ভূমিকা : জানাযার ছালাত মূলত মৃত ব্যক্তির পরকালীন কল্যাণের জন্য জীবিতদের পক্ষ থেকে এক বিশেষ দো‘আ। এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। যদিও জানাযার ছালাত পদ্ধতিগতভাবে অন্যান্য ফরয বা নফল ছালাত থেকে কিছুটা ভিন্ন, যাতে আযান, ইক্বামত, রুকূ, সিজদা বা তাশাহহুদ নেই। তথাপি শরী‘আতের পরিভাষায় একে ‘ছালাত’ হিসেবেই গণ্য করা হয়েছে। যেকোন ছালাত কবুল হওয়ার জন্য যেমন সূরা ফাতিহা পাঠ করা অপরিহার্য বা রুকন, ঠিক তেমনি জানাযার ছালাতেও সূরা ফাতিহা পাঠ করা অন্যতম একটি রুকন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাহ ও ছাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, সূরা ফাতিহা ব্যতীত যেমন সাধারণ ছালাত হয় না, তেমনি সূরা ফাতিহা ব্যতীত জানাযার ছালাতও শুদ্ধ হবে না। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকে জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠের বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে।
কুরআন থেকে দলীল :
জানাযার ছালাত কেবল দো‘আ নয় বরং এটি অন্যান্য ছালাতের মত ছালাত। আল্লাহ তা‘আলার বাণী-وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُونَ، ‘আর এদের কেউ মারা গেলে তুমি কখনোই তার জানাযা পড়বে না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না। ওরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং তারা অবাধ্য অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে’ (তওবা ৯/৮৪)। এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জানাযাও ছালাতের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে ইমাম বুখারী (রহঃ) তাঁর ছহীহ বুখারীতে ‘জানাযার ছালাতের সুন্নাত সম্পর্কিত পরিচ্ছেদে’ উল্লেখ করেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জানাযার ওপর ‘ছালাত’ আদায় করবে।[1]...
তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সাথীর ওপর ‘ছালাত’ (জানাযা) আদায় করো’।[2] তিনি আরো বলেছিলেন, ‘তোমরা নাজ্জাশীর ওপর ‘ছালাত’ আদায় করো’।[3] ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) একে ‘ছালাত’ হিসাবে অভিহিত করেছেন অথচ এতে কোন রুকূ‘ বা সিজদা নেই এবং এতে কোন কথা বলা যায় না। এতে রয়েছে কেবল তাকবীর ও তাসলীম (সালাম)।
ইবনে ওমর (রাঃ) পবিত্রতা অর্জন (ওযূ) ছাড়া জানাযার ছালাত পড়তেন না...। হাসান বছরী (রহঃ) বলেন, ‘আমি ছাহাবী ও তাবেঈদের দেখেছি, তাঁদের মতে জানাযার ছালাত পড়ানোর জন্য সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক হকদার, যাঁকে মানুষ তাদের ফরয ছালাত পড়ানোর জন্য পসন্দ করেন।[4] উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, ছাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেঈনে ইযাম সকলে জানাযাকে ছালাত বলেই জানতেন।
ছহীহ হাদীছ থেকে দলীল :
১. ত্বালহা ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনে আউফ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, صَلَّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عَبَّاسٍ رضى الله عنهما عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ قَالَ لِيَعْلَمُوا أَنَّهَا سُنَّةٌ ‘আমি ইবনু আববাস (রাঃ)-এর পেছনে একটি জানাযার ছালাত আদায় করলাম। তিনি তাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করলেন এবং (ছালাত শেষে) বললেন, ‘যাতে তারা (উপস্থিত লোকেরা) জানতে পারে যে, এটি (সূরা ফাতিহা পাঠ) সুন্নাত’।