২৭ ও ২৮শে আগস্ট শুক্র ও শনিবার নওদাপাড়া, রাজশাহী : ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর দুই দিন ব্যাপী বার্ষিক কর্মী সম্মেলন ২০২৬-এর উদ্বোধনী ভাষণে সম্মেলনের সভাপতি মুহতারাম আমীরে জামা‘আত প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব উপরোক্ত কথা বলেন। সূরা আ‘রাফের ১৮১ আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, প্রত্যেক নবীর উম্মতের মধ্যে হকপন্থী একদল উম্মত চিরদিন ছিলেন, আজও আছেন; যদিও তারা সংখ্যায় কম হন। এই হকপন্থীদের আন্দোলনই হ’ল আহলেহাদীছ আন্দোলন। এটি প্রচলিত অর্থে কোন মাযহাব বা মতবাদের নাম নয়; এটি একটি পথের নাম। এ পথের শেষ ঠিকানা হ’ল জান্নাত। তাই তিনি সকলকে এই হকপন্থী আন্দোলনে শরীক হয়ে জামা‘আতবদ্ধভাবে কাজ করার উদাত্ত আহবান জানান। অতঃপর তিনি সবাইকে দু’দিনব্যাপী কর্মী সম্মেলনে সুশৃংখলভাবে অবস্থানের আহবান জানিয়ে আল্লাহর নামে কর্মী সম্মেলনের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
১ম দিন শুক্রবার সকাল ৯-টায় সম্মেলন শুরু হয়। ১ম অধিবেশনের পরিচালক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাওলানা নূরুল ইসলামের পরিচালনায় ও কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাওলানা আলতাফ হোসাইনের সঞ্চালনায় চট্টগ্রাম যেলা ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি হাফেয শেখ সাদীর অর্থসহ কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সম্মেলন শুরু হয়। অতঃপর আল-হেরা শিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য মুহাম্মাদ মীযানুর রহমান (জয়পুরহাট) জাগরণী পরিবেশন করে। স্বাগত ভাষণ পেশ করেন কর্মী সম্মেলনের আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাওলানা নূরুল ইসলাম।
উদ্বোধনী ভাষণের পর বিষয়ভিত্তিক ধারাবাহিক বক্তব্য শুরু হয়। প্রথমে (১) ‘কর্মীদের পারস্পরিক সদাচরণের গুরুত্ব’ বিষয়ে বক্তব্য পেশ করেন ‘আন্দোলন’-এর কেন্দ্রীয় গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম (মারকায), অতঃপর (২) ‘রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত আত্মগঠন’ বিষয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক এবং ‘হাদীছ ফাউন্ডেশন শিক্ষা বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব (মারকায), (৩) ‘কর্মী গঠনে তা‘লীমী বৈঠকের গুরুত্ব (মহিলা সংস্থার গুরুত্বসহ)’ বিষয়ে কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক ড. মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম (মারকায), (৪) ‘সাংগঠনিক জীবনের অন্তরায় হিংসা ও অহংকার’ বিষয়ে কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য অধ্যাপক শেখ রফীকুল ইসলাম (সাতক্ষীরা), (৫) ‘নৈতিক অবক্ষয় প্রতিরোধে আমর বিল মা‘রূফ ও নাহি আনিল মুনকার’ বিষয়ে মাওলানা আমানুল্লাহ বিন ইসমাঈল (পাবনা) বক্তব্য পেশ করেন।
বাদ আছর (৬) ‘কাদিয়ানী ফিৎনা প্রতিরোধে আমাদের করণীয়’ বিষয়ে আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়ার ভাইস-প্রিন্সিপাল ড. নূরুল ইসলাম (মারকায), (৭) ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন-এর প্রচার-প্রসারে পেশাজীবী ফোরামের ভূমিকা’ বিষয়ে আহলেহাদীছ পেশাজীবী ফোরামের সভাপতি ডা. শওকত হাসান বক্তব্য রাখেন।
