এক জুম‘আর দিনে আবুবকর ছিদ্দীক (রা.) দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, আগামীকাল সকালে তোমরা ছাদাক্বার উটগুলো নিয়ে উপস্থিত হবে। আমরা সেগুলো বণ্টন করব। আর আমাদের অনুমতি ছাড়া কেউ যেন ভেতরে প্রবেশ না করে। এক ব্যক্তি যখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল তখন তাঁর স্ত্রী বলল, এই উটের লাগামটি নিয়ে যাও। হয়তো আল্লাহ আমাদের একটি উট দান করবেন। লোকটি লাগাম নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখল, আবুবকর ও ওমর (রা.) উটগুলোর কাছে প্রবেশ করেছেন। সেও বিনা অনুমতিতে তাঁদের সঙ্গে ভেতরে ঢুকে পড়ল। আবুবকর (রা.) তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাকে আমাদের অনুমতি ছাড়া কে ভেতরে ঢুকতে দিল’? এরপর তিনি লোকটির হাত থেকে লাগামটি নিয়ে সেটি দিয়েই তাকে আঘাত করলেন। উট বণ্টন শেষ হলে আবুবকর (রা.) সেই লোকটিকে ডেকে লাগামটি ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন, ‘এসো, তুমি আমার কাছ থেকে কিছাছ (প্রতিশোধ) গ্রহণ করো’। তখন ওমর (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম! সে কিছাছ নেবে না। এটিকে মানুষের জন্য রেওয়াজে পরিণত করবেন না। তখন আবুবকর (রা.) বললেন, তাহলে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে আমার দায় থেকে আমাকে কে মুক্ত করবে? ওমর (রা.) বললেন, তাকে সন্তুষ্ট করে দিন। অতঃপর আবুবকর (রা.) তাঁর খাদেমকে নির্দেশ দিলেন, যেন সে ঐ ব্যক্তির কাছে একটি সওয়ারীর উট, তার জিন, একটি মখমলের চাদর এবং পাঁচ দীনার পৌঁছে দেয়। এভাবে তিনি তাকে সন্তুষ্ট করলেন।[1]
এই ঘটনায় আবুবকর (রা.)-এর অসাধারণ তাকবওয়া, ন্যায়পরায়ণতা, জবাবদিহিতার অনুভূতি এবং মানুষের হক আদায়ে তাঁর গভীর সতর্কতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে।
ব্যভিচারীর শাস্তি কার্যকর করলেন আবুবকর (রা.) :
আবুবকর ছিদ্দীক (রা.)-এর কাছে এমন এক ব্যক্তিকে আনা হল, যে এক কুমারী দাসীর সঙ্গে অবৈধ যৌনসম্পর্কে লিপ্ত হয়ে তাকে গর্ভবতী করেছিল। পরে সে নিজেই ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি প্রদান করে। ইবনু মাছরূদ (রহঃ) বলেন, সে ব্যভিচার করেছিল এবং সে মুহসান (অর্থাৎ পূর্বে বৈধ বিবাহের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবন অতিবাহিতকারী) ছিল না। তখন আবুবকর (রা.) তার ওপর শরী‘আত নির্ধারিত ব্যভিচারের শাস্তি (একশ বেত্রাঘাত) কার্যকর করার নির্দেশ দেন। এরপর তাকে ফাদাক অঞ্চলে নির্বাসিত (দেশান্তর) করা হয়।
বিচারের কাঠগড়ায় ওমর (রা.) :
ইমাম শা‘বী (রহ.) বলেন, ওমর (রা.) ও উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর মধ্যে কোন একটি বিষয় নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। তখন ওমর (রা.) বললেন, ‘আমাদের দু’জনের মাঝে ফায়ছালা করার জন্য একজন বিচারক নির্ধারণ করুন! তারা উভয়ে মিলে যায়েদ বিন ছাবিত (রা.)-কে তাদের বিচারক নিযুক্ত করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তারা তাঁর (যায়েদের) কাছে গেলেন। ওমর (রা.) গিয়ে বললেন, ‘আমরা তোমার কাছে এসেছি যেন তুমি আমাদের মাঝে বিচার কর। বর্ণনাকারী বলেন, তারা যখন যায়েদের ঘরে প্রবেশ করলেন, তখন যায়েদ ওমর (রা.)