রামাযানে ছায়েমদের বিশেষ স্বাস্থ্য পরামর্শ

রামাযানে ছিয়াম পালনে নিহিত রয়েছে শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক উন্নয়ন। ছিয়ামে শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া ‘অটোফ্যাজি’র মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, ক্যান্সার প্রতিরোধ, মস্তিষ্ক ও হার্টের কার্যক্ষমতার উন্নতি, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, শরীরের চর্বি, পেটের সমস্যা এবং ফ্যাটি লিভারসহ বেশ কিছু রোগে উপকার পাওয়া সম্ভব। রামাযানের পবিত্রতা বজায় রেখে সারাদিন সতেয ও সবল থাকতে এবং নির্বিঘ্নে ইবাদত করতে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও চিকিৎসাবিষয়ক কিছু পরামর্শ নিম্নে প্রদান করা হ’ল।-

১. পর্যাপ্ত পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস : সারাদিনে সবল ও কর্মোদ্দীপ্ত থাকতে ইফতার ও সাহারীতে বিশেষভাবে উপকারী খাবার সাধ্যমতো গ্রহণ করতে চেষ্টা করতে হবে।

(ক) গ্রহণীয় খাবার : ইফতার ও সাহারীতে ৩-৪টি খেজুর, ১-২টি ডিম, ১-২ মুঠো বাদাম (ইফতারীতে চিনাবাদাম, কাজুবাদাম অথবা কাঠবাদাম রাখা উচিত), ৩-৪ চামচ ছোলা, ২-৩টি কলা। ইফতারীতে লেবুর শরবতে চিনির পরিবর্তে মধু বেশী উপকারী। বিভিন্ন রসালো ফল যেমন- কমলা, মাল্টা, বেদানা, শসা অথবা তরমুজ খাওয়া ভালো।

(খ) বর্জনীয় খাবার : তেলে ভাজা বিভিন্ন আইটেম যেমন- পেঁয়াজু, বিভিন্ন চপ, জিলাপি, বুন্দিয়া ও চিপস তেলে ভাজা এবং চিনিসমৃদ্ধ হওয়ায় তা স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ক্ষতিকর। তাই এ খাবার গুলো সর্বদা এড়িয়ে চলতে হবে।

২. পর্যাপ্ত পানি পান : প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য গড়ে কমপক্ষে ৯-১০ গ্লাস পানি পান সারাদিন শরীরকে সুস্থ ও সতেয রাখতে সহায়ক। পর্যাপ্ত পানি পান নিশ্চিত হ’লে পিপাসা, শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি, অবসাদ ও কোষ্ঠকাঠিন্যসহ বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে। তবে সাহারী ও ইফতারে একেবারে খুব বেশী পানি পান করা যাবে না। বরং ইফতারের কিছু সময় পর থেকে তারাবীর ছালাতের মাঝে মাঝে এবং সাহারীতে খালিপেটে হিসাবমতো পানি পান করতে পারেন।

৩. পেটের সমস্যা ও গ্যাস্ট্রিক কমাতে : (ক) একজন সুস্থ ব্যক্তির ইফতারের প্লেট থেকে ভাজাপোড়া সরানো কঠিন। তাই যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যকর উপায়ে ঘরে তৈরি হালকা তেল ও মশলা দিয়ে ১-২টা আইটেম স্বল্প পরিমাণে খাওয়া। (ঘ) যেহেতু তেলের অংশটা বেশী ক্ষতিকর তাই সেটা টিস্যুর মাধ্যমে শুষে নিয়ে আলাদা করা উচিত। (চ) বাইরের অধিকাংশ খাবার কয়েকদিনে ব্যবহৃত একই তেল দিয়ে ভাজা হয়, যা মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই তা বর্জন করা। (জ) তাড়াহুড়া করে একবারে ভরপেটে বেশী খাওয়া অবশ্যই বর্জনীয়।