[5]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ইবনু আববাস (রা.) একটি জানাযার ছালাত আদায় করলেন এবং তাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করলেন। আমি (রাবী) এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই এটি সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত অথবা সুন্নাতের পূর্ণতা’।[6] নাসাঈর বর্ণনায় রয়েছে, ত্বালহা ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমি ইবনু আববাস (রাঃ)-এর পেছনে একটি জানাযার ছালাত আদায় করলাম।فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ، وَسُورَةٍ وَجَهَرَ حَتَّى أَسْمَعَنَا، فَلَمَّا فَرَغَ أَخَذْتُ بِيَدِهِ، فَسَأَلْتُهُ فَقَالَ: سُنَّةٌ وَحَقٌّ، ‘তিনি সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পাঠ করলেন এবং উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করলেন যাতে আমাদের শোনানো যায়। যখন তিনি (ছালাত থেকে) অবসর হ’লেন, আমি তাঁর হাত ধরলাম এবং তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, (এটি) পাঠ করা সুন্নাত এবং হক বা ওয়াজিব।[7]
এর ব্যাখ্যায় ইমাম আল্লামা কাসত্বালানী (রহঃ) বলেন, ‘নিশ্চয়ই এটি অর্থাৎ জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা সুন্নাত। এটি শরী‘আত প্রণেতার (রাসূল (ছাঃ)-এর) একটি পদ্ধতি। সুতরাং সুন্নাত হওয়ার বিষয়টি ওয়াজিব হওয়ার পরিপন্থী নয়।[8]
এই হাদীছের ব্যাখ্যায় ইমাম শাওকানী (রহঃ) বলেন, فِيهِ وَفِي بَقِيَّةِ أَحَادِيثِ الْبَابِ دَلِيلٌ عَلَى مَشْرُوعِيَّةِ قِرَاءَةِ فَاتِحَةِ الْكِتَابِ فِي صَلَاةِ الْجِنَازَةِ، ‘এই হাদীছটি এবং এ অধ্যায়ের অন্যান্য হাদীছসমূহ স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে ছালাতুল জানাযায় সূরা ফাতিহা পাঠ করা শরী‘আত সম্মত’।[9]
২. আবূ উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,السُّنَّةُ فِي الصَّلَاةِ عَلَى الْجَنَازَةِ أَنْ يَقْرَأَ فِي التَّكْبِيرَةِ الْأُولَى بِأُمِّ الْقُرْآنِ مُخَافَتَةً، ثُمَّ يُكَبِّرَ ثَلَاثًا، وَالتَّسْلِيمُ عِنْدَ الْآخِرَةِ، ‘জানাযার ছালাতের সুন্নাত হ’ল প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা (উম্মুল কুরআন) নিঃশব্দে পাঠ করা, এরপর আরও তিনটি তাকবীর দেওয়া এবং শেষ তাকবীরের পর সালাম ফেরানো’। [10]
৩. আবু উমামা ইবনে সাহল (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম (ছাঃ)-এর জনৈক ছাহাবী তাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, ‘জানাযার ছালাতের সুন্নাত হ’ল ইমাম তাকবীর (তাহরীমা) বলবেন, অতঃপর প্রথম তাকবীরের পর মনে মনে নিঃশব্দে সূরা ফাতিহা পাঠ করবেন। এরপর নবী করীম (ছাঃ)-এর ওপর দরূদ পাঠ করবেন এবং পরবর্তী তাকবীরগুলোতে মৃত ব্যক্তির জন্য একনিষ্ঠভাবে দো‘আ করবেন। এসব (পরবর্তী) তাকবীরে অন্য কিছু (কুরআন) পাঠ করবেন না। অতঃপর মনে মনে নিঃশব্দে সালাম ফেরাবেন।[11] উল্লেখ্য যে, এগুলো এমন ‘মাওকূফ’ হাদীছ (ছাহাবীর বাণী) যা বিধান বা মর্যাদার দিক থেকে ‘মারফূ’ হিসাবে গণ্য।[12]
৪.عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ‘উবাদাহ বিন ছামেত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করল না, তার ছালাত হবে না’।