দুনিয়ার মোহ এক অদ্ভুত মরীচিকা। এর পেছনে মানুষ যত ছোটে, তার তৃষ্ণা যেন তত বেড়েই চলে। অধিক পাওয়ার এই অন্তহীন প্রতিযোগিতায় পড়ে মানুষ অনেক সময়ই ভুলে যায় রিযিকের পবিত্রতার কথা। হালাল-হারামের সীমারেখা বিস্মৃত হয়ে সাময়িক লাভের আশায় মানুষ মিথ্যা কসম ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়। অথচ দুনিয়াবী এই ছোট্ট জীবনে পাহাড়সম হারাম সম্পদের চেয়ে এক চিমটি হালাল রিযিকের বরকত অনেক বেশী প্রশান্তি দায়ক। আর এই হালাল রিযিকের পথে অবিচল থাকতে একজন নেককার ও অল্পে তুষ্ট জীবনসঙ্গীনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন দ্বীনদার স্ত্রী কেবল সংসারের আলোই নন, বরং তিনি স্বামীর আখেরাতমুখী জীবনের এক মযবূত খুঁটি। আসুন! সালাফদের সোনালী যুগের এমনই একটি হৃদয়স্পর্শী কাহিনী থেকে আমরা শিক্ষা নেই, যা আমাদের অন্তরকে নাড়া দেবে এবং নতুন করে ভাবতে শেখাবে।
প্রখ্যাত তাবেঈ হাসান বাছরী (২১-১১০ হি./৬৪২-৭২৮ খ্রি.) বলেন, একবার আমি মক্কায় এক কাপড় ব্যবসায়ীর কাছে একটি কাপড় কেনার জন্য দাঁড়ালাম। দেখলাম লোকটি পণ্য বিক্রির আশায় তার জিনিসপত্রের অতিরঞ্জিত প্রশংসা করছে, আর কথায় কথায় কসম খাচ্ছে। তার এই অবস্থা দেখে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম এবং মনে মনে বললাম, এমন প্রতারক ব্যক্তির নিকট থেকে কেনাকাটা করা মোটেও উচিত নয়। ফলে আমি সেখান থেকে চলে গিয়ে অন্যজনের কাছ থেকে কাপড় কিনলাম। এর ঠিক দুই বছর পর আমি পুনরায় হজ্জ করতে গেলাম এবং ঘটনাক্রমে মক্কার বাজারে সেই লোকটির কাছেই আবার উপস্থিত হ’লাম। কিন্তু এবার তাকে দেখে আমি অবাক! তাকে আগের মতো পণ্যের অযথা প্রশংসা করতে বা অধিক কসম খেতে শুনলাম না। অত্যন্ত শান্ত ও সৎভাবে সে ব্যবসা করছে। আমি কৌতূহলী হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি সেই ব্যক্তি নন, যার কাছে আমি কয়েক বছর আগে দাঁড়িয়েছিলাম? সে মুচকি হেসে বলল, হ্যাঁ, আমিই সেই ব্যক্তি।
আমি তাকে বললাম, কোন জাদুকরী পরশ আপনাকে এই প্রশান্ত অবস্থায় নিয়ে এসেছে যা আমি এখন দেখছি? আমি তো এখন আপনাকে আগের মতো পণ্যের মিথ্যা প্রশংসা করতে বা শপথ করতে দেখছি না! তখন সে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, পূর্বে আমার এক স্ত্রী ছিল। আমি দিন-রাত হাড়ভাঙা খাটুনি করে তার কাছে সামান্য কিছু আনলে সে তা তুচ্ছ মনে করত, আর বেশী আনলে সেটাও তার কাছে কম মনে হ’ত। তার সেই অতৃপ্তি ও লোভের কারণে বেশী উপার্জনের আশায় আমাকে মিথ্যা কসম ও প্রতারণার আশ্রয় নিতে হ’ত। অতঃপর আল্লাহ আমার প্রতি রহম করলেন এবং তাকে মৃত্যু দান করলেন।
এরপর আমি এক নেককার নারীকে বিয়ে করেছি। এখন যখন আমি সকালে উপার্জনের আশায় বাজারের দিকে বের হওয়ার প্রস্ত্ততি নেই, তখন সে অত্যন্ত ভালোবাসায় আমার কাপড়ের প্রান্ত ধরে বলে, ‘হে আমার স্বামী! আল্লাহকে ভয় করুন এবং আমাদেরকে হালাল ও পবিত্র রিযিক ছাড়া হারাম কোন কিছু খাওয়াবেন না। যদি আপনি আমাদের জন্য সামান্য কিছু আনেন, তবে আমরা তাতেই তুষ্ট থাকব। আর যদি কোনদিন কিছুই না পান, তবে আমরা চরকায় সূতা কেটে আপনাকে সাহায্য করব, তবুও হারামের দিকে পা বাড়াবেন না’।[1]
শিক্ষা :
মহান আল্লাহ আমাদের প্রতিটি পরিবারকে সালাফদের মত অল্পেতুষ্ট ও তাক্বওয়াপূর্ণ জীবন গঠনের তাওফীক্ব দান করুন। দুনিয়ার লোভ-লালসার নাগপাশ থেকে আমাদের মুক্ত করুন এবং হালাল রিযিকের স্নিগ্ধ ধারায় আমাদের জীবনকে সিক্ত করুন। আমাদেরকে এমন জীবনসঙ্গী দান করুন, যারা একে অপরকে দুনিয়ার লোভের দিকে নয়; বরং হালাল রিযিক, তাক্বওয়া, ঈমান-আমল ও জান্নাতের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন!
[1]. আবূ বকর আহমাদ ইবনু মারওয়ান আদ-দীনাওয়ারী (মৃ.৩৩৩ হি./৯৪৫ খ্রি.), আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, তাহকীক্ব : মাশহূর ইবনে হাসান আলে সালমান (বৈরূত : জামঈয়াতুত তারবিয়াতিল ইসলামিইয়াহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৯ হি./১৯৯৮ খ্রি.), ৫/২৫১।