কর্মময় ও বরকতপূর্ণ জীবন গঠনের উপায়

উপস্থাপনা :

মানুষ হিসাবে আমাদের প্রত্যেকেরই আকাঙ্ক্ষা একটি সুন্দর, সফল ও অর্থবহ জীবন। যে জীবনে আসবে সমৃদ্ধি এবং আল্লাহর তরফ থেকে আসবে অফুরন্ত কল্যাণ ও বরকত। কর্মময় জীবন পৃথিবীতে সাফল্য এনে দেয়, আর বরকতপূর্ণ জীবন দেয় প্রশান্তি। এ দুটিকে সমন্বয় করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গঠন করাই প্রকৃত সফলতা।

একটি বরকতময় ও কর্মমুখর জীবন গঠনের প্রথম সোপান হ’ল নিজের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া। এর পাশাপাশি একটি সুশৃঙ্খল ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারা অনুসরণ করা অপরিহার্য। জীবনের যেকোন কঠিন পরিস্থিতিতে দৃঢ় মনোবল ধরে রেখে মহান আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুল বা ভরসা করতে হবে এবং সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হ’তে হবে। কেননা ইসলামে অলসতা ও উদাসীনতাকে একটি মারাত্মক ব্যাধি এবং শয়তানের পাতা ফাঁদ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ধ্বংসাত্মক অভ্যাস মানুষকে সৎকর্ম ও কল্যাণ বিমুখ করে রাখে এবং ধীরে ধীরে তাকে অনিবার্য ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। বস্ত্তত একজন অলস ও উদাসীন ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতি জাহান্নামও হ’তে পারে। অতএব অলসতার এই ভয়াবহ পরিণতি থেকে বাঁচতে এবং একটি কর্মময় ও বরকতপূর্ণ জীবন গঠন সম্পর্কে আলোচ্য নিবন্ধে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হ’ল-

কর্মমুখর জীবনে অলসতা-উদাসীনতা :

মানব জীবন এক কর্মমুখর যাত্রার নাম। এই যাত্রাপথে কেউ বেছে নেন কর্মঠ ও উদ্যমী জীবন, আবার কেউ গা ভাসিয়ে দেন উদাসীনতা ও আলস্যের স্রোতে। এই দুই পথের ফলাফল সম্পূর্ণ বিপরীত। একটি পথ নিয়ে যায় সাফল্য, সম্মান ও পরিতৃপ্তির স্বর্ণশিখরে, অন্যটি নিক্ষেপ করে ব্যর্থতা, গ্লানি আর হতাশার অতল গহবরে।

একজন কর্মঠ ব্যক্তি তার প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান মনে করেন এবং সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করেন। ঠিক যেমন একটি ধারালো অস্ত্র নিয়মিত ব্যবহারে আরও শাণিত হয়, তেমনি কর্মঠ জীবন মানুষের কর্মদক্ষতাকে ধারালো ও কার্যকর করে তোলে। এর ফলাফলও সুদূরপ্রসারী। কর্মঠ ব্যক্তি কেবল পার্থিব জীবনেই সফলতা, সম্মান ও সমৃদ্ধি অর্জন করেন না, বরং পরকালেও তার প্রতিদান প্রাপ্ত হন।

এর বিপরীতে, অলসতা ও উদাসীনতা হ’ল জীবনের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়। ব্যক্তিকে কর্মবিমুখ ও নিষ্ক্রিয় করে তোলে। এর প্রধান লক্ষণগুলো হ’ল অনীহা, অমনোযোগিতা, অজুহাত এবং উদ্যমহীনতা। এই উদাসীনতা ধীরে ধীরে মানুষের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেয়।

অলসতা ও উদাসীনতার পেছনের মূল কারিগর হ’ল ইবলীস

* প্রিন্সিপাল, জামে‘আ দারুত তাওহীদ, কচুয়া, চাঁদপুর।

শয়তান। সে মুমিনকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য আলস্যের চাদরকে অন্যতম অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে। সে মানুষের মনে আলস্যমাখা অজুহাতের জন্ম দেয়, তাকে উদাসীনতার কম্বলে জড়িয়ে রাখে এবং ধীরে ধীরে আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত, বিশেষ করে ছালাত থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। এভাবে সে মানুষকে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করে।

সুতরাং জীবনকে সার্থক ও সফল করতে চাইলে কর্মঠ ও উদ্যমী হওয়ার কোন বিকল্প নেই। অলসতা ও উদাসীনতার ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করে, প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে দুনিয়া ও আখেরাতের প্রকৃত সফলতা অর্জন করা সম্ভব।

কর্মমুখর জীবন গঠন করবেন কেন?