-কে তাঁর বিছানার সামনের দিকে নিজের পাশে বসালেন। তখন ওমর (রা.) বললেন, هَذَا أَوَّلُ جَوْرٍ جُرْتَ فِي حُكْمِكَ، أَجْلِسْنِي وَخَصْمِي مَجْلِسًا ‘তুমি তোমার বিচারকার্যে প্রথমেই অন্যায় করে ফেললে! তুমি আমাকে এবং আমার প্রতিপক্ষকে (ওবাই) একই আসনে বসাও (অর্থাৎ তুমি কেবল আমাকেই সম্মানের আসনে বসিয়ে অন্যায় করেছ)। এরপর তারা উভয়ে তাঁর কাছে ঘটনাটি খুলে বললেন। তখন যায়েদ (রা.) ওবাই-এর উদ্দেশে বললেন, ‘আমীরুল মুমিনীনের ওপর শপথ (হলফ) করা আবশ্যক। তবে আপনি চাইলে তাঁকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন’। বর্ণনাকারী বলেন, তখন ওমর (রা.) সেই বিষয়টি নিয়ে শপথ করলেন। অতঃপর তিনি (যায়েদকে উদ্দেশ্য করে) শপথ করে বললেন, لَا تُدْرِكْ بَابَ الْقَضَاءِ حَتَّى لَا يَكُونَ لِي عِنْدَكَ عَلَى أَحَدٍ فَضِيلَةٌ ‘তুমি ততক্ষণ প্রকৃত বিচারক হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমার কাছে বিচারপ্রার্থী একজন সাধারণ মানুষ এবং আমার (আমীরুল মুমিনীনের) মাঝে কোন সম্মানজনক পার্থক্যের স্থান না থাকে’।[2]
আনাস (রা.)-কে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করলেন ওমর (রা.) :
হযরত ওমর (রা.) জনস্বার্থকে সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নিজস্ব ইজতিহাদের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। বর্ণিত আরে, তিনি আনাস বিন মালেক (রা.)-কে শাস্তি দিয়েছিলেন। কারণ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ৬ হাযার দিরহাম তাঁর কাছে আমানত হিসাবে রাখা হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা যথাযথভাবে সংরক্ষণে অবহেলা করেছিলেন। ফলে ওমর (রা.) তাঁকে সেই অর্থের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করেন। ঘটনাটির প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা যায়, ওমর (রা.) আনাস (রা.)-এর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনেননি; বরং অর্থ সংরক্ষণে তাঁর অবহেলাই এর কারণ বলে মনে করেছিলেন।[3] আনাস বিন মালেক (রা.) বলেন, ‘আমার কাছে ৬ হাযার দিরহাম আমানত রাখা হয়েছিল। পরে তা হারিয়ে যায়। তখন ওমর (রা.) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এর সঙ্গে তোমার নিজের কোন সম্পদও কি হারিয়েছে?’ আমি বললাম, ‘না’। তখন তিনি আমাকে সেই অর্থের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করলেন’।[4]
উক্ত ঘটনাগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের ন্যায়বিচারের আদালতে ধনী-দরিদ্র, শাসক-প্রজা ও সাধারণ-অসাধারণ সকলেই আইনের দৃষ্টিতে সমান। আবুবকর ও ওমর (রা.) তাদের শাসনামলে সেই ঐতিহাসিক সত্য প্রমাণ করে ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে রয়েছেন।
[1]. বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা ৮/৮৯; সুয়ূতী, জাম‘উল জাওয়ামে ১৪/১৯৯।
[2]. আস-সুনানুল কুবরা, ১০/২৪৩; ক্রমিক : ২০৫১; ওয়াকী, আখবারুল কুযাত ১/১০৮-১০৯।
[3]. আকরাম যিয়া আল-উমারী, আছরুল খিলাফাতির রাশিদাহ (রিয়াদ: মাকতাবাতুল উবাইকান, ১ম সংস্করণ, ১৪৩০ হি./২০০৯ খ্রি.), পৃ. ১২৬।
[4]. আবু বকর আল-জাছ্ছাছ, আহকামুল কুরআন (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৫ হি./১৯৯৪ খ্রি.), ২/২৬০।