৭. ইলম অনুযায়ী আমল না করা মুনাফিক্বীর লক্ষণ :
কথা ও কাজের এই অমিল, জ্ঞান ও কর্মের এই বৈপরীত্য মুমিন ও মুনাফিকের মধ্যকার সুস্পষ্ট বিভেদরেখা। মুমিনের প্রতিটি জ্ঞানবিন্দু তার আমলে পরিণত হওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকে; তার সত্তা অর্জিত ইলমের আলোকে নিজেকে সাজাতে নিরন্তর চেষ্টা করে। অন্যদিকে মুনাফিক জ্ঞানকে ব্যবহার করে এক মুখোশ হিসাবে। তার জিহবা জ্ঞানের মুক্তা ঝরায়, কিন্তু তার অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকে আমলের নূর থেকে বিমুখ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। তার জ্ঞান অন্যের বাহবা কুড়ানোর জন্য, নিজেকে জ্ঞানী প্রমাণের জন্য, কিন্তু নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য নয়। জ্ঞান তার কাছে এক সুন্দর পুষ্প, যাতে কোন সুগন্ধ নেই; এক প্রজ্জ্বলিত মোমবাতি, যা অন্যকে আলো দেয়, কিন্তু নিজের ভিতরকার অন্ধকার দূর করতে পারে না। প্রখ্যাত তাবেঈ হাসান বাছরী (রহঃ) এক অসামান্য কথায় সেই সত্যকে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, عِلْمُ الْمُنَافِقِ فِي قَوْلِهِ، وَعِلْمُ الْمُؤْمِنِ فِي عَمَلِهِ ‘মুনাফিকের জ্ঞান তার কথায় (ভাষণে), আর মুমিনের জ্ঞান তার কর্মে (আমল-আখলাক্বে)’।[1] অর্থাৎ আমাদের জ্ঞান যদি শুধু আমাদের জিহবা, কি-বোর্ড আর অনলাইন প্রোফাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা মুমিনের জ্ঞান নয়; বরং তা মুনাফিকের জ্ঞানেরই প্রতিচ্ছবি। মুমিনের জ্ঞান তার কর্মের মাধ্যমে কথা বলে। তার ইবাদত-বন্দেগী, সততা, তার বিশস্ততা, পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি তার সহানুভূতিই হ’ল তার জ্ঞানের আসল সাক্ষী। তার কর্মই তার জ্ঞানের সবচেয়ে বড় মুখপাত্র।
যেদিন আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করবেন, ‘তোমাকে আমি জানিয়েছিলাম যে, গীবত করা হারাম, কিন্তু তুমি তোমার বন্ধু মহলে বসে তা উপভোগ করতে। তোমাকে শিখিয়েছিলাম যে, ছালাত ফরয, কিন্তু তুমি পার্থিব ব্যস্ততার অযুহাতে তা পরিত্যাগ করতে। তোমাকে শিখিয়েছিলাম পিতা-মাতার খেদমত জান্নাতের চাবিকাঠি, কিন্তু তুমি তাদের অবহেলা করতে’। এরকম আমাদের প্রতিটি জানা বিষয় ক্বিয়ামতের দিন হয় মুক্তির কারণ হবে, নয়তো শাস্তির কারণ হবে। জেনে-বুঝে আমল না করাটা আল্লাহর সাথে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা, যা মুনাফিকের কাজ। কারণ মুনাফিকরা সত্যকে জানার পরও কেবল দুনিয়াবী স্বার্থে তা এড়িয়ে চলে। তাই বিশিষ্ট ছাহাবী আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ إِذَا وُقِفْتُ عَلَى الْحِسَابِ أَنْ يُقَالَ لِي: قَدْ عَلِمْتَ، فَمَاذَا عَمِلْتَ فِيمَا عَلِمْتَ؟ ‘আমি যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশী ভয় করি, তা হ’ল- যখন আমাকে (ক্বিয়ামতের দিন) হিসাবের জন্য দাঁড় করানো হবে, তখন আমাকে বলা হবে যে ‘তুমি তো জ্ঞান অর্জন করেছিলে। সেই জ্ঞান অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ’?[2]