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। এই জীবনব্যবস্থায় অলসতা, উদাসীনতা ও কর্মবিমুখতাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং একটি কর্মমুখর ও উৎপাদনশীল জীবনযাপনে উৎসাহিত করা হয়েছে। কর্মমুখর জীবন গঠন শুধু পার্থিব প্রয়োজন নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।

মহান আল্লাহ মানুষকে তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধানের জন্য পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘ছালাত শেষ হ’লে তোমরা যমীনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর। আর তোমরা আল্লাহকে অধিকহারে স্মরণ কর যাতে তোমরা সফলকাম হ’তে পার’ (জুম‘আ ৬২/১০)

এই আয়াতে ছালাতের মতো শ্রেষ্ঠ ইবাদতের পরেই জীবিকা অর্জনের জন্য কর্মে লিপ্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা কর্মের গুরুত্বকে সুস্পষ্ট করে তুলেছে। আল্লাহ মানুষকে বেকার বসে থাকার জন্য সৃষ্টি করেননি, বরং তাঁর দেওয়া সামর্থ্য ও যোগ্যতা ব্যবহার করে পৃথিবীকে আবাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে একজন কর্মঠ মানুষ ছিলেন এবং তিনি তাঁর ছাহাবীদেরকেও কর্মঠ হ’তে উৎসাহিত করতেন। তিনি বলেন,مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ، وَإِنَّ نَبِىَّ اللهِ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ كَانَ يَأْكُلُ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ- ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ কখনো খায় না। আল্লাহর নবী দাঊদ (আঃ) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন’।[1]

অলসতাকে অন্য সব নেতিবাচক বিষয়ের সাথে উল্লেখ করা প্রমাণ করে যে, এটি মুমিনের চরিত্রের জন্য কতটা ক্ষতিকর। সুতরাং শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মমুখর জীবন গঠন করা একজন মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য। এটি কেবল আর্থিক সচ্ছলতাই এনে দেয় না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মিক প্রশান্তি লাভ এবং আখেরাতের সাফল্যের সোপান তৈরী করে। অলসতা পরিহার করে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হালাল পথে শ্রম দেওয়াই হ’ল ঈমানের দাবী এবং একজন পরিপূর্ণ মুসলিমের পরিচয়।

কর্মমুখর জীবন গঠনের উপায় :

১.ফজর থেকে কর্মে নিযুক্ত হওয়া : একটি কর্মচঞ্চল ও বরকতময় দিনের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ভোরের স্নিগ্ধতায়। অলসতা ও উদ্যমহীনতার প্রধান কারণগুলোর একটি হ’ল ফজরের পর ঘুমিয়ে থাকা। এই ঘুম সারাদিনের কাজের বরকত নষ্ট করে দেয়। তাই রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে নিয়মিত তাহাজ্জুদের ছালাত আদায়ের চেষ্টা করুন। না পারলে অন্তত মাঝে মাঝে পরুন। বাদ ফজর হ’তে সূর্যোদয় পর্যন্ত মুছাল্লাতে বসেই তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করার অভ্যাস করুন।

ভোরের সময়টি না ঘুমিয়ে হাঁটা, ব্যায়াম, কুরআন তিলাওয়াত এবং আত্মশুদ্ধিমূলক বইপত্র পাঠ করা যরূরী। অথবা দিনের পরিকল্পনা সাজানোর কাজে ব্যয় করা যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর উম্মতের জন্য ভোরের সময়ে বরকতের দো‘আ করেছেন। তিনি বলেন, اَللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا، ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য সকালে বরকত দান করুন’।[2] ভোরের কর্মীরা এই দো‘আর অংশীদার হন এবং তাঁদের জীবনে সমৃদ্ধি আসে।

