ভূমিকা :
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটা কেবল বিশ্বাসের অনুশীলন নয়; বরং জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয়ে গঠিত এক পরিপূর্ণ জীবনবিধান। ইসলামে একদিকে যেমন জ্ঞানচর্চার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, অপরদিকে সেই জ্ঞান অনুযায়ী জীবন গঠনের বিশেষ নির্দেশনাও প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু মুসলিম সমাজের বাস্তব চিত্র এই যে, কেউ কেউ জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হ’লেও সেই আলোতে পথচলার প্রতিচ্ছায়া তাদের জীবনে অনুপস্থিত; আবার কেউ আমলের দৃঢ়তায় অনড় ও নিরন্তর ইবাদতগুযার। কিন্তু ইলমের বুনিয়াদ দুর্বল হওয়ায় বিভ্রান্তির অন্ধকারে তিনি পথ হারিয়ে ফেলেন। অথচ ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে ইলম ও আমলের পরিপূর্ণ সমন্বয়ের মাঝে। যেখানে জ্ঞান হয় পথপ্রদর্শক, আর আমল হয় সেই জ্ঞানের পূর্ণ বাস্তবায়ন। একটিকে বাদ দিয়ে অপরটির দাবী করা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি তা ইসলামের সৌন্দর্যকেও বিকৃত করে তোলে।
ইলমের পরিচয় ও তাৎপর্য :
ইলম (العِلْمُ) আরবী শব্দ। যার অর্থ: জ্ঞান, তথ্য, বিদ্যা, বিজ্ঞান, শাস্ত্র, তত্ত্ব।[1] এটা অজ্ঞতা বা মূর্খতা (الجَهْلُ)-এর বিপরীত। ইমাম বাহাউদ্দীন সুবকী (৭১৯-৭৭৩হি.)-এর মতে, العلم: حصول صورة الشئ فى الذهن، ‘স্মৃতিপটে কোন কিছুর চিত্র তৈরী হওয়ার নাম হ’ল ইলম’।[2] শায়খ ছালেহ ইবনে উছায়মীন (রহঃ) বলেন, إدراك الشيء على ما هو عليه إدراكًا جازمًا ‘কোন জিনিস তার প্রকৃত রূপে যেমন আছে, তেমনিভাবে সুনিশ্চিত বা সন্দেহাতীতভাবে অনুধাবন করার নামই হ’ল জ্ঞান’।[3] আর শারঈ ইলমের পারিভাষিক সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইবনে উছায়মীন (রহঃ) বলেন, العلم الشرعي هو علم ما أنزل الله على رسوله من البينات والهدى، ‘মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের প্রতি স্পষ্ট প্রমাণাদি ও হেদায়াত সহ যে জ্ঞান অবতীর্ণ করেছেন, সেটাই হ’ল শারঈ জ্ঞান’।[4] মোট কথা প্রকৃত ইলম সেটাই, যা আল্লাহ কুরআনে অবতীর্ণ করেছেন এবং তাঁর রাসূল ছহীহ হাদীছে বর্ণনা করেছেন। যে জ্ঞানের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে চিনতে পারেন, সঠিকভাবে তাঁদের অনুগত্য করতে পারেন, ইবাদতের পদ্ধতি জানতে পারেন এবং আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকার কৌশল শিখতে পারেন। এই জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক বান্দার উপর ফরযে আইন। মহান আল্লাহ বলেন, فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ، ‘অতএব তুমি জানো যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই। আর তোমার ত্রুটির জন্য ও মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য তুমি ক্ষমা প্রার্থনা কর’ (মুহাম্মাদ ৪৭/১৯)। এখানে মহান আল্লাহ ‘ঈমান’ ও ‘আমলের’ পূর্বে ইলম অর্জনকে আবশ্যক করেছেন। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِم، ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয’।[5] এই হাদীছের অর্থ হ’ল প্রত্যেক মুসলিমের জন্য তাওহীদ, রিসালাত, ঈমান, আক্বীদা, ছালাত, ছিয়াম, যাকাত, হজ্জ এবং হালাল-হারাম মেনে চলার বিধান জানা অপরিহার্য। এসব বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা ফরয। আর নফল ইবাদতের বিস্তারিত মাসায়েল জানা নফল হিসাবে গণ্য। এছাড়া দুনিয়াবী উপকারী জ্ঞান- যেমন চিকিৎসা, প্রযুক্তি, কৃষি ইত্যাদির জ্ঞানার্জন করা মুস্তাহাব অথবা জায়েয। তবে ক্ষেত্র বিবেচনায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পার্থিব বিষয়ের জ্ঞানার্জনও কখনো কখনো অপরিহার্য হ’তে পারে।
