মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়। পড়ার টেবিলে একমনে বসে আছি। সারফারায এসে পাশে বসল। ও পাকিস্তানী, আমার বন্ধু। পাশে বসে যেন কথা শুরু করার বিষয় খুঁজে পাচ্ছিল না। তার চোখজোড়া তাকের বইগুলোর ওপর ঘুরছিল। ‘এই ফ্রেমটাতে কি সব লেখা’? টেবিলের কোণায় একটি কাগজ বাঁধা ফ্রেম দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল। বাংলা পড়তে পারে না। তারওপরে আবার হাতের লেখা। বললাম, ‘এটা জানা কি খুবই দরকার’? সে বলল, ‘যরূর’! বললাম, ‘তো কফি ভী যরূর’! সে বলল, ‘থোড়া ইন্তেযার কী জিয়ে’! মিনিট দশেকের মধ্যেই কফি হাযির। আমিও একটু রিফ্রেশমেন্ট চাচ্ছিলাম। তাই কাহিনি শোনাতে বসে গেলাম।

কফির মগে চুমুক দিয়ে শুরু করলাম। এটা একটা সংবিধান। আর এই সংবিধানের প্রণেতা হ’লেন ক্বারী লুৎফর রহমান। আমার ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষক। ইতিমধ্যে সারফারাযের চোখেমুখে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল। মনে হচ্ছে যেন আমার কথা শুনতে তার বুকে জমে আছে আকাশ সমান আগ্রহ। সে কোন প্রশ্ন করছে না। হয়ত আমার বক্তব্যের মাঝে কোন সমস্যা করতে চাচ্ছে না। আমিও তার আগ্রহ দেখে গল্প একদম গোড়া থেকেই শুরু করলাম। 

সে বহুদিন আগের কথা। আববুর সরকারি চাকুরির সুবাদে নতুন নতুন মাদ্রাসার বারান্দা মাড়ানোর বিষয়টা একদমই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। কোথাও শিকড় গজানোর জো নেই। প্রায় প্রতিবছরই আববু বদলির কুড়াল নিয়ে হাযির হন। আশেপাশে দু’চার বাড়িতে পরিচিত না হ’তেই আসবাবপত্র নেয়ার গাড়ি বাড়িতে ভিড়ে। এটা একদিকে যেমন যন্ত্রণার, তেমনি উপভোগেরও বটে। আরবীতে একটা প্রবাদ আছে, ‘প্রত্যেক নতুনই সুস্বাদু’। আমরা সেই স্বাদ গ্রহণ করতে গিয়ে কোথাও আর স্থায়ী হ’তে পারিনি।

তখন সবেমাত্র ক্লাস ফাইভে পড়ি। এবার আববু বদলি হয়ে নিজের জন্মস্থানেই এসেছিলেন। আমরা গ্রামে নিজ বাড়িতেই উঠেছিলাম। তবে এই গ্রামও আমার কাছে নতুন। কারণ ছোট থেকেই বাইরে থাকা হয়েছে। কাজেই এখানেও আমার কোন বন্ধুবান্ধব নেই। সুবোধ বালকের মত প্রথমদিন মাদ্রাসায় গেলাম। লেট মাত্র আধা ঘন্টা। নতুন মাদ্রাসা বলে কথা। তাই একটু তাড়াতাড়িই গেছি। চারিদিকে এত নতুনের ছড়াছড়ি প্রতিবছরই হয়। কিন্তু আফসোস! আমার অভ্যাসটা আর নতুন হয় না। সেই যখন ক্লাস টুতে পড়ি তখন আমার ক্লাসে লেটের এত পাবন্দী দেখে প্রথম ক্লাসের যয়নুল স্যার পাখি পড়া করে মুখস্থ করালেন, ‘সময় হ’লে কাজ ফেলে; আসতে হবে স্কুলে’। সারাদিন এই বুলিটাই আওড়ালাম। পরের দিন সকালে চরণদ্বয় আওড়াতে আওড়াতে ক্লাস শুরু হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই মাদ্রাসায় পৌঁছালাম। ওটাই শেষ। তারপর থেকে কোন উস্তায এই উলুবনে তাদের একটি মুক্তাও ছড়াননি।