সকালের কাজ হয় বরকতময় : নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর রিসালাতের পাহাড়সম দায়িত্ব, কাজের চাপ, শত ব্যস্ততা, প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাত, ছাহাবীদের তা‘লীম-তারবিয়াত প্রদান ও পরিবারের সবার অধিকার পূরণের পরও তিনি আল্লাহর ইবাদত করতেন দিন-রাত। সূর্য উঠার পর তিনি কমপক্ষে দুই রাক‘আত নফল ছালাত পড়তেন। যেমন রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন,مَنْ صَلَّى الْفَجْرَ فِي جَمَاعَةٍ، ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ- كَانَتْ لَهُ كَأَجْرِ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ- ‘যে ব্যক্তি ফজরের ছালাত জামা‘আতে আদায় করে, তারপর সূর্যোদয় পর্যন্ত উক্ত স্থানে বসে আল্লাহর যিকর সম্পন্ন করে। অতঃপর দুই রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করে; সে ব্যক্তি একটি হজ্জ ও ওমরার ছওয়াব লাভ করে। পরিপূর্ণ, পরিপূর্ণ, পরিপূর্ণ। অর্থাৎ পূর্ণ হজ্জ ও ওমরার ছাওয়াব অর্জন করে’।[3] এতে বুঝা গেল যে, জামা‘আতের সাথে ফজরের ছালাত আদায় করতঃ তাসবীহ-তাহলীলে মশগূল থেকে সকাল করলে এবং মাত্র ২ রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করতে পারলে পরিপূর্ণ হজ্জ ও ওমরার ছওয়াব অর্জিত হয়। ছওয়াবের এই ডালি নিঃসন্দেহে বরকতময় সকালে আপনাকে ইবাদতে সক্রিয় রাখার জন্যই। 

২. ছালাতে গাফলতি পরিহার করা : সময়মত ছালাত পড়তে না পারলে এটাই হবে সারা দিনের অলসতার সূচনা। এ থেকেই আমলহীনতা, পাপপ্রবণতা ও অন্যান্য গাফেলতির দুয়ার উন্মোচিত হয়। সেকারণ যত কষ্টই হোক না কেন, ছালাতের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হওয়া যরূরী। রাসূল (ছাঃ) বলেন,يَعْقِدُ الشَّيْطَانُ عَلَى قَافِيَةِ رَاسِ أَحَدِكُمْ إِذَا هُوَ نَامَ ثَلاَثَ عُقَدٍ يَضْرِبُ كُلَّ عُقْدَةٍ : عَلَيْكَ لَيْلٌ طَوِيلٌ فَارْقُدْ، فَإِنِ اسْتَيْقَظَ فَذَكَرَ اللهَ انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ فَإِنْ تَوَضَّأَ انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ فَإِنْ صَلَّى انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ فَأَصْبَحَ نَشِيطًا طَيِّبَ النَّفْسِ وَإِلاَّ أَصْبَحَ خَبِيثَ النَّفْسِ كَسْلاَنَ- ‘যখন তোমাদের কেউ ঘুমায় তখন তার গ্রীবাদেশে শয়তান তিনটি করে গিঁট মেরে দেয়। আর প্রত্যেক গিঁটে সে এই বলে কুমন্ত্রণা দেয় যে, তোমার সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাত। অতএব তুমি আরো ঘুমাও। কিন্তু যদি সে জেগে ওঠে আল্লাহকে স্মরণ করে, তাহ’লে তার একটি গিঁট খুলে যায়। তারপর যদি ওযূ করে, তবে তার আরেকটি গিঁট খুলে যায়। তারপর সে যখন ছালাত পড়ে, তার সমস্ত গিঁট খুলে যায়। যার ফলে সে প্রভাতে উপনীত হয় স্ফূর্তি, ভালো মন, উদ্যমী ও কর্মঠ অবস্থায়। নচেৎ সে সকালে ওঠে কলুষিত মন, অলসতা ও উদাসীনতা সহকারে’।[4] অতএব কর্মঠ হ’তে চাইলে ফজর সহ প্রতি ওয়াক্তের ছালাতে বিশেষভাবে মনোযোগী হ’তে হবে।

