বিবাহ সম্পর্কিত কতিপয় রীতি-নীতি

ভূমিকা : ইসলামে বিবাহ শুধুমাত্র একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদত এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাহ। এটিকে ঈমানের অর্ধেক হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা মানুষের মানসিক প্রশান্তি, চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা এবং বংশ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিবাহের মতো সুন্দর একটি বিধান দান করেছেন। ইসলামী জীবনদর্শনে বিবাহের প্রতিটি রীতি-নীতি কুরআন ও হাদীছের আলোকে পরিচালিত, যা সকল প্রকার বাহুল্য, অপচয় ও কুপ্রথা থেকে মুক্ত। কিন্তু কালের বিবর্তনে মুসলিম সমাজেও বিভিন্ন অনৈসলামিক ও স্থানীয় সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত রীতিনীতি প্রবেশ করেছে, যা প্রায়শই বিবাহের ইসলামী সৌন্দর্য ও সরলতাকে মলান করে দেয়। বিবাহে নানা অসঙ্গতির মধ্যে রয়েছে নিকাহনামায় ওলীকে বাদ দেয়া, তথাকথিত উকিল নিয়োগ দেয়া, হুযুর ছাড়া বিবাহের কথা না ভাবা, ঈজাব-কবুলের ভাষার ভুল-ভ্রান্তি, নিকাহনামার বিভিন্ন ধারার অসঙ্গতি ইত্যাদি বিষয়। এই প্রবন্ধে ইসলামী শরী‘আত নির্ধারিত বিবাহের মূল স্তম্ভ, শর্তাবলী এবং রীতি-নীতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হ’ল। সাথে সাথে বিবাহকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বিভিন্ন অসঙ্গতি ও শরী‘আতবিরোধী কার্যকলাপ তুলে ধরা হ’ল।-

নীতি ও রীতির পার্থক্য : নীতি ও রীতি বহুল প্রচলিত ও জানা শব্দ হ’লেও এদের অর্থে কিছু পার্থক্য আছে। নীতি অনেকটা আইনের সঙ্গে জড়িত। যার ভিত্তিতে কোন কাজ করা হয়। ভালো-মন্দ, সঠিক-বেঠিক, শুদ্ধ-অশুদ্ধ নির্ণয়ের মাপকাঠি হ’ল নীতি। যে কোন দেশের সরকার, সংস্থা, সংঘ, কমিটি ইত্যাদি পরিচালনার যে বিধিবদ্ধ কিংবা অবিধিবদ্ধ নিয়ম থাকে তাই নীতি নামে পরিচিত। প্রত্যেক দ্বীন-ধর্মের বিশেষত ইসলামেরও রয়েছে বিধিবদ্ধ বা লিখিত নিয়ম-কানূন, যার ব্যত্যয় কখনই কাম্য নয়। নীতি কখনো আইনের রূপ নেয়, যা লঙ্ঘনে শাস্তির মুখোমুখি হ’তে হয়। নীতির আরবী কানূন, হুকুম এবং ইংরেজী Policy, Principle, Ethics ইত্যাদি।

রীতি হ’ল কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সমাজের প্রচলিত প্রথা ও পদ্ধতি। প্রথা থেকেও আইন প্রণয়ন করা হয়। তখন তা নীতিতে পরিণত হয়। বিবাহ পৃথিবীর সকল দেশে সকল সমাজে ও সকল ধর্মে নারী-পুরুষের শারীরিক সম্পর্কের একটি স্বীকৃত প্রথা বা রীতি। জাহেলী যুগেও আরবে এ রীতি ছিল। তবে তার পদ্ধতি ছিল একাধিক। তন্মধ্যে ইসলাম যে পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে তাই ইসলামে বিবাহের নীতি। তালাকেরও ইসলামে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। রীতির আরবী তায়ামুলুন্নাস, রসম, রেওয়াজ ইত্যাদি এবং ইংরেজী Custom, Tradition, Method, style ইত্যাদি।

রীতি বা প্রথা গড়ে ওঠার পিছনে কোন একক ব্যক্তি বা সংস্থার ভূমিকা থাকে না। কিন্তু নীতি নির্ধারণকারী কোন ব্যক্তি বা সংস্থা নীতি নির্ধারণ করে থাকে। নীতি নির্ধারক নীতির পরিবর্তন না ঘটানো পর্যন্ত তার ধরন সর্বত্র একই রকম থাকে। যেমন মুসলিমদের বিবাহের ধরন ও নীতি সারা বিশ্বে একই রকম। কিন্তু রীতি স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বদলায়। যেমন বিবাহের সাথে বর-কনে দেখার আনুষ্ঠানিকতা, বরযাত্রী গমন, ফিরানি-ঘুরানি ইত্যাদি সব দেশে সকল সমাজে এক নয়। রীতি কালে কালে গড়ে ওঠে, একক কেউ এর পিছনে দায়ী নয়।

জীবন চলার পথে নীতিকে মূল গণ্য করা হয়। নীতির সাথে রীতি যতটুকু খাপ খায় বা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় ততটুকু রীতি মানতে কারও কোন আপত্তি নেই। নীতি লঙ্ঘন করে রীতি মানার কোন সুযোগ নেই। ইসলামের নীতি লঙ্ঘনকারী ইসলামের কাছে দোষী হবে। কিন্তু রীতি যেহেতু স্থানীয় সমাজের বিষয় তাই রীতি লঙ্ঘনে ব্যক্তি সমাজে নিন্দার পাত্র হয় এবং সমাজ নিজের মতো করে তার বিরুদ্ধে শালিস দরবার করে।

বিবাহের পরিচয় : বিয়ে, শাদী, নিকাহ, দাম্পত্য সম্পর্ক, পানি গ্রহণ, দার গ্রহণ, পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়া, এমন কত মিষ্টি মধুর ও হৃদয়গ্রাহী নাম জড়িয়ে আছে বিবাহের সাথে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহ একটি দ্বীনী চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে এক জোড়া নারী-পুরুষের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক বৈধ হয় এবং পারস্পরিক পারিবারিক দায়িত্ব গড়ে ওঠে। পৃথিবীতে ভবিষ্যৎ মানব প্রজন্মের আগমনের ধারা রক্ষা বিবাহের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

সাধারণত অভিভাবকদের সম্মতি ও চেষ্টায় যে বিবাহ হয় তাকে আয়োজিত বিবাহ বলে। সমাজে এরূপ বিবাহের প্রচলনই অধিক। আয়োজিত বিবাহে সচরাচর ঘটা করে বিবাহের ব্যবস্থা হয়ে থাকে। সেখানে ওলী, সাক্ষী, বিবাহ পড়ানোর জন্য মাওলানা, কাযী, উপস্থিত দর্শকশ্রোতা ইত্যাদি থাকে। বর কনের উপস্থিত তো বলাই বাহুল্য।