ছোট থেকেই আমি একটু আদুরে ধরনের। প্রতিদিনই টেনেটুনে স্কুলের ঘণ্টা পড়া পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকি। আম্মুও তেমন কিছু বলেন না। তবে আক্রমণ শুরু হয় আটটা বাজলে। আম্মুর সেই ত্রিশ বছরে মুখ, আর আমার এই বার বছরে কর্ণছানাগুলো। তাই কি আর পারে বল? তার ওপরে কথার যে ঝাঁঝ, একদম টেকাই মুশকিল। আম্মু ক্ষেপলে ঘরের ছুঁচো-ইঁদুরগুলোও ভয়ে থাকে বলে আমার মনে হয়। বিছানা থেকে উঠে নাশতা করে স্কুলের পথটুকু পাড়ি দিতে যা সময় লাগে, এতটুকুই আমার দৈনিক বিলম্ব।

আববু অবশ্য এখানে নীরব দর্শকের ভূমিকাতেই থাকেন। অনেক আদরের একটিই বাঁদর ছেলে! দিনে তিনবেলা আমিষ আর বছরে তিনবার ফেল! তার ওপরে প্রতিদিন বিকেলে হাতখরচা দিতেই হবে। তবুও যদি চালচলনে একটু ভদ্র হ’তাম, হয়ত আববু নামের ঐ জীবটার মধ্যে কিছুটা হ’লেও চাঞ্চল্য থাকত। কিন্তু আমার যত আধুনিক অত্যাচার আর আম্মুর ঐ তড়িৎ গতিতে বদলে যাওয়া মেজাযের জ্বালা সইতে সইতে তার অনুভূতি নামক ইন্দ্রিয়টার বেশ ক্ষয়ক্ষতি যে হয়েছে তা বোঝাই যায়।

আববু তো আমাকে কিছু বলেনই না, উল্টো আরো আমাকে সহযোগিতা করেন বলেই মনে হয়। এই যেমন, যখন নতুন মাদ্রাসায় ভর্তি হই তখনই আববু শিক্ষকদের বিনয়ের সাথে বলেন, ‘ইয়ে মানে... উস্তাদজী! বলছিলাম কি... আমার ছেলেটা... মানে ঘুম থেকে অত তাড়াতাড়ি উঠতে পারে না। যদি... আপনারা একটু... তাছাড়া বেশী কড়াকড়ি হ’লে ও আবার মাদ্রাসায় আসতেই চায় না। আমিও ওর মনের বিরুদ্ধে কিছু করি না। চাই, ছেলেটা যেভাবেই হোক দু’কলম পড়ালেখা শিখুক। আমার বড় ইচ্ছা, ও বড় আলেম হবে। আর আপনারা তো শিক্ষাগুরু। তাই বলছিলাম...’। আববা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। এজন্য তার সম্মানের দিকে লক্ষ্য করেই হোক, আর অন্য কোন কারণেই হোক আবেদন মঞ্জুর হয়ে যেত সবখানেই।

