ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ) (পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মদীনায় হিজরত :

ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ) আবিসিনিয়ায় (হাবশায়) হিজরতকারী মুসলমানদের অগ্রগামী ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই আবিসিনিয়ায় হিজরত হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গে পুনরায় মদীনায় হিজরত করেন। এ কারণে তাঁকে ‘যুল হিজরাতাইন’ (ذو الهجرتين) বা দুই হিজরতের অধিকারী বলা হয়। মদীনায় হিজরতের ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রগামী মুহাজিরদের অন্যতম ছিলেন। মদীনায় হিজরতের সময় পরিবারের কাউকেই তিনি মক্কায় রেখে যাননি। পরিবারের সকল পুরুষ ও নারী সদস্যকে নিয়ে হিজরত করেছিলেন।[1] আয়েশা বিনতে কুদামা বলেন, ওছমান, কুদামা ও আব্দুল্লাহ তিন ভাই এবং মু‘আম্মার বিন হারিছ মদীনায় হিজরত করে আব্দুল্লাহ বিন সালামা আল-আজলানীল বাড়ীতে অবস্থান করেন। ওয়াকেদী বলেন, মাযঊন পরিবার হিজরতে এতটাই সম্পূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন যে, মক্কায় তাদের বড়ীগুলো পুরো খালি হয়ে গিয়েছিল।[2]

যুদ্ধে অংশগ্রহণ :

ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ) মদীনায় হিজরতের পর বেশী দিন জীবিত ছিলেন না। দ্বিতীয় হিজরীতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সেকারণ যুদ্ধে শরীক হওয়ার তেমন কোন সুযোগ তিনি পাননি। তবে দ্বিতীয় হিজরী সনে সংঘটিত ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলাম ও কুফরের মধ্যে পার্থক্যকারী ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। তিনি, তার ভাই আব্দুল্লাহ ও পুত্র সায়েব বীরত্বের সাথে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর হায়াতের গাড়ী ইতিমধ্যে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। যুদ্ধ থেকে মদীনায় ফেরার সময় পথিমধ্যে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এই অসুখেই ইহজগতের মায়াজাল ছিন্ন করে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে অন্তহীন পথের যাত্রী হন।[3]

রাসূল (ছাঃ)-এর ভালোবাসা :

তিনি সেই সৌভাগ্যশালী ছাহাবী, যার মৃত্যুর পর স্বয়ং রাসূল (ছাঃ) তার কপালে মুহাববতের পরশমাখা চুমো দিয়ে অঝোর নয়নে কেঁদেছিলেন। রাসূলের নীরব অশ্রুবিন্দু তাঁর দুই কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়েছিল। আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَبَّلَ عُثْمَانَ بْنَ مَظْعُونٍ وَهُوَ مَيِّتٌ وَهُوَ يَبْكِي، أَوْ قَالَ: عَيْنَاهُ تَذْرِفَانِ، ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মৃত ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)-কে চুম্বন করেন এবং কাঁদেন। তিনি (রাবী) বলেন, এ সময় তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে’।[4] অন্য বর্ণনামতে আয়েশা (রাঃ) বলেন, فَكَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى دُمُوعِهِ تَسِيلُ عَلَى خَدَّيْهِ، ‘আমি যেন এখনো তাঁর দু’গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে দেখছি’।[5]

ইবনু আববাস (রাঃ)-এর বর্ণনা মতে, ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ) যখন মৃত্যুবরণ করেন রাসূল (ছাঃ) তার মুখের কাপড় সরিয়ে দুই চোখের মাঝখানে কপালে চুমো দেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে কাঁদেন। অতঃপর তাঁকে খাটিয়ায় উঠানোর সময় বলেন, طُوبَى لَكَ يَا عُثْمَانُ، لَمْ تَلْبَسْكَ الدُّنْيَا وَلَمْ تَلْبَسْهَا ‘সুসংবাদ তোমার জন্য, হে ওছমান! দুনিয়া তোমাকে কলুষিত করতে পারেনি, আর তুমিও দুনিয়ার মোহে নিজেকে জড়াওনি’।[6]