আর ছেলে-মেয়ে নিজেদের পসন্দ ও ইচ্ছায় যে বিবাহ করে তাকে ভালোবাসার বা গোপন বন্ধুত্বজনিত সম্পর্কমূলক বিবাহ বলে। ভালোবাসার বা গোপন বন্ধুত্বজনিত সম্পর্কমূলক বিবাহে সাধারণত ছেলে-মেয়ে কাযী অফিসে গিয়ে ঈজাব-কবুলের মাধ্যমে কাবিননামা রেজিস্ট্রি করে বিবাহ করে থাকে। এ বিবাহে কোন ঘটা বা আয়োজন থাকে না, বরং সময়বিশেষে সাক্ষীসাবুদ জোটানই মুশকিল হয়ে পড়ে। সাধারণত এক্ষেত্রে কনের ওলীও উপস্থিত থাকে না। কনে নিজ উদ্যোগে বিয়ে করে থাকে। এরূপ বিবাহ শরী‘আতসিদ্ধ নয়। উল্লেখ্য, মাহরাম নয় এমন নারী ও পুরুষের মাঝে বিবাহ বহির্ভূত ভালোবাসা বা গোপন বন্ধুত্বজনিত সম্পর্ক গড়ে তোলা হারাম ও নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন,وَأُحِلَّ لَكُمْ مَا وَرَاءَ ذَلِكُمْ أَنْ تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُمْ مُحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ ‘আর (তোমাদের জন্য হারাম হ’ল) সকল সধবা নারী। তবে তোমাদের মালিকানাধীন ক্রীতদাসী (ও যুদ্ধবন্দিনী) ব্যতীত। এটি তোমাদের জন্য আল্লাহ বিধিবদ্ধ করেছেন। এদের ব্যতীত তোমাদের জন্য সকল নারী হালাল করা হয়েছে এই শর্তে যে, তোমরা তাদেরকে সম্পদের বিনিময়ে কামনা করবে বিবাহের উদ্দেশ্যে, ব্যভিচারের উদ্দেশ্যে নয়’ (নিসা ৪/২৪)। পরের আয়াতে স্বাধীন মহিলাকে বিবাহের সামর্থ্য না জুটলে তিনি দাসীদের বিবাহ করতে বলছেন,فَانْكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَاتٍ غَيْرَ مُسَافِحَاتٍ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ ‘অতএব তোমরা তাদের পরিবারের অনুমতিক্রমে তাদের বিয়ে কর এবং তাদেরকে সঙ্গতভাবে মোহরানা প্রদান কর এজন্য যে, তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে এবং ব্যভিচারিণী হবে না বা কাউকে উপপতি হিসাবে গ্রহণ করবে না’ (নিসা ৪/২৪)। কাজেই অবৈধ সম্পর্ক করা থেকে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর সাবধান ও হুঁশিয়ার থাকতে হবে।

বিবাহে ওলীর আবশ্যকতা : বিবাহে ওলীর ভূমিকা নীতি ও রীতি উভয়ভাবে স্বীকৃত। ওলী বলা হয় আছাবাকে। মীরাছ বা মৃতের সম্পত্তি লাভের ক্রমানুসারে পুরুষ ওয়ারিছগণ ওলী হবে। কনের পূর্ব স্বামীর গর্ভজাত পুত্র যদি থাকে তবে সেই তার মায়ের বিবাহের ওলী হবে। এমনিতে পিতা, ভাই, দাদা, চাচা ক্রমান্বয়ে কনের ওলী হবে। বাংলায় ওলী অর্থ অভিভাবক। উক্ত সূত্রে ওলী কনে পক্ষেরও থাকতে পারে আবার বর পক্ষেরও থাকতে পারে। কারও এরূপ ওলী না থাকলে রাষ্ট্রপ্রধান তার ওলী হবেন। বিবাহে কনের ওলীকে কনের অনুমতি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আছে, আবার কনেরও ওলীর সম্মতিক্রমে বিবাহ করার বিধান রয়েছে সেহেতু বিবাহে কনের ওলীর ভূমিকা কুরআন ও হাদীছে নীতিগতভাবে স্বীকৃত। অবীরা মহিলাদের বিয়ে দেওয়ার জন্য পুরুষদের লক্ষ্য করে আল্লাহ বলেছেন, وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ ‘তোমাদের মধ্যস্থিত স্বামীহীনা অবীরাদের তোমরা বিবাহ দিয়ে দাও’ (নূর ২৪/৩২)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ ‘ওলি ছাড়া কোন বিবাহ হয় না’।[1] মেয়েরা বিবাহের উপযুক্ত হ’লে ওলীরাই তো চেষ্টা করে ছেলে যোগাড় করে এবং তাদের বিবাহ দেয়। তাদের এ চেষ্টা পাত্র খোঁজা থেকে শুরু করে বিবাহ হওয়া এবং কন্যা বিদায় করা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। বিয়ের আকদ বা ঈজাব ও কবুলে তাই তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

কিন্তু রীতিগতভাবে ‘ওলী’ শব্দটি কানে এলেই বাঙালী মুসলিম আল্লাহর ওলীদের বুঝে থাকে। যারা ছিলেন ছূফী-সাধক, যাদের ছিল অনেক অলৌকিক ক্ষমতা বা কারামত। কিন্তু বিবাহের ওলীর সাথে এ সকল ওলীর কোন যোগ নেই। আসলে আমাদের জানার পরিধি এতই কম যে, অনেক কন্যার পিতা ও ভাই জানে না যে, বিবাহে তারা তাদের মেয়ে বা বোনের ওলী এবং বিবাহের ঈজাব-কবুলের দায় তাদের। বিবাহের ঈজাব-কবুলের ভাষা ও বাক্য তাদের ভালোমতো জানা দূরের কথা, মোটের উপর তা জানার বিষয় বলেও তারা মনে করে না। নিজেকেসহ যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই আমার কথার সত্যতা জানা যাবে। সমাজের লোকেরা মনে করে, এটা জানবে বিবাহ পড়ানো মাওলানা ও কাযী। তারা কথা বলবে বিবাহের জন্য উদ্দিষ্ট উকীলকে। উকীলও নিজে বিবাহের ঈজাব-কবুলের ভাষা ও বাক্য জানবে না; মাওলানা বা কাযী তাকে যা বলতে বলবে সে তা মুখে উচ্চারণ করবে। তার উচ্চারণ শেষ হ’লে ঐ মাওলানা বা কাযী বরকে বলবে, ‘আপনি বলুন, কবুল’। তখন বর বলবে, কবুল। বর কবুল শব্দ জানলেও কোন মুহূর্তে তা বলতে হবে তা জানে না। মাওলানা বা কাযী তাকে বলার পর সে মুখ খোলে। মোটকথা, বিবাহে আমাদের সমাজে ওলী খুবই গৌণ ভূমিকা পালন করে। যেভাবে তার দায়িত্ব পালন করার কথা সেভাবে সে করে না। হয় ইচ্ছে করে, নয় জানার অভাবে।

