ইমরুল হাসান বুয়েট থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে ২০০৩ সালে পাস করার পর থেকে দীর্ঘদিন দেশে ও বিদেশে টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন। পেশাগত কারণে দীর্ঘদিন লন্ডন, মিসর, ফিলিপাইন, আরব আমিরাতে অবস্থান করার পর ২০১৪ সালের শেষের দিকে দেশে ফেরেন। এরপর তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন ও কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টা করেন। সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বরে শীতকালে নিরাপদ আমিষ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গাযীপুরে অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত অর্গানিক মুরগীর খামার গড়ে তোলেন।
ইমরুলের শুরুটা ভালোই ছিল। প্রথম দু’টি ব্যাচে কোন ঝামেলা হয়নি। কারণ সময়টা ছিল শীতের। তবে গরম আসার পরই হোঁচট খেতে হ’ল। পরপর দু’বার রাণীক্ষেত রোগ ও গরমে হাযার হাযার মুরগী মারা গেলে কর্মীরা তাকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের পরামর্শ দেন। এই কঠিন সময়েও তিনি ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সম্মত হননি। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া মুরগী পালনের নিশ্চয়ই কোন উপায় আছে। পথ খুঁজতে থাকেন ইমরুল। একসময় পেয়েও গেলেন। সেটি হ’ল ‘বয়সভেদে শেডের তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা’। এটির সঙ্গে খাটালেন তাঁর প্রকৌশলবিদ্যা। নিজেই খামারের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করলেন সার্বক্ষণিক তাপমাত্রা মনিটরিংয়ের সেন্সর। বসালেন কুলিং প্যাড। আর নযর দিলেন মুরগীর খাবারে। আমেরিকান ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচার ও ইউরোপিয়ান অর্গানিক গাইডলাইন অনুসারে অ্যান্টিবায়োটিক মুক্ত ও অর্গানিক মুরগী পালনের জন্য নিজেই মুরগীর ফিড তৈরি করতে শুরু করলেন। দানাদার খাবার তৈরির জন্য মেশিন ডিজাইন করে চীন থেকে তৈরি করিয়ে আনেন। মুরগীকে নিয়মিত অ্যাপল সিডার ভিনেগার উইথ মাদার, প্রাকৃতিক বিটেইন, অরেগানু, সজনে পাতা, কাঁচা হলুদ, রসুন, আদা, বিভিন্ন ধরনের শাক, পেঁপে পাতা, নিম পাতা, কাঁচা মরিচ ইত্যাদি খেতে দেওয়া হয়।
শুরুতে শুধু একটি শেড দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন তিনটি শেডে চলছে কার্যক্রম। বর্তমানে ফরাসী হার্বার্ড ও ব্রয়লার মুরগী সম্পূর্ণ অর্গানিক উপায়ে উৎপাদন করে গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন ইমরুল। উন্নত মানের খাবার ও ভালো মানের টিকার কারণে অর্গানিক মুরগীর মূল্য বাজারদরের চেয়ে বেশী হয়।
নিজের এই সাহসী উদ্যেগ সম্পর্কে ইমরুল বলেন, পড়াশোনা করে জেনেছি অ্যান্টিবায়োটিকের অধিক ব্যবহার মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। আবার মানুষের শরীরকে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী করে ফেলে। এতে প্রয়োজনের সময় অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আর কাজে লাগে না। তার চেয়ে ভয়ানক হ’ল খাবার তালিকা। আমেরিকার ফুড ও ড্রাগ এজেন্সি জানাচ্ছে, মুরগীতে অধিক শক্তিশালী ও ভয়াবহ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। এজন্য তাদের কৃষি বিভাগ বলছে, কোন মুরগীতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হ’লে সেই ডোজ শেষ হওয়ার কমপক্ষে ১০ দিন পর ঐ মুরগী খাওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীরা ক্বিয়ামতের দিন নবী, ছিদ্দীক এবং শহীদদের সাথে থাকবেন’ (ছহীহাহ হা/৩৪৫৩)। এ হাদীছটি তার নিজের এবং কর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসাবে গ্রহণ করেছেন। আর রাববুল আলামীন যেহেতু হালাল এবং পবিত্র খাবার খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, তাই তিনি তার মুরগী ব্যবসাকে অ্যান্টিবায়োটিক ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল মুক্ত রাখার মাধ্যমে হালালের সাথে ‘তাইয়েব’ (বাক্বারাহ ১৬৮) বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।
তিনি তার কর্মীদের বুঝান যে, মানুষকে নিরাপদ খাবার খাওয়ানো এবং সততার সাথে মুরগী পালন করা কেবল চাকুরী নয়, এটি একটি ইবাদত। যার প্রতিদান আল্লাহ আখেরাতে দেবেন।
তিনি মনে করেন, অনৈতিকভাবে লাভ বাড়ানোর চেয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করা যরূরী। তিনি তার ব্যবসাকে কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসাবে দেখেন না, বরং দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা হিসাবে দেখেন। মানুষকে বিষমুক্ত খাবার দিয়ে সুস্থ রাখা তার কাছে একটি ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব।
ইমরুলের এই উদ্যোগ মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি কমিয়ে নিরাপদ খাদ্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
[ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব পালনের এই অনন্য নযীর কায়েম করার জন্য উদ্যোক্তা ভাই ও তার সাথীদের অসংখ্য ধন্যবাদ। আল্লাহসৃষ্ট পবিত্র ও কল্যাণময় খাদ্য মানুষকে পরিবেশনের কারণে আল্লাহ তাদের প্রচেষ্টায় বরকত দান করুন। অন্যদেরকেও এ দৃষ্টি অনুসরণ করার জন্য আবেদন জানাই (স.স.)]