এতদিন সব ঠিকঠাকই চলছিল। তবে এত বড় মাপের ঝামেলাটা যে আমাদের গ্রামেই অবস্থান করছিল, তাই বা কে জানে। এই নতুন মাদ্রাসায় আমাদের প্রথম ক্লাস নেন ক্বারী লুৎফর রহমান ছাহেব। বয়স আনুমানিক চল্লিশ হবে। চেহারা ও পোষাকে ইসলামী শালীনতা বিদ্যমান। আববুর সাথে তার চেনা-জানা নাকি সেই প্রাইমারি থেকেই। আববুই তার চেয়ে এক বছরের জুনিয়র। ক্বারী ছাহেব ভেতর থেকেই ধার্মিক মানুষ। পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত বেশ পাবন্দীর সাথেই আদায় করেন। তবে তিনি নিয়ম-কানূনের ক্ষেত্রে নাকি বেশ কড়া। তা কোন ব্যাপার নয়। তিনিও বিগতদের কাতারে ঠেলেঠুলে জায়গা করে নিবেন, এটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এমনটা তো হ’লই না, উল্টো তিনি আমাকে যাদের কাতারে দাঁড় করিয়ে দিলেন তা আমি স্বপ্নেও ভেবে দেখার প্রয়োজন অনুভব করিনি।

প্রথম দিন আধা ঘন্টা লেটে মাদ্রাসায় গেলাম। দেখলাম সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিই ক্লাস করাচ্ছেন। ঢুকে যাব, ভাবলাম ব্যবহারে বংশের পরিচয় বলে কথা। একটু ভদ্রতা না দেখলেই কেমন হয়। বাইরে দাঁড়িয়েই বললাম, উস্তাদজী! আসতে পারি? কিন্তু আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে তিনি পড়াতেই থাকলেন! আমার কথায় কোন ভ্রূক্ষেপই করলেন না! আবার ভাবলাম, বেচারা তো সেকেলে মানুষ, হ’তে পারে এমন ভদ্রতা তার সামনে কখনো দেখানোই হয়নি। আবার বাইরে থেকে লক্ষ্য করছি, সবাই আমার দিকে কত আগ্রহ ভরে তাকাচ্ছে! আমার স্থানে যদি এখানে একটা হীরে রেখে দেওয়া হ’ত তবুও এত আগ্রহ নিয়ে তাকাতো না। ইতিমধ্যেই দু’য়েকজন আমাকে দেখিয়ে কানাকানি করছে। আমি মনে মনে বলছি, ভেবো না, আমিও বড়লোক বাপেরই ছেলে। শিং ভেঙ্গে এসে বাছুরের পালে মিশেছি। ক’দিন পরে সবাই টের পাবে। এসব ভেবেই বুক টান করে ক্লাসে ঢুকে গেলাম। সাথে সাথেই ক্বারী হুযুরের কন্ঠে একটি বাক্য ধ্বনিত হ’ল, ‘রায়হান! বাইরে যাও’! তার সাথে ক্লাস জুড়ে চাপা হাসির শব্দ। আমি ঘটনা বুঝে উঠতেই রক্তে যেন হারিকেন জেগে উঠল। আমি ক্বারী ছাহেবের দিকে তাকালাম। রাগে আর লজ্জায় আমার ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। তিনি আবার বললেন, ‘ক্লাস থেকে বের হও। অফিস রুমে গিয়ে বস। আমি আসছি’। এবার তার কথাগুলো আগের তুলনায় বেশ কড়া মনে হ’ল। আমি আর কথা বাড়ালাম না। অফিস রুমের দিকে পা বাড়ালাম।

অফিস রুমে বসে কি সব ভাবছি। কিছুক্ষণ বাদেই তিনি এলেন। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, চা খাবে? মনে মনে বললাম, ন্যাকা, গরু মেরে জুতা দান করতে এসেছে। মুখে কিছু বললাম না। কথা তিনিই শুরু করলেন। ‘দেখো রায়হান! ছাত্র জীবন ফসল চাষের সময়, আর তা ভোগ করতে পারবে কর্ম জীবনে। ফসল চাষের সময় যদি কৃষকের অবহেলা প্রকাশ পায় তবে তার সার্বিক ফলাফল কি হ’তে পারে তা অনুমান করার বয়স তোমার হয়েছে। আমি যখন ছাত্র ছিলাম সেকালের কথা বললে তুমি বিশ্বাস করবে না, তাই তোমাকে কর্মজীবনের কথাই বলি। আমি পনের বছর যাবৎ এখানে শিক্ষকতা করছি। ক্লাসে অনুপস্থিতি তো দূরের কথা, কোন দিন ক্লাসে এক মিনিট দেরী হয়েছে এমন কোন নযীর নেই’।