তারপর মুহতারাম আমীরে জামা‘আত প্রণীত ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন কি ও কেন?’ বইয়ের আলোকে প্রশ্নোত্তর আকারে সংকলিত প্রচারপত্রের উপর গ্রুপভিত্তিক পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হয়। কর্মীগণ গুরুত্বের সাথে পাঠচক্রে অংশগ্রহণ করেন এবং অনেকেই তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুখস্থ করেন।
বাদ মাগরিব যেলা সংগঠন সমূহের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধিতে যেলা সভাপতি ও প্রতিনিধিগণের মধ্য হ’তে পরামর্শমূলক বক্তব্য পেশ করেন (৮) শেরপুর যেলা ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি মুহাম্মাদ এনামুল হক, (৯) ভোলা যেলা সভাপতি কামরুল হাসান, (১০) বরিশাল-পশ্চিম সাংগঠনিক যেলা সভাপতি মাওলানা ইব্রাহীম কাওছার সালাফী, (১১) নোয়াখালী যেলার কর্মী শহীদুল ইসলাম সজীব, (১২) কুষ্টিয়া-পশ্চিম যেলার কর্মী আব্দুল মুক্বীত প্রমুখ।
অতঃপর (১৩) ‘তরুণ সমাজে দ্বীনের দাওয়াত প্রসারে আমাদের করণীয়’ বিষয়ে ‘যুবসংঘ’-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম, (১৪) ‘মাল ও মর্যাদার লোভ সাংগঠনিক উন্নতির অন্তরায়’ বিষয়ে ঢাকা-দক্ষিণ যেলার সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ এবং বাদ এশা (১৫) ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন কি চায়, কেন চায়, কিভাবে চায়?’ বিষয়ে জামালপুর-দক্ষিণ যেলার সাধারণ সম্পাদক কামারুয্যামান বিন আব্দুল বারী বক্তব্য রাখেন।
২য় দিন শুক্রবার বাদ ফজর মারকাযের পশ্চিম পার্শ্বস্থ মসজিদে ‘দ্বীনের পথে আত্মত্যাগ’ বিষয়ে দরস পেশ করেন আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়ার প্রিন্সিপাল হাফেয মুহাম্মাদ আখতার। একই সময়ে পূর্ব পার্শ্বস্থ মসজিদে সূরা আছরে বর্ণিত ৪টি গুণ বিষয়ে দরস পেশ করেন ‘আন্দোলন’-এর কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ সম্পাদক অধ্যাপক মাওলানা দুররুল হুদা।
দরস শেষে সামান্য বিরতির পর বিষয়ভিত্তিক বক্তব্য শুরু হয়। (১) ‘সাংগঠনিক অগ্রগতি অর্জনে আমানতদারিতার গুরুত্ব’ বিষয়ে বক্তব্য পেশ করেন ‘আন্দোলন’-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাওলানা নূরুল ইসলাম (মেহেরপুর), (২) ‘সাংগঠনিক মযবূতি বৃদ্ধিতে কর্মীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য’ বিষয়ে কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাওলানা আলতাফ হোসাইন (সাতক্ষীরা), (৩) ‘আহলেহাদীছের পরিচয়’ বিষয়ে কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন (মারকায), (৪) ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন-এর চার দফা কর্মসূচী’ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম (যশোর), (৫) ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন-এর পাঁচটি মূলনীতি’ বিষয়ে কেন্দ্রীয় যুববিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রশীদ আখতার (কুষ্টিয়া) বক্তব্য রাখেন।
নাশতার বিরতির পর (৬) ‘আদর্শ ও চরিত্রবান শিশু-কিশোর গঠনে সোনামণি সংগঠনের ভূমিকা’ বিষয়ে ‘সোনামণি’র কেন্দ্রীয় সহ-পরিচালক নাজমুন নাঈম (সাতক্ষীরা), (৭) ‘মানবসেবার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা (আল-‘আওনের ভূমিকাসহ) বিষয়ে ‘আল-‘আওন-এর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মুহাম্মাদ আবুদাঊদ (রাজশাহী), (৮) ‘ফিরক্বায়ে নাজিয়ার বৈশিষ্ট্য সমূহ’ বিষয়ে রাজশাহী-সদর সাংগঠনিক যেলা সভাপতি মাওলানা দুররুল হুদা, (৯) ‘পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নিরসনে করণীয়’ বিষয়ে কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য