দুনিয়ায় আগমনের পর থেকে এই চিরচেনা সবুজের আঙ্গিনায় আমার বেড়ে ওঠা। সেই ছোট্ট অবস্থায় মায়ের কোলে আদর-যত্নে লালিত হ’লাম। কৈশোর কাটল দুরন্তপনা স্বভাবের সমবয়সীদের সাথে। যৌবন কেটে গেল চোখের পলকে। কখন যে জীবনজুড়ে বার্ধক্যের আগমন ঘটল, টেরও পাইনি। যখন দুয়েকটা করে চুল পাকতে শুরু করেছিল তখন ভেবেছিলাম, সমস্যার কারণে পাকছে। পাকা চুলগুলো তুলে ফেলতাম। সেদিন ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। ডাক্তার বলল, ‘বয়স হয়েছে তো! এখন শরীরে রোগ লেগেই থাকবে’। ডাক্তারের কথায় বেশ আশ্চর্য হ’লাম। আমার বয়স হয়েছে মানে! পরে হিসাব করে দেখলাম, সত্যিই বয়স হয়েছে।

আজকাল রাতে ঘুম কমই হয়। অনেক রাত পর্যন্ত রিলস দেখে তারপর ঘুম আসে। মনে করতাম, এটা আমার নেশা। তবে ডাক্তারের কথা শুনে মনে হচ্ছে, এটা আমার নেশা নয়, বরং বার্ধক্য। বার্ধক্যের কারণেই ঘুম আসে না। তাই গতরাতে শুয়ে শুয়ে আমি জীবনের হিসাব মিলাচ্ছিলাম। কর্মজীবনে যেমন টাকার হিসাব মিলত না। কোথায় কত খরচ হ’ল বলতে পারতাম না। তেমনই আজ আমি জীবনের হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। সত্যিই আমার যৌবনের দিকে তাকালে মাত্র কয়েকটা রাতের কথাই মনে পড়ে। হয়ত সাত-আটটা বিকেল আর দশ-বারটা সকাল। এই কয়েকটা বেলায় বিশ বছরের যৌবন কেটে গেল! কিভাবে! আমার হিসাব মেলে না।

আমি কর্মজীবনে প্রত্যেকটা কাজ সময়মত করতাম। প্রত্যেকটা কাজ শুরুর আগেই তার ডেডলাইন নির্ধারণ করে নিতাম। তবে একটা কাজের ডেডলাইন আজও নির্ধারণ করতে পারিনি। তা হ’ল, দুনিয়ার পেছনে ছোটার ডেডলাইন। দুনিয়ার সকল কাজের যদি ডেডলাইন থাকে, তবে ঠিক কত বছর পর্যন্ত দুনিয়ার পেছনে ছোটার পরে আমি ক্ষান্ত হব? এটারও তো একটা সীমারেখা থাকা উচিত তাই না? খাহেশকে ঘোড়া বানিয়ে আমি দিন-রাত ছুটে চলেছি। হায়াতের সীমানা কখন যে হুট করে শেষ হয়ে যাবে তা কি আমার জানা আছে? এই ঘোড়ার লাগাম আসলে কখন টেনে ধরা দরকার? ঘোড়ার লাগাম টানারও তো একটা ডেডলাইন থাকা উচিত, তাই না?

জীবনে এই প্রথম কোন বিষয় নিয়ে আমার আফসোস হচ্ছে। এই প্রথম মনে হচ্ছে, আমার মাধ্যমে কোন বড় ভুল হয়ে গেছে। চোখ দু’টো জ্বালা করে অশ্রু বেরিয়ে আসছে। ঠিক কতদিন পরে আমার চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে, আমি জানি না। আমার নিজের ওপরে বড়ই ক্ষোভ হচ্ছে। সারাজীবনের কৃতকর্মের দিকে চেয়ে মনে হচ্ছে, আমি সত্যিই অপরাধী। আমার মস্তিষ্কে যত আবর্জনা রয়েছে তা যদি দৃশ্যমান হয়ে যেত তবে দুনিয়ার বুকে সৌন্দর্য বলে হয়ত কিছুই বাকী থাকত না। এই পৃথিবীর যত অমলিন ও মনোমুগ্ধকর জিনিস আছে তার সবটাই কদর্যে ছেয়ে যেত।

