ভূমিকা :
ইসলামের ইতিহাস শুধু বিজয়ের ইতিহাস নয়। বরং নির্যাতন-নিপীড়ন, ছবর ও আত্মোৎসর্গের এক রঞ্জিত ইতিহাস। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণ ছিলেন যার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁদের মধ্যে এমন অনেকেই ছিলেন, যারা সত্যের পথে অবিচল থাকার কারণে চরম নির্যাতন, বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের ঈমানী দৃঢ়তা বা আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। যাঁদের নাম উচ্চারিত হ’লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ত্যাগ, তাকবওয়া ও আত্মনিবেদনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইসলামের সূচনালগ্নে এমনই এক মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন হযরত ওছমান ইবনু মাযঊন (রাঃ)। তিনি ছিলেন প্রথম যুগের সেই সৌভাগ্যবান ছাহাবীদের একজন, যিনি সত্যের আহবানে সাড়া দিয়ে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং ঈমানের পথে অসীম কষ্ট ও অসংখ্য পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। মক্কার জাহেলী সমাজ যখন নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ও তাঁর অনুসারীদের ওপর নির্যাতনের স্টীম রোলার চালাচ্ছিল, তখন ওছমান ইবনু মাযঊন (রাঃ) ছিলেন দৃঢ়চিত্ত, অবিচল ও আপসহীন। সম্ভ্রান্ত বংশে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও তিনি সত্যের জন্য সামাজিক মর্যাদা, আরাম-আয়েশ ও পার্থিব স্বার্থকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে এমন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল যে, তিনি দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আখেরাতের সফলতাকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়েছিলেন। আলোচ্য নিবন্ধে এই মহান ছাহাবীর জীবনসংগ্রাম, চরিত্র মাধুর্য, ত্যাগ ও ইসলামের জন্য তাঁর অবদানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হ’ল।-
বংশ পরিচয় :
হযরত ওছমান বিন মাযউন (রাঃ) মক্কার অত্যন্ত প্রভাবশালী ও মর্যাদাপূর্ণ ‘বনু জুমাহ’ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ণ নাম ওছমান বিন মাযউন বিন হাবীব বিন ওয়াহাব বিন হুযাফা বিন জুমাহ বিন আমর বিন হুছাইছ বিন কা’ব আল-জুমাহী।[1] তাঁর ডাকনাম বা কুনিয়াত ছিল আবূ সায়িব। তাঁর পিতার নাম মাযঊন এবং মাতার নাম ছিল সুখাইলা বিনতু উনাইস (মতান্তরে বিনতু আনবাস)। ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)-এর পরিবারের প্রায় সকল সদস্যই ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর দুই ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে মাযঊন এবং কুদামা ইবনে মাযঊনও প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং হাবশা ও মদীনায় হিজরত করেছিলেন।
ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)-এর পারিবারিক সম্পর্কগুলো তৎকালীন মক্কার সামাজিক বিন্যাসেও গুরুত্ব বহন করত। তাঁর বোন যয়নাব বিনতু মাযঊন ছিলেন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তবাব (রাঃ)-এর স্ত্রী এবং উম্মুল মুমিনীন হাফছাহ (রাঃ) ও আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের মাতা। তাঁর নিজের স্ত্রী ছিলেন খাওলা বিনতু হাকিম (রাঃ), যিনি নিজেও ছিলেন ইসলামের প্রথম দিকের নিবেদিতপ্রাণ ছাহাবিয়া এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিত্ব।
শারীরিক গঠন :
আয়েশা বিনতে কুদামা বলেন, ‘মাযঊন পরিবারের ভাইদের চেহারায় পরস্পরের সঙ্গে মিল ছিল। ওছমান (রাঃ) ছিলেন শ্যামবর্ণ। তার দাড়ি ছিল ঘন ও লম্বা।[2]
ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই মদ বর্জন :
জাহেলী আরবের লোকেরা যখন মদ্যপান, জুয়া এবং পৌত্তলিকতার চরম অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, তখনও ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ) ছিলেন এক ব্যতিক্রমী আলোকিত সত্তা। তিনি সেই হাতেগনা কয়েকজন কুরাইশদের একজন ছিলেন যারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই নিজের ওপর মদ হারাম করে নিয়েছিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল এক প্রগাঢ় যুক্তিবাদ। তিনি মনে করতেন, মদ এমন একটি পানীয় যা মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ ‘বিবেক’ কেড়ে নেয় এবং তাকে নিম্নস্তরের মানুষের কাছে হাস্যস্পদ করে তোলে। তাই তিনি মদ্যপান থেকে বিরত থাকেন। তিনি বলতেন,لَا أَشْرَبُ شَرَابًا يَذْهَبُ عَقْلِي، وَيُضْحِكُ بِي مَنْ هُوَ أَدْنَى مِنِّي، ‘আমি এমন পানীয় পান করব না যা আমার বিবেক কেড়ে নেয় এবং আমাকে এমন ব্যক্তির নিকটে হাসিরপাত্র করে যে আমার তুলনায় নিম্নস্তরের’।[3] পরে যখন মদ হারাম ঘোষণা করা হয়, তখন তিনি বলেন, ‘ধ্বংস হোক মদের! আমি তো আগে থেকেই এর ক্ষতি বুঝতে পেরেছিলাম’।[4] এই চারিত্রিক আভিজাত্য এবং বিবেকের স্বচ্ছতাই তাঁকে ইসলামের সত্যবাণী গ্রহণের জন্য মানসিকভাবে প্রস্ত্তত করে রেখেছিল।
ইসলাম গ্রহণ :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন গোপনে ও প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন, তখন ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)-এর পবিত্র অন্তর দ্রুত সেই সত্যকে চিনে নিতে সক্ষম হয়। রাসূল (ছাঃ)-এর দারুল আরক্বামে যাওয়ার আগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বে ১৩ জন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন চতুর্দশ মুসলিম।[5] তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইবনে আববাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কায় তাঁর বাড়ির আঙ্গিনায় বসে ছিলেন। এমন সময় ওছমান বিন মাযঊন পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) তাঁকে দেখে মুচকি হাসলেন এবং বসার আমন্ত্রণ জানালেন। ওছমান যখন রাসূল (ছাঃ)-এর সামনে বসলেন, তখন হঠাৎ নবী করিম (ছাঃ)-এর ওপর ওহী নাযিলের লক্ষণসমূহ প্রকাশ পেল। ওছমান (রাঃ) বিস্ময়ভরে লক্ষ্য করলেন যে, রাসূল (ছাঃ) আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন এবং খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু শোনার চেষ্টা করছেন। ওহী নাযিল শেষ হওয়ার পর রাসূল (ছাঃ) তাঁকে পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাহল-এর ৯০ নম্বর আয়াতটি পাঠ করে শোনালেন,إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও অবাধ্যতা হ’তে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর’ (নাহল ১৬/৯০)। এই আয়াতটি শোনার সাথে সাথেই ওছমান (রাঃ)-এর হৃদয়ে ঈমানের আলো প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে এবং তিনি সেখানেই কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি জানতেন যে, মক্কার কুরাইশরা, বিশেষ করে তাঁর নিজের গোত্র ‘বনু জুমাহ’ এটি সহজে মেনে নেবে না। তবুও তিনি সত্যের পথে অটল থাকার শপথ নিলেন। তাঁর সাথে তাঁর ভাই আব্দুল্লাহ ও কুদামা এবং পুত্র সায়িবও ইসলাম গ্রহণ করেন, যার ফলে মাযউন পরিবার মক্কায় ঈমানী আন্দোলনের এক শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হয়।
সামাজিক নিগ্রহ ও নির্যাতনের শিকার ওছমান (রাঃ) :
ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)-এর মতো একজন প্রভাবশালী ও অভিজাত ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ কুরাইশদের জন্য ছিল এক চরম আঘাত। বিশেষ করে বনু জুমাহ গোত্র এটিকে তাদের আভিজাত্যের অবমাননা হিসাবে গণ্য করেছিল। অন্যান্য নির্যাতিত ছাহাবীদের ন্যায় ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)-এর উপরেও নেমে আসল সামাজিক বঞ্চনা-গঞ্জনা, নিগ্রহ-নিপীড়নের নানাবিধ ঘটনা। কিন্তু ওছমান (রাঃ) পরকালে মুক্তির নেশায় সবকিছু চোখ বুজে হজম করতেন। জান্নাতী সফলতার উদগ্র বাসনা তাকে এতটাই ব্যাকুল করে তুলেছিল যে, দুনিয়ার মোহমায়া তাকে কিঞ্চিত পরিমাণও স্পর্শ করতে পারেনি।
হাবশায় হিজরত : নবুঅতের পঞ্চম বছর। কুরাইশদের নির্যাতনের মাত্রা যখন চরম থেকে চরমতর আকার ধারণ করতে লাগল, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মুসলমানদের একটি দলকে হাবশায় বাদশাহ নাজ্জাশীর রাজ্যে (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার পরামর্শ দেন। কেননা বাদশাহ নাজ্জাশী ছিলেন সহনশীল ও ন্যায়পরায়ণ। সেখানে মুসলমানরা নিরাপদে দ্বীন পালন করার সুযোগ পাবেন। হাবশায় প্রথম হিজরতকারী ১৫ জনের এই কাফেলার নেতা ছিলেন ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)। এদের মধ্যে ৪ জন ছিলেন নারী। তারা লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে বাদশাহ নাজ্জাশীর রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেন যেন শান্তিতে ও নিরাপদে আল্লাহর ইবাদত করার সুযোগ পান। উল্লেখ্য, ইসলামের প্রথম যুগের নতুন মুসলমানদের হাবশায় হিজরতই তখনকার নির্যাতনের একটি জাজ্বল্য প্রমাণ। কারণ মুসলমানরা নিছক ভ্রমণের জন্য নয়, বরং ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতেই দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
হাবশায় কিছুদিন অবস্থানের পর একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মক্কার কুরাইশরা দলবদ্ধভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এই সংবাদ শুনে ওছমান (রাঃ) অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং তাঁর দল নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু মক্কার কাছাকাছি আসার পর তারা বুঝতে পারেন যে খবরটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং কুরাইশরা আগের চেয়েও অধিক হিংস্র হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় ফিরে যাওয়াও ছিল অসম্ভব, আর মক্কায় প্রবেশ করা ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। তখন অধিকাংশ মুহাজির মক্কার কোন না কোন প্রভাবশালী মুশরিক নেতার আশ্রয় (জিওয়ার) গ্রহণ করে মক্কায় প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন।
ওয়ালীদ বিন মুগীরার আশ্রয় গ্রহণ ও বর্জন : ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ) মক্কার অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ওয়ালীদ বিন মুগীরার সাথে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ও আভিজাত্যের সুবাদে তার আশ্রয় গ্রহণ করে মক্কায় প্রবেশ করেন। ওয়ালিদের আশ্রয়ে থাকার কারণে কেউ তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেত না। তিনি নিরাপদে চলাফেরা করতেন। ভিতরে বিদ্বেষের আগুন জ্বললেও প্রকাশ্যে কেউ তাকে কিছু বলত না। কিন্তু একই সময়ে অপরাপর মুসলিমদের উপরে চলতে থাকে লোমহর্ষক নির্যাতন। এতে ওছমানের বিবেকে বিষয়টি মারাত্মকভাবে আঘাত করে। তিনি ভাবলেন আমার অন্যান্য মুসলিম ভাইয়েরা নির্যাতন ভোগ করছে আর আমি নিরাপদে চলাফেরা করছি। এই বিবেকের দংশন তাকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য করে। তিনি ওয়ালিদের আশ্রয় প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
