নীল জুতার দো‘আ
জুম‘আর ছালাত শেষে আমরা সবাই মিলে ঠিক করলাম, আজ একটু সৎ ও ভালো মানুষের সঙ্গে সময় কাটাব। তাদের গল্প শুনব, উপদেশ নেব, যেন মনটা শান্ত হয়। তাই সবাই মিলে চললাম আলী চাচার বাড়িতে।
আলী চাচা আমাদের এলাকার একজন বয়োজ্যেষ্ঠ আলেম। আমরা তার ঘরে ঢুকলাম। একদম সাদামাটা ঘর। তিনি আমাদের দেখে হাসলেন। তার মুখের মিষ্টি হাসি দেখলে কখনোই মনে হয় না তিনি বিরক্ত। তার সাদা দাড়ি যেন মুক্তার মত ঝিলমিল করছে। তার গায়ে সাদা জুববা ও টুপি যেন সেখান থেকে ফুলের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। পোশাক পুরনো হ’লেও একেবারে পরিষ্কার, যেমন তার মনটা; সেখানে একটুও হিংসা নেই। তাকে দেখলে সালাফদের কথা মনে হয়। তার কাছে বসে থাকলে বা তার উপদেশ শুনলে ঈমান বেড়ে যায়, হৃদয়জুড়ে এক ইলাহী প্রশান্তির পরশ ছুঁয়ে যায়।
কুশলাদি বিনিময়ের পর তিনি আমাদেরকে বসতে বললেন এবং নরম মাটির ওপর পুরনো একটা মাদুর বিছিয়ে দিলেন। তারপর খেজুর এনে আমাদের সামনে রাখলেন। বললেন, ‘খাও বেটারা’।
আমরা খেতে শুরু করলাম। খাওয়া শেষে কিছু খেজুর বাকী রয়ে গেল। তখন আলী চাচা তার ছোট ছেলেকে ডাকলেন। ছেলের নাম ছিল আস‘আদ। আলী চাচা এই নাম রেখেছেন ছাহাবী আস‘আদ ইবনে যুরারা (রাঃ)-এর নামে।
আস‘আদ এসে বাকী খেজুর তুলে নিল। যাওয়ার সময় সে পিতাকে বলল, ‘আববা! আগামীকাল মাদ্রাসা খুলবে। আমার জুতাটা পুরনো হয়ে গেছে। নতুন জুতা প্রয়োজন।
আমরা ভাবলাম, আলী চাচা নিশ্চয়ই টাকা বের করে দিবেন। কিন্তু তিনি তো অন্যরকম! তিনি ছেলেকে কাছে ডেকে আদর করে বললেন, ‘বাবা! আল্লাহর কাছে জুতা চাও। তোমার আববার কাছে তো টাকা নেই’।
ছোট্ট আস‘আদ তখন কী করল জানেন? সে দৌড়ে গিয়ে ওযূ করল, তারপর মুছাল্লা বিছিয়ে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করল। এরপর সে কচি হাত দু’টো আকাশের দিকে তুলে দো‘আ করল। তার দো‘আর ভাষাগুলো শুনে আমাদের চোখে পানি চলে এল। সে বলল, ‘হে আল্লাহ! আগামীকাল মাদ্রাসা খুলবে। আমার জুতা পুরনো হয়ে গেছে। আমি আববাকে বলেছি, কিন্তু আববা বলেছেন তার কাছে টাকা নেই। তাই আমি তোমার কাছেই চাই। আমাকে একটা নতুন জুতা দাও। তবে নীল রঙের জুতা চাই। আমার বন্ধু ওমর যেমন জুতা পরে, ঠিক তেমন নীল জুতা দিও। কালকের মধ্যেই দিও আল্লাহ। কাল তো মাদ্রাসা খুলবে!’
আমরা অবাক হয়ে গেলাম। ভাবলাম, এই ছেলের যদি জুতা না আসে, তাহ’লে তার বিশ্বাস ভেঙে যাবে। মনটা খারাপ হবে। হয়তো আর কখনো আল্লাহকে ডাকবে না! কিন্তু আল্লাহর কাছে যদি কেউ খাঁটি মনে চায়, আল্লাহ তো তাকে ফেরান না। মহান আল্লাহ সালাফদের মতো এই ছেলেটার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখলেন।
কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা পড়ল।
-কে?
