জীবনের তাকীদে আমাদের প্রায়ই নিকটবর্তী বা দূরবর্তী স্থানে সফর করতে হয়। অনেক সময় সামান্য অসতর্কতার কারণে ভ্রমণের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়। কিছু ছোট ছোট বিষয়ে সচেতন থাকলে আমরা শারীরিক কষ্ট ও দুর্ভোগ অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারি। সফরের সুস্থতায় যরূরী কিছু দিকনির্দেশনা নিম্নে উল্লেখ করা হ’ল :
১. ‘মোশন সিকনেস’ বা বমিভাব নিয়ন্ত্রণ : গাড়িতে উঠলে অনেকেরই বমি বমি ভাব হয়। এটি এড়াতে যাত্রার অন্তত ১ ঘণ্টা আগে খাবার খেয়ে নেওয়া উচিত এবং যেকোন ধরনের ভাজাপোড়া বা তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলা যরূরী। বাসে বা গাড়িতে সিট নির্বাচনের ক্ষেত্রে পেছনের দিকে না বসে সামনের সারিতে এবং জানালার পাশে বসা শ্রেয়। যাতে বাইরের প্রকৃতি ও পরিবেশ দেখা যায়। সফরের সময় দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহার বা বই পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং সতেজ থাকতে সাথে লেবু বা কমলা রাখতে পারেন। যার প্রাকৃতিক ঘ্রাণ অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া প্রয়োজনবোধে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ‘রিভার্ট’ বা ‘এক্লিজ’ জাতীয় ঔষধ ভ্রমণের এক ঘণ্টা আগে সেবন করলে ‘মোশন সিকনেস’ থেকে মুক্ত থাকা যায়।
২. পেটের সমস্যা : পেটের পীড়া হ’তে মুক্ত থাকতে রাস্তার পার্শ্ববর্তী খোলা খাবার ও অনিরাপদ পানি সম্পূর্ণ বর্জন করুন। খাওয়ার আগে হাত ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত করা এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকা যরূরী। কারণ উদ্বেগ পেটের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। আপদকালীন সুরক্ষায় ভ্রমণকালে সবসময় খাবার স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ঔষধ (যেমন- অ্যালজিন) সাথে রাখুন।
৩. মাথাব্যথা ও মাইগ্রেন : যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা আছে তাদের জন্য সফর অনেক সময় কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তাদের জন্য বিশেষ সতর্কতা হ’ল- যথাসম্ভব রাত জেগে দীর্ঘ সফর না করা, সময়মতো পর্যাপ্ত পানি পান ও খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করা। বাইরের উচ্চশব্দ থেকে বাঁচতে কানে তুলা বা এয়ারফোন ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া তীব্র রোদে সানগ্লাস ব্যবহার উপকারী। প্রয়োজনে নাপা জাতীয় ঔষধ সেবন করলে খুব সহজে উপকার পাওয়া যায়।
৪. শরীর ব্যথা ও বাতের সমস্যা : দীর্ঘ সময় একভাবে বসে থাকা বা রাস্তার ঝাঁকুনিতে পিঠ, হাত ও পায়ে ব্যথা হ’তে পারে। যাদের আগে থেকে বাতের সমস্যা আছে, তারা যথাসময়ে ঔষধ সেবন নিশ্চিত করবেন। ভ্রমণে কোমরে বেল্ট, হাঁটুর ক্যাপ বা ব্যাক সাপোর্ট সাথে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। একটানা একভাবে না বসে মাঝে মাঝে অবস্থান পরিবর্তন করা প্রয়োজন। ব্যথায় ‘নাপা রক্তপিন্ড’ জাতীয় ঔষধ বা ‘হট ওয়াটার ব্যাগ’ ব্যবহারে স্বস্তি পাওয়া যায়।
৫. কোল্ড ও ডাস্ট অ্যালার্জির সমস্যা : ধুলাবালি বা ঠান্ডা বাতাসে হাঁপানি ও অ্যালার্জির সমস্যা বাড়তে পারে। এজন্য বাইরে বের হ’লে অবশ্যই মাস্ক অথবা অন্যকিছু দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখতে হবে। গাড়ির খোলা জানালার সরাসরি বাতাস থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা যরূরী। ইনহেলার বা নাকের স্প্রে নিয়মিত ব্যবহার করলে তা অবশ্যই সাথে রাখতে হবে।
৬. দীর্ঘমেয়াদী রোগীদের জন্য সতর্কতা : উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্ট বা কিডনির জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের অতি প্রয়োজনীয় ঔষধসমূহ সাথে নিতে ভুল করা চলবে না। এক্ষেত্রে রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে, যেন কোন কিছু ভুলবশত বাসায় রেখে গিয়ে সফরে হঠাৎ জটিলতায় না পড়েন। ডায়াবেটিস রোগীরা গ্লুকোমিটার সাথে রাখতে পারেন এবং হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তে শর্করা কমে যাওয়া) রোধে প্রয়োজনীয় মিষ্টান্ন সাথে রাখা উচিত। অনুরূপভাবে হার্টের রোগীরা যরূরী স্প্রে সর্বদা হাতের নাগালে রাখবেন।
৭. প্রাকৃতিক ডাক ও শারীরিক জটিলতা : সফরে প্রস্রাব-পায়খানা দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে মূত্রনালিতে সংক্রমণ (Infection), কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাইলসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বাসা থেকে বের হওয়ার পূর্বেই হাজত সেরে নেওয়া এবং ভ্রমণে অলসতা বা লোকলজ্জার খাতিরে এগুলো চেপে না রেখে যথাসময়ে প্রয়োজন সেরে নিতে হবে।
৮. অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শারীরিক অবসন্নতা : রাতজাগা, অপর্যাপ্ত বিশ্রাম ও অনিয়মিত আহারের ফলে শরীরে ক্লান্তি নেমে আসে, যা সফরের আনন্দকে মলান করে দেয়। ক্লান্তি দূর করতে রাতে পর্যাপ্ত ঘুম এবং সফরের মাঝে সুযোগ বুঝে ৮-১০ মিনিটের ‘পাওয়ার ন্যাপ’ বা স্বল্পকালীন বিশ্রাম শরীরকে দ্রুত সতেজ করে। এছাড়া সতেজ থাকতে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা আবশ্যক।
পরিশেষে বলব, সামান্য কিছু সতর্কতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা আমাদের এই ভ্রমণকে আনন্দময় ও নিরাপদ করতে পারে। অতএব সুস্থ অবস্থায় আল্লাহর নে‘মতের কদর করা এবং সফরে যাবতীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কর্তব্য। আল্লাহ আমাদের প্রতিটি সফরকে নিরাপদ ও বরকতময় করুন- আমীন!
ডা. মহিদুল হাসান মা‘রূফ
মেডিকেল অফিসার, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।