ওয়ালীদকে তিনি বললেন, ‘হে আবূ আব্দুশ শামস! তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছ, কিন্তু আমি তোমার দেওয়া নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিচ্ছি। তিনি অবাক বিস্ময়ে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ) বলেন, আমি কেবলমাত্র মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ করতে চাই। আমার ভাইদের কষ্টের অংশীদার হওয়াটাই আমার কাছে প্রকৃত নিরাপত্তা। ওয়ালীদ তখন কা‘বা চত্বরে জনসমক্ষে এই ঘোষণা দিতে বললেন, যাতে কেউ ওয়ালিদকে চুক্তি ভঙ্গের দায়ে দোষারোপ করতে না পারেন। ওছমান (রাঃ) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই ঘোষণা উচ্চারণ করে দিলেন।[6]
শারীরিক নির্যাতন : ওয়ালীদ বিন মুগীরার আশ্রয় ত্যাগ করার কয়েক মুহূর্ত পরেই ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ) শারীরিক নির্যাতনের সম্মুখীন হন। মক্কার এক জনাকীর্ণ মজলিসে আরবের শ্রেষ্ঠ কবি লাবীদ বিন রাবী‘আ কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। ওছমান (রাঃ) পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লাবীদ একটি পংক্তি আবৃত্তি করলেন, ألا كل شيء ما خلا الله باطل ‘জেনে রাখ, আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই অসার’। ওছমান (রাঃ) তখন বললেন, صدقت ‘তুমি সত্য বলেছ’। পরে লাবীদ বলল, وكل نعيم لا محالة زائل، ‘প্রত্যেক নি‘আমত একদিন বিলীন হয়ে যাবে’। ওছমান (রাঃ) আপত্তি করে বললেন, كذبت، نعيم الجنة لا يزول، ‘তুমি মিথ্যা বলেছ। জান্নাতের নে‘মত কখনো বিলীন হবে না’। এতে কুরাইশরা ক্ষুব্ধ হয়ে যায়। একজন উঠে এসে তাঁর মুখে আঘাত করে। এতে তাঁর একটি চোখে গুরুতর আঘাত লাগে এবং চোখ ফুলে যায়।
চোখে আঘাত পাওয়ার পর ওয়ালীদ বিন মুগীরা বললেন,لو كنت في جواري ما أصابك، ‘তুমি যদি আমার আশ্রয়ে থাকতে, তাহলে এ আঘাত পেতে না’। জবাবে ওছমান (রাঃ) বললেন, بل إن عيني الصحيحة لفقيرة إلى ما أصاب أختها في الله، ‘বরং আমার সুস্থ চোখটিও আল্লাহর পথে তার সঙ্গী চোখের মতো আঘাত পাওয়ার জন্য প্রস্ত্তত’।[7]
পরহেযগারিতা :
ওছমান বিন মাযঊন (রাঃ)-এর পরহেযগারিতা ছিল অনন্য। তিনি ছিলেন শতভাগ দুনিয়াবিমুখ। এমনকি ইবাদতের ব্যস্ততা তাকে নিজ পরিবার থেকেও উদাসীন করে তুলেছিল। একদিন তাঁর স্ত্রী খাওলা জীর্ণ-শীর্ণ ও মলিন পোষাকে আয়েশা (রাঃ)-এর নিকটে আসলে আয়েশা (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার এই অবস্থা কেন? তিনি বললেন, আমার স্বামী সারা রাত ছালাত আদায় করে এবং সারা দিন ছিয়াম পালন করে (আমার তেমন কোন খোঁজ-খবর রাখে না)। আয়েশা (রাঃ) বিষয়টি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট উপস্থাপন করলে তিনি ওছমান বিন মাযঊনের সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন,يَا عُثْمَانُ إِنَّ الرَّهْبَانِيَّةَ لَمْ تُكْتَبْ عَلَيْنَا أَفَمَا لَكَ فِىَّ أُسْوَةٌ فَوَ اللهِ إِنِّى أَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَحْفَظُكُمْ لِحُدُودِهِ، ‘হে ওছমান! আমাদের জন্য বৈরাগ্যকে ফরয করা হয়নি। আর আমার মধ্যে কি তোমার জন্য উত্তম আদর্শ নেই? অথচ আল্লাহর কসম! আমিই তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক আল্লাহকে ভয় করি এবং আল্লাহর সীমারেখা সর্বাধিক রক্ষা করি’।[8]
