ভূমিকা : জ্ঞান হ’ল আলো। আর আমল হ’ল সেই আলোর প্রতিফলন। একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ। আমলবিহীন ইলম যেমন নিষ্প্রাণ বোঝা, ঠিক তেমনি ইলমবিহীন আমলও অন্ধের পথচলার মত বিপদসংকুল। সেজন্য ইলম ও আমলের সমন্বয়ের মাঝেই মুমিনের প্রকৃত সফলতা ও মর্যাদা নিহিত থাকে। পুণ্যবান সালাফগণ সামান্য জ্ঞান পেলে সেটা দিয়ে আমলের পাহাড় গড়তেন। আর আমারা জ্ঞানের বিশাল সমুদ্রে ডুব দিয়েও আমলের ক্ষেত্রে দেওলিয়া। জ্ঞান ও কর্মের বৈপরীত্যই মূলত এই অবক্ষয়ের মূল কারণ। কিভাবে এই নিষ্ফল জ্ঞানকে জীবন্ত আমলে রূপান্তরিত করা যায়? কিভাবে এ দুইয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে নাজাতের পথে ফেরা যায়? তার কার্যকরী উপায় খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে।
ইলম ও আমলের মাঝে সমন্বয় করার উপায়
১. নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা :
আমলের বাগানে প্রথম যে বীজটি রোপণ করতে হয়, তা হ’ল বিশুদ্ধ নিয়তের বীজ। এই বীজটা যদি লৌকিকতা ও পার্থিব স্বার্থের বিষে দুষ্ট হয়, তবে ইলমের সুউচ্চ বৃক্ষটিও নিষ্ফলতায় পর্যবসিত হয়। তাই ইলম অনুযায়ী আমল করার প্রথম শর্ত হ’ল নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা, একে একান্তভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত করা। ইলম অর্জনের মূল উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত, তা স্বয়ং আল্লাহ আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন,وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ، ‘আর মুমিনদের এটা সঙ্গত নয় যে, সবাই একত্রে (জিহাদে) বের হবে। অতএব তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং ফিরে এসে নিজ কওমকে (আল্লাহর নাফরমানী হ’তে) ভয় প্রদর্শন করতে পারে, যাতে তারা সাবধান হয়’ (তওবা ৯/১২২)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আললামা আব্দুর রহমান সা‘দী (রহঃ) বলেন, ‘যে ইলম শিখেছে, তার দায়িত্ব হ’ল তা বান্দাদের মাঝে প্রচার করা ও ছড়িয়ে দেওয়া এবং এ বিষয়ে তাদের নছীহত করা। কেননা আলেমের পক্ষ থেকে ইলম প্রচার করা তার বরকতের অংশ এবং বর্ধনশীল প্রতিদান’।[1]
তাই ইলমের উদ্দেশ্য হ’ল প্রথমে নিজে আমল করা, অতঃপর অন্যকে নছীহত করা, সতর্ক করা। এই নিয়তের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে আবূ আব্দুল্লাহ আহমাদ ইবনে ‘আত্বা আর-রূযাবারী (মৃ.৩৬৯হি.) বলেন, مَنْ خَرَجَ إِلَى الْعِلْمِ يُرِيدُ الْعِلْمَ، لَمْ يَنفَعْهُ الْعِلْمُ، وَمَنْ خَرَجَ إِلَى الْعِلْمِ يُرِيدُ الْعَمَلَ بِالْعِلْمِ، نَفَعَهُ قَلِيلُ الْعِلْمِ، وقَالَ: الْعِلْمُ مَوْقُوفٌ عَلَى الْعَمَلِ بِهِ، وَالْعَمَلُ مَوْقُوفٌ عَلَى الْإِخْلَاصِ، وَالْإِخْلَاصُ لِلَّهِ يُورِثُ الْفَهْمَ عَنِ اللهِ عز وجل، ‘যে ব্যক্তি শুধু জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে ইলমের সন্ধানে বের হয়, ইলম তার কোন উপকার করে না। আর যে ব্যক্তি ইলম অনুযায়ী আমল করার উদ্দেশ্যে ইলমের সন্ধানে বের হয়, সামান্য ইলমই তার উপকার করে। তিনি আরো বলেন, ইলম আমলের উপর নির্ভরশীল, আর আমল ইখলাছের উপর নির্ভরশীল। আর আল্লাহর জন্য ইখলাছ মানুষকে তাঁর পক্ষ থেকে গভীর প্রজ্ঞা দান করে’।[2] বর্তমান সময়ে আমাদের মাঝে এমন অনেকে আছেন, যারা ইলমের পাহাড় গড়েছেন, কিন্তু সে অনুযায়ী আমলের তাওফীক্ব হয়নি। আবার এমন সাধারণ মানুষও আছেন, যিনি হয়তো শুধু জেনেছেন যে ‘ছালাত আদায় করা ফরয, ক্বিয়ামতর দিন সর্বপ্রথম ছালাতের হিসাব গ্রহণ করা হবে। আর তা জানার পর জীবনে কখনো ছালাত ছাড়েননি। ঐ ‘সামান্য ইলম’ই তার নাজাতের জন্য যথেষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
তবে কখনো এমন হ’তে পারে যে, ইলম অর্জনের শুরুতে নিয়ত শতভাগ পরিশুদ্ধ ছিল না। হয়তো দুনিয়ার কোন চাকচিক্য বা পার্থিব স্বার্থ মনের কোণে উঁকি দিয়েছিল। কিন্তু ইলমের নূর এতই শক্তিশালী যে, তা যদি নিষ্ঠার সাথে অন্বেষণ করা হয়, তবে তা একসময় অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে ফেলে। মা‘মার (৯৫-১৫৩হি.) বলেন, مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِغَيْرِ اللهِ يَأْبَى عَلَيْهِ الْعِلْمُ حَتَّى يُصَيِّرَهُ إِلَى اللَّهِ، ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর জন্য ইলম অন্বেষণ করে, ইলম তাকে প্রত্যাখ্যান করতে থাকে, যতক্ষণ না সে ইলমকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে’।[3] বর্তমান সমাজের অধিকাংশ মানুষ শুধু সার্টিফিকেট, চাকরী, খ্যাতি বা দুনিয়াবী পদের জন্য ইলম অর্জন করেন। ফলে সেই ইলমে বরকত থাকে না। সুতরাং এই জ্ঞান তখনই সত্যিকারের উপকারী ও বরকতময় হবে, যখন তা আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মানুষের নিঃস্বার্থ কল্যাণের উদ্দেশ্যে খালেছ করা হবে।
হাবীব ইবনু আবী ছাবিত (মৃ. ১১৯হি.) বলেন,طَلَبْنَا هَذَا الْأَمْرَ وَلَيْسَ لَنَا فِيهِ نِيَّةٌ ثُمَّ جَاءَتِ النِّيَّةُ بَعْدُ، ‘আমরা এই ইলম অন্বেষণ শুরু করেছিলাম, তখন আমাদের কোন (খালেছ) নিয়ত ছিল না। অতঃপর নিয়ত পরে এসেছে’।[4] এমনকি ইমাম হাসান আল-বাছরী ও সুফিয়ান আছ-ছাওরী (রহঃ) থেকেও বর্ণিত হয়েছে, তাঁরা বলতেন,كُنَّا نَطْلُبُ الْعِلْمَ لِلدُّنْيَا؛ فجرَّنا إِلَى الْآخِرَةِ، ‘আমরা দুনিয়ার জন্য ইলম অন্বেষণ শুরু করেছিলাম, অতঃপর তা (ইলম) আমাদেরকে আখেরাতের দিকে টেনে নিয়ে গেছে’।[5]
