ক্যাপ্টেন ইব্রাহীম ত্রাওরে : আফ্রিকান নবজাগরণের অগ্রসেনানী

পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম দরিদ্র দেশ বুরকিনা ফাসো। জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশই পশুপালনের মতো প্রথাগত জীবিকায় নির্ভরশীল। দারিদ্রে্যর হার ৬৪.৫ শতাংশ। এই হতাশার মাঝেই ২০২২ সালে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে দেশটিকে নতুন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন ক্যাপ্টেন ইব্রাহীম ত্রাওরে, যিনি বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধান। গতানুগতিক প্রবীণ নেতৃত্বে পরিচালিত আফ্রিকায় তিনি এক তরুণ ক্যারিশম্যাটিক ব্যতিক্রম। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও আধুনিক উপনিবেশবাদের শৃঙ্খল ছিন্ন করে আফ্রিকাকে নতুন দিশা দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর এই তরতাযা যুবক আজ ‘আফ্রিকার মুক্তির নতুন সূর্য’ হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছেন। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও নয়া-উপনিবেশবাদের কবল থেকে মুক্ত করতে তার ভাবনা চিন্তা এখন আফ্রিকার ঘরে ঘরে।

স্বাধীনতার আগে ও পরে বহু যুগের পশ্চিমা, বিশেষ করে ফরাসী শোষণ ও নির্ভরশীলতা আফ্রিকাকে পিছিয়ে রেখেছে, ত্রাওরের এই যুক্তি আফ্রিকায় এখন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

ত্রাওরে ফ্রান্সসহ ঐতিহ্যগত পশ্চিমা শক্তির সামরিক উপস্থিতি বন্ধ করার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ক্ষমতায় এসেই তিনি ফ্রান্সের সঙ্গে সামরিক চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেন। এক মাসের মধ্যে দেশ থেকে ফরাসী বিশেষ বাহিনী প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়। ত্রাওরের দেখাদেখি নাইজার, মালি ও আইভরি কোস্ট ফরাসি সেনা সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়া ও অন্যান্য বিকল্প শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে বহুমুখী কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছেন।

ত্রাওরে নিজেকে ‘একজন সৈনিক ও জনগণের সেবক’ হিসাবে পরিচয় দেন। ক্ষমতাকে তিনি কর্তৃত্ব হিসাবে নয়, দায়িত্ব হিসাবে দেখেন। তাঁর এই নম্রতা ও মানুষের পাশে থাকার মানসিকতা তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে দেশে শুরু হয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ।

ইতিমধ্যে ত্রাওরে সরকারের ব্যয় সংকোচনে মন্ত্রী-আমলাদের বেতনবৃদ্ধি বন্ধ করেছেন। একই সঙ্গে জাতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সোনার দু’টি খনি জাতীয়করণ করেছেন এবং ইউরোপে অপরিশোধিত সোনা রফতানী সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেন। ফলে ২০২৩ সালে বুরকিনা ফাসো ৫৭ টন সোনা উৎপাদন করে আফ্রিকার পঞ্চম বৃহত্তম সোনা উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশ।

দেশীয় প্রক্রিয়াকরণে জোর দিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো সোনার শোধনাগার নির্মাণ করেন, যার বার্ষিক ক্ষমতা ১৫০ টন। ত্রাওরে বলেন, ‘আমরা আর বিদেশে আমাদের সোনা পরিশোধন করব না। এখন আমরা জানতে পারব যে আমাদের খনি থেকে বেরিয়ে আসা সোনার আসল মূল্য কী। এর আগে দেশের সোনা যেত দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড বা চীনের শোধনাগারগুলিতে। কত সোনা যে লোপাট হ’ত তার ইয়ত্তা নেই।

ত্রাওরে সম্ভবত একমাত্র বিশ্বনেতা যিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তা গ্রহণে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলেছেন। তাঁর মতে, দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে পশ্চিমাদের শর্তসাপেক্ষ ঋণ নয়, প্রয়োজন প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা। বুরকিনা ফাসোতে সোনার পাশাপাশি রয়েছে দস্তা, তামা, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফেট, চুনাপাথর এবং সম্ভাবনাময় হীরা, বক্সাইট, নিকেল ও ভ্যানাডিয়ামের মওজুদ, যা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল।

