দ্বীনী খেদমত : কৃতিত্ব নয় সৌভাগ্য

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার মনোনীত দ্বীন ইসলামের প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করা নিঃসন্দেহে একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার বিষয়। দ্বীনের যেকোন ছোট বা বড় খেদমত করার সুযোগ পাওয়া মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট নে‘মত ও সৌভাগ্যের পরিচায়ক। তবে এই সৌভাগ্যের পথটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং সংবেদনশীল। এই পথে সামান্য পদস্খলন বান্দার সমস্ত অর্জনকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই এটি নিয়ে গর্ব করার কোন অবকাশ নেই, বরং এর জন্য কৃতজ্ঞতা ও বিনয়াবনত হওয়াই মুমিনের কর্তব্য। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা দ্বীনী খেদমতের লক্ষ্য, দ্বীনের খাদেমদের মানসিকতা এবং কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করব ইনশাআল্লাহ।

দ্বীনী খেদমতের লক্ষ্য

দ্বীনী খেদমতে নিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে সর্বদা আল্লাহর একজন নগণ্য বান্দা এবং মানুষের জন্য কল্যাণকামী হিসাবে গণ্য করতে পারেন। তার প্রতিটি কথা ও কাজ হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তিনি হবেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী, ধৈর্যশীল, বিনম্র এবং উম্মাহর জন্য নিবেদিতপ্রাণ। দ্বীনের খেদমতই হবে তার জীবনের মূল লক্ষ্য। তবে এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়ের প্রতি তাকে বিশেষভাবে নযর দিতে হবে। যেমন-

(১) নিয়তের বিশুদ্ধতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দান :

প্রত্যেক আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। সঠিক নিয়ত ব্যতীত কোন আমলই কবুলযোগ্য হবে না। রাসূল (ছাঃ)-এর সুস্পষ্ট ঘোষণা, إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى ‘সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে’।[1]

একজন ব্যক্তি হয়তো ইসলামের জন্য অনেক বড় বড় খেদমত করেছেন, বই লিখেছেন, বক্তৃতা দিচ্ছেন, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করছেন, মানুষকে সহযোগিতা করছেন। কিন্তু তার অন্তরের নিয়ত যদি হয় মানুষের কাছে বড় আলেম, বড় খাদেম বা সমাজসেবক হিসাবে পরিচিতি লাভ করা, তবে আল্লাহর কাছে তার এই পরিশ্রমের কোন মূল্য নেই। বরং তা পাপে পরিণত হবে।

মূলত দ্বীনের খেদমত করতে করতে একসময় শয়তান নিজের মধ্যে আত্মগর্ব তৈরী করে দেয়। ফলে নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা উত্তম ভাবা এবং নিজের জ্ঞান, কর্ম বা অবদান নিয়ে গর্ব করার মত এক ভয়াবহ আত্মঘাতি প্রবণতা সৃষ্টি হয়। একসময় তা পরিণত হয় জাহান্নামীদের গুরুতর ব্যাধি অহংকারে। ফলে নেক আমল করতে করতেও সে নিজের অজান্তে এমন পাপে জড়িয়ে পড়ে, যা তার জান্নাতের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। অথচ সে বুঝতেই পারে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যার অন্তরে অনু পরিমাণ অহংকার রয়েছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।[2]

ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তিন শ্রেণীর ব্যক্তির বিচার করা হবে, যারা বড় বড় নেকীর কাজ করা সত্ত্বেও তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। যাদের সবকিছু ঠিক ছিল, কিন্তু তাদের নিয়ত কেবল আল্লাহর জন্য খালেছ ছিল না। তারা হলেন,

(ক) শহীদ : একজন ব্যক্তিকে বিচারের জন্য আনা হবে, যে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছে। আল্লাহ যখন তাকে তার নে‘মতের কথা স্মরণ করিয়ে জিজ্ঞেস করবেন সে কী আমল করেছে। তখন সে নিজের কৃতিত্ব যাহির করে বলবে, ‘আমি আপনার জন্য যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছি’। আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি যুদ্ধ করেছ যাতে লোকেরা তোমাকে ‘বীর’ বলে, আর তা বলাও হয়েছে’। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

(খ) আলেম ও ক্বারী : এরপর এমন এক ব্যক্তিকে আনা হবে, যে নিজে জ্ঞানার্জন করেছে, অন্যকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন তেলাওয়াত করেছে। সে আল্লাহর কাছে দাবী করবে যে, সে এসব কিছু তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই করেছে। আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি জ্ঞানার্জন করেছ যাতে তোমাকে ‘আলেম’ বলা হয় এবং কুরআন তেলাওয়াত করেছ যাতে তোমাকে ‘ক্বারী’ বলা হয়। আর দুনিয়াতে তা বলাও হয়েছে’। অতঃপর তাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

