বাগদাদ ছিল ইসলামী সভ্যতার হৃদস্পন্দন, জ্ঞান ও বিজ্ঞানের রাজধানী, ইতিহাসের বিস্ময়। এই নগরীর সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য যেন রূপকথার রাজপ্রাসাদে জ্বলতে থাকা পূর্ণিমার চাঁদের আলো। যার দীপ্তিতে মলান হয়ে যেত দুনিয়ার অন্য সব রত্ন। যেখানে বাতাসও যেন জ্ঞান ও সৌন্দর্যের গন্ধে ভরপুর ছিল। সেখানে জ্ঞানের আলো জ্বালানো হ’ত কলমের আখরে, আর সভ্যতার বিকাশ মাপা হ’ত চিন্তা ও গবেষণার গভীরতায়। বাগদাদের বিশেষত্ব আলঙ্কারিক শব্দের গাঁথুনীতে বাক্যের বন্ধনে সীমাবদ্ধ রেখে বর্ণনা করা কঠিন। বাগদাদ কেবল আববাসীয়দের রাজধানী ছিল না বরং ছিল মানবসভ্যতার এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়। তাইতো ইউনূস বিন আব্দুল আ‘লা আছ-ছাদাফী (মৃ. ২৬৪ হি.) বলেন, আমাকে ইমাম শাফেঈ (রহ.) একবার প্রশ্ন করলেন, هَلْ رَأَيْتَ بَغْدَادَ؟ ‘তুমি কি বাগদাদ দেখেছো’? আমি বললাম, না! তখন তিনি বললেন, مَا رَأَيْتَ الدُّنْيَا ‘তাহ’লে তো তুমি দুনিয়া-ই দেখনি’।[1]
এই অনিন্দ্য সুন্দর নগরীর ভিত্তি স্থাপন করেন দ্বিতীয় আববাসী খলীফা আবু জা‘ফর আল-মানছূর (মৃ. ১৫৮ হি.)। সে সময় আববাসী খিলাফতের রাজধানী ছিল ইরাকের কূফা নগরীর সীমান্তবর্তী হাশিমিয়্যা উপশহর। ১৪১ হিজরীতে রাওয়ান্দিয়া[2] ভ্রান্ত ফিরক্বার অনুসারীরা হাশিমিয়্যায় আক্রমণ করার পর খলীফা অনুভব করলেন যে, রাজ্যের জন্য একটি সুরক্ষিত ও সুসংগঠিত শহরের প্রয়োজন। বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করার পর তিনি দজলা ও ফোরাত নদী দ্বারা প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত বাগদাদকে নির্বাচন করলেন। সেখানে কয়েক রাত থেকে নগরীর অবস্থান, মনোরম ভূপ্রকৃতি, দূষণমুক্ত মৃদু মন্দ বায়ু এবং আবহাওয়ায় তিনি বিমোহিত হ’লেন। তিনি সেখানেই শহর নির্মাণের নির্দেশ দিলেন।[3]
খত্বীব বাগদাদী লিখেছেন, আল-মানছূর ১৩৬ হিজরীতে আববাসী খিলাফত গ্রহণ করেন। ১৪৫ হিজরীতে তিনি বাগদাদ শহরের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং প্রকৌশলীদের ডেকে একটি গোলাকার (বৃত্তাকার) শহর নির্মাণের আদেশ দেন। বলা হয়, সমগ্র পৃথিবীতে বাগদাদই একমাত্র গোলাকার নগরী ছিল। ১৪৬ হিজরীতে নির্মাণ সম্পন্ন হ’লে খলীফা সেখানে বসবাস শুরু করেন।[4] দজলা নদীর তীরবর্তী শহরটি গোলাকার করার পরিকল্পনায় আল-মানছূরের দূরদর্শী চেতনার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। কেননা গোলাকার শহরের কেন্দ্রস্থলে রাজপ্রাসাদ স্থাপন করলে শহরের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং শহরের প্রতিটি অংশ সমান দূরত্বে অবস্থান করে। সেজন্য তিনি শহরের মধ্যস্থলেই প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন এবং প্রাসাদের পাশেই ছিল জামে মসজিদ।
বাগদাদ নগরীর চারটি প্রধান দরজা ছিল। পূর্বে বাবুল খোরাসান, পশ্চিমে বাবুশ শাম, দক্ষিণে বাবুল বছরা এবং উত্তরে বাবুল কূফা। প্রতিটি দরজার উপর একটি গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছিল এবং প্রতি দুই দরজার মধ্যে আঠারোটি প্রাচীর-টাওয়ার বানানো হয়েছিল। শুধু বাবুল বছরা এবং বাবুল কূফার মাঝখানে একটি অতিরিক্ত টাওয়ার ছিল। প্রতিটি দরজায় একজন সেনাপ্রধানের অধীনে এক হাজার সৈন্য শহরের নিরাপত্তা প্রহরী হিসাবে দায়িত্ব পালন করত।[5] তখন শহরের ভিতরে শুধুমাত্র গোসলখানার সংখ্যা ছিল ষাট হাজার। প্রত্যেক গোসলখানায় পাঁচজন কর্মী কাজ করত। অর্থাৎ শুধুমাত্র গোসলখানার কর্মীদের সংখ্যা ছিল তিন লক্ষ![6] তাহ’লে অনুমান করাই যায়, শহরের মোট জনসংখ্যা হয়ত এই সংখ্যার পাঁচগুণের কম ছিল না। খলীফা আবু জা‘ফর এই নগরীর সৌন্দর্য খুব বেশী দিন উপভোগ করতে পারেননি। ১৫৮ হিজরীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তৎপরবর্তী আরো দু’জন খলীফার খিলাফতকাল অতিবাহিত হ’লেও বাগদাদের উল্লেখযোগ্য কোন উন্নতি হয়নি। আববাসীয়দের ৪র্থ খলীফা হারূণুর রশীদ (মৃ. ১৯৩ হি.)