ভূমিকা : মানব ইতিহাসের সূচনাকাল থেকেই কুরবানী আত্মত্যাগের এক মহান প্রতীক হিসাবে স্বীকৃত। কুরবানী কেবল পশু যবেহ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ কোন আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়। বরং এটি গভীর আধ্যাত্মিক অনুশীলন যা মানুষকে তাক্বওয়া, ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়। আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের কুরবানীর ঘটনা থেকে শুরু করে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের সামনে কুরবানীর প্রকৃত তাৎপর্য তুলে ধরে। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সত্য ও ন্যায়ের পথে নিজের প্রিয় বস্ত্তকে কুরবানী করার এই অব্যাহত ধারা পরবর্তীকালে অন্যান্য নবীদের যুগ অতিক্রম করে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর যুগে এসে পূর্ণতা লাভ করে। যা আজও মুসলিম উম্মাহর জীবন বিধান এবং মানুষের পশু প্রবৃত্তিকে দমন করে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করার নিরন্তর সংগ্রাম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। মহান আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন,وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ- ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমরা কুরবানীর বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা যবহ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে এজন্য যে, তিনি চতুষ্পদ গবাদিপশু থেকে তাদের জন্য রিযিক নির্ধারণ করেছেন’ (হজ্জ ২২/৩৪)।
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, ত্যাগের এই মহান ধারাটি সৃষ্টির শুরু থেকে প্রতিটি নবীর যুগেই ইবাদত হিসাবে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তার স্বরূপ বা পদ্ধতি কি ছিল তা আল্লাহই ভাল জানেন। পবিত্র কুরআন ও হাদীছে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নবী-রাসূলগণের যুগে কুরবানীর ঘটনা পাওয়া যায়। আলোচ্য প্রবন্ধে কুরবানীর সেই ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরা হল।
আদম (আঃ)-এর যুগ : কুরবানীর সূচনা
আমরা জানি ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম কুরবানীর সূত্রপাত ঘটে পৃথিবীর প্রথম মানব ও প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ)-এর দুই পুত্র ক্বাবীল ও হাবীলের মাধ্যমে। ক্বাবীল ছিল আদম (আঃ)-এর বড় সন্তান এবং হাবীল ছিল তার ছোট। ক্বাবীল কৃষিকাজ করত এবং হাবীল পশুপালন করত। তারা দু’জনেই আল্লাহর নামে কুরবানী করেছিল। কিন্তু কেন তারা কুরবানী করেছিল, সে স্থানটি কোথায় ছিল এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীছে ছহীহ কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। ক্বাবীল কুরবানীর জন্য তার ফসলের মধ্যে নিম্নমানের কিছু শস্য পেশ করেছিল।
কিন্তু হাবীল আল্লাহর ভালবাসায় তার পশুদের মধ্যে সর্বোত্তম দুম্বাটি কুরবানী দিল। সে যুগে নিয়ম ছিল যে, যার কুরবানী গ্রহণযোগ্য হবে আসমান থেকে আগুন এসে তার কুরবানী নিয়ে যাবে। নিয়মানুযায়ী সেদিন আগুন হাবীলের কুরবানী নিয়ে গেল কিন্তু ক্বাবীলের কুরবানী সেখানেই থেকে গেল। এই রাগে, ক্ষোভে ও হিংসায় ক্বাবীল নিজের আপন ছোট ভাই হাবীলকে হত্যা করল। এতে পৃথিবীর ইতিহাসে একদিকে হিংসাত্মক হত্যাকান্ডের প্রথম মহাপাপ সংঘটিত হল, অপরদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আত্মদানের মহান আদর্শের পরম্পরা সূচিত হ’ল।
ইব্রাহীম (আঃ)-এর যুগ : পিতা-পুত্রের ঐতিহাসিক পরীক্ষা
