ্রেণী পর্যন্ত সকল পর্যায়ে ইসলামী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যরূরী। কেননা ইসলামী শিক্ষার পূর্ণ বিকাশ সাধনের মধ্যেই বাংলাদেশের উন্নতি ও অগ্রগতি নিহিত। এমনকি ইসলামী শিক্ষার মধ্যেই রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের নিশ্চিত গ্যারান্টি।
সমাপনী : সহশিক্ষা ব্যবস্থা ইসলামী পর্দা, শালীনতা ও চরিত্র গঠনের বিপরীতমুখী একটি ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা। এটি সমাজে যেনা-ব্যভিচার, বেহায়াপনা-বেলেল্লাপনা ও নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের কারণ। মুসলিমপ্রধান দেশ হিসাবে আমাদের উচিত শিক্ষাব্যবস্থায় প্রকৃত ইসলামী মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং সন্তানদের নিরাপদ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও ইসলামী শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন- আমীন!
ড. ইহসান ইলাহী যহীর
কোরপাই, বুড়িচং, কুমিল্লা।
[1]. https://en.wikipedia.org/wiki/Mixed-sex_education
[2]. মুসলিম হা/২৬৫৭; বুখারী হা/৬২৪৩; মিশকাত হা/৮৬।
[3]. তিরমিযী হা/১১৭১; মিশকাত হা/৩১১৮; ছহীহুত তারগীব হা/১৯০৮।
[4]. বুখারী হা/৩০০৬; মুসলিম হা/১৩৪১; মিশকাত হা/২৫১৩।
[5]. বুখারী হা/৩৪৮৪; মিশকাত হা/৫০৭২।
[6]. তিরমিযী হা/১১৭৩; মিশকাত হা/৩১০৯; ইরওয়া হা/২৭৩।
[7]. বুখারী হা/২৪; মুসলিম হা/৩৬; মিশকাত হা/৫০৬৯।
[8]. বুখারী হা/৬১; মুসলিম হা/৩৭; মিশকাত হা/৫০৭০।
[9]. তিরমিযী হা/২০০৯; ইবনু মাজাহ হা/৪১৪৮; মিশকাত হা/৫০৭৬; ছহীহাহ হা/৪৯৫।
[10]. বুখারী হা/১০১।
[11]. শিক্ষা ব্যবস্থা : প্রস্তাবনা সমূহ পৃ. ৩০।