কুরআন সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের সংশয় ও তার জবাব (২য় কিস্তি)

৩. কুরআনের ভাষা ও সাহিত্যের মান :

প্রাচ্যবিদরা কুরআনের সাহিত্যিক মান এবং এর অলৌকিকত্ব (ই‘জায) নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। স্কটিশ দার্শনিক থমাস কার্লাইল (Thomas Carlyle) কুরআনের সত্যতা স্বীকার করলেও একে ক্লান্তিকর পাঠ (toilsome reading), বিভ্রান্তিকর জগাখিচুড়ি (a wearisome confused jumble), অন্তহীন পুনরাবৃত্তি (endless iterations) এবং অগ্রহণযোগ্য নির্বুদ্ধিতা (insupportable stupidity) হিসাবে বর্ণনা করেছেন।[1] সালোমন রেইনাখ (Salomon Reinach) এটিকে নিম্ন সাহিত্যিক মানসম্পন্ন (little merit ... from a literary point of view) বলে মন্তব্য করেছেন।[2]

কুরআনের ব্যাকরণগত ত্রুটির অভিযোগও করা হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে। যেমন ইরানী ধর্মত্যাগী মুরতাদ লেখক আলী দাস্তি (Ali Dashti) কুরআনে আরবী ভাষার স্বাভাবিক নিয়মের বিপরীত একশো’র বেশী ভুল রয়েছে বলে আখ্যা দিয়েছেন। যেমন অসম্পূর্ণ বাক্য, অপরিচিত শব্দ, লিঙ্গ ও বচনের অসমতার ব্যবহার ইত্যাদি।[3]

জার্মান প্রাচ্যবিদ গার্ড আর. পুইন (Gerd R. Puin) বলেন যে, ‘যদিও কুরআন দাবী করেছে যে, তা মুবীন বা সুস্পষ্ট; কিন্তু যদি লক্ষ্য করা যায় তবে দেখা যাবে যে, কুরআনের প্রতি পঞ্চম বাক্য প্রায়শই অর্থহীন এবং সমগ্র কুরআনের এক-পঞ্চমাংশ কেবলই দুর্বোধ্য কিংবা অন্য ভাষায় অনুবাদ অযোগ্য। তাছাড়া অনেক আরবও স্বীকার করবে যে, এতে স্ববিরোধী বক্তব্য বিদ্যমান’।[4]

তাদের মতে, কুরআনে এমন অনেক শব্দ রয়েছে যার অর্থ অস্পষ্ট। এছাড়াও কুরআন আরবীতে নাযিল হওয়ার কথা বলা হ’লেও এতে বহু অনারব শব্দ আছে। যেমন ইমাম সুয়ূতী ১০৭টি অনারব বিদেশী শব্দ[5] এবং আর্থার জেফেরি (Arthur Jeffery) প্রায় ২৭৫টি আরামাইক, হিব্রু, সিরিয়াক, ইথিওপিক, ফার্সি এবং গ্রীক উৎসের শব্দ খুঁজে পেয়েছেন।[6] এছাড়া তারা কুরআনে বর্ণনার অসঙ্গতি এবং বক্তার পরিবর্তন নিয়েও সমালোচনা তুলেছেন। যেমন, সূরা ফাতিহা একটি প্রার্থনা, যা আল্লাহর প্রতি নিবেদিত। কিন্তু দাস্তির বক্তব্য হ’ল, আল্লাহর প্রতি নিবেদিত বাক্য স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক উচ্চারিত হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।[7]

জবাব :

প্রথমতঃ কুরআন আরবী ভাষার চূড়ান্ত উৎকর্ষের প্রতীক। আরব কবিরাও এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেনি। কুরআন নিজেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছে,أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِثْلِهِ ‘তারা বলে, এটি তিনি নিজের মনগড়া বলেছেন। বল, তাহ’লে এর মতো একটি সূরা আনো’..( ইউনুস ১০/৩৮)। আল্লাহ আরো বলেন, قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَن يَأْتُواْ بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لاَ يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا ‘যদি মানুষ ও জিন এই কুরআনের অনুরূপ হাযির করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ হাযির করতে পারবে না, যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়’ (ইসরা ১৭/ ৮৮)

