মাঝে মাঝে অবসাদের ছায়া মনটাকে ঘিরে ধরে। সকল কাজগুলো একঘেঁয়েমিতে রূপ নেয়। তখন যেন মনের আকাশ জুড়ে নেমে আসে বিনোদনের তৃষ্ণা। মন তখন ডুব দিতে চায় ভালোলাগার পুকুর ঘাটে। বিনোদনের এই তৃষ্ণা সবারই জাগে। কারো জাগে মাসে একবার। কারো সপ্তাহে। আমি এক বিক্ষিপ্ত মানুষ। আমার প্রতিদিনই জাগে। কিন্তু বিনোদন তো বেশ ব্যয়বহুল! এর জন্য খরচা আছে। সবাই কি সেই খরচা বইতে পারে? সবাই কি মন চাইলেই পসন্দের খাবার খেতে পারে? বেড়াতে যেতে পারে পাহাড়, সমুদ্র সৈকত বা অজানা কোন নদীর চরে? তাই আমার মত মানুষেরা গ্রহণ করে বিনা পয়সার বিনোদন। সেই অমূল্য বিনোদনের নাম হ’ল সমালোচনা।
বন্ধু মহলে সমালোচনায় আমার বেশ নাম-ডাক আছে। আমি যেভাবে রসিয়ে রসিয়ে সমালোচনা করতে পারি, তা আর পারে কয়জন? এজন্য বন্ধু মহলে আমাকে বলা হয়, ‘বিশিষ্ট সমালোচক’। আমরা যখন কাজের ফাঁকে এক টেবিলে বসি, তখনই আমার কোন বন্ধু সমসাময়িক কোন ইস্যুর জের টেনে আমার নাম উপস্থাপন করে। বলে, ‘সম্মানিত ভাতৃমন্ডলী! এ পর্যায়ে অমুক বিষয়ে কথা বলার জন্য আহবান জানাচ্ছি বিশিষ্ট সমালোচক জনাব অমুককে’। আমি মুচকি হেসে গলাটা ঝেড়ে নিয়ে সমালোচনা শুরু করি। সে কি হাসাহাসি চলে! লুটোপুটি চলে! গড়াগড়ি চলে! ঘড়ি-ঘণ্টার কোন হিসাবই তখন আমাদের থাকে না।
এই সমালোচনার মজলিস শুধু কাজের ফাঁকে জমে, এমন নয়। কখনো মসজিদ থেকে ছালাত আদায় করে বেরিয়ে। কখনো সন্ধ্যার পরে চায়ের দোকানে। তথাকথিত এই বিনোদন-মজলিস জমে ওঠে যে কোন সময়েই। আবার জমে উঠতে কোন সময় লাগে না। কোন বিষয় ঠিকও করে আসতে হয় না। কারণ সমালোচনার হাযারো বিষয় আমাদের মস্তিষ্কে সারাদিন আঁকিবুকি কাটতেই থাকে। কোন সহকর্মী কি করল। কর্তৃপক্ষ কি করল। এই আলোচনা নিয়েই আমার জীবন বেশ সুন্দর। সমালোচনা যদি না থাকত, তবে আমার একেকটা দিন হ’ত হাযার বছরের সমান। কি করে আমার দিন কাটত, আমি জানি না।
হঠাৎ সেদিন খেয়াল করলাম, সমালোচনা শুধু বিনোদন নয়, এটা আমার অস্ত্র। এটা আমার আশ্রয়। আমার কর্মস্থলে এমন কোন নিখুঁত কাজ আজ পর্যন্ত হয়নি, যাকে আমি সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করতে অপারগ হয়েছি। যখনই কোন কল্যাণকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, আমি নিজের সর্বশক্তি দিয়ে তার সমালোচনা করেছি। সহকর্মীদের কাছে করেছি। অধীনস্থদের কাছেও করেছি। এমনকি অপরিচিত ব্যক্তির কাছেও করেছি। যে ঐ মানুষটিকে চেনে না, তাকে চিনিয়ে দিয়েও তার কাছে সমালোচনা করেছি। আমার কোন সহকর্মীকে কোন ভাল কাজ করতে দেখলে বিভিন্ন তীর্যক মন্তব্য দিয়ে তাকে ক্ষত-বিক্ষত করেছি। আঙ্গুল তুলে হেসেছি। এই ক্ষেত্রগুলোতে সমালোচনাকে আমি এক মহাস্ত্র হিসাবে ধারণ করেছি।