হাসান বাছরী (রহ.) বলেন, اعْتَبِرُوا النَّاسَ بِأَعْمَالِهِمْ، وَدَعُوا قَوْلَهُمْ؛ فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَدَعْ قَوْلًا إِلَّا جَعَلَ عَلَيْهِ دَلِيلًا مِنْ عَمَلٍ يُصَدِّقُهُ أَوْ يُكَذِّبُهُ، فَإِذَا سَمِعْتَ قَوْلًا حَسَنًا فَرُوَيْدًا بِصَاحِبِهِ، فَإِنْ وَافَقَ قَوْلًا وَعَمَلًا فَنِعْمَ وَنُعْمَةُ عَيْنٍ، ‘মানুষকে তাদের কাজের ভিত্তিতে মূল্যায়ন কর, তাদের কথার ভিত্তিতে নয়। কারণ আল্লাহ এমন কোন কথা রাখেননি, যার উপর তিনি কাজের মাধ্যমে একটি প্রমাণ দেননি’ সেটা হয় কথাকে সত্যায়ন করে, নয়তো তা মিথ্যা প্রমাণ করে। তাই যখন তুমি কোন চমৎকার কথা শোনবে, তখন তার কথায় মুগ্ধ হওয়ার আগে একটু থাম (একটু ভেবে দেখ)। যদি তার কথা ও কাজ পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহ’লে সেটা খুবই উত্তম ও প্রশংসনীয়’।[3]
একজন মানুষ সারাদিন সততার বুলি আওড়াতে পারে, কিন্তু যখন ব্যবসার সুযোগ আসে, তখন যদি সে ওযনে কম দেয় বা পণ্যে ভেজাল মেশায়, তবে তার মুখের কথা মূল্যহীন। একজন নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে জনগণের সেবার অঙ্গীকার করতে পারেন, কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারে বসে যদি তিনি দুর্নীতি করেন, তবে তার অঙ্গীকার প্রতারণা মাত্র। হাসান বছরী (রহঃ) আমাদের এক চিরন্তন সত্য শিখিয়েছেন আমল হ’ল কথার আয়না। যার কথা ও কাজে মিল নেই, তার সুন্দর কথাগুলো আসলে এক ধরনের ধোঁকা। এই বাহ্যিক ধার্মিকতা ও অভ্যন্তরীণ কপটতাই হ’ল মুনাফিকের চরিত্র, যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেন,إِنْ أَنَا عَمِلْتُ بِمَا أَعْلَمُ فَأَنَا أَعْلَمُ النَّاسِ، وَإِنْ لَمْ أَعْمَلْ بِمَا أَعْلَمُ فَلَيْسَ فِي الدُّنْيَا أَحَدٌ أَجْهَلَ مِنِّي، ‘আমি যা জানি, সে অনুযায়ী যদি আমি আমল করি, তবে আমিই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। আর আমি যা জানি, সে অনুযায়ী যদি আমল না করি, তবে দুনিয়াতে আমার চেয়ে বড় মূর্খ আর কেউ নেই’।[4]
কথায় ও কাজে আল্লাহর বান্দা হওয়ার চেষ্টা করা প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। কেননা আমরা প্রতিদিন আমাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করি যে, আমরা কার গোলাম- আল্লাহর, নাকি আমাদের প্রবৃত্তির? মুখে আল্লাহর বান্দা দাবী করা সহজ, কিন্তু প্রতিটি কাজে সেই দাসত্বের প্রমাণ দেওয়াই প্রকৃত ঈমানের পরিচায়ক। আর এর ব্যতিক্রমই হ’ল মুনাফিক্বী। ইয়াহইয়া ইবনে মু‘আয (মৃ.২৫৮হি.) বলেন, كُونُوا عِبَادَ اللهِ بِأَفْعَالِكُمْ، كَمَا زَعَمْتُمْ أَنَّكُمْ عَبِيدُ اللهِ بِأَقْوَالِكُمْ، ‘তোমরা তোমাদের আমলের মাধ্যমে আল্লাহর বান্দা হওয়ার চেষ্টা কর ঠিক সেই ভাবে, যেভাবে তোমরা কথার মাধ্যমে আল্লাহর বান্দা হওয়ার দাবী করে থাক’।[5]
৮. আমল বিহীন ইলম পরিতাপের কারণ :
জ্ঞান হ’ল আত্মার খোরাক। কিন্তু সেই জ্ঞান যদি আমলে পরিণত না হয়, তবে তা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই এক অন্তহীন পরিতাপ ও আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে ব্যক্তি তার সামনে রাখা সুস্বাদু খাবার মুখে না দিয়ে বারবার পিঠের পেছনে ফেলতে থাকে, সে যেমন নিজের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে না, তেমনি যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে কিন্তু জীবনে তার প্রতিফলন ঘটায় না, সে কখনো সেই জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হ’তে পারে না; বরং সেটা তার জন্য বোঝা ও লজ্জার কারণ হয়।