(গ) দানবীর : সবশেষে এমন এক ব্যক্তিকে আনা হবে, যাকে আললাহ প্রচুর সম্পদ দিয়েছিলেন। সে দাবী করবে যে, সে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই সকল ভালো পথে সম্পদ ব্যয় করেছে। আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি দান করেছ যাতে লোকেরা তোমাকে ‘দানবীর’ বলে, আর তা বলাও হয়েছে’। অতঃপর তাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।[3]

হাদীছটি দ্বীনের খাদেম হিসাবে দায়িত্বপালনকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা। হাদীছটি আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, যেকোন ইবাদত বা ভালো কাজ আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য প্রধান শর্ত হ’ল, কাজটি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই সম্পাদন করা। মানুষের প্রশংসা, খ্যাতি বা কোন দুনিয়াবী স্বার্থে করা কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং তা ভয়াবহ শাস্তির কারণ হবে। শাহাদত, ইলম চর্চা, দাওয়াত প্রদান কিংবা দান-ছাদাক্বার মত বড় বড় আমলও কেবল নিয়তের কারণে মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক যে, কোন আমল করার আগে নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করা যে, কাজটি আমি কেন করছি? আল্লাহর জন্য, নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্যে? নাকি বাহবা পাওয়ার জন্য? প্রতি মুহূর্তে নিজেকে আত্মসমালোচনার আতশী কাঁচের মধ্য দিয়ে নিয়ে যেতে পারলে আত্মশুদ্ধির পথটা সুগম হয়। আত্মগর্ব ও অহংকারের কালিমা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা যায়।

(২) দ্বীনী খেদমতকে কৃতিত্ব নয়, নে‘মত হিসাবে গ্রহণ করা :

আল্লাহ আমাদের বারংবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, হেদায়াত এবং সৎকাজ করার ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতে। মানুষ তার নিজস্ব ক্ষমতায় নিজস্ব প্রচেষ্টায় দ্বীনের জন্য কিছুই করতে পারে না, যদি না আল্লাহ তাকে সেই কাজের সুযোগ এবং সক্ষমতা দান করেন। উপরন্তু ইসলাম গ্রহণ করা এমনকি ইসলামের উপর টিকে থাকাই আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ বৈ কিছুই নয়। যেমন তিনি বলেন,يَمُنُّونَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُلْ لَا تَمُنُّوا عَلَيَّ إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلْإِيمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ‘তারা ইসলাম কবুল করেছে বলে তোমাকে ধন্য করতে চায়। বল, তোমরা মুসলমান হয়ে আমাকে ধন্য করেছ বলে মনে করো না। বরং ঈমানের দিকে পরিচালিত করে আল্লাহ তোমাদের ধন্য করেছেন। যদি তোমরা (ঈমানের দাবীতে) সত্যবাদী হয়ে থাক’ (হুজুরাত ৪৯/১৭)

এই আয়াতটি দ্বীনের খেদমতের মূল দর্শনকে স্পষ্ট করে তুলেছে। ছাহাবীদের মধ্যে কেউ কেউ যখন নিজেদের ইসলাম গ্রহণকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি অনুগ্রহ হিসাবে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, তখন আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করে তাদের ধারণা সংশোধন করে দেন। তিনি জানিয়ে দেন যে, ঈমান ও ইসলামের পথ পাওয়াটাই বান্দার উপর আল্লাহর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ। সুতরাং দ্বীনের যেকোন খেদমত, তা যত বড়ই হোক না কেন, তা মূলত আল্লাহর দেওয়া সেই হেদায়াতেরই একটি অংশ। এর জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। এতে নিজের কৃতিত্বের কিছু নেই, গর্ব বা অহংকারেরও কিছু নেই।

(৩) কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন বা শুকরিয়া আদায় করা :

দ্বীনের কাজের জন্য নির্বাচিত হওয়াকে নিজের যোগ্যতা না ভেবে আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ বা নে‘মত মনে করা এবং তার জন্য গভীরভাবে কৃতজ্ঞ থাকা একজন একনিষ্ঠ খাদেমের জন্য আবশ্যক। তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবেন এজন্য যে, রাববুল আলামীন লক্ষ-কোটি বনু আদমের মধ্য থেকে তাকে দ্বীনের খেদমতের জন্য নির্বাচন করেছেন। এটি কোন জাগতিক অর্জন নয়, বরং এটি এক বিরাট সম্মান, নে‘মত ও আমানত। যার শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তা‘আলা খেদমতের পরিধি ও প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ বলেন, لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেব’ (ইবরাহীম ১৪/৭)।

