খোলাফায়ে রাশেদীন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁদের শাসনামলে ন্যায়বিচারের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিম্নে এ বিষয়ে দ্বিতীয় খলীফা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর আমলের একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা নিম্নরূপ-
গাসসানী রাজার উপর ক্বিছাছ কায়েম করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ওমর (রাঃ) :
উজাবালাহ ইবনুল আইহাম ছিলেন শাম অঞ্চলের খ্রিস্টান আরব গোত্র গাসসান-এর সর্বশেষ রাজা। তিনি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর খেলাফতকালে রোমানদের পক্ষে ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পরে ওমর (রাঃ)-এর যুগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেছেন যে, জাবালাহ ইবনুল আইহামের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ ওমর (রাঃ)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন। এরপর তিনি তাঁকে মদীনায় আসার আমন্ত্রণ জানান। অন্য বর্ণনায় আছে, জাবালাহ নিজেই মদীনায় আসার অনুমতি চাইলে ওমর (রাঃ) তাঁকে অনুমতি দেন। অতঃপর তিনি তাঁর কওমের বহু লোককে সাথে নিয়ে- কেউ বলেন দেড়শ, কেউ বলেন পাঁচশ অশ্বারোহীসহ-মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ওমর (রাঃ) তাঁর অভ্যর্থনার জন্য উপঢৌকন ও আতিথেয়তার ব্যবস্থা করেন। তাঁর মদীনায় প্রবেশের দিনটি ছিল এক স্মরণীয় দিন। তিনি স্বর্ণ-রৌপ্যের অলংকারে সজ্জিত ঘোড়ায় চড়ে এবং মণিমুক্তাখচিত মুকুট পরে নগরে প্রবেশ করেন। মদীনার নারী-পুরুষ তাঁকে এক নজর দেখার জন্য বেরিয়ে আসে। তিনি ওমর (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে ওমর (রাঃ) তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং নিজের নিকটে বসান।
সে বছর তিনি ওমর (রাঃ)-এর সঙ্গে হজ্জ পালন করেন। তাওয়াফের সময় বনু ফাযারাহ গোত্রের এক ব্যক্তি অসাবধানতাবশত তাঁর লুঙ্গির এক প্রান্তে পা দিলে তা খুলে যায়। এতে জাবালাহ ক্রুদ্ধ হয়ে লোকটির নাকে এমন সজোরে আঘাত করেন যে, তার নাক ভেঙে যায়। তখন লোকটি বনু ফাযারাহর বহু মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ওমর (রাঃ)-এর কাছে বিচার প্রার্থনা করে। ওমর (রাঃ) জাবালাহকে ডেকে পাঠালে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তখন ওমর (রাঃ) বললেন, তোমার ওপর কিসাস কার্যকর হবে’। জাবালাহ বললেন, ‘কীভাবে? আমি তো একজন রাজা, আর সে একজন সাধারণ মানুষ!’ তখন ওমর (রাঃ) বললেন, إنَّ الإسلام جمعك وإياه فلستَ تفضلُه إلَّا بالتقوى ‘ইসলাম তোমাকে ও তাকে একই মর্যাদায় এনে দাঁড় করিয়েছে। তাক্বওয়া ছাড়া তার ওপর তোমার কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই’। জাবালাহ বললেন, ‘আমি তো মনে করেছিলাম, ইসলামে এসে জাহিলিয়াতের যুগের চেয়ে আরও বেশী সম্মানিত হব’। ওমর (রাঃ) বললেন, ‘এসব কথা বাদ দাও। তুমি যদি ঐ ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট না কর, তবে তোমার ওপর ক্বিছাছ কার্যকর করা হবে’। জাবালাহ বললেন, ‘তাহলে আমি খ্রিস্টান হয়ে যাব’। ওমর (রাঃ) বললেন, ‘তুমি যদি ইসলাম ত্যাগ করো, তবে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিব’। বিষয়টি যে অত্যন্ত গুরুতর, তা বুঝতে পেরে জাবালাহ বললেন, ‘আমাকে আজ রাত পর্যন্ত চিন্তা করার অবকাশ দিন’। এরপর তিনি সেখান থেকে চলে যান। রাত গভীর হলে তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে সংগোপনে শামের দিকে পালিয়ে যান। পরে রোমান সাম্রাজ্যে প্রবেশ করে কনস্টান্টিনোপলে সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবারে উপস্থিত হন। হিরাক্লিয়াস তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন, সম্মানিত করেন, বহু ভূসম্পত্তি প্রদান করেন, প্রচুর ভাতা নির্ধারণ করে দেন, মূল্যবান উপহার দেন এবং নিজের ঘনিষ্ঠ সভাসদদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি দীর্ঘকাল সেখানেই অবস্থান করেন।
পরবর্তীকালে ওমর (রাঃ) হিরাক্লিয়াসের কাছে একটি পত্র পাঠান। পত্রবাহক দূতকে হিরাক্লিয়াস জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কি তোমার চাচাতো ভাই জাবালাহর সাথে সাক্ষাৎ করেছ?’ তিনি বললেন, ‘না’। তখন হিরাক্লিয়াস তাঁকে জাবালাহর সঙ্গে দেখা করতে বলেন। দূত তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দেখলেন, তিনি দুনিয়াবী ভোগ-বিলাসে নিমগ্ন-বিলাসবহুল পোশাক, বিছানা, সুগন্ধি, দাসী, উন্নত আহার, পানীয় ও রাজকীয় প্রাসাদে পরিবেষ্টিত। দূত তাঁকে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে শামে ফিরে আসার আহবান জানালেন। জাবালাহ্ বললেন, ‘আমার মতো ব্যক্তি, যে ইসলাম ত্যাগ করেছে, তার কি আবার ফিরে আসার সুযোগ আছে?’ দূত বললেন, ‘অবশ্যই। আশ‘আছ ইবনু কায়েসও একসময় মুরতাদ হয়েছিল এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। পরে সে তওবা করে ফিরে এলে মুসলিমরা তাকে গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি আবু বকর ছিদ্দীক (রাঃ) তাঁর বোন উম্মু ফারওয়ার সঙ্গে তার বিয়েও দিয়েছিলেন।[3]
উক্ত ঘটনা থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর দৃঢ়তা প্রতীয়মান হয়। সেই সাথে বিচারের ক্ষেত্রে উঁচু-নীচু কোন ভেদাভেদ নেই- ইসলামের এই সার্বজনীন নীতি প্রতিফলিত হয়েছে।
[1]. মুসলিম হা/১৮২৭।
[2]. বুখারী হা/৪৩০৪।
[3]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, (বৈরূত: দারু ইবনি কাছীর, ৩য় সংস্করণ, ১৪৩৪ হি./২০১৩ খ্রি.), ৮/৮৯-৯০; মাকরীযী, ইমতাউল আসমা‘ ১৪/২৪৫-৪৭।