লাল চালের পুষ্টিগুণ

বর্তমানে মানুষ খাদ্যের স্বাদ ও চেহারার প্রতি যতটা মনোযোগী, তার চেয়ে অনেক কম মনোযোগী হচ্ছে খাদ্যের পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্য উপযোগিতার প্রতি। আমাদের দেশে সাদা মিনিকেট চাল দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মূলত তার চকচকে রঙ ও চিকন আকৃতির কারণে। কিন্তু এই চাল প্রসেসিংয়ের সময় এর প্রাকৃতিক অাঁশ, ভিটামিন বি, আয়রণসহ নানা পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, দীর্ঘদিন এই চাল খাওয়ার ফলে দেহে অপুষ্টি, ডায়াবেটিস, কোষ্ঠকাঠিন্য ও রক্তস্বল্পতা ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

অপরদিকে আমাদের নিজস্ব কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যের অংশ লাল চাল। ধান থেকে খোসা ছাড়ানোর পর পরই পাওয়া যায় ব্রাউন রাইস বা লাল চাল। এটি অপেক্ষাকৃত কম প্রক্রিয়াজাত, আঁশসমৃদ্ধ ও প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন খনিজ পদার্থে পূর্ণ। লাল চাল নিয়মিত খেলে হযমশক্তি ভালো থাকে, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। তাই শরীর ও স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে আমাদের উচিত চকচকে চালের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর লাল চাল খাওয়া এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন করা।

লাল চালের পুষ্টিগুণ :

সাদা চালের মত লাল চালে ক্যালোরি এবং কার্বোহাইড্রেট ভরপুর, তবে অন্যান্য প্রায় সকল পুষ্টির ক্ষেত্রে বাদামী বা লাল চাল সাদা চালকে ছাড়িয়ে যায়। এই গোটা শস্যটি ফোলেট, রাইবোফ্লাভিন (বি-২), পটাশিয়াম এবং ক্যালসিয়ামের একটি ভাল উৎস।

উপরন্তু লাল চালে অধিক হারে ম্যাঙ্গানিজ বিদ্যমান। এই খনিজ উপাদানটি শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার জন্য অত্যাবশ্যক। যেমন হাড়ের বিকাশ, ক্ষত নিরাময়, পেশী সংকোচন, বিপাক, স্নায়ুর কার্যকারিতা এবং রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রক। ম্যাঙ্গানিজের অভাবে বিপাকীয় সমস্যা, হাড়ের ক্ষয়, দুর্বল বৃদ্ধি এবং কম উর্বরতা সম্বলিত জটিলতা সৃষ্টি হ’তে পারে। আপনার প্রায় সমস্ত দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পুষ্টির জন্যে এই চালের মাত্র এক কাপ ভাত-ই যথেষ্ট।

ভিটামিন ও খনিজ ছাড়াও, লাল চাল শক্তিশালী উদ্ভিদ যৌগ সরবরাহ করে। উদাহরণস্বরূপ, লাল চালের মধ্যে রয়েছে ফেনল এবং ফ্ল্যাভোনয়েডস নামক এক প্রকার অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা শরীরকে জারণ চাপ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হৃদরোগ, ক্যান্সার এবং অকাল বার্ধক্য সহ বেশ কয়েকটি ভয়াবহ রোগের দিকে ধাবিত করে।

ব্রাউন রাইসে পাওয়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো ফ্রি-র‌্যাডিক্যাল নামক অস্থির অণু দ্বারা সৃষ্ট কোষের আঘাত রোধ করতে এবং শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

ওযন কমাতে লাল চাল :

লাল চাল ওযন কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সাদা চালের মতো পরিশোধিত শস্যের তুলনায় লাল চালের মতো গোটা শস্য প্রচুর পরিমাণে ফাইবার এবং পুষ্টি ধারণ করে।

যেমন ১৫৮ গ্রাম লাল চালের মধ্যে ৩.৫ গ্রাম ফাইবার থাকে, যা সাদা ভাতের মধ্যে থাকে ১ গ্রামেরও কম। ফাইবার দীর্ঘ সময় ধরে আপনার পাকস্থলি পরিপূর্ণ রাখে বিধায় ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার নির্বাচন আপনাকে সামগ্রিকভাবে কম ক্যালোরি গ্রহণে সাহায্য করতে পারে। লাল চাল পেটের মেদ কমাতেও সাহায্য করে।

হার্টের সুস্থতায় লাল চাল :

