১১ হিজরী সনের ১লা রবীউল আউয়াল এক শোকাবহ সোমবার। এই দিনে বিশ্বমানবতার নবী, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর প্রিয় উম্মাহকে গভীর শোকের সাগরে ভাসিয়ে স্বীয় রবের সান্নিধ্যে চলে গেলেন। আইয়ামে জাহেলিয়াতের প্রগাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত দ্বন্দ্বমুখর সমাজকে ২৩ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, সংঘাত-সংগ্রাম এবং নিপীড়ন-নির্যাতনের যাতাকলে দলিত হয়ে তিলে তিলে গড়ে তুলে রেখে গেলেন অহি-র চিরন্তন আলোয় উদ্ভাসিত এক সুসংহত ইসলামী রাষ্ট্ররূপে। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! অবশ্যই আল্লাহ এই ইসলামী শাসনকে এমনভাবে পূর্ণতা দান করবেন যে, একজন আরোহী (ইয়ামনের রাজধানী) ছান‘আ থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত একাকী ভ্রমণ করবে। অথচ সে আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করবে না। এমনকি তার পশুর ওপর নেকড়ের ভয় ছাড়া আর কোন ভয় থাকবে না’।[1]

একদিন রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করল এবং অপর এক ব্যক্তি ডাকাতের উপদ্রবের অভিযোগ করল। ঘটনা বর্ণনাকারী রাবী আদি ইবনু হাতিম (রাঃ) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নবী করীম (ছাঃ) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আদী! তুমি যদি দীর্ঘজীবী হও তবে দেখবে একজন উষ্ট্রারোহী হাওদানশীন মহিলা হীরা (ইরাক) হ’তে রওয়ানা হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করে ফিরে যাবে। সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করবে না। আদী (রাঃ) বলেন, আমি নিজে দেখেছি, এক উষ্ট্রারোহী মহিলা হীরা হ’তে একাকী রওয়ানা হয়ে কা‘বা শরীফ তাওয়াফ করেছে। সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও ভয় করে না’।[2]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ঘোষিত ভবিষ্যদ্বাণীগুলো ছাহাবায়ে কেরামের জীবদ্দশাতেই বাস্তবে রূপ নিয়েছিল। গঠিত হয়েছিল তাঁর প্রতিশ্রুত ইলাহী অহীভিত্তিক ন্যায়নিষ্ঠ, ইনছাফপূর্ণ ও নিরাপদ ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেখানে তাতের সঙ্গে আপোষের কোন স্থান ছিল না। ইসলামী আইন প্রয়োগে ছিল না সম্ভ্রান্ত ও সাধারণের ভেদাভেদ, না ছিল ধনী-দরিদ্র, শক্তিশালী-দুর্বল কিংবা নারী-পুরুষের মধ্যে কোন বৈষম্য। সকলেই আইনের দৃষ্টিতে ছিল সমান। তিনি এমন এক অনন্য সমাজ কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে মানুষের অন্তরে জাগ্রত তাক্বওয়া ও পরকালের ভয় সামাজিক শৃঙ্খলার প্রধান প্রহরী ছিল। তাইতো যেনার মত ঘৃণ্য পাপ গোপনে করার পরও, অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে শুধুমাত্র পরকালে মুক্তির আশায় অপরাধী স্বেচ্ছায় এসে নিজের অপরাধ স্বীকার করে শাস্তি প্রার্থনা করেছিল।[3] এই অভাবনীয় নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা সেই সমাজে আধুনিক কোন পুলিশ বাহিনীর প্রয়োজন পড়েনি, বরং প্রতিটি মানুষের বিবেকই ছিল তার পাহারাদার। সেই স্বর্ণযুগে রাসূল (ছাঃ) রেখে গেলেন ইলাহী উদ্যানের নির্ভরযোগ্য কান্ডারী, নক্ষত্রসম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত চারজন মহান খলীফাকে। যারা তাঁরই দেখানো পথে অবিচল থেকে বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার ঢালে সেই আদর্শ রাষ্ট্রকে কেবল টিকিয়েই রাখেননি; বরং ন্যায়-ইনছাফ ও কল্যাণের ডালপালা দিগন্তের পর দিগন্তে প্রসারিত করেছিলেন। ফলে পৃথিবীব্যাপী সূচিত হয়েছিল সুবিচার ও সাম্যের ভিত্তিতে সুসংগঠিত, সমৃদ্ধ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সোনালী সভ্যতা।

খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামল ছিল নববী আদর্শে প্রতিফলিত এক পূর্ণাঙ্গ ও জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সাফিনাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘নবুঅতের ভিত্তিতে পরিচালিত খিলাফত ত্রিশ বছর অব্যাহত থাকবে’।[4] হযরত আবু বকর, ওমর, ওছমান ও আলী (রাঃ)-এর সুদক্ষ শাসনের মাধ্যমে ৩০ বছরের সেই নবুঅতী খিলাফত পূর্ণতা লাভ করে। এই আদর্শিক রাষ্ট্রের শাসকগণ জনগণের উপর কর্তৃত্বকারী ছিলেন না। বরং তারা ছিলেন আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ তাক্বওয়াশীল জনগণের কাছে বিশ্বস্ত ও আমানতদার শাসক। তাঁদের ছিল না রাজপ্রাসাদ, ছিল না পরণে রাজকীয় পোষাক কিংবা ভৃত্য-চাকরে সজ্জিত দেহরক্ষী দল। তাঁরা ছিলেন রাষ্ট্রের সেবক ও জনগণের খাদেম। হক্ব-বাতিলের চিরন্তন লড়াইয়ে খলীফা আবু বকর ছিদ্দীক (রাঃ) লড়েছিলেন যাকাত বিরোধী ও ভন্ড নবীদের বিরুদ্ধে। খলীফা হয়েও চাকরের বেশে সেবা করেছেন অসহায় মানুষের। তাঁর ঈমানের দৃঢ়তা ও দায়িত্ববোধ ইসলামী রাষ্ট্রকে এনে দিয়েছিল নবজীবন। জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি অছিয়ত করে বলেছিলেন, ‘আমি খলীফা হওয়ার পর থেকে আমার ব্যক্তিগত সম্পদে যা কিছু বৃদ্ধি পেয়েছে তা লক্ষ্য করো এবং আমার পরবর্তী খলীফার কাছে তা পাঠিয়ে দিও’। আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘তিনি মৃত্যুবরণ করার পর আমরা (তাঁর সম্পদ) পরীক্ষা করে দেখলাম। তাঁর কাছে একটি সুদানী গোলাম ছিল যে তাঁর সন্তানদের দেখাশোনা করত এবং একটি উট পাওয়া গেল যার সাহায্যে পানি তুলে বাগানে দেওয়া হ’ত। দ্বিতীয় খলীফা ওমর (রাঃ)-এর কাছে সেগুলো নিয়ে গেলে তিনি তা দেখে কেঁদে ফেললেন ও বললেন, ‘আবু বকরের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক! তিনি তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরীদের জন্য (সততার এমন মানদন্ড রেখে গেছেন যা পালন করা) অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য করে দিয়েছেন’।[5]