তাকে নিজের ঢাক এত নিপুণভাবে পেটাতে দেখে আমার খুবই রাগ হ’ল। এই শিক্ষকগুলোর উপদেশ দেয়ার নামে নিজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হওয়ার অভ্যাসটা আর গেল না। তখনি ঠিক করে ফেললাম, মহাশয়ের কারগুযারীর সোয়া চৌদ্দটা আগামী চবিবশ ঘন্টার মধ্যেই বাজিয়ে দেব। যেই ভাবা ব্যাস, প্ল্যান রেডি! আমি তার এই মন জুড়ানো নছীহতের ফাঁকেই মনে মনে দু’লাইন কবিতা আওড়িয়ে ফেললাম। তা চিরকুটে লেখাও হয়ে গেল। কথা শেষে যখন উঠলাম, তখন আমি তার অগোচরে চিরকুটখানা টেবিলে রেখে দিলাম। যেন আগামীকাল মাদ্রাসায় দেরী করে এসেই তিনি চিরকুটটা পান। আর আমাকেও হাড়ে হাড়ে চিনতে পারেন।

পরের দিন সকাল। ক্বারী হুযুর মাদ্রাসার জন্য তৈরী হচ্ছেন। তার বাড়ি থেকে মাদ্রাসায় যেতে কোন গাড়ি ঘোড়ার ব্যবস্থা নেই। তিনি যে সাইকেলটাতে যাওয়া-আসা করেন তা বাড়ির বাইরে রাখা আছে। তিনি সব গোছগাছ করে সাইকেলের দিকে পা বাড়ালেন। বাড়ি থেকে বের হয়েই স্কুলব্যাগ কাঁধে একটি ছেলেকে হনহন করে হেঁটে চলে যেতে দেখলেন। তিনি পেছন থেকে নাম ধরে কয়েকবার ডাকলেন। আমি না শোনার ভান করে হাঁটতে থাকলাম। তিনি যে এত আগেই বাড়ি থেকে বের হবেন, কে জানে? তিনি তো আমাকে দেখে ফেললেন! হায়! সব প্ল্যান ভেস্তে গেল। কি করি...! হন্তদন্ত হয়ে মাদ্রাসায় পৌঁছলাম। দেখলাম, অফিসে আরো শিক্ষকগণ বসে আছেন। এখন অফিসে গিয়ে তার টেবিল থেকে চিরকুটটাও সরানো সম্ভব নয়।

এদিকে ক্বারী হুযুর সাইকেলে চড়তে যাবেন, এমন সময় দেখলেন কোন চাকাতেই পাম নেই! পাম তো নেই, টিউবের ভালভকোরও নেই! এরপরেও তিনি কিভাবে ক্লাস শুরুর আগেই মাদ্রাসায় পৌঁছলেন তা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে ধরল না। হয়ত অন্য কারো সাইকেলে চড়ে এসেছেন। অফিসে ঢুকে তিনি দেখলেন তার টেবিলে একটি চিরকুট। তাতে লেখা আছে, ‘শোনান কারগুযারী, আসেন তিনি মাদ্রাসাতে কয়েক ঘন্টা দেরী’। সাথে সাথে বিষয়গুলো তার কাছে পানির মতো স্পষ্ট হয়ে গেল।