দ্বিতীয়তঃ কুরআন সামগ্রিকভাবেই অলৌকিকতার একটি প্রমাণ। ভাষা ও সাহিত্যগত দিক থেকে এটি কেবল শব্দ বা বাক্য গঠন নয় বরং এর সুর, তাল, সংক্ষিপ্ততা সবকিছুই এর অলৌকিকত্বের প্রমাণ বহন করে। কুরআনের এই বৈশিষ্ট্যগত বহুমুখিতা প্রাচ্যবিদদের বুদ্ধিসীমার বাইরে। এজন্য তারা বিচ্ছিন্নভাবে কেবল সংশয়ের বুদবুদ ছড়ায়। তবে কখনই তারা সত্যকে পাশ কাটাতে পারে না। তাদের কতিপয় অর্বাচীন যখন কুরআনের ভাষাকে দুর্বোধ্য বা অর্থহীন মনে করে, তখন আরবরা তো বটেই, বহু অমুসলিম প্রাচ্যবিদও কুরআনের ভাষাগত সৌন্দর্যে এতটাই বিমুগ্ধ হয়েছেন যে তারা বলেছেন, পৃথিবীর সকল সাহিত্যমানকে কুরআন দিয়ে বিচার করা উচিৎ। যেমন ড. উইলিয়াম নাসাউ লিস (Dr. William Nassau Lees) বলেন, ‘কুরআনের ভাষা কেবল মনোমুগ্ধকর নয় বরং অতীব সুন্দর। এটি খুবই শক্তিশালী ও গভীর অভিব্যক্তিপূর্ণ। কিছু কিছু স্থানে ভাষা অত্যন্ত উচ্চমানের। যেখানে আল্লাহর মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে, তা এককথায় অতুলনীয়। কুরআনের ভাষা সর্বোচ্চ সৌন্দর্যময়, সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও এর গঠনশৈলী তুলনারহিত। কুরআনের ভাষা ও গঠন এমন এক মাপকাঠি, যার আলোকে সকল সাহিত্য রচনা বিচার করা উচিত (The Holy Quran is the touchstone by which every composition is tried)’।[8] বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ ও আরবী সাহিত্য গবেষক এ.জে আরবেরী খুব চমৎকার করেই বলেছেন, ‘যদি প্রকৃত সত্য স্বীকার করে নেয়া হয়, তবে কুরআনে যে বিষয়বস্ত্ত ও মনের ভাবের আকস্মিক ওঠানামা দেখা যায় (যার প্রবাহিত বাগ্মিতার সমুদ্রকে মাপতে উৎসুক সমালোচকরা বিভ্রান্ত হয়), তা আর কোন দুর্বোধ্যতা বা জটিলতা তৈরি করবে না। সত্যি বলতে সমালোচকদের ‘সারবত্তাহীন বিশ্লেষণের খাঁচা’ দিয়ে কুরআনের এই মহাসমুদ্র মাপার চেষ্টাই অর্থহীন’।[9]

মূলতঃ কুরআনের চমৎকার বিন্যাস ও আন্তঃসজ্জা প্রকৃতঅর্থে তারাই উপলব্ধি করতে পারে, যারা আরবী সাহিত্যের প্রকৃত মান ও ধারা বোঝে। ফলে কুরাইশরা মুহাম্মাদ (ছা.)-এর সমালোচনায় লিপ্ত হ’লেও ভাষাগত অলৌকিকত্বকে অস্বীকার করতে পারেনি এবং কুরআনের চ্যালেঞ্জও গ্রহণ করেনি। কেননা তারা স্পষ্টই অনুধাবন করেছিল যে, এই ভাষা কখনও মানুষের হ’তে পারে না।