আমার খুব ভালই মনে পড়ছে, আমার অপর এক মুসলমান ভাই যদি কোন ভাল কাজ করে তবে আমি মুখে তাকে বাহবা দেই ঠিকই, কিন্তু আমার অন্তর ফেটে যায় হিংসায়। অনেক সময় অনেক সুন্দর অভিনয় করেও সেই হিংসা আমি ঢাকতে পারি না। চেহারায়, কথাবার্তায় প্রকাশ পেয়েই যায়। আমি তখন তাকে মুখের বাহবাও দিতে পারি না। আমার কষ্ট হয়। অপ্রকাশ্য যন্ত্রণা অনুভব করি। তবে আজকের এই অনুতাপ সেই যন্ত্রণার চেয়েও হাযারগুণ ভারী লাগছে আমার কাছে। মনে হচ্ছে, কেউ যেন আমার বুকের ওপর পুরো একটি পাহাড় তুলে দিয়েছে।

ভুল তো মানুষেরই হয়। এটা আমিও মুখে বলি। সুতরাং মানুষ হিসাবে আমিও ভুল থেকে মুক্ত নই। কিন্তু কেউ যদি আমার একটা ভুল ধরে বসে, তখন আমি ভেতর ভেতর রাগে ফুঁসতে থাকি। আমি বিষাক্ত সাপের মত হয়ে যাই। আমি অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকি। সুযোগ পাওয়া মাত্রই ছোবল দিয়ে শোধ করে নেব সেই আশায়। অনেক সময় অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে সুযোগ না পেয়েও ছোবল দেই। এতে কেবল আমার মূর্খতাই প্রকাশ পায়। আমার চেহারা সবার সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। আমি এটার কোন ধার ধারি না। কারণ প্রতিশোধ নেয়ার মত প্রশান্তি ভিন্ন কিছুতে পাই না।

আমি আমার এই সুন্দর সেবক-চেহারার আড়ালে ঠিক কতটা আত্মস্বার্থকে প্রাধান্য দেই তা কেউ কোন দিন জানতে পারেনি। মানুষ আমাকে আত্মত্যাগী ভেবেছে। সুনিপুনভাবে আত্মত্যাগী হওয়ার অভিনয় করে যাওয়া আমি মনে মনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছি। যা আমার চেহারায় কখনোই ফুটে ওঠেনি। মানুষ শুধু পোষাক-পরিচ্ছদ, চেহারা আর কথা বলার ধরন দেখেই আমাকে ভাল মানুষ মনে করে নিয়েছে। অল্পতেই বিশ্বাস করে নিয়েছে। আমি তাদের এমন কর্মকান্ডে মনে মনে হেসেছি। মনে করেছি, কত পাগল এরা! তবে আজ মনে হচ্ছে, পাগল আমিই ছিলাম। আমি তাদেরকে ধোঁকা দেইনি। বরং নিজেই নিজেকে ধোঁকা দিয়েছি। আর তারা যে আমাকে বিশ্বাস করেছে, সে বিশ্বাসের যোগ্য আমি ছিলাম না। 

আমার মত ভাল মানুষেই! পূর্ণ আজ এই পৃথিবী। যাদের ভেতরটা লোভ, অহংকার, বিদ্বেষে পরিপূর্ণ, তারাই এই সমাজের ভাল মানুষ। মানুষের আর্ত-চিৎকারে যাদের পৈশাচিক অনন্দ হয়, তারাই আজ সেবক। আমার মত মানুষের পদচারণায় এই দুনিয়াটা সত্যিকারের ভাল মানুষ বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। আচ্ছা, তারা যদি আমার এই কদর্যতা সম্পর্কে জানতে পারে তবে কি ঘটতে পারে! এটা ভাবতে গেলেই চোখ আবারো ভিজে আসে। ভেতরের পাহাড় যেন অল্প অল্প করে গলে অশ্রু হয়ে বের হয়।

