জলীলুল কদর তাবেঈ, প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ ও ফকীহ উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রহঃ) ২৩ হিজরীতে ওছমান (রাঃ)-এর  খেলাফত কালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ ছাহাবী যুবায়ের বিন আওয়াম ও আবুবকর তনয়া আসমা (রাঃ)-এর পুত্র। বহু ছাহাবী তাঁর নিকট থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। পিতার ন্যায় পরহেযগারিতার মূর্তপ্রতিক এই মনীষী ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী ধৈর্যশীল। তাঁর অপরিসীম ধৈর্যশীলতার কিছু কিছু কাহিনী ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। যা আল্লাহর পথের পথিকদের প্রেরণা যুগিয়ে চলেছে যুগে যুগে।

এমনই একদিনের ঘটনা। তিনি খলীফা ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে দামেশকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। সাথে আছে সবচেয়ে প্রিয় পুত্র মুহাম্মাদ। হঠাৎ সে কৌতুহলী হয়ে পিতার হাত ছেড়ে ঢুকে পড়ল ঘোড়ার আস্তাবলে। একসময় নিকটবর্তী হয়ে গেল একটি পাগলা ঘোড়ার। ঘোড়াটি তাকে প্রচন্ড আঘাত করে মাটিতে ফেলে দিল। ফলে সে মৃত্যুবরণ করল। অন্য বর্ণনায় এসেছে, মুহাম্মাদ পরিবারের সাথে একটি গাধায় আরোহণ করে শহরে আসছিল। হঠাৎ গাধা থেকে পড়ে সে মারা গেল।

যাইহোক ধৈর্যশীল পিতা উরওয়া আকস্মাৎ পুত্র বিয়োগে শোকে মূহ্যমান হ’লেন। তবে তার চোখে-মুখে ছিল না কোন অভিযোগের ছাপ। বরং তিনি বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! আমার সাতজন সন্তান ছিল। আপনি একজনকে নিয়ে নিয়েছেন, কিন্তু ছয়জনকেই অবশিষ্ট রেখেছেন। যতবারই আমাকে পরীক্ষায় ফেলেছেন ততবারই সফলতা দিয়েছেন। যতবারই কিছু নিয়েছেন, ততবারই কিছু দিয়েছেন’।

একই সফরে তাঁকে দিতে হ’ল ধৈর্যের আরো এক কঠিন পরীক্ষা। তিনি যখন কুরা উপত্যকায় পৌঁছলেন। পায়ে ব্যথা অনুভব করলেন। দেখলেন ফোঁড়া উঠেছে। নিরুপায় অবস্থায় দীর্ঘ সফর শেষে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে একসময় পৌঁছলেন খলীফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের দরবারে।

খলীফা দেখলেন ইতিমধ্যে তার পায়ের অর্ধেক নলা পচে গেছে। তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিকটে পরামর্শ চাইলেন। তারা পর্যবেক্ষণ করে বললেন, পচে যাওয়া অংশটুকু অবশ্যই কেটে ফেলতে হবে। নইলে পুরো পা পচে যাবে। এমনকি সারা শরীরে পচন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় অর্ধেক পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হ’ল। 

অস্ত্রোপচারের জন্য শল্যচিকিৎসকগণ প্রস্তুত। নিয়ম অনুযায়ী তীব্র যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য তারা উরওয়া (রহঃ)-কে মদ পান করতে বললেন। কিন্তু না, তিনি রাযী হ’লেন না। তিনি বললেন,مَا ظَنَنْتُ أَنَّ أَحَدًا يُؤْمِنُ بالله يَشْرَبُ شَيْئًا يُغَيِّبُ عَقْلَهُ حَتَّى لَا يَعْرِفَ رَبَّهُ عَزَّ وَجَلَّ ‘আমি মনে করি না যে, আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এমন কোন ব্যক্তি কিছু পান করে বেহুঁশ হয়ে স্বীয় প্রভুকে ভুলে যেতে পারে’।

চিকিৎসকরা এবার আরেকটি উপায় হিসাবে তাঁকে ঘুমের ঔষধ পান করাতে চাইলেন। কিন্তু ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক উরওয়া তাদেরকে বিস্মিত করে জানিয়ে দিলেন, ঘুমিয়ে গেলে আমি যে (প্রচন্ড যন্ত্রণা থেকে) ছবর করার নেকী থেকে বঞ্চিত হবো!