তৃতীয়তঃ আরবী গদ্যকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়,

একটি হ’ল ছন্দবদ্ধ গদ্য (سجع) এবং অপরটি হ’ল সরল ও সাধারণ গদ্য (مرسل)। কিন্তু কুরআন ‘গদ্যও নয়, কবিতাও নয়, বরং উভয়ের এক অনন্য সংমিশ্রণ (for the Koran is neither prose nor poetry, but a unique fusion of both)।[10] এটি সরল গদ্য নয়, কারণ এতে ছন্দ, সুর এবং অনন্য শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আবার এটি ছন্দও নয়। এভাবে কুরআন এক বিস্ময়কর ছন্দময় ও অছন্দময় শৈলীর অপূর্ব সংমিশ্রণ। কুরআনের এই সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য পুরো কুরআনে বিস্তৃত। এটি প্রচলিত কাব্যিক নিয়মাবলী অনুসরণ করে না, বরং একটি প্রাকৃতিক, সংক্ষিপ্ত ছন্দবদ্ধ বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে গঠিত, যা এটিকে কাব্যিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত রাখে এবং একই সাথে গদ্যের চেয়েও বেশী সাবলীলতা ধারণ করে। এছাড়া কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে একজাতীয় ছন্দ (mono-rhyme)। একটি গবেষণায় দেখা যায়, কুরআনের অর্ধেকেরও বেশী আয়াত একই অক্ষরে শেষ হয়। এই অসাধারণ ছন্দবিন্যাস অনুকরণ করা সম্ভব নয়।[11]

রুম্মানী এবং ডেভিন জে. স্টুয়ার্ট উল্লেখ করেছেন যে, কুরআনের ভাষা শব্দার্থগতভাবে (semantically oriented) সুবিন্যস্ত, এমনকি যেখানে প্রচলিত ছন্দের অভাব দেখা যায় সেখানেও। এতে প্রমাণিত হয় যে, মূলত ছন্দ নয়, বরং অর্থের গভীরতার উপর ভিত্তি করে কুরআনের শব্দচয়ন করা হয়েছে।[12]

কোন ভাষাতে Palindrome (উল্টোরূপে একই রকমভাবে পড়া যায় এমন শব্দ বা বাক্য) একটি স্বতন্ত্র শিল্পরূপ হিসাবে গণ্য হয়, যা কবিতার ছনদ বিন্যাস ও রচয়িতার উৎকর্ষতা এবং নিখুঁতভাব প্রকাশ করে। কুরআনেও দু’টি আয়াতে এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যেমন- (১) ربك فَكَبِّرْ (প্যালিনড্রোমিক বিন্যাস- ر ب ك ف ك ب ر), (আল-মুদ্দাছছির, ৩)। (২) كُلٌّ فِي فَلَكٍ (প্যালিনড্রোমিক বিন্যাস- ك ل ف ي ف ل ك), (আল-আম্বিয়া ২১/৩৩)। কুরআনে এই প্যালিনড্রোমের অস্তিত্ব কুরআনের অনন্যতা ও ভাষার সমৃদ্ধিকে আরও গভীরভাবে প্রকাশ করে, যা পাঠকের ঈমান বৃদ্ধি করে।[13]

চতুর্থতঃ প্রাচ্যবিদরা কুরআনের কিছু নির্দিষ্ট আয়াতের দিকে আঙুল তোলেন যেখানে তাদের মতে, শব্দের বচন (একবচন/বহুবচন), লিঙ্গ (পুংলিঙ্গ/স্ত্রীলিঙ্গ) অথবা ই‘রাব (শব্দের শেষাংশের পরিবর্তন যা তার ব্যাকরণগত অবস্থা নির্দেশ করে) প্রচলিত আরবী ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী হয়নি। যেমন- সূরা মায়িদার ৬৯নং আয়াত (إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّابِئُونَ وَالنَّصَارَى) নিয়ে সংশয় উত্থাপন করা হয়। إِنَّ (ইন্না) যা তার পরের শব্দকে ‘নছব’ (কর্মকারক) দেয়, কিন্তু এখানে الصَّابِئُونَ (আছ-ছাবিউন) শব্দটি ‘নছব’ (কর্মকারক)-এর পরিবর্তে ‘রফা’ (কর্তাকারক) অবস্থায় রয়েছে।