অনেকে হয়তো দুনিয়াবী সম্মান, উপাধি বা চাকরীর লোভে জ্ঞানার্জন শুরু করে। কিন্তু পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চা করতে গিয়ে তাদের অন্তর পরিশুদ্ধ হয়ে যায় এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পরকালমুখী হয়ে যায়। তাই শুরুতেই হতাশ না হয়ে আল্লাহর কাছে খাঁটি নিয়তের জন্য বেশী বেশী দো‘আ করা উচিত।
২. আমল করার উদ্দেশ্যে ইলম হাছিল করা :
জ্ঞানার্জন কোন একাডেমিক বিলাসিতা নয়, বরং তা হ’ল অন্ধকারে পথচলার জন্য আলো সংগ্রহ করা। যে ব্যক্তি কেবল জানার জন্য জানে, কিন্তু মানার জন্য নয়, সে যেন এমন এক ভোজনরসিক, যিনি কেবল সুস্বাদু খাবারের বর্ণনা শোনেন; কিন্তু কখনো সেই খাবারের স্বাদ আস্বাদন করেন না। জনৈক সালাফ বলেন, الْعِلْمُ خَادِمُ الْعَمَلِ، وَالْعَمَلُ غَايَةُ الْعِلْمِ، فَلَوْلَا الْعَمَلُ لَمْ يُطْلَبْ عِلْمٌ، وَلَوْلَا الْعِلْمُ لَمْ يُطْلَبْ عَمَلٌ، وَلَأَنْ أَدَعَ الْحَقَّ جَهْلًا بِهِ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَدَعَهُ زُهْدًا فِيهِ، ‘ইলম হ’ল আমলের সেবক। আর আমল হ’ল ইলমের চূড়ান্ত লক্ষ্য। যদি আমল না থাকত, তবে ইলম অন্বেষণ করা হ’ত না। আর যদি ইলম না থাকতো, তবে আমল অন্বেষণ করা হ’ত না। আর হক্ব বা নেক আমল সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও অবহেলাবশত তা ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে আমার কাছে না জানার কারণে সেই আমল ছেড়ে দেওয়া উত্তম’।[6] উদাহরণস্বরূপ, একজন সাধারণ রিকশাচালক, যে হয়তো জানেই না তাহাজ্জুদের ফযীলত কী, ক্বিয়ামতের দিন তার জবাবদিহিতা, আর সেই আলেমের জবাবদিহিতা এক নয়, যিনি তাহাজ্জুদের উপর শত শত হাদীছ মুখস্থ করেছেন, জেনেছেন; কিন্তু কখনো শেষ রাতে সিজদায় মাথা রাখেননি।
ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যের উপরই নির্ভর করে আত্মিক উন্নতি বা অবনতি। মালেক ইবনে দীনার (মৃ. ১৪০ হি.) বলেন, مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِلْعَمَلِ وَفَّقَه الله وَمَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِغَيْرِ الْعَمَلِ يَزْدَادُ بِالْعِلْمِ فَخْرًا، ‘যে ব্যক্তি আমল করার জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করে, আল্লাহ তাকে সেই জ্ঞানের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার তাওফীক্ব দান করেন। আর যে ব্যক্তি আমল করার উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে অন্য কোন কারণে ইলম তালাশ করে, সেই জ্ঞানের মাধ্যমে তার অংহকার বৃদ্ধি পায়’।[7] সত্যিই তাই। যখন একজন আলেম তার ইলম দিয়ে মানুষের বাহবা কুড়ান, তখন তার অহংকার বাড়ে। কিন্তু যখন তিনি সেই ইলম অনুযায়ী গভীর রাতে একাকী আল্লাহর সামনে কাঁদেন, তখন আল্লাহ তাকে বিনয়ী হওয়ার তাওফীক্ব দান করেন।
ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৬হি.) বলেন, এমন কত আলেম আছে, আল্লাহ যাকে তার অর্জিত ইলমের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার তাওফীক্ব দেননি, ফলে স্বীয় জ্ঞান অনুযায়ী সে আমল করতে পারেনি। আবার এমন কত সাধারণ লোক আছে, আল্লাহ যাকে নেক আমল করার তাওফীক্ব দিয়ে সম্মানিত করেছেন।[8] লুকমান হাকীম স্বীয় সন্তানকে উপদেশ দিয়ে বলেন, يَا بُنَيَّ! لَا تَتَعَلَّمْ مَا لَا تَعْلَمُ حَتَّى تَعْمَلَ بِمَا تَعْلَمُ، ‘বৎস আমার! অর্জিত জ্ঞানের উপর আমল না করা পর্যন্ত অজানা ইলম শিখ না’।[9]
তাই সালাফে ছালেহীন যখন নতুন কিছু শিখতেন, তখন সাথে সাথে তা আমলে পরিণত করতেন। আবূ ক্বিলাবাহ (মৃ. ১০৪হি.) বলেন, إِذَا أَحْدَثَ اللهُ لَكَ عِلْمًا فَأَحْدِثْ لَهُ عِبَادَةً، وَلَا يَكُنْ إِنَّمَا هَمُّكَ أَنْ تُحَدِّثَ بِهِ النَّاسَ، ‘যখন আল্লাহ তোমাকে কোন নতুন ইলম দান করেন, তখন তুমি তার জন্য নতুন একটি ইবাদত চালু কর। আর (ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে) তোমার একমাত্র উদ্দেশ্য যেন এটা না হয় যে, তুমি তা লোকদেরকে বলে বেড়াবে’।[10] কি অপূর্ব নছীহত! আজ আমরা নতুন একটি হাদীছ জানলে বা নতুন কোন মাসআলা শিখলে আমাদের প্রথম উদ্দেশ্য থাকে কখন তা ফেইসবুকে শেয়ার করবো বা মানুষকে বলে বেড়াব। যদিও খালেছ নিয়তে মানুষকে সেটা জানালে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু আবূ ক্বিলাবাহ (রহঃ)-এর উপদেশটা একটু গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মনে হবে যে, আপনার-আমার প্রথম কাজ হ’ল নিজে সেই অনুযায়ী একটি নতুন ইবাদত শুরু করা। যেমন আপনি আজ জানলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রতি রাতে সূরা সাজদাহ ও সূরা মুলক তেলাওয়াত করতেন এবং সূরা দু’টি তেলাওয়াত না করা পর্যন্ত তিনি ঘুমাতেন না।[11] এখন আমাদের প্রথম কাজ কি? এই হাদীছটি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া? নাকি আজ রাত থেকেই ঘুমের আগে সূরা দু’টি তেলাওয়াত করা?