[13] এর ব্যাখ্যায় ইমাম উছায়মীন (রহঃ) বলেন, أن صلاة الجنازة صلاة مفتتحة بالتكبير مختتمة بالتسليم، فتدخل في عموم قوله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب، فإذا صلى أحد على الجنازة ولم يقرأ بفاتحة الكتاب فإن الصلاة لا تصح، ولا تبرأ بها الذمة، ولا تقوم بما يجب قيامه جهة أخينا الميت من حق، ‘নিশ্চয়ই জানাযার ছালাত এমন একটি ছালাত, যা তাকবীরের মাধ্যমে শুরু হয় এবং সালামের মাধ্যমে শেষ হয়। সুতরাং এটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সেই সাধারণ বাণীর অন্তর্ভুক্ত হবে যেখানে তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করল না, তার ছালাত হবে না’। অতএব যদি কেউ জানাযার ছালাত পড়ে কিন্তু তাতে সূরা ফাতিহা পাঠ না করে, তবে সেই ছালাত শুদ্ধ (ছহীহ) হবে না। এর দ্বারা (ছালাত পড়ার) দায়িত্ব মুক্ত হবে না এবং আমাদের মৃত ভাইয়ের পক্ষ থেকে যে হক আদায় করা ওয়াজিব ছিল, তাও আদায় হবে না’।[14] শায়খ বিন বায (রহঃ) বলেন, واجبة كما قال صلى الله عليه وسلم: صلوا كما رأيتموني أصلي، وقال عليه الصلاة والسلام: لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب ‘জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব বা আবশ্যক, যেমনটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা সেভাবেই ছালাত পড় যেভাবে আমাকে ছালাত পড়তে দেখেছ’ এবং তিনি আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সূরা ফাতেহা পাঠ করবেনা, তার ছালাত হবে না’।[15]
৫. জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم كَبَّرَ عَلَى الْمَيِّتِ أَرْبَعًا وَقَرَأَ بِأُمِّ الْقُرْآنِ بَعْدَ التَّكْبِيرَةِ الأُولَى، ‘নবী করীম (ছাঃ) জানাযার ছালাতে মৃত ব্যক্তির ওপর চারটি তাকবীর দিয়েছেন এবং প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা পাঠ করেছেন’।[16]
৬. উম্মে শারীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُنَا أَنْ نَقْرَأَ عَلَى الْجِنَازَةِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ، ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন’।[17]
৭. আবূ আল-উরইয়ান আল-হাদ্দা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, صَلَّيْت خَلْفَ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ عَلَى جِنَازَةٍ، فَلَمَّا فَرَغَ أَخَذْت بِيَدِهِ فَقُلْت كَيْفَ صَنَعْت؟ قَالَ : قرَأْتُ عَلَيْهَا بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ، ‘আমি হাসান ইবনে আলী (রাঃ)-এর পেছনে জানাযার ছালাত পড়েছি। ছালাত শেষ হ’লে আমি তাঁর হাত ধরে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি (ছালাতে) কী করেছেন? তিনি বললেন, আমি জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়েছি’।[18]
এছাড়াও আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ, সাহল ইবনু হুনাইফসহ বহু ছাহাবী জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন।[19] এমনকি আবুবকর ও ওমর (রাঃ) মৃত্যুবরণ করলে তাদের জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।[20]
তাবেঈগণের আমল :
তাবেঈ ও তাবে‘ তাবেঈদের আমল থেকেও জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ শরী‘আতসিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত।
১. সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহঃ) বলেন, জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত।[21]
২. মুহাম্মাদ ইবনু আমর ইবনু আতা থেকে বর্ণিত, মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রাঃ) এক জানাযার ছালাত আদায় করলেন। তিনি প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা ও একটি ছোট সূরা পাঠ করলেন এবং উভয়টির পাঠ তিনি উচ্চৈঃস্বরে করলেন। ছালাত শেষ হ’লে তিনি বললেন, আমি এতটুকুও জানি যে, এ ছালাত (জানাযার ছালাত) নিঃশব্দ থাকা উচিত; বরং আমি শুধু তোমাদের শেখাতে চেয়েছি যে এ জানাযার ছালাতে ক্বিরাআত রয়েছে।[22]