বিবাহে উকীল ও সাক্ষী নিয়োগ : বিবাহে ওলী যদি নিজে ভূমিকা রাখতে পারে তবে নীতিগতভাবে উকীল নিয়োগের কোন প্রয়োজন নেই। বিবাহের আকদ বা চুক্তির অনুষ্ঠানে মূল কাজ ঈজাব ও কবুল। ঈজাব ও কবুলের নির্দিষ্ট ভাষা আছে। তা যদি কোন ওলী ও বর-কনে না জানে, কিংবা জানলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা নিজেরা ঈজাব-কবুল করতে অনিচ্ছুক হয় তবেই উকীল নিয়োগের কথা আসবে। সে ক্ষেত্রে ওলী নিজ উদ্যোগে কিংবা অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে একজন দক্ষ লোককে উকীল নিয়োগ দেবে। তার নিয়োগকৃত উকীলকে অবশ্যই ঈজাব ও কবুল বাস্তবায়নের যোগ্যতা থাকতে হবে। সে বিবাহের খুৎবা দেওয়ারও যোগ্যতা রাখবে। ঈজাব ও কবুলের ভাষা তার পূর্ব থেকে জানা থাকবে। মাওলানা বা কাযী তাকে বলার পর সে বলবে না। মূলত উকীল অর্থ প্রতিনিধি বা এজেন্ট। সে বিবাহে ওলীর পক্ষে ঈজাব ও কবুলের ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করবে। সে যদি ওলীর প্রতিনিধিত্বই করতে না পারে তবে সে কিসের উকীল? যে উকীল জজের সামনে মক্কেলের কথা উপস্থাপন করতে পারে না তাকে মক্কেল কি উকীল নিয়োগ দেয়? তাই যে উকীল ঈজাব কবুলের ভাষা নিজের থেকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারে না তার উকীল হওয়া বিধিসম্মত নয়। এটি ওলীর পক্ষ থেকে তার উপর অর্পিত আমানত। বিবাহে খুৎবা দেওয়া মুস্তাহাব। উকীল বাদে অন্য কেউ দিলেও অসুবিধা নেই। বিবাহের মজলিসে হাযির সবাই বিবাহে সাক্ষী বলে গণ্য। তবে ফেতনা-ফাসাদ এড়াতে দু’চারজনের নাম উল্লেখে নীতিগতভাবে অসুবিধা নেই।

সাক্ষীদের উকীলের মুখের ঈজাব এবং বরের মুখের কবুল স্বকর্ণে শুনতে হবে অথবা লিখতে দেখতে হবে। কনের সম্মতি কেবল ওলী নেবে। এই অনুমতির জন্য সাক্ষী রাখার কোন প্রয়োজন নেই এবং বিয়ের কোন পক্ষের সাক্ষীদেরই কনের থেকে অনুমতি গ্রহণের শব্দ শোনা শর্ত নয়। আমাদের সমাজে বিবাহের অনুষ্ঠানে ওলী নয় বরং উকীলকেই রীতিগতভাবে মূল বা প্রধান হিসাবে ভাবা হয়। উকীল ছাড়া বিবাহ আমরা ভাবতেই পারি না। সম্ভবত এ কারণে নিকাহনামায় ওলীর বদলে উকীলকে স্থান দেওয়া হয়েছে। কনের পিতা কিংবা ভাই বেঁচে আছে, বিবাহের মজলিসেও উপস্থিত আছে তবুও উকীল নিয়োগ করতেই হবে। এটাই এ দেশের প্রথা। দেখা যায় বিবাহের মজলিসে বর পক্ষ আসার পর শুরু হয় উকীল সাক্ষী নির্বাচন। অনেক ক্ষেত্রে উকীল সাক্ষী নিয়োগের সময় বাপ-ভাইয়ের হদিসই থাকে না। সমাজের মোড়ল-মাতববররাই তাদের ঠিক করে। অথচ উকীল নিয়োগ দেওয়ার কথা ওলীর। রীতি যাই থাকুক, ওলীর সম্মতি ছাড়া উকীল নিয়োগ নীতিগতভাবে শুদ্ধ নয়। তারা বিবাহে বর পক্ষের দু’জন ও কনে পক্ষের দু’জন সাক্ষীকে যরূরী মনে করে। হাজেরানে মজলিস সবাই যে সাক্ষী হ’তে পারে তা তারা হয়তো জানে না। আবার কনের সম্মতির শব্দ সাক্ষীদের শোনাকে তারা রীতি হিসাবে যরূরী মনে করে।

ঈজাব-কবুলের ভাষা : ঈজাব ও কবুল দু’টি আরবী শব্দ, যার বাংলা অর্থ প্রস্তাব ও গ্রহণ। বিবাহে বর ও কনে নামের দু’টি পক্ষ থাকে। তাদের যে পক্ষ বিবাহের চুক্তির কথা প্রথমে বলেন, তাকে বলা হয় ঈজাব এবং দ্বিতীয় পক্ষ চুক্তির উক্ত কথায় যে সম্মতি জ্ঞাপন করে তাকে বলা হয় কবুল। এ দু’টি বিষয় বিবাহের রোকন বা স্তম্ভ। মূলত এ দু’টির মাধ্যমে বিবাহ চুক্তি সম্পন্ন হয়। কাজেই ঈজাব ও কবুলের ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যে ভাষা নীতিগতভাবে অনুমোদিত তার মধ্যে থাকা কর্তব্য। তার ব্যত্যয় কোনভাবেই কাম্য নয়।

ঈজাব ও কবুলের বাক্য ওলী এবং ওলীর পক্ষে উকীলও বলতে পারেন। সেখানেও উভয় পক্ষের বাক্যের ক্রিয়া অতীতকাল বাচক কিংবা ঈজাব আদেশবাচক এবং কবুলের বাক্য অতীতকালবাচক হবে। যেমন কনের ওলী বরকে বলবে, আমার মেয়ে অমুককে এত টাকা অথবা সোনা ইত্যাদি মোহরের বিনিময়ে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ ও নিকাহনামায় উল্লিখিত ব্যক্তিদের সাক্ষী মেনে আপনার সাথে বিবাহ দিলাম’; উত্তরে বর বলবে, ‘আমি এ বিবাহ কবুল করলাম’। কনের উকীল বিবাহের ঈজাব করলে বলবে, আমার মক্কেল অমুকের অমুক নামের মেয়েকে আমি উকীল হিসাবে এত টাকা অথবা সোনা ইত্যাদি মোহরের বিনিময়ে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ ও নিকাহনামায় উল্লিখিত ব্যক্তিদের সাক্ষী মেনে আপনার সাথে বিবাহ দিলাম’; উত্তরে বর বলবে, ‘আমি কবুল করলাম’।

অন্যূন দু’জন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলা সাক্ষীর সামনে ওলীর সম্মতিতে তারা এভাবে বললে বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যাবে। ঈজাব-কবুলের আগে একটি খুৎবা আরবীতে দেওয়া মুস্তাহাব। ঈজাব-কবুল কনের ওখানে হোক কিংবা বরের ওখানে হোক, এক জায়গায় একবারই বলতে হবে। তিনবার বলা আবশ্যক নয়।