এর জবাবে বলা যায় যে, যেগুলোকে প্রাচ্যবিদরা ‘ব্যাকরণগত ভুল’ বলে দাবী করেন, সেগুলো আসলে আরবী ভাষার উচ্চাঙ্গের সাহিত্যিক শৈলী, বিশেষ অলঙ্কারিক ব্যবহার বা গভীর অর্থবহনকারী ব্যতিক্রমী প্রয়োগ। আরবী ভাষায় এমন অনেক ব্যাকরণগত কাঠামো রয়েছে যা প্রচলিত সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে বিশেষ অর্থ বা তাকীদ প্রকাশ করে। যেমন উপরোল্লিখিত উদাহরণে الصَّابِئُونَ শব্দটি ‘রফা’ (কর্তাকারক) অবস্থায় আসার কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। যেমন ابتداء বা নতুন বাক্যের শুরু। অর্থাৎ এই বাক্যে الصَّابِئُونَ নতুন বাক্যের مبتدأ (উদ্দেশ্য) হিসাবে কাজ করছে, যার خبر (বিধেয়) উহ্য রয়েছে। এই ধরনের বাক্য শৈলী আরবী সাহিত্যে কোন বিষয়ের প্রতি পাঠক বা শ্রোতার বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়।[14] কিন্তু এ বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে কিংবা আরবী ভাষাভাষী না হওয়ায় প্রাচ্যবিদরা তা ব্যাকরণগত ভুল মনে করেছে।

মূলত কুরআনে ব্যাকরণগত ভুল থাকার দাবীটাই অবান্তর। কেননা কুরআনই আরবী ব্যাকরণের ভিত্তি। কুরআনের পূর্বে আরবী ব্যাকরণের কোন অস্তিত্বই ছিল না। আরবী ব্যাকরণের নিয়ম-কানূন (নাহু ও ছরফ) কুরআনকে সঠিকভাবে বোঝা ও তেলাওয়াত করার জন্যই প্রণীত হয়েছে। আরবী ব্যাকরণের প্রতিষ্ঠাতাগণ যেমন আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালী (১৬-৬৯হি.), আল-খলীল ইবনু আহমাদ আল-ফারাহীদী (১০০-১৭৩হি.), সিবাওয়েহ (১৪৮-১৮০ হি.) প্রমুখ কুরআনের ভাষা বিশ্লেষণ করেই আরবী ব্যাকরণের নিয়মগুলো তৈরী করেছেন। তারা কুরআনকে ব্যাকরণের মানদন্ড হিসাবে গ্রহণ করেছেন, কুরআনকে ব্যাকরণ দিয়ে বিচার করেননি।

তাছাড়া কুরআনের ভাষাগত অলৌকিকত্বের একটি দিক হ’ল, এর ভাষা সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ বা নিয়ম-কানূনকে অনুসরণ করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এমন ব্যতিক্রমী ও উচ্চাঙ্গের প্রয়োগ দেখা যায় যা মানুষের পক্ষে তৈরি করা অসম্ভব। এটি বরং প্রমাণ করে যে কুরআন কোন মানুষের রচনা নয়, বরং আল্লাহরই কালাম।

পঞ্চমতঃ কুরআনে অনারব শব্দ যা ব্যবহৃত হয়েছে, তা মূলতঃ আরবীকৃত হয়েছে এবং আরবী ভাষারই অংশ হয়ে গেছে। আর এটাই প্রতিটি ভাষার স্বাভাবিক ইতিহাস যে কালের বিবর্তনে তাতে অনিবার্যভাবে অন্য ভাষার শব্দ সন্নিবেশিত হয়। এটা ভাষার দুর্বলতা নয় বরং সমৃদ্ধির পরিচায়ক। সুতরাং কোন শব্দ আরবী ভাষায় গৃহীত হওয়ার পর তা আর অনারব বলা যায় না। তবে অনারব উৎস থেকে গৃহীত হওয়ায় একে ‘মুআর্রাব’ (আরবীকৃত) বলা হয়। যেমন ইমাম সুয়ূতী অধ্যায় রচনা করেছেন, الْمُهَذَّبَ فِيمَا وَقَعَ فِي الْقُرْآنِ مِنَ الْمُعَرَّبِ- (কুরআনে ব্যবহৃত বিদেশী শব্দের সংকলন) এবং বলেছেন, ‘কুরআনে কিছু শব্দ অন্য ভাষা থেকে এলেও সেগুলো এতটাই আরবীকৃত হয়ে গিয়েছিল যে, সেগুলোকে আর অনারব বলা যায় না।[15]