৩. মুজাহিদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, জানাযার ছালাতে তিনি প্রথমে তাকবীর বলতেন, তারপর সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন, এরপর নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করতেন, তারপর একটি দো‘আ উল্লেখ করেছেন।[23] হাফেয ইবনু আব্দিল বার্র (রহঃ) বলেন, ‘ইবনু আববাস, ওছমান ইবনে হুনাইফ এবং আবূ উসামাহ ইবনু সাহল ইবনু হুনাইফ থেকে বর্ণিত আছে যে, তারা জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন। এটি মক্কা, মদীনা ও বছরার বহু সংখ্যক ছাহাবী এবং তাবেঈনের মতও বটে। তাদের সবার অভিমত ছিল জানাযার ছালাতে প্রথম তাকবীরের পর একবার সূরা ফাতিহা পাঠ করা।[24]
চার ইমামের অভিমত :
হানাফী মাযহাব : হানাফী মাযহাবের অভিমত হচ্ছে জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা মাকরূহ। তবে কেউ দো‘আর নিয়তে পাঠ করলে তা জায়েয। হানাফী বিদ্বান ইমাম ত্বাহাবী এবং বদরুদ্দীন ‘আইনী সূরা ফাতিহা পাঠের দলীলগুলো উপস্থাপন করার পর বলেন, যারা পাঠ করেছেন তারা দো‘আ হিসাবে পাঠ করেছেন।[25] অথচ তাদের দাবীর পক্ষে কোন ছহীহ দলীল উপস্থাপন করতে পারেননি। মযহাবী সংকীর্ণতা মানুষকে সত্য গ্রহণে কিভাবে বাধা দেয় তা তাদের আলোচনা থেকে স্পষ্ট।
উল্লেখ্য যে, পরবর্তী হকপন্থী হানাফী বিদ্বানগণ জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করাকে উত্তম বলেছেন। যেমন ছাহেবে মির‘আত বলেন, ‘হানাফী মাযহাবের পরবর্তী যুগের আলেম হাসান আশ-শুরুনবুলালী এ মাসআলাটি নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত রিসালা লিখেছেন, এতে তিনি প্রমাণসহ দেখিয়েছেন যে জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়া না পড়ার চেয়ে উত্তম এবং এটি পাঠ করা মাকরূহ হওয়ার কোন দলীল নেই। এই মতকেই সমর্থন করেছেন হানাফী বিদ্বান শায়খ আব্দুল হাই আল-লাক্ষ্ণীভী।
মালেকী মাযহাব : মালেকী মাযহাবের অভিমত হচ্ছে জানাযার ছালাতে সূরা পাঠ করা অপসন্দনীয়। তবে কেউ পড়তে চাইলে পড়তে পারে। তাদের মতের ব্যাপারে বলা হয়েছে- قراءة الفاتحة فيها مكروهة تنزيهاً، ‘জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা মাকরূহে তানযীহী’ (অপসন্দনীয়, তবে হারাম নয়)।
শাফেঈ মাযহাব : শাফেঈ মাযহাবের অভিমত হচ্ছে সূরা ফাতিহা অন্যান্য ফরয ছালাতের ন্যায় জানাযার ছালাতেরও অন্যতম রুকন। তাদের অভিমতের ব্যাপারে বলা হয়েছে,قراءة الفاتحة في صلاة الجنازة ركن من أركانها، والأفضل قراءتها بعد التكبيرة الأولى، ‘জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ছালাতের একটি রুকন (অপরিহার্য স্তম্ভ)। সর্বোত্তম হ’ল প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা পাঠ করা’।
হাম্বলী মাযহাব : হাম্বলী মাযহাবের মতেও জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা অবশ্য কর্তব্য। তাদের অভিমত সম্পর্কে বলা হয়েছে, قراءة الفاتحة فيها ركن، ويجب أن تكون بعد التكبيرة الأولى، ‘জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা রুকন এবং তা প্রথম তাকবীরের পরেই হওয়া আবশ্যক’।[26]
উপরোক্ত চারটি অভিমতের মধ্যে পবিত্র কুরআন এবং ছহীহ সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলীল এবং প্রসিদ্ধ সালাফী বিদ্বানগণের অভিমতের আলোকে প্রমাণিত হ’ল যে, জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব।
বিদ্বানগণের অভিমত :
নববী (রহঃ) বলেন, فَقِرَاءَةُ الْفَاتِحَةِ فَرْضٌ فِي صَلَاةِ الْجِنَازَةِ بِلَا خِلَافٍ عِنْدَنَا وَالْأَفْضَلُ أَنْ يَقْرَأَهَا بَعْدَ التَّكْبِيرَةِ الْأُولَى ‘সুতরাং আমাদের মতে জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা বিনা মতভেদে ফরয। আর উত্তম হ’ল এটি প্রথম তাকবীরের পর পড়া’।[27]