৩. সময়ের অপচয় রোধ করা : মানুষের সঙ্গী হয়ে থাকে বর্তমানে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, ইউটিউব চ্যানেল সহ আরো অনেক কিছু। এসবের ব্যবহারে নিজেকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে। বিশেষ করে এগুলো যেন রাতের ঘুম কেড়ে নিতে না পারে, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাতে বিছানায় গিয়ে মাসনূন দো‘আ, তেলাওয়াত, যিকর-আযকারের মাধ্যমে ঘুমিয়ে পড়লে অলসতা হার মানবে এবং আমলে মন বসবে। ফলে হতাশা দূর হবে এবং আল্লাহ প্রদত্ত বরকত জীবনকে সাফল্যমন্ডিত করবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِنَّ اللهَ تَعَالَى يَقُولُ يَا ابْنَ آدَمَ تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِى أَمْلأْ صَدْرَكَ غِنًى وَأَسُدَّ فَقْرَكَ وَإِلاَّ تَفْعَلْ مَلأْتُ يَدَيْكَ شُغْلاً وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ- ‘হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতের জন্য অবসর হও। তাহ’লে আমি তোমার অন্তর প্রাচুর্য দিয়ে পূর্ণ করে দিব এবং তোমার অভাব দূর করে দিব। আর যদি তা না কর তাহ’লে তোমার দুই হাত ব্যস্ততা দিয়ে ভরে দিব এবং তোমার অভাব দূর করব না’।[5] অতএব সৎকর্ম, ইলম অর্জন প্রভৃতি কাজে লিপ্ত থেকে সময়গুলোর সঠিক মূল্যায়ন করা উচিৎ।

কর্মঠ ও আত্মনির্ভরশীল হওয়া : কর্মঠ হওয়া মহান আল্লাহর নির্দেশ। এমনকি তিনি ছালাতের পর জীবিকা সন্ধানের জন্য উৎসাহিত করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوْا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللهِ، ‘অতঃপর যখন ছালাত সমাপ্ত হবে, তখন তোমরা যমীনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর’ (জুমু‘আহ ৬২/১০)

আমরা অনেকে শিক্ষিত কিংবা সামাজিক স্টেটাসের ভয়ে বৈধ পথে কষ্ট করতে অনিহা প্রকাশ করি। কবির ভাষায় ‘করিতে পারি না কাজ, সদা ভয় সদা লাজ, সংশয়ে সংকল্প সদা টলে। পাছে লোকে কিছু বলে’? এযেন আমাদের বাস্তব জীবনে করুণ বাস্তবতা। এর ভয়ে নিজ হাতে হালাল জীবিকা অন্বেষণ থেকে পিছপা হই। আমরা উদ্যোক্তা হ’তে শরমিন্দা হই। এটা নিতান্তই অনুচিত। অথচ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,لأَنْ يَحْتَطِبَ أَحَدُكُمْ حُزْمَةً عَلَى ظَهْرِهِ خَيْرٌ مِنْ أَنْ يَّسْأَلَ أَحَدًا، فَيُعْطِيَهُ أَوْ يَمْنَعَهُ- ‘তোমাদের মধ্যে কারো রশি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে পিঠে করে বয়ে আনা লোকেদের কাছে এসে ভিক্ষা করার চেয়ে উত্তম। চাই তারা তাকে দিক বা না দিক’।[6]