জ্ঞানী ও তথ্য বর্ণনাকারীর মাঝে মূল পার্থক্য এটাই। তারা কোন ইলম হাছিল করলে আগে নিজে আমল করতেন, তারপর সেটা প্রচার করতেন। আর আমাদের কর্মনীতি তাদের থেকে কতই না দূরে! হাসান বাছরী (২১-১১০ হি.) বলেন, هِمَّةُ الْعُلَمَاءِ الرِّعَايَةُ، وَهِمَّةُ السُّفَهَاءِ الرِّوَايَةُ، ‘আলেমদের মূল লক্ষ্য হ’ল ইলমের যত্ন নেওয়া বা বাস্তবায়ন করা। আর নির্বোধদের লক্ষ্য হ’ল শুধু বর্ণনা করা’।[12] বর্তমান যুগ হ’ল ইলম বর্ণনার যুগ। আমরা অধিকাংশই কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং শেয়ারকারী। কিন্তু ইলমের যত্ন কয়জন করি? আমরা গীবতের ভয়াবহতা নিয়ে লেকচার শেয়ার করি, আবার নিজেরাই বন্ধুদের আড্ডায় গীবতে লিপ্ত হই।
ইলম অর্জনের একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ দিয়েছেন ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (৯৭-১৬১ হি.)। তিনি বলেন,أَوَّلُ الْعِلْمِ الصَّمْتُ، وَالثَّانِي الِاسْتِمَاعُ لَهُ وَحِفْظُهُ، وَالثَّالِثُ الْعَمَلُ بِهِ، وَالرَّابِعُ نَشْرُهُ وَتَعْلِيمُهُ، ‘ইলমের প্রথম (স্তর) হ’ল নীরবতা। দ্বিতীয়, তা শোনা ও মুখস্থ করা। তৃতীয়, সে অনুযায়ী আমল করা। চতুর্থ, তা প্রচার করা ও শিক্ষা দেওয়া’।[13] লক্ষ্য করুন, ‘আমল’কে তিনি ‘প্রচার’-এর আগে রেখেছেন। অথচ আমরা দ্বিতীয় স্তর (শোনা) থেকেই চতুর্থ স্তরে (প্রচার) লাফ দেই। মাঝখানের তৃতীয় স্তর (আমল) গায়েব করে দেই! ফলে আমাদের জীবনে অর্জিত ইলমের কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। যদি প্রশ্ন করা হয়, সালাফদের স্মৃতিশক্তি এত প্রখর কেন ছিল? তার একটি গোপন রহস্য হ’ল, তারা ইলমকে আমল দিয়ে বেঁধে ফেলতেন। ইমাম শা‘বী (রহঃ) বলেন, كُنَّا نَسْتَعِينُ عَلَى حِفْظِ الْحَدِيثِ بِالْعَمَلِ بِهِ، ‘আমরা হাদীছ মুখস্থ করার জন্য সে অনুযায়ী আমল করার সাহায্য নিতাম’।[14]
সুতরাং দ্বীনের জ্ঞান হাছিলের মূল উদ্দেশ্য হ’তে হবে সার্বিক জীবনে সেই জ্ঞানের বাস্তবায়ন। নতুবা সেই জ্ঞানের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার তাওফীক্ব লাভ করা সম্ভব নয়। যদি কখনো ইলম ও আমলের মাঝে কোনটা বেশী যরূরী তা নিয়ে সংশয় হয়, তবে আবূ উবাইদ (রহঃ)-এর ঘটনাটি মনে রাখা উচিত। তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে ইদরীস (রহঃ) একবার আমাকে বিভিনণ আলেমের ঘটনা শুনাচিছলেন। আমিও খুব মনোযোগ দিয়ে তা শুনছিলাম। তখন তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, يَا أَبَا عُبَيْدٍ! مَهْمَا فَاتَكَ مِنَ الْعِلْمِ، فَلَا يَفُوتَنَّكَ الْعَمَلُ، ‘হে আবূ উবাইদ! ইলমের কিছু গেলে যাক, তবে অবশ্যই যেন আমল ছুটে না যায়’।[15] একজন ছাত্র হয়তো নতুন একটি বই পড়ার (ইলম) বা তার অসুস্থ মায়ের সেবা করার (আমল) মাঝে দোটানায় আছে। এই মুহূর্তে তার জন্য নতুন বই পড়ার চেয়েও মায়ের সেবা করাটা বেশী যরূরী। অর্থাৎ জ্ঞান অর্জনে কিছু সুযোগ হাত ছাড়া হ’লেও সমস্যা নেই, কিন্তু আমল করার সুযোগ যেন কোনভাবেই হাতছাড়া না হয়।
আর যারা ইলমকে শুধু দুনিয়াবী স্বার্থে বা সন্দেহ ছড়ানোর জন্য ব্যবহার করে, তাদের জন্য কঠিন হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ طَلَبَ العِلْمَ لِيُجَارِيَ بِهِ العُلَمَاءَ، أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ، أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ، أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَ، ‘যে ব্যক্তি আলেমদের সাথে তর্ক বাহাছ করা অথবা জাহেল-মূর্খদের সাথে বাকবিতন্ডা করার জন্য এবং মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে ইলম হাছিল করেছে, আল্লাহ তাকে জাহানণামে নিক্ষেপ করবেন।’।[16]
ইমাম আওযাঈ (রহঃ) বলেন, وَيْلٌ لِلْمُتَفَقِّهِينَ لِغَيْرِ الْعِبَادَةِ، وَالْمُسْتَحِلِّينَ الْحُرُمَاتِ بِالشُّبُهَاتِ، ‘দুর্ভোগ সেই ফক্বীহদের (জ্ঞানীদের) জন্য যারা ইবাদত ব্যতীত অন্য উদ্দেশ্যে (ইলম শিখে), এবং যারা বিভিন্ন সন্দেহের মাধ্যমে হারামকে হালাল করে’।[17]
ফুযাইল ইবনে ইয়ায (রহঃ) বলেন, عَلَى النَّاسِ أَنْ يَتَعَلَّمُوا، فَإِذَا عَلِمُوا فَعَلَيْهِمُ الْعَمَلُ، ‘ইলম অর্জন করা মানুষের কর্তব্য। আর যখন শেখা হয়ে যাবে, তখন সেই অর্জিত ইলমের প্রতি আমল করা অপরিহার্য’।[18]
৩. ইলমের শিষ্টাচার বা আদব রক্ষা করা :
প্রতিটি মূল্যবান বস্ত্তরই একটি আবরণ থাকে, যা তাকে রক্ষা করে। আর ইলমের আবরণ হ’ল তার আদব বা শিষ্টাচার। এটা ইলম ও আমলের মধ্যবর্তী সেতুবন্ধন। আদব বিহীন জ্ঞান কেবল মস্তিষ্কে জমা হয়; আত্মায় প্রবেশ করে না। তাই ইলমকে আমলে রূপদানের জন্য আদবের প্রতি যত্নবান হওয়া অপরিহার্য। ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈনে এযাম এবং সালাফে ছালেহীন ইলম অর্জনের আগে আদব শেখাকে বেশী গুরুত্ব দিতেন। কারণ তারা জানতেন, আদব ছাড়া ইলম একটি লাগামহীন ঘোড়ার মত, যা আরোহীকে নিয়েই ধ্বংসের দিকে ছুটে যায়। তাই খলীফা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, تَأَدَّبُوا ثُمَّ تَعَلَّمُوا، ‘আগে শিষ্টাচার শেখ, তারপর জ্ঞানার্জন কর’।[19] ইমাম ইবনু শিহাব যুহরী (৫৩-১২৪হি.) বলেন,كُنَّا نَأْتِي الْعَالِمَ فَمَا نَتَعَلَّمُ مِنْ أَدَبِهِ أَحَبُّ إِلَيْنَا مِنْ عِلْمِهِ، ‘আমরা যখন কোন আলেমের কাছে আসতাম, তখন তাঁর জ্ঞান থেকে যা শিখতাম, তার চেয়ে অধিক প্রিয় ছিল তাঁর শিষ্টাচার থেকে যা শিখতাম’।[20] হাজ্জাজ ইবনে আরতাআহ (রহ.) বলেন,إِنَّ أَحَدَكُمْ إِلَى أَدَبٍ حَسَنٍ أَحْوَجُ مِنْهُ إِلَى خَمْسِينَ حَدِيثًا، ‘তোমাদের কেউ পঞ্চাশটি হাদীছ শেখার চেয়ে একটি সুনদর শিষ্টাচার শেখার প্রতি বেশী মুখাপেক্ষী’।[21] আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (১১৮-১৮১হি.) বলেন, نَحْنُ إِلَى قَلِيلٍ مِنْ الْأَدَبِ أَحْوَجُ مِنَّا إِلَى كَثِيرٍ مِنْ الْعِلْمِ، ‘বিপুল জ্ঞানের চেয়ে আমাদের অল্প শিষ্টাচারের প্রয়োজনই বেশী’।[22]