একবার রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হ’ল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে কারা সবচেয়ে বেশী পরীক্ষার সম্মুখীন হয়? তিনি বললেন, নবীগণ’।[1] মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দা নবী ইব্রাহীম (আঃ)-কে একের পর এক কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেছিলেন। দীর্ঘদিন নিঃসন্তান থাকার পর জীবনের পড়ন্ত বয়সে আল্লাহ তাঁকে একটি পুত্রসন্তান দান করেছিলেন। যে সন্তান ছিল তাঁর হৃদয়ের প্রশান্তি, চোখের শীতলতা। কিন্তু বেশীদিন সেই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে স্নেহ-সুখ উপভোগ করার সৌভাগ্য তাঁর হ’ল না। সন্তানের মুখে ‘বাবা’ ডাক শোনার আগেই দুগ্ধপোষ্য শিশু এবং তার মা হাজেরাকে জনমানবহীন নির্জন মরূপ্রান্তর মক্কার বিরানভূমিতে রেখে আসার নির্দেশ এল আল্লাহর পক্ষ থেকে। চারপাশে নেই কোন জনপদ, নেই পানির উৎস, নেই জীবনের কোন চিহ্ন, আছে শুধুই নিঃসঙ্গতা আর নির্জনতা। ইব্রাহীম (আঃ) ছিলেন আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল। বুকভরা কষ্ট, চোখভরা অশ্রু নিয়ে তিনি আল্লাহর আদেশ পালন করলেন। মা হাজেরা ও আদরের শিশুপুত্র ইসমাঈলকে ফিলিস্তীনের কেনান থেকে মক্কায় রেখে আসলেন।
এরই মধ্যে কেটে গেল অনেক বছর। ইব্রাহীম (আঃ) মাঝে-মধ্যে মা ও ছেলেকে দেখে আসতেন। যখন ইসমাঈল (আঃ)-এর ১৩ বা ১৪ বছরের কিশোর তখন আল্লাহ তা‘আলা ইব্রাহীম (আঃ)-কে আরেকটি কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন। ইব্রাহীম (আঃ) পরপর তিনরাত স্বপ্নে দেখলেন তিনি স্বীয় পুত্রকে যবেহ করছেন। নবীদের স্বপ্ন যে অহী তা তিনি ভালভাবেই জানতেন। তাই বিন্দুমাত্র দেরী না করে সন্তানকে মক্কা থেকে মিনা প্রান্তরে নিয়ে চললেন। এই পথে ইবলীস শয়তান তিনবার এসে তাঁকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু প্রতিবারই ইব্রাহীম (আঃ) দৃঢ়চিত্তে শয়তানকে সাতটি করে নুড়ি পাথর নিক্ষেপ করে প্রতিহত করলেন। ঈমানের দৃঢ়তা শয়তানের সব কুমন্ত্রণাকে পরাজিত করল। অবশেষে সেই হৃদয়বিদারক মুহূর্ত উপস্থিত হ’ল। মিনায় পৌঁছে পিতা তাঁর প্রিয় সন্তান ইসমাঈলকে বললেন,يَابُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى ‘হে আমার বৎস! আমি স্বপ্নে দেখছি যে, আমি তোমাকে যবহ করছি। এখন ভেবে দেখ তোমার অভিমত কি?’ ইসমাঈল (আঃ) বললেন,يَاأَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন’ (ছাফফাত ৩৭/১০২)।
কী অসীম আত্মসমর্পণ! কী অবিচল ঈমান! স্বপ্নে পাওয়া এক পরোক্ষ আদেশ পালনে পিতার যেমন ছিল নিখুঁত আনুগত্য, ঠিক তেমনি নিজের জীবনকে আল্লাহর পথে দ্বিধাহীন চিত্তে উৎসর্গ করতে পুত্রেরও ছিল অনন্য আত্মনিবেদন। বছরের পর বছর যে সন্তানের জন্য ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহর দরবারে অশ্রুসিক্ত নয়নে দো‘আ করেছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই কলিজার টুকরোকে পেয়েও পিতৃত্বের পূর্ণ স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পাননি। অথচ তাকেই নিজ হাতে যবেহ করার কঠিনতম পরীক্ষায় তিনি এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হলেন না। সেদিন ছিল ১০ই জিলহজ্জ।[2] ইব্রাহীম (আঃ) ছুরি হাতে প্রস্ত্তত হ’লেন এবং ইসমাঈল (আঃ)-কে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশ থেকে ভেসে এলো মহান আল্লাহর সেই চিরন্তন ঘোষণা, ‘হে ইব্রাহীম! অবশ্যই তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। এভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা’ (ছাফফাত ৩৭/১০৫-৬)। ইব্রাহীম (আঃ) পিছনে তাকিয়ে দেখেন একটি সাদা শিংওয়ালা দুম্বা দাঁড়িয়ে আছে।[3] পিতা-পুত্র সেই দুম্বা কুরবানী করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। এই দুম্বাটি ছিল আদম (আঃ)-এর সন্তান হাবীলের দেওয়া কুরবানী।