কোন ইবাদত সম্পাদনের আগে সেই ইবাদতের জ্ঞানার্জন করা বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সঠিক জ্ঞান না থাকলে মানুষ তাওহীদ মনে করে শিরক করে ফেলতে পারে, আবার সুন্নাত মনে করে বিদ‘আত করে ফেলতে পারে। সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন, فضلُ العلمِ أحبُّ إليَّ من فضلِ العبادةِ وخيرُ دِينكمُ الورَعُ، ‘ইবাদতের মর্যাদা অপেক্ষা ইলমের মর্যাদা আমার নিকট অধিকতর পসন্দনীয়। আর তোমাদের সর্বোত্তম দ্বীন হ’ল আল্লাহভীরুতা’।[6] হুযায়ফাহ ইবনুল ইয়ামান (রাঃ)-এর বর্ণনায় অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,فَضْلُ الْعِلْمِ خَيْرٌ مِنْ فَضْلِ الْعِبَادَةِ وَخَيْرُ دِينِكُمُ الْوَرَعُ، ‘ইলমের মর্যাদা ইবাদতের মর্যাদা অপেক্ষা উত্তম। আর তোমাদের শ্রেষ্ঠতম দ্বীন হ’ল পরহেযগারিতা’।[7] অর্থাৎ ইলম যদি মানুষকে আল্লাহভীরু না বানায়, তবে সেই ইলম প্রকৃত ইলম নয়।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ سَلَكَ طَرِيْقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللهُ لَهُ بِهِ طَرِيْقًا إِلَى الْجَنَّةِ، ‘যে ব্যক্তি জ্ঞানের সন্ধানে কোন পথ অবলম্বন করে, বিনিময়ে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন’।[8] এই হাদীছ প্রমাণ করে, ইলমের পথ মানেই জান্নাতের পথ। কারণ ইলম মানুষকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ চিনতে শেখায়, হালাল-হারামের ব্যবধান বোঝায় এবং সর্বোপরি খাঁটি ঈমান ও বিশুদ্ধ আমলের বুনিয়াদ গড়ে দেয়। আলী (রাঃ) বলেন, العِلْمُ خَيْرٌ مِنَ الْمَالِ، العِلْمُ يَحْرُسُكَ، وَأَنْتَ تَحْرُسُ الْمَالَ، الْمَالُ يُنْقِصُهُ النَّفَقَةُ، وَالعِلْمُ يَزْكُو عَلَى الإِنْفَاقِ، ‘সম্পদের চেয়ে জ্ঞান উত্তম। জ্ঞান তোমাকে পাহারা দেয়, আর তুমি সম্পদকে পাহারা দেও। সম্পদ ব্যয় করলে কমে যায়, আর জ্ঞান ব্যয় করলে বৃদ্ধি পায়’।[9]
হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, ‘মহান আল্লাহ তার নবীকে ইলম ছাড়া অন্য কোন কিছু বাড়িয়ে দেওয়ার প্রার্থনার নির্দেশ দেননি। তিনি তাঁর নবীকে বলেন, وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا ‘তুমি বল! হে আমার রব! আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন’ (তোয়াহা ২০/১১৪)। অত্র আয়াতে জ্ঞান বলতে ‘শারঈ জ্ঞানকে বুঝানো হয়েছে। যেই জ্ঞান মুকাল্লাফ বা শরী‘আতের আজ্ঞাবহ বান্দাকে তার দ্বীনের বিষয়ে, ইবাদত ও লেনদেনের ক্ষেত্রে এবং আল্লাহ ও তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে আবশ্যকীয় বিষয়সমূহ জানতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে’।[10]
ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেন, لَيْسَ عَمَلٌ بَعْدَ الْفَرَائِضِ أَفْضَلُ مِنْ طَلَبِ الْعِلْمِ ‘ফরয আমল সমূহের পর ইলম অর্জনের চাইতে উত্তম কোন আমল নেই’।[11] আবূ হানীফা (রহঃ) স্বীয় ছাত্র আবূ ইউসুফ (রহঃ)-কে উপদেশ দিয়ে বলেন, وَإِنْ بَقِيت عَشْرَ سِنِينَ بِلَا كَسْبٍ وَلَا قُوتٍ فَلَا تُعْرِضْ عَنْ الْعِلْمِ؛ فَإِنَّك إذَا أَعْرَضْت عَنْهُ كَانَتْ مَعِيشَتُك ضَنْكًا، ‘তোমাকে যদি দশ বছর কোন উপার্জন কিংবা খাবার ছাড়া থাকতে হয়, তবে তা-ই থেকো, তবু ইলম থেকে বিমুখ হয়ো না। কারণ ইলম থেকে বিমুখ হ’লে তোমার জীবনযাপন সংকুচিত হয়ে আসবে’।[12]
ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন,النَّاسُ مُحْتَاجُونَ إِلَى العِلْمِ أَكْثَرَ مِنْ حَاجَتِهِمْ إِلَى الطَّعَامِ وَالشَّرَابِ؛ لِأَنَّ الطَّعَامَ وَالشَّرَابَ يُحْتَاجُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ، وَالْعِلْمُ يُحْتَاجُ إِلَيْهِ بِعَدَدِ الْأَنْفَاسِ، ‘মানুষের পানাহারের চেয়ে জ্ঞানের প্রয়োজন অধিক। কারণ খাদ্য ও পানীয় দিনে একবার বা দু’বার প্রয়োজন হয়। কিন্তু জ্ঞানের প্রয়োজন হয় শ্বাস-প্রশ্বাসের সংখ্যা পরিমাণ’।[13] রাগেব ইছফাহানী (রহঃ) বলেন, إن الطعام غذاء البدن والعلم غذاء الروح ‘খাদ্যদ্রব্য হচ্ছে শরীরের খাবার, আর রূহের খাবার হ’ল ইলম’।[14] সালাফগণ বলতেন, العِلْمُ إِمَامٌ وَالْعَمَلُ تَابِعُهُ، يُلْهَمُهُ السُّعَدَاءُ، وَيُحْرَمُهُ الْأَشْقِيَاءُ، ‘জ্ঞান হ’ল আমলের নেতা, আর আমল হ’ল জ্ঞানের অনুসারী। সৌভাগ্যবানদেরকে এটা প্রদান করা হয়, আর হতভাগাদের তা থেকে বঞ্চিত করা হয়’।[15]
তবে মনে রাখতে হবে যে, ইলম শুধুই মুখস্থ করা বা অর্জন করার বিষয় নয়; বরং তা আমলে বাস্তবায়নের বিষয়। কেননা ইলম মানব জীবনের আলোকবর্তিকা স্বরূপ, যা অন্তরকে জাগ্রত করে, ঈমানকে শাণিত করে, উপকারী চিন্তার উন্মেষ ঘটায়, আমলকে সঠিক ও পরিশুদ্ধ করে এবং জীবনকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিচালিত করার নির্দেশ দেয়।। সুতরাং ইলমের গুরুত্ব অনুধাবন না করে আমলের দাবী করা যেমন অসম্ভব, তেমনি ইলম অর্জন করে তা আমলে পরিণত না করাও আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল। আল্লাহ আমাদেরকে উপকারী ইলম হাছিলের তাওফীক্ব দান করুন।
আমলের পরিচয় ও গুরুত্ব :
আমল (العمل) অর্থ- কাজ, কর্ম, ক্রিয়া ইত্যাদি।[16] তবে এখানে আমল বলতে ‘আল্লাহর ইবাদত’, ‘আমলে ছালেহ’ বা সৎ কাজকে বুঝানো হয়েছে। আব্দুর রঊফ মুনাভী বলেন, ‘নেক আমল হ’ল দোষ-ত্রুটি মুক্ত সেই কাজ, যার মূল ভিত্তি হ’ল নিয়তের পরিশুদ্ধিতা, যা সর্বোচ্চ সক্ষমতার মাধ্যমে সম্পাদনের প্রচেষ্টা করা হয় এবং যা আমলকারীর জ্ঞান ও শারঈ প্রজ্ঞা অনুযায়ী সম্পাদিত হয়’।[17] মোটকথা আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক যে কোন কথা, কাজ, চিন্তা ও মনের ভাবনাকে নেক আমল বলা হয়। নেক আমল শুধু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়; বরং জিহবার মাধ্যমে, অন্তরের মাধ্যমে এবং চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমেও নেক আমল সম্পাদিত হয়। তবে সেই আমল কবুলযোগ্য হওয়ার শর্ত হ’ল- তা একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহর জন্য হ’তে হবে এবং শরী‘আত অনুমোদিত পদ্ধতিতে আদায় করতে হবে। ঈমান আনার পরে বান্দার সর্বপ্রথম দায়িত্ব হ’ল নেক আমল করা। পবিত্র কুরআনের প্রায় সত্তর জায়গাতে মহান আল্লাহ ঈমান আনার পরে নেক আমল করার কথা বলেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا، ‘নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম সমূহ সম্পাদন করে, তাদের জন্য জান্নাতুল ফেরদৌস ঠিকানা হিসাবে প্রস্ত্তত রয়েছে’ (কাহফ ১৮/১০৭)। অন্যত্র তিনি বলেন, إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا، ‘যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম সমূহ সম্পাদন করে, তাদের জন্য দয়াময় পরস্পরের মধ্যে মহববত সৃষ্টি করে দিবেন’ (মারয়াম ১৯/৯৬)।
আর তিনি আমল করার পূর্বে সেই ঈমান ও তাওহীদের ইলম অর্জন করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন,فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ، ‘অতএব তুমি জানো যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই। আর তোমার ত্রুটির জন্য ও মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য তুমি ক্ষমা প্রার্থনা কর’ (মুহাম্মাদ ৪৭/১৯)। কেননা জ্ঞানার্জন সঠিক না হ’লে ঈমান-আমলও সঠিক হয় না। সেজন্য আবুল হাসান আল-হার্রালী (মৃ. ৬৩৭হি.) বলেন, العمل ما دبر بالعلم ‘প্রকৃত আমল সেটাই যা জ্ঞান অনুযায়ী সম্পাদন করা হয়’।[18] অর্থাৎ শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই আল্লাহর নির্দেশ মান্য করা হয় না; বরং সেই জ্ঞানের দাবী অনুযায়ী যখন আমল করা হয়, তখন সেই জ্ঞান প্রকৃত জ্ঞান হিসাবে আখ্যায়িত হয়। যেমনভাবে শুধু হৃদয়ে বিশ^াস ও মৌখিক স্বীকৃতি দিলে ঈমানদার হওয়া যায় না; বরং তার সাথে আমল করার মাধ্যমে সেই বিশ^াস ও স্বীকৃতির দাবী বাস্তবায়ন করতে হয়।