এদিকে আমি গো-বেচারার মতো পিঠে কুলো আর কানে তুলো নিয়ে ক্লাসে বসে ভাবছি, আজকে তিনি আমাকে কি করবেন তা আল্লাহই ভালো জানেন। দুঃখে, আফসোসে, কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে নিজের শরীরকে সম্বোধন করে বলতে লাগলাম, হায় আমার আদরের শরীর! অসুস্থ দাদুকে তুমি মেডিকেলে দেখতে যাওনি! ওখানে গেলে তোমার খারাপ লাগে! আর কিছুক্ষণ পরেই তো তুমি নিকটস্থ কোন চিকিৎসালয়ে পড়ে থাকবে হে! কি দরকার ছিল ঐ লোকটার টায়ার পাংচার করার জন্য অত ভোরে ঘুম থেকে কষ্ট করে ওঠার? এর চেয়ে যদি তুমি আজ দিনমান ঘুমিয়ে থাকতে! হায় আফসোস! আজ যদি তুমি মাদ্রাসাতেই না আসতে!

ক্বারী হুযুর ক্লাসে ঢুকলেন। বরাবরের মতই সবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। বললেন, ‘আজ আমি ক্লাস করাব না। যরূরী কাজ আছে’। ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাবার সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার আববুকে এখন কোথায় পাবো? আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, বাসায়। তিনি আমাকে বাসায় যাবার সময় চিরকুটটা নিয়ে যেতে বলে বেরিয়ে গেলেন। আমি বুঝলাম না, আক্রমণ তিনি কোন দিক দিয়ে করতে চাইছেন। অফিসে গিয়ে দেখলাম চিরকুটটা আগের জায়গাতেই আছে। ও মা! এতো আমার চিরকুটটা নয়! এতে লেখা আছে, ‘বাচ্চা কবুতর, অল্প দিনেই দেখবে বাছা নতুন খোয়াড়ঘর’।

তার মানে হ’ল, কোলাকুলিটা দা-কুমড়ায় হয়নি। সেয়ানে সেয়ানেই হয়েছে। যেমনি বুনো ওল, তেমনি বাঘা তেঁতুল! এই সেকেলে লোকটা এত ধুরন্ধর। এজন্যই হয়ত কথায় বলে, বইকে তার মোড়ক দিয়ে যাচাই করতে নেই। আমার কাছে বিষয়টা যেন আরো ঘোলাটে হয়ে গেল। আসলে কি ঘটছে তা বুঝতে না পারলেও অন্য রকম কিছু একটা যে ঘটবে তা বোঝা যাচ্ছে। আমিও নিজেকে বড় ধরনের বকাঝকা এবং আম্মুর বেদম প্রহার সহ্য করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্ত্তত করতে শুরু করলাম।

বাড়িতে গেলাম। যা দেখলাম তা আমি মোটেও আশা করিনি। আববু আম্মু দু’জনেই বেজায় খুশী। কিছুক্ষণ পরে আম্মুর কাছ থেকে সেই খুশীর কারণ আবিষ্কার করলাম। আম্মু বললেন, ক্বারী লুৎফর রহমান ছাহেব এসেছিলেন। তিনি নাকি আমার নামে বেশ প্রশংসা করে গেছেন। আববুকে বলেছেন, ‘আরে শহীদ! তোমার ছেলে এতটা মেধাবী! পড়াশোনায় এত আগ্রহী! তো শুরু থেকেই কেন একে ভালো কোন মাদ্রাসায় পড়াওনি? আমিতো প্রথমবার দেখে বুঝতেই পারিনি। একদম ছেঁড়া ধুকড়িতে আতপ চাউল! আমি হলফ করে বলতে পারি, সে ভবিষ্যতে ‘কিছু একটা’ হবে। এত তীক্ষ্ণ মেধা! মাত্র দু’দিনেই আমার মন জয় করে নিয়েছে।

কালকে আমি বললাম, পারলে একটু তাড়াতাড়ি মাদ্রাসায় এসো। তো আজ সবার আগেই হাযির’! এ কথা শুনতেই আম্মু বলে উঠলো, ‘হুঁ হুঁ সে নিজে নিজেই আজ ঘুম থেকে উঠেছে। এটা তো আমি ভাবতেও পারিনি’। আর আববু তো সব শুনে গদগদ হচ্ছেন। ক্বারী ছাহেব বললেন, ‘শহীদ! তোমার যদি কোন আপত্তি না থাকে তবে এই বছরটা আমি রায়হানকে আমার বাড়িতে রেখে গড়ে তুলতে চাই’। আর তখন অধিকাংশ মাদ্রাসাতেই জায়গীর প্রথা চালু ছিল। সুতরাং এটা কোন অবাক হওয়ার বিষয়ও ছিল না।

