কাযী শুরাইহ বিন হারেছ আল-কিন্দী ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও খ্যাতিমান ন্যায়বিচারক। তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবেঈ ফক্বীহ ছিলেন। ২য় খলীফা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) তাঁকে কূফার ‘কাযী’ বা বিচারক হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন।[1] ৩য় খলীফা ওছমান এবং ৪র্থ খলীফা আলী (রাঃ)-এর সময়ও তিনি কূফার বিচারক ছিলেন।[2] তিনি সর্বমোট ৬০ বছর বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। তন্মধ্যে কূফায় ৫৩ বছর এবং বছরাতে ৭ বছর।[3] তাঁর মতো এত দীর্ঘ সময় কোন মুসলিম বিচারক এই গুরুদায়িত্ব পালন করেননি। তিনি একশ’ বিশ বছর বয়সে ৭৮/৮০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। নিম্নে তাঁর ন্যায়বিচারের কয়েকটি শিক্ষণীয় ঘটনা উল্লেখ করা হ’ল।-
১. নিজ পুত্রের বিরুদ্ধে রায় প্রদান :
শুরাইহ (রহ.)-এর পুত্র আব্দুল্লাহ তাঁর পিতাকে বলল, ‘আমার ও কিছু লোকের মধ্যে একটি বিষয়ে বিরোধ রয়েছে। আপনি বিষয়টি ভেবে দেখুন! যদি অধিকার আমার পক্ষে থাকে, তাহ’লে আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করব; আর যদি অধিকার আমার পক্ষে না থাকে, তাহ’লে আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করব না’। শুরাইহ তাঁর পুত্রের নিকট থেকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শুনে বললেন, ‘যাও, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করো। পুত্র তখন তাদের কাছে গেল এবং পরস্পরের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি শুরাইহ-এর আদালতে উপস্থাপিত হ’ল। শুরাইহ নিজ ছেলের বিরুদ্ধেই রায় প্রদান করলেন। ছেলে বাড়িতে ফিরে এলে, শুরাইহ তাকে বললেন, ‘আল্লাহর কসম! তুমি যদি আগে থেকেই আমাকে বিষয়টি না বলতে তাহ’লে আমি তোমাকে দোষারোপ করতাম না। কিন্তু তুমি আমাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলেছ যে, তুমি আমাকে অপমানিত করে ছেড়েছ। এরপর শুরাইহ বললেন, ‘হে বৎস! আল্লাহর কসম! তুমি আমার কাছে তাদের সবার সমান পৃথিবী পরিমাণ মানুষের চেয়েও বেশী প্রিয়। কিন্তু আল্লাহর বিধান তোমার চেয়েও আমার কাছে অধিক মর্যাদাপূর্ণ ও প্রিয়। আমি আশঙ্কা করেছিলাম, যদি তোমাকে আগে বলে দিই যে রায় তোমার বিরুদ্ধে যাবে, তাহ’লে তুমি তাদের সঙ্গে আপস করে ফেলতে এবং এর ফলে তাদের কোন ন্যায্য অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হ’ত’।[4]
শিক্ষা : শুরাইহ-এর কাছে আত্মীয়তা ও ভালোবাসার ঊর্ধ্বে ছিল আল্লাহর বিধান ও ন্যায়বিচার। নিজের পুত্রের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও তিনি তার বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত রায় দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হননি। কারণ মুমিনের কাছে সত্য ও ন্যায়ের সম্পর্ক আত্মীয়তার সম্পর্কের চেয়েও শক্তিশালী।
২. এক নারীর মিথ্যা ক্রন্দন :
বিখ্যাত তাবেঈ শা‘বী (রহ.) বলেন, ‘আমি শুরাইহ (রহ.)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক নারী একজন পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে তাঁর কাছে এল। সে অঝোরে কাঁদতে লাগল। আমি বললাম, ‘হে আবু উমাইয়াহ! আমার ধারণা, এই অসহায় নারীটি নির্যাতিত’। তখন শুরাইহ আমাকে বললেন, ‘হে শা‘বী! ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা কিন্তু সন্ধ্যাবেলায় তাদের পিতার কাছে কাঁদতে কাঁদতেই এসেছিল’।[5]