উল্লেখ্য যে, মৃত ব্যক্তির শোকে মাতম করা, চিৎকার করে কান্নাকাটি করা, বুক চাপড়ানো, কাপড় ছিঁড়া ইত্যাদি শরী‘আতে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই আমরা তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল, জান ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা। আর তুমি সূসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের। যাদের উপর কোন বিপদ আসলে তারা বলে, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর দিকেই ফিরে যাব’ (বাক্বারাহ ২/১৫৫-১৫৬)। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ، ‘ঐ ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে শোকে গাল চাপড়ায়, জামার বুক ছিঁড়ে এবং জাহেলী যুগের ন্যায় চিৎকার করে মাতম করে’।[7] তিনি আরো বলেন,أَرْبَعٌ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَا يَتْرُكُونَهُنَّ: الْفَخْرُ فِي الْأَحْسَابِ وَالطَّعْنُ فِي الْأَنْسَابِ وَالْاسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ، وَالنِّيَاحَةُ، وَقَالَ:النَّائِحَةُ إِذَا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِهَا، تُقَامُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَلَيْهَا سِرْبَالٌ مِنْ قَطِرَانٍ، وَدِرْعٌ مِنْ جَرَبٍ، ‘আমার উম্মতের মধ্যে জাহেলী যুগের চারটি স্বভাব রয়েছে, যা তারা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবে না। সেগুলো হ’ল- ১. বংশ-মর্যাদা নিয়ে অহংকার করা, ২. অন্যের বংশ-পরিচয় নিয়ে কটাক্ষ করা, ৩. নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা (অর্থাৎ নক্ষত্রকে বৃষ্টির কারণ বা প্রভাবক মনে করা) এবং ৪. মৃত ব্যক্তির জন্য উচ্চস্বরে বিলাপ বা মাতম করা। এরপর তিনি বলেন, যে নারী (বা ব্যক্তি) মৃতের জন্য বিলাপ ও মাতম করে, সে যদি মৃত্যুর পূর্বে তওবা না করে, তবে ক্বিয়ামতের দিন তাকে এমন অবস্থায় দাঁড় করানো হবে যে, তার পরনে থাকবে গলিত আলকাতরার (কাতরান) পোষাক এবং খোস-পাঁচড়াজনিত পুঁজে-আচ্ছাদিত একটি বর্ম’।[8]