-এর শাসনামলে বাগদাদ সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণ করে। তাঁর সময়েই জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাকেন্দ্র ঐতিহাসিক ‘বায়তুল হিকমাহ’ (House of wisdom) প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বায়তুল হিকমাহকে পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন ৭ম খলীফা আল-মামূন (মৃ. ২১৮ হি.)। মূলত তাঁর সময়ে বায়তুল হিকমায় ফার্সী, গ্রীক, মিশরীয়, কালদীয়, ভারতীয়সহ বিভিন্ন ভাষায় গ্রন্থ সংগৃহীত হ’ত। অতঃপর খলীফা সংগৃহীত গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদের জন্য ইহুদি, পার্সী, খৃষ্টান, মুসলিম নির্বিশেষে সকল ভাষাভাষী ও মতাদর্শের পন্ডিতদের নিযুক্ত করতেন। শূন্যের আবিষ্কারক এবং বীজগণিতের জন্মদাতা মুহাম্মাদ ইবনে মূসা আল-খাওয়ারেযমী (মৃ. ২৩২ হি.) সেই বিরাট গ্রন্থাগারের একজন লাইব্রেরীয়ান ছিলেন। আরবী সাহিত্য, পদার্থ, রসায়ন, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, ইতিহাস, ভূগোল ও ভূতত্ত্ববিদ্যা, মানচিত্রাংকণ এবং জ্যোতির্বিদ্যাসহ প্রভৃতি বিষয়ে মৌলিক রচনায় বায়তুল হিকমা অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছিল। ইসলামী স্বর্ণযুগের প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক এই কেন্দ্রের জ্ঞানের আলোক শিখা এশিয়া, আফ্রিকা, স্পেন ছাড়িয়ে ইউরোপের অন্ধকার মাটিকে আলোকিত করেছিল।
এই শহরেই ৪৫৯ হিজরীতে ২৬তম আববাসীয় খলীফা আল-ক্বায়েম বিআমরিল্লাহ (মৃ. ৪৬৮ হি.)-এর সময়ে সেলজুক সুলতান আল্প আরসালান (মৃ. ৪৬৫ হি.) ও মালিকশাহ (মৃ. ৪৮৫ হি.)-এর চৌকষ মন্ত্রী নিযামুল মুলক তূসী (মৃ. ৪৮৫ হি.)-এর হাত ধরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে উচ্চ শিক্ষার অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিক নিযামিয়া মাদ্রাসা। তৎকালীন সময়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিত এই শিক্ষা নগরীতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান সাগরে অবগাহনের জন্য আসত। কিন্তু নৈসর্গিক সৌন্দর্যে অতুলনীয় এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এই শহরের ভাগ্যে যা ঘটেছিল তা হয়ত পৃথিবীর আর কোন শহরের ভাগ্যে ঘটেনি। কখনো কামানের গোলায়, কখনো বুলেটের আঘাতে বাগদাদের হৃদপিন্ড ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল। আববাসীয় খলীফাদের ক্ষমতার অন্তর্দ্বন্দ্ব, অযোগ্যতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, মাযহাবী দ্বন্দ্ব এবং ভোগ-বিলাসীতার কারণে বাগদাদের জৌলুস এক সময় হারিয়ে যায়। শেষ আববাসীয় খলীফা মুস্তা‘ছিম বিল্লাহ (মৃ. ৬৫৬ হি.)-এর সময়ে তাতারীদের হাতে বাগদাদের মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক পতন ঘটে।
খলীফা মুস্তা‘ছিম বিল্লাহ বাপ-দাদাদের মত দ্বীনদার ও সাহসী ছিলেন না। তিনি খিলাফত পাওয়ার পর রাফেযী শী‘আ ইবনু আলকামীকে মন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন। সে খলীফাকে ইচ্ছামত চালাত এবং আববাসী খিলাফত ধ্বংস করে রাফেযী ধর্মমত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখত। সেজন্য আলকামী তাতারীদের (মোঙ্গল) সাথে গোপনে সম্পর্ক রাখত এবং ইরাক এসে বাগদাদ দখলের পরামর্শ দিত। সে তাতারীদের পক্ষ থেকে কোন খবর আসলে খলীফাকে জানাত না কিন্তু খলীফার খবর তাতারীদের জানিয়ে দিত।