ঈজাব-কবুলের বাক্য নীতিগতভাবে যাই থাক আমাদের সমাজে প্রচলিত রীতি তার ধারেকাছেও নেই। তাদের ভাষা না অতীতকালবাচক, না আদেশবাচক। তারা সাধারণত মেয়ের কাছে প্রথমে একবার ঈজাব-কবুল করে, পরে ছেলের কাছে দ্বিতীয়বার ঈজাব-কবুল করে। উভয় জায়গায় ঈজাব-কবুলের বাক্য তিনবার উচ্চারণ করা হয়। এর কম হ’লে তাদের দৃষ্টিতে বিবাহ হয় কিনা সন্দেহ। তাদের উকীল সাক্ষীদের দলবল সাথে করে মেয়ের নিকট যায়। সেখানে মেয়ে পক্ষের অনেক মহিলা উপস্থিত থাকে। তারা মেয়েকে সাহস যোগায় এবং তার মুখ দিয়ে শুধু ‘কবুল’ শব্দ উচ্চারণের অনুরোধ জানাতে থাকে। উকীল ছাহেব মাওলানার শেখানো ভাষা কনের সামনে আওড়ায়। সে বলে, অমুক গ্রাম অথবা শহর নিবাসী অমুকের ছেলে অমুক এত টাকা দেনমহর এওয়াজে যার এত টাকা নগদ, এত টাকা বাকি অথবা পুরোটাই বাকিতে আপনাকে বিবাহের প্রস্তাব করছে। আপনি এ শর্তে রাজি থাকলে বলুন কবুল। মেয়ে বলে ‘কবুল’। তখন উকীল আগত সাক্ষীদের বলে, আপনারা শুনেছেন তো? তারা বলে, হ্যাঁ। আর যদি না শুনে থাকে তবে বলে, না। তখন সে কনেকে জোরে কবুল বলতে বলে। এভাবে তিনবার সে উক্ত কথা বলে এবং সাক্ষীরা শুনেছে কি-না তা জানতে চায়। সাক্ষীদের পরিচয় কিন্তু সে কনের কাছে তুলে ধরে না। অবশ্য নীতিগতভাবে তার কোন প্রয়োজনও নেই। কেননা এ অনুমতি নেওয়ার দায়িত্ব মেয়ের ওলীর এবং একমাত্র মেয়ের ওলীর। এখান থেকে সাক্ষীদের দলবলসহ উকীল ছাহেব বরের মজলিসে এসে সালাম দিয়ে বলে, হ্যাঁ, মেয়ে কবুল বলেছে। তখন মাওলানা বা অন্য কেঊ সাক্ষীদের জিজ্ঞেস করে, মেয়ে কবুল বলেছে কি-না? তারা বলে, হ্যঁা। আসলেও তারা মেয়ের থেকে কবুল না বলিয়ে আসে না।

এবার মাওলানা ছাহেব উকীলকে বলতে বলেন, অমুক গ্রাম অথবা শহর নিবাসী অমুক তার মেয়ে অমুককে এত টাকা দেনমহর এওয়াজে যার এত টাকা নগদ, এত টাকা বাকি অথবা পুরোটাই বাকিতে আপনার সাথে বিবাহ দিতে রাযী বা সম্মত। আপনি এ শর্তে রাযী থাকলে বলুন কবুল। ছেলে বলে ‘কবুল’। তখন উকীল আগত সাক্ষীদের বলে, আপনারা শুনেছেন তো? তারা বলে, হ্যাঁ। এখানেও মাওলানার মাধ্যমে উকীল একই কথা তিনবার বলে। তারপর মাওলানা বসে বসে আরবীতে একটি খুৎবা পড়েন। তারপর সমবেত কণ্ঠে দরূদ ও দো‘আ-মুনাজাতের মাধ্যমে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন। সবশেষে বরকে বলা হয়, দাঁড়িয়ে সবাইকে সালাম দাও। সে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। এ সময় বর পক্ষের আনা মিষ্টি-খেজুর ইত্যাদি বিতরণ করা হয়। এভাবে সম্পাদিত বিবাহ য পদ্ধতিগতভাবে সঠিক নয়।

ঈজাব-কবুলের সাথে মোহরের উল্লেখ শর্ত নয়। মোহর উল্লেখ ছাড়াই বিবাহ বৈধ হয়ে যায়। তবে সে ক্ষেত্রে মোহরে মিছাল বা মেয়ের বংশে তার সদৃশ একজন মেয়ের যে মোহর সেই পরিমাণ মোহর সে স্বামীর থেকে পাবে।

বিবাহে মাওলানার ভূমিকা : সাধারণত মসজিদের ইমাম বিবাহ পড়ানোর দায়িত্ব পালন করেন। তাকে প্রচলিত কথায় মাওলানা বলে। নীতিগতভাবে বিবাহে মাওলানার কোনই ভূমিকা নেই। কুরআন, হাদীছ ও ফিক্বাহের কোন স্থানেই বিবাহে মাওলানার আবশ্যকতা উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিবাহে খুৎবা পড়া মুস্তাহাব। খুৎবা পড়া হয় আরবীতে। আমরা বাঙালিরা সচরাচর আরবী জানি না। তাই আরবী জানা লোক হিসাবে খুৎবা দেওয়ার জন্য নীতিগতভাবে একজন মাওলানা থাকতে পারেন। কিন্তু আমাদের সমাজে মাওলানা থাকার কারণ অন্যত্র। এখানে বিবাহ পড়ান বলে একটা কথা আছে। এই বিবাহ পড়িয়ে থাকেন মাওলানা। তিনিই পুরো অনুষ্ঠান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিচালনা করেন। উকীল-সাক্ষীর নিয়োগ কার্যকর করা, আনুষ্ঠানিকতার শুরুতে উকীল কনের কাছে গিয়ে কী বলবে তা শিখিয়ে দেওয়া, বরের কাছে এসে উকীল কী বলবে তা বলে দেওয়া এবং শেষে খুৎবা দিয়ে দো‘আ-দরূদের মাধ্যমে বিবাহের শেষ নামানো পর্যন্ত মাওলানা কাজ করে থাকেন। এর নাম বিবাহ পড়ানো। কাজেই রীতি অনুসারে মাওলানা ছাড়া বিবাহের কথা ভাবা যায় না। কাবিননামা লেখার কাযীও যেহেতু মাদ্রাসা পড়ুয়া তাই তারাও অনেক সময় মাওলানার কাজ করেন। খুৎবা যে ঈজাব-কবুলের আগে দিতে হয় তা মনে হয় আমাদের জানা নেই, অথবা সমাজের রসম হিসাবে আমরা পরে দিতে অভ্যস্ত।

ম্যারেজ রেজিস্ট্রার ও নিকাহনামা : যিনি বিবাহের তথ্য নিকাহনামায় লিপিবদ্ধ করেন তাকে ম্যারেজ রেজিস্ট্রার বা বিবাহ নিবন্ধক বলে। আর যে ফরমে তিনি বিবাহের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন তাকে নিকাহনামা বলে। কিন্তু প্রচলিত ভাষায় নিবন্ধককে কাযী এবং তার লেখা ফরমকে কাবিননামা বলা হয়। বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী ১৯৬১ সাল থেকে নিকাহনামার প্রচলন হয়েছে। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে প্রতি ইউপিতে এবং শহরাঞ্চলে প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে মুসলিম ম্যারেজ রেজিস্ট্রার বা কাযী নিযুক্ত আছেন। তাদের মূল কাজ বিবাহের মজলিসে উপস্থিত থেকে নিকাহনামা লিপিবদ্ধ করা এবং প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর গ্রহণ করা। পরে সীল-স্বাক্ষরসহ নিকাহনামার কপি মেয়ে অথবা ছেলের অভিভাবককে প্রদান করা।

নিকাহনামা একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। বিবাহ নিয়ে উদ্ভূত মামলা-মোকদ্দমা নিরসন এবং দেশে-বিদেশে স্বামী-স্ত্রী প্রমাণে নিকাহনামার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি একটি লিখিত দলীল বিধায় স্বামী স্ত্রীর যে কোন জনের মৃত্যুতে অন্যজন এটি দেখিয়ে মীরাছ দাবী করতে পারে। সন্তানের পিতৃত্ব মাতৃত্ব প্রমাণেও নিকাহনামার ভূমিকা স্বীকৃত।

কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত নিকাহনামায় বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। যেমন ১. পুরো নিকাহনামায় ওলীর কোন উল্লেখ নেই। অথচ শরী‘আতে কনের ওলীর সম্মতি ছাড়া বিয়ে বৈধ নয়। তাই এ নিকাহনামায় ৪নং ধারার পরে অথবা সুবিধাজনক যে কোন জায়গায় কনের ওলী বা অভিভাবকের নাম ও ঠিকানা সংযোজন অত্যন্ত যরূরী। ২. নিকাহনামায় দৃষ্টিকটূভাবে উকীলের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং সেই উকীল কন্যা কর্তৃক নিয়োগের কথা বলা আছে। যদিও বিবাহের মজলিসে কোন কনে নিজ উদ্যোগে তার বিবাহের উকীল নিয়োগ দিয়েছে বলে জানা যায় না। আর কনে যদি নিজে উকীল নিয়োগ দিয়েই থাকে তবে তার ওখানে পুনরায় ঈজাব-কবুলের মানে কী?

