এক গ্রামে বাস করতেন একজন জ্ঞানী ও সম্ভ্রান্ত আলেম। তার ছিল একটিমাত্র ছেলে সন্তান। নাম আবিদ। আদব-আখলাকে সে ছিল যেমন অমায়িক, মেধা ও মননেও ছিল তেমনই প্রখর। গ্রামের মানুষের ছোট-খাটো প্রয়োজন ও পরামর্শে সে সর্বদা নিজেকে নিবেদিত রাখত। এসমস্ত গুণের কারণে তার ব্যক্তিত্ব ও বিনয়ের খ্যাতি ছিল পুরো এলাকাজুড়ে। পরিবারের একমাত্র সন্তান হওয়ায় তাকে নিয়ে পিতা-মাতার স্বপ্ন ছিল আকাশচুম্বী। হঠাৎ আবিদের শরীরে এক দুরারোগ্য ব্যাধি বাসা বাঁধল। আশেপাশের নামকরা সব হেকিম ও কবিরাজের কাছে কয়েক মাস চিকিৎসা নিয়েও কোন উন্নতি হচ্ছিল না। এমন রোগে আক্রান্ত হয়ে মানসিক ও দৈহিকভাবে ভেঙে পড়েছিল আবিদ। বিষণ্ণতা ও হতাশার ছাপ সর্বদাই তার চেহারায় স্পষ্ট দেখা যেত। এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার আশায় সে সর্বদা আল্লাহর উপর ভরসা রাখত এবং অধিকাংশ সময় নফল ইবাদতে ব্যস্ত থাকত। একদিন ইমাম ছাহেব মসজিদের কোণে তাকে বিষণ্ণমনে দেখে তার পেরেশানীর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আবিদ একপর্যায়ে তার দুরারোগ্য রোগের কথা ইমাম ছাহেবকে জানাল। ইমাম ছাহেব বললেন, আল্লাহ পৃথিবীতে এমন কোন রোগ দেননি যার প্রতিষেধক তিনি পাঠাননি। তুমি কোন চিন্তা করো না। যখন সঠিক ওষুধ তোমার শরীরে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহর হুকুমে তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে। তুমি চাইলে আমি একজন বড় হেকিমের ঠিকানা দিতে পারি। যার কাছে অনেক জটিল ও কঠিন রোগী সুস্থ হয়েছেন। তবে এখান থেকে তার কাছে যেতে প্রায় এক মাস সময় লেগে যেতে পারে। আবিদ দৌড়ে বাসায় গিয়ে তাঁর আববাকে সব খুলে বলল। একমাত্র সন্তানের সুস্থতার জন্য পিতা দ্রুত ছুটে আসলেন ইমাম ছাহেবের কাছে। হেকিমের নাম ঠিকানা সব জেনে নিলেন। ঠিক করলেন যত অর্থই যাক, যত দূরেই হোক আর যত কষ্টই হোক এই সফর তিনি করবেন।
সে যুগের বাহন হিসাবে ঘোড়ায় চড়ে পিতা-পুত্র আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে রওয়ানা হ’লেন হেকিমের উদ্দেশ্যে। টানা দশ দিন চলার পর পথিমধ্যে তাদের ঘোড়াটি অসুস্থ হয়ে পড়ল। দীর্ঘ সফরের ধকলে ঘোড়াটি আর চলতে পারছিল না। এই অচেনা পথে পিতা-পুত্র কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রাস্তার ধারে একটি গাছের নীচে বসে পড়লেন। কিছু সময় পর এক পথিক এসে তাদের সব ঘটনা শুলন। এতে লোকটি দয়াপরবশ হয়ে দু’জনকেই তার বাসায় নিয়ে গিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। প্রশস্ত বাড়িতে দুই মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট সংসার তার। ফলে বাসায় মেহমান আসলে তাদের কোন অসুবিধায় পড়তে হয় না।
আবিদ অসুস্থ হ’লেও তার ইবাদতে কোন কমতি ছিল না। সফরেও সে নফল ছালাত ও যিকির-আযকারে মশগূল থাকত। তার কথা ও আচরণের মধ্যে এমন এক আকর্ষণ ছিল যে, প্রথম সাক্ষাতেই যে কেউ তার প্রতি মুগ্ধ হ’ত। দু-এক দিনের মধ্যেই সেই মহল্লায় আবিদকে নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা শুরু হ’ল। এদিকে তাদের অসুস্থ ঘোড়াটিও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিল।
একদিন বাড়ির মালিক আবিদকে একান্তে কথা বলার জন্য আলাদা একটি কক্ষে নিয়ে গেলেন। দীর্ঘক্ষণ কেউ কোন কথা বলছে না। এবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবিদ বলল, চাচা আপনি কি বিশেষ কিছু বলার জন্য এখানে ডেকে এনেছেন? যদি আপনার কিছু বলার থাকে আপনি নিঃসংকোচে বলতে পারেন। আমি আপনার কথা সাধ্যমত রাখার চেষ্টা করব। এবার তিনি বললেন, বাবা তুমি তো জানো আমার দুইটা মেয়ে। আমার স্ত্রী মেয়েগুলো ছোট থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি চেষ্টা করেছি তাদেরকে দ্বীনি আবহে বড় করার। এই বয়সে আমার একটাই চাওয়া, তোমার মত ছেলের সাথে যদি আমার মেয়ের বিয়ে দিতে পারি তাহ’লে...। আবিদ অবাক বিস্ময়ে বলল, চাচা আপনি কি বলছেন? আপনি আমাদের বিপদে আশ্রয় দিয়েছেন। এই সুযোগে আমি যদি আপনার মেয়েকে বিয়ে করি তাহ’লে মানুষ কি ভাববে! তাছাড়া আমিতো নিজেই এক দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত। দুনিয়াতে আমার হায়াতই বা ক’দিন। ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন, বাবা আবিদ! আমি আবেগবশত এ প্রস্তাব দিচ্ছি না। সম্পদের মোহে অনেক মানুষ আসে। কিন্তু দ্বীনদার ও চরিত্রবান ছেলে এখন হীরা-জহরতের চেয়েও দামী। আমার মেয়ের তাক্বদীরে যদি তুমি থাকো তবে তোমার অসুস্থতা কোন বাধা নয়। আর চিকিৎসার জন্য যা প্রয়োজন আমি তার ব্যবস্থা করব। আবিদ মাথা নীচু করে বিনীত স্বরে বলল, চাচা আমার শ্রদ্ধেয় পিতা আমার সাথে আছেন। তিনি আমার অভিভাবক। এত বড় সিদ্ধান্ত আমি তাকে ডিঙিয়ে নিতে পারব না। আপনি বরং আববার সাথে কথা বলুন।
