\ এক \
চৌধুরী ছাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিনের। সুন্দর চেহারা, মুখে দাড়ি, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতে অভ্যস্ত তিনি। সমাজে জনসেবক হিসাবে বেশ নামডাক আছে। সেদিন সোমবার। আছরের ছালাতের পর চৌধুরী ছাহেবের বাড়ীতে গিয়ে হাযির হ’লাম। ভদ্রলোক বৈঠকখানায় বসে তাসবীহ পাঠ করছিলেন। আমাকে দেখে ভারি খুশী হ’লেন।
হাঁক ডাক ছাড়লেন, কুলছূম! এই কুলছূম, জলদি আয়! একটু পর বছর সাতেক বয়সের একটি মেয়ে এসে উপস্থিত হ’ল। মেয়েটির পরনে অনেকগুলো তালি দেওয়া পুরনো কাপড়, মাথার চুল রুক্ষ আর উষ্কখুষ্ক। কিন্তু এই মলিন রূপের আড়ালেও তার গায়ের রং ও চেহারাখানি ভারি মায়াবী। চৌধুরী ছাহেব ধমক দিয়ে বললেন, হা করে দাঁড়িয়ে কি দেখছিস? সালাম কর! উনি আমার বন্ধু, চাচা বলে ডাকবি, বুঝলি?
কুলছূম ভয়ার্ত চোখে ‘জ্বী’ বলে কদমবুচি করতে এল। আমি বাধা দিয়ে বললাম, কদমবুচি করতে নেই মা, সালাম দেওয়াই যথেষ্ট।
চৌধুরী ছাহেব আবার ধমকালেন, যা, ভেতর থেকে কিছু নাশতা নিয়ে আয়। মেয়েটি মাথা নিচু করে ভেতরে চলে গেল। আমার মনটা ব্যথায় ভারি হয়ে উঠল। বললাম, মেয়েটাকে অন্তত একটু ভালো কাপড়-চোপড় পরালেই তো পারেন! ওকে কোথাও কুড়িয়ে পেয়েছেন নাকি?
চৌধুরী ছাহেব নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, না ভাই, এমনিতেই এসে জুটেছে। ওর মায়ের সাথে পাশের পীর ছাহেবের বাড়ীতে থাকত। মুরীদরা এসে কুলছূমকে কোলে নিয়ে খুব আদর-সোহাগ করত, বলত হুজুরের মতো চেহারা পেয়েছে। এই জ্বালা সইতে না পেরে পীরের স্ত্রী ওদের বের করে দেয়। পরে ওর মা করোনায় মরে গেল। সেই থেকেই ও আমার এখানে।
\ দুই \
আরেক দিন মাগরিবের ছালাত পড়ে আমরা কয়েকজন বৈঠকখানায় বসে গল্পে মশগূল। চৌধুরী ছাহেব চোখ বন্ধ করে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে তাসবীহ জপছেন। এমন সময় অন্দরমহল থেকে ভেসে এল সপাসপ বেত্রাঘাতের শব্দ আর এক করুণ আর্তনাদ। চিনতে পারলাম, এ কুলছূমের গলা।
ভেতর থেকে বিবি ছাহেবের তীক্ষ্ণ কণ্ঠ কানে ভেসে এল, হারামজাদী! চোরের হদ্দ! ছয়টা মোরববার মধ্যে একটা তুই চুরি করে গিললি? সেজন্যই তো আমার ছেলে-মেয়ের ভাগে কম পড়ল! আজ তোর একদিন কি আমার একদিন! আমরা থমকে গেলাম, কিন্তু চৌধুরী ছাহেব নির্বিকার। তাসবীহ পড়া শেষ করে তিনি অত্যন্ত শান্ত পায়ে ভেতরে গেলেন। একটু পর ফিরে এসে হাসিমুখে বললেন, কিছু না ভাই। বাড়ীতে ঐ যে একটা ‘মানুষ’ আছে না- ঐ যে হারামজাদী কুলছূম! চোর
*গাবতলী, বগুড়া।
একটা, মোরববা চুরি করে খেয়েছে। তাই বিবি ছাহেব একটু শাসন করছেন। আর ওকেই বা কি দোষ দিব? ওর মা-ইতো ছিল একটা হারামজাদী। সেই চুরি করে খাইয়ে মেয়ের জিভ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্য বন্ধুরা তখন সায় দিয়ে বলে উঠল, ঠিকই তো, ছোটলোকের জাতই চোর!