অর্ধ-জাহানের খলীফা, দিগ্বিজয়ী, কঠোর ন্যায়বিচারক ও মানবিকতার মূর্ত প্রতীক হযরত ওমর ফারূক (রাঃ) ছিলেন ইসলামী খেলাফতের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। যিনি জোড়াতালি দেয়া পোষাক পরে খেজুর পাতার প্রাসাদে বসে অর্ধ-পৃথিবী শাসন করেছেন। যার ব্যাপারে স্বয়ং নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘ওমর! শয়তান তোমাকে কোন গলিতে হঁাটতে দেখলে অন্য গলি দিয়ে সে হঁাটে’।[6] ‘হে ওমর! আল্লাহ যদি আমার পরে কাউকে নবী বানাতেন তাহ’লে তুমিই নবী হ’তে’।[7] এই মহান ব্যক্তি ইসলামী খিলাফতের খলীফা হয়েও লম্বা পোষাক পরার কারণে জনগণের জবাবদিহিতার মুখে পড়েছেন। রাষ্ট্রীয় ভান্ডারে সম্পদের প্রাচুর্য রেখে নিজে ক্ষুধার্তের সঙ্গী হয়েছেন। খলীফা হয়েও চাকরকে উটের পিঠে বসিয়ে নিজে উটের লাগাম ধরে টেনেছেন। রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে ঘুরে ঘুরে রাজ্যের অসহায় মানুষের সেবা করেছেন। কেননা তিনি মনে করতেন, ‘যদি ফোরাতের তীরে একটি ভেড়ার বাচ্চাও হারানো অবস্থায় মারা যায়, তবে তার জন্য ক্বিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হ’তে হবে আমি ওমর সে ভয় পাই’।[8] তাইতো কাযী নযরুল ইসলাম ‘ওমর ফারূক’ কবিতায় কত চমৎকার করে লিখেছেন,

অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধুলার তখ‍&‍তে বসি

খেঁজুর পাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি!

ইসলাম সে তো পরশ-মাণিক তারে কে পেয়েছে খুঁজি!

পরশে তাহার সোনা হ’ল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি।

আজ বুঝি কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর

‘মোর পরে যদি নবী হ’ত কেউ, হ’ত সে এক ওমর!’

ইসলামের তৃতীয় খলীফা হযরত ওছমান গণী বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে ইসলামী সাম্রাজ্যকে আরবের গন্ডি পেরিয়ে আফ্রিকার উত্তর উপকূল, পারস্য ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। পবিত্র কুরআনুল কারীম সংকলন করার মত মহতী সৌভাগ্য তিনি অর্জন করেছিলেন। এই দানবীর এতটাই লজ্জাশীল ছিলেন যে, ফেরেশতাগণও তাকে দেখে লজ্জা পেতেন।[9] রাসূল (ছাঃ) ওছমান (রাঃ)-কে বলেছিলেন, ‘হে ওছমান! তোমাকে আল্লাহ তা‘আলা একদিন এই কাজের (খিলাফতের) দায়িত্বশীল করবেন। মুনাফিকরা ষড়যন্ত্র করে আল্লাহ প্রদত্ত তোমার এই জামা (খিলাফতের দায়িত্ব) তোমার থেকে খুলে ফেলতে চাইবে। তুমি কখনও তা খুলবে না’।[10] ওছমান (রাঃ)-এর খেলাফতকালে বিদ্রোহী মুনাফিকরা তাকে ৪০ দিন নিজ গৃহে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। তিনি চাইলেই কঠোর হস্তে এই বিদ্রোহ দমন করতে পারতেন। কিন্তু রাসূল (ছাঃ) তাকে এই পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিয়েছিলেন। মৃত্যুশয্যায় রাসূল (ছাঃ) ওছমান (রাঃ)-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি আসলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর সাথে একান্তে কথা বলতে লাগলেন। কথোপকথনের সময় ওছমান (রাঃ)-এর মুখাবয়ব পরিবর্তিত হচ্ছিল (অর্থাৎ তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত ও আবেগাপ্লুত হচ্ছিলেন)। এটাই ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে হযরত ওছমানের শেষ সাক্ষাৎ। ওছমান (রাঃ) বলেন, ‘রাসূল (ছাঃ) আমার থেকে একটি অঙ্গীকার নিয়েছেন, আমি তাতে ধৈর্য ধারণ করব’।[11] এই অঙ্গীকারটি ছিল, ইসলামী খিলাফতকে বিদ্রোহীদের হাতে না ছাড়ার এবং ধৈর্য ধারণ করার অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে গিয়ে ইসলামী খেলাফতের শৃঙ্খলার স্বার্থেই শেষ পর্যন্ত হযরত ওছমানকে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে।