ইমাম মালেক (৫৩-১৭৯হি.)-এর সুযোগ্য ছাত্র আব্দুল্লাহ ইবনু ওয়াহ্হাব (১২৫-১৮৭হি.) বলেন, الَّذِي نَقَلْنَا مِنْ أَدَبِ مَالِكٍ أَكْثَرُ مِمَّا تَعَلَّمْنَاهُ مِنْ عِلْمِهِ، ‘আমরা ইমাম মালেকের জ্ঞান থেকে যা শিখেছি, তার চেয়ে পরিমাণে অনেক বেশী তাঁর শিষ্টাচার থেকে গ্রহণ করেছি’।[23] ইবরাহীম ইবনু হাবীব ইবনুশ শাহীদ (মৃ. ২০৩হি.) বলেন, আমার আববা আমাকে বলেছেন,يَا بُنَيَّ، إِيتِ الْفُقَهَاءَ وَالْعُلَمَاءَ، وَتَعَلَّمْ مِنْهُمْ، وَخُذْ مِنْ أَدَبِهِمْ وَأَخْلَاقِهِمْ وَهَدْيِهِمْ، فَإِنَّ ذَاكَ أَحَبُّ إِلَيَّ لَكَ مِنْ كَثِيْرٍ مِنَ الْحَدِيثِ، ‘হে আমার বেটা! ফক্বীহ ও আলেমদের নিকট যাও, তাদের থেকে ইলম শেখ। আর (বিশেষভাবে) তাদের শিষ্টাচার, আখলাক্ব ও চালচলন থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর। অনেক বেশী হাদীছ শেখার চেয়ে তোমার জন্য এই শিষ্টাচার শেখা আমার কাছে অধিকতর প্রিয়’।[24]
ইলমের শিষ্টাচার বা আদব বলতে কি বুঝানো হয়? এ মর্মে খাত্বীব আল-বাগদাদী (৩৯২-৪৬৩হি./১০০২-১০৭২খৃ.) বলেন, وَالْوَاجِبُ أَنْ يَكُونَ طَلِبَةُ الْحَدِيثِ أَكْمَلَ النَّاسِ أَدَبًا، وَأَشَدَّ الْخَلْقِ تَوَاضُعًا، وَأَعْظَمَهُمْ نَزَاهَةً وَتَدَيُّنًا، وَأَقَلَّهُمْ طَيْشًا وَغَضَبًا، ‘হাদীছ অন্বেষণকারীদের জন্য অপরিহার্য হ’ল- মানুষের মধ্যে সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ শিষ্টাচারের অধিকারী হওয়া, সৃষ্টির মাঝে সর্বাধিক বিনয়ী হওয়া, সততা ও ধার্মিকতায় শ্রেষ্ঠতম হওয়া এবং অস্থিরতা ও ক্রোধে সর্বনিমণ হওয়া’।[25] ইমাম আল-গাযালী (৪৫০-৫০৫হি./১০৫৭-১১১১খৃ.) বলেন, مِنْ آدَابِ الْمُتَعَلِّمِ...طَهَارَةُ النَّفْسِ عَنْ رَذَائِلِ الْأَخْلَاقِ وَمَذْمُومِ الْأَوْصَافِ وَالصِّفَاتِ الرَّدِيئَةِ مِثْلَ: الْغَضَبِ وَالشَّهْوَةِ وَالْحِقْدِ وَالْحَسَدِ وَالْكِبْرِ وَالْعُجْبِ وَأَخَوَاتِهَا، ‘শিক্ষার্থীর অন্যতম শিষ্টাচার হ’ল...আতমাকে নীচু নৈতিকতা, নিনিদত বৈশিষ্ট্য এবং মনদ গুণাবলী থেকে পবিত্র রাখা। যেমন ক্রোধ, কুপ্রবৃত্তি, বিদ্বেষ, হিংসা, অহংকার, আতমমুগ্ধতা এবং এ জাতীয়
অন্যান্য বদ অভ্যাস’।[26]
এ কারণেই সালাফগণ ইলম বিতরণের আগে দেখতেন- ইলম অর্জনকারীর আদব ঠিক আছে কি-না! আর তারা শুধু সিলেবাস শেষ করতেন না, বরং ছাত্ররা যা শিখল, সে অনুযায়ী আমল করল কি-না, সেই খবরও নিতেন। শু‘আইব ইবনে হারব (রহঃ) ইলম অর্জনের জন্য সুফিয়ান ছাওরী (৯৭-১৬১ হি.)-এর কাছে গেলেন। তখন সুফিয়ান (রহঃ) তাকে বললেন, حَتَّى تَعْمَلُوا بِمَا تَعْلَمُونَ ثُمَّ تَأْتُونِي فَأُحَدِّثكُمْ، ‘তোমরা অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমল কর। এরপর আমার কাছে এসো, তখন আমি তোমাদের হাদীছ শুনাব’।[27] ইমাম সুফিয়ান (রহঃ) আগে আমলের ‘হোমওয়ার্ক’ জমা নিয়েছেন, তারপর নতুন ‘ইলম’ শিক্ষা দিয়েছেন।
আদব ও আমল নিশ্চিত না করে শুধু তথ্য দিয়ে মস্তিষ্ক বোঝাই করা সালাফদের পদ্ধতি ছিল না। তাই ইলম ও আমলের মাঝে সমন্বয় ঘটাতে চাইলে জ্ঞানের আগে আদবকে তার যথার্থ স্থানে ফিরিয়ে আনা আবশ্যক। আব্দুল্লাহ ইবনু হারূন (রহঃ) বলেন, ‘আমি মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ আল-ফিরইয়াবী (১২০-২১২হি.)-এর কাছে এসে বললাম, আমাকে পাঁচটি হাদীছ বলুন। তিনি বললেন, ঠিক আছে। আমি তাঁর সামনে পড়তে শুরু করলাম, আর তিনি গণনা করছিলেন, যা আমি জানতাম না। যখন আমি ষষ্ঠটি শুরু করলাম, তিনি বললেন, اذْهَبْ فَتَعَلَّمِ الصِّدْقَ، ثُمَّ اكْتُبِ الْحَدِيثَ، ‘যাও, আগে সত্যবাদিতা শেখ, তারপর হাদীছ লেখ’।[28]
সালাফদের কর্মনীতি আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় নছীহত। আমরা শুধু সিলেবাস শেষ করছি, কিন্তু ছাত্ররা যা শিখল তা আমল করলো কি-না, সেই খবর নিচ্ছি না। ইলম অর্জনের আগে তাই আত্মাকে পবিত্র করা, আর ইলম অর্জনের পরে আমল করা আবশ্যক। অন্যথায় শুধু তথ্য সংগ্রহ করা হবে, আলেম উপাধি পাওয়া যাবে; কিন্তু সেই ইলমের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা লাভ করা সম্ভব হবে না।
৪.আমল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা :
ইলম অর্জনের পর আমাদের হৃদয়ে যে আবেগ ও অনুভূতি তৈরী হয়, তা অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু সেই আবেগ যদি বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় রূপ না নেয়, তবে তা ভোরের শিশিরের মত উবে যায়। আমরা অনেকেই কোন আলেমের বক্তব্য শুনে বা বই পড়ে ভীষণভাবে আলোড়িত হই, কিন্তু পরক্ষণেই ভুলে যাই। কারণ আমরা সেই ইলমকে ‘আমলে’ পরিণত করার কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করি না। অথচ আমাদের সালাফগণ যখন কুরআন-হাদীছের কোন ইলম অর্জন করতেন, তখন সেটা তাদের জীবনে খুব গভীরভাবে রেখাপাত করত। ইসমাঈল ইবনে ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেন, ‘একবার সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) আমাকে দেখলেন, আমি কা‘বা ঘরের পাশে বনু শাইবা গোত্রের এক ব্যক্তির সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করছিলাম। আমাকে এভাবে হাসতে দেখে সুফিয়ান (রহঃ) বললেন, تَبْتَسِمُ فِي هَذَا الْمَوْضِعِ إِنْ كَانَ الرَّجُلُ لَيَسْمَعُ الْحَدِيثَ الْوَاحِدَ فَنَرَى عَلَيْهِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ سَمْتَهُ وَهَدْيَهُ، ‘তুমি কি এই জায়গায় (বায়তুল্লাহর পাশে) হাসছ? পূর্বের মানুষদের অবস্থা তো এমন ছিল যে, কোন ব্যক্তি যখন একটি হাদীছ শুনত, তখন আমরা তাদের চেহারা, চলাফেরা ও আচার-আচরণে তিন দিন পর্যন্ত এর প্রভাব ও গাম্ভীর্য দেখতে পেতাম’।