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাতে এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করতেন যে, তাঁর পা ফুলে যেত। আমি তাঁকে বললাম, ‘হে রাসূল (ছাঃ)! আপনি কেন এত কষ্ট করছেন, অথচ আল্লাহ আপনার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন? জবাবে তিনি বললেন,أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا ‘আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?’।[4]

(৪) বিনয়াবনত থাকা :

দ্বীনের খাদেমদের জন্য সর্বদা বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করা অপরিহার্য। দ্বীনের কাজে সফলতা-পরিচিতি, যশ-খ্যাতি আসলেও তিনি নিজেকে আল্লাহর একজন নগণ্য বান্দা হিসাবে দেখবেন, দ্বীনী খেদমতকে নিজের কৃতিত্ব না ভেবে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ মনে করবেন। সর্বোপরি সমস্ত গৌরব ও প্রশংসা আল্লাহর দিকেই ন্যস্ত করবেন। কারণ জ্ঞান, কর্ম ও প্রভাব মানুষকে অহংকারী করে তুলতে পারে, যা ইবলীসের বৈশিষ্ট্য। তাই তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করবেন যে, তার যা কিছু অর্জন, সবই আল্লাহর রহমত। এই মানসিকতা তাকে স্বীয় প্রভুর নিকটে এবং মানুষের কাছে প্রিয় করে তুলবে এবং তার দাওয়াতকে আরও ফলপ্রসূ করবে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, عِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا ‘রহমানের (প্রকৃত) বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে’ (ফুরক্বান ২৫/৬৩)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللهُ ‘যে আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে দেন’।[5] 

আবুবকর (রাঃ) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রদত্ত ভাষণে বলেন, أَيُّهَا النَّاسُ فَإِنِّي قَدْ وُلِّيتُ عَلَيْكُمْ وَلَسْتُ بِخَيْرِكُمْ، فَإِنْ أَحْسَنْتُ فَأَعِينُونِي، وَإِنْ أَسَأْتُ فَقَوِّمُونِي ‘হে লোকসকল, আমাকে তোমাদের উপর কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। সুতরাং যদি আমি সঠিক কাজ করি তবে আমাকে সাহায্য কর এবং যদি আমি ভুল করি তবে আমাকে সংশোধন করে দিও’।[6]

খেলাফতের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় হযরত ওমর (রাঃ) বলতেন, لَوْ مَاتَتْ شَاةٌ عَلَى شَطِّ الْفُرَاتِ ضَائِعَةً ، لَظَنَنْتُ أَنَّ اللهَ تَعَالَى سَائِلِي عَنْهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‘যদি ফোরাত নদীর তীরে একটি বকরীর বাচ্চাও হারানো অবস্থায় মারা যায়, তাতে আমার ভয় হয় যে, সেজন্য আল্লাহ আমাকে ক্বিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করবেন’।[7] অর্ধ পৃথিবীর শাসক হয়েও তিনি রাতের আঁধারে খাবারের বস্তা নিয়ে বিধবাদের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন।[8]

সালাফদের জীবন পরিক্রমায় দেখা যায়, তারা বড় বড় খেদমত আঞ্জাম দেওয়ার পরও নিজেদেরকে সবচেয়ে নগণ্য মনে করতেন। তারা রাতের আঁধারে গোপনে দান করতেন, নীরবে জ্ঞানার্জন ও শিক্ষাদানে ব্যস্ত থাকতেন এবং নিজেদের পরিচয় প্রকাশ হওয়াকে অপসন্দ করতেন। তারা মনে করতেন, আল্লাহ যে তাদেরকে দ্বীনের কাজের জন্য কবুল করেছেন, এটাই তাদের জন্য পরম সৌভাগ্য। এর উপর গর্ব বা অহংকার করার অর্থ হ’ল আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়া।

(৫) ভয় ও আশা রাখা :

একজন মুমিনের অন্তর ভয় ও আশার মাঝে দোদুল্যমান থাকে। দ্বীনের একজন একনিষ্ঠ খাদেম একদিকে ভয় করেন যে, তার নিয়তের সামান্য ত্রুটি, রিয়া বা অহংকারের কারণে তার সমস্ত পরিশ্রম বরবাদ হয়ে যেতে পারে। রাববুল আলামীন যেকোন সময় তার যোগ্যতা ছিনিয়ে নিতে পারেন। অর্জিত জ্ঞান-অভিজ্ঞতা ভুলিয়ে দিতে পারেন। অন্যদিকে তিনি আল্লাহর রহমতের প্রতি দৃঢ় আশা রাখেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তার কিছু ভুলত্রুটি সত্ত্বেও আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তার খেদমত কবুল করে নিতে পারেন। এই ভয় তাকে আত্ম-অহংকার থেকে বাঁচায় এবং আশা তাকে হতাশ হওয়া থেকে রক্ষা করে। আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন, يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا ‘তারা তাদের প্রতিপালককে ডাকে ভয় ও আশার সাথে’ (সাজদাহ ৩২/১৬)