মুমিন কখনও অকর্মণ্য ও পরনির্ভরশীল হবে না। বরং সে উদ্যমী, পরিশ্রমী ও কর্মঠ হবে। পার্থিব জীবনে সে তার দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবে। আর এখান থেকে নিজের প্রাপ্য গ্রহণ করবে এবং অন্যের হক আদায় করবে। আল্লাহ বলেন,هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولاً فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِّزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ- ‘তিনিই তো পৃথিবীকে তোমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা তার কাঁধে বিচরণ কর এবং তাঁর দেওয়া রিযিক থেকে ভক্ষণ করে থাক। আর তাঁর দিকেই হবে তোমাদের পুনরুত্থান’ (মুলক ৬৭/১৫)। অতএব নিজ হাতে হালাল উপার্জনের সাধ্যমত চেষ্টা করা প্রত্যেক পুরুষের ঈমানী দায়িত্ব।

কাজে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া : কাজের প্রতি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হ’তে হবে। কর্মচঞ্চলতার প্রধান হাতিয়ার হ’ল হিম্মত বা সৎ সাহস। সুতরাং প্রথমেই কষ্ট ও মেহনত করার জন্য হিম্মত বা সৎ সাহস অর্জন করতে হবে। অলসতার এই রোগ থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হ’তে হবে। আল্লাহর তাওফীক কামনা করে কাজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হ’লে আল্লাহ অবশ্যই সাহায্য করবেন।

দ্রুত সৎকর্ম সমূহ বাস্তবায়ন করা : সৎ কর্ম কিংবা তওবা করার চিন্তা মনে আসার সাথে সাথেই তা করে ফেলা উচিত। আজকের নেক আমল আজই এবং আজকের তওবা আজকেই করতে হবে। কিছুতেই তা আগামীকালের জন্য রেখে দেওয়া যাবে না। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন,بَادِرُوا بِالأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِى كَافِرًا أَوْ يُمْسِى مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا- ‘তোমরা সৎ কর্মের দিকে দ্রুত অপগ্রগামী হও রাত্রির ঘুটঘুটে অন্ধকার সদৃশ ফিৎনায় পতিত হওয়ার পূর্বেই। যখন কোন ব্যক্তি সকালে উঠবে ঈমানদার অবস্থায়, আর সন্ধ্যা করবে কাফের অবস্থায় অথবা সন্ধ্যা করবে মুমিন অবস্থায় আর সকালে উঠবে কাফের অবস্থায়। মানুষ দুনিয়াবী তুচ্ছ স্বার্থের বিনিময়ে নিজের দ্বীন বিক্রি করে দিবে’।[7] আল্লাহ বলেন,وَسَارِعُوْۤا اِلٰی مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمٰوٰتُ وَالْاَرْضُ اُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ- ‘তোমরা দ্রুত ধাবিত হও তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং এমন জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আকাশসমূহ ও যমীনের সমপরিমাণ। যা আল্লাহভীরুদের জন্য প্রস্ত্তত করা হয়েছে’ (আলে ইমরান ৩/১৩৩)। অতএব যত দ্রুত সম্ভব সৎকর্ম বাস্তবায়ন করা প্রত্যেক মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব।

সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের জীবনী অধ্যয়ন করা : কর্মময় জীবন গঠনের আরেকটি উপায় হচ্ছে- নবী-রাসূল, ছাহাবী-তাবেঈ ও সালাফগণের জীবনী পাঠ করা। মহান আল্লাহ বলেন, لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ، ‘পূর্বপুরুষদের কাহিনীতে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা রয়েছে’ (ইউসুফ ১২/১১১)। আল্লাহভীরুদের সান্নিধ্যে থাকা, তাঁদের সাহচর্য গ্রহণ করা, মজলিসে বসা, তাঁদের কথা মনযোগ দিয়ে শ্রবণ করলে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা সঞ্চয় করা যায়। মহান আল্লাহ বলেন,يَآ أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اتَّقُواْ اللهَ وَكُونُواْ مَعَ الصَّادِقِينَ- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক’ (তাওবা ৯/১১৯)। অতএব সৎসঙ্গে থাকলে আপনি সৎ ও কর্মঠ হবেন এটাই স্বাভাবিক।