[29] আল্লাহু আকবার! ভাবুন তো, একটি হাদীছ শোনার পর তিন দিন যাবৎ তাঁদের মধ্যে এর প্রভাব থাকত! তাঁরা সেই হাদীছটি নিয়ে ভাবতেন, তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করতেন। আর আমাদের অবস্থা কী? আমরা প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় শত শত হাদীছ স্ক্রল করে চলে যাই, জুমু‘আর খুৎবায় ইমামের হৃদয়গ্রাহী আলোচনায় কাঁদি; কিন্তু মসজিদ থেকে বের হ’তেই সব ভুলে যাই। আমাদের প্রভাব তিন মিনিটও থাকে না, আর তাঁদের থাকত তিন দিন! কারণ তাঁরা ইলমকে গ্রহণ করতেন ‘আমলের পরিকল্পনা’ দিয়ে, আর আমরা গ্রহণ করি নিছক ‘তথ্য’ হিসাবে।
ইলমকে আমলে বাস্তবায়নের জন্য অন্যতম কার্যকরী উপায় হ’ল- কোন জ্ঞান অর্জনের সাথে সাথে যত দ্রুত সম্ভব তা সম্পাদন করে ফেলা অথবা সেই আমল সম্পাদনের পকিল্পনা করে ফেলা। উদাহরণ স্বরূপ, ধরুন! আপনি আজ ইলম অর্জন করলেন যে, ‘ছালাতে তাড়াহুড়া করা শয়তানের পক্ষ থেকে’। তখন ‘পরিকল্পনা’ এমন হওয়া উচিত যে, ‘আমি আমার পরবর্তী যোহরের ছালাত থেকেই প্রতিটি রুকন ধীরস্থিরভাবে আদায় করব’। অথবা আপনি জানলেন যে, ‘পরনিন্দা করা মারাত্মক কাবীরা গুনাহ, এটা মানুষকে জাহান্নামের দিকে ধাবিত করে’। তখন পরিকল্পনা করতে হবে যে, ‘এরপর থেকে কারো সাথে গল্প করার সময় আমার মুখ দিয়ে যেন অন্য কোন ভাইয়ের গীবত না হয়ে যায়, সে ব্যাপারে অবশ্যই আমি খেয়াল রাখব’। অনুরূপভাবে আপনি জানতে পারলেন, ‘হাসিমুখে কথা বলা ছাদাকা স্বরূপ’। আজ থেকেই পরিবারের সদস্যদের সাথে হাসিমুখে কথা বলার অনুশীলন করূন। যখনই আপনি পরিকল্পনা মাফিক কাজ শুরু করবেন, তখন ঐ ইলমটি আপনার হৃদয়ে গেঁথে যাবে। ইলম তখন আর নিছক তথ্য থাকবে না, বরং তা আপনার ‘আমল’ হয়ে জীবন্ত হয়ে উঠবে।
বড় বড় আমলের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা আরো সুনির্দিষ্ট এবং পরিচ্ছন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই পরিকল্পনা ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন রকম হ’তে পারে। বিশেষকরে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত, পাপ ও হারাম বিষয় থেকে বেঁচে থাকা, সকাল-সন্ধ্যার যিকর, কুরআন তেলাওয়াত প্রভৃতি ইবাদতের ব্যাপারে পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। এভাবে প্রতিদিন অর্জিত ইলমের প্রতি আমল শুরু করার পরিকল্পনা করলে, একসময় পুরো জীবনটাই সুন্নাতের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ ।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (১৬৪হি.-৮৫৫খৃ.)-এর সুযোগ্য ছাত্র, ইমাম আল-মাররূযী (রহঃ) বলেন, ‘ইমাম আহমাদ (রহঃ) আমাকে বলেছেন, مَا كَتَبْتُ حَدِيْثاً إِلَاّ وَقَدْ عَمِلتُ بِهِ، حَتَّى مَرَّ بِي أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- احْتَجَمَ، وَأَعْطَى أَبَا طَيْبَةَ دِيْنَاراً، ‘আমি এমন কোন হাদীছ লিপিবদ্ধ করিনি, যার উপর আমি (অন্তত একবার হ’লেও) আমল করিনি। অবশেষে যখন আমার কাছে এই হাদীছটি পৌঁছাল যে, ‘নবী করীম (ছাঃ) হিজামা (শিঙ্গা) করিয়েছিলেন এবং (হিজামাকারী) আবূ তায়বাহকে এক দীনার পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন’, তখন আমিও হিজামা করালাম এবং হিজামাকারীকে এক দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) প্রদান করলাম’।[30] আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহ্হাব (রহঃ) বলেন, একবার আমি মানত করলাম যে, যদি কারো গীবত করি তাহ’লে একদিন করে ছিয়াম রাখব। এভাবে আমি গীবত থেকে বাঁচার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমি গীবত করি আবার ছিয়ামও রাখি। ফলে আমি নিয়ত করলাম, একবার গীবত করলে এক দিরহাম করে ছাদাক্বাহ করব। এবার আমি দিরহামের ভালোবাসায় গীবত পরিত্যাগ করতে সক্ষম হ’লাম’।[31] তবে একথা সত্য যে, সব জ্ঞান একসাথে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই শুরু করতে হবে সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ বিষয় দিয়ে। সেজন্য আমরা আমাদের অর্জিত ইলমকে তিন ভাগে ভাগ করতে পারি :
(ক) ফরযে আইন (আবশ্যক) : তাওহীদ, শিরক, বিদ‘আত, ছালাত, যাকাত, ছিয়াম এবং হালাল-হারামের মৌলিক জ্ঞান। এই জ্ঞান অর্জনের সাথে সাথেই আমল শুরু করতে হবে। এই জ্ঞান বাস্তবায়নে কোন ছাড় চলবে না।
(খ) সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ : রাসূল (ছাঃ)-এর নিয়মিত সুন্নাতসমূহ।
(গ) নফল ও মুস্তাহাব : অতিরিক্ত ফযীলতের আমলসমূহ।
এভাবে আমরা ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আমাদের অর্জিত ইলমকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করতে পারি। সালাফগণ প্রথমে আক্বীদা ও ফরয ইবাদতের জ্ঞানকে মজবূত করতেন, তারপর ফযীলতের দিকে মনোযোগী হ’তেন। সর্বদা মনে রাখতে হবে, আকাশছোঁয়া স্বপণ যেমন পরিকল্পনা ছাড়া বাস্তবায়ন হয় না, তেমনি ইলমের সুউচ্চ আদর্শও আমলের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া জীবনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই জ্ঞানকে কর্মে পরিণত করতে হ’লে তাকে দৈননিদন রুটিনের শৃঙখলে বেঁধে ফেলা যরূরী। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন।