ছাহেবে মির‘আত বলেন, ‘সঠিক ও সত্য মত হ’ল জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব। যেমনটি ইমাম শাফেঈ, আহমাদ, ইসহাক এবং অন্যান্য ইমামগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কেননা তারা এ বিষয়ে একমত (ইজমা‘) হয়েছেন যে, এটি ছালাত। আর (অন্যান্য ছহীহ হাদীছে) এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, সূরা ফাতিহা ছাড়া কোন ছালাত নেই। সুতরাং জানাযার ছালাতও এই সাধারণ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। একে (জানাযাকে) সেই নির্দেশের বাইরে রাখতে হ’লে দলীলের প্রয়োজন। এছাড়া এটি এমন ছালাত, যাতে ক্বিয়াম বা দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াজিব। সুতরাং অন্যান্য ছালাতের মতোই এতে ক্বিরাআত (সূরা ফাতিহা পাঠ) ওয়াজিব হবে’।[28]
শায়খ উছায়মীন (রহঃ) বলেন, ‘জানাযার ছালাতে ফাতিহা রুকন। কারণ নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, যে ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়ে না, তার ছালাত নেই। এছাড়া জানাযার ছালাতও ছালাত। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর তুমি কখনও তাদের জন্য জানাযার ছালাত পড়বে না যারা তাদের মধ্যে মারা গেছে’ (নিসা ৪/৪৩)। এখানে আল্লাহ তা‘আলা এটিকে ছালাত বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ইবনু আববাস (রাঃ) জানাযার ছালাতে স্বরবে সূরা ফাতিহা পড়েছিলেন এবং বলেছিলেন, যাতে তোমরা জানো যে, এটি সুন্নাত’।[29]
শায়খ বিন বায (রহঃ) বলেন, ‘এই হাদীছটি স্পষ্ট করে দেয় যে, জানাযার ছালাত রুকূ-সিজদাবিশিষ্ট সাধারণ ছালাতে মতোই; এতেও সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হয়। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একে ছালাত নামে অভিহিত করেছেন এবং তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে না, তার ছালাতই হয় না’। সুতরাং জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব। এ কারণেই ইবনে আববাস (রাঃ) হাদীছে বর্ণিত জানাযায় উচ্চৈঃস্বরে ক্বিরাআত পাঠ করেছেন এবং বলেছেন, ‘যাতে তোমরা জানতে পারো যে এটি সুন্নাহ’।[30]
আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, ‘সেই প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, হানাফী ফকবীহগণ এই হাদীছটি গ্রহণ করেননি। অথচ হাদীছটি বিশুদ্ধ এবং এটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি তাদের (হানাফী মাযহাবের) নিজস্ব পদ্ধতি ও মূলনীতি (উছূল) অনুযায়ীও এই হাদীছটি জানাযার ছালাতে সুন্নাত প্রমাণের জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্ত ছিল![31]
জানাযার ছালাতের পদ্ধতি :
জানাযার ছালাতে চার তাকবীর দিবে। পাঁচ থেকে নয় তাকবীর পর্যন্ত প্রমাণিত আছে। তবে চার তাকবীরের হাদীছ সমূহ অধিকতর ছহীহ ও সংখ্যায় অধিক। মুক্তাদী ইমামের পিছে পিছে তাকবীর বলবে। প্রথমে মনে মনে জানাযার নিয়ত করে সরবে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে দু’হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে বাম হাতের উপর ডান হাত বুকে বাঁধবে। এ সময় ‘ছানা’ পড়বে না। আনাস, ইবনু ওমর, ইবনু আববাস (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবীগণ সকল তাকবীরেই হাত উঠাতেন। অতঃপর আ‘ঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ সূরায়ে ফাতিহা ও অন্য একটি ছোট সূরা পড়বে। তারপর দ্বিতীয় তাকবীর দিবে ও দরূদে ইবরাহীমী পাঠ করবে। তারপর তৃতীয় তাকবীর