(৬) সহানুভূতি ও ক্ষমাশীল হওয়া :

দ্বীনের দাওয়াত ও খেদমতের ক্ষেত্রে মানুষের প্রতি দয়া, সহানুভূতি, কোমলতা এবং তাদের ভুল-ত্রুটিকে ক্ষমার চোখে দেখা একজন দাঈ বা খাদেমের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। দয়া ও সহানুভূতি মানুষের হৃদয় জয় করে। পরস্পরের ভুলগুলো ক্ষমাশীলতার মাধ্যমে সংশোধন করে নিলে পারস্পরিক সম্পর্ক সুন্দর হয়। এর মাধ্যমে সহজেই মানুষের কাছে দ্বীনের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। কঠোরতা, রূঢ় আচরণ এবং অন্যের প্রতি ঘৃণা কেবল সম্পর্কই নষ্ট করে না বরং তাকে দ্বীন থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়। রাববুল আলামীন নবী করীম (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ ‘যদি তুমি রূঢ়ভাষী ও কঠিন হৃদয়ের হ’তে, তাহ’লে তারা তোমার পাশ থেকে সরে যেত। অতএব তুমি তাদের মার্জনা কর ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর’ (আলে ইমরান ৩/১৫৯)

(৭) বিভক্তি থেকে দূরে থাকা :

দ্বীনের নামে সামান্য মতপার্থক্যের জের ধরে বা ব্যক্তিগত স্বার্থে মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা উম্মাহর জন্য মারাত্মক ক্ষতি। এটি উম্মাহর শক্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়। আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ ‘নিশ্চয়ই যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন দায়িত্ব আপনার উপরে নেই’ (আন‘আম ৬/১৫৯)। এজন্য যে কোন মূল্যে বিভক্তির জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

দ্বীনী কাজে যা করণীয়

(১) ইস্তিকামাত বা লক্ষ্যে অবিচল থাকা :

দ্বীনের পথে অবিচল থাকা সাফল্যের মূল ভিত্তি। যে কোন কাজে লেগে থাকা বা অবিচলতা ছাড়া কোন বড় কাজই সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এ পথে চলতে গেলে নানা রকম বাধা, প্রতিকূলতা, মানুষের সমালোচনা, উপহাস এবং সাময়িক ব্যর্থতা আসা স্বাভাবিক। এরূপ পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে, লক্ষ্যে অবিচল থেকে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রেখে নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য দৃঢ়তার সাথে পালন করতে হবে।

একদিন সুফিয়ান বিন আব্দুল্লাহ ছাক্বাফী রাসূল (ছাঃ)-কে বললেন, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে এমন কথা বলে দিন, যে বিষয়ে আপনার পরে আর কাউকে জিজ্ঞেস করতে না হয়। জওয়াবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, قُلْ آمَنْتُ بِاللهِ ثُمَّ اسْتَقِمْ ‘তুমি বল আমি আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম। অতঃপর এর উপর দৃঢ় থাক’।[9]

(২) আল্লাহর উপর ভরসা রাখা :

দ্বীনের খাদেম তার সর্বোচ্চ শ্রম, মেধা ও কৌশল প্রয়োগ করবেন, কিন্তু ফলাফলের জন্য তিনি মানুষের উপর বা নিজের যোগ্যতার উপর নির্ভর করবেন না। তিনি বিশ্বাস রাখবেন, হেদায়াত দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তার দায়িত্ব শুধু সুন্দরভাবে পৌঁছে দেওয়া। কাজে সফলতা এলে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবেন এবং একে আল্লাহর অনুগ্রহ বলে স্বীকার করবেন। আর ব্যর্থতা বা প্রতিবন্ধকতা এলে হতাশ না হয়ে নিজের ত্রুটি খুঁজে বের করবেন এবং নতুন করে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে কাজ শুরু করবেন।

নবী শু‘আইব (আঃ)-এর কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ ‘আমার কোনই ক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত। আমি তাঁর উপরেই নির্ভর করি এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাই’ (হূদ ১১/৮৮)

আল্লাহ স্বীয় রাসূলকে বলেন,فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ ‘যখন তুমি কোন সংকল্প কর, তখন আল্লাহর উপর ভরসা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালোবাসেন’ (আলে ইমরান ১৫৯)

(৩) নিয়মিত আত্মসমালোচনা করা :