অধ্যাপক জালালুদ্দীন (১০) ‘সংগঠনের অগ্রগতিতে আর্থিক মযবূতির গুরুত্ব ও পদ্ধতি (ইনফাক্ব ফী সাবীলিল্লাহ)’ বিষয়ে খুলনা যেলা ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম বক্তব্য পেশ করেন (১১) অতঃপর বিগত ২০২৫-২৬ বছরের বার্ষিক সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম। কর্মী সম্মেলন উপলক্ষে ‘কর্মীদের প্রতি আমীরে জামা‘আতের আহবান’ পাঠ করে শুনান কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাওলানা নূরুল ইসলাম। অতঃপর ‘বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ’-এর ২০২৬-২৮ সেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির নাম ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় যুববিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রশীদ আখতার। সবশেষে আমীরে জামা‘আত তাদেরসহ উপস্থিত সকলের আনুগত্যের বায়‘আত গ্রহণ করেন।
কেন্দ্রীয় পরিষদ সদস্য ও উপদেষ্টা সম্মেলন : সম্মেলনের ২য় দিন শুক্রবার সকাল ৯-টা থেকে পৌনে ১১-টা পর্যন্ত মারকাযের পূর্ব পার্শ্বস্থ মসজিদের নীচ তলায় মুহতারাম আমীরে জামা‘আতের সভাপতিত্বে ‘আন্দোলন’-এর কেন্দ্রীয় পরিষদ সদস্য ও উপদেষ্টা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাওলানা নূরুল ইসলামের উদ্বোধনী বক্তব্যের পর সভাপতির নির্দেশক্রমে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের কেন্দ্রের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের অডিটকৃত হিসাব পেশ করেন কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক বাহারুল ইসলাম (কুষ্টিয়া)। সংগঠনের ২০২৫-২৬ বছরের কেন্দ্রীয় বাজেট ও পরিকল্পনা পাঠ করেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম। অতঃপর সংগঠনের অগ্রগতি সম্পর্কে পরামর্শমূলক বক্তব্য পেশ করেন রাজশাহী-সদর যেলার উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট জারজিস আহমাদ, ড. মুহাম্মাদ মুহসিন (সাতক্ষীরা), জয়পুরহাট যেলার সহ-সভাপতি আব্দুল মুন‘ঈম ও কুমিল্লা যেলা সভাপতি মাওলানা ছফিউল্লাহ প্রমুখ। সবশেষে কেন্দ্রীয় পরিষদ সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে হেদায়াতী ভাষণ প্রদান করেন মুহতারাম আমীরে জামা‘আত।
সম্মেলনের অন্যান্য রিপোর্ট : দু’দিন ব্যাপী কর্মী সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে কুরআন তেলাওয়াত করেন হাফেয মুহাম্মাদ শেখ সাদী (চট্টগ্রাম), হাফেয লুৎফর রহমান, হাফেয ওবায়দুল্লাহ ও হাফেয যাকারিয়া (মারকায) এবং হাফেয আব্দুল্লাহ আল-ফাহীম (কুষ্টিয়া)। জাগরণী পরিবেশন করেন আল-হেরা শিল্পী গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় পরিচালক রাক্বীবুল ইসলাম (মেহেরপুর), সদস্য মুহাম্মাদ মীযানুর রহমান (জয়পুরহাট), কেরামত আলী (পাবনা), যিল্লুর রহমান ও মুবাশশিরুল ইসলাম (রাজশাহী), আসাদুল্লাহ মিলন (নারায়ণগঞ্জ), জিহাদুল ইসলাম (রংপুর), এনামুল হক (নওগাঁ) প্রমুখ।
আল-আওন : সম্মেলনে প্রথমদিন সকাল ৯-টা থেকে পরদিন জুম‘আ পর্যন্ত মারকাযী জামে মসজিদের মূল গেইটের বাইরে উত্তর পার্শ্বে রাজশাহী-সদর সাংগঠনিক যেলা ‘আল-আওন’-এর উদ্যোগে ব্লাড গ্রুপিং ও রক্তদাতা সদস্য সংগ্রহ ক্যাম্পিং অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত ক্যাম্পিংয়ে ১৯ জনের ব্লাড গ্রুপিং ও ১১ জন রক্তদাতা সদস্য বা ‘ডোনর’ তালিকাভুক্ত হন।
উল্লেখ্য, এবারের কর্মী সম্মেলনে ৬৬টি সাংগঠনিক যেলার ১৫৬৯ জন বাছাইকৃত কর্মী উপস্থিত ছিলেন।