অতুলনীয় বীরত্ব ও প্রজ্ঞাবান চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রাঃ) ফিৎনায় পরিপূর্ণ সমাজে ছিলেন হক্বের কন্ডারী। হযরত ওছমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম উম্মাহ যখন চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল, তখন সকলের অনুরোধে তিনি খিলাফতের গুরুদায়িত্ব নিজ কঁাধে তুলে নেন। তাঁর পুরো শাসনকালই ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা। ওছমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদের বিচারের দাবীতে সৃষ্ট রাজনৈতিক বিবাদ এবং উগ্রপন্থী খারেজীদের বিশৃঙ্খলায় এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় তিনি পার করেছেন। কিন্তু বিন্দুমাত্র বিচ্যুত না হয়ে তিনি জ্ঞানের আলো আর অসীম ধৈর্যের বর্ম দিয়ে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাতিলের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। ৪১ হিজরীর পবিত্র রামাযান মাসে, ফজরের ছালাতের সময়ে খারেজী আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিমের নির্মম আঘাতে এই মহান বীর শাহাদাতবরণ করেন। তাঁর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে ইসলামী খেলাফতের প্রদীপ নিভে যায়। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে খেলাফতে রাশেদার এলাহী নীতি ও আদর্শ। সেখানে ক্ষমতা ছিল আল্লাহ প্রদত্ত আমানত, আইন ছিল অহি-র বিধান, শাসন ছিল সেবা আর জবাবদিহিতাই ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। আজকের ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে সেই সোনালী খেলাফতের আদর্শে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা প্রতিটি সচেতন মুমিনের হৃদয়ে স্পন্দিত হয়। কিন্তু সে পুনর্জাগরণের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে আমরা আজ গভীর গোলকধঁাধায় নিমজ্জিত। বিশেষত একবিংশ শতাব্দীর জটিল রাজনৈতিক মেরুকরণে ইসলামী রাষ্ট্রের নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আমাদের বিভ্রান্তি চরমে পৌঁছেছে। অনেকেই অবলীলায় বলে ফেলেন যে, ইসলামে নেতৃত্ব নির্বাচনের কোন সুনির্দিষ্ট বা আদর্শিক কাঠামো নেই। অথচ এই ধারণাটি কেবল ভ্রান্তই নয় বরং ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিশাল অধ্যায়কে অস্বীকার করার শামিল। যদি কোন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি না-ই থাকবে, তাহ’লে ইসলামের শ্রেষ্ঠতম চারজন মহান খলীফা কিভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্বে অভিষিক্ত হ’লেন? রাসূল (ছাঃ)-এর হাতে গড়া চার খলীফার মনোনয়ন পদ্ধতি ক্বিয়ামত পর্যন্ত আগত মুসলিম উম্মাহর জন্য আদর্শিক দিকনির্দেশনা নয় কি? ছাহাবায়ে কেরামের কর্মপদ্ধতির আলোকে আমাদের পুনরায় পর্যালোচনা করতে হবে খেলাফতের নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতি কী ছিল। এক্ষণে সেই ঐতিহাসিক ঘটনা সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক।