নিয়ত হ’ল সকল কাজের প্রাণ। শয়তান মানুষের আমলে সরাসরি বাধা দিতে না পারলে তার নিয়তকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। তাই দ্বীনের খাদেমদের জন্য আত্মপর্যালোচনা একটি অত্যাবশ্যকীয় কাজ। প্রতিনিয়ত সে নিজের নিয়তকে যাচাই করবে। কোন দুনিয়াবী স্বার্থ, খ্যাতি বা প্রশংসার লোভ অন্তরে প্রবেশ করছে কি না, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। ওমর (রাঃ) বলতেন, حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا ‘তোমরা নিজেদের আমলের হিসাব নিজেরাই গ্রহণ কর, চূড়ান্ত হিসাব দিবসে তোমাদের কাছ থেকে হিসাব গৃহীত হবার পূর্বেই’।[10]

(৪) ঐক্য ও পরামর্শভিত্তিক কাজ করা :

দ্বীনী কাজ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ঊর্ধ্বে একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। তাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে গ্রহণ করা ইসলামের অন্যতম মূলনীতি। আমার বুঝই যথার্থ বা আমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্তত এ ধরনের মানসিকতা পরিহার করে সবার সম্মিলিত মতামতের উপর নির্ভর করা উচিত। এতে কাজে বরকত হয়, ভ্রাতৃত্ব মযবূত হয় এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ ‘তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করে’ (শূরা ৪২/৩৮)

(৫) সঠিক জ্ঞান অর্জন করা :

ইলম বা জ্ঞান হ’ল যেকোন কাজের মূল চালিকাশক্তি। সঠিক জ্ঞান ছাড়া যেকোন কাজই ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যদি খেদমতকারীর নিজেরই সঠিক জ্ঞান না থাকে, তবে তিনি মানুষকে ভুল পথে চালিত করতে পারেন, যা উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশী করবে। তাই পাঠদান, বক্তব্য প্রদান, লেখালেখির ক্ষেত্রে যেমন কুরআন, সুন্নাহ, ফিক্বহ এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলী সম্পর্কে বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য, তেমনি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, সমাজ পরিচালনা, বিচার-ফায়ছালা প্রভৃতি বিষয়ে সম্যক জ্ঞানার্জন করা আবশ্যক।

(৬) দায়িত্বে অবহেলা না করা :

দ্বীনের খেদমত একটি মহান আমানত। আল্লাহ যাকে এই কাজের জন্য নির্বাচিত করেছেন, তার উচিত পূর্ণ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে এই দায়িত্ব পালন করা। এই দায়িত্ব পালনে কোন প্রকার অবহেলা, অলসতা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ প্রত্যেককে তার নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহর সামনে জিজ্ঞাসিত হ’তে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’।[11]

দ্বীনী কাজে যা বর্জনীয়

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দ্বীনের যেকোন সেবা করা, তা হ’তে পারে শিক্ষাদান, দাওয়াতী কাজ, লেখালেখি, সমাজসেবা বা সাংগঠনিক কাজ সবটাই অত্যন্ত সম্মানজনক ও সৌভাগ্যের বিষয়। তবে কিছু ক্ষতিকর মানসিকতা বা অন্তরের ব্যাধি এই মহান কাজকেও আল্লাহর কাছে মূল্যহীন করে দিয়ে উল্টো পাপে পরিণত করতে পারে। তাই দ্বীনের প্রত্যেক খাদেমের উচিত এ ব্যাপারে সচেতন থাকা এবং এসব ব্যাধি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা।

(১) রিয়া ও সুম‘আ (লোক দেখানো ও প্রচারের মানসিকতা) :

‘রিয়া’ হ’ল কোন ইবাদত বা ভালো কাজ মানুষকে দেখানোর জন্য করা। আর ‘সুম‘আ’ হ’ল নিজের ভালো কাজের কথা মানুষকে শোনানোর মাধ্যমে খ্যাতি ও প্রশংসা লাভ করার ইচ্ছা। উভয়টিই দ্বীনের খাদেমদের আমল নষ্ট করার সহজতম উপলক্ষ। রাসূল (ছাঃ) একদিন একদল ছাহাবীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে দাজ্জালের চেয়েও অধিক ভয়ংকর কিছুর সংবাদ দিব? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তা হ’ল, الشِّرْكُ الْخَفِىُّ ‘গোপন শিরক’। (তা হ’ল) কোন ব্যক্তি ছালাতে দাঁড়ালে যখন অন্য ব্যক্তি তার ছালাতের দিকে লক্ষ্য করে, তখন সে আরও সুন্দরভাবে ছালাত আদায় করে’।[12]