এর আরও দলীল হ’ল, কুরআনে ব্যবহৃত অনারব শব্দগুলো আরবদের কাছে মোটেও অপরিচিত ছিল না। তারা এসবের অর্থ জানত বলে এ বিষয়ে কোন অভিযোগ তুলেনি। যদি এ বিষয়টি আসলেই সমালোচনার যোগ্য হ’ত তবে তৎকালীন কাফের আরবরা কিংবা রোমান ও পারসিকরা নিশ্চিতভাবে চ্যালেঞ্জ করত। কিন্তু তাদের এমন কোন চ্যালেঞ্জ না করাই প্রমাণ করে যে, কুরআন সত্যিই বিশুদ্ধ আরবী ভাষায় নাযিলকৃত।[16]

মূলতঃ আরবী ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাচীন সেমিটিক ভাষা। সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে যেকোন ভাষাই অন্যান্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে। প্রাক-ইসলামী যুগেও আরব বণিকরা বিভিন্ন সভ্যতার সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগের কারণে অন্য ভাষার শব্দ আরবীতে ব্যবহার করত। এই শব্দগুলো আরবের সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং আরবী ভাষার অংশ হয়ে গিয়েছিল। আর কুরআন তার সামগ্রিক কাঠামো, ব্যাকরণ, বাক্যবিন্যাস এবং শৈলীতে সম্পূর্ণ আরবী এবং এই কারণেই এটিকে ‘আরবী কুরআন’ বলা হয়েছে।[17]

ষষ্ঠতঃ বর্ণনার অসঙ্গতি এবং বক্তার পরিবর্তন নিয়ে যে সমলোচনা করা হয়েছে, তা প্রাচ্যবিদদের আরবী ভাষার ব্যাপারে অজ্ঞতার পরিচায়ক। কেননা আরবী সাহিত্যের একটি শাখা হ’ল বালাগাত বা অলঙ্কারশাস্ত্র। এই শাস্ত্রের একটি বিষয়বস্ত্ত হ’ল ‘দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন’ (التفات) নামক একটি কার্যকর ভাষাশৈলী, যা কুরআনে হরহামেশা ব্যবহার করা হয়েছে। এতে একটি বাক্যে বক্তব্য প্রদানকালে হঠাৎ করে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে, এক কাল থেকে অন্য কালে বা এক সংখ্যার রূপ থেকে অন্য সংখ্যায় পরিবর্তন আনা হয়, যাতে বক্তব্যে অলংকার, শৈল্পিকতা ও গুরুত্ব বাড়ে। যেমন সূরা ফাতিহার প্রথম তিন আয়াতে তৃতীয় পুরুষে বলা হয়েছে, হঠাৎ চতুর্থ আয়াতে দ্বিতীয় পুরুষে চলে যাওয়া হয়েছে। এটাই التفات। এই পরিবর্তনের কারণে বক্তা বা সম্বোধিতের পুরুষ, সংখ্যা, কাল বা কারকের পরিবর্তন হ’তে পারে, যা অর্থকে আরও শক্তিশালী ও প্রভাবশালী করে তোলে এবং শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করে।[18] সুতরাং এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর এবং আরবী ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতারই পরিচয়।