ইসহাক্ব ইবনে ইবরাহীম আত-তাবারী (রহঃ) বলেন, আমি একবার ফুযাইল ইবনে ইয়ায (১০৭-১৮৭হি.)-এর কাছে হাদীছ শিখতে চাইলাম। তখন তিনি বললেন, ‘যদি তুমি আমার কাছে স্বর্ণমুদ্রা চাইতে, তবে তা আমার জন্য সহজ ছিল, কিন্তু তুমি আমার কাছে হাদীছ শিখতে চাচ্ছ’। আমি বললাম, আপনি যদি এমন কিছু হাদীছ আমাকে শুনিয়ে দেন, যা এখনো আমার কাছে নেই, তবে তা আমার কাছে অধিক সংখ্যক স্বর্ণমুদ্রা পাওয়ার চেয়েও অধিক প্রিয় হবে। তখন তিনি বললেন, إِنَّكَ مَفْتُونٌ، أَمَا وَاللهِ! لَوْ عَمِلْتَ بِمَا سَمِعْتَ لَكَانَ لَكَ فِي ذَلِكَ شُغْلٌ عَمَّا لَمْ تَسْمَعْ، ‘তুমি তো পাগল হয়ে গেছ! আল্লাহর কসম, তুমি যদি শোনা (হাদীছ) অনুযায়ীই আমল করতে, তবে যা শোননি সে সম্পর্কে জানার সুযোগই পেতে না’। এরপর তিনি বললেন, আমি সুলায়মান ইবনে মেহরান আল-আ‘মাশ (৬১-১৪৮হি.)-কে বলতে শুনেছি, إِذَا كَانَ بَيْنَ يَدَيْكَ طَعَامٌ تَأْكُلُهُ فَتَأْخُذُ اللُّقْمَةَ فَتَرْمِي بِهَا خَلْفَ ظَهْرِكَ كُلَّمَا أَخَذْتَ اللُّقْمَةَ رَمَيْتَ بِهَا خَلْفَ ظَهْرِكَ مَتَى تَشْبَعُ؟ ‘যখন তোমার সামনে খাবার রাখা হয়, আর তুমি এক লোকমা তুলে নিলে, তারপর তা খাওয়ার বদলে পেছনে ফেলে দিলে, এরপর আবার প্রতিটি লোকমাই এভাবে পেছনে ফেলে দিলে, তবে কি তুমি কখনো পরিতৃপ্ত হ’তে পারবে?’[6]
আজ আমরা তথ্যের এক মহাসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। আমাদের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ আর সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালগুলো জ্ঞান ও তথ্যের এক বিশাল ভোজনালয়। আমরা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইসলামিক আলোচনা শুনি, আর্টিকেল পড়ি, বইয়ের পিডিএফ সংগ্রহ করি এবং সুন্দর সুন্দর উক্তি শেয়ার করি। আমরা প্রতিনিয়ত জ্ঞানের লোকমা তুলছি, কিন্তু তা আমাদের আত্মার ভেতরে প্রবেশ না করিয়ে আমলের অভাবে পিঠের পেছনে ছুড়ে ফেলছি। অতএব কেবল ইলম সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়; বরং তা হজম করতে হয় আমলের মাধ্যমে। কারণ যে আলেম বা ছাত্র প্রতিদিন নতুন নতুন হাদীছ শেখে, নতুন নতুন কিতাব পড়ে, কিন্তু নিজের অন্তরে ও জীবনে তার প্রতিফলন ঘটায় না- সে যেন শুধু লুকমা জমাচ্ছে অথচ মুখে দিচ্ছে না। হয়ত একসময় সে জ্ঞানের ভারে নত হবে, কিন্তু অন্তর থাকবে প্রচন্ড ক্ষুধার্ত।
যাঁরা ছিলেন ইলমের সাগর, সেই মহান ইমামগণ ইলমের আমানত বা দায়িত্বের কথা ভেবে সর্বদা ভীত থাকতেন। তাঁদের কাছে ইলম অর্জন কোন সম্মান বা খ্যাতির বিষয় ছিল না, বরং ছিল আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার এক আমানত। প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ও তাবেঈ ইমাম শু‘বা ইবনে হাজ্জাজ (৮৫-১৬০হি.) মাঝে মাঝে আশংকা করে বলতেন, مَا أَنَا مُقِيمٌ عَلَى شَيْءٍ أَخَافُ أَنْ يُدْخِلَنِيَ النَّارَ غَيْرُهُ يَعْنِي الْحَدِيثَ، ‘আমি এমন কিছু করি না, যার কারণে জাহান্নামের ভয় করি- শুধু এটাকে ছাড়া। এর মাধ্যমে তিনি হাদীছ বর্ণনাকেই উদ্দেশ্য করতেন’।[7] যে হাদীছ চর্চাকে আমরা নাজাতের উপায় মনে করি, সেই হাদীছ চর্চাই তাঁর জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হ’তে পারে বলে তিনি ভয় পেতেন। কারণ তিনি জানতেন, প্রতিটি হাদীছ যা তিনি শিখেছেন বা শিক্ষা দিয়েছেন, তার প্রত্যেকটি সম্পর্কে তাঁকে ক্বিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হবে তিনি নিজে এর ওপর কতটুকু আমল করেছেন?
সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না (১০৭-১৯৮হি.) নিজের ইখলাছ বা একনিষ্ঠতা নিয়ে এতটাই চিন্তিত ছিলেন যে, তিনি বলতেন, لَوْ قِيلَ لِي: لِمَ طَلَبْتَ الْحَدِيثَ؟ مَا دَرَيْتُ مَا أَقُولُ، ‘যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কেন তুমি হাদীছ অন্বেষণ করেছ? তবে আমি জানিনা, কী জবাব দেব’।[8] অথচ আমরা সামান্য জ্ঞান অর্জন করেই নিজেকে ‘শায়েখ’, ‘আলেম’, ‘মুফতী’ হিসাবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। অথচ এই মহান ইমাম নিজের নিয়ত নিয়েই সন্দিহান থাকতেন। তাঁদের এই ভয় প্রমাণ করে, তাঁরা ইলমকে কেবল তথ্য হিসাবে দেখেননি, বরং দেখেছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক গুরুতর আমানত হিসাবে, যার খেয়ানত ধ্বংস ডেকে আনবে।
৯. ইলম আলেমের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবে :
মহাবিচারের সেই ভয়ংকর দিনে, যখন মানুষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার নিজের বিরুদ্ধেই কথা বলবে, তখন এক অপ্রত্যাশিত সাক্ষী আল্লাহর আদালতে দাঁড়াবে। আর সেটা হ’ল আমাদের অর্জিত ইলম। সেদিন আমাদের ইলম হবে একটি দ্বিমুখী ধারালো তরবারী; হয় তা আমাদের পক্ষে সুপারিশ করে মুক্তির কারণ হবে, অথবা আমাদের বিপক্ষেই সবচেয়ে শক্তিশালী অভিযোগকারী হিসাবে আবির্ভূত হয়ে ধ্বংসের কারণ হবে।
আমাদের অর্জিত জ্ঞানের মূল উৎস হ’ল আল্লাহর অহি তথা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ। কুরআন সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য অবতীর্ণ। এটি নিছক পাঠ করার জন্য বা মুখস্থ করার জন্য অবতীর্ণ হয়নি; এটি এসেছে জীবন পরিচালনার এক পূর্ণাঙ্গ সংবিধান হিসাবে। যে এই সংবিধান মেনে চলবে, কুরআন তার জন্য সুপারিশকারী হবে। আর যে একে পাঠ করবে, বুঝবে, কিন্তু জীবনে বাস্তবায়ন করবে না, তার বিরুদ্ধে কুরআনই হবে প্রধান সাক্ষী। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, الْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ، ‘(ক্বিয়ামতের দিন) কুরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলীল হবে’।[9] ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, لَا يَغُرَّنَّكُمْ مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ، إِنَّمَا هُوَ كَلَامٌ يُتَكَلَّمُ بِهِ، وَلَكِنِ انْظُرُوا إلى مَنْ يَعْمَلُ بِهِ، ‘যে কুরআন পাঠ করে, তার দ্বারা তোমরা প্রতারিত হয়ো না। এটা তো কেবলই কালাম, যা দিয়ে কথা বলা হয়। বরং লক্ষ্য কর! (কুরআন পাঠের পর) কে সেই অনুযায়ী আমল করে’।[10]
ক্বিয়ামতের দিন যখন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তাঁর উম্মতের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে দাঁড়াবেন। আর সেই অভিযোগটি হবে কুরআনকে পরিত্যাগ করা নিয়ে। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) কুরআন পরিত্যাগ করার বিভিন্ন স্তর বর্ণনা করেছেন, যা আমাদের অন্তরকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন, مَنْ لَمْ يَقْرَأِ الْقُرْآنَ فَقَدْ هَجَرَهُ، وَمَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ وَلَمْ يَتَدَبَّرْهُ فَقَدْ هَجَرَهُ، وَمَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ وَتَدَبَّرَهُ وَلَمْ يَعْمَلْ بِهِ فَقَدْ هَجَرَهُ، ‘যে ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত করে না, সে কুরআনকে পরিত্যাগ করল। যে ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত করে, কিন্তু তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে না, সেও কুরআনকে পরিত্যাগ করল। আর যে কুরআন তেলাওয়াত করল এবং তা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করল, কিন্তু সেই অনুযায়ী আমল করল না, সে ব্যক্তিও কুরআনকে পরিত্যাগ করল’। তারা সবাই আল্লাহর সেই আয়াতের শামিল হবে, যেখানে তিনি বলেছেন, وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَذَا الْقُرْآنَ مَهْجُوراً- ‘(সেদিন) রাসূল বলবে, হে আমার রব! আমার সম্প্রদায় তো এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য গণ্য করেছিল’ (ফুরক্বান ২৫/৩০)।