[7] তাতারীরা ৬০৬ হিজরীতে নিজ রাষ্ট্রের বাইরে তুর্কী ও ফারগানা এলাকায় প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। ইবনু জাওযীর নাতি বলেন, মাওয়ারাউন্নাহারে (مَاوَرَاءَ النَّهْر) ৬১৫ হিজরীতে তাতারীদের প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। তারা বুখারা ও সমরকন্দ দখল করে হত্যাকান্ড চালায়। ৬১৫ হিজরীতে খোরাসান আক্রমণ করে। খোরাসানের সুলতান খাওয়ারিযম শাহ (মৃ. ৬১৭ হি.) পূর্বেই শহরসমূহ মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খানের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ধ্বংস করেছিলেন। তারা হাতের কাছে কিছুই না পেয়ে মানুষকে হত্যা এবং বন্দি করে রাখে। সেই বছর বর্তমান ইরানের প্রদেশ হামাদান ও কাযভীন ধ্বংস করে। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তারা আযারবাইজান ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহ ধ্বংস করে। তাইতো ইবনুল আছীর (মৃ. ৬৩০ হি.) বলেন, ‘যদি কেউ বলে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া সৃষ্টি করার পর, তাতারদের মত কঠিন পরীক্ষায় পৃথিবীবাসীকে আর কখনো ফেলেননি তাহ’লে সে সত্যই বলবে’।[8]
খোরাসান দখলের পর কুখ্যাত মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খান মারা যায়। তার স্থলে নেতৃত্বে আসে স্বীয় সন্তান তোলুই খান। সে মারা যাওয়ার পর তার পুত্র দুর্ধর্ষ হালাকু খান খোরাসানে রাজত্ব করে। খোরাসান, হামাদান, রায়, মার্ভ, নিশাপুর, কাযভীন, আযারবাইজান, বুখারা, সমরকন্দ, কাশগড় ও আর্মেনিয়াসহ বহু মুসলিম দেশ তারা দখল করে লুটপাট, ধ্বংস ও হত্যাকান্ড চালায়। ৪৮৩ হিজরীতে নিযারীয়া শী‘আ হাসান ছাববাহ (মৃ. ৫১৮ হি.) সেলজুক সুলতান মালিকশাহের তাড়া খেয়ে ইরানের কাযভীনে অবস্থিত ২১৬৩ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন ‘আল-বুর্য’ পর্বতে অবস্থিত ‘আলামূত’ দুর্গ দখল করে বাতিনী মতবাদ (গুপ্ত ঘাতক) প্রচার করতে থাকে। বাতিনীদের উৎখাত করার জন্য ৬৫৪ হিজরীতে হালাকু খান আলামূত দুর্গ অবরোধ করেন। দূর্গের শাসক রুকনুদ্দীন খোরশাহ এক পর্যায়ে আত্মসমর্পণ করে। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে আগলে রাখা দুর্গকে হালাকু তছনছ করে দেয়। খোরশাহকে কিছুদিন সম্মান দেখানোর পর তাকে এবং তার পরিবারের নারী, পুরুষ, শিশুসহ সকল আত্মীয়কে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।[9]
এই অভিযানের পূর্বে হালাকু খান খলীফা মুস্তা‘ছিম বিল্লাহর সমর্থন এবং সৈন্য সহযোগিতা চেয়েছিল। কিন্তু মুস্তা‘ছিম বিল্লাহ সমর্থন জানালেও সেনাবহিনী দিয়ে সাহায্য করেননি। ফলে অভিযান শেষে হালাকু খান খলীফার কাছে দূত পাঠিয়ে হুমকি দেয়।[10] তার ঠিক দু’বছর পরে ৬৫৬ হিজরীতে বাগদাদ আক্রমণ করে। আলামুত দুর্গ পতনের পর ইসমাঈলী শী‘আদের উপর বিজয় অর্জন করে হালাকু বর্তমান ইরানের হামাদান প্রদেশে তার সদর দপ্তর স্থাপন করেছিল। মূলত এর পরেই খলীফাকে বাগদাদ দখলের হুমকি দিয়ে চিঠিতে দুইটি শর্ত জুড়ে দেয়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য শর্ত ছিল যে, বাগদাদের দুর্গসমূহ ভেঙে ফেলতে হবে, পরিখাগুলো ভরাট করতে হবে এবং সমুদয় অঞ্চল হালাকুর ছেলের কাছে সমর্পণ করতে হবে। চিঠি পেয়ে মুস্তা‘ছিম বিল্লাহ শারফুদ্দীন ইবনুল জাওযীকে প্রধান করে কয়েকজন দূত হালাকুর কাছে পাঠালেন এবং হুমকির জবাবে লিখলেন, ‘অহংকার ছেড়ে নিজের দেশে ফিরে যাও। তুমি যা আদেশ দিবে তাই চূড়ান্ত? আমাকে যে শর্ত দিয়েছ সেটা বাস্তবায়ন করার সামর্থ্য তোমার নেই। তোমার কি মনে হয় এই সাহস, সৈন্যবাহিনীর শক্তি আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আকাশের নক্ষত্রকেও বনদী করে নিবে? লক্ষ লক্ষ অশবারোহী ও পদাতিক যোদ্ধা যুদ্ধের জন্য আমার এক ঈশারার অপেক্ষায় রয়েছে। সময় হ’লে তারা সমুদ্রের পানিও শুকিয়ে ফেলবে। তুমি সেŠহার্দ্যের পথ অবলম্বন করে খোরাসানে ফিরে যাও। আর যুদ্ধ করতে চাইলে দেরী করো না, নিয়ত করে পরে অযুহাত দিতে পারবে না; আমার সেনাবাহিনী যুদ্ধে নামতে প্রস্ত্তত’। খলীফার এই জবাব পেয়ে রাগে হালাকু কঠোর ভাষায় আবার লেখেন, ‘তুমি যুদ্ধের প্রস্ত্ততি নাও...যদি শয়তানও আমার পথে বাধা সৃষ্টি করে তবে ঈশ্বরের সাহায্যে আমি তাকেও পরাজিত করব’।