৫. অনুধাবন করে নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করা :
ইলমের মূল উৎস হ’ল আল্লাহর কিতাব। এই কুরআনের সাথে সম্পর্ক যত গভীর হবে, ইলম অনুযায়ী আমলের তাওফীক্ব তত সহজ হবে। কিন্তু না বুঝে শুধু পাঠ করে কুরআন খতম করার মাধ্যমে এটা লাভ করা সম্ভব নয়; বরং প্রতিটি আয়াত অনুধাবন করে তেলাওয়াত করার মাঝেই এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। কুরআন আমাদের কাছে এসেছে নিছক বরকতের জন্য নয়; বরং তা এসেছে হেদায়াত ও জীবন বিধান হিসাবে। সেজন্য কুরআন তেলাওয়াতের অর্থ শুধু পাঠ করা নয়; বরং কুরআনের হালাল-হারাম, আদেশ-নিষেধের অনুসরণ করা। মহান আল্লাহ বলেন, الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلَاوَتِهِ أُولَئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ، ‘আমরা যাদেরকে কিতাব প্রদান করেছি, তা যারা যথার্থভাবে তেলাওয়াত করে, তারাই তার (মুহাম্মাদের) উপরে বিশ্বাস স্থাপন করে’ (বাক্বারাহ ২/১২১)।
কুরআন যথাযথভাবে তেলাওয়াত করা (حَقَّ تِلَاوَتِهِ)-এর অর্থ হ’ল- ‘তারা কুরআনের আদেশ ও নিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে যথাযথ অনুসরণ করে। ফলে তারা এর হালাল করা বস্ত্তকে হালাল মনে করে, হারামকে হারাম মনে করে এবং এতে যা বর্ণিত আছে সে অনুযায়ী আমল করে’। ইকরিমা (রহঃ) বলেন, তেলাওয়াত করার অর্থ হ’ল ‘অনুসরণ করা’। যেমন আল্লাহ বলেন, وَالْقَمَرِ إِذَا تَلَاهَا ‘শপথ চন্দ্রের যখন তা সূর্যের অনুগামী হয়’ (শামস ৯১/২)। এখানে تَلَاهَا অর্থ أَََتْبَعَهَا (তার অনুসরণ করে)।[32] সুতরাং না বুঝে এবং আমলকারী না হয়ে কুরআনের অর্থ পাঠ করাকে ‘কুরআন তেলাওয়াত’ বলা হয় না; বরং যারা কুরআন পাঠের মাধ্যমে এর বিধি-বিধান অনুযায়ী আমল করে তারাই প্রকৃত কুরআন তেলাওয়াতকারী। সুতরাং ‘যথাযথ তেলাওয়াত’ শুধু তাজবীদ সহকারে পড়া নয়। বরং যখন আপনি পড়ছেন, ‘তোমরা সূদের কাছেও যেও না’, তখন সূদভিত্তিক সকল লেনদেন থেকে যখন একশ হাত দূরে থাকতে পারছেন, তখন এটাই ‘যথাযত তেলাওয়াত’।
কুরআন যদি বুঝে পড়া না হয়, তবে তা আমলের প্রেরণা যোগায় না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ مِنْ أَحْسَنِ النَّاسِ صَوْتًا بِالْقُرْآنِ، الَّذِي إِذَا سَمِعْتُمُوهُ يَقْرَأُ، حَسِبْتُمُوهُ يَخْشَى اللهَ، ‘মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর কণ্ঠের তেলাওয়াতকারী সেই ব্যক্তি, যার তেলাওয়াত শুনে তোমাদের মনে হবে যে, সে আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত (হয়ে তেলাওয়াত করছে)’।[33] আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) বলেন,كانَ الرجل مِنَّا إذا تعلَّم عَشْر آياتٍ لم يجاوزهُنّ حتى يعرف معانيهُنَّ، والعملَ بهنَّ، ‘আমাদের মধ্যকার কোন ব্যক্তি যখন দশটি আয়াত শিখতেন, তখন সেই আয়াতগুলো অতিক্রম করতেন না যতক্ষণ না এগুলোর অর্থ জানতে পারতেন এবং আমল করতে পারতেন’।[34]
ফুযাইল ইবনে ইয়ায (রহঃ) বলেন,إِنَّمَا نَزَلَ الْقُرْآنُ لِيُعْمَلَ بِهِ فَاتَّخَذَ النَّاسُ قِرَاءَتَهُ عَمَلًا، ‘কুরআন নাযিল হয়েছে এর উপর আমল করার জন্য। সুতরাং মানুষ যেন এর তেলাওয়াতকে আমল হিসাবে গ্রহণ করে’। তাকে জিজ্ঞেস করা হ’ল- ‘কুরআনের উপর আমল করা হবে কীভাবে?’ তিনি বলেন,لِيُحِلُّوا حَلَالَهُ وَيُحَرِّمُوا حَرَامَهُ، وَيَأْتَمِرُوا بِأَوَامِرِهِ، وَيَنْتَهُوا عَنْ نَوَاهِيهِ، وَيَقِفُوا عِنْدَ عَجَائِبِهِ، ‘তারা এর হালাল বিধানকে হালাল মনে করবে এবং হারামকে হারাম মনে করবে। এর নির্দেশনাবলী পরিপূর্ণরূপে মেনে চলবে, নিষেধসমূহ থেকে বিরত থাকবে এবং এর আশ্চর্য বিষয়সমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে’।[35]
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ (৬৬১-৭২৮ হি.) বলেন, الْمَطْلُوبُ مِنْ الْقُرْآنِ هُوَ فَهْمُ مَعَانِيهِ، وَالْعَمَلُ بِهِ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ هَذِهِ هِمَّةَ حَافِظِهِ لَمْ يَكُنْ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ، وَالدِّينِ، ‘কুরআন পাঠের মূল উদ্দেশ্য হ’ল- এর অর্থ অনুধাবন করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। কুরআনের বাহকের যদি এই অভিপ্রায় না থাকে, তবে সে আলেম ও দ্বীনদারদের অন্তর্ভুক্ত হবে না’।[36] উদাহরণস্বরূপ, একজন রোগী যদি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনকে সুন্দর করে গিলাফে মুড়িয়ে চুমু খায়, কিন্তু তা খুলে না পড়ে এবং সে অনুযায়ী ঔষধ না খায়, তবে কি সে সুস্থ হবে? কখনোই না। কুরআন হ’ল আমাদের অন্তরের রোগের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেসক্রিপশন বা শিফা। আমরা একে পাঠ করি, চুমু খাই; কিন্তু তা বুঝে পড়ি না, এর মর্ম অনুধাবণের চেষ্টা করি না এবং কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করি না। ফলে কুরআন পাঠ করার পরেও আমাদের আত্মার রোগ সারছে না এবং এর আলোকে আমরা জীবন গড়তে পারছি না। কুরআনের প্রতিটি আয়াতে আল্লাহর এক বিশেষ রহমত সঞ্চিত আছে, এর এক অলৌকিক শক্তি আছে। কোন মানুষ যদি কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে, অনুধাবন করে তেলাওয়াত করে, তবে তার দেহ-মন প্রভাবিত হবেই। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। মহান আল্লাহ আমাদের নিয়মিত কুরআন অনুধাবনের তাওফীক্ব দিন- আমীন!