তবে কারো বিয়োগ ব্যথায় স্বাভাবিকভাবে চোখের পানি ফেলা ও নীরবে কান্না করা জায়েয। যেমনটি রাসূল (ছাঃ) ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)-এর ক্ষেত্রে করেছিলেন। দুনিয়াত্যাগী পরহেযগার এই সাথীর বিদায় যেন তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। হৃদয়ের গভীরে এক কষ্টকর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল তাঁর দু’চোখ দিয়ে। একইভাবে স্বীয় পুত্র ইবরাহীম (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময়ও রাসূল (ছাঃ) নীরবে কেঁদেছিলে এবং বলেছিলেন,إِنَّ الْعَيْنَ تَدْمَعُ وَالْقَلْبَ يَحْزَنُ وَلَا نَقُولُ إِلَّا مَا يَرْضَى رَبُّنَا، ‘নিশ্চয়ই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, হৃদয় দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়; তবে আমরা কেবল সে কথাই বলি যা আমাদের রবের সন্তুষ্টির কারণ হয়’।[9]
প্রিয় পাঠক! কতইনা সৌভাগ্যবান ছাহাবী ছিলেন তিনি। যার প্রতি রাসূল (ছাঃ)-এর ভালোবাসা এতটাই গভীর ছিল যে, তিনি ওছমানের বিদায়ে অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না। এমনকি মমতার পরশ বুলিয়ে শেষবারের মত মৃত ওছমানের কপালে হৃদয়ের আকুতি মিশ্রিত চুমো দিয়ে বিদায় জানালেন।
মৃত্যু :
আনুগত্য ও ইবাদতে পরিপূর্ণ এক নাতিদীর্ঘ পথচলা শেষে এই মহান ছাহাবী মৃত্যুর বিছানায় শায়িত হ’লেন। খারিজাহ বিন যায়েদ বিন ছাবিত (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, উম্মুল ‘আলা নামক জনৈকা আনছারী মহিলা, যিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে বায়‘আত গ্রহণ করেছিলেন, তিনি বলেন, (হিজরতের পর) লটারির মাধ্যমে মুহাজিরদেরকে আনছারদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হচ্ছিল। আমাদের ভাগে আসলেন ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)। আমরা তাঁকে আমাদের ঘরের মেহমান করে নিলাম। এরপর তিনি এমন এক ব্যথায় আক্রান্ত হ’লেন, যে ব্যথায় তার মৃত্যু হ’ল। মৃত্যুর পর তাঁকে গোসল দেয়া হ’ল। তাঁর কাপড় দিয়েই তাঁকে কাফন পরানো হ’ল’।[10] তিনি সেই সৌভাগ্যবান ছাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা রাসূল (ছাঃ)-এর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। রাসূল (ছাঃ) তাঁর জানাযা আদায় করেন। দ্বিতীয় হিজরীর শা‘বান মাসে বদর যুদ্ধের পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।[11] তার মৃত্যুতে জনৈকা নারী শোকগাথা গেয়ে বলেন,
يَا عَيْنُ جُودِي بِدَمْعٍ غَيْرِ مَمْنُونٍ
 عَلَى رَزِيَّةِ عُثْمَانَ بْنِ مَظْعُون
‘হে চোখ! ওছমান বিন মাযঊনের এই মহা বিপদে বা মৃত্যুতে অঝোরে অশ্রু বিসর্জন দাও, যেন এই ধারা কখনো শেষ না হয়’।[12]

মৃতব্যক্তির আখেরাত সম্পর্কে নিশ্চিত মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সতর্কতা :
পরকালে কে সম্মানিত, কে অসম্মানিত, কে নাজাতপ্রাপ্ত এ বিষয়গুলো সম্পূর্ণ গায়েবের খবর। মহান আল্লাহ ব্যতীত যে বিষয়ে কারো কোন ইলম নেই। তবে যেটুকু রাসূল (ছাঃ)-কে আগাম জানানো হয়েছে এবং তিনি উম্মাহ্কে জানিয়েছেন সেটুকু ব্যতীত। সেকারণ ব্যক্তির পরহেযগারিতা দেখেই মন্তব্য করা যাবে না যে, তিনি আখেরাতে সম্মানিত হয়েছেন। তবে তার কল্যাণের জন্য ও তার নাজাতের জন্য দো‘আ করতে হবে। ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)-এর মৃত্যুর পর এরকমই একটি শিক্ষণীয় ঘটনা ঘটেছে। যা ছহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে। 
ওছমানের গোসল ও কাফন পরানোর পর যখন রাসূল (ছাঃ) আসলেন, তখন উম্মুল ‘আলা, মদীনায় যার বাসায় ওছমান (রাঃ) আশ্রিত ছিলেন তিনি রাসূল (ছাঃ)-কে শুনিয়ে ওছমান বিন মাযঊনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْكَ أَبَا السَّائِبِ، فَشَهَادَتِى عَلَيْكَ لَقَدْ أَكْرَمَكَ اللَّهُ، ‘তোমার ওপর আল্লাহর রহমত হোক হে আবূ সায়েব! (ওছমান) তোমার বেলায় আমার সাক্ষ্য এটাই যে, আল্লাহ তোমাকে সম্মানিত করেছেন’। একথা শুনে রাসূলল্লাহ (ছাঃ) বলেন, وَمَا يُدْرِيكِ أَنَّ اللهَ أَكْرَمَهُ، ‘তুমি কী করে জানলে যে আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন?’ উম্মুল ‘আলা বলেন, আমি বললাম,لاَ أَدْرِى بِأَبِى أَنْتَ وَأُمِّى يَا رَسُولَ اللهِ ‘আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমি জানিনা (তাহ’লে আল্লাহ কাকে সম্মানিত করবেন?)’ তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,أَمَّا عُثْمَانُ فَقَدْ جَاءَهُ وَاللهِ الْيَقِينُ وَإِنِّى لأَرْجُو لَهُ الْخَيْرَ، وَاللهِ مَا أَدْرِى وَأَنَا رَسُولُ اللهِ مَا يُفْعَلُ بِى، ‘আল্লাহর কসম! ওছমানের নিকট তো নিশ্চিত বিষয় (মৃত্যু) এসে গেছে। আমি তাঁর জন্য কল্যাণই আশা করি। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও জানি না, আমার সাথে কি ব্যবহার করা হবে?’ তখন উম্মুল ‘আলা (রাঃ) বলেন, فَوَاللهِ لاَ أُزَكِّى أَحَدًا بَعْدَهُ أَبَدًا ‘আল্লাহর কসম! আমি আর কখনো কারো পবিত্র হওয়ার সাক্ষ্য দেব না’। (উম্মুল ‘আলা বলেন,) এতে আমি দুঃখিত হ’লাম। অতঃপর ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমে স্বপ্নে দেখলাম যে, ওছমান (রাঃ)-এর জন্য একটি প্রবাহমান ঝরনা রয়েছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে এসে স্বপ্নের খবর জানালে তিনি বললেন, ذَلِكَ عَمَلُه، ‘ওটা তাঁর আমল’ (সৎকর্ম)’।[13]
অতএব বুঝা গেল যে, মাইয়েতের পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে নিশ্চিত কোন মন্তব্য করা সমীচীন নয়। যেমনটি প্রচলিত আছে যে, ‘মরহূম’ ‘মাগফূর’ ইত্যাদি। বরং বলতে হবে ‘রাহিমাহুল্লা’হ বা আল্লাহ তার উপর রহম করুন। ‘গাফারাল্লাহ লাহু’ বা আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন ইত্যাদি।