[11] সুতরাং আমরা আজ কোন শ্রেণীতে পড়ছি? আমাদের ঘরে সুন্দর গিলাফে মোড়ানো কুরআন আছে, মোবাইল অ্যাপে কুরআন আছে, কিন্তু তেলাওয়াত নেই। তেলাওয়াত থাকলেও তাদাববুর বা গভীর চিন্তা নেই। আর চিন্তা থাকলেও জীবনে তার বাস্তবায়ন নেই। আমরা কি জেনে বা না জেনে সেই হতভাগা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছি না, যাদের বিরুদ্ধে স্বয়ং আমাদের নবী (ছাঃ) আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করবেন? আল্লাহুল মুস্তা‘আন।
বিশর ইবনুল হারেছ আল-হাফী (১৭৯-২২৭হি.) বলেন, الْعِلْمُ حَسَنٌ لِمَنْ عَمِلَ بِهِ، وَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ مَا أَضَرَّهُ، وَقَالَ: هَذِهِ حُجَجٌ أَوْ قَالَ هَذِهِ حُجَّةٌ، يَعْنِي: عَلَى مَنْ عَلِمَ، ‘জ্ঞান তার জন্যই কল্যাণকর যে সে অনুযায়ী আমল করে। আর যে আমল করে না, জ্ঞান তার কী পরিমাণ ক্ষতিই না করে! তিনি আরও বলেন, এই জ্ঞান প্রমাণস্বরূপ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জন করেছে, (আমল না করলে) এই জ্ঞান তার বিরুদ্ধেই দলীল হবে’।[12] আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ ইবনে সাম‘ঊন (৩০০-৩৮৭হি.) বলেন,كُلُّ مَنْ لَمْ يَنْظُرْ بِالْعِلْمِ فِيمَا لِلَّهِ عَلَيْهِ، فَالْعِلْمُ حُجَّةٌ عَلَيْهِ، وَوَبَالٌ، ‘যে ব্যক্তি তার জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের দিকে দৃষ্টি দেয় না, তার অর্জিত জ্ঞান তার বিরুদ্ধেই প্রমাণ এবং ধ্বংসের কারণ হবে’।[13]
ইলমের এই ভয়াবহ দায়িত্বের কথা ভেবে সালাফে ছালেহীন সর্বদা ভীত থাকতেন। তাদের জ্ঞান ছিল পাহাড়সম, আর আমল ছিল তার চেয়েও উঁচু। তবুও তারা আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়ে থর থর করে কাঁপতেন। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেন, لَيْتَنِي لَمْ أَكْتُبِ الْعِلْمَ، وَلَيْتَنِي أَنْجُو مِنْ عِلْمِي كَفَافًا لَا عَلَيَّ وَلَا لِي، ‘হায়! আমি যদি জ্ঞান লিপিবদ্ধ না করতাম! আর আমি যদি আমার অর্জিত জ্ঞান থেকে কোন মতে বেঁচে যেতে পারতাম, এমনভাবে যে তা না আমার পক্ষে থাকবে, আর না আমার বিপক্ষে যাবে’।[14]
একবার ভাবুন, তিনি কেবল ‘সমান সমান’ হয়ে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছেন! অর্থাৎ তার বিশাল জ্ঞান যেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী না হয়, এটাই ছিল তার সর্বোচ্চ আকুতি। ইমাম শা‘বী (রহঃ) জ্ঞানের দায়বদ্ধতার কথা ভেবে বলেন, لَيْتَنِي لَمْ أَكُنْ عَلِمْتُ مِنْ ذَا العِلْمِ شَيْئاً، ‘হায়! আমি যদি এই জ্ঞানের কিছুই না জানতাম!’।[15]
এইসব কথা তাদের জ্ঞানবিমুখতার কারণে ছিল না, বরং জ্ঞানের বিশাল দায়িত্বের গভীর উপলব্ধি থেকে ছিল। তারা জানতেন, যখন তুমি জ্ঞান অনুযায়ী আমল করবে না, তখন তা তোমার বিরুদ্ধেই প্রমাণ হবে। সার্রী আস-সাক্বাতী (১৬০-২৫৩হি.) বলেন,كُلَّمَا ازْدَدْتَ عِلْمًا كَانَتِ الْحُجَّةُ عَلَيْكَ أَوْكَدَ، ‘তুমি জ্ঞান-গরিমায় যত সমৃদ্ধ হবে, তোমার বিরুদ্ধে দলীল ততই জোরালো হবে’।[16] তাদের এই ভয় আর আমাদের নির্ভয় বিচরণ- এই দুইয়ের মধ্যে কতই না পার্থক্য! কতই না ব্যাবধান! আমরা অল্প জেনে অহংকারী হয়ে উঠি, আর তারা জ্ঞানের গভীরে পৌঁছেও আল্লাহর ভয়ে কতই না বিনয়ী থাকতেন। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন।