হানাফী মাযহাব মতে যদিও কনে স্বেচ্ছায় ওলীর অনুমতি ছাড়া বিবাহ করতে পারে কিন্তু সে বিবাহ ওলীর অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং কনে নয় বরং কনের ওলী প্রয়োজনবোধে উকীল নিয়োগ দেবে। ওলী ছাড়া বিয়ে শুদ্ধই হয় না। তাই এ নিকাহনামার ৭নং ধারায় এরূপ সংশোধনী কাম্য। উল্লেখ্য, বর বিবাহের মজলিসে স্বয়ং উপস্থিত থাকলে তার উকীল নিয়োগ আবশ্যক নয়। বর উকীল নিয়োগ না দিলে তার উকীল ও সাক্ষী নিয়োগের অনুচ্ছেদ অবশ্যই ফাঁকা থাকবে। সেখানে ম্যারেজ রেজিস্ট্রার কোন নাম-ঠিকানা নিজ থেকে লিখলে তা আমানতের খিয়ানত হবে। অনেকে বিবাহের সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা বরের সাক্ষীর ঘরে লিখে দেয়। নিকাহনামার ১১নং ধারায় বিবাহের সাক্ষীদের নাম ঠিকানার জন্য দু’জন সাক্ষীর ক্রমিক উল্লেখ রয়েছে। সাক্ষী দু’জন পুরুষ হ’লে তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু শরী‘আত তো বিবাহে দু’জন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলা সাক্ষীর অনুমোদন দিয়েছে। কাজেই কোন বিবাহে মহিলাদের সাক্ষী মানলে তৃতীয় ক্রমিকের আবশ্যক হবে, যার সুযোগ নিকাহনামায় নেই। সরকার নারী দরদী নারী বান্ধব বলে কথার খৈ ফুটালেও বিবাহের সাক্ষীতে নারীদের সুযোগের বেলায় বলতে গেলে উদাসীন। নারীরাও হয়তো তাদের জন্য শরী‘আত প্রদত্ত এ সুযোগের কথা জানে না।

নিকাহ নামায় ১৩, ১৪, ১৫, ১৬ ও ২০নং ধারায় মোহর এর স্থলে দেনমোহরের উল্লেখ আছে। আমাদের প্রশ্ন ‘দেনমোহর’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে। এটা কি শারঈ কোন পরিভাষা, নাকি নিকাহনামা প্রস্ত্ততকারকদের মনোক্তি? আরবী মাহর বা মাহরুন শব্দকে বাংলায় মোহর উচ্চারণ করা হয়, যার অর্থ বিয়েতে কনেকে প্রদত্ত হাদিয়া। ঘোড়া, গাধার প্রথম বাচ্চাকে আরবীতে মোহর বলে। কুরআনে মোহর-এর স্থলে ‘আজর’, ‘উজুর’ ‘ছদুক্বাত’ শব্দ এসেছে। হাদীছে ‘মাহর’ ও ‘ছদাক বা ছিদাক’ বর্ণিত হয়েছে। ফিক্বাহ শাস্ত্রে ‘মাহর’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। মাহরকে মোহর উচ্চারণে কিছু যায় আসে না। কিন্তু মোহরের আগে ‘দেন’ এল কোত্থেকে তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। আমার যতদূর মনে হয় আরবী ‘দাইনুন’ বা দাইন শব্দ থেকে ‘দেন’ শব্দ এসেছে। দাইন অর্থ ঋণ, কর্য, দেনা। এই দাইন অপভ্রংশ বা বিকৃত উচ্চারণে ‘দেন’ হয়ে মোহরের আগে যুক্ত হয়েছে। কেন যুক্ত হ’ল তার কারণ হিসাবে বলা যায়, বিবাহে মোহর বাকি থাকাই এদেশে রেওয়াজ। বাকিও আরবী দাইন বা দেনার সমার্থক শব্দ। যেহেতু মোহর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এ সমাজের মানুষ মনে করে না তাই তারা মোহরের আগে ‘দেন’ শব্দ যোগ করে ‘দেনমোহর’ বানিয়ে নিয়েছে; যাতে মোহর বাকী রাখা যায়। যে করেই হোক, মোহরের আগে যে শব্দ কুরআন, হাদীছ ও ফিক্বহে নেই সেই শব্দ একটি রাষ্ট্রীয় ফরমে কী করে যোগ হ’ল? এটা কি আমাদের দ্বীন ও আরবী ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচয় বহন করে না? আমি বিশ্বাস করি, দেশে যথেষ্ট জ্ঞানী-গুণী মানুষ আছেন। তারা আমার কথা সঠিক কি-না তা যাচাই করে ‘দেন’ শব্দ বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিবেন। যারা বিবাহের মজলিসে মোহর পরিশোধ করেন তাদের তো আর মোহর বাকী থাকে না। অথচ ছাপানো ফরমে দেনমোহর লেখা থাকার কারণে নগদে পরিশোধের পরও তাদের মোহর ফরমের দৃষ্টিতে বাকী থেকে যায়। তাই ভুলভাল ফরম থেকে শুদ্ধ ফরম নিশ্চয়ই কাম্য। উল্লেখ্য, মোহর না দেওয়ার ইচ্ছায় বিবাহ করলে হাদীছে তা মারাত্মক গুনাহের কারণ বলা হয়েছে। কাজেই বরকে বিবাহের সময় অথবা পরবর্তীতে অবশ্যই মোহর পরিশোধ করতে হবে।

নিকাহনামার ১৮ ও ১৯নং ধারায় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে কি-না এবং তাতে স্বামীর তালাক প্রদানের ক্ষমতা খর্ব হয়েছে কি-না তার উল্লেখ আছে। এ দু’টি ধারায় বিশেষত ১৮নং ধারায় প্রয়োজনে স্ত্রীকে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য তালাকের অধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোন সে তালাক, স্ত্রী তা কীভাবে প্রয়োগ করবে, তাতে স্বামীর তালাক প্রদানের ক্ষমতা কিভাবে খর্ব হয়নি তার কোন ব্যাখ্যা নেই। হয়তো মূল আইনে তা আছে। কিন্তু বিয়ের মজলিসে কোন ম্যারেজ রেজিস্ট্রারকে এ দু’টি ধারার ব্যাখ্যা করতে কোনদিন শুনিনি। সবার মুখে মুখে চালু আছে, ঐ ধারায় স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। কিন্তু কি সে তালাক, কত তালাক, স্ত্রী স্বামীকে তালাক দেবে, নাকি স্ত্রী নিজের উপর নিজে তালাক দেবে, তার কোন কথা সেখানে নেই। স্ত্রী জানে না সে ঐ ধারা অনুসারে কত তালাকের মালিক হয়েছে, আবার স্বামীও জানে না সে কত তালাকের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু দেখা যায় নিকাহনামা অনুসারে স্ত্রী যখন তালাক কার্যকর করে তখন তিন তালাকই কার্যকর করে। স্ত্রী তিন তালাক দিয়ে দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটাল অথচ স্বামীর তালাকের অধিকার খর্ব হ’ল না, এর থেকে পাগলামি আর কিছু আছে কি? যদি স্বামীর অর্পিত ক্ষমতা যে কোন সময় প্রত্যাহারের অধিকার থাকত কিংবা এক অথবা দুই তালাকের অধিকার দেওয়া হ’ত তাহ’লেও স্বামীর তালাকের ক্ষমতা খর্ব হয়নি বলে কিছুটা দাবী করা যেত। কিন্তু তালাকের নাটাই স্ত্রীর হাতে দিয়ে স্বামীর অধিকার খর্ব হয়নি বলা প্রহসন বৈ কিছু নয়।

