রিয়াদের আলোঝলমলে এলাকা ‘হাই আন-নূর’ বা আলোকিত নগরী। নাম আলোকিত হ’লেও সেই শহরের যুবকদের জীবন অলসতা আর বিলাসিতার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের মায়াজালে তারা এতটাই বুঁদ হয়ে থাকত যে, বাস্তবতার আলো তাদের চোখে পৌঁছত না। নিত্যনতুন নেশা, অনৈতিক সম্পর্ক আর মূল্যহীন বিনোদন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে গিয়েছিল। পরিবার, সমাজ, এমনকি নিজের অস্তিত্বের প্রতিও তারা উদাসীন হয়ে পড়েছিল।
এই শহরেরই এক কোণে বাস করত এক যুবক, যার নাম ছিল আরহাম। আরহামও একসময় এই স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছিল। সে ছিল শহরের দক্ষ ও জনপ্রিয় ভিডিও গেমার। ভার্চুয়াল জগতে তার ছিল অসংখ্য অনুসারী। কিন্তু তার হৃদয় মাঝে লুকিয়ে ছিল এক গভীর শূন্যতা। রাতে যখন সে একা থাকত, তখন এক অব্যক্ত অস্থিরতা তাকে গ্রাস করত। তার মনে হ’ত, সে যেন কোন এক অন্তহীন সাগরে ভাসছে, যার কোন কূল নেই, কিনারা নেই।
একদিন আরহাম তার গেমিং সেশন চলাকালীন সময়ে হঠাৎ অস্থিরতা অনুভব করে। যে গেমিং তাকে সুখের খোরাক জোগান দিত সেই গেমিং তার কাছে অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক লাগছিল। তাই সেসব ফেলে বাড়ির ছাদে গিয়ে আকাশের দিকে আনমনে চেয়ে থাকে। মনের মাঝে হাযারও প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। সে কি করছে তার জীবন নিয়ে? ভার্চুয়াল জগতের সাময়িক আনন্দ তাকে কি দিচ্ছে? জীবন মানেই কি শুধু বিনোদন আর ভার্চুয়াল জগতে জনপ্রিয়তা অর্জন করা? নাকি জীবনের প্রকৃত কোন অর্থ আছে? কারন এই গেমিং, বিনোদন আর জনপ্রিয়তা তো সময়ের সাথে একদিন হারিয়ে যাবে। এসব ভাবতে ভাবতে তার পুরনো একটি স্মৃতি মনে পড়ে গেল। তার দাদা, যিনি ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ আলেম। দাদা সবসময় তাকে একটি কথা বলতেন, ‘আরহাম, দুনিয়ার চাকচিক্য ক্ষণিকের, কিন্তু আখেরাতের জীবন অনন্ত। তোমার এই শক্তি, এই যৌবন, এগুলো আল্লাহর দেওয়া আমানত। একে সদ্ব্যবহার করো, অন্যথা একদিন আফসোস করবে’।
দাদার স্মৃতিময় কথাগুলো যেন তার হৃদয়ের গভীরে আঘাত হানল। পরদিন সকালে সে সিদ্ধান্ত নিল, সে তার জীবন পরিবর্তন করবে। কিন্তু কিভাবে? চারপাশের পরিবেশ এতটাই দূষিত যে, আলোর পথ খুঁজে পাওয়াই যেন কঠিন।
আরহাম প্রথমে তার স্মার্টফোন এবং গেমিং ডিভাইসগুলো একপাশে সরিয়ে রাখল। তারপর সে তার দাদার পুরনো ধর্মীয় বইগুলো খুঁজে বের করল। ধুলোমাখা বইগুলো দেখে তার প্রথমে হাসি পেল, কিন্তু যখন সে একটি বই খুলল, তখন তার চোখ আটকে গেল একটি আয়াতে,أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ ‘তোমরা কি ভেবেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?’ (মুমিনূন ২৩/১১৫)।
এই আয়াতটি পড়ে আরহামের চোখে পানি এসে গেল। সে অনুভব করল, আল্লাহ্ তাকে অনর্থক সৃষ্টি করেননি অথচ সে অনর্থক কাজেই জীবন অতিবাহিত করছে। সে সঙ্গে সঙ্গে জায়নামায (মুছল্লা) বিছিয়ে ছালাতে দাঁড়াল। দীর্ঘ সময় সে সিজদায় পড়ে রইল, আল্লাহর কাছে তার ভুলগুলোর জন্য ক্ষমা চাইল।
এরপর থেকে আরহামের জীবন বদলে যেতে শুরু করল। সে প্রতিদিন মসজিদে যেত, ইমামের কাছে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করত। অল্প সময়ের মধ্যে সে তার অনৈতিক বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করল এবং ভালো বন্ধুদের সাথে মিশতে শুরু করল। সে তার গেমিং আসক্তি থেকে বেরিয়ে এসে সমাজের জন্য কিছু করার সিদ্ধান্ত নিল। সে একটি দাতব্য সংস্থায় স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজ শুরু করল, দরিদ্র শিশুদের পড়াতে লাগল এবং অসহায় মানুষদের সাহায্য করতে লাগল। সে বুঝতে সক্ষম হয়েছিল তার মৃত্যু পর এই অসহায় মানুষগুলোই তার জন্য অন্তত দো‘আ করবে কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের ভার্চুয়াল ফলোয়াররা তার মৃত্যুর পর কোন উপকারে আসবে না।
প্রথমদিকে তার পুরনো বন্ধুরা তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত। অনেকেই বলত আরহাম পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু আরহাম দমে যায়নি। আরহাম দুনিয়াতে আলোর পথ খুঁজে পেয়েছিল যা তার মনের শূন্যতা দূর করেছিল, তার জীবন ভরে উঠেছিল এক অনাবিল স্বস্তি ও প্রশান্তিতে। সেই আলো তার পরকালকেও আলোকিত করবে আর যারা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে তারা দুনিয়া ও পরকালে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে। সে অনুভব করতে পারল, সত্যিকারের সুখ পার্থিব ভোগে নয়, বরং আল্লাহর আনুগত্য এবং মানব সেবায়ই নিহিত।
ধীরে ধীরে আরহামের পরিবর্তন দেখে তার কিছু বন্ধুও অনুপ্রাণিত হ’ল। তারাও দ্বীনের পথে ফিরে আসার চেষ্টা করল। আরহাম বুঝতে পারল, একজন মানুষ যখন সত্যিকার অর্থে নিজেকে পরিবর্তন করে, তখন সে শুধু নিজের জীবনকেই আলোকিত করে না, বরং অন্যদের জন্যও আলোর মিনার হয়ে ওঠে।
শিক্ষা : গল্পটি আজকের যুবসমাজকে এই শিক্ষা দেয় যে, আধুনিকতার নামে আমরা যেন আমাদের মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিকতাকে বিসর্জন না দেই। জীবনের সত্যিকারের অর্থ নিহিত রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানব সেবায়। যখন আমরা এই পথে ফিরে আসি, তখন আমাদের জীবন অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং আমরা অন্যদের জন্য সঠিক পথের দিশারী হিসাবে কাজ করতে পারি।