লাল চাল ফাইবার এবং উপকারী যৌগসমৃদ্ধ হওয়ায় এটি হৃদরোগের ঝূঁকি কমাতে সাহায্য করে। লাল চালের ভাতে লিগনান্স নামক যৌগ রয়েছে, যা হৃদরোগের ঝূঁকির কারণগুলো উপশমে সাহায্য করে। লিগনান সমৃদ্ধ খাবার যেমন- তিসি, তিল এবং বাদাম, উচ্চ কলেস্টেরল, নিম্ন রক্তচাপ এবং ধমনীর শক্ত হয়ে যাওয়া হ্রাসে সাহায্য করে। লাল চালের মধ্যে থাকা ম্যাগনেসিয়াম নামক খনিজ উপাদান হার্ট-সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

উচ্চ ডায়াবেটিস কমাতে লাল চাল :

যদিও রক্তে শর্করার উপর কার্বোহাইড্রেট সবচেয়ে বেশী প্রভাব ফেলে, ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাদা ভাতের মতো পরিশোধিত শস্য জাতীয় খাবারগুলো কম খেয়ে রক্তে শর্করা এবং ইনসুলিনের স্পাইক কমিয়ে থাকেন। সাদা চালের বদলে লাল চাল খেয়ে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন উপায়ে উপকৃত হ’তে পারেন। লাল চালে বিদ্যমান ম্যাগনেসিয়াম এবং ফাইবার উভয়ই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

লাল চালে সাদা ভাতের তুলনায় কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স থাকে, যার অর্থ হ’ল এটি ধীরে হযম হয় এবং রক্তে শর্করার উপর কম প্রভাব ফেলে। সাদা চালে গ্লাইসেমিক সূচক (জিআই)-এর মাত্রা বেশী, যা একটি খাদ্য কত দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়ায় তা পরিমাপ করে। লাল চালের জিআই-৫০ এবং সাদা চালের জিআই-৮৯, যার অর্থ হ’ল সাদা চাল রক্তে শর্করার মাত্রা লাল চালের তুলনায় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি করে। উচ্চ-জিআই খাবার খাওয়ার সাথে টাইপ-২ ডায়াবেটিস সহ বেশ কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ হওয়ার সম্ভাবনা জড়িত। লাল চাল প্রাথমিক অবস্থায় টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস করতে পারে।

ক্ষতিকর গ্লুটেন এড়াতে লাল চাল :

গ্লুটেন একটি প্রোটিন যা গম, বার্লি এবং রাইয়ের মতো শস্যে পাওয়া যায়। অনেকে গ্লুটেনে অ্যালার্জি থাকার কারণে পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া, ফুসকুড়ি এবং বমির মতো হালকা থেকে গুরুতর প্রতিক্রিয়া অনুভব করে থাকেন। উপরন্তু গাঁট-ফোলানো বাত ও টাইপ-১ ডায়াবেটিসের মত অটোইমিউন রোগাক্রান্ত লোকেরা প্রায়ই গ্লুটেন-মুক্ত খাদ্য থেকে উপকৃত হন। এই সকল কারণে গ্লুটেন-মুক্ত খাবারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে।

সৌভাগ্যবশত লাল চালের ভাত প্রকৃতিগতভাবেই এই সমস্যাযুক্ত প্রোটিন থেকে মুক্ত থাকার কারণে যারা গ্লুটেন নিতে পারেন না তাদের নিরাপদ পসন্দে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য, গ্লুটেন-মুক্ত ডায়েটে থাকা লোকেদের জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর গ্লুটেন-মুক্ত পণ্য যেমন ক্র্যাকার এবং পাস্তার মধ্যেও লাল চাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

[সংকলিত]






নীরব ঘাতক হাঁটু ক্ষয় : প্রতিরোধের উপায় - আত-তাহরীক ডেস্ক
নীরব প্রহরী কিডনী : সুস্থ রাখতে করণীয়
তীব্র গরমে স্বাস্থ্য সতর্কতা - ডা. মেহেদী হাসান মনিম
দুধ চায়ের বদলে পান করতে পারেন যেসব স্বাস্থ্যকর চা - আত-তাহরীক ডেস্ক
লাল না সাদা ডিম; মুরগী, হাঁস না কোয়েলের ডিম? কোন্টির পুষ্টিগুণ বেশী?
রামাযানে ছায়েমদের বিশেষ স্বাস্থ্য পরামর্শ - ডা. মহিদুল হাসান মা‘রূফ
এলার্জি ও এজমা রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ - ডা. মহিদুল হাসান মা‘রূফ
সাপে কাটলে ভুলেও প্রচলিত এই ভুলগুলো করবেন না
সন্ধ্যা ৭-টার মধ্যে রাতের খাবার খাবেন যে কারণে
শীতে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয়
প্রচন্ড গরমে নিজেকে সুস্থ রাখার ১০টি উপায়
হেপাটাইটিস থেকে বাঁচার উপায়
আরও
আরও
.