দূতগণ ফিরে এসে হালাকুর উত্তরের ভয়াবহতা সম্পর্কে খলীফাকে অবগত করলেন। খলীফা পরামর্শ সভা ডাকলেন। ইবনু আলকামী যোগ্য ও বিচক্ষণ দূতদের সাথে বিপুল অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী উপঢেŠকন পাঠিয়ে হালাকুর কাছে দুঃখ প্রকাশ করার মতামত দিলেন। খলীফা এই প্রস্তাব মেনে নেন। কিন্তু মুজাহিদুদ্দীন আইবেক কয়েকজন আমীরকে নিজের পক্ষে নিয়ে সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে প্রতিরোধের পরামর্শ দিলেন। ফলে খলীফা হালাকুকে সামান্য কিছু উপহার পাঠালেন। যাহোক হালাকু ও খলীফার মধ্যে আদান-প্রদানকৃত পত্রাবলীর ফলাফল পরিশেষে অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধে রূপ নিল। হালাকু হামাদানে বসে বাগদাদ দখলের পরিকল্পনা প্রণয়ন করলেন। তিনি চারদিক থেকে বাগদাদকে অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেজন্য তার এক সেনানায়ক বায়জু নয়ানকে পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণের জন্য পাঠালেন। আর তিনি নিজে সেনাবাহিনীর একটি বৃহৎ অংশ নিয়ে পূর্ব দিক থেকে অবরোধ করতে রওয়ানা হ’লেন।[11]
হালাকু হামাদান থেকে ২০ ফারসাখ (প্রায় ১০০-১২০কি.মি) দূরে ‘দীনাওয়ার’ (ইরানের কেরমানশাহ প্রদেশের শহর) পৌঁছালে খলীফার দূত শারফুদ্দীন ইবনুল জাওযী হালাকুকে খাজনা দেওয়ার শর্তে শান্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ওদিকে নয়ান দজলা অতিক্রম করে ৬৫৬ হিজরীর ১০ই মুহাররম পশ্চিমে আববাসীয় বাহিনীর মুখোমুখি হয় এবং তাদের পরাজিত করে। এসময় বহু মানুষ ভয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করে এবং বাগদাদের পূর্ব দিকে চলে যায়। নয়ান ত্রিশ হাযারেরও বেশী অশবারোহী নিয়ে দুজাইল এলাকায় আসলে মুজাহিদুদ্দীন আইবেক তাকে কিছুটা প্রতিহত করতে সক্ষম হন। কিন্তু মঙ্গোল সেনারা পাল্টা আক্রমণে আববাসীয় বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে ধবংস করে দেয়। তারা বহু মানুষকে হত্যা ও বনদী করে। রাতের অন্ধকারে দজলার একটি বাঁধ খুলে দেয়। এতে পালাতে থাকা লোকদের পথ বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে কাঁদা পানিতে ডুবে মারা যায়, অনেকে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বাঁচে, আবার কেউ কেউ মরুভূমি পেরিয়ে সিরিয়ার দিকে পালিয়ে যায়। মুজাহিদুদ্দীন বারো হাযার সৈন্য হারিয়ে অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে বাগদাদে ফিরে আসেন। নয়ান পশ্চিমে এসে লুটপাট চালায় এবং খলীফার বাহিনী পশ্চিমে প্রতিরোধে ব্যস্ত থাকায় হালাকু বিনা বাধায় দুই লক্ষ যোদ্ধা নিয়ে পূর্ব দিকে অবস্থান নেয়।[12]
বাগদাদকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়। খলীফা প্রতিরক্ষা বূহ্য রচনা করেন এবং শহরের চতুর্দিকে পাথর নিক্ষেপণ যন্ত্র (মিনজানীক) স্থাপন করেন। ১২ই মুহাররম শুরু হয় যুদ্ধ। দুঃখজনক বিষয় হ’ল এ সময় বাগদাদ রক্ষার জন্য মাত্র দশ হাযার অশ্বারোহী ছিল। অথচ পূর্ববর্তী খলীফা মুসতানসির (মৃ. ৬৪০ হি.)-এর শাসনকালে সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষ। খলীফার শী‘আ মন্ত্রী ইবনে আলকামী অত্যন্ত সুকৌশলে বাগদাদের সৈন্য কমিয়ে দেন। কারণ বাগদাদের কারখ অঞ্চলে রাফেযী শী‘আরা বসবাস করত। কারখের শী‘আ এবং বছরার সুন্নীদের সাথে সবসময় মাযহাবী মতভেদ ও সংঘাত লেগেই থাকত। একবার দুই দলের মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেল। বছরাবাসী সেনাপতি রুকনুদ্দীন আদ-দাওয়েদার এবং খলীফাপুত্র আমীর আবু বকরের কাছে অভিযোগ করল। তারা সৈন্যদের কারখে হামলা করার নির্দেশ দিলেন। তাতে