হয়ত এই প্রথম আমার কারো প্রতি অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা আসছে। সেটা এই বিশ্ব চরাচরের মালিক আল্লাহর প্রতি। যিনি আমার মত এক পিশাচের চেহারা সৌন্দর্যের প্রলেপ দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। আমি কোনদিন তার অনুগত হইনি। তবুও তিনি আমাকে দুনিয়ার বুকে অঢেল রিযিক, সম্মান আর নে‘মতে পূর্ণ এক জীবন দান করেছেন। জীবনে হয়ত এই প্রথম খুব লজ্জা লাগছে। আমি জীবনে অনেককে সরি (Sorry) বলেছি। সেগুলো ছিল চাকুরি টিকিয়ে রাখার জন্য, সংসার ঠিক রাখার জন্য বা পদোন্নতির জন্য। আমি অন্তর থেকে কখনো তাদের কাছে লজ্জিত হইনি। তবে এবার যে লজ্জা আমাকে আক্রমণ করেছে, আমি ভয় পাচ্ছি যে, তা হয়ত আমাকে খেয়ে ফেলবে। সত্যি! বড়ই নির্বোধ আমি!

আমি এতদিন শুধু চাকচিক্যের পেছনে ছুটেছি। দামী ব্রান্ডের পেছনে পড়ে সময় ও অর্থ নষ্ট করেছি। তবে আজ মনে হচ্ছে, মৃত্যুর পরে যারা আমার গোসল দিবে তারা যদি আমার হাতের ঘড়িটা খুলতে গিয়ে মনে করে, বাহ কত সুন্দর ঘড়ি! তারা যদি আমার জামা খুলতে গিয়ে মনে করে, কত দামী কাপড় পরত লোকটা! আমার ওয়ালেটে ১৫টা এটিএম কার্ড দেখে যদি মনে করে, এই লোকটা তো হাযার বছর বাঁচার প্রস্ত্ততি নিয়েছিল। তবে আমি বিবস্ত্র অবস্থায় আমার গোসলদাতাদের কাছেই লজ্জিত হয়ে পড়ব। মৃত্যুর পরের জীবন তো আরো পরে।

আমি সপ্তাহে একদিন ছালাত আদায় করেছি। মাঝে মাঝে কিছু দ্বীনী প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সহযোগিতা করেছি। এতটুকু পুণ্যকে পুঁজি করেই আমি জান্নাতের রাজকীয় জীবন কল্পনা করেছি। তবে আজ মনে হচ্ছে, যদি আমি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের মত আখেরাত চাই, তবে আমার দুনিয়াও ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের মতই হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু না, আমি রোম ও পারস্যের শাসকদের মত দুনিয়া অতিবাহিত করেছি। আর আখেরাত কল্পনা করেছি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের মত। এটা হয় না! এই সোজা হিসাবটা আমার মস্তিষ্কে এতদিন ঢোকেনি। আমি এতদিন ভুল পথেই হেঁটেছি। আফসোস!

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘড়ির কাঁটা রাত দু’টো পার করেছে, খেয়াল করতে পারিনি। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ওযূ করে ছালাতে দাঁড়ালাম। এটা আমার জীবনের প্রথম তাহাজ্জুদ। নিয়ত করেছি, দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে জীবনের সকল গোনাহ থেকে তওবা করব। তাহ’লে হয়ত কিছুটা প্রশান্তি মিলবে। বুকে জমে থাকা পাহাড়ের ওযন কিছুটা হালকা হবে। তবে এমন হ’ল না। ছালাত এগুতে থাকল। আমার পাহাড়ের ওযন আরো বাড়তে থাকল। আমার অন্তর আরো বেশী চঞ্চল হয়ে উঠল।

মনে হ’ল, জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ আমি আল্লাহর দরজায় এসে দাঁড়িয়েছি একেবারে রিক্ত, নিঃস্ব এক ভিখারী হয়ে। আমার সাথে কোন পুণ্য নেই, আছে কেবল চরম অক্ষমতা আর বুকভরা অনুশোচনা। আমি তো এমন এক কাঙাল, যার ভিক্ষা চাওয়ার মতো একটা ঝুলি বা সামান্য পাত্রটুকুও অবশিষ্ট নেই। দুনিয়ার মোহ আর প্রবৃত্তির তাড়না আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে কামড়ে ধরে ভেতর থেকে একেবারে নিঃশেষ করে দিয়েছে। অশ্রুধারা যেন বাঁধ মানছে না। মনে হচ্ছে, আরেকটু পরেই চোখ দিয়ে রক্ত বের হবে।