অনুরূপভাবে বক্তৃতা বা আলোচনার সময় শ্রোতাদের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা। এ লক্ষ্যে মানুষের সামনে নিজেকে বড় আলেম, পরহেযগার বা মুখলিছ কর্মী হিসাবে যাহির করার চেষ্টা করা। মাঝে মাঝে নিজের জ্ঞান যাহির করার জন্য কঠিন বা অপ্রচলিত মাসআলা বলা, যাতে মানুষ তাকে বড় আলেম বা জ্ঞানী মনে করে। সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়তা ও বড়ত্ব প্রচারের উদ্দেশ্যে ছবি বা ভিডিও পোস্ট করে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার কামনা করা এ সবই রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। এরূপ নিয়ত আমলকে ধ্বংস করে দেয়। তাই এসব থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।

(২) অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ :

দ্বীনী কাজে অহংকার করা আরেকটি মারাত্মক ব্যাধি। এটা প্রকাশ পায় নিজের ইবাদত, জ্ঞান বা ধার্মিকতার কারণে নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা উত্তম মনে করা এবং অন্যদেরকে তুচ্ছ বা ছোট ভাবার মাধ্যমে। এটি অন্তরে লুকিয়ে থাকা এক নীরব ঘাতক, যা মানুষের নেক আমলকে নষ্ট করে দেয়।

যখন কোন জ্ঞানী ব্যক্তি তার জ্ঞানের কারণে সাধারণ মুসলমান বা স্বল্পজ্ঞানী ব্যক্তিকে হেয় করেন, নিজের মতকেই একমাত্র সঠিক বলে ধরে নেন এবং অন্যের পরামর্শ গ্রহণ করতে চান না, তখন তা জ্ঞানের অহংকারে পরিণত হয়। আর মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে জ্ঞানের অহংকারই সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অহংকার, যার কারণে মানুষ জেনেশুনেই পথভ্রষ্ট হয়।

একইভাবে কোন ইবাদতগুযার, আমলদার ব্যক্তি যখন কোন পাপী ব্যক্তিকে দেখে মনে মনে বা প্রকাশ্যে তাচ্ছিল্য করে এবং ভাবে, আমি তার চেয়ে অনেক ভালো, আমি ইবাদত অনেক বেশী করি। আর সে তো পাপী, আমলহীন, নানা পাপে লিপ্ত; তখন তার ইবাদতই তার অহংকারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়’। সে ভুলে যায় যে, আল্লাহ তাকে যে জ্ঞান দিয়েছেন, যে ইবাদত করার তাওফীক দিয়েছেন চাইলে মুহূর্তেই তা ছিনিয়ে নিতে পারেন।

এই অহংকার কেবল জ্ঞান বা ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়। দান করে গ্রহীতাকে ছোট ভাবা, অন্যকে উপদেশ দেওয়ার সময় নিজেকে ত্রুটিমুক্ত ও অন্যকে নিকৃষ্ট মনে করাও এর অন্তর্ভুক্ত। মূলত অহংকারের জন্ম হয় আত্মমুগ্ধতা থেকে, যখন ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহ ভুলে গিয়ে নিজের আমলকে বড় করে দেখতে শুরু করে। এই অহংকার সত্যকে গ্রহণ করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, অন্যদের চিন্তাধারা, পরামর্শ হ’তে উপকৃত হওয়া থেকে বঞ্চিত করে, সর্বোপরি আল্লাহর রহমত থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই সকল দ্বীনী কাজের পর দুনিয়াবী গর্ববোধে স্ফীত না হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং বিনয়ী থাকাই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।

(৩) দুনিয়াবী স্বার্থ হাছিলের মানসিকতা :

অনেক সময় আমাদের কারো কাজ বাহ্যিকভাবে কোন কাজকে আল্লাহর জন্য মনে হ’লেও তার পেছনের মূল চালিকাশক্তি থাকে অর্থ, সম্মান, ক্ষমতা বা জনপ্রিয়তা অর্জনের লোভ। এই মানসিকতা ব্যক্তির নিয়ত বা উদ্দেশ্যকে দূষিত করে ফেলে।

যখন কোন বক্তা আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে শ্রোতাদের বাহবা ও নিজের প্রসিদ্ধিকে বেশী গুরুত্ব দেন অথবা কোন সমাজসেবক যখন নিঃস্বার্থ সেবার আড়ালে নিজের সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন, তখন তার দ্বীনী কাজ দুনিয়াবী স্বার্থে কলুষিত হয়ে পড়ে।