দিবে ও জীবিত-মৃত সকলের মাগফিরাতের জন্য হাদীছে বর্ণিত দো‘আ সমূহ পড়বে। দো‘আ পাঠ শেষে চতুর্থ তাকবীর দিয়ে প্রথমে ডানে ও পরে বামে সালাম ফিরাবে। ডানে একবার মাত্র সালাম ফিরানোও জায়েয আছে। জানাযার ছালাত নীরবে পড়া উত্তম। তবে সরবেও পড়া যায়। ইমাম সরবে পড়লে মুক্তাদীগণ আ‘ঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ কেবল সূরায়ে ফাতিহা চুপে চুপে পড়বে এবং পরে দরূদ ও অন্যান্য দো‘আ সমূহ পড়বে। তবে ইমাম নীরবে পড়লে মুক্তাদীগণ সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা এবং অন্যান্য দো‘আ সমূহ পড়বে।
জানাযার ছালাতে সূরা পাঠের বিপক্ষে উপস্থাপিত দলীলসমূহ ও পর্যালোচনা :
অপরদিকে জানাযার ছালাতে সূরা পাঠ না করার পক্ষে কয়েকটি আছার পেশ করা হয়, যেগুেলো দিয়ে দলীল গ্রহণ যৌক্তিক নয়। যেমন-
১. নাফে‘ (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) জানাযার ছালাতে ক্বিরাআত পাঠ করতেন না।[32] এর অর্থ হ’ল তিনি সূরা ফাতিহা ব্যতীত অন্য কোন সূরা পাঠ করতেন না। যেমন আল্লাহর বাণী ‘আর যখন কুরআন তেলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করো এবং চুপ থাকো, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও’ (আ‘রাফ ৭/২০৪)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে ইমামের তেলাওয়াতকালেও সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে।
عَنْ مُوسَى بْنِ عَلِيٍّ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: قُلْتُ لِفَضَالَةَ بْنِ عُبَيْدٍ: هَلْ يُقْرَأُ عَلَى الْمَيِّتِ شَيْءٌ؟ قَالَ: لَا-
২. মুসা ইবনে আলী তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি ছাহাবী ফাযালাহ ইবনে উবায়েদকে জিজ্ঞেস করলাম, মৃত ব্যক্তির ওপর (জানাযার ছালাতে) কি কোন কিছু পাঠ করা হবে? তিনি উত্তরে বললেন, না’।[33]
প্রথমত : এর অর্থ হ’ল তিনি সূরা ফাতিহা ব্যতীত অন্য কোন সূরা পাঠ করতেন না। কারণ তারা রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতের বিরোধিতা করতেন না। দ্বিতীয়ত: রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী ও আমলের বিপরীতে কারো বক্তব্য থাকলে তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
عَنْ أَبِي الْمِنْهَالِ، قَالَ: سَأَلْتُ أَبَا الْعَالِيَةِ عَنِ الْقِرَاءَةِ فِي الصَّلَاةِ عَلَى الْجِنَازَةِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ فَقَالَ: مَا كُنْتُ أَحْسَبُ أَنَّ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ تُقْرَأُ إِلَّا فِي صَلَاةٍ فِيهَا رُكُوعٌ وَسُجُودٌ-
৩. আবুল মিনহাল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবুল আলিয়াকে জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি উত্তরে বললেন, আমি তো মনে করতাম যে, সূরা ফাতিহা কেবল সেই ছালাতেই পাঠ করা হয় যাতে রুকূ ও সিজদা রয়েছে।[34] এটিও আবুল আলিয়ার নিজস্ব বক্তব্য।
এছাড়াও ছাহাবী আবু হুরায়রা, তাবেঈ শাবেঈ, আত্বা, মুহাম্মাদ থেকে কিছু নিজস্ব বক্তব্য পাওয়া যায় যেগুলো ছহীহ বুখারী ও কুতুবুস সিত্তায় বর্ণিত ইবনু আববাস ও আবু উমামাহ এবং অন্যান্য ছাহাবীর আমল ও বক্তব্যের তুলনায় একেবারে দুর্বল। আবু মুহাম্মাদ ইবনু হাযম (রহঃ) বলেন, এদের (আগের আলেমদের) কারো কাছ থেকে এমনটি প্রমাণিত নয় যে, তারা বলেছেন, ‘জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়া যাবে না। বরং হ্যাঁ, আমরা তো বলি, এতে (জানাযায়) কুরআনের কিছুই পড়া হবে না উম্মুল কুরআন ছাড়া। সুতরাং এদের সাথে সেই সমস্ত ছাহাবীদের কথার মধ্যে কোন বিরোধ থাকে না যারা জানাযার ছালাতে কুরআন তেলাওয়াত করার কথা স্পষ্ট করে বলেছেন। যেমন ইবনু আববাস, মিসওয়ার, যাহহাক ইবনু কায়েস, আবু হুরায়রা, আবুদ্দারদা, ইবনু মাসউদ এবং আনাস।[35]