আনমনে বলতে শুরু করলাম, হে আল্লাহ! আমি কি ফিরে পাবো আমার হৃদয়ের সেই পবিত্রতা? জীবনের সমস্ত সঞ্চয় হারিয়ে আমি যে আজ রিক্ত, ক্লান্ত, দিশেহারা। পাপের কালিমায় আমার অন্তর্জগৎ আজ বড়ই নোংরা। নিজের ভেতর কোন শক্তি পাচ্ছি না। সাহসগুলো যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। হৃদয়ে আজ হঠাৎই অসংখ্য দগ্ধ দাগ দেখছি। কিন্তু সেগুলোকে ধুয়ে যে পরিষ্কার করবো, সেই উপায়ও আমার জানা নেই। চোখগুলো আজ এমনভাবে শুকিয়ে গেছে যে, অপরাধের ভারে তারা ঠিকমতো কাঁদতেও পারছেনা। হৃদয়ের এই গভীর ক্ষত আর প্রকৃত অবস্থা প্রকাশের কোন ভাষা বা শক্তি আজ আমার নেই।

আমি জানি, তোমার এই পবিত্র চৌকাঠের উপযোগী একটি নেক আমলও আমার ঝুলিতে নেই। আমার দুই হাত আজ সম্পূর্ণ খালি। কিন্তু হে দয়ামল! এ যে তোমার অসীম দয়া ও কৃপার দরবার, যা পুরোপুরি নূরে ভরপুর। আমি আশা হারাচ্ছি না। আমি জানি, তোমার দরবারের যে সম্মান ও শিষ্টাচার বজায় রাখা দরকার, আমি হতভাগা তা থেকে বঞ্চিত। আমি এমন এক অক্ষম ভিখারী, যার ঠিকমতো চাওয়ার সামান্য আদব-কায়দাও জানা নেই। তীব্র অনুশোচনার চোটে আজ আমার যবান বারবার ভুল করে ফেলছে। আড়ষ্ট ভাষা অন্তরের আর্তনাদকে ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারছে না। হে আল্লাহ! আমার এই নির্বাক, আড়ষ্ট ভাষা আর শূন্য হাতের ফরিয়াদের ওপর তুমি দয়া করো।

মনে হচ্ছিল, এই ভাষাগুলো আমার নয়। আমি এভাবে বলতে জানি না। কেউ হয়ত আমার মাঝে থেকে আমাকে এভাবে বলিয়ে নিচ্ছে। দু’হাত আসমানের দিকে তুলে ঠিক কতটা কেঁদেছি, তা মনে নেই। ক্লান্ত হয়ে মুছল্লার ওপরেই ঘুমিয়ে গেছি। ফজরের আযান শুনে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। ছালাত আদায় করতে মসজিদে যাব কি-না, ভাবছি। মানুষ কি বলবে। নাকি আগামী জুম‘আ থেকেই শুরু করব। এইসব মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। ডাক্তারের কথা মনে পড়ল। আমার তো বয়স হয়েছে। এভাবে আর কতদিন? যাই মসজিদে। মানুষ যা বলবে বলুক। আমি তো তাদের ঘরে যাচ্ছি না, তাদের কাছেও যাচ্ছি না। আমি আল্লাহর ঘরে তাকে সিজদা করতে যাচ্ছি।

ফজরের ছালাতে আমাকে দেখে নিয়মিত মুছল্লীরা একটু অবাকই হ’লেন। ছালাতের পরে নিজেদের মাঝে কানাঘুষাও করলেন। আমি সকালের সূর্যের দিকে তাকিয়ে মনে করলাম, এই হয়ত আমার পরীক্ষা শুরুর সময়। এখন থেকে আমাকে শুনতে হবে তাচ্ছিল্যভরা কথাবার্তা। সহ্য করতে হবে অনেক ঠাট্টা-বিদ্রূপ। প্রশ্নের মুখোমুখি হ’তে হবে ধাপে ধাপে। বাসায় আসলাম। সবাই জিজ্ঞাসা করছে, আমি এই ভোরের অন্ধকারে কোথায় গিয়েছিলাম! কারো কোন বিপদ হয়েছে কি-না? আমি বললাম, হ্যাঁ। একজন বড়ই বিপদে ছিল। তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে গিয়েছিলাম।

