এক মুসাফির তার উটের পিঠে সওয়ার হয়ে মরুভূমি পাড়ি দিচ্ছিলেন। এমন সময় যোহরের ওয়াক্ত চলে আসে। তিনি আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায়ের জন্য এমন এক জায়গার সন্ধান করছিলেন যেখানে উটটি বেঁধে রাখা যায়। এমন সময় এক ব্যক্তিকে দেখলেন। তিনি লোকটিকে সালাম জানিয়ে বললেন, আমি ছালাত আদায় করব। আপনি দয়া করে আমার উটটির পাশে একটু দঁাড়াবেন কি? লোকটি তার আবেদনে সাড়া দিয়ে বলল, ঠিক আছে আমি এখানে থাকছি। আপনি ছালাত আদায় করে নিন। মুসাফির ব্যক্তি তার কাছে উট হেফাযতে রেখে ছালাতে দঁাড়িয়ে গেলেন। ছালাতের এক পর্যায়ে মুসাফির ব্যক্তিটি মহান আল্লাহর নিকট দো‘আ করলেন এবং মনস্থির করলেন যে, তিনি খুশি হয়ে উট পাহারা দেওয়া ব্যক্তিকে ২০০ দিরহাম হাদিয়া দিবেন। যথারীতি আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত শেষ করে মুসাফির ব্যক্তি পুনরায় সফর শুরু করার জন্য তার উটের কাছে ফিরে গেলেন। কিন্তু সেখানের পরিস্থিতি দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান। তিনি দেখতে পান যে, যার কাছে উটটি আমানত হিসাবে রেখে গিয়েছিলেন ঐ ব্যক্তি সেখানে নেই। সেই সাথে উটের গদিটিও নেই। কিন্তু উটটি সে জায়গায় ঠিকই পূর্বের ন্যায় বঁাধা আছে।
মুসাফির ব্যক্তি চতুর্দিকে ভালভাবে তাকিয়ে দেখলেন কোথাও তাকে দেখা যায় কি-না। তিনি ভাবলেন, হয়ত তার ধারণা ভুল হচ্ছে। লোকটি হয়ত গদিটি নিয়ে তার কোন যরূরী প্রয়োজনে গিয়েছে। কাজ শেষে সে আবার ফিরে আসবে। কিন্তু অনেক সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও সে ব্যক্তি আর ফিরে আসলো না। তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, ঐ ব্যক্তি তার উটের গদিটি চুরি করে নিয়ে গেছে। মুসাফির ভাবলেন, লোকটি আর যাই হোক কিছুটা মানবিক বটে। কেননা সে ইচ্ছা করলে উটটিকেই চুরি করে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু সে হয়ত ভাবল, এই ধূধূ মরুভূমিতে তার একমাত্র বাহনটি নিয়ে গেলে মুসাফির ব্যক্তির অনেক কষ্ট হয়ে যাবে। যেহেতু গদির ব্যবস্থা পুনরায় করা যাবে, তাই সে উট না নিয়ে উটের গদিটি নিয়ে চলে যায়। সবশেষে নিরুপায় হয়ে মুসাফির ব্যক্তি গদির অভাবে উটের পিঠে সওয়ার হ’তে না পেরে হেঁটে হেঁটেই মরুভূমির পথ পাড়ি দিতে লাগলেন।
অবশেষে তিনি একটি বাজারে পৌঁছতে সক্ষম হ’লেন। বাযারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি লোকালয়ে অবস্থিত ছিল। সেখানে প্রয়োজনীয় প্রায় সকল দ্রব্য পাওয়া যেত। মুসাফির ভাবলেন তিনি এই বাযার থেকেই তার উটের জন্য একটি গদি ক্রয় করবেন। বাযারে ঘুরতে ঘুরতে তিনি একটিই মাত্র দোকান পেলেন যেখানে উটের গদি বিক্রি হয়। তিনি দোকানদারকে সালাম জানিয়ে তার পরিচয় পেশ করলেন এবং তার প্রয়োজন প্রকাশ করলেন। দোকানদার তাকে বললেন, আমার কাছে একটি সুন্দর আর