সপ্তমতঃ নোলডেকের মতে, কুরআনে বর্ণিত গল্পগুলো খুব সংক্ষিপ্ত এবং এতে বর্ণনার ধারাবাহিকতা (steady advance in narration) রক্ষা করা হয়নি।[19] কুরআনে বর্ণিত কাহিনীসমূহে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় বিস্তারিত তথ্য এড়িয়ে চলা হয়েছে, যা কুরআনের অন্যতম বিশেষত্বও বটে। এর কারণ সম্পর্কে শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) বলেন,هي أن العامة من الناس عندما يسمعون حكاية غريبة أو قصة كاملة بجميع خصوصياتها وفصولها، فإن طباعهم تميل إلى نفس القصة وتولع بها، ويفوت الغرض الأساسي - وهو التذكير - من بيان القصة الذي يهدف إليه القرآن الكريم. ‘সাধারণ মানুষ যখন কোন আশ্চর্য ঘটনা বা কোন কাহিনী তার সব খুঁটিনাটি ও অধ্যায়সহ শোনে, তখন তারা কেবল সেই কাহিনীর প্রতিই আকৃষ্ট হয় এবং তাতেই মুগ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে কুরআনের কাহিনী বর্ণনার যে মূল উদ্দেশ্য তথা শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ, তা তাদের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায়’।[20] সুতরাং এ বিষয়ে সমালোচনার অবকাশ নেই।

আবার কুরআনে কখনও একই গল্প বেশ কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে। এর পিছনেও বিভিন্ন কারণ রয়েছে। যেমন- (১) প্রতিবার কিছু অতিরিক্ত বিবরণ যোগ করা, যা আগের আয়াতগুলোতে উল্লেখ ছিল না। যেমন সূরা হিজরে হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টির উৎসকে ‘কর্দম থেকে তৈরী শুকনো ঠনঠনে মাটি’ (مِنْ صَلْصَالٍ مِنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ) বলা হয়েছে, যা সূরা আ’রাফে বর্ণিত হয়নি। (২) কখনো গল্পটি যেই প্রসঙ্গে এসেছে, সেখানে আলাদাভাবে কোন দিক তুলে ধরা হয়, যা অন্য কোন জায়গায় প্রাসঙ্গিক ছিল না। (৩) একই অর্থে ভিন্ন ভিন্ন রচনাশৈলীতে উপস্থাপন করার বিস্ময়কর ক্ষমতা দেখানো। মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর যুগে আশ্চর্য হ’ত যে, কীভাবে একই কাহিনী নানা রূপে, ভিন্ন ভিন্ন শব্দে এবং গঠনে উপস্থাপন করা হচ্ছে! আল্লাহ তাদের জানিয়ে দেন-এ আশ্চর্যজনক বিষয়টি কেবল মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকেই হ’তে পারে, যিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। (৪) নতুনভাবে উপস্থাপন কোন গল্প শ্রোতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, মনোযোগ ধরে রাখে এবং তার মধ্যে নতুন ভাবনার খোরাক যোগায়।[21]

অষ্টমতঃ কুরআনের ২৯টি সূরার শুরুতে কিছু الحروف المقطعة (বিচ্ছিন্ন অক্ষর, যেমন- আলিফ-লাম-মীম, ইয়া-সীন, হা-মীম) দেখা যায়, যাদের অর্থ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। প্রাচ্যবিদরা এই শব্দগুলোর অস্পষ্টতাকে কেন্দ্র করে সংশয় সৃষ্টি করে। অনুরূপভাবে কুরআনে কিছু মুতাশাবিহাত (রূপক বা দ্ব্যর্থবোধক) আয়াত আছে, যার অর্থ স্পষ্ট নয় বা একাধিক অর্থ হ’তে পারে। এছাড়া কুরআনে কিছু এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা প্রচলিত আরবী ভাষায় খুব একটা ব্যবহৃত হয় না বা তৎকালীন আরবের বিভিন্ন গোত্রীয় উপভাষায় প্রচলিত ছিল। প্রাচ্যবিদরা এই শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে না পেরে সেগুলোকে অস্পষ্ট বা অর্থহীন বলে দাবী করেন। তাদের এসকল সংশয়ের জবাবে বলা যায়- (১) الحروف المقطعة (বিচ্ছিন্ন অক্ষর) গুলো মানবজাতির জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং আল্লাহর সীমাহীন জ্ঞানের একটি প্রমাণ। এই অক্ষরগুলো দ্বারা আল্লাহ আরবের কবি ও সাহিত্যিকদের যেন চ্যালেঞ্জ করেছেন যে, তোমরা যে ভাষার অক্ষরগুলো ব্যবহার করে কবিতা ও সাহিত্য রচনা করো, সেই একই অক্ষরগুলো দিয়ে আমি এমন এক গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি যা তোমাদের পক্ষে তৈরী করা সম্ভব নয়। এটি কুরআনের অলৌকিকত্বের (إعجاز) -এর একটি দিক। (২) সূরা আলে ইমরানের ৭নং আয়াতে উল্লেখই করা হয়েছে যে, কুরআনেمحكمات (সুস্পষ্ট) এবং متشابهات (অস্পষ্ট) উভয় প্রকার আয়াত রয়েছে। মুহকামাত আয়াতগুলো কুরআনের মূল ভিত্তি, আর মুতাশাবিহাত আয়াতগুলো একাধারে নিগূঢ় প্রজ্ঞা এবং পরীক্ষা বহন করে। কেননা এই আয়াতগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈমানের একটি পরীক্ষা। বিশ্বাসীগণ এগুলোর অর্থ পুরোপুরি না বুঝলেও আল্লাহর উপর ঈমান আনেন এবং বিশ্বাস করেন যে এর প্রকৃত জ্ঞান আল্লাহর কাছেই রয়েছে।