কর্মমুখর জীবনের ব্রত গ্রহণ করা : নিজেই কর্মমুখর জীবনের প্রতি ব্রতী হতে হবে। উদাসীনতা, অলসতা, উদ্যমহীনতা, অকর্মণ্যতা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। অলসতা ব্যর্থ মানুষের স্বভাব। ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডাখানা’। সুতরাং শয়তানী ওয়াসওয়াসার শিকারে পরিণত হয়ে ব্যর্থদের কাতারে শামিল হওয়া যাবে। অতঃপর শয়তানের অনিষ্ট হ’তে পানাহ চেয়ে সৎ আমলের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,اَلْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ، وَفِي كُلٍّ خَيْرٌ احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَلاَ تَعْجَزْ- ‘আল্লাহর নিকট শক্তিশালী মুমিন অধিক উত্তম ও প্রিয় দুর্বল মুমিনের চাইতে। তুমি ঐ জিনিসের প্রতি যতণবান হও, যাতে তোমার উপকার আছে।

আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অক্ষম হয়ো না’।[8]

অলসতা ও উদ্যমহীনতার কারণ : অলসতার অন্যতম প্রধান কারণ হ’ল রাতে দেরীতে ঘুমানো এবং দেরীতে ঘুম থেকে উঠা। এশার পরে ঘুমিয়ে যাওয়া এবং ভোর রাতে ঘুম থেকে ওঠা এবং তাহাজ্জুদের ছালাত আদয়ের চেষ্টা করা উচিত। সকালে সূর্যোদয়ে পরে ইশরাক ও ছালাতুয যোহা আদায় করা। এগুলি বাস্তবায়ন করতে পারলে জীবনে উদ্যম আসবে এবং কাজের গতি সঞ্চার হবে বহুগুণ।

অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক কথা এবং কাজ পরিহার করা অবশ্যক। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مِنْ حُسْنِ إِسْلاَمِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لاَ يَعْنِيهِ- ‘একজন ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হ’ল, অনর্থক কথা ও কাজ পরিত্যাগ করা’।[9]

প্রতিদিন রুটিন মাফিক কাজে আত্মোনিয়োগ করা কর্তব্য। শিক্ষার্থী হ’লে পড়া-লেখায়, চাকুরিজীবী হ’লে প্রফেশনে, ব্যবসায়ী হ’লে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে স্বপ্ন পূরণে স্বপ্নচারী হতে হবে। আর অক্লান্ত মেহনত করতে হবে। সেইসাথে রবের তাওফীক কামনা করে সর্বোচ্চ শিখরে আরোহনের প্রাণান্ত কোশেশ করতে হবে। رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ- ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদেরকে ইহকালে কল্যাণ দাও ও পরকালে কল্যাণ দাও এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাও!’ (বাক্বারাহ ২/২০১)। উল্লেখ্য যে, ইহকালে কল্যাণ আসে কাজে আর পরকালের কল্যাণ আসবে আমলে। যেগুলি কর্মঠ ব্যক্তিদের মহৎ গুণ। কবির ভাষায়-

‘অবসর কোথায়, কোথায় শ্রান্তি, এখনও কাজ রয়েছে বাকি,

তাওহীদ আজ পূর্ণ কিরণ, দিগ-দিগন্তে দেয়নি উঁকি’।

অলসতা হ’তে মুক্তির দো‘আ : অলসতা হ’তে মুক্তির জন্য নিম্নোক্ত দো‘আগুলি অধিক হারে পাঠ করুন।

اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمِّ وَالحَزَنِ، وَالعَجْزِ وَالكَسَلِ، وَالبُخْلِ وَالجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ- ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ হ’তে, অপারগতা ও অলসতা হ’তে, কৃপণতা ও ভীরুতা হ’তে, ঋণের ভার ও মানুষদের দমন-পীড়ন হ’তে’।[10]اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَالْهَرَمِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ- اَللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلاَهَا اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لاَ يَنْفَعُ وَمِنْ قَلْبٍ لاَ يَخْشَعُ وَمِنْ نَفْسٍ لاَ تَشْبَعُ وَمِنْ دَعْوَةٍ لاَ يُسْتَجَابُ لَهَا- ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, কৃপণতা, বার্ধক্য ও কবরের আযাব হ’তে। হে আল্লাহ! আপনি আমার হৃদয়ে তাক্বওয়া দান করুন, আমার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করুন। আপনিই তো আত্মাকে পরিশুদ্ধকারী। আপনি হৃদয়ের মালিক ও অভিভাবক। হে আল্লাহ! আপনার নিকট আশ্রয় চাই এমন ইলম হ’তে যে ইলম কোন উপকার সাধন করে না, এমন হৃদয় হ’তে যে হৃদয় বিনম্র হয় না, এমন আত্মা হ’তে যে আত্মা পরিতৃপ্ত হয় না এবং এমন দো‘আ হ’তে যা কবুল করা হয় না’।[11]