আসুন! একবার নিজেকে প্রশ্ন করি, আমার অর্জিত জ্ঞান আজ কোথায় বাস করছে? আমার জিহবার ডগায়? নাকি কী-বোর্ডের বোতামে? আমার জ্ঞান কি কেবল কিছু সুন্দর কথা আর আকর্ষণীয় আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি তা আমার চরিত্র, আমার আচরণ এবং প্রতিটি পদক্ষেপে জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠছে?
যে জ্ঞানের ভার আমরা বহন করছি, তা আল্লাহর আদালতে আমার-আপনার বিরুদ্ধে এক অকাট্য প্রমাণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেদিন কোন ওযর বা অজুহাত গৃহীত হবে না। সেদিন বলা হবে, ‘তুমি তো জানতে!’ এই একটি বাক্যই সমস্ত আত্মপক্ষ সমর্থনের পথ রুদ্ধ করে দেবে। আল্লাহুল মুস্তা‘আন।
তাই আমরা সারাদিন যে জ্ঞান অর্জন করলাম, হোক তা একটি আয়াতের তাফসীর, একটি হাদীছের মর্ম বা কোন আলেমের আলোচনা- তার কতটুকু আমার জীবনে প্রভাব ফেলেছে? আমার আজকের জ্ঞান কি আমার কোন একটি বদ অভ্যাসকে বদলে দিতে পেরেছে? আমার কোন একটি পাপকে প্রতিহত করার শক্তি জুগিয়েছে? আমার অহংকারকে চূর্ণ করে আমাকে আরও বিনয়ী করেছে?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে হৃদয়ে কাঁপন অনুভব করুন! এখনই সময় অশ্রুসজল চোখে আল্লাহর কাছে তওবা করার এবং জ্ঞানকে জীবনে ধারণ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার। কারণ ক্বিয়ামতের সেই কঠিন দিনে আমাদের অর্জিত ইলম হয় আমাদের মুক্তির জন্য সুফারিশকারী হবে, নতুবা আমাদের বিপক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। সেদিন আমাদের জ্ঞান যদি আমাদের বিপক্ষে না গিয়ে আমাদের পক্ষে থাকে, তবে মুমিনের জন্য সেটাই হবে সবচেয়ে বড় সফলতা।
১০. ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর শাস্তি :
আমলবিহীন ইলমের সকল পরিণতির মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও চূড়ান্ত পরিণতি অপেক্ষা করছে ক্বিয়ামতের সেই মহাবিচারের ময়দানে। দুনিয়ার অপমান, অন্তরের অশান্তি, জ্ঞানের স্বাদ থেকে বঞ্চনা- এসব সেই আখেরাতের ভয়ংকর শাস্তির তুলনায় অতি তুচ্ছ। সেদিন অর্জিত জ্ঞান ব্যক্তির মুক্তির জন্য সুপারিশকারী না হয়ে, তার বিপক্ষেই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসাবে দাঁড়াবে এবং তাকে জাহান্নামের অতল গহবরে নিক্ষেপ করার কারণ হবে। ক্বিয়ামতের দিন তিন শ্রেণীর লোকের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম রায় ঘোষণা করা হবে। তাদেরকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারা হ’লেন : শহীদ, ক্বারী বা আলেম এবং দানশীল।
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ، وَعَلَّمَهُ وَقَرَأَ الْقُرْآنَ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ، وَعَلَّمْتُهُ وَقَرَأْتُ فِيكَ الْقُرْآنَ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ: عَالِمٌ، وَقَرَأْتَ الْقُرْآنَ لِيُقَالَ: هُوَ قَارِئٌ، فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، ‘(ক্বিয়ামতের দিন যার বিরুদ্ধে বিচারের প্রথম রায় ঘোষিত হবে তন্মধ্যে অন্যতম হ’ল) সেই ব্যক্তি সে ইলম অর্জন করেছিল ও অন্যদের শিক্ষা দিয়েছিল এবং কুরআন পড়েছিল। তাকে হাযির করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তাকে যত নে‘মত দিয়েছিলেন তা অবহিত করবেন। সে তা স্বীকার করবে। তখন তিনি বলবেন, এসব নে‘মত পেয়ে তুমি কী করেছিলে? সে বলবে, আমি ইলম অর্জন