একজন বৃদ্ধ কৃষকের একটি বিশাল খেজুর বাগান ছিল। এর মধ্যে একটি গাছ ছিল খুবই উন্নতমানের। তিনি গাছটিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং বিশেষ পরিচর্যা করতেন। গাছটির উৎকৃষ্ট মানের সুমিষ্ট খেজুরের এলাকা জুড়ে সুখ্যাতি ছিল। গাছটিতে ফলনও হ’ত তুলনামূলক বেশী। কৃষক প্রতি বছর সকলকে জানান দিয়ে এ গাছের খেজুর নামাতেন। এলাকার লোকজনও খেজুর কেনার জন্য নির্দিষ্ট দিনে বাগানে ভিড় জমাতো। ঐ গাছের সাথে সাথে কৃষকের বাগানের অন্য খেজুরও অধিক পরিমাণে বিক্রি হ’ত। এতে কৃষক বেশ লাভবান হ’তেন। ফলে গ্রামের অন্য কৃষকেরা তাকে হিংসা করত।
একবার খেজুর সংগ্রহের আগের রাতে সেই গাছের সব খেজুর চুরি হয়ে গেল। এজন্য পরবর্তী বছর কৃষক আর খেজুর সংগ্রহের তারিখ ঘোষণা করলেন না। কেবল কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীরাই বিষয়টি জানত। কিন্তু দেখা গেল, সে বছরেও আগের রাতে খেজুর চুরি হয়ে গেল। চোরের সুনির্দিষ্ট সময়জ্ঞান দেখে কৃষক নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, এটি তার প্রতিবেশী বা নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই কেউ করেছে, যারা প্রতি রাতে তার বাড়িতে এসে কফি পান করত ও খোশগল্প করত।
পরের বছর তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সেই খেজুর গাছের প্রসঙ্গ তুললেন এবং বন্ধু ও প্রতিবেশীদের মধ্যে একাধিকবার এ‘লান করলেন যে, তিনি নির্দিষ্ট দিনে খেজুর সংগ্রহ করবেন। এরপর সেই নির্ধারিত দিনের আগের রাতে তিনি বন্দুক নিয়ে বাগানের একটি ছোট ঢিবির আড়ালে চোরের অপেক্ষায় বসে থাকলেন।
অপেক্ষা বেশী দীর্ঘ হ’ল না। কিছুক্ষণের মধ্যে একজন লোক লাঠি ভর দিয়ে হেঁটে আসতে লাগল, যার মুখচ্ছবি প্রথমে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তবে যখন লোকটি আরও কাছে আসলো, কৃষক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন! কারণ চোর আর কেউ নয়, তার অন্ধ প্রতিবেশী আবু সাঈদ।
অন্ধ আবু সাঈদকে দেখে কৃষকের কৌতুহল হ’ল। তিনি বন্দুক রেখে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন যে, একজন অন্ধ ব্যক্তি কিভাবে এত উঁচু গাছ থেকে খেজুর চুরি করতে পারে। তিনি দেখলেন, আবু সাঈদ সাবধানে লাঠির সাহায্যে রাস্তা অনুভব করতে করতে খেজুর গাছের কাছে আসল। একটি দড়ি বের করল এবং সেটি গাছের চারপাশে পেঁচিয়ে নিজের পিঠের পেছনে বাঁধল, যাতে সে ও গাছের গুঁড়ি একই বৃত্তের মধ্যে থাকে। এরপর প্রচলিত কৌশলে গাছে উঠতে লাগল। গাছে উঠতে উঠতে যখন তার মাথা খেজুর পাতার স্পর্শ পেল, তখন সে বুঝল যে, গাছের চূড়ায় পৌঁছে গেছে। এরপর সে খেজুরের থোকা গুলো কাটতে লাগল। সব কাজ শেষ হ’লে সে একই উপায়ে নিচে নেমে আসলো এবং চুপচাপ নিজের বাড়ির দিকে চলে গেল। তখন কৃষক ভাবলেন, একজন অন্ধ মানুষকে হত্যা করার জন্য গুলি নষ্ট করা বৃথা। তাছাড়া একজন অন্ধকে চুরির দায়ে হত্যা করলে মানুষ তা বিশ্বাস করবে না। উপরন্তু তার সুনাম নষ্ট হবে। তাই তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এক পরিকল্পনা করলেন।
কৃষক প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পরের মৌসুম পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তিনি তার ক্ষোভ পুরো একটি বছর ধরে লুকিয়ে রাখলেন। যখন খেজুর সংগ্রহের সময় ঘনিয়ে আসল, তখন তিনি পূর্বের ন্যায় এলাকা জুড়ে খেজুর সংগ্রহের তারিখ ঘোষণা করলেন। বিশেষ করে আবু সাঈদের সামনে জোরে জোরে বললেন, আমি আগামীকাল সকালেই খেজুর নামিয়ে ফেলব। আশা করি এই বছর আমার খেজুর গাছ চোরের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
এরপর রাত নামার আগেই কৃষক তার প্রিয় খেজুর গাছের কাছে গেলেন। তিনি গাছের সব খেজুর ও পাতা কেটে ফেললেন। ফলে গাছটি শুধু একটি মাথাহীন গুঁড়িতে পরিণত হ’ল। এরপর তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে গেলেন।
রাতে আবু সাঈদ তার চেনা পদ্ধতিতে দড়ি বেঁধে গাছে উঠতে লাগল। কিন্তু এবার গাছে কোন খেজুর বা পাতা ছিল না, যার স্পর্শে সে বুঝতে পারবে যে, সে গাছের চূড়ায় পৌঁছে গেছে। ফলে খেজুর ও পাতার স্পর্শের আশায় আবূ সাঈদ উপরের দিকে উঠতে লাগলো। কিন্তু পত্র-পল্লবহীন ন্যাড়া গাছের একেবারে উপরে উঠে গিয়ে সে পিছন দিকে পড়ে গেল এবং মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করলো। পরদিন সকালে ঘোষণা অনুযায়ী সকলে বাগানে উপস্থিত হয়ে বুঝতে পারল, চোর আসলে কে ছিল!
এখানে সবচেয়ে বেশী অবাক করা বিষয় ছিল কৃষকের ধৈর্য ও প্রতিশোধের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। তিনি সম্পূর্ণ এক বছর ধরে কিভাবে নিজের রাগ লুকিয়ে রাখলেন, আর কিভাবে এতদিন আবু সাঈদের সাথে হাসিমুখে কথাবার্তা বলতেন সেটাই বিস্ময়কর! অবশেষে তিনি এমন কৌশল প্রয়োগ করলেন, যাতে অন্ধ চোরও মৃত্যুবরণ করল, তার সুনামও অক্ষুণ্ণ থাকল।
* শিক্ষার্থী, আরবী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।