কারখ শহর এবং রাফেযীদের মহল্লা লুণ্ঠিত হ’ল। মন্ত্রী আলকামীর আতমীয়-স্বজনের বাড়ী-ঘরও লুণ্ঠন থেকে রেহাই পায়নি। কারখবাসীরা এ বিষয়ে মন্ত্রী আলকামীর কাছে অভিযোগ করে। তিনি বাহ্যিকভাবে তাদের ধৈর্য ধরে সহনশীল আচরণ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু এ ঘটনার পর থেকে মন্ত্রীর আক্রোশ বৃদ্ধি পায়। তিনি ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে জঘন্যতম চক্রান্তে লিপ্ত হন। তিনি ইসলামকে উৎখাত করে রাফেযী বিদ‘আতকে প্রতিষ্ঠিত করার সুদূরপ্রসারী চেতনা লালন করতেন। সে লক্ষ্যে সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেন। ফলে তাদের অনেকে বাজারে এবং বিভিনণ মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে দানপ্রার্থনা করতে বাধ্য হয়। বাগদাদকে ক্রমশ অরক্ষিত করার জন্য তিনি সৈন্য সংখ্যা কমাতে কমাতে দশ হাযারে নামিয়ে আনেন। তারপরেই তাতারীদের সাথে পত্র-বিনিময় করে বাগদাদ দখলে প্ররোচিত করেন।[13]
৬৫৬ হিজরীর ১৯শে মুহাররম পর্যন্ত হালাকুর বাহিনীকে আববাসীয় সৈন্যরা প্রতিরোধ করতে থাকে। মঙ্গোলরা লাগাতার তীর ও পাথর বর্ষণ করে শহরের সুরক্ষা প্রাচীর ভেদ করার চেষ্টা করে। অবশেষে ২৫শে মুহাররম শহর দেয়ালের সবচেয়ে নিচু টাওয়ার তারা নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়। সেখান দিয়ে মঙ্গোল বাহিনী দেয়াল টপকে শহরে ঢুকে পড়ে। এরপরই শুরু হয় নৃশংস হত্যা, ভয়াবহ লুটপাট ও নির্মম নির্যাতন। আক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে খলীফা হতাশ হয়ে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি অঢেল সম্পদসহ দূত প্রেরণ করে হালাকুর কাছে যুদ্ধ বিরতির আবেদন করেন কিন্তু হালাকু তাতে সম্মত হয়নি। ফলে ৪ঠা ছফর সরাসরি সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে খলীফা নিজ পরিবারের সদস্য, আলেম-ওলামা, কাযী এবং শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে প্রতিনিধিদল সঙ্গে নিয়ে বাগদাদ থেকে হালাকুর শিবিরে যান। মঙ্গোলদের ইতিহাস লেখক রশীদুদ্দীন ফযলুল্লাহ হামাদানী প্রতিনিধি দলের সংখ্যা ৩০০০ উল্লেখ করেছেন। তবে ইমাম ইবনু কাছীরের মতে, এ দলের সংখ্যা ছিল ৭০০ জন। তন্মধ্যে খলীফাসহ মাত্র ১৭ জনকে হালাকুর কাছে যেতে দেওয়া হয়। অবশিষ্টদের বাহন থেকে নামিয়ে সর্বস্ব লুট করে হত্যা করা হয়। হালাকু খলীফাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন যে, তুমি শহরের লোকদের অস্ত্র ত্যাগ করে বাইরে জমায়েত হ’তে বল যাতে আমরা তাদের গণনা করতে পারি। তখন খলীফা সরল মনে শহরে ঘোষণা করালেন যেন সবাই অস্ত্র সমর্পণ করে বাইরে আসে। মানুষ দল বেঁধে বেরিয়ে আসল কিন্তু বিশ্বাসঘাতক মঙ্গোল সৈন্যরা তাদের ধরে ধরে হত্যা করতে লাগল। হালাকু খলীফার অনুসারী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নয়ানের সেনা শিবিরে তাঁবু স্থাপন করে বন্দি করে রাখলেন। তারপর ৭ই ছফর মঙ্গোল সৈন্যরা একযোগে শহরে প্রবেশ করে সাধারণ হত্যাকান্ড ও লুটপাট শুরু করল।[14]
তাতার বাহিনী বাগদাদে এমন নির্মম গণহত্যার জোয়ার বইয়ে দিয়েছিল, যার বিভীষিকা লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ, বাড়ী-ঘর, মসজিদ, মাদ্রাসা কিছুই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। সেদিনগুলোতে মৃত্যু ছিল বাতাসে ভাসমান অক্সিজেন আর বেঁচে থাকার সকল আর্তি ছিল নিষ্ফল আবেদন। শুধুমাত্র কিছু খ্রিষ্টান, কিছু ব্যবসায়ী যারা বিপুল ধনসম্পদের বিনিময়ে প্রাণের নিরাপত্তা পেয়েছিল এবং যারা মন্ত্রী আলকামীর বাসায় আশ্রয় নিয়েছিল তারা ব্যতীত সমগ্র নগরীর মানুষের উপর নেমে এসেছিল নৃশংস আক্রমণ। বহু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে লুকিয়ে পড়েছিল কূপের ভিতর, পুরনো কবরে কিংবা গবাদিপশুর খোঁয়াড়ে। কোথাও