উপসংহার : মুমিন জীবনে অলসতার কোন স্থান নেই। কেননা এই দুনিয়াতে যা কিছু করেছে, ব্যস্ত লোকেরাই করেছে। অলস-অকর্মণ্যরা শুধু ভালো মানুষের ভুল ধরেছে, সমালোচনা করেছে। তারা নিজেরা কোন কল্যাণজনক কাজ করতে পারেনি। সমাজকে কোন কিছু উপহার দিতে পারেনি। অতএব আসুন! অলসতার জরাজীর্ণ চাদর ছুঁড়ে ফেলে বরকতময় কর্মমুখর জীবন ও আমলী যিন্দেগীর প্রতি আমরা বিশেষভাবে মনোযোগী হই। মহান আল্লাহ আমাদের সে তাওফীক দান করুন- আমীন!

[1]. বুখারী, হা/২০৭২।

[2]. আবুদাউদ হা/২৬০৬; তিরমিযী হা/১২১২; মিশকাত হা/৩৯০৮।

[3]. তিরমিযী হা/৫৮৬; মিশকাত হা/৯৭১; ছহীহাহ হা/৩৪০৩।

[4]. বুখারী হা/১১৪২, ৩২৬৯; মুসলিম হা/৭৭৬; মিশকাত হা/১২১৯

[5]. আহমাদ হা/৮৬৮১; তিরমিযী হা/২৪৬৬; ইবনু মাজাহ হা/৪১০৭; মিশকাত হা/৫১৭২; ছহীহাহ হা/১৩৫৯

[6]. বুখারী হা/২০৭৪, ২৩৭৪

[7]. মুসলিম হা/১১৮; তিরমিযী হা/২১৯৫; মিশকাত হা/৫৩৮৩

[8]. মুসলিম হা/২৬৬৪; ইবনু মাজাহ হা/৭৯

[9]. মুসলিম হা/১৫৯৯; মিশকাত হা/৪৮৩৯

[10]. বুখারী হা/৬৩৬৯; মিশকাত হা/২৪৫৮

[11]. মুসলিম হা/২৭২২; মিশকাত হা/২৪৬০






বিষয়সমূহ: বিবিধ বিধি-বিধান
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত পরিচিতি (শেষ কিস্তি) - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
ইসলামে ভ্রাতৃত্ব (২য় কিস্তি) - ড. এ এস এম আযীযুল্লাহ
বিদ‘আতে হাসানার উদাহরণ : একটি পর্যালোচনা - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
আক্বীদা ও আহকামে হাদীছের প্রামাণ্যতা - মীযানুর রহমান মাদানী
তাহরীকে জিহাদ : আহলেহাদীছ ও আহনাফ (৮ম কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
সঠিক আক্বীদাই পরকালীন জীবনে মুক্তির উপায় - মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম মাদানী
ইসলামে পোশাক-পরিচ্ছদ : গুরুত্ব ও তাৎপর্য - মুহাম্মাদ আবু তাহের, পরিচালক, কিউসেট ইনস্টিটিউট, সিলেট।
ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের বিধান - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
টাখনুর নীচে কাপড় পরিধানের শাস্তি - আব্দুল মালেক বিন ইদরীস
স্মৃতির আয়নায় আত-তাহরীক-এর সূচনা - শামসুল আলম
আকাঙ্ক্ষা : গুরুত্ব ও ফযীলত - রফীক আহমাদ - বিরামপুর, দিনাজপুর
করোনার নববী চিকিৎসা - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
আরও
আরও
.