-আমি, আব্দুল্লাহর আম্মু।
আস‘আদ দৌড়ে গিয়ে বলল, ‘জুতা এসেছে! ধন্যবাদ হে আল্লাহ!’
আমরা ভাবলাম, হয়তো না-ও হ’তে পারে। যদি সত্যিই জুতা না আসে, তাহ’লে ছেলেটার কী হবে! কিন্তু আল্লাহ আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করলেন।
আস‘আদ ফিরে এলো। হাতে উজ্জ্বল লাল-নীল রঙের ফুল অাঁকা একটা সুন্দর বাক্স।
আস‘আদ বলল, ‘আববা, এই যে জুতা!’
আলী চাচা হেসে বললেন, ‘কিভাবে এলো বাবা?’
আস‘আদ বলল, ‘আমাদের প্রতিবেশী আব্দুল্লাহর আম্মু এসেছিলেন। বললেন, তার ছেলে আব্দুল্লাহর জন্য এই জুতা কিনেছিলেন। কিন্তু জুতাটা তার পায়ে ছোট হয়। তাই আমাকে দিয়ে গেলেন।
আলী চাচা বললেন, ‘বাহ! আল্লাহ তো তোমার দো‘আ কবুল করেছেন’। আস‘আদ খুশি হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ আববা! এটা নীল রঙের জুতা। ঠিক ওমরের জুতার মতো’।
আলী চাচা বললেন, দেখলে বাবা! যে আল্লাহর দরজায় গিয়ে সত্যি মনে কিছু চায়, আল্লাহ তাকে কখনো খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না’।
পিতা-মাতার জন্য শিক্ষা :
(১) সন্তানদের আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ ভরসার শিক্ষা দিন। তাদেরকে শুধু জাগতিক উপায় শেখাবেন না। শেখান- প্রথমে আল্লাহর কাছে চাইতে হয়। কারণ তিনিই মূল দাতা। আল্লাহর কাছে দো‘আ করা যেন তাদের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়।
(২) প্রয়োজনে দুনিয়ার কাছে হাত না পেতে আল্লাহর কাছে চাইতে উৎসাহিত করুন। সরাসরি আল্লাহর কাছে চাওয়ার মাধ্যমে সন্তানের ঈমান বৃদ্ধি পায়। এতে আত্মমর্যাদা রক্ষা হয় ও পরনির্ভরতা কমে।
(৩) ঘরে দ্বীনী পরিবেশ সৃষ্টি করুন। আলী চাচার মতো ঘরকে ছোট্ট এক মাদ্রাসায় পরিণত করুন। নবী-রাসূল, ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীনের জীবন নিয়ে সন্তানদের সাথে গল্প করুন।
(৪) সন্তানদের চাওয়াকে অবহেলা না করে সঠিক দিকনির্দেশনা দিন।
(৫) সন্তানদের সামান্য ইবাদতেও উৎসাহ দিন। ছালাত আদায় করা, দো‘আ করা, সিজদায় গিয়ে আললাহর কাছে বলার অভ্যাস তৈরী করুন।
সোনামণিদের জন্য শিক্ষা :
(১) আল্লাহর কাছে চাইতে কখনো লজ্জা পাবে না। যে ছোট্ট ছেলেটা নতুন জুতা চেয়েছিল, সে সরাসরি আল্লাহর কাছে বলেছিল। তাই তুমিও আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন খুলে বলবে।
(২) বিশ্বাস করো, আল্লাহ সবসময় তোমার কথা শুনছেন। চাওয়ার পর যদি সময় লাগে, তবুও হতাশ হবে না। কারণ আল্লাহ কখনোই খালি হাতে ফেরান না।
(৩) ছোট-ছোট প্রয়োজনেও আল্লাহর কাছে চাইবে। যেমন খেলনা, বই, জামা, জুতা সবই আল্লাহর কাছেই চাইবে। এতে তোমার দো‘আর শক্তি বাড়বে।
(৪) বন্ধুরা যা পায়, তুমিও চাইতে পারো। তবে অন্যের হিংসা করবে না; বরং আল্লাহর কাছে চাইবে। তিনি চাইলে তোমাকেও দিবেন।
(৫) সাহস ও ধৈর্য রাখবে। যদি দো‘আ কবুল হ’তে একটু দেরী হয়, তবুও অপেক্ষা করবে। কারণ আল্লাহ যখন দেন, সুন্দর করেই দেন।