সন্তানকে মুছল্লী বানাবেন কিভাবে?

গল্পটি একজন মায়ের জীবন থেকে নেওয়া একটি বাস্তব ঘটনা। তিনি বলেন, আমার মেয়ে একসময় ছালাতের ব্যাপারে খুবই অলস ছিল। একদিন আমি আমার মেয়েকে বললাম, ‘ওঠো, ছালাত আদায় কর’। সে আমার কথামতো উঠে মুছল্লা (জায়নামায) নিয়ে ঘরের ভিতরে গেল। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম, সে মুছল্লাটি মেঝেতে ছুড়ে ফেলল এবং তার পাশে বসে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর বের হয়ে আসলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি ছালাত আদায় করেছ? সে বলল, হ্যাঁ। আমি প্রচন্ড রেগে গিয়ে তার মুখে এক থাপ্পড় মেরে দিলাম। আমি জানি, এটা আমার ভুল হয়েছিল। পরে আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এরপর আমি ছালাতের জন্য তার সাথে বহুবার রাগারাগি করেছি, বকা দিয়েছি, আল্লাহর ভয় দেখিয়েছি। কিন্তু কিছুতেই কোন কাজ হয়নি। এটি নিয়ে দীর্ঘদিন আমি খুবই দুশ্চিন্তায় ছিলাম।

একদিন আমার এক বান্ধবী আমাকে একটি ঘটনা বলল। সে তার একজন আত্মীয়ার বাসায় গিয়েছিল। তার সেই আত্মীয়া অতটা ধর্মপরায়ণ না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হ’ল, যখন আযান হ’ল, তার ছেলে-মেয়েরা নিজেরা উঠে গিয়ে ছালাত আদায় করতে লাগল। তাদের কাউকে ডাকারও প্রয়োজন হ’ল না।

তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ছেলেমেয়েরা কেমন করে ছালাতের প্রতি এমন আগ্রহী হ’ল? তুমি তো রাগারাগি করলে না, বকাবকি করলে না। এমনকি একটা ডাকও দিলে না!

তিনি বললেন, সত্যি বলতে আমি তেমন কিছুই করিনি। শুধু একটা কাজ করেছি। আমি বিয়ের আগে থেকেই একটা দো‘আ করতাম, আজও করি। হয়তো সেই দো‘আর কারণেই আল্লাহ আমাকে এই নে‘মত দিয়েছেন।

তার এই গল্প শোনার পর থেকে আমিও নিয়মিত এই দো‘আটি পড়তে লাগলাম। প্রতিটি সিজদায়, ছালাতে সালাম ফিরানোর পূর্বে ও পরে, তাহাজ্জুদের সময়সহ দো‘আ কবুলের সময়-গুলোতে আমি দো‘আটি পড়তাম। আল্লাহর কসম করে বলছি, সেই মেয়েটি (যে একসময় ছালাতে অলসতা করত) নিজেই এখন বাড়ির সবাইকে ছালাতের জন্য ডাকে! সে ভোরবেলা উঠে আমাদের ঘরে ঘরে গিয়ে ‘ওঠো, ছালাতের সময় হয়ে গেছে’ বলে ডেকে বেড়ায়। তার ভাই-অন্যান্য বোনেরাও সকলে ছালাতের ব্যাপারে খুব যত্নশীল। আলহামদুলিল্লাহ।

আপনারা নিশ্চয়ই জানতে আগ্রহী, সেই দো‘আটি কী? দো‘আটি কুরআনে আছে। তা হ’ল,رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ (রববীজ‘আলনী মুক্বীমাছ ছলাতি ওয়া মিন যুররিয়াতী, রববানা ওয়া তাকাববাল দু‘আ) ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ছালাত কায়েমকারী বানাও এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের পালনকর্তা! আমার দো‘আ কবুল কর’ (ইব্রাহীম ১৪/৪০)

সুতরাং দো‘আই হ’ল মূল অস্ত্র। প্রিয় পাঠক! আমরা প্রায়শই দো‘আ করতে ভুলে যাই। আমরা কেবল তখনই দো‘আ করি, যখন আমাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া যখন আর কোন উপায় থাকে না। কিন্তু প্রকৃত মুমিনের উচিত সর্বদা আল্লাহর তাওফীক কামনা করা। কোন কাজের পরিকল্পনাতেই আল্লাহর নিকট সাহায্য চাইতে হবে। যেমন এই বোনটি বিয়ের আগেই সন্তানের জন্য দো‘আ করতেন। কেননা আল্লাহ চাইলে সবকিছু বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। সকল অসম্ভাবনার বদ্ধ দুয়ার তিনি খুলে দিতে সক্ষম। তাই আপনার সন্তানদের মুছল্লী বানাতে চাইলে আজ থেকেই নিয়মিত দো‘আ শুরু করুন।

জনৈক ব্যক্তি বলেছিলেন, ছোটবেলায় আমি স্বপ্ন দেখতাম, আমি পুরো উম্মাহকে বদলে ফেলব। তারপর যখন একটু বড় হ’লাম, ভেবেছিলাম, এটা অনেক কঠিন কাজ। তবে আমি অন্তত আমার দেশকে উন্নত করব। আরও বড় হয়ে চিন্তা করলাম, অন্তত আমার শহরকে পরিবর্তন করব। কিন্তু আমি এগুলোর কিছুই করতে পারিনি। বরং আমি লক্ষ্য করলাম, আমার নিজেরই উন্নয়ন প্রয়োজন। আমি উপলব্ধি করলাম, বড় কিছু বদলাতে চাইলে ছোট থেকেই শুরু করতে হয়। তাই আপনি যদি সমাজ সংস্কারের স্বপ্ন দেখেন, তাহ’লে আগে নিজ স্ত্রী-সন্তানদের যত্ন নিন, আদর্শ পরিবার গড়ে তুলুন। তাহ’লে আস্তে আস্তে পুরো সমাজ বদলে যাবে ইনশাআল্লাহ।

এজন্য কুরআনে বর্ণিত নিম্নোক্ত দো‘আসমূহ হ’তে পারে আপনার অব্যর্থ হাতিয়ার। ১. যাকারিয়া (আঃ)-এর দো‘আ, رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ، ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে তোমার পক্ষ হ’তে একটি পূত-চরিত্র সন্তান দান কর। নিশ্চয়ই তুমি প্রার্থনা শ্রবণকারী’ (আলে-ইমরান ৩/৩৮)। ২. ইব্রাহীম (আঃ)-এর দো‘আ,رَبِّ هَبْ لِيْ مِنَ الصّٰلِحِيْنَ، ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে একটি সুসন্তান দান কর’ (ছা-ফফা-ত ৩৭/১০০)। ৩. স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য দো‘আ,رَبَّنَا هَبْ لَـنَا مِنْ اَزْوَاجِنَا وَذُرِّيّٰتِنَا قُرَّةَ اَعْيُنٍ وَّاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِيْنَ اِمَامًا، ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানদের মাধ্যমে চক্ষু শীতলকারী বংশধারা দান কর এবং আমাদেরকে আল্লাহভীরুদের নেতা বানাও’ (ফুরক্বান ২৫/৭৪)

মূল : মুহসিন জববার, অনুবাদ : নাজমুন নাঈম*

* শিক্ষার্থী, আরবী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।






বিষয়সমূহ: বিধি-বিধান
আরও
আরও
.