কোথাও লোকজন বিরান বাড়ীতে আশ্রয় নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা সেই দরজা ভেঙ্গে আগুন দিয়ে জবালিয়ে তাদেরকে হত্যা করেছিল। যারা বাসার ছাদে উঠে ভেবেছিল মৃত্যু হয়তো নিচেই ঘুরপাক খাচ্ছে তাদেরও রক্ষা হয়নি। তাতারীরা সেই ছাদে উঠেই পৈশাচিকভাবে তাদেরকে হত্যা করেছে। নিহতদের প্রবাহিত রক্ত ছাদ থেকে গড়িয়ে অলিতে-গলিতে প্রবাহিত হয়েছে। আববাসীয়দের নিশ্চিহ্ন করার জন্য খলীফার ভবন থেকে ডাকা হ’ত ‘বনু আববাসের অমুক কোথায়’? যখন সেই ব্যক্তি তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বের হ’তেন তখন তাকে কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে ছাগলের মত যবেহ করা হ’ত। মসজিদ ও মুসাফির খানায় আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের হত্যা করা হয়েছিল। ব্যাপকভাবে ইমাম, খতীব ও হাফিযগণ নিহত হয়েছিলেন। ফলে বাগদাদের মসজিদসমূহে মাসের পর মাস না আযান হয়েছে আর না কোন জামা‘আত।
বাগদাদ হালাকুর দখলে যাওয়ার পর টানা চল্লিশ দিন শহরজুড়ে হত্যা আর লুটপাটের নৃশংস তান্ডব অব্যাহত ছিল। কোথাও কোন মানুষ ছিল না। চোখ যতদূর যায় শুধু লাশ আর লাশ। নিহত মানুষের পাহাড়সম স্তূপে পথঘাট ভরে গিয়েছিল। জনাকীর্ণ শহরটির হৃৎপৃন্ড যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। পথে-ঘাটে পড়ে থাকা লক্ষ লক্ষ মৃতদেহ বৃষ্টির পানিতে পচে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। লাশের উৎকট দুর্গন্ধে শহরের বাতাস ও পানি দূষিত হয়ে মহামারী দেখা দিয়েছিল। এমনকি এই বায়ু দূষণ সিরিয়া পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ফলে সেখানে ব্যাপক মানুষ মহামারীর শিকার হয়েছিল। চল্লিশ দিন পর যখন তাতারীরা শহরের নিরাপত্তা ঘোষণা করে তখন বিভিনণ স্থানে আতমগোপনকারী ভীত-সন্ত্রস্ত ও ক্ষুধার্ত লোকজন বের হয়ে আসতে থাকে। তাদেরকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কবর থেকে পুনর্জীবিত করা হয়েছে। কারও সাথে কারও পরিচয় নেই। পিতা পুত্রকে চিনে না, ভাই ভাইকে চিনে না। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, দূষিত ও মহামারীপিড়ীত শহরে ক্ষুধা-অনাহার এবং রোগ-শোকে বেঁচে থাকা অবশিষ্ট মানুষগুলোরও শেষ আশ্রয় হয়েছিল অন্ধকার কবর। ঠিক কত মানুষকে তারা হত্যা করেছিল তার সঠিক হিসাব আল্লাহই ভাল জানেন। কেউ বলেন আট লক্ষ, কারও মতে আঠার লক্ষ আবার কারও মতে বিশ লক্ষ।[15]
মূর্খ বর্বর তাতারীরা শুধু মানুষ হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। পাঁচশত বছরের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পসংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানভান্ডার ‘বায়তুল হিকমার’ সঞ্চিত লক্ষ লক্ষ মূল্যবান বিরল গ্রন্থ, পান্ডুলিপি, গবেষণাপত্র ও দলীল-দস্তাবেজ তারা দজলা নদীতে ফেলে দেয়। ফলে খরস্রোতা দজলার পানি বইয়ের কাগজ ও অক্ষরের কালিতে কালো হয়ে যায়।[16] পাঁচশত বছর ধরে সমগ্র বিশ্বকে নেতৃত্বদানকারী ইলমের নূর একদিনেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। অন্য একটি বর্ণনায় বলা হয়, মঙ্গোলরা সেদিন বাগদাদের বিপুল জ্ঞানভান্ডারে আগুন লাগিয়ে দেয়। যা পৃথিবীর আর কোন লাইব্রেরীর সংগ্রহে ছিল না। এমনকি এটাও বলা হয়ে থাকে যে, তারা সেই গ্রন্থগুলো মাটি ও পানির সঙ্গে মিশিয়ে ইটের পরিবর্তে সেতু নির্মাণে ব্যবহার করেছিল।[17]