আববু চুপচাপ উঠে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে আসলেন আমার কাঁথা-বালিশ কাপড়চোপড় সব বেঁধে নিয়ে। আববু নাকি নিজেই গিয়ে আমার সবকিছু তার বাড়িতে রেখে এসেছেন। আর আজ দুপুরের খাবারটাও আমি নাকি ক্বারী ছাহেবের বাড়িতেই খাচ্ছি! এ কাহিনী শোনার পর আমি যেন আশ্চর্য হওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেললাম। এ অবস্থায় কি করতে হবে, কি বলতে হবে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তবে এতটুকু বুঝতে পারছিলাম যে, বেশ জাঁদরেল লোকের পাল্লাতেই পড়া হয়েছে। মুখে মিঠা কথা, বগলে ছুরি! একে ঠেকাবে কে?

দুপুরবেলা ক্বারী ছাহেবের বাড়িতে আসলাম। এখনো পরিস্থিতির ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারিনি। হাত-পাগুলো যন্ত্রমানবের মতই কাজ করছে। ক্বারী ছাহেব খাবার এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘এবেলা আমি মেহমানদারী করছি। এরপর থেকে কিন্তু নিজেকেই বেড়ে খেতে হবে, বুঝেছ? তোমার বাপের সাথে আমার সম্পর্ক সেই ছোট থেকেই। তাই ভাবলাম বন্ধুত্বেরও তো একটা দায়িত্ব আছে
বৈ কি? আমার মত বন্ধু থাকতে তার ছেলে যদি আস্ত একটা অমানুষ হয় তবে বিষয়টাই বা কেমন হ’ল। আমি অবশ্য তার কাছে তোমাকে শাসন করার অনুমতি নিয়ে নিয়েছি। দরজায় একটা কাগজ লাগানো আছে। দেখেছ? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, ‘ওটাই তোমার সংবিধান। মুখস্থ করে নিও। আমি একটু কাউন্সিলে যাচ্ছি। সন্ধ্যায় ফিরে যেন তোমাকে পড়ার টেবিলে পাই’। বলেই চলে গেলেন।

আধা খাওয়া ভাতের প্লেট রেখে আমি গিয়ে আগে কাগজটা পড়লাম। শিরোনাম ছাড়া ক্রমিক নম্বর দিয়ে লিখে গেছে। ১. মাদ্রাসায় যাতায়াত ক্বারী ছাহেবের সাইকেলের পিছনে চড়ে করতে হবে। ২. প্রতিদিন এক বেলা আমিষ (শর্ত সাপেক্ষে)। ৩. ক্লাসের পড়া মুখস্থ না করলে প্রতি ক্লাসের জন্য সেদিনের এক বেলা আমিষ বন্ধ থাকবে। ৪. হাত খরচা আগের মতই চলবে (শর্ত সাপেক্ষে)। ৫. মাসিক পরীক্ষায় ন্যূনতম এক বিষয়েও ফেল করলে পরবর্তী পরীক্ষা পর্যন্ত হাত খরচা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। নীচে আমার আববার স্বাক্ষরও আছে দেখলাম। দুঃখে কাঁদতে লাগলাম, মাথায় হাত দেয়া ছাড়া আর কি উপায় আছে রে রায়হান? খাঁচায় পুরে খোঁচা মারা লোকের সাথে লাগতে গেলি কেন রে? ঘুম আর খাওয়া তো গেলই, হাত খরচাও গেল। এবার কি হবে?