সবচেয়ে বড় কথা, ইসলাম এক সাথে তিন তালাক দেওয়ার কথা বলে না। বিবাহ বিচেছদের জন্য তিন তোহরে তিন তালাক দিতে হয়। কাজেই স্বামীর তালাকের ক্ষমতা যাতে পুরো মাত্রায় খর্ব না হয় সেজন্য ‘তাফবীয’ তালাকের একটা সীমা নিকাহনামায় উল্লেখ থাকা উচিত। আর তা কোনক্রমেই এক থেকে দুইয়ের অধিক হবে না। তাতে স্ত্রী তালাক নিলেও পরবর্তীতে সমঝোতার দ্বার খোলা থাকবে এবং উভয় পক্ষ চাইলে অন্যত্র বিবাহের ঝুঁকি ছাড়াই পুনরায় দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। আবার তাতে খোলার অনুমতিও পরিষ্কার করে লিখে রাখা যায়। স্ত্রী খোলার আবেদন করলে স্বামী তা দিতে সম্মত থাকবে -মর্মে লেখা থাকলে স্ত্রী স্বামীকে জানিয়ে খোলা করতে পারবে। তাতে পরবর্তীতে নতুন করে বিবাহ করা যায়।

২৩নং ধারায় যে ব্যক্তির দ্বারা বিবাহ পড়ানো হয়েছে তার নাম, পিতার নাম ইত্যাদি চাওয়া হয়েছে। বিবাহে বর, কনে, ওলী, সাক্ষী ও উকীল (যদি নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে) এই পাঁচ প্রকার লোকের প্রয়োজন শরী‘আতে উল্লেখ আছে। কে বিবাহ পড়াল তা উল্লেখ থাকার প্রয়োজন নেই। অথচ নিকাহনামায় ওলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে অস্বীকার করে অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিকে উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় করে তোলা হয়েছে। এতে দেশের অধিকাংশ মুসলিম নারী-পুরুষ নিজেরা বিবাহের ভাষা জানে না, বিবাহের আক্বদ ও চুক্তি করতে কী করতে হয় বা বলতে হয় তা জানে না। সব জানেন ঐ বিবাহ পড়ানো ব্যক্তি। তিনি যা বলতে বলবেন তাই বলবে উকীল, তাই বলবে কনে, তাই বলবে বর। বিবাহের অনুষ্ঠানের আগ-পর, সংসার জীবন ইত্যাদি সবকিছুই তারা জানে, সবকিছুই করতে পারে; জানে না ও পারে না শুধু বিবাহের চুক্তি করতে। কারণ সেজন্য সমাজে ‘বিবাহ পড়ানো ব্যক্তি’ নামের নির্দিষ্ট লোক আছে। কবি ফররুখ আহমদের ছড়ার একটি পংক্তি আছে, ‘কালো ঘোড়া এলো যেই খোঁড়া হ’ল সকলেই’।

বিবাহে কনের অনুমতি গ্রহণ : বিবাহে কনের অনুমতি গ্রহণ অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। অনুমতি গ্রহণ করবেন ওলী অথবা তার নিযুক্ত প্রতিনিধি। প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে কুমারী হোক কিংবা অকুমারী, তার অনুমতি গ্রহণ ছাড়া ওলী তাকে বিবাহ দিলে সে বিবাহ মেয়ের উপর নির্ভর করবে। সে বিবাহ প্রত্যাখ্যান না করলে বিবাহ বলবৎ থাকবে, আর প্রত্যাখ্যান করলে বিবাহ ভেঙ্গে যাবে। কাজেই অনুমতি নিয়ে তবেই ওলী তার বিবাহের আয়োজন করবে।

প্রশ্ন হচ্ছে- অনুমতি গ্রহণের সময়টা কখন? বিবাহের সমস্ত আয়োজন শেষ করে ঈজাব-কবুলের সময়? নাকি আলোচ্য বরের সাথে বিবাহের আলোচনার শুরুতে? অনুমতি গ্রহণের নিয়মটাই বা কি? এ সকল কথা আগে জানতে হবে। ধার্মিকতা, তাক্বওয়া, আদব-আখলাক বা আচার-ব্যবহার, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আর্থিক অবস্থা, ভাই-বোনের সংখ্যা, দেহ সৌষ্ঠব, বয়স, বংশ মর্যাদা ইত্যাদি বিষয়ে মেয়ের সঙ্গে ছেলের কুফূ বা সামঞ্জস্য আছে কি-না সেসব কথা জানিয়ে তার মতামত নেওয়ার নাম অনুমতি বা এযেন। এ অনুমতি নিশ্চয়ই বিবাহের সূচনা লগ্নে নেওয়া সমীচীন। আগে অনুমতি নেওয়া হ’ল না, বিবাহের সব আয়োজন করে আকদের মজলিসে অনুমতি নেওয়ার সময় মেয়ে অস্বীকার করলে তখন কি সকলের মাথায় বাড়ি পড়বে না? এমন পরিস্থিতিতে পিতা -মাতার সব আয়োজন পন্ড হবে। বর পক্ষসহ উপস্থিত আত্মীয় -বন্ধু, প্রতিবেশীরা অপমানিত হবেন। যা কেউ সহজে মেনে নেবে না। কাজেই নিয়মতান্ত্রিক অনুমতি আগেই নিতে হবে।

ছেলে দেখা : অনানুষ্ঠানিকভাবে ছেলেকে মেয়ের অভিভাবক অবশ্যই দেখবে। সম্ভব হ’লে মেয়েও ছেলেকে দেখবে। তার ও ছেলের মধ্যে বিবাহ করার মতো কোন আকর্ষণীয় গুণের দেখা মিলতে পারে। অভিভাবককে তো তার মেয়ের স্বার্থেই ছেলেকে দেখতে হবে, জানতে হবে এবং সেখানে মেয়ে বিবাহ দেওয়া যাবে কি-না তার তত্ত্ব তালাশ করতে হবে। তবে প্রাধান্য দিতে হবে দ্বীনদারীকে। হাদীছে এসেছে, إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلاَّ تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الأَرْضِ وَفَسَاد عَرِيض ‘যখন তোমাদের নিকট এমন কেউ মেয়ের বিবাহের পয়গাম দেবে যাদের দ্বীনদারী ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট তাদের সাথে তোমরা বিবাহ দাও। নচেৎ ধরা বক্ষে ফেতনা ও বড় অশান্তি দেখা দেবে’।[2] সব রকম খোঁজ-খবর নিলেই না তিনি মেয়ের সাথে আলোচনা করে তার মতামত ও অনুমতি নিতে পারবেন। ছেলেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে দেখায় মেয়ের মতো সমস্যা রয়েছে। উভয় পক্ষ বিবাহে সম্মত হ’লে বিবাহের দিন-ক্ষণ ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি আলোচনার জন্য তারা আনুষ্ঠানিকভাবে একত্রিত হ’তে পারে।