এই ক্ষেত্রে দ্বীনী খেদমতকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসাবে না দেখে, বরং পার্থিব জীবনে সফলতার সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এই মানসিকতা ইবাদতকে ব্যবসায় পরিণত করে এবং আমলের অভ্যন্তরীণ রূহ বা একনিষ্ঠতাকে ধ্বংস করে দেয়। বাহ্যিকভাবে কাজটি যতই সুন্দর হোক না কেন, উদ্দেশ্যের এই ভ্রষ্টতার কারণে তা আল্লাহর কাছে মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে এবং পরকালে তা পুরস্কারের বদলে শাস্তির কারণ হ’তে পারে।

(৪) সংকীর্ণতা ও বিদ্বেষ :

দ্বীনী খেদমতে সংকীর্ণতা ও বিদ্বেষ হ’ল এক ক্ষতিকর আত্মিক রোগ, যার স্বরূপ হ’ল শরী‘আত নির্দেশিত বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের পরিবর্তে নিজের মতাদর্শকেই সত্যের একমাত্র মানদন্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। এর ফলে দ্বীনের খেদমত আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয়ে, নিজস্ব মতামতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়।

এই সংকীর্ণতার ফলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্য মুসলিম ভাইদেরকে সহযোগী না ভেবে প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করে। তারা নিজেদের পন্থাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করে। তারা অন্যদের ভালো কাজকে স্বীকৃতি না দিয়ে এবং শুধু তাদের ছোটখাটো ভুল নিয়ে সমালোচনা ও গীবত করে। নিজ দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং সত্য জানার পরেও শুধুমাত্র দলীয় স্বার্থে ভুলকে সমর্থন করে। এই সংকীর্ণতা ইখলাছের পরিপন্থী এক মারাত্মক ব্যাধি, যা মুসলিম উম্মাহর দেহে বিভেদ ও ঘৃণার বিষ ছড়িয়ে দেয়।

অতএব আমাদেরকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করতে হবে। অন্য মুসলিম ভাই বা দলের প্রতি বিদ্বেষ না রেখে, তাদের ভালো কাজকে সম্মান করতে হবে এবং সত্য যেখান থেকেই আসুক, তা বিনয়ের সাথে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখতে হবে। মতামতের ভিন্নতাকে শত্রুতা না ভেবে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা এবং গঠনমূলক পন্থায় একে অপরকে সংশোধনের চেষ্টা করে যেতে হবে।

(৫) ফলাফলের জন্য অধৈর্য হওয়া :

দ্বীনী খেদমতের ক্ষেত্রে ফলাফলের জন্য অধৈর্য হয়ে পড়া এক প্রকার মানসিক অস্থিরতা, যার স্বরূপ হ’ল নিজের প্রচেষ্টা বা কাজের দৃশ্যমান সফলতা দ্রুত দেখতে চাওয়া। এর মূলে রয়েছে প্রচেষ্টার চেয়ে ফলাফলের উপর বেশি মনোযোগ দেওয়া এবং আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ আস্থা বা তাওয়াক্কুলের অভাব। এই অধৈর্য ব্যক্তি বা দলকে সংখ্যাবৃদ্ধি, জনপ্রিয়তা বা তাৎক্ষণিক পরিবর্তন দেখার জন্য ব্যতিব্যস্ত করে তোলে এবং প্রত্যাশিত ফল না পেলে তারা হতাশ, ক্লান্ত বা নিরাশ হয়ে পড়েন।

এই অস্থিরতা থেকে বাঁচার প্রধান উপায় হ’ল, নিজের দায়িত্ব ও আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা। আমাদের দায়িত্ব হ’ল দ্বীনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া বা খেদমত করা; ফলাফল দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তাই ফলাফলের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের প্রচেষ্টা ও একনিষ্ঠতার দিকে মনোযোগ দেয়াই আবশ্যক।

এক্ষেত্রে আমাদের নবী-রাসূলগণের জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত, যারা সারা জীবন দাওয়াত দিয়েও সামান্য কিছু অনুসারী পেয়েছিলেন, কেউ কেউ কোন অনুসারীই পাননি, কিন্তু কখনো নিরাশা তাদেরকে গ্রাস করেনি।

(৬) হিকমত বা প্রজ্ঞার সাথে কাজ না করা :