হালাকু খান খলীফা মুস্তা‘ছিম এবং তাঁর সাথীদের বন্দী শিবিরে আটক করার পর ৯ই ছফর বাগদাদের প্রাসাদে প্রবেশ করে। অতঃপর খলীফাকে প্রাসাদে ডেকে এনে রাজ কোষাগার খুলে সমুদয় অর্থ সম্পদ জব্দ করে উপস্থিত তাতার আমীর ও সেনাপতিদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। তারপর মুস্তা‘ছিমকে গুপ্তধন বের করার নির্দেশ দেয়। খলীফা প্রাসাদ প্রাঙ্গণে সংরক্ষিত সোনায় ভরা হাউজের সন্ধান দেন। মাটি খুঁড়ে আববাসীয়দের পাঁচশত বছরের সঞ্চিত হাউজ ভর্তি লাল স্বর্ণ পাওয়া যায়। এ সময় হালাকু এক থালা স্বর্ণ খলীফার সামনে রেখে বললেন, ‘এগুলো খাও’। খলীফা বললেন, ‘এগুলো খাওয়া সম্ভব নয়’। হালাকু তখন বলেছিল, ‘তাহ’লে কেন এগুলো জমিয়ে রেখেছিলে? সৈন্যদের কেন দাওনি? এই লোহার দরজাগুলো দিয়ে কেন তীরের অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ করোনি? কেন আমূ দরিয়া নদীর তীরে এসে আমাকে প্রতিরোধ করোনি’? জবাবে খলীফা বললেন, ‘এটাই তাক্বদীরে নির্ধারণ করা ছিল’। হালাকু বললেন, ‘এখন তোমার ওপর যা ঘটতে চলেছে সেটাও নিশ্চয়ই তাক্বদীরে নির্ধারণ করা আছে’।[18] অতঃপর হেরেমের সাতশত মহিলা ও এক হাযার দাসীকে বন্দী করা হয়। তবে খলীফার মিনতির কারণে আত্মীয়-স্বজন ও নিকটতম পর্দাশীল নারীদের মধ্য থেকে একশ’ জনকে তাঁর সাথে যেতে দেওয়া হয়। মৃতদেহের বিষাক্ত দুর্গন্ধে হালাকু টিকতে না পেরে ৬৫৬ হিজরীর ১৪ই ছফর বাগদাদ ছেড়ে ‘ওয়াক্ফ ওয়াল জালাবিয়া’ (وقف والجلابية) গ্রামে শিবির স্থাপন করে। সেখানেই সেদিন খলীফাকে ডেকে এনে প্রথমে তাঁর বড় ছেলে পঁচিশ বছর বয়সী আবুল আববাস আহমাদ এবং খলীফার সেবায় নিয়োজিত পাঁচজন দাসকে হত্যা করা হয়। পরদিন খলীফার সাথে যারা বন্দী তাবুতে ছিল তাদের এবং তারপরদিন খলীফার দ্বিতীয় সন্তান তেইশ বছর বয়সী আবুল ফযল আব্দুর রহমানকে হত্যা করা হয়। তিন কন্যা সন্তানকে বন্দী করা হয় এবং সবচেয়ে ছোট সন্তান মুবারক শাহকে হালাকুর স্ত্রী ওলজাই খাতুনের কাছে পাঠানো হয়।[19]
জৈষ্ঠ্য পুত্রকে হত্যার পর মুস্তা‘ছিম বিল্লাহকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, মঙ্গোলদের মুস্তা‘ছিম বিল্লাহকে হত্যার কোন পরিকল্পনা ছিল না। খলীফা বাগদাদের অর্ধেক খাজনার বিনিময়ে হালাকুর সাথে সন্ধি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কুচক্রী মন্ত্রী আলকামী হালাকুকে বোঝায় যে, অর্ধেক খাজনার ভিত্তিতে সন্ধি হ’লে এটা এক দুই বছরের বেশী স্থায়ী হবে না। ফলে হালাকু সন্ধি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। মূলত আলকামী এবং হালাকুর রাফেযী শী‘আ মন্ত্রী নাছিরুদ্দীন তূসী (মৃ. ৬৭২ হি.) খলীফাকে হত্যার জন্য প্ররোচিত করে। উল্লেখ্য যে, দার্শনিক নাছিরুদ্দীন আলামূত দুর্গ অবরোধের সময় রুকনুদ্দীন খোরশাহের দূত হিসাবে কাজ করেছিল। দুর্গ পতনের পর হালাকু তাকে ডেকে নিয়ে মন্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করে। খলীফাকে কিভাবে হত্যা করা হয় সেটা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত আছে। কথিত আছে যে, মঙ্গোলরা বিশ্বাস করত রাসূলের বংশের খলীফার রক্ত মাটিতে পড়লে দুনিয়ায় ভূমিকম্প আসবে। সেজন্য তারা মুস্তা‘ছিম বিল্লাহকে একটি চটের বস্তায় ভরে নির্মমভাবে লাথি দিতে দিতে হত্যা করে, যেন কোন রক্তপাত না ঘটে। তবে কারও মতে শ্বাসরোধ করে আবার কেউ কেউ তাকে পানিতে ডুবিয়ে মারার কথা লিখেছেন।[20] বাগদাদের মর্মন্তুদ পতন এবং খলীফার হৃদয়বিদারক মৃত্যুতে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। রক্তে রঞ্জিত ভূমি, চারিদিকে বিধ্বস্ত নগরকাঠামো, ক্ষতবিক্ষত মসজিদ-মাদ্রাসার অব্যক্ত আর্তনাদ আর নিস্তব্ধ নীরবতায় পাঁচশত পঁচিশ বছরের দোর্দন্ড প্রতাপ খেলাফত আর তিলে তিলে গড়ে তোলা ইসলামী সভ্যতা বিলীন হয়ে যায়। তাইতো ভগ্ন হৃদয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাগদাদের নিযামিয়া মাদ্রাসার উত্তরসূরী ফারসী কবি শেখ সা‘দী (মৃ. ৬৯০ হি.) মর্ছিয়া (শোক কবিতা) কবিতায় লিখেছিলেন,
آسمان را حق بود گر خون بگرید بر زمین
بر زوال ملک مُستَعصِم امیرالمؤمنین
ای محمد گر قیامت می بر آری سر ز خاک
سر بر آور وین قیامت در میان خلق بین
‘হে আকাশ তুমি বৃষ্টির বদলে আজ ঝরাবে না খুন!