করেছিলাম, অন্যদের তা শিখিয়েছিলাম এবং তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কুরআন তেলাওয়াত করেছিলাম। তিনি বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি বরং (জনগণের মাঝে) আলেম বা বিদ্বান বলে আখ্যায়িত হবে সেজন্য বিদ্যা শিখেছিলে এবং ক্বারী বলে পরিচিত হবে সেজন্য কুরআন তেলাওয়াত করেছিলে। তোমাকে তো সেসব বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। তারপর তার সম্পর্কে আদেশ দেওয়া হবে। তখন তাকে অধোমুখী করে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’।[17] এ হাদীছ এতটাই ভারী ও গুরুত্ববহ যে আবু হুরায়রা (রাঃ) এই হাদীছটি বর্ণনার সময় অজ্ঞান হয়ে যেতেন। মিসরের প্রখ্যাত তাবেঈ শুফাই আল-আছবাহী (মৃ. ১০৫ হি.)-এর নিকটে এই হাদীছটি বর্ণনা করতে গিয়ে আবূ হুরায়রা (রাঃ) ভয়ে তিন বার বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন।[18]
ওছমান ইবনে আফফান (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, يُجَاءُ بِالرَّجُلِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُلْقَى فِى النَّارِ، فَتَنْدَلِقُ أَقْتَابُهُ فِى النَّارِ، فَيَدُورُ كَمَا يَدُورُ الْحِمَارُ بِرَحَاهُ، فَيَجْتَمِعُ أَهْلُ النَّارِ عَلَيْهِ، فَيَقُولُونَ: أَىْ فُلاَنُ، مَا شَأْنُكَ؟ أَلَيْسَ كُنْتَ تَأْمُرُنَا بِالْمَعْرُوفِ، وَتَنْهَى عَنِ الْمُنْكَرِ؟ قَالَ: كُنْتُ آمُرُكُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَلاَ آتِيهِ، وَأَنْهَاكُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَآتِيهِ، ‘ক্বিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তখন আগুনে পুড়ে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে। এ সময় সে ঘুরতে থাকবে যেমন গাধা তার চাকা নিয়ে তার চারপাশে ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামবাসীরা তার নিকট একত্রিত হয়ে তাকে বলবে, হে অমুক ব্যক্তি! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না আমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করতে এবং অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করতে? সে বলবে, আমি তোমাদেরকে সৎ কাজে আদেশ করতাম বটে, কিন্তু আমি তা করতাম না। আর আমি তোমাদেরকে অন্যায় কাজ হ’তে নিষেধ করতাম, অথচ আমিই তা করতাম’।[19]
একবার চোখ বন্ধ করে সেই ভয়াবহ দৃশ্যটি কল্পনা করুন। যে আলেম, যে বক্তা, যে দ্বীনের দাঈ দুনিয়ার বুকে মানুষের কাছে সম্মানিত ছিল, ক্বিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুনে তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে পড়েছে আর সে পেষণের চাকায় বাঁধা গাধার মতো অন্তহীন যন্ত্রণায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার এই অপমানজনক পরিণতি দেখে জাহান্নামীরাও অবাক হয়ে প্রশ্ন
করছে, ‘আপনি না আমাদের সৎ পথের দিশা দিতেন?’ এই দৃশ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যে জ্ঞান ও উপদেশ নিজের জীবনকে পরিবর্তন করতে পারে না, তা আল্লাহর কাছে কতখানি মূল্যহীন ও ঘৃণিত। আমাদের প্রতিটি উপদেশ, প্রতিটি স্ট্যাটাস, প্রতিটি লেকচার প্রথমে আমাদের নিজেদের আত্মার জন্য হওয়া উচিত। নতুবা যে জ্ঞান আমাদের মুক্তির আলো হওয়ার কথা ছিল, সেই জ্ঞানই ক্বিয়ামতের দিন আমাদের কপটতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে এবং জাহান্নামের জ্বালানিতে পরিণত হবে। তাই আজ নিজেকে প্রশ্ন করার সময় এসেছে- আমার অর্জিত জ্ঞান কি আমার মুক্তির অছীলা, নাকি আমারই বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে সবচেয়ে বড় অভিযোগকারী?
