নীরব প্রহরী কিডনী : সুস্থ রাখতে করণীয়

আমাদের শরীরের এক জোড়া কিডনী হ’ল দু’টি নীরব ও অক্লান্ত কর্মী। প্রতিদিন প্রায় ২০০ লিটার রক্ত ফিল্টার করে শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়াই এদের প্রধান কাজ। এরা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে এবং হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এর গুরুত্ব তেমন একটা উপলব্ধি করি না। কিডনী রোগকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ এর লক্ষণগুলো খুব দেরীতে প্রকাশ পায়। তাই কিডনী সুস্থ থাকতে আমাদের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনা অপরিহার্য।

কিডনী সুস্থ রাখতে করণীয় :

১. পর্যাপ্ত পানি পান করুন : কিডনীর প্রধান কাজ হ’ল রক্ত ছাঁকা। আর এই কাজটি ঠিকমতো করার জন্য তার প্রয়োজন পর্যাপ্ত পানি। পানি শরীর থেকে সোডিয়াম এবং টক্সিন (বিষাক্ত পদার্থ) বের করে দেয়। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৮-১০ গ্লাস (২-৩ লিটার) বিশুদ্ধ পানি পান করা উচিত। তবে যাদের কিডনীতে সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে পানি পানের পরিমাণ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সীমিত করতে হ’তে পারে।

২. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন : উচ্চ রক্তচাপ কিডনী রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। এটি কিডনীর রক্তনালীগুলোর ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে এবং সময়ের সাথে সাথে সেগুলোকে অকার্যকর করে ফেলে। অতএব রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করুন। সেই সাথে এর জন্য লবণ কম খাওয়া, ব্যায়াম এবং প্রয়োজনে ওষুধ সেবন অপরিহার্য।

৩. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন : রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকলে তা কিডনীর ফিল্টারগুলোকে নষ্ট করে দেয়। ডায়াবেটিস হ’ল কিডনী বিকল হওয়ার এক নম্বর কারণ। তাই ডায়াবেটিস থাকলে রক্তের সুগার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করুন।

৪. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন : সুষম খাদ্য কিডনীকে ভালো রাখে। তাজা ফলমূল, শাকসবজি এবং আঁশজাতীয় খাবার বেশী খান। প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড এবং অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।

৫. ওযন নিয়ন্ত্রণে রাখুন ও ব্যায়াম করুন : অতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়, যা কিডনীর জন্য ক্ষতিকর। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানোর মতো হালকা ব্যায়াম করুন।

৬. ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন করুন : ধূমপান কিডনীতে রক্ত চলাচল কমিয়ে দেয় এবং কিডনী ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

৭. ব্যথানাশক ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করুন : বিভিন্ন ব্যথানাশক ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে সেবন করলে তা কিডনীর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

৮. নিয়মিত কিডনী পরীক্ষা করান : যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা পারিবারিক কিডনী রোগের ইতিহাস আছে, তাদের বছরে অন্তত একবার কিডনীর কার্যকারিতা পরীক্ষা তথা ক্রিয়েটিনিন

পরীক্ষা করানো উচিত।

যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলবেন বা সীমিত খাবেন

১. অতিরিক্ত লবণ : লবণ কিডনীর প্রধান শত্রু। অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তচাপ বাড়ায় এবং কিডনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। যেমন কাঁচা লবণ, প্যাকেটজাত চিপস, ফাস্ট ফুড, সল্টেড বাদাম, আচার, সস, প্রক্রিয়াজাত গোশত এবং ক্যানজাত খাবার।

২. অতিরিক্ত পটাশিয়াম (কিডনী রোগীদের জন্য) : পটাশিয়াম শরীরের জন্য দরকারি হ’লেও, কিডনী দুর্বল হ’লে এটি রক্ত থেকে অতিরিক্ত পটাশিয়াম সরাতে পারে না, যা হৃদযন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হ’তে পারে।

তাই বিশেষত কিডনী রোগীরা কলা, কমলালেবু, টমেটো, আলু, মিষ্টি আলু, পালংশাক, অ্যাভোকাডো, খেজুর এবং ডাবের পানি সীমিত খাবেন। সুস্থ ব্যক্তিরা এগুলো খেতে পারবেন, তবে অতিরিক্ত নয়।

৩. লাল গোশত : গরু ও খাসির গোশতে প্রোটিনের পরিমাণ খুব বেশী থাকে। এই প্রোটিন বিপাকের ফলে যে বর্জ্য তৈরি হয়, তা কিডনীর মাধ্যমে ফিল্টার হ’তে হয়। অতিরিক্ত লাল গোশত কিডনীর ওপর কাজের বোঝা বাড়িয়ে দেয়।

৪. চিনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার : অতিরিক্ত চিনি ওযন বাড়ায় এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি করে, যা পরোক্ষভাবে কিডনীর ক্ষতি করে। প্যাকেটজাত ফলের রস, মিষ্টি দই এবং বেকারি আইটেম এড়িয়ে চলুন।

যেসব খাবার কিডনী ভালো রাখে :

১. পানি : কিডনী পরিষ্কার রাখার সেরা পানীয় হ’ল বিশুদ্ধ পানি।

২. লেবু : লেবুতে থাকা সাইট্রেট কিডনীতে ক্যালসিয়াম পাথর জমতে বাধা দেয়। প্রতিদিন সকালে হালকা গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে খেতে পারেন।

৩. কম-পটাশিয়ামযুক্ত ফল : যেমন আপেল, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, আনারস, তরমুজ ইত্যাদি।

৪. কম-পটাশিয়ামযুক্ত সবজি : যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ, রসুন, শসা ইত্যদি।

৫. স্বাস্থ্যকর প্রোটিন : যেমন মাছ, মুরগীর গোশত, ডিমের সাদা অংশ ইত্যাদি।

৬. অলিভ অয়েল : রান্নার জন্য অন্যান্য তেলের বদলে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল ব্যবহার করুন। এটি হার্ট ও কিডনী উভয়ের জন্যই উপকারী।

শেষ কথা : আপনার কিডনী দু’টি আপনার জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তন এবং খাদ্যতালিকায় সচেতনতা এনে আপনি এই নীরব প্রহরীদের সুস্থ রাখতে পারেন। মনে রাখবেন, কিডনী রোগের চূড়ান্ত পরিণতি হ’ল কিডনী বিকল হয়ে যাওয়া। এই পর্যায়ে পৌঁছালে তখন বেঁচে থাকার জন্য ডায়ালাইসিস বা কিডনী প্রতিস্থাপন-এর প্রয়োজন হয়। যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য। এছাড়া এই রোগ নানা রকম মারাত্মক শারীরিক জটিলতা তৈরি করে। তাই প্রতিরোধই হ’ল সর্বোত্তম উপায়। [সংকলিত]






আরও
আরও
.