(৩) ভাষার নিয়মাবলী সব সময়ই পরিবর্তনশীল এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ভাষার প্রয়োগে পার্থক্য থাকে। প্রাক-ইসলামী আরবী ভাষা ও কবিতাগুলোতেও বিভিন্ন আঞ্চলিক উপভাষার (dialects) প্রভাব ছিল। কুরআন এসব উপভাষার শ্রেষ্ঠ অংশগুলো একত্রিত করে একটি অনন্য ভাষাশৈলী উপস্থাপন করেছে। সুতরাং কোন শব্দ কারো কাছে অস্পষ্ট হওয়াটা কুরআনের দুর্বলতা নয় (৪) কুরআনে কিছু এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা প্রচলিত আরবী ভাষায় খুব একটা ব্যবহৃত হয় না; কিন্তু তৎকালীন আরবের বিভিন্ন গোত্রীয় উপভাষায় প্রচলিত ছিল। আরবী ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এর শব্দভান্ডার বিশাল হওয়ায় একই শব্দের একাধিক অর্থ থাকা বা বিভিন্ন গোত্রীয় উপভাষায় ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার হওয়া ভাষার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। এটি ভাষার দুর্বলতা নয়; বরং এর গভীরতা ও সমৃদ্ধিই নির্দেশ করে। প্রাচ্যবিদরা এই শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে না পেরে সেগুলোকে অস্পষ্ট বা অর্থহীন বলে দাবী করেন। (৫) কুরআন এমন একটি গ্রন্থ যা সব যুগের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। তাই এর কিছু দিক আপাতঃ অস্পষ্ট মনে হ’লেও সময়ের সাথে সাথে আরো স্পষ্ট হয়। তাছাড়া কুরআনের কিছু আয়াত মানুষের জন্য গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত রাখে। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে কুরআনের সেই সব আয়াতের নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হচ্ছে, যা পূর্বে অস্পষ্ট মনে হ’লেও এখন স্পষ্ট হচ্ছে। (ক্রমশঃ)


[1]. Thomas Carlyle (1841), On Heroes, Hero-Worship and the Heroic in History, p. 64-67.

[2]. Reinach, Salomon (1909), Orpheus: A History of Religions.

[3]. Dashti, Ali (1994). Twenty Three Years: A Study of the Prophetic Career of Mohammad, 1994: p. 4.

[4]. Dashti, Ali (1994). Twenty Three Years: A Study of the Prophetic Career of Mohammad, 1994: p. 4.

[5]. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন (কায়রো : আল-হায়আতুল মিছরিয়াহ, ১৯৭৪), পৃ. ২/১২৫-৪৩।

[6]. Jeffery, Arthur, The Foreign Vocabulary of the Koran, Baroda, 1938.