যুক্তিনির্ভর দলীল ও তার জওয়াব :
১. বিরোধীরা বলে জানাযার ছালাতে রাসূল (ছাঃ) দো‘আ করার কথা বলেছেন।[36] সুতরাং সূরা ফাতিহা বা অন্য সূরা তেলাওয়াত করার সুযোগ নেই।
পর্যালোচনা : এর জওয়াবে হাফেয ইবনু হাযম (রহঃ) ও ছাহেবে তোহফা বলেন, এই দলীল আদতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ রাসূলের উক্তি فَأَخْلِصُوا لَهُ الدُّعَاءَ-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল ‘তোমরা তার জন্য আন্তরিকভাবে দো‘আ করো’। এতে জানাযায় কুরআন তেলাওয়াত না করার কোন ইঙ্গিত নেই। ক্বাযী ইসমাঈল তাঁর ‘কিতাবুছ্-ছালাতি আ‘লা নবী’ গ্রন্থে আবূ উমামাহ আল বাহেলী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, ‘জানাযার ছালাতের সুন্নাহ হ’ল ইমাম সূরা ফাতিহা পড়বেন, তারপর নবী করীম (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করবেন, তারপর মৃত ব্যক্তির জন্য আন্তরিকভাবে দো‘আ করবেন যতক্ষণ না শেষ করেন। আর সূরা ফাতিহা একবারই পড়বেন, এরপর সালাম ফিরাবেন।[37]
২. বিরোধীরা বলে, হয়তো ছাহাবী এবং তাদের পরবর্তীরা সূরা ফাতিহা দো‘আ হিসাবে পাঠ করেছেন।
পর্যালোনা : এ যুক্তিটিও বাতিল। বরং এর জওয়াবে ইমাম ইবনু হাযম বলেন,هَذَا بَاطِلٌ؛ لِأَنَّهُمْ ثَبَتَ عَنْهُمْ الْأَمْرُ بِقِرَاءَتِهَا، وَأَنَّهَا سُنَّتُهَا، ‘এটি সম্পূর্ণ বাতিল। কারণ তাদের থেকে সূরা ফাতিহা পড়ার নির্দেশ দেওয়া এবং এটি যে সুন্নাত তা প্রমাণিত’। এরপর তিনি বলেন, সুতরাং যে ব্যক্তি বলে, ‘হয়তো তারা এটি (সূরা ফাতিহা) দো‘আ হিসাবে পড়েছেন’ তার এই কথাটি ডাহা মিথ্যা। আমরা জানি না কিসে তাদেরকে এটি (জানাযায় ফাতিহা পাঠ) উনিষেধ করতে উদ্বুদ্ধ করল, যার ফলে তারা এ ধরনের দুর্বল অযূহাতের মাধ্যমে মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন? আশ্চর্যের বিষয় হ’ল, তারা তো কিবয়াসের অনুসারী, অথচ তারা নিজেরাও মনে করেন যে এটি একটি ছালাত। তারা জানাযার জন্য তাকবীর, ক্বিবলামুখী হওয়া, পুরুষদের ইমামতি, পবিত্রতা এবং সালাম ফিরানোকে আবশ্যক করেন, কিন্তু কেবল ক্বিরাআত (সূরা পাঠ) বাদ দিয়ে দেন![38]
৩. বিরোধীরা বলে, জানাযায় রুকূ‘-‘সিজদা, তাশাহহুদ যেমন রহিত হয়ে গেছে তেমনি ক্বিরাআতও রহিত হয়ে গেছে।
পর্যালোচনা : তাদের এই ক্বিয়াসও বাতিল। কারণ সূরা ফাতিহা পাঠের বিষয়টি ছহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। হাফেয ইবনু হাযমসহ বিদ্বানগণ বলেন, এখন প্রশ্ন হ’ল কোন যুক্তিতে
এই ক্বিয়াস (যে জানাযায় ফাতিহা পড়া যাবে না) বাধ্যতামূলক হয়ে গেল, অথচ ক্বিরাআতকে তাকবীর ও সালামের সাথে মিলিয়ে ক্বিয়াস করা হবে না? ‘বরং যদি ক্বিবয়াসকে সঠিক ধরা হয়ও, তাহ’লে কিবরাআতকে তাকবীর ও সালামের উপরে কিবয়াস করা আরও বেশী যৌক্তিক হবে। কারণ এগুলো সবই জিহবা দিয়ে উচ্চারিত যিকর; শরীরের কাজের (যেমন : রুকূ-সিজদা) উপর ক্বিরাআতকে কিবয়াস করার চেয়ে এটি অনেক বেশী উপযুক্ত। এরপর তিনি বলেন, কিন্তু এটাই তো তাদের ক্বিবয়াস ও সুন্নাহ সম্পর্কে ধারণার বাস্তবতা! তারা সবসময় বলে, মদীনার আমলের বিরোধিতা করা উচিত নয়, অথচ এখানে আমরা তাদের সামনে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিলাম মদীনার আলেমদের আমল, ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ), সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, আবূ উমামাহ এবং যুহরী (রহঃ)-এর আমল ও বক্তব্য। তবুও তারা তাদের বিপরীত মত গ্রহণ করল’।[39]