শিক্ষা : শুধু কান্না, আবেগ বা বাহ্যিক দুর্বলতা দেখে কাউকে মাযলূম ধরে নেওয়া যায় না। কারণ কান্না সত্যতার প্রমাণ নয়; বিচারককে প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
৩. দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়বিচার :
দু’জন ব্যক্তি শুরাইহের কাছে একটি বিরোধ নিয়ে উপস্থিত হ’ল। তিনি তাদের একজনের বিরুদ্ধে রায় দিলেন। তখন সে ব্যক্তি বলল, ‘আমি জানি, আপনি কোন দিক থেকে প্রভাবিত হয়েছেন’। (অর্থাৎ লোকটি ঘুষ গ্রহণের দিকে ইঙ্গিত করল)। তখন শুরাইহ বললেন, ‘আল্লাহ ঘুষদাতা, ঘুষগ্রহীতা এবং মিথ্যাবাদীর প্রতি লা‘নত বর্ষণ করুন’![6] অথচ তিনি দুর্নীতি থেকে সর্বতোভাবে মুক্ত ছিলেন। শুরাইহ বলতেন, ‘উপহার যখন দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, ন্যায়বিচার তখন জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায়’।[7]
৪. নির্ভীক ন্যায়বিচারক :
(ক) শুরাইহ এমন এক ব্যক্তিকে কারাগারে বন্দী করেছিলেন, যার বিরুদ্ধে একটি বিষয়ে রায় দেওয়া হয়েছিল। তখন বিশর ইবনু মারওয়ান তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে বললেন, লোকটিকে ছেড়ে দিন। কিন্তু শুরাইহ তা প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বললেন, ‘কারাগার আপনার, কারারক্ষী আপনার কর্মচারী; কিন্তু আমি সত্যটি দেখতে পেয়ে তার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছি এবং তাই তাকে কারাগারে বন্দী করেছি’। এ কথা বলে তিনি তাকে মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানান।[8]
(খ) আশ‘আছ বিন ক্বায়েস শুরাইহ-এর বিচারসভায় প্রবেশ করলেন। শুরাইহ তাঁকে দেখে বললেন, আমাদের শায়েখ ও নেতা, আপনাকে স্বাগতম! এবং তাঁকে নিজের পাশে বসালেন। তিনি সেখানে বসে থাকা অবস্থায় এক ব্যক্তি এসে আশ‘আছের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। তখন শুরাইহ তাঁকে বললেন, উঠে প্রতিপক্ষের আসনে বসুন এবং আপনার প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন! আশ‘আছ বললেন, আমি আমার আসন থেকেই তার সঙ্গে কথা বলব। শুরাইহ বললেন, আপনাকে অবশ্যই উঠতে হবে। অন্যথা আমি কাউকে আদেশ করব, সে আপনাকে উঠিয়ে দেবে। আশ‘আছ বললেন, আপনি তো বেশ উঁচু হয়ে গেছেন! অর্থাৎ আমার সঙ্গে আপনার আচরণ তো বেশ কঠোর হয়ে গেল! শুরাইহ বললেন, আপনি কি কখনো দেখেছেন যে, এই ন্যায়বিচার আপনার কোন ক্ষতি করেছে? আশ‘আছ বললেন, না। শুরাইহ বললেন, তাহ’লে দেখছি, আপনি অন্যের ওপর আল্লাহর নে‘মত চিনতে পারেন, অথচ নিজের ওপর আল্লাহর নে‘মত চিনতে পারেন না।[9]
শিক্ষা : ন্যায়বিচারের আসনে বসার পর বিচারকের কাছে ক্ষমতাবান ও দুর্বল সকলেই সমান। সত্য ও প্রমাণের সামনে কোন ব্যক্তিগত প্রভাবের স্থান নেই। শুরাইহ-এর এই ঘটনা ন্যায়ের প্রতি অবিচলতা, বিচারিক স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার সামনে সত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
[1].ড. আকরাম যিয়া আল-উমারী, আছরুল খিলাফাহ আর-রাশেদাহ, পৃ. ১৫৭, ১৭২।
[2].ঐ, পৃ. ১৭৪-১৭৫।
[3].তাহযীবুল কামাল ১/২৪৩।
[4].আল-মুনতাযাম, ৬/১৮৫।
[5].ছিফাতুছ ছাফওয়া ২/২৩-২৪; তারীখু দিমাশক ২৩/৪৬।
[6].আত-ত্ববাকাতুল কুবরা ৭/২৫৬।
[7].তারীখু দিমাশক ২৩/৩৭।
[8].ঐ ২৩/৩০।
[9].আল-ইকদুল ফারীদ ১/৮২।