অতএব শুধু ইলম অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই ইলম অনুযায়ী আমল করাও আবশ্যক। কেননা ক্বিয়ামতের ময়দানে এ ব্যাপারে প্রত্যেক বান্দাকে জিজ্ঞেস করা হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لَا تَزُولُ قَدَمُ ابْنِ آدَمَ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ، عَنْ عُمُرِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ، وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ، وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ، ‘ক্বিয়ামত দিন আদম সন্তানের পা আল্লাহর কাছ থেকে একটুও নড়াতে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে : (১) তার জীবনকাল সম্পর্কে, তা কোন পথে অতিবাহিত করেছে, (২) তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কি কাজে তা জীর্ণ করেছে, (৩) তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা থেকে তা উপার্জন করেছে, (৪) আর তা কোন খাতে ব্যয় করেছে এবং (৫) সে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে অনুযায়ী কী আমল করেছে’।[19] হাদীছটির দিকে গভীর দৃষ্টি দিলে দেখা যায় যে, প্রথম চারটি প্রশ্ন যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, পঞ্চম প্রশ্নটি সেভাবে বলা হয়নি। প্রশ্নের ধরন পরিবর্তন করা হয়েছে।
অর্থাৎ এখানে বলা হয়নি যে, وعن عمله ماذا عمل به (আর তার আমল সম্পর্কে, সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে)। মূলত পঞ্চম প্রশ্নের ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমল করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এর মাধ্যমে আরো ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, أن العلم مقدمة العمل وهو لا تعتد به لولا العمل ‘ইলম হ’ল আমলের ভূমিকা। ইলমকে ইলম হিসাবে গণ্য করা হয় না যদি না তা আমল দ্বারা পালিত হয়’।[20] তাছাড়া আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার আমলের মাধ্যমে; তার বেশ-ভূষা, চেহার-ছূরাত ও ধন-দৌলতের মাধ্যমে নয়। আবূ হুরায়রা (রাঃ)-এর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে দৃষ্টি দেন না; বরং তিনি তোমাদে অন্তর ও আমল সমূহের প্রতি দৃষ্টি দেন’।[21] মূলত মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছ আমল করার জন্য এবং সেই আমলের ব্যাপারে পরীক্ষা করার জন্য। আল্লাহ বলেন,الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ‘যিনি মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য, কে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সুন্দর আমল করে? (মুলক ৬৭/০২)।
অতএব আমলই হচ্ছে ইলমের পূর্ণতা ও ঈমানের বাস্তব প্রতিফলন। ইলম যদি হয় আলো, তবে আমল হ’ল জীবনকে আলোকিত করার বাস্তব প্রতিফলন। একমাত্র আমলের মাধ্যমেই মুমিন তার জ্ঞানের প্রমাণ দেয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে অগ্রসর হয়। ইসলামী দৃষ্টিকোণে আমল শুধু ধর্মীয় আচরণ নয়; বরং তা জীবনের সর্বস্তরে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার একটি বহুমাত্রিক প্রয়াস। কাজেই প্রকৃত সফলতা ও চিরস্থায়ী মুক্তির জন্য ইলমের সঙ্গে আমলের সুনিপুণ সমন্বয় অপরিহার্য।
ইলম ও আমল পরস্পরের পরিপূরক :
