ইন্টারনেট ব্যবহারে সতর্কতা

ভূমিকা : বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেট মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর ব্যাপক ব্যবহার আমাদের জীবনকে অত্যন্ত সহজ করেছে। তবে ইন্টারনেটের প্রসারের সাথে সাথে এর ব্যবহারের নেতিবাচক দিকগুলো ও নৈতিকতার প্রশ্নটিও আজ অত্যন্ত গুরুতবপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দায়িত্বশীল ব্যবহার না হ’লে এই প্রযুক্তি উপকারের বদলে ঈমান ও আমলের জন্য এক ভয়াবহ ফিৎনায় পরিণত হ’তে পারে, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ধ্বংস ডেকে আনে। একজন মুমিনের অন্তরে সর্বদা ক্বিয়ামতের মাঠে জবাবদিহিতার অনুভূতি থাকা অপরিহার্য। তাই দুনিয়াবী কল্যাণ লাভ এবং আখেরাতের ক্ষতি থেকে বাঁচতে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব করণীয় ও শিষ্টাচার বজায় রাখা অত্যন্ত যরূরী। এ নিবন্ধে আমরা ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সেসব দিক নিয়েই আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

ইন্টারনেটে নৈতিকতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা : ইসলামী নৈতিকতা ও তাক্বওয়ার অভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার এক ভয়াবহ ফিৎনা ও বিপজ্জনক হাতিয়ারে পরিণত হ’তে পারে। এর লাগামহীন ও অনৈতিক ব্যবহার সমাজে চরম অবক্ষয়, পাপাচার ও অস্থিরতা তৈরি করে। যা একজন মুমিনের ঈমান ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দেয়। এছাড়া শরী‘আতের সীমারেখা ও নৈতিকতা না মানলে ব্যবহারকারী দুনিয়াবী ক্ষতির পাশাপাশি আখিরাতেও নিজের জন্য চরম ধ্বংস ডেকে আনবে। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও দ্বীনী শিষ্টাচার রক্ষা করা একান্ত যরূরী। এর ফলে ব্যবহারকারী তাক্বওয়ার ভিত্তিতে দায়িত্বশীল, সচেতন ও নিরাপদভাবে অনলাইনের ইতিবাচক সুবিধাগুলো গ্রহণ করতে পারবে।

ইনটারনেটে নৈতিকতা রক্ষায় করণীয়

ইন্টারনেটের বহুমুখী ফিৎনা থেকে নিজের ঈমান ও আমলকে হেফাযত করে এর সঠিক ও ইতিবাচক ব্যবহারের জন্য একজন মুমিনকে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। নিম্নে ইন্টারনেট ব্যবহারে ইসলামী নৈতিকতা, তাক্বওয়া ও শিষ্টাচার বজায় রাখার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করা হ’ল।

১. ইন্টারনেট ব্যবহারের উদ্দেশ্য সৎ রাখা :

ইন্টারনেটে সময় ব্যয় করার মূল উদ্দেশ্য সর্বদা সৎ, ইতিবাচক ও কল্যাণমুখী হ’তে হবে। ইসলামে যেকোন কাজের প্রতিফল সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে নিয়তের উপর। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, ‘সমস্ত আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল’।[1]

সুতরাং ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিক্ষা, গবেষণা, হালাল উপার্জন, দ্বীনী জ্ঞান অর্জন বা প্রয়োজনীয় তথ্য অনুসন্ধানের ন্যায় কল্যাণকর উদ্দেশ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পক্ষান্তরে উদ্দেশ্যহীন ব্রাউজিং, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, অনৈতিক কনটেন্ট দেখা বা অহেতুক সময় নষ্ট করা হ’তে একজন মুমিনকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। পবিত্র কুরআনে সফল মুমিনদের অন্যতম প্রধান গুণ হিসাবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা অনর্থক কাজ হ’তে বিরত থাকে’ (মুমিনূন ২৩/৩)। তাই ইনটারনেট ব্যবহারের শুরুতেই নিজের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করে নেওয়া আবশ্যক। যাতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সময়টুকুও ইবাদত হিসাবে গণ্য হয়।

২. সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা: সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করা একজন মুমিনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ইন্টারনেটে অহেতুক দীর্ঘ সময় ব্যয় করা ব্যক্তির ইবাদত, পড়াশোনা, হালাল রুযী অন্বেষণ বা বিশ্রামের সময় কমিয়ে দেয় এবং চরম মানসিক চাপ তৈরি করে। তাই দৈনন্দিন সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা করে ইন্টারনেট ব্যবহার করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সতর্ক করে এরশাদ করেছেন, ‘দু’টি নে‘মতের বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকার মধ্যে পতিত হয়। আর তাহ’ল সুস্থতা ও অবসর’।[2]

উদাহরণস্বরূপ, প্রতিদিন কেবল নির্দিষ্ট ও প্রয়োজনীয় সময়ের জন্য অনলাইনে থাকা এবং এর বাইরে অফলাইনে সময় দেওয়া একটি উত্তম অভ্যাস। প্রয়োজনে বিভিন্ন অ্যাপ বা সফটওয়্যারের মাধ্যমে ‘স্ক্রিন টাইম’ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। সময়ের এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা আমাদের দৈনন্দিন কাজকেই গতিশীল ও বরকতময় করবে।

অনৈতিক বিষয়াদি এড়িয়ে চলা ও দৃষ্টির হেফাযত করা : অনলাইনে অনেক সময় চরম অশ্লীল, বিভ্রান্তিকর বা মানহানিকর কনটেন্ট সামনে আসে। একজন মুমিনের জন্য এ ধরনের ফিৎনা থেকে দৃষ্টির হেফাযত করা ফরয। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। এটা তাদের জন্য পবিত্রতর’ (নূর ২৪/৩০)

বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Algorithm) এমনভাবে কাজ করে যে, কোন খারাব কনটেন্টে সামান্য সময় ব্যয় করলে পরবর্তীতে টাইমলাইনে বারবার সেটাই ভেসে ওঠে। তাই শয়তানের এই আধুনিক ফাঁদ থেকে বাঁচতে অনৈতিক কনটেন্টগুলো কেবল স্ক্রল করে পার না হয়ে সাথে সাথে ব্লক (Block) বা ‘রিপোর্ট’ (Report) করা উচিত। এতে পরবর্তীতে ঐ জাতীয় কনটেন্ট আসা বহুলাংশে কমে যায় এবং সম্পূর্ণ নিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহার করা সম্ভব হয়।

নেতিবাচক ও মিথ্যা কনটেন্টে লাইক ও শেয়ার না করা : ইন্টারনেট এমন একটি উন্মুক্ত মাধ্যম যেখানে সর্বদা মিথ্যা, গুজব ও অশ্লীল কনটেন্টের ছড়াছড়ি থাকে। অনলাইনে এসব নেতিবাচক বা ভুয়া কনটেন্টে লাইক ও শেয়ার করার অর্থ হ’ল- পাপের কাজে ও মিথ্যা প্রচারে সহায়তা করা। ইসলামে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোন সংবাদ ছড়ানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘কোন ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বলে বেড়ায়’।[3] এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন নেতিবাচক, হিংসাত্মক বা অশ্লীল পোস্টে সামান্য প্রতিক্রিয়া (React) জানালেও তা মুহূর্তেই অন্যদের কাছে পৌঁছে যায়। এর পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি(নূর ২৪/১৯)

ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় নির্জনতা পরিহার করা : নির্জনতা শয়তানের প্ররোচনার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। দীর্ঘ সময় একা একা বা বদ্ধ ঘরে ইন্টারনেট ব্যবহার করলে অগোচরে পাপাচার ও চারিত্রিক পদস্খলনের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। মানুষ লোকচক্ষুর অন্তরালে গোপনে যে পাপ করে, তা তার সকল নেক আমলকে ধ্বংস করে দিতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একাকী অবস্থায় পাপকারীদের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন একদল মানুষের পাহাড় সমতুল্য নেক আমলগুলোকে আল্লাহ ধূলিকণায় পরিণত করবেন।... কারণ তারা এমন লোক যে, একান্ত গোপনে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত হবে’।[4]