কনে দেখা : যে মেয়ের সাথে বিবাহের কথা হচ্ছে নীতিগত ভাবে হাদীছে তাকে দেখার কথা বলা হয়েছে। জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,إِذَاخَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ، فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ، قَالَ: فَخَطَبْتُ جَارِيَةً فَكُنْتُ أَتَخَبَّأُ لَهَا حَتَّى رَأَيْتُ مِنْهَا مَا دَعَانِي إِلَى نِكَاحِهَا وَتَزَوُّجِهَا فَتَزَوَّجْتُهَا- ‘যখন তোমাদের কেউ কোন মহিলাকে বিবাহের পয়গাম দেয় তখন তার মধ্যে বিবাহ করার মতো আকর্ষণীয় কোন দিক দেখা সম্ভব হ’লে সে যেন তা দেখে নেয়। তিনি বলেন, আমি এক তরুণীকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সেজন্য আমি তাকে দেখার সুযোগ খুঁজছিলাম। এক পর্যায়ে আমি তাকে দেখতে পাই এবং তার মাঝে আকর্ষণীয় এমন কিছু পাই, যা তাকে বিবাহ করতে আমায় উদ্বুদ্ধ করে। শেষ পর্যন্ত আমি তাকে বিবাহ করি’।[3]

কনে দেখার জন্য আনুষ্ঠানিকতা যরূরী নয়। বাড়িতে, হোটেল-রেস্টুরেন্টে, পথ চলতে বা যে কোন স্থানে দেখার পর্ব সারা যাবে। ছেলে ও মেয়ের নির্জনে মিলিত হওয়া ব্যতিরেকে উভয় পক্ষের সম্মতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কনের পিতা, মাতা কিংবা ভাইয়ের উপস্থিতিতে কনেকে দেখাও জায়েয। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতার সাথে এমন অনেক রীতি জড়িয়ে গেছে যা নীতিগতভাবে মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। সেগুলো বাদ দিলে এভাবে দেখাতে দোষ হবে না। কনে দেখার মূল উদ্দেশ্য বিবাহ করা। হয়তো ছেলে মেয়ের মধ্যে এমন কোন আকর্ষণীয় গুণ দেখতে পাবে যা তাকে বিবাহে উদ্বুদ্ধ করবে। আবার অপসন্দের বিষয় দেখে পিছিয়েও আসতে পারে। মেয়ের দেখবে শুধু চেহারা, দু’হাতের তালুর উপর নীচ এবং দু’পা। মেয়েকে ছেলে নিজে দেখতে পারে, আবার চাইলে নিজের মা, বোন, আত্মীয়া অথবা নির্ভরযোগ্য কোন মহিলা দেখে তার গুণাবলী তাকে জানাতে পারে। এভাবে সে রাযী কি-না প্রকাশ করতে পারে। 

তবে দিনক্ষণ ঠিক করে আনুষ্ঠানিক রীতিতে মেয়ে দেখায় অনেক সমস্যা আছে। এখানে ছেলের সাথে এমন অনেক পুরুষ লোক মেয়েকে দেখতে যায় যা বৈধ নয়। অপরদিকে বিবাহের আশায় কনে পক্ষ আগত লোকদের যথাসাধ্য ব্যয়বহুল মেহমানদারী করতে বাধ্য হন। আনুষ্ঠানিকতার ফলে বিষয়টি আশে পাশে জানাজানি হয়ে যায়। ফলে বিবাহ না হ’লে মেয়েকে এবং তার পরিবারকে খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হ’তে হয়। কোন মুসলিমকে কষ্ট না দিয়ে ও বিব্রত না করে নীতিগতভাবে দেখলে কোনই অসুবিধা নেই। সুতরাং অনানুষ্ঠানিকভাবে দেখাই শ্রেয়।

এনগেজমেন্ট ও আংটি পরানো : এনগেজমেন্ট ও আংটি পরানো একটি দেশীয় রীতি। বিবাহে উভয় পক্ষের সম্মতি ও অঙ্গীকারের নাম এনগেজমেন্ট। তার স্মারক হিসাবে আংটি পরানোর রেওয়াজ রয়েছে। এটি শারঈ কোন নীতিমালাভুক্ত বিষয় নয়। সামনে বিবাহের শুভেচ্ছা স্মারক হিসাবে সাধারণত বর ও কনেকে এটি দেওয়া হয়। আগের যুগে এটি ছিল না। ইদানীং চালু হয়েছে। তবে কোন কারণে বিবাহ না হ’লে আংটি ইত্যাদি ফেরৎ দিতে হবে। উল্লেখ্য, পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার হারাম। সেকারণ বরকে স্বর্ণের আংটি দেওয়া যাবে না।

বরযাত্রী : বিবাহে বরযাত্রী আবহমানকাল থেকে চলে আসা একটি সামাজিক রীতি। কনে পক্ষের অভিভাবকগণও এ সামাজিক রীতিতে অভ্যস্ত। তারা তাই দরকষাকষি করে একটা সংখ্যায় সম্মত হয়। কনে পাত্রস্থ করার তাকীদে এবং সামাজিক রেওয়াজের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো মানসিক হিম্মত ও সাহস না থাকায় তারা বরযাত্রীদের মেনে নেয়। আবার ছেলের সাথে আপনজন, আত্মীয়, প্রতিবেশী, ছেলের বন্ধুবান্ধব প্রমুখকে বিবাহের বরযাত্রী না করলে বর পক্ষেরও পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হয়। ফলে তারাও বাধ্য হয়ে নানাজনকে বরযাত্রী করে। আর এভাবে বরযাত্রীর বহর লম্বা হয়ে যায়। তারপরও অনেকে দাওয়াত না পেয়ে নাখোশ হন। তবে বরের সাথে বিবাহে কেউই যাবে না ইসলাম সে কথাও বলে না। ইসলাম ঘোষণা দিয়ে বিবাহ করতে বলে। দু’দশ জন ন্যূনপক্ষে যা না হ’লেই না, কেবল তারা যাবে। সংখ্যাটা কনে পক্ষকে জানিয়ে তাদের সম্মতি নিতে হবে। যদি কনে পক্ষ আমভাবে সকলকে আপ্যায়ন করতে চায় তাহ’লে অবশ্য সংখ্যা জানানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু উভয় পক্ষ একটি সংখ্যায় সম্মত হ’লে সেই সংখ্যাই যেতে হবে। বেশী হ’লে কনে পক্ষের অনুমতি নিতে হবে।

একবার এক ছাহাবী রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সহ পাঁচ জনকে দাওয়াত করেন। পরে একজন ছাহাবী আসেন এবং তাঁর সাথে যান। মেযবানের বাড়ি গিয়ে তিনি আগে অতিরিক্ত আগন্তুকের কথা জানান এবং বলেন, এ আমাদের অনুগামী হয়েছে। তুমি চাইলে তাকে অনুমতি দিতে পার, আর না চাইলে তাকে বাদ দিতে পার, সে ফিরে যাবে। তিনি অবশ্য তাকে অনুমতি দিয়েছিলেন।[4] বিনা দাওয়াতে খাওয়া ভদ্রতার পরিপন্থী। আরবরা এ ধরনের লোককে ‘তুফায়লী’ বলে। বাংলায় ‘রবাহূত’ ও ‘অনাহূত’।