৪. খাদ্যগ্রহণ বিষয়ে পরামর্শ : সারাদিন পর্যাপ্ত শক্তি ও সামর্থ্য ঠিক রাখতে এবং স্বস্তির সাথে ইবাদত করতে সুবিধামতো খাদ্যগ্রহণ যরূরী। ইফতারীতে কম খেয়ে রাতের খাবার ৭-৮-টার মাঝে খেয়ে নিতে পারেন। আর তারাবীহর ছালাতের পরে খেলেও খাওয়ার পরপরই না ঘুমানো কর্তব্য। বরং ঘুমানোর আগে কিছু সময় হাঁটাহাঁটি করা উচিত। এতে পরিপাকতন্ত্রে ও ঘুমে উপকার হবে এবং সাহারীতে পর্যাপ্ত খেতে সুবিধা হবে।

৫. শরীরকে সবল ও কর্মক্ষম রাখতে : পর্যাপ্ত পুষ্টিকর সুষম খাবার ও পানিপানের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম যরূরী। সেই সাথে বিষণ্ণতা ও চাপমুক্ত হয়ে মানসিকভাবে প্রফুল্ল থাকা আবশ্যক। কারণ বিষণ্ণতা ও টেনশন শরীরকে দুর্বল এবং অবসাদগ্রস্ত করে দেয়। এক্ষেত্রে কুরআন তেলাওয়াত করা-শোনা এবং দো‘আ, যিকির-আযকার করা খুব উপকারী। আর মাঝে মাঝে লম্বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের অভ্যাস করা প্রয়োজন। এতে শরীরের কর্মোদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।

৬. স্বাস্থ্যকর ঘুমের সময়সীমা : ইফতারের পরে সাহরীর আগে রাতে ঘুমানোর জন্য কমপক্ষে ৫-৬ ঘণ্টা সময় রাখা যরূরী। এছাড়াও সাহরীর পরে আরও ২-৩ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। সারাদিনে সময়-সুযোগ হ’লে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতে পারেন। তবে অপ্রয়োজনে বেশী সময় শুয়ে থাকা বা ঘুমানোর প্রয়োজন নেই।

৭. ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সতর্কতা : রাতে গ্রহণকৃত ওষুধ বা ইনসুলিন সাহারীতে এবং সকালের ওষুধ ইফতারীর সময় নিতে হবে। ডোজ ডায়াবেটিস-এর মাত্রা অনুসারে সঠিকভাবে এডজাস্ট করতে হবে। আর ডায়াবেটিস বেশী উঠানামা করলে সাহরীর ২ ঘণ্টা পরে, দুপুরে এবং ইফতারীর ঘণ্টাখানেক আগে ব্লাডসুগার চেক করতে পারেন। বিশেষ করে হাইপোগ্লাইসেমিয়া ইতিপূর্বে হয়ে থাকলে বা লিভার/কিডনী রোগ থাকলে সকলকে লক্ষণ বিষয়ে আরও সতর্ক হ’তে হবে। যেমন : হাত কাঁপা, বুক ধড়ফড় করা, শরীর ঘামা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, অচেতন হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। যেকোন সময় ব্লাডসুগার ৩.৯-এর চেয়ে কমে গেলে ছিয়াম ভেঙে ফেলতে হবে।

৮. বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ : যাদের দীর্ঘমেয়াদী রোগ আছে এবং যাদের নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন, তারা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের দেওয়া চিকিৎসা ও পরামর্শ যথাযথ ফলো করুন। যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা, বাতব্যথা, লিভার বা কিডনি সমস্যা ও পেটের সমস্যা থাকলে রামাযানে সেগুলো কি মাত্রায় বা কিভাবে গ্রহণ করবেন এবং ছিয়াম রাখতে কি কি বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করবেন সে বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে বুঝে নিন। ওষুধের ডোজ এডজাস্ট ও সময় ঠিক করে নিতে হবে।