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা লোকদের থেকে লুকাতে চায়, কিন্তু আল্লাহ থেকে লুকাতে চায় না। তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন, যখন রাত্রিতে তারা (আল্লাহর) অপ্রিয় বাক্যে শলা-পরামর্শ করে। বস্ত্ততঃ আল্লাহ তাদের সকল কৃতকর্মকে বেষ্টন করে আছেন’ (নিসা ৪/১০৮)। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় নির্জনতা পরিহার করে সর্বদা পরিবার ও বন্ধুদের উপস্থিতিতে বা খোলামেলা পরিবেশে তা ব্যবহার করা উত্তম। এতে শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকা এবং নিজের তাক্বওয়া ও নৈতিকতা রক্ষা করা অত্যন্ত সহজ হয়।

সাইবার বুলিং, ট্রোলিং ও গীবত থেকে বিরত থাকা : বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় কাউকে নিয়ে ট্রোল করা, মিম (Meme) বানিয়ে উপহাস করা বা কমেন্ট বক্সে গীবত করা মহামারির আকার ধারণ করেছে। এক্ষেত্রে ছোট-বড়, আলেম-ওলামা রাষ্ট্রের সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও ছাড় পাচ্ছেন না। অনেক সময় মানুষ মজা করার ছলেও অন্যের সম্মানহানি করে, যা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে হারাম। এবিষয়ে সতর্ক করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের দোষ বর্ণনা করো না এবং পরস্পরকে মন্দ লকবে ডেকো না। বস্ত্ততঃ ঈমান আনার পর তাকে মন্দ নামে ডাকা হ’ল ফাসেকী কাজ। যারা এ থেকে তওবা করে না, তারা সীমালংঘনকারী’ (হুজুরাত ৪৯/১১)। সুতরাং ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় একজন মুমিনকে অবশ্যই অন্যের সম্মান ও মর্যাদার প্রতি যত্নবান হ’তে হবে এবং সাইবার বুলিং বা গীবতের মতো জঘন্য পাপ থেকে নিজের যবান ও কিবোর্ডকে হেফাযত করতে হবে।

অনলাইন প্রতারণা ও হারাম উপার্জন হ’তে বেঁচে থাকা : বর্তমানে ইন্টারনেটে উপার্জনের বহুমুখী সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অনলাইন জুয়া (বেটিং অ্যাপ), ভুয়া ই-কমার্স, স্ক্যামিং বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে নানাবিধ হারাম কাজের ব্যাপক ছড়াছড়ি রয়েছে। অনেক তরুণই সহজে অর্থ উপার্জনের মোহে এসব প্রতারণা ও হারামে জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মনিটাইজেশন অন করে যে অর্থ উপার্জন করা হয় তা এড প্রদর্শনের দ্বারা হওয়ায় উক্ত অর্থ হালাল নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হারাম উপার্জনকারীকে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘ঐ দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যা হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট হয়েছে’।[5] সুতরাং ইন্টারনেট বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে উপার্জনের ক্ষেত্রে উক্ত পেশা বা মাধ্যমটি পূর্ণরূপে শরী‘আতসম্মত ও হালাল কি-না, তা গভীরভাবে যাচাই করে নেওয়া একজন মুমিনের জন্য একান্ত যরূরী।

কপিরাইট ও মেধাস্বত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা :

ইন্টারনেটে অন্যের লেখা, ছবি বা কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া (Plagiarism) কিংবা অবৈধভাবে পেইড সামগ্রী ব্যবহার করা (Piracy) এক ধরনের জঘন্য চুরি। ইসলামে অন্যের অধিকার বা সম্পদ হরণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আধুনিক যুগে মেধাসম্পদও (Intellectual Property) এক প্রকার মূল্যবান সম্পদ। তাই অনলাইনে অন্যের কাজকে নিজের বলে দাবী করা বা অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা স্পষ্ট প্রতারণা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ধোঁকা দেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়’।[6] সুতরাং ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্যের মেধাস্বত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং প্রয়োজনে মূল সূত্রের উল্লেখ করা একজন মুমিনের নৈতিক দায়িত্ব।