দ্বীনী খেদমতের ক্ষেত্রে জ্ঞানের অভাব বিভিন্নভাবে পরিদৃষ্ট হয়। এর অভাবের বাস্তব চিত্র হ’ল সঠিক জ্ঞানকে ভুল পদ্ধতিতে, ভুল সময়ে বা ভুল স্থানে প্রয়োগ করা। এর ফলে সত্য কথাটিও মানুষের কাছে কঠোর বা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় এবং তারা তা গ্রহণ করার পরিবর্তে দূরে সরে যায়। প্রজ্ঞার অভাবে একজন দাঈ একজন দায়িত্বশীল স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা না করে মানুষের ধারণক্ষমতার বাইরে গিয়ে কঠিন ভাষায় বা জটিল বিষয়ে আলোচনা করেন, মানুষের মানসিক অবস্থা না বুঝেই কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন, প্রকাশ্যে কাউকে অপমান করে বা লজ্জা দিয়ে সংশোধন করার চেষ্টা করেন এবং হেদায়াতের চেয়ে নিজের মত প্রতিষ্ঠায় অধিক আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এর চূড়ান্ত পরিণতি হ’ল, খেদমতের নামে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি হওয়া এবং মানুষের অন্তরে তার প্রতি, তার দাওয়াতের প্রতি আগ্রহের পরিবর্তে ঘৃণা জন্মানো।

এক্ষেত্রে আমাদেরকে দ্বীনের গভীর জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনচরিত, দাওয়াতী পদ্ধতি নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করতে হবে; মানুষের কাছে দাওয়াত দেওয়ার সময় তাদের অবস্থা, পারিপার্শ্বিকতা ও ধারণক্ষমতা বুঝতে হবে; ধৈর্য, সহনশীলতা ও কোমলতাকে নিজের চরিত্রের অংশে পরিণত করতে হবে এবং কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা কম, তা অনুধাবন করে কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। সর্বোপরি, নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধির উপর আত্মবিশ্বাসী না হয়ে, প্রজ্ঞার জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দো‘আ করতে হবে।

উপসংহার :

দ্বীনের খেদমত নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ, তবে এর মূল চালিকাশক্তি হ’তে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং এর বাহ্যিক প্রকাশ হ’তে হবে বিনয় ও কৃতজ্ঞতা। যখন কোন বান্দা দ্বীনের কাজ করে গর্ব ও অহংকার করে, তখন সে মূলত নিজের আমলকে ধ্বংস করে এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যায়। নেক আমল করে তার মূল্য হারানোর চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কিছু নেই। অন্যদিকে যে ব্যক্তি খেদমতকে আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করে, সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন এবং তার কাজে বরকত দান করেন।

অতএব দ্বীনের প্রত্যেক খাদেমের উচিত উপরোক্ত ইতিবাচক মানসিকতাগুলো ধারণ করা এবং বর্জনীয় বিষয়গুলো থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়া। আললাহ আমাদের সবাইকে ইখলাছের সাথে তাঁর দ্বীনের খেদমত করার তাওফীক দান করুন, আমাদের সকল খেদমতকে কবুল করুন এবং আমাদের অন্তরকে সব ধরনের কলুষতা থেকে পবিত্র রাখুন। -আমীন!


[1]. বুখারী হা/১।

[2]. মুসলিম হা/৯১।

[3]. মুসলিম হা/১৯০৫; মিশকাত হা/২০৫।

[4]. বুখারী হা/৪৮৩৭।

[5]. মুসলিম হা/২৫৮৮, ১৮৮৯।

[6]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৫/২৬৯।

[7]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৭৪১৫। সনদ ‘হাসান লিগাইরিহী’

[8]. বুখারী হা/৪১৬১।

[9]. আহমাদ হা/১৫৪৫৪; মুসলিম হা/৩৮।

[10]. তিরমিযী হা/২৪৫৯, সনদ মওকূফ ছহীহ।

[11]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৮৫।

[12]. আহমাদ; ইবনু মাজাহ হা/৪২০৪; মিশকাত হা/৫৩৩৩






মানবাধিকার ও ইসলাম (২য় কিস্তি) - শামসুল আলম
পবিত্রতা অর্জন সম্পর্কিত বিবিধ মাসায়েল (৬ষ্ঠ কিস্তি) - মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম মাদানী
কিভাবে নিজেকে আলোকিত করবেন? - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
নিয়মের রাজত্ব - রফীক আহমাদ - বিরামপুর, দিনাজপুর
ইলম অন্বেষণও শিক্ষাদানের গুরুত্বও ফযীলত - মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
ইসলামী বিচার ব্যবস্থার কল্যাণকামিতা - শেখ মুহাম্মাদ রফীকুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক, পাইকগাছা সরকারী কলেজ, খুলনা
মাসায়েলে কুরবানী - আত-তাহরীক ডেস্ক
ওযূর আদব সমূহ - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
গীবত : পরিণাম ও প্রতিকার (২য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
কুরআন শিক্ষা ও তেলাওয়াতের ফযীলত - ইহসান ইলাহী যহীর
জামা‘আতে ছালাত আদায়ের গুরুত্ব, ফযীলত ও হিকমত (২য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
মানবাধিকার ও ইসলাম (১১তম কিস্তি) - শামসুল আলম
আরও
আরও
.