অফিসে গেলাম। বরাবরের মতই বন্ধুরা সিগারেটের অফার করল। আমি বললাম, ডাক্তার কড়াভাবে নিষেধ করেছেন। কাজে মন দিলাম। আজ আমি অফিসে যেন প্রথমবারের মত যোহরের আযান শুনলাম। ছালাতের জন্য উঠলাম। একজন বলল, আরে! কই যান? আমি বললাম, ছালাতে। সে বলল, হঠাৎ আপনার আচরণ এমন লাগছে কেন? কোন মুমিন জিন ভর করেছে নাকি? আমি বললাম, না। শয়তান জিন থেকে মুক্তি পেয়েছি। আমার এমন অস্বাভাবিক কথাবার্তা মুহূর্তেই অফিসে ছড়িয়ে পড়ল। আলোচনা-সমালোচনা শুরু হ’ল।

আছরের ছালাত আদায় করে অফিস থেকে বের হ’লাম। আমার স্বজনদের কথা-বার্তা ও আচার-ব্যবহারে অন্তর ক্ষত-বিক্ষত হ’লেও গতরাতে যে বুকের মাঝে পাহাড়সম চাপ অনুভব করছিলাম, তা অনেকটাই হালকা হয়ে গেল। কি মনে করে একবার আকাশের দিকে তাকালাম। দেখলাম, সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। আবার সেই ডাক্তারের কথা মনে পড়ল। এবার মনে একটা প্রশান্তি অনুভব করলাম। কারণ আমার বয়স হয়েছে। কাজেই আমার পরীক্ষার সময়ও খুবই কম হবে। অল্পদিনেই হয়ত আমি হায়াতের সীমানা পেরিয়ে ওপারে চলে যাব। মুছে যাব। হারিয়ে যাব। মুক্তি পাব এই ছলনাময়ী দুনিয়া থেকে।

(৯ পৃষ্ঠার পর)

এক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য এই যে, যতক্ষণ পর্যন্ত নাসেখ হাদীছ কারো কাছে না পৌঁছে ততক্ষণ পর্যন্ত মানসূখ হাদীছ তার ক্ষেত্রে মানসূখ গণ্য হবে না যদিও বাস্তবে তা মানসূখ। যখন নাসেখ হাদীছ পৌঁছাবে তখন মানসূখ হাদীছের উপর আমল আদৌ জায়েয হবে না। রাবী‘আ (বাহরাইন) গোত্রের জন্য حَنْتَمٌ (হানতাম বা সবুজ কলস) ও دُبَّاءٌ (দুববাউ বা লাউয়ের খোলের পাত্র) ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা ততদিন পর্যন্ত মানসূখ হয়নি যতদিন পর্যন্ত না নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার নাসেখ হাদীছ তাদের হাতে পৌঁছেছে। অতএব সুন্নাতের অনুগামীর কর্তব্য হবে জীবনভর যদি তার হাতে একটি হাদীছও হস্তগত হয় এবং আর কোন হাদীছের দেখা না মেলে তবুও সে সেই একটি হাদীছকে মহামূল্যবান মনে করে অাঁকড়ে ধরে রাখবে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, بَلِّغُوْا عَنِّي وَ لَوْ أَيَة (‘একটা আয়াত হ’লেও আমার পক্ষ থেকে তা পৌঁছে দাও’)-এর মর্ম এটাই। কিতাবসমূহ অনুসন্ধান করলে জানা যায় যে, পূর্ববর্তী আলেমগণও নাসেখ হাদীছ হস্তগত না হওয়া পর্যন্ত মানসূখ হাদীছের উপর আমল করছেন।