বাক্বীউল গারক্বাদে প্রথম সমাহিত :

মদীনায় মুহাজিরদের মধ্যে তিনিই প্রথম মৃত্যুবরণ করেন এবং বাক্বীউল গারক্বাদে (জান্নাতুল বাক্বী) মুহাজির ছাহাবীদের মধ্যে সর্বপ্রথম দাফনের সৌভাগ্য লাভ করেন। তাকে দাফন করার পর রাসূলুল্লাহ তাঁর মাথার পাশে একটি পাথর রেখে বলেছিলেন, هَذَا قَبْرُ فَرَطِنَا ‘এটি আমাদের অগ্রগামীর কবর’।[14] উক্ত মর্মে আবূদাঊদে বর্ণিত আছে, কাছীর বিন যায়েদ আল-মাদানী হ’তে, তিনি মুত্তালিব হ’তে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, لَمَّا مَاتَ عُثْمَانُ بْنُ مَظْعُونٍ أُخْرِجَ بِجَنَازَتِهِ فَدُفِنَ فَأَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلًا أَنْ يَأْتِيَهُ بِحَجَرٍ فَلَمْ يَسْتَطِعْ حَمْلَهُ فَقَامَ إِلَيْهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَحَسَرَ عَنْ ذِرَاعَيْهِ قَالَ كَثِيرٌ قَالَ الْمُطَّلِبُ: قَالَ الَّذِي يُخْبِرُنِي ذَلِكَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى بَيَاضِ ذِرَاعَيْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ حَسَرَ عَنْهُمَا ثُمَّ حَمَلَهَا فَوَضَعَهَا عِنْدَ رَأْسِهِ، وَقَالَ: «أَتَعَلَّمُ بِهَا قَبْرَ أَخِي، وَأَدْفِنُ إِلَيْهِ مَنْ مَاتَ مِنْ أَهْلِي، ‘যখন ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ) মৃত্যুবরণ করলেন, তখন তাঁর জানাযা বের করা হ’ল এবং তাঁকে দাফন করা হ’ল। এরপর নবী করীম (ছাঃ) এক ব্যক্তিকে একটি পাথর আনতে বললেন। কিন্তু লোকটি সেটি বহন করতে পারছিল না। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজেই পাথরটির দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তাঁর উভয় বাহুর কাপড় গুটিয়ে নিলেন। কাছীর বলেন, মুত্তালিব আমাকে বলেছেন, যিনি তাঁকে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন তিনি বলেছেন, মনে হচ্ছে আমি এখনো রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দুই বাহুর শুভ্রতা দেখতে পাচ্ছি, যখন তিনি কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন। এরপর তিনি নিজেই পাথরটি বহন করে ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)-এর মাথার কাছে রাখলেন এবং বললেন, أَتَعَلَّمُ بِهَا قَبْرَ أَخِي، وَأَدْفِنُ إِلَيْهِ مَنْ مَاتَ مِنْ أَهْلِي، ‘এই পাথরের মাধ্যমে আমি আমার ভাইয়ের কবরটি চিহ্নিত রাখব এবং আমার পরিবারের যে-ই মৃত্যুবরণ করবে, তাকে তাঁর পাশে দাফন করব’।[15]