নরম গদি আছে। আপনি ইচ্ছা করলে দেখতে পারেন। মুসাফির ব্যক্তি গদিটি দেখে মনে করলেন এটি তো তার গদির মতোই দেখতে। তৎক্ষণাৎ হাতে নিয়ে টের পেলেন যে, হ্যঁা এটিই তার সেই উটের গদি। কিন্তু তিনি দোকানদারকে কিছু বললেন না যে এটিই তার উটের গদি ছিল। তিনি দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেন, এই গদি আপনি কোথায় পেলেন বা কার কাছ থেকে ক্রয় করেছেন? দোকানদার জবাব দেয়, বেশ কিছু সময় আগে এক ব্যক্তি দোকানে এসে বলল, আমার কাছে একটি গদি আছে। আমি একটু অভাবে পড়ে গেছি। তাই গদিটি বিক্রি করতে চাই। তখন আমি তার কাছে থেকে ২০০ দিরহাম দিয়ে গদিটি ক্রয় করে নেই। মুসাফির তার সাথে ঘটে যাওয়া আসল ঘটনা বুঝতে পারলেন এবং বিষয়টি দোকানদারের কাছে গোপন রাখলেন এটা ভেবে যে, যদি কোন ব্যক্তি তার কোন ভাইয়ের দোষ গোপন রাখে, তাহ’লে মহান আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন তার পাপ গোপন রাখবেন (মুসলিম হা/২৫৯০, ছহীহুল জামে‘ হা/৭৭১২)।
মুসাফির ব্যক্তি আর কথা না বাড়িয়ে গদিটির দাম জানতে চাইলে দোকানদার বলল, ‘জীবনে অনেক ব্যবসা করেছি। আপনি একজন মুসাফির মানুষ। আপনার দো‘আ নিশ্চিত কবুল হয় (আবূদাঊদ হা/১৫৩৬)। তাই আপনার প্রতি ইহসান করে এই দ্রব্য থেকে প্রাপ্ত লাভ আমি ছেড়ে দিলাম। অর্থাৎ ক্রয়কৃত দামেই আমি আপনার কাছে বিক্রি করলাম। আপনি শুধু আমার ব্যবসার কল্যাণের জন্য দো‘আ করবেন। দোকানদারের কথা শুনে মুসাফির খুবই আবেগাপ্লুত হয়ে যান। সাথে সাথে দোকানদারের জন্য মহান আল্লাহর নিকট দো‘আ করে তিনি তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।
শিক্ষা : রিযিক মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। মহান আল্লাহ দুনিয়াতে হালাল ও হারাম উভয়টিই দিয়েছেন কেবল বান্দার পরীক্ষার জন্য। মুমিন বান্দা তার বিবেককে কাজে লাগিয়ে শুধু হালালটি গ্রহণ করতে সচেষ্ট থাকবে এবং হারাম বর্জন করে চলবে। আলোচিত গল্পে যে ব্যক্তির কাছে মুসাফির উট আমানত হিসাবে রেখেছিলেন তার অর্জিত ২০০ দিরহাম হারাম পন্থায় উপার্জিত। সে একটু ধৈর্য ধারণ করতে পারলেই ২০০ দিরহাম হালাল উপায়ে অর্জন করতে পারত। অতএব আমাদের হালাল রিযিক অর্জনের জন্য ধৈর্য ও আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে। এছাড়াও যেসব শিক্ষণীয় বিষয় এই গল্পে রয়েছে, তাহ’ল-
১. আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায় করা।
২. ছালাতের মধ্যে যেকোন বৈধ দো‘আ করা।
৩. পরিচিত-অপরিচিত সকল মুসলিমকে সালাম দেওয়া।
৪. অন্যের দোষ গোপন রাখা।
৫. মুসাফিরের দো‘আ কবুল হয় বিধায় তার সাথে সুন্দর আচরণ করা।
৬. সর্বদা হালাল উপায়ে রিযিক অন্বেষণ করা।
৭. হালাল রিযিক তালাশ করতে গিয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং মহান আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করা।