[7]. Dashti, Ali (1994). Twenty Three Years: A Study of the Prophetic Career of Mohammad, 1994: p.106,109.

[8]. M.M.Ali, History of the Muslims of Bengal, Imam Muhammad Islamic University, Riyadh, 1988, Vol.II, Chapter VII.

[9]. A.J. Arberry. The Koran Interpreted, The World’s Classics, Oxford University Press, 1983, Introduction. P.XI.

[10]. A.J. Arberry. The Koran Interpreted, The World’s Classics, P.X.

[11]. Devin J. Stewart, Saj’ in the Qur’an, Prosody and Structure, P.102

[12]. আলী বিন ঈসা আর-রুম্মানী, ছালাছা রাসায়েল ই‘জাযিল কুরআন (কায়রো : ১৯৫৬), পৃ. ৯৭-৯৮।

[13]. Thonthowi and others, I'jaz Al-Quran in Linguistic Perspective and it’s Impact on The Readers, Insyirah: Jurnal Ilmu Bahasa Arab dan Studi Islam, Vol. 7, No. 1, June 2024, p. 128.

[14]. আবুল কাসেম আয-যামাখশারী, তাফসীরুল আল-কাশ্শাফ (বৈরূত : দারুল কিতাব আল-আরাবী, ১৪০৭হি.), পৃ. ১/৬৬০।

[15]. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল-ইতক্বান ফী উলূমিল কুরআন (কায়রো : আল-হায়আতুল মিছরিয়াহ, ১৯৭৪), পৃ. ২/১২৫।

[16]. মুহাম্মাদ শা‘রাভী, তাফসীরুশ শা‘রাভী (১৯৯৭ খ্রি.), পৃ. ১১/৬৮২৫।

[17]. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, ১৪১৯ হি.), পৃ. ৭/১৪৭।

[18]. M A S Abdel Haleem, Grammatical Shift For The Rhetorical Purposes: Iltifāt And Related Features In The Qur'ān, Bulletin of the School of Oriental and African Studies, 1992, Volume LV, Part 3.

[19]. Noldeke’s essay on the Koran in the Encylopedia Britannica, 9th Edition , Vol.16, P. 1891.

[20]. শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী, আল-ফাউযুল কাবীর ফী তাফসীরল কুরআন (কায়রো : দারুছ ছাহওয়াহ, ১৯৮৪), পৃ. ৬৬।

[21]. বাদরুদ্দীন আয-যিরাকশী, আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন (বৈরূত : দারুল মা‘রিফাহ, ১৯৫৭), পৃ. ৩/২৬-২৭।






নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি আদব সমূহ - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
লাইলাতুল মি‘রাজ রজনীতে করণীয় ও বর্জনীয় - আত-তাহরীক ডেস্ক
দান-ছাদাক্বা : পরকালীন পাথেয় সঞ্চয়ের অনন্য মাধ্যম - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিরিখে যেলাসমূহের মাঝে সময়ের পার্থক্যের কারণ - তাহসীন আল-মাহী
জিহাদের ন্যায় ফযীলতপূর্ণ আমল সমূহ - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
ফৎওয়া : গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও বিকাশ (৪র্থ কিস্তি) - ড. শিহাবুদ্দীন আহমাদ, শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, রাজশাহী
ইসলামী সমাজ ও সংস্কৃতি সুরক্ষায় হাদীছের ভূমিকা - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
ঈদের ছয় তাকবীরের পক্ষে উপস্থাপিত দলীল সমূহ পর্যালোচনা - আহমাদুল্লাহ - সৈয়দপুর, নীলফামারী
দান-ছাদাক্বার আদব সমূহ - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
দ্বীনের পথে ত্যাগ স্বীকার (২য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
পথশিশুদের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব - মুহাম্মাদ আব্দুর রঊফ
আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৪র্থ কিস্তি) - তানযীলুর রহমান - শিক্ষক, বাউটিয়া দাখিল মাদ্রাসা, রাজশাহী
আরও
আরও
.