শিক্ষনীয় :

ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)-এর জীবন কেবলমাত্র একটি জীবনী নয়, বরং তাঁর জীবনটাই ঈমান ও আমলের একটি বড় পাঠশালা। তাঁর জীবনী থেকে আমরা বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করতে পারি। যেমন-

১. সুস্থ বিবেক : তিনি নৈতিকতা ও সুস্থ বিবেক সম্পন্ন একজন বিনম্র মানুষ ছিলেন। তাঁর বিবেক এতটাই সুস্থ ও সজাগ ছিল যে, ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসার আগেই তিনি ক্ষতিকর পানীয় মদ বর্জন করেছিলেন। এ ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সত্য গ্রহণের জন্য পবিত্র মানসিকতা ও সুস্থ বিবেক প্রয়োজন।

২. ঈমানী দৃঢ়তা : তাঁর মধ্যে ঈমানের দৃঢ়তা এতটাই প্রকট ছিল যে, প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ওয়ালিদ বিন মুগীরার নিরাপত্তা ত্যাগ করেছিলেন স্রেফ আল্লাহর উপর অঘাধ ঈমান ও তাওয়াক্কুলের ভিত্তিতে। বলেছিলেন, মুমিনের জন্য আল্লাহর নিরাপত্তাই শ্রেষ্ঠ।

৩. ছবরের শিক্ষা : কাফেরদের নির্যাতনের মুখেও তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল ও মহান আল্লাহর শোকরগুযার। লাবীদের মজলিসে এক চোখ আঘাতপ্রাপ্ত হ’লে তিনি তার অপর চোখটি আল্লাহর পথে আঘাতের জন্য প্রস্ত্তত- এই ঘোষণা দেন। যা মুমিনদের জন্য গভীর অনুপ্রেরণা।

৪. ভারসাম্যপূর্ণ জীবন : অতিরিক্ত ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর সংসার ত্যাগের ইচ্ছাকে রাসূল (ছাঃ) নাকচ করে দিয়ে রাসূলের আদর্শ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতে ইসলাম যে বাস্তব ও মানবিক ধর্ম সেটি ফুটে উঠেছে। যুগ যুগ ধরে উম্মাহ এখান থেকে ইবরত হাছিল করবে।

৫. নেতৃত্বের গুণ : তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের যোগ্যতা ছিল। হাবশায় হিজরতকারী প্রথম দলের নেতা হিসাবে তিনি চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও মুসলমানদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এতে নেতৃত্বের গুণের ছবক পাওয়া যায়। এ ছাড়াও তাঁর জীবনী থেকে আরো শিক্ষা লাভ করা যায় যে,

৬. বিশুদ্ধ আক্বীদা ও আমল বজায় রাখার স্বার্থে প্রয়োজনে প্রতিকূল পরিবেশ থেকে অনুকূল পারিবেশে হিজরত করা যায়।

৭. মৃত্যুর পর মৃতের জন্য স্বাভাবিকভাবে কান্না করা বৈধ, কিন্তু মাতম ও বিলাপ করা নিষিদ্ধ।