[4] আল্লাহ তা‘আলা দুম্বাটি ইসমাঈল (আঃ)-এর পরিবর্তে পাঠিয়ে প্রথম কুরবানীর ঐতিহ্যের সাথে এক গভীর শরী‘আতগত মেলবন্ধন স্থাপন করলেন এবং এটিকে পরবর্তী উম্মতের জন্য বিধান হিসাবে নির্ধারণ করে দিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ইব্রাহীম (আঃ)-এর যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর ১০ই যিলহজ্জে কুরবানী করে থাকে; যা আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, ত্যাগ এবং তাক্বওয়ার এক অনন্য শিক্ষা বহন করে।
মূসা (আঃ)-এর যুগ : বনু ইস্রাঈলের হঠকারিতা
মানুষের লোভ আর হঠকারিতা কতটা ভয়াবহ হ’তে পারে তার এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত পবিত্র কুরআনের সূরা বাক্বারায় বর্ণিত বনী ইসরাঈলের একটি ঘটনায় ফুটে উঠেছে। ইব্রাহীম (আঃ)-এর নাতি নবী ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশধর বনী ইসরাঈলের এই ঘটনার সাথে কুরবানীর বিধান জড়িয়ে আছে। যেখানে আল্লাহর নির্দেশে একটি গাভী যবেহ করার মাধ্যমে এক গুপ্ত হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয় এবং একই সঙ্গে আনুগত্য ও অবাধ্যতার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বনী ইসরাঈলের এক যুবক লোভে পড়ে তার একমাত্র চাচাতো বোনকে বিয়ে করে চাচার বিপুল সম্পত্তির একক মালিক হ’তে চেয়েছিল। কিন্তু চাচা বিয়েতে রাযী হ’ল না। ফলে যুবক সম্পত্তির লালসায় অন্ধ হয়ে আপন চাচাকেই গোপনে হত্যা করে বসল। পরদিন সে নিজেই কান্নাকাটি করে কওমের নেতাদের কাছে বিচার দাবি করল, যেন কেউ তাকে সন্দেহ করতে না পারে। কিন্তু সাক্ষীর অভাবে আসামী চিহ্নিত করা যাচ্ছিল না। এমতাবস্থায় নেতারা বিচারের জন্য মূসা (আঃ)-এর কাছে আসলেন। মূসা (আঃ) আল্লাহর পক্ষ থেকে অহি-র মাধ্যমে জেনে গেলেন যে, স্বয়ং বাদীই তার চাচাকে হত্যা করেছে। কিন্তু সরাসরি অপরাধীর নাম ঘোষণা না করে আল্লাহ এক বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে সত্য উৎঘাটনের নির্দেশ দিলেন। মূসা (আঃ) নেতাদেরেকে বললেন, এই গুপ্তহত্যার রহস্য উন্মোচনের জন্য আল্লাহ তোমাদের একটি গাভী যবেহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ঠিক তখনই বনী ইসরাঈলের স্বভাবজাত কুযুক্তি আর টালবাহানা শুরু হ’ল। তারা সরল আদেশকে জটিল করতে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিল যে, গাভীটির বয়স কত? রং কেমন? সেটি কাজে অভ্যস্ত কি না? প্রতিবারই আল্লাহর পক্ষ থেকে শর্তগুলো আরো নির্দিষ্ট ও কঠিন হ’তে লাগল। ফলে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের সেই গাভীটি খুঁজে পাওয়া তাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল। তারা দীর্ঘ সময় ধরে হন্যে হয়ে গাভীর সন্ধান করতে থাকল।
অবশেষে তারা এমন এক গাভী খুঁজে পেল যেটা না খুব বৃদ্ধ, না একেবারে অল্পবয়সী; বরং মাঝামাঝি বয়সের। তার রং ছিল উজ্জ্বল গাঢ় হলুদ, যা দর্শকদের চোখ জুড়িয়ে দেয়। সে গাভী কখনো জমিতে হাল চাষ বা পানি সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়নি। এক কথায় সুঠাম ও খুঁতহীন। সেই দুর্লভ গাভীটি খুঁজে পাওয়ার পর তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও যবেহ করল। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিস্ময়কর নির্দেশ এলো। আল্লাহ বললেন, ‘যবেহকৃত গাভীর একটি অংশ দিয়ে মৃত ব্যক্তির দেহে আঘাত করো’ (সূরা বাক্বারাহ ২/৭৩)। আঘাত করার সাথে সাথে নিথর দেহটি মুহূর্তের জন্য জীবিত হয়ে উঠল এবং সবার সামনে তার হত্যাকারী ভাতিজার নাম বলে দিয়ে পুনরায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। আল্লাহর কুদরতে সত্য প্রকাশিত হ’ল। এই অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা কেবল একটি গুপ্তহত্যার রহস্যই উন্মোচন করেননি, বরং কিবয়ামতের দিন মৃতকে পুনর্জীবিত করার বাস্তব প্রমাণও পেশ করেছেন। মূলত আল্লাহর আদেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। বনী ইসরাঈলরা যদি শুরুতেই আল্লাহর নির্দেশ মেনে যেকোন একটি সাধারণ গাভী যবেহ করত, তবে তাদের এত কষ্ট করতে হ’ত না। এতকিছুর পরেও আল্লাহর নিদর্শনের চাক্ষুষ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাদের হঠকারিতা তাদেরকে আল্লাহর প্রতি অনুগত হ’তে দেয়নি।
ইলিয়াস (আঃ)-এর যুগ : হক-বাতিলের পরীক্ষা
তৎকালীন ফিলিস্তীনের বাদশাহ আখিয়াব এবং রাণী ইযবেল ছিলেন বাআল দেবতার অনুসারী। তারা বিরাট মন্দির তৈরী করে সকলকে বাআল দেবতার পূজা করতে নির্দেশ জারি করেছিলেন। রাজার আদেশে সকলেই শিরকের অতল গহবরে হারিয়ে গিয়েছিল। এই জাতিকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা‘আলা ইলিয়াস (আঃ)-কে নবী হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু দু’একজন ছাড়া কেউ তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেনি। একটা পর্যায়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ফলে তিনি দূর পাহাড়ে আত্মগোপন করেন এবং এই অবাধ্য জাতির জন্য দুর্ভিক্ষের বদ দো‘আ করলেন। এমতাবস্থায় দেশে প্রকট আকারে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। তখন ইলিয়াস (আঃ) আত্মগোপন থেকে বের হয়ে সরাসরি রাজ দরবারে গিয়ে বললেন, আল্লাহর অবাধ্যতার জন্যই তোমাদের উপর দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে। তোমরা আল্লাহর অবাধ্যতা ছেড়ে দিয়ে তাঁর ইবাদত করো, তবেই তিনি দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি দিবেন। তিনি আরো বললেন, তোমরা দাবি করো যে তোমাদের বাআল দেবতার নাকি সাড়ে চারশ’ নবী রয়েছে। তাহ’লে চলো একটা সত্য-মিথ্যার পরীক্ষা হয়ে যাক। তোমরা সবাই মিলে বাআল দেবতার নামে কুরবানী পেশ কর, আর আমি একাকী আমার আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করি। যার কুরবানী আসমান থেকে নেমে আসা আগুন গ্রহণ করবে তার ধর্মই সত্য বলে গৃহীত হবে।
এই যৌক্তিক চ্যালেঞ্জ রাজা ও মূর্তিপূজারীরা সানন্দে গ্রহণ করল। অতঃপর নির্দিষ্ট দিনে ‘কোহে কারমাল’ নামক এক পাহাড়ি উপত্যকায় সবাই সমবেত হ’ল। প্রথমে বাআল পূজারীরা তাদের কুরবানী পেশ করল। নিমগ্ন সাধনা আর অনবরত কান্নাকাটি করতে করতে সকাল গড়িয়ে দুপুর হ’ল কিন্তু আকাশ থেকে আগুন তো দূরের কথা আগুনের একটা ফুলকিও আসল না। এরপর হযরত ইলিয়াস (আঃ) আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করলেন। কিছুক্ষণ পরই আসমান থেকে আগুন নেমে এসে সেই কুরবানী ভস্ম করে দিল। এ দৃশ্য দেখে বহু মানুষ আল্লাহর সিজদায় লুটিয়ে পড়ল কিন্তু বাআল পূজারী অন্ধ ধর্মনেতারা মুশরিকই থেকে গেল। যুগে যুগে এভাবেই আল্লাহ তা‘আলা বাতিলকে পরাজিত করে হকের আওয়াজ বুলন্দ করেছেন।
জাহেলী যুগ : ইব্রাহীমী সুন্নাতের বিকৃতি
আরব জাতির পিতা ছিলেন ইব্রাহীম (আঃ)। সেজন্য জাহিলী যুগে মক্কার লোকেরা দাবী করত তারা ইব্রাহীম (আঃ)-এর ধর্ম অনুসরণ করে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা ইব্রাহীম (আঃ)-এর প্রকৃত দ্বীনকে বিকৃত ও পরিবর্তিত করে ফেলেছিল। ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আঃ) সর্বপ্রথম কা‘বা ঘর নির্মাণ করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমেই কা‘বাকে কেন্দ্র করে ইবাদত, তাওয়াফ এবং হজ্জের বিধান চালু করেছিলেন (হজ্জ ২২/২৬-২৭)। আর পিতা-পুত্রের কুরবানীর ইতিহাস তো যুগ যুগ ধরে জীবন্ত ছিল। যেই কা‘বাকে ইব্রাহীম (আঃ) তাওহীদের কেন্দ্রভূমিতে রূপান্তর করলেন, সেই কা‘বার চতুর্পাশে মূর্তি স্থাপন করে মক্কার লোকেরা শিরকের আখড়ায় পরিণত করেছিল। তারা মূর্তির পূজা করত। কা‘বায় ইবাদতের সময় শিস দিত ও তালি বাজাতো (আনফাল ৮/৩৫)। তাদের এই বিকৃতি কুরবানীর বিধানকেও কলুষিত করেছিল। ইব্রাহীমী সুন্নাতের পরিবর্তে তারা মূর্তির সম্মানে কুরবানী চালু করেছিল (মায়েদাহ ৫/৩)। আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার আশায় মূর্তির নামে কুরবানী দিয়ে গোশতের কিছু অংশ মূর্তিগুলির মাথায় রাখত ও তার উপরে কিছু রক্ত ছিটিয়ে দিত। কেউবা উক্ত রক্ত কা‘বাগৃহের দেওয়ালে লেপন করত।[5] এভাবে তারা ইব্রাহীমী সুন্নাতের মূল চেতনা পরিত্যাগ করে কুসংস্কার ও শিরকের গভীর অন্ধকারে পতিত হয়েছিল।
রাসূল (ছাঃ)-এর যুগ : উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য পূর্ণাঙ্গ বিধান
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আগমনের মাধ্যমে মানবজাতি লাভ করে পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ইব্রাহীম (আঃ)-এর যুগ থেকে প্রচলিত কুরবানীর বিধান রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে এসে শিরকমুক্ত, বিশুদ্ধ তাওহীদভিত্তিক ইবাদতে পরিণত হয়। জাহেলি যুগের কদর্য প্রথা বিলুপ্ত করে মহান আল্লাহ ঘোষণা দেন, لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى ‘ওগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর নিকটে পৌঁছে না। বরং তাঁর নিকট পৌঁছে তোমাদের আল্লাহভীরুতা’ (হজ্জ ২২/৩৭)। আল্লাহভীরুতা তথা ইখলাছই ছিল ইব্রাহীমী কুরবানীর প্রকৃত চেতনা। এই চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে রাসূল (ছাঃ) নিজে নিয়মিত কুরবানী দিয়েছেন এবং এই বিধান ক্বিয়ামত পর্যন্ত উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হিসাবে বিদ্যমান রাখার জন্য বিদায় হজ্জের ভাষণে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ، عَلَى كُلِّ أَهْلِ بَيْتٍ فِي كُلِّ عَامٍ أُضْحِيَّةٌ ‘হে জনগণ! নিশ্চয়ই প্রত্যেক পরিবারের উপরে প্রতি বছর একটি করে কুরবানী’।[6] চৌদ্দশত বছর ধরে রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ পালনার্থে প্রতিটি মুসলিম পরিবারের কুরবানী স্রেফ পশু যবেহ নয়, বরং নিজের কুপ্রবৃত্তি বিসর্জন দিয়ে মহান আল্লাহর সামনে পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক জীবন্ত অঙ্গীকার।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, কুরবানীর ইতিহাস আদি পিতা আদম (আঃ) থেকে শুরু করে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) পর্যন্ত প্রবহমান এক অবিচ্ছিন্ন ও শাশ্বত ইবাদত। এই ইবাদত কিয়ামত পর্যন্ত মুমিন হৃদয়ে ত্যাগের প্রেরণা জাগ্রত করবে। পশুর গলায় ছুরি চালানোর মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তি তার ভেতরের আমিত্ব, অহংকার এবং পশুত্বকেই কুরবানী দিতে শিখবে। মহান আল্লাহ আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার তাওফীক দান করুন-আমীন!
মুহাম্মাদ আব্দুর রঊফ
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।
[1]. তিরমিযী হা/২৩৯৮; মিশকাত হা/১৫৬২; ইবনে মাজাহ হা/৪০২৩।
[2]. তাফসীরে কুরতুবী, ১৫/১০২ পৃ.।
[3]. মুসনাদে আহমাদ হা/২৭০৭।
[4]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, নবীদের কাহিনী-১ (রাজশাহী : হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় সংস্করণ, অক্টোবর ২০১০), পৃ. ৪৪।
[5]. তাফসীর ইবনে কাছীর ৫/৪৩১; তাফসীরে মাযহারী ৬/৩২৫।
[6]. তিরমিযী হা/১৫১৮; মিশকাত হা/১৪৭৮; আবুদাঊদ হা/২৭৮৮।