অনেকেই পুরনো টুথব্রাশ মাসের পর মাস ব্যবহার করেন। আবার কেউ কেউ ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতই অন্যের টুথব্রাশ ব্যবহার করেন! এই সামান্য অবহেলাই ডেকে আনতে পারে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের মতো ভয়ংকর সমস্যা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, টুথব্রাশ হ’ল শরীরকে সংক্রমণ ও রোগ থেকে রক্ষা করার প্রথম সারির রক্ষাকবচ। চিকিৎসকদের মতে, মানুষের মুখে থাকে প্রায় ৭০০ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া। নিয়মিত দাঁত না মাজলে এসব ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে প্লাক তৈরি করে, যা মাড়ির প্রদাহের মূল কারণ। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, এই ব্যাকটেরিয়া ও প্রদাহজনক অণুগুলো রক্তপ্রবাহে ঢুকে গেলে তা হৃদয়, লিভার ও অগ্ন্যাশয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ সৃষ্টি করে।
ডায়াবেটিসের সঙ্গে মুখের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক : ২০২০ সালে প্রকাশিত ডায়াবেটোলজিয়া জার্নালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে অন্তত তিনবার বা তার বেশী দাঁত ব্রাশ করেন তাদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি, যারা দিনে মাত্র একবার বা একবারও ব্রাশ করেন না তাদের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কম।[1] এর পেছনের অন্যতম কারণ হ’ল ডায়বেটিসে আক্রান্তদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে। ফলে মুখে সংক্রমণ হ’লে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। ইনসুলিনই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তাই দাঁতের যত্ন না নিলে ডায়াবেটিস আরও জটিল হ’তে পারে।
মাড়ির প্রদাহ বাড়ায় হৃদরোগের ঝুঁকি : মাড়ির দীর্ঘস্থায়ী ইনফ্লামেশন শুধু রক্তপাত ঘটায় না, বরং ধমনীগুলোকেও শক্ত করে ফেলে। যাকে বলে অ্যাথেরোস্কেলরোসিস। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জনস হপকিন্স মেডিসিন জানায়, এটি ধমনীর ভেতরে প্লাক জমে যাওয়ার ফলে হয়, যা হার্টঅ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘদিন মুখের প্রদাহ চলতে থাকলে হৃদয়ের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। যাদের অনিয়ন্ত্রিত মাড়ির রোগ আছে, তাদের হার্ট ডিজিজের আশঙ্কা প্রায় দ্বিগুণ।
সুস্থ থাকতে করণীয় :
১. দিনে দুইবার দাঁত মাজুন: প্রতিদিন কমপক্ষে দুইবার, সকালে খাওয়ার পর এবং ঘুমানোর পূর্বে ভালোভাবে দাঁত মাজুন। এসময় আঙুল বা ব্রাশ দিয়ে জিহবা পরিষ্কার ও মাড়িতে আলতোভাবে ম্যাসাজ করে নিতে হবে। এছাড়া প্রতিবার ছালাতে ওযূ করার সময় মেসওয়াক করতে পারেন। নিয়মিত ব্রাশ করলে শরীর ও মন উভয়ই ভালো থাকে।
২. নিয়মিত ফ্লস করুন : যাদের দাঁতের ফাঁকে খাবার আটকে থাকে, তাদের ডেন্টাল ফ্লস বা ইন্টার ডেন্টাল ব্রাশে অভ্যস্ত হ’তে হবে। দাঁতের ভেতরের পৃষ্ঠে পাথর এবং চর্বণে ব্যবহৃত পৃষ্ঠ ও দুই দাঁতের মধ্যবর্তী পৃষ্ঠে ক্ষয় বেশী হয়। কারণ এসব স্থান পর্যাপ্ত পরিষ্কার হয় না।
৩. বছরে অন্তত দুইবার ডেন্টাল চেকআপ করুন : দাঁতের যত্নে সবচেয়ে বড় সাবধানতা হ’ল- কোন সমস্যাকে অবহেলা না করা। দাঁতে সামান্য শিরশির অনুভূতি, মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বা হালকা ব্যথা যেকোন লক্ষণ দেখা দিলেই অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিতে হবে। কোন দৃশ্যমান সমস্যা না থাকলেও প্রতি ছয় মাসে একবার ডেন্টাল চেক-আপ করানো উচিত। এতে করে সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই তা সমাধান করা সম্ভব হয়।
৪. সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন : দাঁতের সুস্থতার জন্য সুষম খাদ্যের গুরুত্ব অনেক। কারণ এটি দাঁত ও মাড়িকে শক্তিশালী করে এবং গহবর (Cavity) ও অন্যান্য সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে। ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন ডি, ভিটামিন সি এবং ফ্লোরাইড জাতীয় পুষ্টি উপাদান দাঁতের এনামেল মযবূত করতে অপরিহার্য। যা খাদ্যের মাধ্যমেই পূরণ হয়। এছাড়াও দৈনন্দিন প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে।
কতদিন পর টুথব্রাশ বদলাবেন : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি তিন মাসে একবার টুথব্রাশ পরিবর্তন করা উচিত। কারণ পুরনো টুথব্রাশে জীবাণু জমে যায় এবং এর ব্রিসল বা আঁশ বাঁকিয়ে যায়। ফলে তা দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা প্লাক বা ব্যাকটেরিয়া পুরোপুরি তুলতে পারে না।
ব্রাশের যত্নে বাড়তি সতর্কতা : ব্যবহারের পর টুথব্রাশ খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করে পানি ঝরার জন্য সবসময় সোজা বা খাড়া করে রাখুন। অন্য ব্রাশের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখবেন না, খোলা বাতাসে শুকাতে দিন। পাশাপাশি ভেতরে জমে থাকা অদৃশ্য জীবাণু ধ্বংস করতে সপ্তাহে অন্তত এক দিন গরম পানি দিয়ে ব্রাশ পরিষ্কার করতে হবে।
যে খাবারগুলো পরিহার করতে হবে : চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাদ্য মুখের স্বাস্থ্যকে যেমন হুমকিতে ফেলে, তেমনি রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও হ্রাস করে। ছোটবেলা থেকে চিনির প্রতি দুর্বলতা কমাতে শিশুদের উৎসাহিত করতে হবে। ধূমপান, জর্দা, গুল প্রভৃতি নেশা জাতীয় দ্রব্য দাঁতের সুস্থতার জন্য বিপজ্জনক। এছাড়াও অতিরিক্ত টকজাতীয় খাবার, যেমন লেবু, তেঁতুল ও ক্যান্ডি দাঁতের সংস্পর্শে যত কম রাখা যায়, ততই ভালো।
শেষ কথা : নিয়মিত ও সঠিক সময়ে দাঁত মাজা শুধু মুখের নয়, পুরো শরীরের স্বাস্থ্যের জন্য যরূরী। দাঁতের অযন্ত্রে আমরা যে রোগ ও ভোগান্তিগুলোতে ভোগী তা খুবই কষ্টকর। তাই ছোট এই অভ্যাসটাই ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ দাঁতের নানা জটিলতা থেকে সুরক্ষা পেতে সাহায্য করতে পারে।