কিন্তু আমি পরে আসল ঘটনাটি জানতে পেরেছিলাম। কুলছূম নিজের জন্য মোরববা চুরি করেনি। চৌধুরী ছাহেবের তিন বছরের ছেলে খোকা নিজে অর্ধেকটা খেয়ে বাকীটা ভালোবেসে কুলছূমের মুখে গুঁজে দিয়েছিল। বিবি ছাহেব দূর থেকে সেটা দেখেই ভুল বোঝেন। কুলছূম একটিবারও খোকার নাম মুখে নেয়নি, পাছে বিবি ছাহেব নিজের ছেলেকেও বকা দেন! মার খাওয়ার পর রাতে যখন কুলছূম ফুঁপিয়ে কাঁদছিল, ছোট্ট খোকা চুপিচুপি এসে তার আধো আধো বোলে কুলছূমের চোখের পানি মুছে দিয়েছিল।
আমি ভাবতাম, নিজেদের সন্তানদের জন্য হিসাব করে মোরববা ও সন্দেশ থাকলেও এই বয়সের ইয়াতীম কুলছূমদের জন্য কোন বরাদ্দ থাকে না কেন? আল্লাহ সবার মুখে সমান জিভ দিয়েছেন, অথচ এই চৌধুরী ছাহেবরা এত নিষ্ঠুর হয় কি করে!
\ তিন \
আরেক দিনের ঘটনা। চা-নাশতা শেষে চৌধুরী বাড়ী থেকে উঠব উঠব করছি। এমন সময় অন্দরমহল থেকে আবার সেই সপাসপ শব্দ আর কুলছূমের আর্তনাদ। সঙ্গে বিবি ছাহেবের গর্জন- হারামজাদী! তুই জাদু করছিস, নইলে আমার পেটের ছেলে আমারই পর হয়ে যায়?
কুলছূমের অপরাধ ছিল তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। খোকার জন্মের পর থেকে তাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে কুলছূম। তার পেশাব-পায়খানা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে তাকে ঘুম পাড়ানো-সবই সে করত। বিবি ছাহেবের হুকুম ছিল, কুলছূম খাইয়ে-দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে খোকাকে তাঁর বুকে দিয়ে আসবে। কিন্তু মুশকিল হ’ল, মাঝরাতে খোকার ঘুম ভাঙলেই সে মায়ের বদলে কুলছূমের কোলে যাওয়ার জন্য চিৎকার জুড়ে দিত। নিজের ছেলের এই টান বিবি ছাহেবের সহ্য হ’ত না। আর তার সব রাগ গিয়ে পড়ত ঐ ইয়াতীম মেয়েটার ওপর। বিবি ছাহেব কুলছূমকে তাদের ‘চাকরানি’ বা নিচু জাতের মানুষ ভাবলেও খোকা সেই কৃত্রিম বিভেদ মানতে চাইত না। সে মায়ের দামী আচলের চেয়ে কুলছূমের ছেঁড়া আচলের গন্ধেই বেশী শান্তি পেত।
এমনি করে পাঁচ বছর কেটে গেল। অন্দরে কুলছূমের আর্তনাদ এখন সবার গা-সওয়া হয়ে গেছে। কুলছূম এখন অনেক বড় হয়েছে। একদিন তাকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছ মা? জবাব দেওয়ার পরিবর্তে তার দুই চোখ অশ্রুতে টলমল করছে। সে তাড়াতাড়ি তার পরনের ছেঁড়া ওড়না দিয়ে হাতের একটা পোড়া দাগ ঢাকার চেষ্টা করল। কোন শব্দ না করে শুধু চোখ মুছতে মুছতে ভেতরে চলে গেল। তার সেই নীরব কান্না আমাকে বুঝিয়ে দিল, এই পাঁচ বছরে তার কষ্টের কোন উপশম হয়নি।
\ চার \
কয়েক দিন পরের ঘটনা। গভীর রাতে হঠাৎ গ্রামের নিস্তব্ধতা ভেঙে চারিদিক থেকে চিৎকার ভেসে এল- আগুন! আগুন! চৌধুরী বাড়ীতে আগুন! আমি ধরফর করে বিছানা থেকে উঠে দৌড়ালাম। গিয়ে দেখি, চৌধুরী ছাহেবের সাজানো গোছানো বিশাল অন্দরমহল দাউদাউ করে জ্বলছে। চারিদিকে প্রচন্ড ধোঁয়া আর মানুষের হাহাকার। চৌধুরী ছাহেব তখন উঠোনে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছেন, তাঁর একহাতে টাকার সিন্দুক আর অন্যহাতে কিছু দলিলপত্র। বিবি ছাহেবও কোনমতে গা বাঁচিয়ে বাইরে এসে হাঁপ ছাড়ছেন। আমি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, টাকাকড়ি কিছু বাঁচানো গেল?
বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, ঘরগুলোই যা পুড়ল ভাই! তবে সময় থাকতে গোয়ালঘরের গরু-বাছুরগুলোর দড়ি কেটে দিতে পেরেছিলাম। টাকার সিন্দুকটাও বের বের করতে পেরেছি। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিবি ছাহেবের সম্বিত ফিরল। নিজের শূন্য কোলের দিকে তাকিয়ে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ওগো! আমার খোকা কই? খোকা তো ভেতরে ঘুমাচ্ছিল!