পরস্পর বিরোধার্থক হাদীছ সমূহও (أَحَادِيْثُ مُتَعَارِضَة) হাদীছ গ্রন্থে এক জায়গায় লেখা হয়ে থাকে, যাতে একটু চিন্তা-ভাবনা করলেই বিরোধ দূর হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কথার মধ্যে দৃশ্যত কোন বিরোধ থাকার কথা নয়। কিন্তু স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিদের চোখে তা বিরোধপূর্ণ মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি হাদীছের অর্থ ও প্রয়োগের ক্ষেত্র ভিন্ন হয়ে থাকে। হাদীছের প্রকারভেদ সম্পর্কে একটি কথা বাকী রয়ে গেছে। তা এই যে, ‘উছূলে হাদীছ’ বা হাদীছের মূলনীতি শাস্ত্রের আলেমগণ হাদীছের অনেক প্রকার বর্ণনা করেছেন। যেমন ছহীহ, হাসান, আহসান, গরীব, মুরসাল, মারফূ, মওকূফ, মাকতূ ইত্যাদি। হাদীছের এত সব মাত্রা বা স্তর প্রত্যেকের মস্তিষ্ক দ্রুত আয়ত্ত করতে পারে না। ফলে হাদীছের উপর আমল থমকে যেতে পারে। আমাদের বুঝতে হবে যে, হাদীছের প্রকারভেদগুলোর এই আধিক্য মূলত বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও শর্তের পার্থক্যের কারণে হয়ে থাকে। যত বেশী শর্ত ও দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করা হবে, প্রকারের সংখ্যা তত বাড়তেই থাকবে; আর যত শর্ত কমানো হবে, প্রকারের সংখ্যাও তত কমে আসবে। যেমন মানুষ দুই প্রকার হ’তে পারে, যথা: শ্বেতকায় ও কৃষ্ণকায়। আবার হাযার প্রকারও হ’তে পারে। যথা: সাদা, কালো, লাল, বাদামী, পিঙ্গল, লম্বা গলা, খাটো গলা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু হাদীছের ক্ষেত্রে প্রকারভেদ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ আমলকারীদের মধ্যে প্রচুর দ্বিধাবোধ বা সন্দেহ সৃষ্টি হয়।

উছূলে হাদীছ শাস্ত্রের আলেমগণ হাদীছের প্রকার নির্ণয়ে চমৎকার ও সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। হাদীছের ওপর আমলকারীরাও যদি নিজেদের সামনে একটি সহজ ও সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি রাখেন, তাহ’লে তাতে অনেক উপকার হবে। সেই সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিটি হ’ল, মওযূ‘ (জাল) নয় এমন সব হাদীছ মূলত দুই প্রকার: শক্তিশালী (قوی) ও দুর্বল (ضعيف)। শক্তিশালী সেই হাদীছকে বলে যার বর্ণনাকারীগণ অজ্ঞাত নন এবং তাদের নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণিত। আর দুর্বল সেই হাদীছকে বলে যার বর্ণনাকারীদের সনদ অজ্ঞাত নয়; কিন্তু সেই বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ততা (ثقات) এবং অন্যান্য অবস্থা যথাযথভাবে প্রমাণিত নয়। সবল হাদীছকে তারা আবার দুই প্রকার বলে থাকেন। কোন হাদীছ বা তার বিষয়বস্ত্ত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে একাধিক ব্যক্তি বর্ণনা করলে সেটি মুতাওয়াতির। আর যদি এমন না হয় তাহ’লে সেটি গায়রে মুতাওয়াতির। অন্যান্য কিতাবে ওলামায়ে কেরাম মুতাওয়াতির হাদীছের বর্ণনাকারীর নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করেননি। এর কারণ হ’ল, রাবীদের অবস্থা ও বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতার কারণে তাওয়াতুরের জন্য নির্দিষ্ট কোন সংখ্যা নির্ধারিত নেই। যখন কোন বর্ণনা সামগ্রিকভাবে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করিয়ে দেয়, তখনই সেটি মুতাওয়াতির হিসাবে গণ্য হয়। তবে এ কথা অস্পষ্ট নয় যে, যখন রাবীগণ বিশ্বস্ত, ন্যায়পরায়ণ ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন হন, তখন তাঁদের তিনজনের বর্ণনাও নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে। এ কারণে এখানে তা তিনজন রাবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।