উপসংহার :
পরিশেষে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের জীবনকে আমলহীন ইলমের অভিশাপ থেকে রক্ষা করেন। আমাদেরকে এমন উপকারী জ্ঞান দান করেন, যা হৃদয়ে ঈমানের নূর জ্বালিয়ে দেয়, জীবনে পরিবর্তন আনে, আমাদেরকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে হেদায়াতের পথে পরিচালিত করে। মহান আল্লাহ আমাদের জ্ঞানকে জান্নাতের সোপন হিসাবে কবুল করুন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন! ইয়া রববাল আলামীন!
-আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ*
*. এম.ফিল গবেষক, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়।
[1]. খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলম, পৃ. ৩৭।
[2]. আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ ওয়ার রাক্বায়েক্ব, পৃ. ১৪; আহমাদ ইবনে হাম্বল, আয-যুহদ, পৃ. ১১২।
[3]. শাতেবী, আল-মুওয়াফাক্বাত (কায়রো : দারু ইবনে আফ্ফান, ১ম প্রকাশ, ১৪১৭হি./১৯৯৭খৃ.) ১/৭২।
[4]. খত্বীব বাগদাদী, আল-জামে‘ লি-আখলাক্বির রাবী ওয়া আদাবিস সামি, মুহাক্কিক্ব : ড. মাহমূদ আত-তাহ্হান (রিয়াদ : মাকতাবাতুল মা‘আরেফ, তাবি) ১/৯০।
[5]. ইবনুল জাওযী, আত-তাযকিরাহ ফীল ওয়ায (বৈরূত : দারুল মা‘রেফাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪০৬হি.), পৃ. ৯৬।
[6]. হাফেয জামালুদ্দীন মিযযী, তাহযীবুল কামাল ফী আস্মাইর রিজাল, মুহাক্কিক্ব : ড. বাশশার আওয়াদ মা‘রূফ (বৈরূত : মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪০০হি./১৯৮০খৃ.), ২৩/২৯৩।
[7]. ইবনু সা‘দ, আত-তাবাক্বাতুল কুবরা (কায়রো : মাকতাবাতুল খানজী, ১ম মুদ্রণ, ১৪২১হি./২০০১খৃ.) ৯/২৮০।
[8]. ইবনু শাহীন, তারীখু আসমাইছ ছিক্বাত, মুহাক্কিক্ব : ছুবহী সামিরাঈ (কুয়েত : আদ-দারুস সালাফিইয়াহ, ১ম প্রকাশ, ১৪০৪হি./১৯৮৪খৃ.) পু. ১০৫।
[9]. ছহীহ মুসলিম হা/২২৩; মিশকাত হা/২৮১।
[10]. সুনানে সা‘দ ইবনে মানছূর ২/৩৯৩; ইক্বতিযাউল ইলমি আল-আমল, পৃ. ৭১।
[11]. আবূ যর ক্বালামূনী, ফাফির্রূ ইলাল্লাহ (কায়রো : মাকতাবাতুছ ছাফা, ৫ম মুদ্রণ, ১৪২৪হি.), পৃ. ২৯৫; ই‘লামুল আছহাব, পৃ. ৬০৬।
[12]. খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলম, পৃ. ৪৪।
[13]. ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া, তাহক্বীক: আহমাদ ইবনে আলী (কায়রো: দারুল হাদীছ, ২০০০খ্রিঃ/১৪২১হিঃ), ১/৫৫০; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্বক, ৫১/১২।
[14]. খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলম, পৃ. ৫৫।
[15]. শামসুদ্দীন যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, মুহাক্কিক্ব : শু‘আইব আরনাউত্ব ও অন্যান্য (বৈরূত : মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ৩য় মুদ্রণ, ১৪০৫হি./১৯৮৫খৃ.) ৪/৩০৩।
[16]. খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলম, পৃ. ৫৩।
[17]. মুসলিম হা/১৯০৫।
[18]. তিরমিযী হা/২৩৮২; হাকেম হা/১৫২৭; ছহীহ ইবনু হিববান হা/৪০৮।
[19]. বুখারী হা/৩২৬৭; মিশকাত হা/৫১৩৯।