অপর বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ওছমান বিন মাযউন-এর কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁকে ডেকে আনলেন। অতঃপর বললেন,يَا عُثْمَانُ، أَرَغِبْتَ عَنْ سُنَّتِي قَالَ: لَا وَاللهِ يَا رَسُولَ اللهِ وَلَكِنْ سُنَّتَكَ أَطْلُبُ قَالَ فَإِنِّي أَنَامُ وَأُصَلِّي، وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأَنْكِحُ النِّسَاءَ، فَاتَّقِ اللهَ يَا عُثْمَانُ، فَإِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِضَيْفِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، فَصُمْ وَأَفْطِرْ، وَصَلِّ وَنَمْ- ‘হে ওছমান! তুমি কি আমার সুন্না্ত থেকে বিমুখ হয়েছ? তিনি বললেন, না, আল্লাহর কসম হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! বরং আমি আপনার সুন্নাতই অনুসরণ করতে চাই। তখন নবী (ছাঃ) বললেন, আমি তো (রাতে কিছু সময়) ঘুমাই এবং (কিছু সময়) ছালাত আদায় করি; আমি ছিয়াম রাখি এবং ছিয়াম ছেড়ে দেই; আর আমি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। সুতরাং হে ওছমান! আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার পরিবারের অধিকার রয়েছে, তোমার ওপর তোমার মেহমানের অধিকার রয়েছে এবং তোমার নিজেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে। অতএব তুমি ছিয়াম রাখো এবং ছিয়াম ভঙ্গও করো; ছালাত পড়ো এবং ঘুমাও’।[9]
আলোচ্য হাদীছ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইবাদতের নামে নিজের শরীর, পরিবার বা সামাজিক দায়িত্বকে অবহেলা করা ইসলামের আদর্শ নয়। রাসূল (ছাঃ) নিজে ইবাদত করতেন, আবার বিশ্রাম নিতেন, পরিবারকে সময় দিতেন এবং জীবনের স্বাভাবিক দায়িত্বও পালন করতেন। তিনি এতটাই ইবাদতগুযার ও সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন যে, তিনি, আলী (রাঃ) এবং আবু যার (রাঃ) একসময় সংসারবিমুখ জীবনযাপনের চিন্তা করেছিলেন।[10] তিনি এ বিষয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূল (ছাঃ) তাকে অনুমতি দেননি। এ প্রসঙ্গে সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) বলেন,رَدَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى عُثْمَانَ بْنِ مَظْعُونٍ التَّبَتُّلَ، وَلَوْ أَذِنَ لَهُ لَاخْتَصَيْنَا، ‘রাসূল (ছাঃ) ওছমান বিন মাযঊনকে সংসারত্যাগী সন্ন্যাসজীবন (তাবাত্তুল) গ্রহণ করতে নিষেধ করেছিলেন। যদি তিনি তাকে অনুমতি দিতেন, তবে আমরা সকলে খোজা বা খাসী হয়ে যেতাম’।[11] [ক্রমশ:]
[1]. শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন ওছমান আয-যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১ম খন্ড, পৃ: ১৫৪।
[2]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১ম খন্ড, পৃ ১৫৮।
[3]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১ম খন্ড, পৃ: ১৫৪; ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাযাম ফী তারীখিল মুলুম ওয়াল উমাম (বৈরূত: দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়াহ তাবি), ৩য় খন্ড, পৃ: ১৯০।
[4]. সিয়ার, ১ম খন্ড, পৃ: ১৫৫।
[5]. সিয়ার, ১ম খন্ড, পৃ: ১৫৫।
[6]. মাহমূদ আল-মিছরী, আছহাবুর রাসূল (ছাঃ) (মিসর: মাকতাবাতু আবী বকর ছিদ্দীক্ব, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০২ খৃঃ) ২য় খন্ড, পৃ: ১৬৮।
[7]. আছহাবুর রাসূল (ছাঃ), ২য় খন্ড, পৃ:১৬৯।
[8]. আহমাদ হা/২৫৯৩৫ সনদ ছহীহ; ছহীহ ইবনে হিববান হা/৬।
[9]. আবূদাঊদ হা/১৩৬৯; সনদ ছহীহ।
[10]. সিয়ার, পৃ: ৫৪।
[11]. বুখারী হা/৫০৭৩; মুসলিম হা/১৪০২।