ইলম ও আমল হ’ল রেল লাইনের দু’টি পাতের মতো, যার একটি ছাড়া অপরটি অচল। আমল বিহীন ইলমের যেমন কোন মূল্য নেই, ঠিক তেমনি ইলম বিহীন আমলেরও কোন দাম নেই। ইলম ও আমলের সমন্বয়ে ফুটে ওঠে মুমিন বান্দার প্রকৃত দ্বীনদারী। বর্তমান মুসলমানদের দ্বীন-দুনিয়ার যাবতীয় দুর্গতির পিছনে যতগুলো কারণ রয়েছে, তন্মধ্যে প্রধান কারণ হ’ল ইলম ও আমলের সমন্বয়হীনতা। আমরা যা শিখি, তা কাজে বাস্তবায়ন করি না; যা বলি তা করি না। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্বীনের কথা প্রচার করি, কিন্তু নিজেদের জীবনে দ্বীনের বাস্তবায়ন নেই। আমরা মানুষকে বলি ‘বেশী বেশী ইস্তিগফার করুন’, অথচ নিজেরাই ইস্তিগফার করার সময় পাই না। মানুষকে আমলের কথা বলতে বলতে আমরা হয়রান হয়ে যাই, অথচ দিনশেষে নিজের নেক আমলের পাল্লাটা শূন্যই পড়ে থাকে। অথচ স্বর্ণালী যুগের সোনালী মানব সালাফে ছালেহীন আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় ইলম ও আমলের সমন্বয় করতেন। অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন এবং এর বিপরীতটাকে ধ্বংসাত্মক মনে করতেন।
আলী ইবনু আবী তালেব (রাঃ) বলেন, يَا حَمَلَةَ الْعِلْمِ، اعْمَلُوا بِهِ؛ فَإِنَّمَا الْعَالِمُ مَنْ عَلِمَ ثُمَّ عَمِلَ وَوَافَقَ عَمَلُهُ عِلْمَهُ، وَسَيَكُونُ أَقْوَامٌ يَحْمِلُونَ الْعِلْمَ لَا يُجَاوِزُ تَرَاقِيَهُمْ تُخَالِفُ سَرِيرَتُهُمْ عَلَانِيَتَهُمْ وَيُخَالِفُ عَمَلُهُمْ عِلْمَهُمْ، يَقْعُدُونَ حَلَقًا فَيُبَاهِي بَعْضُهُمْ بَعْضًا حَتَّى إِنَّ الرَّجُلَ لَيَغْضَبُ عَلَى جَلِيسِهِ أَنْ يَجْلِسَ إِلَى غَيْرِهِ وَيَدَعَهُ، أُولَئِكَ لَا تَصْعَدُ أَعْمَالُهُمْ فِي مَجَالِسِهِمْ تِلْكَ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ‘হে জ্ঞানধারীরা! তোমরা তোমাদের জ্ঞান অনুযায়ী আমল করো। কারণ প্রকৃত আলেম তো সেই ব্যক্তি, যে জ্ঞান অর্জন করে এবং সে অনুযায়ী আমল করে এবং যার আমল তার জ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আগামীতে এমন কিছু লোক আসবে, যারা জ্ঞান বহন করবে, কিন্তু সেই জ্ঞান তাদের গলার নীচে নামবে না (অন্তরে প্রবেশ করবে না, প্রভাব ফেলবে না)। তাদের অন্তরের অবস্থা ও বাহ্যিক প্রকাশ পরস্পর বিরোধী হবে। তাদের আমলও তাদের জ্ঞানের বিরোধিতা করবে। তারা বৈঠকে বসবে এবং একে অপরের সামনে নিজেদের জ্ঞান নিয়ে গর্ব করবে। এমনকি একজন ব্যক্তি তার সাথীর ওপর রাগান্বিত হবে শুধু এই কারণে যে, সে গিয়ে অন্য কারো পাশে বসেছে এবং তাকে (আগের জনকে) ছেড়ে দিয়েছে। এমন লোকদের কোন আমলই তাদের ঐসব বৈঠক থেকে আল্লাহর কাছে উঠবে না (কবুল হবে না)’।[22]
আলী (রাঃ)-এর এই বক্তব্যটি বর্তমান সময়ের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে অনেকেই ইসলামী জ্ঞান অর্জন করে, বই পড়ে, বক্তৃতা দেয়, অন্যদের উপদেশ দেয়; কিন্তু তাদের সেই জ্ঞান নিজের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে না। তাদের অবস্থা হ’ল- ইলম তাদের গলার নীচে নামে না; অন্তরে প্রবেশ করে না। তারা তাওহীদ, ছালাত, ছিয়াম, আমানতদারিতা, পরহেযগারিতা, বিনয় এসব নিয়ে কথা বলে, অথচ নিজেরাই অহংকার করে, ছালাতে গাফেলতি করে, নেক আমলে অলসতা করে, অন্যের সমালোচনায় লিপ্ত থাকে, নানা পাপাচারে জড়িত থাকে, কথা আর কাজে বিস্তর ফারাক তৈরী করে। অনেকে মাহফিল ও আলোচনা সভায় গিয়ে একে অপরের উপর জ্ঞান যাহির করে, কার রেফারেন্স কত বেশী, কার মাহফিলে জনসমাগম বেশী, কে কত চমৎকার উপস্থাপনা করতে পারে, কার আলোচনা মানুষ সবচেয়ে বেশী পসন্দ করে, ইউটিউবে কার ভিউ বেশী- এগুলো নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে। অথচ এইসব মনোভাব ইখলাছের পরিপন্থী। আমরা অন্যকে ইখলাছের সবক দেই, কিন্তু নিজেরাই লৌকিকতা ঘেরাটোপ থেকে বের হ’তে পারি না। আজকের সমাজে এটি খুবই পরিচিত দৃশ্য। আমরা ইলমের আলোচনায় ব্যস্ত, কিন্তু নিজের জীবনে সেই ইলমের বাস্তব অনুশীলন অনুপস্থিত। ফলে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমরা প্রতিনিয়ত অশান্তির দহনে পুড়ছি। মূলত ইলম ও আমলের সমন্বয়হীনতাই এর জন্য দায়ী। এই অবস্থা না বদলালে আমাদের জ্ঞান শুধু পুঁথিগতই থেকে যাবে, যা ক্বিয়ামতের দিন আমাদের বিপদের কারণ হবে। তাই অর্জিত জ্ঞানের আলোকে নিজেকে সংশোধন করে সেই জ্ঞান আমলে পরিণত করা অপরিহার্য কর্তব্য।
আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, ويل لمن لم يعلم ولم يعمل مرّةً، وويل لمن علم ولم يعمل سبعين مرَّةً، ‘যে জানেনি এবং আমল করেনি, তার জন্য একবার আফসোস। আর যে জেনেছে কিন্তু আমল করেনি তার জন্য সত্তর বার আফসোস’।[23] হাসান বাছরী (রহঃ) বলেন,أَطْلُبُ الْعِلْمَ طَلَبًا لَا يَضُرُّ بِالْعِبَادَةِ، وَأَطْلُبُ الْعِبَادَةَ طَلَبًا لَا يَضُرُّ بِالْعِلْمِ، فَإِنَّ مَنْ عَمِلَ بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ مَا يُفْسِدُ أَكْثَرَ مِمَّا يُصْلِحُ، ‘আমি এমনভাবে ইলম অন্বেষণ করি, যা ইবাদতের জন্য ক্ষতিকর হবে না। আর আমি এমন এমনভাবে ইবাদত করি, যা ইলম অন্বেষণের জন্য ক্ষতিকর হবে না। কেননা যে ব্যক্তি ইলম ছাড়া আমল করে সে যতটা না সংশোধন করে তার চেয়ে বেশী অনিষ্ট করে’।[24]
ইমাম ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন,فإن العلم هو الأصل الأعظم والنور الأكبر، وربما كان تقليب الأوراق أفضل من الصوم والصلاة والحج والغزو، وكم من معرض عن العلم يخوض في عذاب الهوى في تعبده، ويضيع كثيرًا من الفرص بالنفل، ويشتغل بما يزعمه الأفضل عن الواجب، ولو كانت عنده شعلة من نور العلم، لاهتدى، ‘নিশ্চয়ই জ্ঞানই (দ্বীনের) মূল স্তম্ভ এবং সর্বোচ্চ আলো। কখনো কখনো (জ্ঞানার্জনের নিমিত্তে) বইয়ের পাতাগুলো উল্টানো নফল ছিয়াম, ছালাত, হজ্জ এবং জিহাদ অপেক্ষা উত্তম হয়ে থাকে। এমন কিছু মানুষ আছে, যে ইলম থেকে বিমুখ থাকার কারণে নিজের ইবাদতে প্রবৃত্তির অনুসরণে ডুবে থাকে। সে নফল ইবাদত করতে গিয়ে অনেক ফরয ইবাদতকে নষ্ট করে দেয়। ওয়াজিবকে তরক করে তার ধারণাপ্রসূত উত্তম (?) কাজ করে (অথচ শরী‘আতে সেটা উত্তম নয়)। যদি তার নিকটে সঠিক জ্ঞানের একটি আলোকবর্তিকা থাকত, তাহ’লে অবশ্যই সে সঠিক পথ পেত’।[25]
খত্বীব বাগদাদী (রহঃ) বলেন, فَلَا تَأْنَسْ بِالْعَمَلِ مَا دُمْتَ مُسْتَوْحِشًا مِنَ الْعِلْمِ، وَلَا تَأْنَسْ بِالْعِلْمِ مَا كُنْتَ مُقَصِّرًا فِي الْعَمَلِ وَلَكِنِ اجْمَعْ بَيْنَهُمَا، وَإِنْ قَلَّ نَصِيبُكَ مِنْهُمَا، وَمَا شَيْءٌ أَضْعَفُ مِنْ عَالِمٍ تَرَكَ النَّاسُ عِلْمَهُ لِفَسَادِ طَرِيقَتِهِ، وَجَاهِلٍ أَخَذَ النَّاسُ بِجَهْلِهِ لِنَظَرِهِمْ إِلَى عِبَادَتِهِ ‘তুমি যতক্ষণ ইলম থেকে বিমুখ থাকবে, ততক্ষণ তুমি আমল করে তৃপ্তি পাবে না। অনুরূপভাবে তুমি যদি আমলে শীথিলতা প্রদর্শন কর, তবে তুমি ইলম অর্জন করে তৃপ্তি পাবে না। সুতরাং তুমি উভয়ের মাঝে সমন্বয় কর। যদিও ইলম-আমল উভয়ের মাঝে তোমার সামান্য কিছু অংশ থাকে’।[26]
বর্তমানে অনেকে কেবল আমলে মনোযোগ দেয়, কিন্তু ইলমের দিকে ফিরে তাকায় না। ফলে তাদের আমল হয় অন্ধ অনুসরণ ও বিদ‘আতে পূর্ণ। আবার কেউ কেউ কেবল জ্ঞান অর্জনেই ব্যস্ত, বক্তৃতা, লেখালেখি, আলোচনা- সবই করে, কিন্তু নিজের আমলের যিন্দেগীতে অলস প্রকৃতির। ফলে ইলম চর্চা তাদেরকে আত্মতৃপ্তি এনে দিতে পারে না; বরং সেই জ্ঞান তাদের জন্য এক বোঝায় পরিণত হয়। যেমন দেখা যায় কেউ ছালাত-ছিয়াম, নফল ইবাদতে খুবই পরিশ্রম করে, কিন্তু শরী‘আত অনুযায়ী সঠিক নিয়ম জানে না; ফলে তার ইবাদত অনেক সময় ভুল পথে চলে যায়। আবার কেউ আরবী ব্যাকরণ, ফিক্বহ, হাদীছ তাফসীর, উছূল ইত্যাদি শিখে; কিন্তু অহংকারে পড়ে যায়, আমলে গাফেল থেকে যায়। সেজন্য অল্প পরিমাণে