৮. কারও জান্নাত বা জাহান্নাম সম্পর্কে দলীল ছাড়া নিশ্চিত মন্তব্য করা উচিত নয়।

৯. প্রকৃত মর্যাদা তাক্বওয়ার মাধ্যমেই অর্জিত হয়।

১০. মৃত ব্যক্তিকে পরম মমতায় চুমু দেওয়া যায়।

উপসংহার : ওছমান ইবনু মাযঊন (রাঃ) ছিলেন ইসলামের সূচনালগ্নের এক নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক। তাঁর জীবন ঈমানের দৃঢ়তা, ইবাদতের গভীরতা, দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর মৃত্যুতে নবী করীম (ছাঃ)-এর অশ্রু ও ভালোবাসা তাঁর মর্যাদার সাক্ষ্য বহন করে। আজকের মুসলিম সমাজ যদি তাঁর ত্যাগ, তাক্বওয়া, নৈতিকতা ও আদর্শকে ধারণ করতে পারে, তবে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ, সর্বক্ষেত্রেই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য পুনরুজ্জীবিত হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহান ছাহাবীর জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণের তাওফীক দান করুন-আমীন!!


[1]. আল-মুনতাযাম ফী তারীখিল মুলুক ওয়াল উমাম, ৩য় খন্ড, পৃ: ১৯০।

[2]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১ম খন্ড, পৃ. ১৫৮।

[3]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, আল-ইছাবাহ ফী তাময়ীযিছ ছাহাবা, তাহক্বীক্ব: ড. আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুহসিন আত-তুরকী (কায়রো, মিসর: ২০০৮ খৃ. ১৪২৯ হি), ৭ম খন্ড, পৃ. ১১১; আছহাবুর রাসূল (ছাঃ), পৃ: ৬৭; আল-মুনতাযাম, ৩য় খন্ড, পৃ: ১৯১।

[4]. তিরমিযী, হা/৯৮৯ সনদ ছহীহ।

[5]. ইবনু মাজাহ হা/১৪৫৬ সনদ ছহীহ।

[6]. আল-মুনতাযাম, ৩য় খন্ড, পৃ: ১৯১; সিয়ার, ১ম খন্ড, পৃ: ১৫৯।

[7]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৭২৫।

[8]. মুসলিম, হা/৯৩৪; মুসনাদে আহমাদ হা/২২৯৬৩; মিশকাত হা/১৭২৭।

[9]. বুখারী হা/১৩০৩; মুসলিম হা/ ২৩১৫।

[10]. বুখারী হা/১২৪৩, ২৬৮৭।

[11]. সিয়ারু, ১ম খন্ড, পৃ ১৫৫; আল-মুনতাযাম, ৩য় খন্ড, পৃ: ১৯১।

[12]. আল-ইছাবাহ ফী তাময়ীযিছ ছাহাবা, ৭ম খন্ড, পৃ: ১১১।

[13]. বুখারী হা/১২৪৩, ২৬৮৭।

[14]. সিয়ার, ১ম খন্ড, পৃ: ১৫৫।

[15]. আবূদাঊদ, হা/৩২০৬, সনদ হাসান, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩০৬০।






ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ) - ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন
উক্কাশা বিন মিহছান (রাঃ) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
হাসান বিন আলী (রাঃ) (২য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
উম্মুল মুমিনীন ছাফিয়া (রাঃ) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
উম্মুল মুমিনীন জুওয়াইরিয়া বিনতুল হারিছ (রাঃ) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
রায়হানা বিনতু শামঊন (রাঃ) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
ইসলামের প্রথম দাঈ, ওহোদের ঝান্ডাবাহী শহীদ ছাহাবী মুছ‘আব বিন ওমায়ের (রাঃ) - ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন
হুসায়েন বিন আলী (রাঃ) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
সা‘দ ইবনু মু‘আয (রাঃ) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
হুসায়েন বিন আলী (রাঃ) (শেষ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
হাসান বিন আলী (রাঃ) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
মায়মূনা বিনতুল হারেছ (রাঃ) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
আরও
আরও
.