পরের দিন সকাল। পড়া মুখস্থ হয়েছে? আমি বললাম, একটু একটু। তিনি আমাকে একটি আরবী প্রশ্ন দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা মুখস্থ কর। রাস্তায় যেতে যেতে শোনাবে’। তাই হ’ল। ক্লাসে গিয়ে তিনি সবার উদ্দেশ্যে সেই প্রশ্নটিই জিজ্ঞাসা করলেন। আমি আনমনেই হাত তুললাম। তিনি বললেন, ‘যাক! একজন পাওয়া গেল’। আমি আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম, আমিই শুধু হাত তুলেছি। আর সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি সবার সামনে দাঁড়িয়ে কোন রকম ঢোকগেলা ছাড়াই আরবীতে চটচট করে উত্তর দিলাম। দেখলাম সবাই আমার দিকে বাহবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ক্বারী ছাহেব মুচকি হাসছেন।

তিনি আমকে বসতে বললেন না। আমি দাঁড়িয়েই থাকলাম। আমি নিজের মধ্যে নতুন এক অহংকার অনুভব করলাম। যে অহংকারের স্বাদ ইতিপূর্বে আমি কোনদিন আস্বাদন করিনি। পূর্বের যত অহংকার সব আমার কাছে মহূর্তে তুচ্ছ হয়ে গেল। আমি এর আগেও ক্লাসে দাঁড়িয়ে থেকেছি। সেগুলো ছিল অপমানের। তবে আজ আমি দাঁড়িয়ে আছি এক বুক অহংকার নিয়ে। খেয়াল করলাম, বুকের গহীনে এক পিপাসার্ত উন্মাদনা জেগে উঠেছে। সে চিৎকার করে বলছে, এই স্বাদটাই আমার প্রতিদিন চাই।

সাইকেলের পিছনে চড়ে বাসায় আসছি। ক্লাসে পড়া পারার মধ্যেও যে এমন একটা স্বাদ আছে তা আমি কোনদিনই অনুভব করিনি। সারাদিন সেই সুখের মুহূর্ত অনুভব করতেই কেটে গেল। সন্ধ্যায় বই খাতা নিয়ে বসলাম। ক্বারী ছাহেব আমার পাশে এসে বসলেন। এবার তিনি আমাকে বোঝালেন না। আমাকে প্রেরণা দিলেন। আমি যেন তার কথার মাঝে এক নতুন ‘আমি’-কে দেখতে পাচ্ছিলাম। আগের দিন তার নছীহত শুনে আমার রাগ হয়েছিল, তবে আজ তার কথাগুলো ভাল লাগতে শুরু করল। আমার মনে হ’ল, এমন কথা আমি এর আগে কোনদিন শুনিনি। কথা এত সুন্দর হয়!

তিনি চলে গেলেন। আমি পড়াশোনা শুরু করলাম। একটু মনোযোগ দিতেই দেখলাম পড়াগুলো পটাপট মুখস্থ হয়ে যেতে লাগল। দেখলাম, পড়া মুখস্থ হওয়ার পরেও এক ধরনের ভালোলাগা কাজ করছে! আমি আশ্চর্যই হ’লাম। এসব কি ঘটছে আমার সাথে? পরেরদিন ক্লাসে আবারো একই কাহিনি। আবার আগের দিনের মতই অহংকারের স্বাদ পেলাম। সেদিন আমি সবগুলো ক্লাস মনোযোগ দিয়ে করেছি। দেখলাম, ক্লাসে মনোযোগ দিলে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসে। এটাও তো একটা ভালোলাগার বিষয়! আমার কাছে এতদিন আটটি ঘণ্টা আট বছরের মত মনে হ’ত। আজ দেখলাম আটটি ঘণ্টা আট মিনিটেই ফুরিয়ে গেল! 