হ’লেও ইলম ও আমলের দুই দিককে একত্র করা আবশ্যক। আজকের সমাজে অনেক আলেমের জীবনযাত্রা দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষ তাদের ইলম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্যদিকে কোন কোন অজ্ঞ লোকের বাহ্যিক ইবাদতের বাহুল্য দেখে মানুষ তার ভুলকেও গ্রহণ করে নেয়, কারণ তারা তার ইখলাছপূর্ণ আমল দেখে মুগ্ধ হয়। ফলে সমাজে ভুল ধারণার বিস্তার ঘটে। এই বাস্তবতা আমাদের চোখের সামনে। তাই ইলম ও আমলের ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় প্রয়োজন, যেন ব্যক্তিজীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয় এবং দ্বীনের প্রকৃত সৌন্দর্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেছেন, مَا بَلَغَنِي عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدِيْثٌ قَطُّ، إِلاَّ عَمِلْتُ بِهِ وَلَوْ مَرَّةً، ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যে হাদীছই আমার কাছে পৌঁছেছে, আমি জীবনে একবার হ’লেও তার উপর আমল করেছি’।[27]
আল্লামা আব্দুল্লাহ ইবনে বায (রহঃ) বলেন, ‘নিঃসন্দেহে সকল কল্যাণের চাবিকাঠি হ’ল ইলম। আল্লাহর ফরযকৃত বিধানের প্রতিপালন এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয় সমূহ বর্জনের প্রধান মাধ্যম এটাই। আল্লাহ যাকে তাওফীক্ব দান করেন তার জ্ঞানের ফলাফল হ’ল তার আমল। এটা প্রত্যেক কল্যাণকার কাজের সংকল্পকে সুনিশ্চিত করে। ইলমবিহীন ঈমান, আমল, সংগ্রাম ও জিহাদের কোন গুরুত্ব নেই। ইলমবিহীন কথা ও কাজের কোন মূল্য নেই। জ্ঞান বিহীন কোন কিছুতে উপকারিতা তো নেই; বরং রয়েছে মারাত্মক ক্ষতি, যা বড় ফাসাদের দিকে টেনে নিয়ে যায়’।[28]
অতএব দ্বীনের জ্ঞান হাছিলের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। আর এর মূল উদ্দেশ্য হ’তে হবে- সার্বিক জীবনে সেই জ্ঞানের বাস্তবায়ন। নতুবা সেই জ্ঞানের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার তাওফীক্ব লাভ করা সম্ভব নয়। মালেক ইবনে দীনার (রহঃ) বলেন, مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِلْعَمَلِ وَفَّقَه الله وَمَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِغَيْرِ الْعَمَلِ يَزْدَادُ بِالْعِلْمِ فَخْرًا، ‘যে ব্যক্তি আমল করার জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করে, আল্লাহ তাকে সেই জ্ঞানের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার তাওফীক্ব দান করেন। আর যে ব্যক্তি আমল করার উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে অন্য কোন কারণে ইলম তালাশ করে, সেই জ্ঞানের মাধ্যমে তার অংহকার বৃদ্ধি পায়’।[29] ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, এমন কত আলেম আছে, আল্লাহ যাকে তার অর্জিত ইলমের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার তাওফীক্ব দেননি, ফলে স্বীয় জ্ঞান অনুযায়ী সে আমল করতে পারেনি। আবার এমন কত সাধারণ লোক আছে, আল্লাহ যাকে নেক আমল করার তাওফীক্ব দিয়ে সম্মানিত করেছেন।[30]
সুতরাং ইলম ও ইবাদত একে অপরের পরিপূরক। একটি ছাড়া অপরটির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। ইলমের বাস্তবায়ন যার জীবনে যত বেশী, সে ততই আল্লাহমুখী ও কল্যাণকামী মানুষে পরিণত হয়। আর যার ইলম ও আমলের মাঝে দূরত্ব সূচিত হয়, সে নিজে যেমন ধ্বংসের মুখে পতিত হয়, তদ্রূপ সমাজও তার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মহান আল্লাহ আমাদের ইলম ও আমলে সীমাহীন বরকত দান করুন। অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার তাওফীক্ব দান করুন। ইলম ও আমলের ভারসাম্য বজায় রেখে তাঁর সন্তুষ্টি হাছিলের মাধ্যমে আমৃত্যু ছিরাতে মুস্তাক্বীমে অটল-অবিচল থাকার তাওফীক্ব দিন- আমীন!
আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
এম.ফিল গবেষক, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়।
[1]. ড. ফজলুর রহমান, আল-মু‘জামুল ওয়াফী (ঢাকা : রিয়াদ প্রকাশনী, ৬ষ্ঠ সংস্করণ, ২০০৯) পৃ. ৭০৭।
[2]. বাহাউদ্দীন সুবকী, আরূসুল আফরাহ (বৈরূত : আল-মাকতাবাতুল আছরিইয়াহ, ১ম প্রকাশ, ১৪২৩হি./২০০৩খৃ.), ২/৫১।
[3]. মুহাম্মাদ ছালেহ ইবনে উছায়মীন, আল-উছূল মিন ইলমিল উছূল (সঊদী আরব : দারু ইবনিল জাওযী, ৪র্থ মুদ্রণ, ১৪৩০হি./২০০৯খৃ.), পৃ. ১৫; ঐ, কিতাবুল ইলম, পৃ. ৯।
[4]. মুহাম্মাদ ছালেহ ইবনে উছায়মীন, মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল (সঊদী আরব : দারুল ওয়াত্বান, ১ম প্রকাশ, ১৪১৩হি.) ৭/১৩০।
[5]. ইবনু মাজাহ হা/২২৪; মিশকাত হা/২১৮, সনদ হাসান।
[6]. মুস্তাদরাক হাকেম হা/৩১৪; ছহীহুল জামে‘ হা/৪২১৪, সনদ ছহীহ।
[7]. ত্বাবারানী, আল-মু‘জামুল আওসাত্ব হা/৩৯৬০; বাযযার হা/২৯৬৯; ছহীহুত তারগীব হা/৬৮, সনদ ছহীহ লিগায়রিহী।
[8]. মুসলিম হা/২৬৯৯; মিশকাত হা/২০৪।
[9]. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্ব (বৈরূত : দারুল ফিকর, ১৪১৫হি. /১৯৯৫খৃ.) ৫০/২৫২; ওমর মুক্ববিল, মাওয়াইযুছ ছাহাবাহ (রিয়ায : মাকতাবাতু দারিল মানহাজ, ১ম প্রকাশ, ১৪৩৫হি.) পৃ. ৪৭।
[10]. ইবনু হাজার আসকালানী, ফাৎহুল বারী, ১/১৪১।
[11]. আবূ নু‘আইম ইছফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া, ৬/৩৬৩।
[12]. আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ হামাবী আল-হানাফী, গামযু উয়ূনিল বাছায়ির (বৈরূত : দারুল কুতুবিল-ইলমিইয়াহ, ১ম প্রকাশ, ১৪০৫হি./১৯৭৫খৃ.) ৪/৩১৩।
[13]. ইবনুল ক্বাইয়িম জাওযিইয়াহ, মিফতাহু দারিস সা‘আদাত (রিয়ায : দারু আত্বাআতিল ইলম, ১৪৪০হি./২০১৯খৃ.) ১/১৬৪।
[14]. তাফসীরে রাগেব ইছফাহানী ৫/৪৯৮।
[15]. ইবনু আজীবাহ, আল-বাহরুল মাদীদ ১/৩৩৩।
[16]. আল-মু‘জামুল ওয়াফী, পৃ. ৭১২।
[17]. আব্দুর রঊফ মুনাভী, আত-তাওক্বীফ ‘আলা মুহিম্মা-তিত তা‘আরীফ (কায়রো : আলামুল কুতুব, ১ম প্রকাশ, ১৪১০হি./১৯৯০খৃ.) পৃ. ২৪৭।
[18]. আবুল হাসান আল-হার্রালী, তুরাছু আবিল হাসান আল-হার্রালী (মরক্কো : মানশুরাতুল মারকায আল-জামে‘ঈ, ১ম প্রকশ, ১৪১৮হি./১৯৯৭খৃ.) পৃ. ২৩২।
[19]. তিরমিযী হা/২৪১৬; মিশকাত হা/৫১৯৭; সনদ হাসান।
[20]. আব্দুর রহমান মুবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযী ৭/৮৫।
[21]. মুসলিম হা/২৫৬৪; মিশকাত হা/৫৩১৪।
[22]. ইবনু আব্দিল বার্র, জামে‘উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহী (সঊদী আরব : দারু ইবনিল জাওযী, ১৪১৪হি.) ১/৬৯৭; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্ব (বৈরূত : দারুল ফিক্র, ১৪১৫ হি.) ৪২/৫০৯।
[23]. ইবনুল জাওযী, ছায়দুল খাত্বের, পৃ. ৫৭।
[24]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ ৭/১৮৭; যামাখশারী, রাবীউল আবরার ৪/৩২।
[25]. ইবনুল জাওযী, ছায়দুল খাত্বের, পৃঃ ১১৩।
[26]. খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলমি আল-আমল, মুহাক্কিক্ব : মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী (বৈরূত : আল-মাকতাবুল ইসলামী, ৫ম মুদ্রণ, ১৪০৪হি./১৯৮৪খৃ.), পৃ. ১৪।
[27]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা (বৈরূত : মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ৩য় মুদ্রণ, ১৪০৫হি./১৯৭৫খৃ.), ৭/২৪২।
[28]. ইবনে বায, মাজমূ‘উ ফাতাওয়া, ৪/৫৯।
[29]. আবূ নু‘আইম আছফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ২/৩৭৮।
[30]. মুহাম্মাদ খাদেমী, বারীক্বাহ মাহমূদিয়্যাহ (দামেশক : মাত্ববা‘আতুল হালাবী, ১৩৪৮হি.), ১/২৯৯।