১১ হিজরীর ১লা রবিউল আওয়াল দ্বিপ্রহরে রাসূল (ছাঃ) মৃত্যুবরণ করেন। রাসূলের মৃত্যুতে সকলেই শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। দাফনের পূর্বে কে রাসূলের স্থলাভিষিক্ত নেতা হবেন এটা নিয়ে জটিলতা দেখে দেয়। আনছার ও মুহাজির নেতৃবৃন্দ ছাক্বীফা বনী সা‘এদাহ প্রাঙ্গণে সমবেত হন। দীর্ঘ আলোচনার পর শীর্ষস্থানীয় ছাহাবীদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আবু বকর (রাঃ)-এর হাতে সকলে বায়‘আত করেন।[12] খলীফা আবু বকর (রাঃ) তাঁর জীবনের শেষ সময়ে ওমর (রাঃ)-কে পরবর্তী খলীফা হিসাবে প্রস্তাব করেন। তবে তিনি এককভাবে এই সিদ্ধান্ত কারো উপর চাপিয়ে দেননি বরং শীর্ষস্থানীয় ছাহাবীদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ করেন। সকলের ইতিবাচক মতামতের পর তিনি হযরত ওমর (রাঃ)-কে মনোনীত করেন এবং সাধারণ জনগণ তা সানন্দে গ্রহণ করে।[13] এটি প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী শাসক যোগ্য উত্তরসূরি প্রস্তাব করতে পারেন তবে তা শূরার অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল।

হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর শাহাদাতের পূর্বে খলীফা নির্বাচনের জন্য একটি অনন্য পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। তিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ছয়জন বিশিষ্ট ছাহাবীর একটি শূরা কমিটি গঠন করে দেন। তাঁদের দায়িত্ব ছিল নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে তিন দিনের মধ্যে খলীফা নির্বাচন করা। মজলিসে শূরার সদস্যগণ মিসওয়ার ইবনে মাখরামা (রাঃ)-এর ঘরে অথবা আয়েশা (রাঃ)-এর হুজরায় একত্রিত হন। হযরত ওমর (রাঃ) মিক্বদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রাঃ)-কে এই হুকুম দিয়ে যান যে, এই ছয়জন ব্যক্তি যতক্ষণ না একজনকে খলীফা নির্বাচন করবেন, ততক্ষণ তুমি কাউকে ভিতরে প্রবেশ করতে দিবে না। এই কমিটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে আলাপ-আলোচনা করেন এবং হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) মদীনার সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে যাকে তিনি যোগ্য মনে করেন তার কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করেন। তিনদিন পর ফজরের ছালাতের ওয়াক্তে আব্দুর রহমান ইবনে আঊফ (রাঃ) ওছমান (রাঃ)-কে খলীফা ঘোষণা করেন এবং সকলেই তাঁর হাতে বায়‘আত করেন।[14] হযরত ওছমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর মদীনা যখন চরম অরাজকতার মুখে, তখন কোন আনুষ্ঠানিক কমিটি গঠনের সুযোগ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে ছাহাবীগণ হযরত আলীর (রাঃ) কাছে উপস্থিত হয়ে খিলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানান। হযরত আলী (রাঃ) প্রথমে অনীহা প্রকাশ করেন এবং নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। কিন্তু উম্মাহর বিশৃঙ্খলা রোধে এবং ছাহাবীদের পিড়াপিড়িতে রাযী হয়ে যান। অতঃপর তিনি মসজিদে নববীতে সবাই তাঁর হাতে আনুগত্যের বায়‘আত নেন।[15]

উপরোক্ত সমুদয় তথ্যের আলোকে বলা যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্রের মনোনয়ন পদ্ধতি, শাসনতন্ত্রের কাঠামো, আইন ও বিচার, অর্থনীতি, যুদ্ধ ও শান্তি নীতি সবই ছিল শূরাভিত্তিক এবং পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের মযবূত নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এই খিলাফতে গণতন্ত্রের ন্যায় শিরকী ধোঁকাবাজিপূর্ণ সর্বসাধারণের মতামতের নামে ক্ষমতার নোংরা খেলা ছিল না; বরং সেখানে ছিল ইসলামী শূরা পদ্ধতি, যা হ’ল যোগ্য ব্যক্তিদের মনোনীত যোগ্যদের শাসনব্যবস্থা। আর এটিই মুসলিম উম্মাহর একমাত্র অনুসরণীয় আদর্শ। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ ‘তোমরা আমার সুন্নাত ও আমার সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদ্বীনের সুন্নাতকে অঁাকড়ে ধরবে’।[16] ইসলামের সকল বিষয়ে চার খলীফার অনুসরণ যদি হক্বের মানদন্ড হয় তবে ইসলামী রাজনীতিতে নেতা নির্বাচনের মানদন্ড কেন খিলাফত না হয়ে ব্যালটতন্ত্র হবে? আজকে যারা ত্বরিতগতিতে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ভোটের রাজনীতিতে খেলাফত কায়েমের দিবাস্বপ্ন দেখছেন এবং সাময়িক সাফল্যে স্ফীত হচ্ছেন, তারা স্পষ্টরূপে মুসলিম উম্মাহকে ইসলামী খেলাফতের নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত করছেন।