মুহূর্তের মধ্যে পুরো উঠোন স্তব্ধ হয়ে গেল। আগুনের উত্তাপ তখন এতটাই তীব্র যে ভেতরে ঢোকার সাহস কারও নেই। ঠিক সেই সময়, ধোঁয়ায় কাশতে কাশতে পেছনের দিক থেকে ছুটে এল কুলছূম। বিবি ছাহেবের আর্তনাদ শুনে সে থমকে দাঁড়াল। কুলছূমের চোখে কোন দ্বিধা দেখা গেল না। বিবি ছাহেবের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, ভয় পাইয়েন না আম্মা, আমি খোকা ভাইরে লইয়া আসতাছি।
না রে মা, যাস না! পুড়ে মরবি! বিবি ছাহেবের মুখ থেকে এবার আর ‘হারামজাদী’ বা ‘চোর’ শব্দ বের হ’ল না, এক চরম অপরাধবোধ আর মাতৃস্নেহ থেকে ‘মা’ ডাকটা বেরিয়ে এল। কিন্তু কুলছূম ততক্ষণে জ্বলন্ত ধোঁয়ার কুন্ডলীর ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেছে।
বাইরে আমরা সবাই শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ অন্দরের জ্বলন্ত জানালার পর্দা ছিঁড়ে উঠোনে এসে পড়ল কাপড়ে জড়ানো একটি পুঁটলি। আমরা সবাই ছুটে গেলাম। কাপড়ের বাঁধন খুলতেই দেখা গেল, খোকা দিব্যি বেঁচে আছে! কুলছূম নিজের গায়ের ভেজা কাপড় দিয়ে খোকাকে এমনভাবে জড়িয়ে ছুঁড়ে দিয়েছিল যে, আগুনের একটা অাঁচও তার গায়ে লাগেনি।
কিন্তু খোকাকে ছিঁটকে ফেলার ঠিক পরের মুহূর্তেই, এক বিকট শব্দে জ্বলন্ত ছাদটি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে কুলছূম দাঁড়িয়ে ছিল। একটা আর্তনাদ করার সুযোগও পেল না মেয়েটি।
\ পাঁচ \
পরদিন সকালে আগুন পুরোপুরি নিভে গেছে। চারিদিকে শুধু কালো ছাই আর কয়লা। চৌধুরী ছাহেব তখনো পুড়ে যাওয়া ঘরের এক কোণে তাঁর বেঁচে যাওয়া টাকার হিসাব করছেন। কিন্তু বিবি ছাহেব সম্পূর্ণ বদলে গেছেন। তিনি খোকাকে বুকে জড়িয়ে ধরে যেখানে ছাদ ভেঙে পড়েছিল, সেই ছাইয়ের স্তূপের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। বিবি ছাহেব দুই হাতে সেই তপ্ত ছাই মুঠো করে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, আমি ওরে এক টুকরো মোরববা চুরির অপবাদে পশুর মতো পিটিয়েছি...। আর ও নিজের কলিজা দিয়ে আমার মানিকরে ফিরায়ে দিল! হায় আল্লাহ, আমি কারে ছোটলোক ভাবলাম, আর কারে মানুষ ভাবলাম! এই পাপ আমি কই রাখব?
তাঁর চোখের পানি তপ্ত ছাইয়ের ওপর পড়ে বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছিল। আমার দু’চোখ দিয়েও অঝোরে অশ্রু ঝরতে লাগল। চৌধুরী ছাহেবের ঐ কয়লা হয়ে যাওয়া আলিশান বাড়ীর দিকে তাকিয়ে আমি মনে মনে বললাম, বাহ্যিক রূপ আর বিত্ত-বৈভবে মোড়ানো এই প্রাসাদে সত্যি বলতে ওই একটি মেয়েই প্রকৃত ‘মানুষ’ ছিল।
শিক্ষণীয় :
১. অনেক বিত্তশালী মানুষের বাহ্যিক দ্বীনদারীর আড়ালে তাদের নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে থাকে। বাইরের পৃথিবীতে তার দান-ছাদাক্বা কেবলই আত্মপ্রচারণা বৈ কিছুই নয়।
২. ইয়াতীম ও অসহায় শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা এবং নিজ সন্তান ও আশ্রিত সন্তানের মাঝে বৈষম্য করা চরম অমানবিকতা ও বড় ধরনের পাপ।
৩. কেবল জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না। মাতৃত্ব হ’ল নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও ভালোবাসার নাম।
৪. ছোটরা তাদেরকেই পসন্দ করে, যারা তাদের বেশী ভালোবাসা দিতে পারে।
৫. চরম বিপদের মুহূর্তে মানুষের সঞ্চিত ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা বা বিত্তবৈভব কোন কাজে আসে না; বরং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মানবিকতাই মানুষের ত্রাণকর্তা হিসাবে আবির্ভূত হয়।
৬. প্রকৃত মনুষ্যত্ব পোষাক, বংশমর্যাদা বা সম্পদের মাঝে নিহিত নয়; বরং নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ, ক্ষমা ও অন্যের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার মাঝেই তা নিহিত।
৭. আমরা যাদেরকে অবহেলা বা অপসন্দ করি অনেক সময় আল্লাহ তার অসীলাতেই আমাদেরকে বড় কোন বিপদ থেকে মুক্তি দিতে পারেন।