আমীরুল মুমিনীন মুস্তা‘ছিমের মৃত্যু হায় কি করুন।
হে মুহাম্মাদ! জানি ধরা হ’তে উঠবেন রোজ ক্বিয়ামতে
উঠে দেখুন ক্বিয়ামত নেমে এসেছে আজ সৃষ্টি জগতে’।
যে বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রীর জন্য ইসলামী বিশ্বের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয় সেই আলকামীর ইচ্ছাও পূরণ হয়নি। আলকামী ভেবেছিল বাগদাদ হয়তো তার হাতে থাকবে, তখন সে ফাতিমী শী‘আ খিলাফত প্রতিষ্ঠিত করবে। কিন্তু তাতাররা বাগদাদের দখল নিয়ে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং নামমাত্র মন্ত্রীত্ব দিয়েছিল। ফলে কয়েক মাস পরেই শোকে অনুশোচনায় তার মৃত্যু ঘটে। এমনকি যে নয়ান বাগদাদের পশ্চিমাংশ দখল করে তাদের বিজয় এনে দিয়েছিল, স্রেফ খলীফার সাথে পত্র যোগাযোগের সন্দেহে হালাকু তাকেও হত্যা করতে দ্বিধা করেনি।[21] আববাসীয় শেষ খলীফা মুস্তা‘ছিম বিল্লাহর মৃত্যুর সাথে সাথে আববাসীয় খিলাফতের পতন ঘটে। পরবর্তী সাড়ে তিন বছর মুসলিম বিশ্ব খলীফা শূন্য অবস্থায় পড়ে থাকে।
মুহাম্মাদ আব্দুর রঊফ
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।
[1]. ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/১০২ পৃ.।
[2]. খোরাসান থেকে ভ্রান্ত ফেরকবা রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ঘটে। তারা আত্মা স্থানান্তরে বিশ্বাসী ছিল। তারা বিশ্বাস করত যে, আদম (আ.)-এর আত্মা খলীফা আল-মানছূরের পুলিশ বিভাগের প্রধান ওছমান ইবনু নাহীকের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে। আর খলীফার এক গভর্ণর হায়ছাম ইবনে মু‘আবিয়া হ’লেন জিব্রীল (আ.)। তাদের মতে, যিনি তাদের আহার ও পানীয় দেন তিনিই তাদের রব। সেজন্য তারা খলীফা আল-মানছূরকে স্রষ্টা মনে করত। একদিন তারা খলীফার প্রাসাদে এসে তাঁর চারদিকে তাওয়াফ করতে থাকে এবং বলতে থাকে এটাই আমাদের প্রভুর প্রাসাদ! তাদের এরূপ শিরকী কর্মকান্ডের কারণে খলীফা তাদের ২০০ জন লোককে কারারুদ্ধ করেন। ফলে পরবর্তীতে তারা আল-মানছূরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। খলীফা তাদের বিদ্রোহ দমন করে এই ফেরক্বার মূলোৎপাটন করেন। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/৭৫-৭৬ পৃ.।
[3]. প্রাগুক্ত, ১০/৯৭ পৃ.।
[4]. খতবীব বাগদাদী, তারিখে বাগদাদ, ১/৬৬-৬৭ পৃ.; আল-বালাযুরী, ফুতুহুল বুলদান, ১/২৮৯ পৃ.।
[5]. তারিখে বাগদাদ, ১/৭২-৭৭ পৃ.।
[6]. তদেব, ১/১১৭ পৃ.।
[7]. মাওলানা জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, তারীখুল খুলাফা, অনুবাদ : মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল মতিন সরকার (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম প্রকাশ, জুলাই ২০২৪), পৃ. ৪৬৮।
[8]. তদেব, পৃ. ৪৭১, ৪৭৩।
[9]. রশীদুদ্দীন ফযলুল্লাহ হামাদানী, জামে‘ঊত তাওয়ারীখ, আরবী অনুবাদক : মুহাম্মাদ ছাদিক নিশাত, মুহাম্মাদ মূসা হিন্দাওয়ী, ফুয়াদ আব্দুল মু‘ত্বী আছ-ছাইয়্যাদ, ২য় খন্ড-প্রথম অংশ (কায়রো : ঈসা আল-বাবী আল-হালাবী প্রেস, তা. বি), পৃ. ২৫২-২৫৮।
[10]. তদেব, পৃ. ২৬৭।
[11]. ড. হাসান ইব্রাহীম হাসান, তারীখুল ইসলাম, ৪র্থ খন্ড (বৈরূত : দারুল জীল, ১৪তম সংস্করণ, ১৪১৬ হি.), পৃ. ১৪৭-১৪৯।
[12]. তারীখুল ইসলাম, পৃ. ১৫০; জামে‘ঊত তাওয়ারীখ, পৃ. ২৮৫-২৮৬।
[13]. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৩/২০১ পৃ.; কুতুবুদ্দীন আবুল ফাতাহ মূসা, যাইল মিরআতুয যামান, ১ম খন্ড (কায়রো : দারুল কিতাবুল ইসলামী, ২য় সংস্করণ, ১৪১৩ হি. ), পৃ. ৮৬।।
[14]. জামে‘ঊত তাওয়ারীখ, পৃ. ২৮৭-২৯১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৩/২০১ পৃ.।
[15]. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৩/২০১-২০৪ পৃ.।
[16]. আব্দুল্লাহ আল-আজলান, হারাকাতুত তাজদীদ ওয়াল ইছলাহা ফী নাজদ (লেখক কর্তৃক প্রকাশিত, ১ম সংস্করণ, ১৪০৯ হি.), পৃ. ১২।
[17]. ইউসুফ বিন তাগরীবারদী, নুজূমুয যাহিরা ফী মুলূকি মিছ্র ওয়াল কাহিরা, ৭ম খন্ড (মিসর : দারুল কুতুব, ওযারাতুছ ছাকাফাতি ওয়াল ইর্শাদিল ক্বউমেয়্য়ী, তা.বি.), পৃ. ৫১।
[18]. আলাউদ্দীন আতা মালিক আল-জুইয়ানী, তারীখে জাহানগুশায়ী, ৩য় খন্ড (লন্ডন : হল্যান্ডের ভূমি থেকে লন্ডনে ব্রিল প্রেসে মুদ্রিত, ১৩৫৫ হি.), পৃ. ৩৯০।
[19]. জামে‘ঊত তাওয়ারীখ, পৃ. ২৯১-৯৪।
[20]. আল-বিদায়া ১৩/২০১ পৃ.; যাইল মিরআতুয যামান, ১/ ৮৯ পৃ.।
[21]. যাইল মিরআতুয যামান, ১/৮৯-৯০ পৃ.।