৬.ইলম বিতরণ করা বা (ইলমের প্রচার ও প্রসার ঘটানো) :
বদ্ধ পুকুর যেমন সময়ের সাথে দূষিত হয়ে যায়, তেমনি যে ইলম বিতরণ করা হয় না, তা অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দেয়। জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমেই জ্ঞানের যথার্থ আমল হয় এবং ইলমের নূর বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা‘আলা শুধু জ্ঞানীদের প্রশংসা করেননি; বরং তিনি তাদের প্রশংসা করেছেন যারা জানে এবং সে অনুযায়ী আমল করে। যেমনটি তিনি সূরা আছর-এ নাজাত লাভের জন্য চারটি শর্ত দিয়েছেন: (১) ঈমান [ইলম], (২) সৎকর্ম [আমল], (৩) পরস্পরকে ‘হক’-এর উপদেশ (দাওয়াত) ও (৪) ধৈর্যের উপদেশ। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেঈ (১৫০ -২০৪ হিঃ) বলেন,لَوْ تَدَبَّرَ النَّاسُ هَذِهِ السُّوْرَةَ لَوَسِعَتْهُمْ، ‘যদি মানুষ এই সূরাটি গবেষণা করত, তাহ’লে এটাই তাদের (হেদায়াতের) জন্য যথেষ্ট হ’ত’।[37] এখানে আল্লাহ আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন যে, শুধু ব্যক্তিগত আমল যথেষ্ট নয়; বরং সেই আমল ও ইলমের দাওয়াত না দিলে ক্ষতির চক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না।
প্রত্যেক নবী-রাসূল দাওয়াতের মাধ্যমে তাদের ইলমের বাস্তবায়ন ঘটিয়েছেন। কেননা অর্জিত জ্ঞানের প্রচার-প্রসার ঘটানোর মাধ্যমেই যমীনের বুকে আল্লাহর দাসত্ব প্রষ্ঠিত হয়। সুতরাং জ্ঞানকে শুধু নিজের আমলে সীমাবদ্ধ করে ফেলা এবং গোপন করা উচিত নয়। ইমাম ইবনে আব্দিল বার্র (৩৬৮-৪৬৩হি.) বলেন, إخفاءُ العمل نجاةٌ، وإخفاءُ العلمِ هلَكَةٌ، ‘আমল গোপন করা নাজাত স্বরূপ, আর ইলম গোপন করা ধ্বংস স্বরূপ’।[38] অর্থাৎ আমরা যখন কোন নফল ইবাদত, যেমন তাহাজ্জুদের ছালাত বা গোপন দান মানুষের চোখের আড়ালে করি, তখন তা লৌকিকতা থেকে মুক্ত থাকে এবং আমাদের নাজাতের অছীলা হয়। কিন্তু যখন আমরা এমন একটি জ্ঞান গোপন করি যা মানুষের জানা প্রয়োজন, তখন তা ধ্বংস ডেকে আনে। সূদখোরকে সূদের ভয়াবহতা থেকে, ঘুষখোরকে ঘূষের অনিষ্ট থেকে এবং মাদকাসক্তকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সাবধান না করলে সমাজে এসব বিস্তার লাভ করে সমাজকে ধ্বংস করবে। আর এ ক্ষতি থেকে সমাজের কোন ব্যক্তি রেহাই পাবেনা। ক্বাতাদা (রহঃ) বলেন, فَمَنْ عَلِمَ شَيْئًا فَلْيُعَلِّمْهُ، وَإِيَّاكُمْ وَكِتْمَانَ الْعِلْمِ فَإِنَّهُ هَلَكَةٌ، ‘যে ব্যক্তি কিছু জানে, সে যেন তা শিক্ষা দেয়। আর তোমরা ইলম গোপন করা থেকে বেঁচে থাকো, কেননা তা ধ্বংস ডেকে আনে’।[39]
তাছাড়া ইলম বিতরণ করা এমন এক বিনিয়োগ, যা কখনো শেষ হয় না। ইমাম ইবনে হাযম আন্দালুসী (৩৭৪-৪৫৬হি.) বলেন, الباخل بالعلم ألوم من الباخل بالمال، فالباخلُ بالمال أشفقُ من فناء ما بيده، والباخل بخِلَ بما لا يفنى على النفقة ولا يُفارقُه مع البذل، ‘ইলমের ক্ষেত্রে কৃপণ ব্যক্তি মালের ক্ষেত্রে কৃপণ ব্যক্তির চেয়ে বেশী নিন্দনীয়। কারণ যে সম্পদে কৃপণতা করে, সে তার হাতে যা আছে তা শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে। আর যে ইলমে কৃপণতা করে, সে এমন বিষয়ে কৃপণতা করে যা খরচ করলেও শেষ হয় না এবং দান করলেও তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না’।[40] অর্থ বিতরণ করলে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ইলম বিতরণ করলে শেষ হয়না। বরং এই ইলম এক থেকে একশ গুণে বৃদ্ধি পায়। আর শেখানো সেই জ্ঞান শত শত বছর ধরে ছাদাক্বায়ে জারিয়াহ হয়ে বিতরণকারীর কবরে ছাওয়াব পৌঁছাতে থাকে।
এ কারণেই আল্লামা আব্দুর রহমান আস-সা‘দী (১৮৮৯-১৯৫৬ খ্রি.) বলেন, أَنَّ مَنْ بَثَّ عِلْمَهُ كَانَ حَيَاةً ثَانِيَةً، وَحِفْظًا لِمَا عَلِمَهُ، وَجَازَاهُ اللهُ مِنْ جِنْسِ عَمَلِهِ، ‘যে ব্যক্তি তার ইলম প্রচার করে, সেটা যেন তার জন্য দ্বিতীয় জীবন স্বরূপ। ইলম বিতরণের মাধ্যমে তার অর্জিত জ্ঞান সংরক্ষিত থাকে। আর আল্লাহ তাকে তার এ কাজের অনুরূপ প্রতিদানই দান করেন’।[41] ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম ইবনে তায়মিয়া, ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) প্রমুখ ওলামায়ে কেরাম আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁদের বিতরণ করা ইলমের মাধ্যমে তাঁরা হাযার বছর ধরে আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন। এটাই হ’ল ‘দ্বিতীয় জীবন’। আমরাও এমন সুযোগ লাভের চেষ্টা করতে পারি। যাতে একটি ছোট মাসআলা শেখানো, কাউকে একটি আয়াত বা একটি হাদীছ শিক্ষা দেওয়া, সন্তানকে ছালাতের সঠিক নিয়ম শেখানো, বন্ধুকে একটি ভুলের ব্যাপারে সুন্দরভাবে শুধরানো ইত্যাদি আমার-আপনার বরকত লাভের মাধ্যমে অথবা আকাঙ্খিত সেই ‘দ্বিতীয় জীবন’ হতে পারে।
তবে এই ইলম বিতরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব রয়েছে। আর তা হ’ল অপাত্রে ইলম বিতরণ না করা। কেননা ইলম হ’ল মুক্তার মত; তা যত্রতত্র ছড়িয়ে দেওয়ার জিনিস নয়। ইলম কেবল তার প্রকৃত গ্রাহকের কাছেই পৌঁছাতে হয়। ইবনে হাজার আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২হি.) বলেন, لَا يَنْبَغِي نَشْرُ الْعِلْمِ عِنْدَ مَنْ لَا يحرص عَلَيْهِ وَيحدث من يشتهى بِسَمَاعِهِ لِأَنَّهُ أَجْدَرُ أَنْ يَنْتَفِعَ بِهِ.. التَّنْبِيهُ عَلَى أَنَّ الْعِلْمَ لَا يُودَعُ عِنْدَ غَيْرِ أَهْلِهِ، وَلَا يُحَدَّثُ بِهِ إِلَّا مَنْ يَعْقِلُهُ، وَلَا يُحَدَّثُ الْقَلِيل الْفَهْم بِمَا لَا يَحْتَمِلُهُ، ‘যে ব্যক্তি ইলমের প্রতি আগ্রহী নয়, তার কাছে তা প্রচার করা উচিত নয়। বরং যে শুনতে আগ্রহী তাকেই হাদীছ শোনাবে। কারণ সেই এর দ্বারা উপকৃত হওয়ার অধিক যোগ্য। আবার সতর্ক থাকতে হবে যে, ইলম যেন অযোগ্য পাত্রে রাখা না হয়। যে ব্যক্তি তা বুঝতে সক্ষম কেবল তাকেই তা বলা উচিত। আর কম বোঝে এমন ব্যক্তিকে এমন কথা বলা উচিত নয়, যা সে ধারণ করতে পারবে না’।[42]
বর্তমান যুগে আমরা প্রায়ই এই ভুল করি। যেমন, ফেইসবুকের মত পাবলিক প্লেসে, যেখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জ্ঞানী-গুণী সবাই আছেন, সেখানে আক্বীদার কোন গভীর বা জটিল মাসআলা নিয়ে আলোচনা শুরু করে দেওয়া হয়। এর ফলে মানুষ হেদায়াত পাওয়ার বদলে আরও বেশী বিভ্রান্তি ও ফিতনার মধ্যে নিপতিত হয়। আবার ধরুন, কোন ব্যক্তি হয়তো সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি হয়তো ঠিকমতো পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতই আদায় করেন না। তার কাছে গিয়ে যদি ফিকহের মতভেদপূর্ণ জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয় তাহ’লে তিনি ইসলামের প্রতি আগ্রহই হারিয়ে ফেলবেন। এটা হ’ল ‘অযোগ্য পাত্রে ইলম রাখা’। তার প্রয়োজন ছিল তাওহীদ ও ছালাতের প্রাথমিক জ্ঞান; কিন্তু আপনি তাকে এমন কিছু দিলেন যা সে ধারণ করতে পারবে না। সুতরাং এক্ষেত্রে করণীয় হ’ল রোগীর অবস্থা বুঝে ঔষধ দেওয়া।
প্রখ্যাত তাবেঈ মুহাম্মাদ ইবনে কা‘ব আল-কুরাযী (৪০-১০৮হি.)