সমালোচনাকে কখনো আমি আশ্রয় হিসাবেও নিয়েছি। যখনই দেখেছি, আমি গতানুগতিক। আমার ঝুলি একদম শূন্য। তখনই আমি ঊর্ধ্বতনদের কাছে কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে বিপরীতদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছি। দেখানোর চেষ্টা করেছি, আমি গতানুগতিক নই, বরং আমি মৌলিক। আমি আদি ও আসল। যারা আধুনিকায়ন চায়, তাদের মাঝে হাযারো দোষ। তাদের মাঝে না আছে প্রজ্ঞা, আর না আছে ইনছাফ। তাদের শুধু দোষ আর দোষ। আর আমি এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
আমার স্বাদ নেয়া সকল আলাপের মাঝে সমালোচনা হ’ল সবচেয়ে মুখরোচক আলাপ। এই আলাপ নিয়ে আমি যার কাছেই উপস্থিত হয়েছি, সেই আমাকে সাদরে গ্রহণ করেছে। চা খাইয়েছে। আমি দেখেছি, সমালোচনা শুধু আমার কাছেই নয়, সকলের কাছেই মুখরোচক। আর সেই সমালোচনা যদি হয় কোন সৎ ব্যক্তির। তাহ’লে তো জমেই গেল। এজন্যই হয়ত মিডিয়াগুলো সর্বদা এসব খবর খোঁজে। কে কোন্ ভাল কাজ করল, সেটা আমার কাছে মুখ্য নয়। কার কতটুকু পদস্খলন হ’ল, সেটাই আমি খুঁজে বেড়াই। কারণ মানুষ অভ্যাসগতভাবেই এগুলো শুনতে ভালোবাসে।
এভাবে মানুষের সমালোচনায় জীবন ক্ষয় করে আমার কোন লাভ হয়নি। বরং আমি শুধু হেরেছি, আর হারিয়েছি। হারিয়েছি অবস্থান ও সহাবস্থানের যোগ্যতা। আমি মানুষের কাছে একদম তেতো হয়ে গেছি। এই পরিস্থিতি আসার পূর্বেই হয়ত আমার বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখা উচিৎ ছিল, আমি বছরের পরে বছর মানুষের সমালোচনা করে দেশ-দশ বা নিজের কোন্ কল্যাণ সাধন করেছি? কোন্ অর্জনটি আমার ঝুলিতে এসেছে? এই সমালোচনাকেই কি রাসূল (ছাঃ) গীবত হিসাবে আখ্যায়িত করেননি? এটাই কি সেই পাপ নয়, যা যেনার চেয়েও নিকৃষ্ট? আমি তা থেকে নিজেকে কতটুকু বাঁচাতে পেরেছি?
আমি জনসচেতনতার দোহাই দিয়ে সমালোচনা করেছি। আমি ইছলাহ-কে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে দ্বীনদার ব্যক্তিদের কাছে মানুষের সমালোচনা করেছি। আমি কি কখনো ভেবেছি যে, তার ইছলাহের দায়িত্ব আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন কি-না? ইছলাহ-এর আর কোন নববী পদ্ধতি ছিল কি-না? সমালোচনা দিয়ে কি কখনো সংশোধন আশা করা যায়? আল্লাহ কি আমাকে হাশরের ময়দানে বলবেন যে, ‘অমুকের মধ্যে এই দোষ ছিল। তুমি তার সমালোচনা করে জনসচেতনতা বাড়ালে না কেন’? এই দায়িত্ব কি আমার? আমি কেন এই কাজ করতে গেলাম?
আমি তো দুনিয়াতে এসেছি জান্নাত অর্জনের জন্য। আমি মুসলমান মানেই আমি সর্বদা একজন যোদ্ধা। আমার কিসের এত অধিকারের লড়াই? কোন নেতা কি করল, কোন সরকার কি করল, কর্মক্ষেত্রে কে কি করল তা নিয়ে আমার কেন এত মাথাব্যথা? আমি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য দুনিয়াতে অবস্থান করছি। আমার রিযিক নির্ধারিত। আমার মৃত্যুর সময় ও স্থান নির্ধারিত। এই দুনিয়ার সকল ভাষাই আমার ভাষা। সমস্ত যমীন আমার সিজদার স্থান। আমি প্রতিদিন রাতে মারা যাই। ফজরে আমি নতুন জীবন নিয়ে উঠি। আমি তো এই দুনিয়ায় অবদান রাখতে এসেছি। কুড়াতে নয়, বিলাতে এসেছি। যে সর্বস্ব বিলাতে আসে তার কিসের প্রাপ্তির হিসাব? আমার পাওয়া-না পাওয়ার কি আছে? আমি কেন মানুষের সমালোচনা করতে যাব?