বুরকিনা ফাসো দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা মদদপুষ্ট সশস্ত্র জঙ্গী হামলার শিকার। এই অঞ্চলে ফ্রান্স ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দীর্ঘমেয়াদী কৌশল ছিল স্থানীয় সরকারগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে জঙ্গীবাদ মোকাবিলায় সহায়তা প্রদান। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এই সহায়তার মধ্য দিয়ে আফ্রিকান দেশগুলোর ওপর মূলত তাদের আধিপত্য কায়েম রাখা হয়েছে। স্থানীয় জনমনে সেই পুরোনো ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে।

ত্রাওরে বিদেশী সেনার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে ‘ভলান্টিয়ারস ফর দ্য ডিফেন্স অব ফাদারল্যান্ড’ নামে স্থানীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনী জনগণের আত্মবিশ্বাস ও জাতীয়তাবোধ বাড়িয়েছে।

ত্রাওরের নেতৃত্বে বুরকিনা ফাসো মালি ও নাইজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা জোট গড়ে তোলে। তাদের ‘স্বাধীন সাহেল’ উদ্যোগ পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত, সম্পদনির্ভর, স্বাধীন সাহেল অঞ্চল গঠনের নতুন স্বপ্ন দেখায়, যা আফ্রিকার উপনিবেশোত্তর নতুন রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন।

ত্রাওরে নিজেকে শুধু বুরকিনা ফাসোর নেতা মনে করেন না তিনি আফ্রিকার একজন সৈনিক। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে আফ্রিকান ঐক্য, বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর শোষণ এবং প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য সংঘবদ্ধ হওয়ার বার্তা। তাঁর নেতৃত্বে বুরকিনা ফাসো আফ্রিকান ইউনিয়নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ক্যাপ্টেন ইব্রাহীম শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক নন, বরং তিনি এক নতুন রাজনৈতিক দিগন্তের প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বে বুরকিনা ফাসো যেমন আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথে এগোচ্ছে, তেমনি সমগ্র আফ্রিকায় তিনি হয়ে উঠেছেন স্বাধীনতা ও পরিবর্তনের বাতিঘর।

ক্যাপ্টেন ত্রাওরের এসব পদক্ষেপে নৈতিক পরাজয়ের মুখে ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্ব। ফলে এর জবাবে এখন তারা নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে, মানবিক সহায়তা বন্ধ করছে এবং সামরিক হুমকিও দিচ্ছে। কিন্তু এতে কার্যত আফ্রিকার এই নতুন নেতৃত্ব আরও কঠোর হয়ে উঠছে। জনসাধারণের সমর্থনও বাড়ছে। আফ্রিকান জনমনে এখন প্রশ্ন উঠছে যে, ফ্রান্স আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার নামে খনিজ সম্পদ লুটে নিয়েছে, তাকে আর কত দিন সহ্য করব?

[(কথিত বৃহৎ শক্তিগুলি ‘ভেটো পাওয়ার’ নামে তাদের লুটের পাওয়ার সংরক্ষণ করে। সবার আগে এদের এই ‘ভেটো পাওয়ার’ বাতিল করার পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিৎ (স.স.)।]







পরিবর্তনের হাওয়া আলজেরিয়ায়
আফগানিস্তানকে পুরোপুরি বদলে দেওয়ায় তালেবান সরকারের প্রশংসায় ব্রিটিশ এমপি
ভ্যাকসিন নেওয়া মাত্র ৬০ হাযার সঊদী নিয়েই অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের হজ্জ
দেশভেদে ৯ থেকে ২৩ ঘণ্টা ছিয়াম পালন করছেন মুসলিমরা
সঊদী-রাশিয়া নযীরবিহীন চুক্তি : সম্ভাব্য ফলাফল
মুসলিম জাহান
নাস্তিকদের সন্ত্রাসী ঘোষণা সঊদী আরবের
পবিত্র কুরআন অবমাননা করলেই মৃত্যুদন্ডের শাস্তি ঘোষণা করল নাইজেরিয়া
শিক্ষার সর্বস্তরে সহ-শিক্ষা নিষিদ্ধ করল তালেবান
আফগানিস্তানে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করছে ভারত
সঊদী আরবে বাতিল হ’ল ‘কাফালা’ পদ্ধতি; প্রয়োজন হবে না নিয়োগকর্তার অনুমতি
অনলাইনে দাওয়াত পেয়ে ২১০ জনের ইসলাম গ্রহণ
আরও
আরও
.