বলেন, لَا يَحِلُّ لِعَالِمٍ أَنْ يَسْكُتَ عَلَى عِلْمِهِ، وَلَا لِلْجَاهِلِ أَنْ
يَسْكُتَ عَلَى جَهْلِهِ، ‘কোন আলেমের জন্য তার ইলম থাকা সত্ত্বেও চুপ থাকা বৈধ নয়। আবার কোন মূর্খের জন্যও তার মূর্খতার উপর চুপ থাকাও উচিত নয়’।[43] সমাজে দ’টি কাজ সমানতালে চলছে, যিনি জানেন, তিনি ভয়ে বা অলসতায় চুপ করে আছেন; আর যিনি জানেন না, তিনি অজ্ঞতাকে অাঁকড়ে ধরে আছেন, জানতেও চাচ্ছেন না। এই গন্ডি থেকে বের হয়ে আসা যরূরী। আপনি যা-ই জানেন, তা যতই সামান্য হোক, ইখলাছের সাথে তা অন্যের কাছে পৌঁছে দিন। হ’তে পারে আপনার বলা একটি কথাই কোন মানুষের জীবন বদলে দেবে। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, نَشْرُ العِلْمِ مِنْ أَفْضَلِ أَعْمَالِ البِرِّ، ‘ইলম প্রচার সর্বোত্তম নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত’।[44]
সুতরাং আমরা যেন ইলমকে হৃদয়ে ধারণ করে কেবল নিজের আমল নিয়েই সন্তুষ্ট না থাকি; বরং সেই ইলমের আলোয় চারপাশকে আলোকিত করার ব্রত গ্রহণ করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইলমের যথার্থ হক আদায় করার এবং তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে ‘দ্বিতীয় জীবন’ লাভ করার তাওক্বীক দান করুন- আমীন।
-আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ*
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, রাজশাহী।
[1]. তাফসীরে সা‘দী, পৃ. ৩৫৫।
[2]. খত্বীব বাগদাদী, আয-যুহদ ওয়ার রাক্বায়েক্ব (বৈরূত : দারূল বাশায়ের আল-ইসলামিইয়াহ, ১ম মুদ্রণ, ১৪২০হি./২০০০খৃ.), পৃ. ৭১।
[3]. ইবনু আব্দিল বার্র, জামে‘উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহী, ১/৭৪৮।
[4]. তাফসীরে কুরতুবী ১/২২; জামে‘উ বায়ানিল ইলম, ১/৭৪৯।
[5]. শাত্বেবী, আল-মুওয়াফাক্বাত, সম্পাদনা : বকর ইবনে আব্দুল্লাহ আবূ যায়েদ (কায়রো : দারুল ইবনে আফ্ফান, ১ম মুদ্রণ, /১৯৯৭খৃ.) ১/১০৩-১০৪।
[6]. খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলমিল আমাল, পৃ. ১৫।
[7]. আবূ নু‘আইম আস্ফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ২/৩৭৮।
[8]. মুহাম্মাদ খাদেমী, বারীক্বাহ মাহমূদিয়্যাহ (দামেশক : মাত্ববা‘আতুল হালাবী, ১৩৪৮হি.) ১/২৯৯।
[9]. খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলমিল আমল, পৃ. ৫৬।
[10]. ইক্বতিযাউল ইলমিল আমাল, পৃ. ৩৪।
[11]. তিরমিযী হা/২৮৯২; ছহীহাহ হা/৫৮৫; সনদ ছহীহ।
[12]. ইক্বতিযাউল ইলমিল আমাল, পৃ. ৩৫।
[13]. আবূ নু‘আইম ইস্ফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ৬/৩৬২। আল-জাহেয, আল-বায়ান ওয়াত তাবঈন, ২/১৩৮।
[14]. ইবনু আব্দিল বার্র, আল-ইস্তিযকার, তাহক্বীক্ব : সালেম মুহাম্মাদ আত্বা ও মুহাম্মাদ আলী মু‘আওবিয (বৈরূত : দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়াহ, ১ম মুদ্রণ, ১৪২১হি./২০০০খৃ.), ৮/৫৭১।
[15]. খত্বীব বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ, তাহক্বীক: মুছতাফা আব্দুল ক্বাদের আত্বা (বৈরূত : দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়াহ, ১ম প্রকাশ, ১৪১৭হি.), ১২/৪০৭; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্ব ৪৯/৭৮।
[16]. তিরমিযী হা/ ২৬৫৪; ছহীহুত তারগীব হা/১০৬, সনদ হাসান।
[17]. খত্বীব বাগদাদী, আল-ফক্বীহ ওয়াল মুতাফাক্বক্বিহ, ২/১৭৬।
[18]. খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলমিল আমল, পৃ. ৩৭।
[19]. আব্দুল ক্বাদের জীলানী (মৃ.৫৬১হি.), আল-গুনয়াহ বৈরূত : দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়াহ, ১ম মুদ্রণ, ১৪১৭হি./১৯৯৭হি.), ১/১১৬।
[20]. শামসুদ্দীন যাহাবী, তারীখুল ইসলাম (বৈরূত : দারুল কিতাব আল-আরবী, ২য় মুদ্রণ, ১৪১৩হি./১৯৯৩খৃ.) ৮/২৪০; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৯/৩৪৫।
[21]. ইবনুল মুক্বাফ্ফা‘, আল-আদাবুছ ছাগীর (আলেকজান্দ্রিয়া : দারুল ইবনিল ক্বাইয়িম, তাবি), পৃ. ১১।
[22]. ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিইয়াহ, মাদারিজুস সালেকীন (দারম্ন আত্বাআতিল ইলম) ৩/১৪২।
[23]. শামসুদ্দীন যাহাবী, তারীখুল ইসলাম, ১১/৩২৩।
[24]. খত্বীব বাগদাদী, আল-জামে‘ লি আখলাক্বির রাবী, ১/৮০।
[25]. খত্বীব বাগদাদী, আল-জামে‘ লি আখলাক্বির রাবী, ১/৭৮।
[26]. আবূ হামিদ গাযালী, ইহয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/৪৮।
[27]. ইক্বতিযাউল ইলমি আল-আমল, পৃ. ৮৫।
[28]. খত্বীব বাগদাদী, আল-জামে‘ লি আখলাক্বির রাবী, ১/৩০৪।
[29]. খত্বীব বাগদাদী, আল-জামে‘ লি আখলাক্বির রাবী ওয়া আদাবিস সামি‘, ১/১৫৭।
[30]. আল-জামে‘ লিআখলাক্বির রাবী ওয়া আদাবিস সামি‘, ১/১৫৭।
[31]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৯/২২৮; ইয়াসীর হামাদানী, হায়াতুত তাবেঈন, পৃ. ৯৬৪।
[32]. তাফসীরে কুরতুবী ২/৯৫।
[33]. ইবনে মাজাহ হা/১৩৩৯, সনদ ছহীহ।
[34]. তাফসীরে ত্বাবারী, ১/৮০।
[35]. খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলমিল আমাল, পৃ. ৭৬।
[36]. ইবনে তাইমিয়াহ, আল-ফাতাওয়াল কুবরা (বৈরূত: দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়াহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৮হি./১৯৮৭খৃ.), ২/১৩৫।
[37]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ৮/৪৭৯।
[38]. ইবনু আব্দিল বার্র, আত-তামহীদ (লন্ডন : মুআসসাসাতুল ফুক্বান, ১ম মুদ্রণ, ১৪৩৯হি./২০১৭খৃ.), ১৩/৩২৮।
[39]. তাফসীরে বাগাভী ১/৫৫২।
[40]. রাসায়েলে ইবনে হাযম, পৃ. ১/৩৪৪।
[41]. মুহাম্মাদ ইবরাহীম আল-হামদ, মা‘আল মু‘আলিমীন (সঊদী আরব, যুলফী : প্রবি, ১৪১৭হি.) পৃ. ৪১; গৃহীত : আব্দুর রহমান নাছের আস-সা‘দী, আল-ফাতাওয়া আস-সা‘দিইয়াহ, পৃ. ৪৫৫।
[42]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাৎহুল বারী ১১/১৩৯।
[43]. তাফসীরে কুরতুবী ৪/৩০৪।
[44]. ইবনু আব্দিল বার্র, আত-তামহীদ, ৫/২০২; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৮/১১৪।