নিরুপায় চিকিৎসকগণ এবার অস্ত্রোপচার কক্ষে কয়েকজন মানুষ ঢেকে আনলেন। তাদের প্রবেশ করতে দেখে উরওয়া বললেন, তারা এখানে এসেছে কেন? তাকে জানানো হ’ল, পা কাঁটার সময় ব্যথার আধিক্যে তিনি ধৈর্যহারা হয়ে গেলে যেন চিকিৎসকদের কাজে ব্যাঘাত না ঘটে, তাই তাদের নিয়ে আসা। উরওয়া তাদেরকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বললেন, আশা করি আমি অধৈর্য হব না।

অতঃপর পূর্ণ চেতনা থাকা অবস্থাতেই তার অস্ত্রোপচার শুরু হ’ল। পুরো সময় জুড়ে তার মধ্যে বিরাজ করছিল এক অপার্থিব নির্লিপ্ততা। মুখে কেবল আল্লাহর নাম। ছুরি দিয়ে প্রথমে গোড়ালী পর্যন্ত কেটে ফেলা হ’ল। পরে ধারালো করাত দিয়ে পায়ের নলা কেটে ফেলা হ’ল। এতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রশান্ত। অতঃপর যখন রক্ত বন্ধ করার জন্য ক্ষতস্থানে লোহা পুড়িয়ে দাগানো হ’ল, তখন আর যন্ত্রণার তীব্রতা সইতে পারলেন না; বেহুঁশ হয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে আসলো। পাশে থাকা পায়ের কাঁটা অংশটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলতে লাগলেন, ‘ওহে পা, যে আল্লাহ তোমাকে আমার বোঝা বহন করার জন্য সৃষ্টি করেছেন, তিনি ভালো করেই জানেন যে, আমি তোমার সাহায্যে হেঁটে কোন হারাম কর্মে লিপ্ত হইনি।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, চিকিৎসকগণ পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলে তিনি বললেন, তোমরা যদি আমার পা কেটে ফেলতেই চাও তাহ’লে থামো। আমি ছালাতে দাঁড়াই। তাহ’লে আমি কাটার যন্ত্রণা টের পাবো না।

অতঃপর তিনি ছালাতে দাঁড়ালেন। শল্যবিদগণ সতর্কতার সাথে নলার জীবন্ত হাড়সহ পা কেটে ফেললেন। সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে তিনি নড়া-চড়া তো দূরে থাক উহ্-আহ্ পর্যন্ত করলেন না। ছালাত শেষে খলীফা ওয়ালিদ তাঁর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বললেন, শায়খের মত ধৈর্যশীল আর কাউকে দেখিনি।

অতঃপর উরওয়া সফর সমাপ্ত করে নিজ বাসস্থান মদীনায় ফিরে আসলেন। ফিরে এসে আল­াহর শুকরিয়া আদায় করে বললেন, হে আল্লাহ! তোমার জন্য শুকরিয়া যে, আমার চার হাত-পার মধ্যে মাত্র একখানা তুমি নিয়েছ এবং বাকী তিনখানা অক্ষত রেখেছ। কসম তোমার পবিত্র সত্তার! অসুস্থ হ’লে তুমিই সুস্থতা দান করে থাক। তুমি যদি আমার থেকে কিছু ছিনিয়ে নিয়ে থাক, তবে অনেক কিছু অবশিষ্টও রেখেছ। কিছুদিন যদি কষ্ট দিয়ে থাক, তবে অনেকদিন সুখ-শান্তিও দিয়েছ (ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ৯/১০১-১০৩; আবুল হাজ্জাজ আল-মিযযী, মুযী, তাহযীবুল কামাল ২০/২০-২২; তারীখু দিমাশক্ব ৪০/২৬১; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৪/৪৩০-৪৩২; ইবনু খালি­কান, ওয়াফায়াতুল আ‘ইয়ান ৩/২৫৬-২৫৭)







বিরোধীদের প্রতি ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ)-এর ক্ষমাসুন্দর আচরণ - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
পৃথিবীর বৃহত্তম রাষ্ট্রের খলীফা হারূণুর রশীদের প্রতি ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর ঐতিহাসিক পত্র - আত-তাহরীক ডেস্ক
আবু দাহদাহ (রাঃ)-এর দানশীলতা - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
তাতারদের আদ্যোপান্ত - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর দৃঢ়তা - ড. নূরুল ইসলাম
খলীফা ওমর (রাঃ)-এর অনুশোচনা
ধৈর্যের অনন্য দৃষ্টান্ত - আবু রাযিয়া, নিয়ামতপুর, নওগাঁ
খলীফা হারূনুর রশীদের নিকটে প্রেরিত ইমাম মালেক (রহঃ)-এর ঐতিহাসিক চিঠি - ইহসান ইলাহী যহীর
মহামারী থেকে আত্মরক্ষায় বিদ‘আতী আমলের পরিণতি - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
সততা ও ক্ষমাশীলতার বিরল দৃষ্টান্ত - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
ওমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর মৃত্যুকালীন নছীহত - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
দরিদ্র পরহেযগার ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিলেন সাঈদ ইবনু মুসাইয়েব - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
আরও
আরও
.