যাচাই ছাড়া তথ্য বিশ্বাস না করা : ইন্টারনেটের অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে সবচেয়ে বড় ফিৎনা হ’ল- ভুয়া খবর ও গুজবের ছড়াছড়ি। অনেকেই অনলাইনে চমকপ্রদ খবর, ছবি বা ভিডিও দেখলেই তা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে নেন এবং তা প্রচার করেন। অথচ ইসলামে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোন সংবাদ বিশ্বাস করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এবিষয়ে মহান আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে সতর্ক করে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোন ফাসেক ব্যক্তি তোমাদের নিকটে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহ’লে তোমরা সেটা যাচাই কর, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশে কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতি সাধন না কর। অতঃপর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হও’ (হুজুরাত ৪৯/৬)

ভুয়া কনটেন্ট ও ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন হ’তে সতর্ক থাকা : অনলাইনে গুজবের ফিৎনা হ’তে সমাজ ও নিজের ঈমানকে রক্ষা করতে যেকোন খবরের সত্যতা বিশ্বস্ত উৎস থেকে যাচাই করে নেওয়া একান্ত যরূরী। সন্দেহজনক আইডির পোস্ট ফিৎনামূলক মনে হ’লে সাথে সাথে ‘রিপোর্ট’ বা ‘ব্লক’ করতে হবে। এছাড়া, ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া সন্দেহজনক ছবি, ভিডিও বা খবরের সত্যতা উদ্ঘাটনে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট বা টুলস (যেমন: ফ্যাক্ট চেক, রিউমার স্ক্যানার ইত্যাদি)-এর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, অনলাইন বিজ্ঞাপনের (Ads) আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষতিকর লিংক, ভুয়া তথ্য বা অশ্লীল কনটেন্ট হ’তে দৃষ্টিকে হিফাযত করতে ব্রাউজারে একটি নির্ভরযোগ্য ‘অ্যাড ব্লকার’ (Ads Blocker) চালু রাখা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এর মাধ্যমে স্ক্রিনে হঠাৎ অশ্লীল ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন আসার ঝুঁকি কমে।

সাবস্ক্রিপশন গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করা : অনলাইনে বিভিন্ন পরিষেবার সাবস্ক্রিপশন (Subscription) গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা যরূরী। না বুঝে অবৈধ সাবস্ক্রিপশনের ফাঁদে পড়লে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষ করে যেসব প্ল্যাটফর্ম অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার প্রসার ঘটায়, সেগুলোর সাবস্ক্রিপশন কেনা মানে পাপাচারে আর্থিক সহায়তা করা। তাই যেকোন সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার পূর্বে পরিসেবার হালাল-হারাম ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা, শর্তাবলী পড়া এবং আর্থিক ক্ষতি এড়াতে স্বয়ংক্রিয় নবায়ন (Auto-renewal) বন্ধ রাখা একজন সচেতন মুমিনের কর্তব্য।

ডিজিটাল ওয়েলবিং চালু রাখা : স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর প্রযুক্তি হ’ল ‘ডিজিটাল ওয়েলবিং’ । ডিভাইসে এই ফিচারটি চালু রাখলে ব্যবহারকারী নিজের স্ক্রিন টাইম, অ্যাপ ব্যবহারের সময়সীমা এবং নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ডিজিটাল ওয়েলবিং চালু রাখলে দীর্ঘসময় অনলাইনে থাকার আসক্তি ও মানসিক চাপ কমে এবং অপ্রয়োজনীয় কনটেন্ট এড়িয়ে চলা সহজ হয়। ফলে সময়ের অপচয় রোধ করে ইন্টারনেট ব্যবহারে শৃঙ্খলতা, সচেতনতা ও নৈতিকতা বজায় রাখা অনেক সহজতর হয়।