ভদ্রলোক আবিদের এই আদব ও পিতৃভক্তি দেখে আরও মুগ্ধ হ’লেন। তিনি সেদিনই আবিদের বাবার সাথে আলোচনায় বসলেন। প্রথমে আবিদের বাবা ইতস্তত করলেন। তিনি বললেন, ভাই আমরা মুসাফির। আমার ছেলের এই কঠিন অসুখ। তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এমতাবস্থায় আপনার মেয়েকে তার হাতে তুলে দেওয়া কি ঠিক হবে? বাড়ির মালিক দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, হায়াত ও মঊত আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। আমি চাই আমার মেয়ে এমন একজন স্বামী পাক, যার সংস্পর্শে তার দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ই সুন্দর হবে। আমি সব জেনেই এই প্রস্তাব দিচ্ছি।
অনেক চিন্তা-ভাবনার পর অবশেষে আবিদের বাবা রাযী হ’লেন। আল্লাহর ওপর ভরসা করে অনাড়ম্বরভাবে এবং শরী‘আত সম্মত উপায়ে সেই বাড়িতেই আবিদের সাথে ভদ্রলোকের বড় মেয়ের বিবাহ সম্পন্ন হ’ল। বিয়ের পর আবিদ অনুভব করল, তার মনের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের বিষাদ অনেকটা কেটে গেছে। স্ত্রীর সেবা ও শ্বশুরের আন্তরিকতায় সে মানসিকভাবে অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠল। কয়েকদিন পর তাদের ঘোড়াটিও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল। তবে এবার আর ঘোড়ায় চড়ে নয়, আবিদের শ্বশুর তার জামাই ও বেয়াইর জন্য আরামদায়ক সওয়ারীর ব্যবস্থা করে দিলেন এবং সাথে একজন খাদেমও দিলেন। নববধুকে আপাতত পিত্রালয়ে রেখে তারা পুনরায় হেকিমের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হ’লেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে তারা সেই কাঙ্ক্ষিত হেকিমের দরবারে পৌঁছলেন। হেকিম ছাহেব আবিদকে দীর্ঘক্ষণ পরীক্ষা করলেন। সব শুনে তিনি মুচকি হেসে বললেন, তোমার রোগের মূল কারণ ছিল অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা, যা তোমার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছিল। এখন তোমার নাড়ির গতিতে প্রশান্তি দেখতে পাচ্ছি। তবে আমার মনে হয় আল্লাহ তোমাকে ইতিমধ্যেই অর্ধেক সুস্থ করে দিয়েছেন।
হেকিমের দেওয়া ওষুধ ও তার পরামর্শ মতো কয়েক মাস চলার পর আবিদ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল। তার চেহারায় সেই আগের লাবণ্য ফিরে এলো। পিতা মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। চিকিৎসা শেষে তারা আবার সেই ভদ্রলোকের বাড়িতে ফিরে আসলেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর আবিদ তার স্ত্রী ও বাবাকে নিয়ে নিজের গ্রামে ফিরে আসল। গ্রামের মানুষ আবিদকে সুস্থ এবং বিবাহিত দেখে অবাক হ’ল এবং আনন্দিত হ’ল। ইমাম ছাহেব সব শুনে বললেন, দেখলে তো বাবা! আল্লাহ যা করেন বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন। ঘোড়া অসুস্থ না হ’লে তোমরা সেখানে থামতে না।
আর এমন দ্বীনদার স্ত্রী ও শ্বশুরের দেখাও পেতে না। আল্লাহর পরিকল্পনাই সর্বোত্তম। এরপর থেকে আবিদ তার স্ত্রী ও পরিবার নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগল এবং সমাজের মানুষের খেদমতে পুনরায় নিজেকে নিয়োজিত কর।
শিক্ষা :
১. বিপদ যতই কঠিন হোক, সর্বদা আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে তিনি এমন সব উৎস থেকে সাহায্যের ব্যবস্থা করেন যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।
২. মহান আল্লাহ তা‘আলা বার্ধক্য ছাড়া পৃথিবীর সকল রোগের ওষুধ সৃষ্টি করেছেন। তাই রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি আল্লাহর উপর ভরসা রাখা যরূরী (আবূদাঊদ হা/৩৮৫৫)।
৩. মানুষের সৌন্দর্য তার চেহারায় নয় বরং তার চরিত্রে। উত্তম চরিত্রের মানুষ অচেনা জায়গায় বা কঠিন পরিস্থিতিতেও সবার কাছে সমাদৃত ও সম্মানিত হন।
৪. উপযুক্ত বয়সে এবং দ্বীনদারিতার ভিত্তিতে বিবাহ দিলে আল্লাহ সেই সংসারে বরকত দান করেন এবং মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার পথ খুলে দেন।
শিহাব চৌধুরী বিন দুলাল
চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।