মুসলমান হিসাবে যাদের সাথে আমার বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বন্দ্ব, ধাপে ধাপে আমি তাদেরই শারণাপন্ন। আমি ইসলাম বিদ্বেষী লেখকের সমালোচনা করি। আবার সাহিত্য শিখতে আমি তার লেখাই পড়ি। কারণ আমাদের কোন লেখক নেই। আমি ইসলাম বিদ্বেষী পত্রিকার সমালোচনা করি। আবার মানসম্মত পত্রিকা হিসাবে সেটাই আমি টাকা দিয়ে কিনে পড়ি। কারণ আমাদের আন্তর্জাতিক মানের কোন পত্রিকা নেই। আমাদের কারিকুলাম নেই, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নেই, আমাদের প্রচার মাধ্যম নেই, আমাদের কলমের ধার নেই, আমাদের কথায় কোন লজিক নেই। যারা টকশোতে বসে ইসলাম নিয়ে বাজে মন্তব্য করে, আমরা পর্দার এপাশে তাদের সমালোচনা করি। তাদের সাথে বসে আধা ঘণ্টা বিতর্ক করার যোগ্যতা আমাদের নেই। আমরা শুধু পারি একে অপরের পেছনে লেগে থাকতে আর সমালোচনা করতে।
আমার মুখ থেকে হাসি মুছে যাওয়ার জন্য এই সংকটগুলো কি যথেষ্ট ছিল না? আরো কতটা নিঃস্ব হওয়ার পরে আমি নিজের শুন্যতা অনুভব করতে পারব? আমার তো সমালোচনা দূরে থাক, নিঃশ্বাস ফেলার সময় থাকার কথা নয়। কারণ ইসলাম বিদ্বেষীদের সমালোচনা করে কি হবে? আমি তাদের সামনে ইসলামী সংস্কৃতির সাম্রাজ্য গড়ে তুলব। আমি কেন বলব, অমুক লেখক ইসলাম বিদ্বেষী? আমি এমন একশো লেখক তৈরী করব যারা চিন্তাধারায় হবে ইসলামপন্থী আর ভাষায় হবে কিংবদন্তী। আমি কখনো তীব্র নিন্দা জানাবো না। আমি কারো অনুগ্রহ চাইব না। আমি নীরবে নিভৃতে সৈনিক তৈরী করে যাব। যারা কনস্টান্টিনোপলের অভেদ্য প্রাচীরের সামনে হঠাৎ একদিন আত্মপ্রকাশ করবে সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ-এর একশোটি তোপ হয়ে। সেদিন ঐ অভেদ্য প্রাচীর গুড়িয়ে দেয়া হবে। আমি কেন সমালোচনা করে সময় নষ্ট করব? আমি কেন তীব্র নিন্দা জানাব?
আমি কোন খারাপের সমালোচনা না করে এত ভাল ছড়িয়ে দেব, যার সয়লাবে খারাপ খড়কুটোর মত ভেসে যাবে ইনশাআল্লাহ। আমি আজ থেকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, যতই যা হয়ে যাক, মুখে-কলমে কারো সমালোচনা করব না। যদি কখনো কারো সমালোচনা করে ফেলি তবে তার কাছে ক্ষমা চাইব। কমপক্ষে তিনটি সমমানের মজলিসে তার প্রশংসা করব। এটা আমার শাস্তি। আমার ইছলাহ। আমি ভাল দিয়ে খারাপকে ঢেকে দেব নীরবে। অবদানে অবদানে সাজিয়ে তুলব এই পৃথিবী। আমি এমন এক বিপলবের প্রহর গুনে সময় কাটাব, যে বিপ্লব হবে একটি ঢেউয়ের মত। যে ঢেউয়ে কোন গর্জন থাকবে না। কোন গতি থাকবে না। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে। বড় বড় দালান-কোঠা, পাহাড়-পর্বত তার নীচে তলিয়ে যাবে। যাবতীয় অন্যায় ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব হবে মূসা (আঃ)-এর লাঠির মত। যে এগুলোকে নীরবে গিলে ফেলবে ইনশাআল্লাহ। সেই স্বপ্ন দেখে যাব। স্বপ্ন দেখিয়ে যাব। এই দুর্বল মানুষটি সর্বদা আপনার দো‘আপ্রার্থী।