ভিপিএন (VPN) ব্যবহারে সতর্কতা : ভিপিএন (Virtual Private Network) বা ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক মূলত ইন্টারনেটে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও সাইবার হামলা থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই, বিশেষ করে তরুণ সমাজ, সরকার বা ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ব্লক করে রাখা বিভিন্ন অশ্লীল সাইট, জুয়ার অ্যাপ বা হারাম ওয়েবসাইটগুলোতে প্রবেশ করার জন্য ভিপিএন-এর অপব্যবহার করে থাকে। সুতরাং ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ে ভিপিএন-এর ব্যবহার কেবল বৈধ, পেশাগত বা যরূরী নিরাপত্তামূলক কাজেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। গোপন পাপাচার ও দৃষ্টির অবাধ্যতা সম্পর্কে সতর্ক করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তিনি জানেন তোমাদের চোখের চোরাচাহনি এবং অন্তর সমূহ যা লুকিয়ে রাখে’ (মুমিন ৪০/১৯)।

উপসংহার : আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ ও গতিশীল করেছে, তেমনি মুমিনের ঈমানী অস্তিত্বের জন্য এটি এক চরম পরীক্ষাস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এমন এক দু’ধারী তলোয়ার, যা দিয়ে যেমন দ্বীন প্রচার ও জ্ঞানার্জনের অবারিত সুযোগ রয়েছে, তেমনি এর অপব্যবহারে ঈমান ও আমল ধ্বংস হওয়ারও সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। একজন সচেতন মুমিন হিসাবে আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, অফলাইন জীবনের মতো আমাদের অনলাইন জীবনেরও প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ক্লিক, লাইক, কমেন্ট ও শেয়ারের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব ক্বিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তা‘আলার কাঠগড়ায় দিতে হবে। তাই আসুন! ইন্টারনেটকে আমরা কেবল সময় কাটানো, পাপকাজ বা বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ না করে, একে শুধু ভালো কাজের মাধ্যম বানাই। শয়তানের পাতা আধুনিক এই ফিৎনার জাল থেকে নিজেদের চোখ, কান ও অন্তরকে হিফাযত করে তাক্বওয়াভিত্তিক একটি নিরাপদ ও সুস্থ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলি। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে ইন্টারনেটের যাবতীয় ফিৎনা হ’তে বেঁচে থাকার এবং এর সঠিক ও কল্যাণকর ব্যবহারের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

হাসীবুর রশীদ

শিক্ষার্থী, ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।


[1]. বুখারী হা/১।

[2]. বুখারী হা/৬৪১২; মিশকাত হা/৫১৫৫।

[3]. মুসলিম হা/৫; মিশকাত হা/১৫৬

[4]. ইবনে মাজাহ হা/৪২৪৫; ছহীহাহ হা/৫০৫

[5]. বায়হাক্বী, শু‘আব, মিশকাত হা/২৭৮৭; ছহীহাহ হা/২৬০৯।

[6]. মুসলিম হা/১০১; মিশকাত হা/২৮৬০।






ইন্টারনেট ব্যবহারে সতর্কতা - হাসীবুর রশীদ
যুবসমাজের নৈতিক অধঃপতন : কারণ ও প্রতিকার (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - ড. মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম
এইডস প্রতিরোধে ইসলাম - আত-তাহরীক ডেস্ক
ইয়েমেনের প্রতি সাম্রাজ্যবাদীদের শ্যেনদৃষ্টি
ক্ষুধার্তকে খাদ্য দানের গুরুত্ব, ফযীলত এবং প্রয়োজনীয়তা - ফরহাদুযযামান, রংপুর।
সুধারণা ও কুধারণা - ইহসান ইলাহী যহীর
বর্তমান মুসলমানদের অবস্থা ও পরিণাম - আশিক বিল্লাহ বিন শফীকুল আলম
তাবলীগী ইজতেমায় অংশগ্রহণের গুরুত্ব - মা‘রূফ বিন আব্দুল্লাহ - রংপুর মেডিকেল কলেজ, রংপুর
যুবসমাজের নৈতিক অধঃপতন : কারণ ও প্রতিকার - ড. মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম
মানসিক প্রশান্তি লাভে আল-কুরআন - মুজাহিদুল ইসলাম
জান্নাতের নে‘মত ও তা লাভের উপায়
যে দো‘আয় প্রশান্তি মেলে - মাহফূযুর রহমান
আরও
আরও
.