সুতরাং ১১ হিজরীর সেই শোকাবহ সোমবার থেকে শুরু করে ৪০ হিজরীর রক্তরঞ্জিত ফজর পর্যন্ত খিলাফতে রাশেদার যে আদর্শ চিত্র আমরা দেখলাম সেটাই মুসলিম উম্মাহর সর্বকালীন মুক্তির সনদ। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, খেলাফতের আদর্শে প্রত্যাবর্তন কোন আবেগপ্রসূত বিপ্লব নয়, কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের কোন সংক্ষিপ্ত রাস্তা নয়। বরং পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ধারাবাহিক সংস্কার এবং নৈতিক জাগরণের সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই রাসূল (ছাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, সেই সুদিন আবারও আসবে যেদিন লোকজন মুঠভরা যাকাতের স্বর্ণ-রৌপ্য নিয়ে বের হবে কিন্তু গ্রহণকারী কোন লোক পাবে না। আমরা সেই অপেক্ষাতেই আদর্শের মূলে অবিচল থাকব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন- আমীন!

মুহাম্মাদ আব্দুর রঊফ

শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।


[1]. বুখারী হা/৩৬১২, ৩৮৫২; মিশকাত হা/৫৮৫৮।

[2]. বুখারী হা/৩৫৯৫; মিশকাত হা/৫৮৫৭; হাকিম হা/৮৫৮২।

[3]. বুখারী হা/৬৮১৫; মুসলিম হা/১৬৯৫; মিশকাত হা/৩৫৬২।

[4]. আবু দাঊদ হা/৪৬৪৭; হাকিম হা/৪৬৯৭।

[5]. ইবনু সা‘দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা, ৩য় খন্ড (বৈরূত : দারু ছাদের, ১ম প্রকাশ ১৯৬৮খ্রি:), পৃ. ১৯২; ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ৪/৩০৪ পৃ.; বদরুদ্দীন আইনী, ঊমদাতুল ক্বারী, ১১/১৮৫ পৃ.।

[6]. বুখারী হা/৬০৮৫; মুসলিম হা/২৩৯৬; মিশকাত হা/৬০২৭।

[7]. তিরমিযী হা/৩৬৮৬; মুসনাদে আহমাদ হা/১৭৪৪১।

[8]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান ৯/৫০৬ পৃ.; আবু নু‘আইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৬/১৭৩৭ পৃ.

[9]. মুসলিম হা/২৪০১; মিশকাত হা/৬০৬০; ছহীহ ইবনু হিববান হা/৬৯০৭।

[10]. ইবনু মাজাহ হা/১১২; তিরমিযী হা/৩৭০৫।

[11]. ইবনু মাজাহ হা/১১৩; আহমাদ হা/২৫৮৩৯; তিরমিযী হা/৩৭১১।

[12]. বুখারী হা/৩৬৬৮।

[13]. ইবনু সা‘দ, আত্ব-ত্বাবাকাতুল কুবরা, ৩/২০০ পৃ.।

[14]. বুখারী হা/৩৭০০, ৭২০৭; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৭/১৬৪ পৃ.।

[15]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া, ৭/২৪৯-২৫০ পৃ.।

[16]. আবূদাঊদ হা/৪৬০৭; দারেমী হা/৯৫।






বিষয়সমূহ: বিধি-বিধান
আরও
আরও
.