জানাযার ছালাতে ছানা পাঠ :
জানাযার ছালাতে ছানা পাঠের ব্যাপারে কোন হাদীছ বর্ণিত হয়নি। সেজন্য এই ছালাতকে হালকা করার জন্য ছানা পরিহার করবে। ইমাম নববী বলেন,وَأَمَّا دُعَاءُ الِاسْتِفْتَاحِ فَفِيهِ وَجْهَانِ، واتفق الأصحاب على أَنَّ الْمُسْتَحَبَّ تَرْكُهُ ‘আর (জানাযার ছালাতে) দো‘আয়ে ইস্তিফতাহ (ছানা) পাঠ করার বিষয়ে দু’টি মত রয়েছে। তবে ইমাম শাফেঈ (রহঃ)-এর অনুসারী আলেমগণ এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, এটি বর্জন করা মুস্তাহাব।[40]
উছায়মীন বলেন, ‘আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে, এটি (ছানা পাঠ করা) মুস্তাহাব নয়। এর কারণ হিসাবে তারা বর্ণনা করেছেন যে, জানাযার ছালাতে মূল ভিত্তিই হ’ল সংক্ষিপ্ত করা। আর যেহেতু এই ছালাতে কাঠামোটি সংক্ষিপ্ত করার ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাই এতে কোন ছানা পাঠ করার প্রয়োজন নেই’।[41]
উপসংহার :
জানাযা ছালাত শুদ্ধ হওয়ার জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করা আবশ্যক। এটা ছাড়া জানাযার ছালাত হবে না। পক্ষান্তরে ছানা পড়ার কোন দলীল নেই। সুতরাং জানাযা শুদ্ধ হওয়ার জন্য হাদীছ মোতাবেক আমল করা যরূরী।
[1]. মুসলিম হা/৯৪৫।
[2]. বুখারী হা/২২৮৯।
[3]. বুখারী হা/৩৮৭৮; ইবনু মাজাহ হা/১৫৩৭।
[4]. ছহীহ বুখারী ৫/২১৭।
[5]. বুখারী হা/১৩৩৫।
[6]. তিরমিযী হা/১০২৭, সনদ ছহীহ।
[7]. নাসাঈ হা/১৯৮৭, সনদ ছহীহ।
[8]. মির‘আতুল মাফাতীহ ৫/৩৮০।
[9]. নায়লুল আওতার ৪/৭৫।
[10]. নাসাঈ হা/১৯৮৫, সনদ ছহীহ।
[11]. বায়হাকী, সুনানুল কুবরা হা/১০৮০; ইরওয়াউল গালীল হা/৭৩৪, সনদ ছহীহ।
[12]. ফাৎহুল বারী ৯/৩০৬।
[13]. বুখারী হা/৭৫৬; মুসলিম হা/৩৯৪।
[14]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৩/১৩৩।
[15]. বুখারী হা/৬৩১।
[16]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা হা/৬৯৫৮, ৭২০৮; মুসনাদুশ শাফেঈ ১/৩৫৮, সনদ যঈফ হ’লেও মর্ম ছহীহ।
[17]. ইবনু মাজাহ হা/১৪৯৬; আদ-দুলাবী, আল-কুনা ওয়াল আসমা হা/১৪৫৭, সনদের ব্যাপারে সমালোচনা থাকলেও অনেকে হাসান বলেছেন); মুসনাদুশ শাফেঈ ১/৩৫৮, সনদ যঈফ হলেও মর্ম ছহীহ।
[18]. মুছান্নাফ ইবনে আবি শায়বা হা/১১৩৯৩, ১১৪৯৪।
[19]. মুছান্নাফ ইবনে আবি শায়বা হা/১১৩৯৪, ১১৩৯৫, ১১৩৯৯।
[20]. মুছান্নাফ ইবনে আবি শায়বা হা/১১৪০৩।
[21]. মুছান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ হা/১১৪০৩।
[22]. ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লা বিল আছার ৩/৩৫২।
[23]. ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লা বিল আছার ৩/৩৫২।
[24]. আল-ইস্তিযকার ৩/৪০।
[25]. বদরুদ্দীন আইনী, উমদাতুল কারী ৮/১৪১।
[26]. মির‘আতুল মাফাতীহ ৫/৩৮২।
[27]. আল-মাজমূ‘ শরহুল মুহাযযাব ৫/২৩৩।
[28]. মির‘আতুল মাফাতীহ ৫/৩৮১।
[29]. আশ-শারহুল মুমতে‘ ৫/৩১৮।
[30]. শরহুল বুখারী।
[31]. আহকামুল জানায়েয ১/১২০।
[32]. মুছান্নাফে ইবনু শায়বাহ হা/১১৪০৪।
[33]. মুছান্নাফে ইবনু শায়বাহ হা/১১৪০৭।
[34]. মুছান্নাফে ইবনু শায়বাহ হা/১১৪০৭।
[35]. আল-মুহাল্লা বিল আছার ৩/৩৫২।
[36]. আবূদাউদ হা/৩১৯৯; মিশকাত হা/১৬৭৪।
[37]. আল-মুহাল্লা বিল আছার ৩/৩৫২; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪/৯৪।
[38]. আল-মুহাল্লা বিল আছার ৩/৩৫৪; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪/৯৪।
[39]. আল-মুহাল্লা বিল আছার ৩/৩৫৪; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪/৯৫।
[40]. আল-মাজমূ‘ ৫/২৩৪।
[41]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৭/১১৯।