৯. ওষুধ সেবন ও ব্যথার সমস্যা : বমি বা গ্যাসের ওষুধসহ কিছু মেডিসিন খালিপেটে খেতে হ’লে ইফতারের শুরুতে একটু পানি খেয়ে এগুলো খাওয়া উচিত। রাত জাগলে, পানি কম পান করলে মাথাব্যথা হ’তে পারে। তাই অনর্থক বেশী রাত জাগা যাবে না এবং পর্যাপ্ত পানিপান করতে হবে। সর্বদা চিন্তামুক্ত থাকতে চেষ্টা করতে হবে। অতিরিক্ত আলো ও শব্দদূষণ থেকে দূরে থাকতে হবে। হঠাৎ করে মাথাব্যথা, শরীরে ব্যথা উঠলে ছিয়াম অবস্থায় প্রয়োজনীয় ব্যথানাশক সাপোজিটরি ব্যবহার করা যেতে পারে (শাইখ ছালেহ ইবনে উছায়মীন, আব-শারহুল মুমতে ৬/৩৮১)

১০. যেসব বিষয়ে ছিয়ামের কোন ক্ষতি নেই : চোখ, কান, নাকের ড্রপ (যাতে গলার ভেতর না চলে যায়), ইনসুলিন, সাপোজিটরি, জিহবার নীচে নেওয়া ওষুধ/স্প্রে, ইনহেলার, অক্সিজেন নেওয়ায় সমস্যা নেই। তবে নেবুলাইজেশন মেশিনের মাধ্যমে নিলে সমস্যা হবে। আর এন্ডোস্কপি, ইনজেকশন/টিকা নিলে, পেস্ট দিয়ে ব্রাশ করলে, যরূরী রক্তদান, টেস্টের জন্য রক্ত দেওয়া, লালারস/কফ গিলে ফেললে, অনিচ্ছায় বমি করলেও ছিয়ামের কোন ক্ষতি হবে না।

উপসংহার : অসংযত জীবনাচার ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস পরিহার করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সুশৃঙ্খল জীবনযাপউন করলে রামাযান আমাদের জন্য প্রকৃত অর্থেই রহমত ও প্রশান্তির বার্তা বয়ে আনবে। অতিভোজন ও ভাজাপোড়া খাবার বর্জন করে পরিমিত ও পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা আমাদের ইবাদতে আরও বেশী প্রশান্তি আনতে পারে। মহান অল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে সুস্থতার সাথে রামাযানের ছিয়াম পালনের তাওফীক দান করুন-আমীন!

-ডা. মহিদুল হাসান মা‘রূফ

*মেডিকেল অফিসার, (অনা.) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।







লাল না সাদা ডিম; মুরগী, হাঁস না কোয়েলের ডিম? কোন্টির পুষ্টিগুণ বেশী?
খাওয়ার পর মাত্র ১০ মিনিট হাঁটলেই যে সুফল পাবেন - আত-তাহরীক ডেস্ক
ডায়াবেটিস রোগীর জন্য নিরাপদ ফলমূল
ঘরে অ্যারোসল বা কীটনাশক ব্যবহারের সময় যেসব সতর্কতা অবলম্বন করা যরূরী
সন্ধ্যা ৭-টার মধ্যে রাতের খাবার খাবেন যে কারণে
শীতে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয়
হেপাটাইটিস থেকে বাঁচার উপায়
রামাযানে ছায়েমদের বিশেষ স্বাস্থ্য পরামর্শ - ডা. মহিদুল হাসান মা‘রূফ
এলার্জি ও এজমা রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ - ডা. মহিদুল হাসান মা‘রূফ
ফল ও সবজিতে রাসায়নিক পদার্থ : করণীয় কি?
প্রচন্ড গরমে নিজেকে সুস্থ রাখার ১০টি উপায়
সাপে কাটলে ভুলেও প্রচলিত এই ভুলগুলো করবেন না
আরও
আরও
.