মুতাওয়াতির হাদীছ অকাট্য দলীল (نَصّ قطعی)। অমুতাওয়াতির হাদীছ প্রবল ধারণার ভিত্তিতে সত্য বলে বিবেচিত (مظنون الصدق بظن غالب)। আর দুর্বল হাদীছ সত্য ও মিথ্যা উভয়েরই সম্ভাবনাযুক্ত। দুর্বল হাদীছ ক্বিয়ামত, বারযাখ, জাহান্নাম, জান্নাত, ভয় প্রদর্শন, উৎসাহ প্রদান এবং এ ধরনের বিষয়সমূহে গ্রহণ করা হবে। আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রেও হদ, ক্বিছাছ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়া, যদি এর বিপরীতে কোন শক্তিশালী হাদীছ না থাকে; তাহ’লে তার ওপর আমল করা হবে। আর যদি শক্তিশালী হাদীছ এর বিরোধী হয়, তাহ’লে তা (যঈফ হাদীছ) পরিত্যাগ করতে হবে। এছাড়াও যদি পরবর্তীতে একই বিষয়বস্ত্তর তিনটি দুর্বল হাদীছ পাওয়া যায়, তাহ’লে সেগুলো শক্তিশালী হাদীছের বিধান লাভ করবে।[1] মুতাওয়াতির হাদীছ দ্বারা অমুতাওয়াতির হাদীছকে রহিত করা জায়েয। শক্তিশালী অমুতাওয়াতির হাদীছের মাধ্যমে প্রমাণিত কোন বিধানের উপর আমল করা ফরয এবং তা অস্বীকারকারী কাফের। হাদীছের এই পরিমাণ প্রকারভেদ ও বিধান প্রত্যেক আমলকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী জানা যরূরী এবং যথেষ্ট।

[1]. মাননীয় লেখকের এই বক্তব্যটি সঠিক নয়। কয়েকটি যঈফ হাদীছ একত্র হ’লেই তা ছহীহ হাদীছে পরিণত হয় না। উছূলে হাদীছ অনুযায়ী হাদীছের ছহীহ বা যঈফ হওয়া সনদ ও মতনের গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে, যা কোন সংখ্যাগত বিষয় নয় (ইবনু হাজার, নুযহাতুন নাযার, পৃ. ৮০-৮৫; ইবনুছ ছালাহ, মুকাদ্দিমাহ ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ৩৪-৩৬)। তবে সামান্য দুর্বলতাসম্পন্ন হাদীছ একাধিক স্বতন্ত্র সনদে বর্ণিত হ’লে তা ‘হাসান লিগায়রিহী’ (حسن لغيره) পর্যায়ে উন্নীত হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ‘কয়েকটি যঈফ হাদীছ মিলে একটি ছহীহ হাদীছ হয়ে গেল’। বরং এটি হাসান লিগাইরিহী, যা পরিভাষাগতভাবে ছহীহ লিযাতিহির সমান নয় (ঐ)। পক্ষান্তরে বর্ণনাকারী মিথ্যাবাদী বা অতি দুর্বল হ’লে একাধিক সনদ থাকলেও তা শক্তিশালী হয় না (সাখাবী, ফাতহুল মুগীছ, ১/৬৮-৭০)। অতএব আক্বীদা ও হালাল-হারামসহ শরী‘আতের কোন বিধানেই যঈফ হাদীছ একক দলীল হ’তে পারে না; বরং মূল বিধান কুরআন বা ছহীহ হাদীছে প্রমাণিত থাকলে একে কেবল সহায়ক প্রমাণ (শাহিদ ও মুতাবা‘আত) হিসাবে উল্লেখ করা যায় (ইমাম মুসলিম, মুকাদ্দামাহ ছহীহ মুসলিম, ১/৭; ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘উল ফাতাওয়া, ১/২৫০; শাতিবী, আল-ই‘তিছাম, ১/২৪০) -অনুবাদক।






বিষয়সমূহ: বিবিধ
আরও
আরও
.