শরী‘আতের নীতি হ’ল কারও সম্মতি নিয়ে মেহমান হওয়া। আর মেযবান যার বা যাদের আতিথ্য দিতে সম্মত হবে তাদের সাধ্যমতো সম্মানজনক আতিথ্য দেওয়া। হাদীছে এসেছে, যে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। ব্যবসায়ের নিয়মে পারস্পরিক সম্মতিতে একে অপরের সম্পদ খেতে আল্লাহ তা‘আলা আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু বিবাহে বরযাত্রীদের নিতে না চাইলে কনে পক্ষকে বরযাত্রীর জন্য চাপাচাপি করা উচিত হবে না। সমাজে বহু মানুষের বরযাত্রীর খরচ নির্বাহের সামর্থ্য নেই। একজনের ব্যতিক্রমী আচরণ অন্যদের উপর প্রভাব ফেলে। এতে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। এজন্য কাউকে অনুমতি দেওয়া ঠিক নয়। ইসলামের সহজ বিবাহ পদ্ধতি আজ বরযাত্রী, যৌতুক, ব্যবহার্য দ্রব্য প্রদান, ভোজ উৎসব, উপহার বিনিময় ইত্যাদি নানা কারণে কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

বিবাহের দিনের আয়োজন : বিবাহে বাড়তি মুবাহ আনন্দ নীতিগতভাবে সিদ্ধ। মেয়ে পক্ষের কিছু লোক ছেলের বাড়িতে এবং ছেলে পক্ষের কিছু লোক মেয়ের বাড়িতে যাওয়া, আত্মীয়তা-মেহমানদারী করা নিয়ে কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। এগুলো ছিলায়ে রাহেমি বা আত্মীয়তার বিধানভুক্ত। কিন্তু আমাদের দেশে কেউ কেউ বিবাহ উপলক্ষ্যে বাড়াবাড়ি করে থাকে। বাড়ি কিংবা কমিউনিটি সেন্টার, যেখানেই বিবাহের আয়োজন করা হোক সেখানে পর্দা রক্ষার্থে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা বসার ব্যবস্থা করা কর্তব্য। বিবাহে আলোকসজ্জা বর্তমানে ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এটি অপচয়। এসব পরিহার করতে হবে। অপচয় কবীরা গুনাহ এবং শয়তানী কাজ। পুরো অনুষ্ঠানে বরং এটি লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়। মহিলা মহলে বিবাহে যে সাজ-গোজের প্রদর্শনী চলে তাতে পর্দার খেলাফ হরহামেশাই হয়। নীতির বরখেলাফ করে রীতি পালন কোনভাবেই কাম্য নয়। ধনী-গরীব সকল শ্রেণীর লোককে দাওয়াত দেওয়া ও আপ্যায়ন করা শারঈ নিরীখে কর্তব্য। যে যিয়াফত-মেযবানিতে শুধু ধনীদের ডাকা হয়, গরীবদের দাওয়াত দেওয়া হয় না তা বরকতশূন্য।

বিবাহের আকদ বা অনুষ্ঠান : বিবাহে আক্দ বা চুক্তিই মুখ্য। কাজেই বিবাহের অনুষ্ঠান যেন কোনক্রমেই গৌণ হয়ে না পড়ে সেদিকটা উভয় পক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে। বর পক্ষ আসার পর সৌজন্য হিসাবেই নাশতা-পানি দিতে হয়। নাশতা শেষে ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে উপস্থিত সবাই মিলে সুন্দরভাবে বিবাহের আক্দ সম্পন্ন করবে। শারঈ বিধিবিধান যা বর্ণিত হয়েছে তা মানায় যাতে কোন ত্রুটি না হয় সেটা খেয়াল রাখতে হবে। যেহেতু সরকারি আইন অনুসারে নিকাহনামা বা কাবিননামা লেখার বিধান রয়েছে সেহেতু স্থানীয় কাযীকে সময়মতো উপস্থিত থাকতে বলতে হবে। বর পক্ষ হাযির হওয়ার পর তাদের সাথে ওলী, উকীল, সাক্ষী ও মোহর সম্পর্কে আলোচনা করবে। সামাজিক রীতি অনুসারে বর পক্ষের দেয় বৈধ আনুষঙ্গিক খরচ যদি কিছু থাকে সেটাও স্থির করবে, যাতে পরে এ নিয়ে দু’পক্ষের মতান্তর থেকে মনান্তর না ঘটে। এরপর বিবাহের মূল পর্ব তথা ঈজাব-কবুলের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমে বিয়ের খুৎবা পড়তে হবে। ওলী, উকীল, বর, মাওলানা, কাযী যে-ই চান খুৎবা পড়তে পারবেন। খুৎবা শেষ হ’লে দু’পক্ষ পূর্বে ঈজাব-কবুলের যে নীতি বর্ণিত হয়েছে তার কোন একটির মাধ্যমে ঈজাব কবুল করে বিবাহ সম্পন্ন করবেন।

অতঃপর কাযী নিকাহনামার পূরণীয় সকল অংশ বর্ণিত নিয়মে যথাসাধ্য পূরণ করবেন এবং প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর গ্রহণ করবেন। সরকারি ফরম তিনি তো আর নিজের ইচ্ছামতো সংযোজন-বিয়োজন করতে পারবেন না। তবে ১৮ ধারায় তিনি অবশ্যই দু’পক্ষকে জানিয়ে ‘তাফবীয’ তালাক অথবা ‘খোলা’ তালাকের কথা এবং এক তালাকের সংখ্যা স্পষ্ট করে লিখবেন। সাধারণভাবে তালাকের ক্ষমতা দিয়েছে কিংবা হাঁ দিয়েছে জাতীয় অস্পষ্ট ভাষা লিখবেন না।

[ক্রমশঃ]

[1]. আবু দাউদ হা/২০৮৫; তিরমিযী হা/১১০১; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৫৫৫।

[2]. তিরমিযী হা/১০৮৪; ইবনু মাজাহ হা/১৯৬৭; ছহীহাহ হা/১০২২; ইরওয়া হা/১৮৬৮।

[3]. আবুদাউদ হা/২০৮২।

[4]. বুখারী হা/৫৪৩৪, ২০৮১; মিশকাত হা/৩২১৯।






বিষয়সমূহ: বিবাহ ও তালাক
খেয়াল-খুশির অনুসরণ (২য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে কতিপয় ভ্রান্ত আক্বীদা (৩য় কিস্তি) - হাফেয আব্দুল মতীন - পিএইচ.ডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
মানবাধিকার ও ইসলাম (৩য় কিস্তি) - শামসুল আলম
ওশর : দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার - ড. মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম
ছাদাক্বাতুল ফিতরের বিধান - লিলবর আল-বারাদী - যশপুর, তানোর, রাজশাহী
মানবাধিকার ও ইসলাম (৪র্থ কিস্তি) - শামসুল আলম
প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের শিষ্টাচার - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
নেতৃত্বের মোহ (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
মাসায়েলে কুরবানী - আত-তাহরীক ডেস্ক
যাকাত সম্পর্কিত বিবিধ মাসায়েল - মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম মাদানী
নববী চিকিৎসা পদ্ধতি (৫ম কিস্তি) - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
অল্পে তুষ্টি (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
আরও
আরও
.