এভাবে ধীরে ধীরে ক্লাসে পড়া পারা আমার নিয়মিত হয়ে উঠল। সবার কাছে স্নেহের পাত্র হয়ে উঠলাম আমি। পরপর তিন পরীক্ষায় ফার্স্ট হ’লাম। বছরের শেষে আববু সেই বদলির কুড়াল নিয়ে হাযির হ’লেন। আমার বিদায়ক্ষণে শিক্ষকগণ মনক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, একজন মেধাবী ছাত্র তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এই মেধাবী ছাত্রের জন্মই যে হয়েছিল তাদের প্রতিষ্ঠানে, এটা কেবল ক্বারী লুৎফর রহমান ছাহেব জানতেন। আর জানত আমার পরিবার। 

নতুন প্রতিষ্ঠানে পাড়ি জমালাম। তবে আববুকে আর শিক্ষকদের কাছে গিয়ে আমতা আমতা করতে হয়নি। কারণ ততদিনে তার ছেলে পেয়েছিল নতুন আনন্দের খোঁজ। যাকে কখনো পড়তে বসতে বলা লাগেনি। ক্লাসে মনোযোগী হ’তেও বলতে হয়নি। পড়াশোনাই ছিল যার কাছে নেশার মত। এভাবেই বছর গড়িয়ে যেতে লাগল। গতবছর আমার স্কলারশীপে

মদীনাতুল মুনাওয়ারার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছে। যখন দেশ ছেড়ে আসি, তখন আমাকে বিমানবন্দরে রাখতে এসেছিলেন আববু-আম্মু। এসেছিলেন ক্বারী লুৎফর রহমান ছাহেব। আমার জীবন বদলানোর কারিগর।

ক্বারী হুযুর একদম বুড়িয়ে গেছেন। বিদায়ের সময় তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে বললেন, ‘যাও, অনেক বড় হয়ে ফিরে এসো। দ্বীনের যোগ্য খাদেম হয়ে এসো। আমি তোমার পথপানে চেয়ে থাকবো। আজকের খুশী তো এই ছোট বুকে জায়গা দিতে পারছি না রে বাবা! আমি একজন নিম্নপদের শিক্ষক। আমার ছাত্র নবীর দেশে পড়তে যাচ্ছে। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হ’তে পারে’! আববাকে বললেন, ‘কি শহীদ! আমি বলেছিলাম না, তোমার ছেলে বেশ মেধাবী ও আগ্রহী? বড় হয়ে সে কিছু একটা হবে? দেখলাম, আববু আম্মু দু’জনের চোখেই পানি। পানিতে ভেসে যাচ্ছে চার জোড়া চোখ। তবে আমি জানি, সে পানি শোকের নয়। বড় আনন্দের। বড় গর্বের।

আমার জীবনে অনেক নামী-দামী শিক্ষকের কাছে পড়ার সুযোগ হয়েছে। অনেকের কাছে অনেক কিছু শিখেছি। সকলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তবে আমি খুব বিনয়ের সাথেই বলব যে, ক্বারী লুৎফর রহমান ওস্তাদজী আমাকে মাত্র দু’দিনে যা শিখিয়েছেন, তা আমার সারা জীবনে কোন শিক্ষকের কাছে শেখা হয়নি। তার হাতে লেখা সেই সংবিধান আমি আজও ফ্রেমে বাঁধাই করে রেখেছি। অন্তরে ধারণ করেছি। যখনই আমি সেটার দিকে তাকিয়েছি। উস্তাদজীর জন্য আমার দো‘আ এসেছে। জানি না, দেশে গিয়ে তার সাথে আবার দেখা হবে কি-না। তবে আমি তার মতই একজন আদর্শ ও বিনয়ী শিক্ষক হব। আমি আমার ছাত্রদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর শুনিয়ে যাব অপ্রসিদ্ধ এক গ্রামের ইবতেদায়ী মাদ্রাসার একজন নিম্নপদের ক্বারী হুযুরের গল্প।






বিষয়সমূহ: বিবিধ
আরও
আরও
.